দাসপ্রথা ও ইসলাম: নাস্তিকদের অভিযোগের খণ্ডন
“দাসপ্রথা ও ইসলাম: নাস্তিকদের অভিযোগের খণ্ডন, বিধান, প্রজ্ঞা ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ” পর্ব : ২

এ লেখাটি পড়ার পূর্বে দয়া করে পর্ব :১ পড়ে আসুন
দাস দাসী হওয়ার প্রক্রিয়া
ইসলামে দাস-দাসী সম্পর্কিত বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটনির্ভর। এ বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকেই বিভ্রান্তির শিকার হন কিংবা ইসলামের উপর ভুল অভিযোগ আরোপ করেন। বাস্তবতা হলো—ইসলাম দাসপ্রথার প্রবর্তক নয়; বরং একটি বিদ্যমান বৈশ্বিক প্রথাকে সীমাবদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত করেছে।
দাস-দাসী হওয়ার প্রক্রিয়াকে মূলত দুই ভাগে আলোচনা করা যায়:
i/ ইসলাম পূর্ব যুগে দাস দাসী হওয়ার প্রক্রিয়া
ইসলাম পূর্ব যুগে বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষ দাস দাসীতে রূপান্তরিত হতো, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হল
- অভাবের তাড়নায় পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের বিক্রী করে দাস-দাসীতে পরিণত করতো।
- ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে দাসে পরিণত হতো।
- অভাবী লোকেরা অভাবের তাড়নায় ধনী ব্যক্তিদের দাস-দাসীতে পরিণত হয়ে যেতো।
- শক্তিশালীরা অপহরনের মাধ্যমে কাউকে বন্দি করে দাস-দাসীতে পরিণত করতো।
- যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে বন্দিরা দাস-দাসীতে পরিণত হতো।
ii/ ইসলামী যুগে দাস দাসী হওয়ার প্রক্রিয়া
ইসলামী যুগে দাস-দাসী হওয়ার প্রক্রিয়া মাত্র দুটি। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো
১. স্বাধীন মানুষকে জোরপূর্বক দাস বানানো
জাহেলী যুগে এবং ইসলাম-পূর্ব বিশ্বে একটি জঘন্য প্রথা ছিল—স্বাধীন মানুষকে অপহরণ করে দাস হিসেবে বিক্রি করা। ইসলাম এ ধরনের কার্যক্রমকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছে এবং এটিকে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে।
এ প্রসঙ্গে সহীহ হাদীসে এসেছে—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: قَالَ اللَّهُ تَعَالَى:
ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ، وَرَجُلٌ بَاعَ حُرًّا فَأَكَلَ ثَمَنَهُ، وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِ أَجْرَهُ.
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন—আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন: কিয়ামতের দিন আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হবো—
(১) যে ব্যক্তি আমার নামে অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করেছে,
(২) যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করেছে,
(৩) এবং যে ব্যক্তি শ্রমিক নিয়োগ করে পূর্ণ কাজ আদায় করেছে, কিন্তু তার পারিশ্রমিক দেয়নি।[1]সহীহ বুখারী, হাদীস: ২২২৭
এই হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামে কোনো স্বাধীন মানুষকে দাসে পরিণত করা সম্পূর্ণ হারাম। শুধু হারামই নয়, বরং এটি এমন অপরাধ, যার বিরুদ্ধে স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন বাদী হবেন। অতএব, ইসলাম দাসপ্রথার এই জুলুমপূর্ণ পথকে চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে।
২. যুদ্ধবন্দীদের দাস-দাসীতে রূপান্তর
দ্বিতীয় যে প্রক্রিয়াটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ছিল, তা হলো—বৈধ যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দীদের দাস-দাসীতে পরিণত করা। এই প্রথা কেবল ইসলামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকেই রোমান, পারস্য, গ্রিকসহ বিশ্বের প্রায় সকল বড় সভ্যতায় এটি একটি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক রীতি হিসেবে প্রচলিত ছিল। যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে পরাজিত পক্ষের যোদ্ধা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বন্দী হতো, এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করত বিজয়ী পক্ষ।
আরও স্পষ্টভাবে বললে—
যখন দুটি রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর মধ্যে বৈধ (شرعي) যুদ্ধ সংঘটিত হতো, তখন যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত পক্ষের কিছু লোক জীবিত অবস্থায় বন্দী হয়ে যেত। এই বন্দীদের নিয়ে তখন কয়েকটি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো, যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত। ইসলাম এই বন্দীদের ব্যাপারে একাধিক বিকল্প দিয়েছে, যেমন—
- বন্দীকে ক্ষমা করে মুক্ত করে দেওয়া
- নির্দিষ্ট সম্পদ অর্থাৎ মুক্তিপণ গ্রহণ করে মুক্ত করে দেওয়া
- বন্দী বিনিময় করা
- বন্দীকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা
- দাস/দাসী হিসাবে গণ্য করা
এবার আসুন উপরে উল্লেখিত পাঁচটি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
(১) বন্দীকে ক্ষমা করে মুক্ত করে দেওয়া
কোনো প্রকার বিনিময় ছাড়াই দয়া করে বন্দীদের মুক্ত করে দেওয়া। এটি ইসলামের মানবিক দিককে সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত করে। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআন মাজীদে উল্লেখ রয়েছে
فَإِمَّا مَنًّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً
“অতঃপর (যুদ্ধ শেষে) তাদেরকে হয় অনুগ্রহ করে মুক্তি দাও…” [সূরা মুহাম্মদ : ৪]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেশ অনেককেই কোন মুক্তিপণ বা কোনরকম মাধ্যম ছাড়া এই মুক্ত করে দিয়েছিলেন। যেমন মুত্তালেব বিন হানতাব, কবি আবু ইজ্জা ও ছয়ফি বিন আবি রিফাআ।[2]ইবনে সাইয়েদিন নাস; উয়ুনুল আছার: ১/৩৫২
সাহাবায়ে কেরামের অভ্যাস ছিল তাঁরা অকাতরে প্রচুর সংখ্যক দাস মুক্ত করতেন। “আন্নাজমুল ওয়াহ্হাজ “এর গ্রন্থকার কোন কোন সাহাবীর মুক্ত করা দাসদের সংখ্যা নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেন।
- হযরত আয়েশা (রাযি) – ৬১
- হযরত হাকীম ইবনে হেযাম (রাযি) – ১০০
- হযরত ওসমান গণী (রাযি) – ২০
- হযরত আব্বাস (রাযি) – ৭০
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি) – ১০০০
- হযরত যুল কা’লা হিময়ারী (রাযি) – ৮০০০ (মাত্র একদিনে)
- হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি) – ৩০,০০০[3]ফতহুল আল্লাম, টীকা বুলুগুল মারাম,নবাব সিদ্দিক হাসান খান প্রণীত,২/২৩২
এ থেকে জানা যায় যে, মাত্র সাত জন সাহাবী, ৩৯,২৫৯ জন দাসকে মুক্ত করেছেন।
বন্দীকে বিনা শর্তে মুক্তি করে দেওয়া বা ক্ষমা করে দেওয়ার কিছু অপকারিতা রয়েছে যা একটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতিকারক। তন্মধ্যে কিছু উল্লেখ করা হলো :-
ক. পুনরায় শত্রুপক্ষকে শক্তিশালী করা
যদি বন্দীকে মুক্ত করে দেওয়া হয়, সে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে গিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।
খ. মুসলিমদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়া
কিছু বন্দী মুক্ত হওয়ার পর গুপ্তচরবৃত্তি, ষড়যন্ত্র বা মুসলিমদের ক্ষতি করার কাজে লিপ্ত হতে পারে।
গ. শত্রুপক্ষের মনোবল বৃদ্ধি পাওয়া
যদি তারা দেখে যে মুসলিমরা সহজেই বন্দীদের ছেড়ে দিচ্ছে, তাহলে তাদের মধ্যে যুদ্ধের সাহস বৃদ্ধি পেতে পারে।
ঘ. প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা
শত্রুরা বুঝতে পারে যে, ধরা পড়লেও সহজে মুক্তি পাওয়া যাবে—ফলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। এবং পুনরায় ইসলামী রাষ্ট্রের আক্রমণের চেষ্টা করতে পারে।
ঙ. মুসলিম বন্দীদের বিনিময়ের সুযোগ হারানো
যদি বন্দীদের ধরে রাখা হতো, তাহলে তাদের মাধ্যমে মুসলিম বন্দীদের মুক্ত করা সম্ভব হতো (الفداء)। কিন্তু নিঃশর্ত মুক্তিতে সে সুযোগ নষ্ট হয়।
নিঃশর্ত মুক্তি ইসলামের দয়া ও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেও, এটি সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য নয়। বরং শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি কৌশলগত বিকল্প, যা গ্রহণ বা বর্জন করা হবে পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ও মুসলিমদের সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায়।
(২) নির্দিষ্ট সম্পদ অর্থাৎ মুক্তিপণ গ্রহণ করে মুক্ত করে দেওয়া বন্দীরা অর্থ, সম্পদ বা শিক্ষা (যেমন—লেখাপড়া শেখানো) ইত্যাদির বিনিময়ে নিজেদের মুক্ত করতে পারত। বদরের যুদ্ধের বন্দীদের ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়।
এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন হজরত উমর (রা.) (তিনি বলেন, (বদরযুদ্ধের যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে) আবু বকর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এরা তো আমাদেরই আত্মীয়, কেউ হয়তো চাচাতো ভাই, কেউ আপন ভাই, কেউ-বা পরিবারের অন্য সদস্য। এতএব, আমার মত হলো তাদের থেকে ফিদয়া নেওয়া হোক। তাহলে সেই সম্পদগুলো পরে কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের শক্তি জোগাবে। সেইসাথে সম্ভাবনা আছে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে হেদায়েত দিয়ে দেবেন, তখন তারাও আমাদের সহযোগী হয়ে যাবে।’ এরপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘হে খাত্তাবের পুত্র, তোমার কী মত?’
উমর (রা.) বলেন, আমি তখন বললাম, ‘আল্লাহর কসম! আমার মতটা আবু বকরের মতের মতো নয়। বরং আমার মত হলো, আপনি অমুককে (তার নিজের এক আত্মীয়ের কথা উল্লেখ করলেন) আমার হাতে ছেড়ে দেবেন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। আলির হাতে ছেড়ে দেবেন আকিলকে, সে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে। আর হামজার হাতে দেবেন তার অমুক ভাইকে, সেও তার গর্দান উড়িয়ে দেবে (এভাবে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ মুশরিক বন্দি আত্মীয়কে হত্যা করবে)। যাতে আল্লাহ তাআলা দেখে নেন যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের প্রতি কোনো নমনীয়তা নেই। আর তারাই হলো মুশরিকদের নেতৃস্থানীয় লোক, তাদের নেতা ও প্রধান ব্যক্তিবর্গ…।’
(হজরত উমর (রা.) বলেন,) তবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমার মত গ্রহণ করলেন না, বরং তিনি হজরত আবু বকরের মত গ্রহণ করলেন এবং তাদের (যুদ্ধবন্দিদের) থেকে ফিদয়া গ্রহণ করে তাদেরকে মুক্ত করে দিলেন। [4]আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ২/৪৫৭।
সর্বদা মুক্তিপণের মাধ্যমে বন্দী মুক্তির সম্ভাব্য অপকারিতা সমূহ
ক. যুদ্ধকে অর্থনৈতিক লেনদেনে পরিণত করার আশঙ্কা
যদি বারবার মুক্তিপণ গ্রহণ করা হয়, তাহলে শত্রুপক্ষ এটিকে একটি “ব্যবসায়িক সুযোগ” হিসেবে দেখতে পারে—
বন্দী হওয়া মানেই পরে অর্থ দিয়ে মুক্তি।
খ. দরিদ্র বন্দীদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি
ধনী বন্দীরা সহজে মুক্তি পায়, কিন্তু গরীব বন্দীরা দীর্ঘদিন বন্দী থেকে যেতে পারে—যা মানবিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে।
গ. গুরুত্বপূর্ণ অপরাধী বা বিপজ্জনক ব্যক্তির মুক্তি
কিছু বন্দী মুক্তি পাওয়ার পর আবার যুদ্ধ বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারে—বিশেষত যদি সে নেতৃত্বস্থানীয় বা প্রভাবশালী হয়।
মুক্তিপণের মাধ্যমে বন্দী মুক্তি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত শরয়ী পদ্ধতি, যা ইসলামের ন্যায়বিচার ও কৌশলগত প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে। তবে এটি সর্বাবস্থায় উপযোগী নয়; বরং পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ও মুসলিমদের স্বার্থ বিবেচনায় প্রয়োগযোগ্য।
(৩) বন্দী বিনিময় করা
শত্রুপক্ষের হাতে থাকা মুসলিম বন্দীদের মুক্ত করার জন্য কাফির বন্দীদের বিনিময় করা। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কিছু যুদ্ধবন্দিকে, যেমন আমর ইবনে আবি সফিয়ানকে মুক্ত করে দেন এই শর্তে যে, মুশরিকরা তার বিনিময়ে সাদ ইবনে নুমান ইবনে আক্কালকে মুক্ত করে দেবে, যাকে আবু সুফিয়ান ওমরা করা অবস্থায় আটক করেছিল।[5]আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৩/৩১১
বন্দী বিনিময়ের সম্ভাব্য অপকারিতা
১. বিপজ্জনক শত্রুকে পুনরায় মুক্ত করে দেওয়া
যে বন্দীকে বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, সে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে এসে মুসলিমদের ক্ষতি করতে পারে।
২. শত্রুপক্ষের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি
বিশেষত যদি তারা দক্ষ যোদ্ধা বা নেতা হয়, তাহলে তাদের মুক্তি শত্রুপক্ষকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
৩. কৌশলগত ভারসাম্যহীনতা
যদি বিনিময়ে অসমতা থাকে (যেমন—একজন গুরুত্বপূর্ণ শত্রুর বদলে সাধারণ মুসলিম বন্দী), তাহলে তা কৌশলগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
৪. শত্রুপক্ষকে উৎসাহিত করা
তারা বুঝতে পারে মুসলিমদের বন্দী করলে সহজেই নিজেদের লোকদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব, ফলে ভবিষ্যতে তারা আরো বেশি মুসলিমকে বন্দী করার চেষ্টা করতে পারে।
৫. নিরাপত্তা ও গুপ্তচরবৃত্তির ঝুঁকি
মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি আবার শত্রুপক্ষে গিয়ে তথ্য সরবরাহ বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারে।
বন্দী বিনিময় ইসলামের বাস্তবমুখী ও মানবিক নীতির একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যা মুসলিমদের জীবনরক্ষা ও সম্মান রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত। তবে এটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক কৌশলগত মূল্যায়ন অপরিহার্য, যাতে সাময়িক লাভের কারণে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি না হয়।
(৪) বন্দীকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা
বন্দী দেখতে হত্যা করার বিষয়টিও বদরের যুদ্ধে পরিলক্ষিত হয়। রাসূল (ﷺ) বদর থেকে রওয়ানা দিয়ে ‘ছাফরা’ (الصَّفْرَاء) গিরি সংকট অতিক্রম করে একটি টিলার উপরে গিয়ে বিশ্রাম করেন এবং সেখানে বসে গণীমতের সমস্ত মালের এক পঞ্চমাংশ বের করে নিয়ে বাকী মাল সৈন্যদের মধ্যে সমভাবে বণ্টন করে দেন।[6]সীরাত ইবনু হিশাম ১/৬৪৩; আহমাদ হা/২২৮১৪, হাসান লিগায়রিহী; আলবানী, ফিক্বহুস সীরাহ ২৩৪ পৃঃ সনদ ছহীহ।
এর পূর্বে ছাফরা গিরিসংকটে কুরায়েশ বাহিনীর পতাকাবাহী দুষ্টমতি নযর বিন হারিছকে রাসূল (ﷺ)-এর আদেশক্রমে হযরত আলী (রাঃ) হত্যা করেন। এই শয়তান ইরাকের ‘হীরা’ থেকে নাচগানে পারদর্শী সুন্দরী নর্তকীদের খরীদ করে এনে মক্কাবাসীদের বিভ্রান্ত করত। যাতে কেউ রাসূল (ﷺ)-এর কথা না শোনে ও কুরআন না শোনে। এরপর ‘ইরকুয যাবিয়াহ’(عِرْقُ الظَّبْيَة) নামক স্থানে পৌঁছে আরেক শয়তানের শিখন্ডী উক্ববা বিন আবু মু‘আইত্বকে হত্যার নির্দেশ দেন’।[7]সীরাত ইবনু হিশাম ১/৬৪৪; আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়া ৩/৩০৫
যে ব্যক্তি রাসূল (ﷺ)-কে কা‘বাগৃহে ছালাতরত অবস্থায় গলায় চাদর পেঁচিয়ে এবং পরে মাথায় উটের ভুঁড়ি চাপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছিল [8]বুখারী, ফাৎহুল বারী হা/৬৩৭৮, ৫২০। একে মারেন আছেম বিন ছাবিত আনছারী (রাঃ)। মতান্তরে হযরত আলী (রাঃ)। এই দু’জন ব্যক্তি বন্দীর মর্যাদা পাবার যোগ্য ছিল না। কেননা তারা ছিল আধুনিক পরিভাষায় শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী (مِنْ أَكَابِرِ مُجْرِمِى الْحَرْب)।
সব সময় এই আমল করলে এরও কিছু উল্টো রিয়েকশন দেখা দিতে পারে। যেমন শত্রুপক্ষ প্রতিশোধ হিসেবে মুসলিম বন্দীদের হত্যা করতে পারে। ইসলামের দয়া ও রহমতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, যদি অপপ্রয়োগ হয়, তাহলে ইসলামের মানবিক দিক আড়াল হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় বন্দীদের দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়; হত্যা করলে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়। যদি যথাযথ তদন্ত ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—যা বড় ধরনের যুলুম। কিছু ক্ষেত্রে হত্যা করার পরিবর্তে মুক্তিপণ বা বিনিময় মুসলিমদের জন্য বেশি উপকারী হতে পারত—কিন্তু তা হারিয়ে যায়।
(৫) দাস/দাসী হিসাবে গণ্য করা
যদি উপরোক্ত কোনো পদ্ধতি উপযুক্ত বা সম্ভব না হয়, তখন বন্দীদের মুসলিম সমাজে দাস বা দাসী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। এটি ছিল প্রথম পছন্দ নয়, বরং শেষ বিকল্প (آخر الحلول)।
যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে শরীয়ত যে বিকল্পগুলো দিয়েছে—قتل، منّ، فداء، تبادل—তার সাথে استرقاق (দাসত্বে রাখা)-ও একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। ফুকাহায়ে কিরাম ব্যাখ্যা করেছেন যে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি অন্য বিকল্পগুলোর তুলনায় অধিক উপযোগী (أرجح) হতে পারে। প্রাণরক্ষা ও হত্যা থেকে উত্তম বিকল্প। দাসত্বে রাখা মানে বন্দীর জীবন রক্ষা করা, যা হত্যা করার তুলনায় অধিক দয়াশীল ।অতএব—
হত্যা → জীবন বিনাশ
দাসত্ব → জীবন রক্ষা + কল্যাণের সুযোগ
এছাড়াও দাস-দাসী মুসলিম সমাজে বসবাসের মাধ্যমে, ইসলামের আকীদা, ইবাদত, আখলাক প্রত্যক্ষভাবে দেখে। ফলে ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসে বহু দাস-দাসী ইসলাম গ্রহণ করে সম্মানিত ব্যক্তি হয়েছেন। যুদ্ধবন্দীকে যদি ছেড়ে দেওয়া হয়—
সে অনিশ্চিত জীবন, ক্ষুধা, নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে
কিন্তু দাসত্বে থাকলে—
খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় নিশ্চিত হয়, আর ইসলামী শরীয়তে দাস কে নির্যাতন নিষিদ্ধ।
যদি বন্দীকে মুক্ত করে দেওয়া হয় বা বিনিময় করা হয়—
সে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যেতে পারে। কিন্তু দাসত্বে থাকলে— সে শত্রুপক্ষে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ করার সুযোগ পায় না, মুসলিমদের নিরাপত্তা বজায় থাকে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই কথা স্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হলো যে যুদ্ধ অপরাধীদের সাথে ইসলামী শরিয়া আইন অনুযায়ী ৫ টি কাজ করা যেতে পারে। যেমন
(১) বন্দীকে ক্ষমা করে মুক্ত করে দেওয়া
(২) নির্দিষ্ট সম্পদ অর্থাৎ মুক্তিপণ গ্রহণ করে মুক্ত করে দেওয়া
(৩) বন্দী বিনিময় করা
(৪) বন্দীকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা
(৫) দাস/দাসী হিসাবে গণ্য করা
পাঁচটি প্রক্রিয়ার মধ্যে সর্বোত্তম প্রক্রিয়া হল দাস দাসী হিসেবে গণ্য করা। যা ইতোপূর্বে আলোচনা থেকে স্পষ্ট। এবার আমরা দেখব ইসলামে দাস-দাসীর কি অধিকার দিয়েছে।
ইসলাম প্রদত্ত দাস-দাসীদের অধিকার
ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, ইসলাম দাসপ্রথাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করেনি; বরং কিছু বাস্তব ও যুগোপযোগী কারণবশত এটিকে সীমিত পরিসরে স্বীকৃতি দিয়েছে। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয়, এ ব্যবস্থার পেছনে মানবকল্যাণের এক সুদূরপ্রসারী প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে। বাহ্যিকভাবে কিছু দিক আপাতদৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য মনে হলেও, ইসলামী জীবনব্যবস্থার সামগ্রিক কাঠামোর ভেতরে দাসপ্রথাকে নিছক অমানবিক বা অকল্যাণকর বলে চিহ্নিত করা যায় না।
প্রকৃতপক্ষে, আধুনিক প্রগতিবাদী ও পাশ্চাত্য চিন্তাবিদদের একটি অংশ দাসপ্রথাকে কেন্দ্র করে ইসলামের মৌলিক চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা সচরাচর এ ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকসমূহ উপেক্ষা করেছেন কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে তা আলোচনার বাইরে রেখেছেন। অন্যদিকে, কিছু গবেষক আংশিকভাবে এর বাস্তবতাকে স্বীকার করলেও প্রশ্ন তুলেছেন—মানবতার ধর্ম ইসলাম, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য আশ্রয়স্থল, সেখানে কেন একটি শ্রেণীকে নিম্নস্তরে রাখা হবে? কেন তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা সীমিত হবে? কেন তাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে?
এই প্রশ্নগুলোর মূলে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা। ইসলাম কখনোই দাসপ্রথাকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত বা টিকিয়ে রাখার পক্ষপাতী নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির একটি বাস্তবধর্মী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। একইসঙ্গে, ইসলাম দাস-দাসীদেরকে কেবল শ্রমশক্তি হিসেবে নয়, বরং পূর্ণ মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাদের জন্য এমন বহু অধিকার নির্ধারণ করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে তৎকালীন স্বাধীন মানুষের জীবনমানের সঙ্গেও তুলনীয় ছিল, বরং কখনো কখনো তার চেয়েও উন্নত।
একজন মানুষের স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার অপরিহার্য। পাশ্চাত্য সমালোচকদের দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, দাসপ্রথার কারণে এসব অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এ কারণেই আধুনিক আন্তর্জাতিক কাঠামো, যেমন জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ, দাসপ্রথাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং মানবাধিকারকর্মী ও সমসাময়িক চিন্তাবিদরা ইসলামী বিধানের এ দিকটি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।
অতএব, বিষয়টির সঠিক মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক আলোচনা। সেই প্রেক্ষাপটে, আমরা প্রথমে পর্যালোচনা করব—ইসলামী দৃষ্টিতে দাস-দাসীদের ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং তাদের জন্য কী ধরনের অধিকার ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নির্ধারিত ছিল।
ইসলামে মানুষকে দাস-দাসী বা আমার গোলাম এসব বলা কঠোর ভাবে হারাম
আমরা আল্লাহর দাস/গোলাম । কারণ তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা । তিনি এক ও অদ্বিতীয় সকল প্রশংসা তার । কিন্তু আমরা কোন মানুষের দাস নই। আমরা কেবল আল্লাহ তায়ালার দাস । ইসলাম দাস দাসীকে এতটাই মর্যাদা দিয়েছে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে কাউকে দাস-দাসী বলা সম্পূর্ণভাবে হারাম বা নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে ইমাম বুখারীর জগৎ বিখ্যাত কিতাব আল আদাবুল মুফরাত থেকে একটি হাদিস উল্লেখ করলাম
أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: لاَ يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ: عَبْدِي وَأَمَتِي، وَلاَ يَقُولَنَّ الْمَمْلُوكُ: رَبِّي وَرَبَّتِي، وَلْيَقُلْ: فَتَايَ وَفَتَاتِي، وَسَيِّدِي وَسَيِّدَتِي، كُلُّكُمْ مَمْلُوكُونَ، وَالرَّبُّ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ.
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেনঃ তোমাদের কেউ যেন আমার দাস, আমার দাসী না বলে। ক্রীতদাসও যেন আমার প্রভু না বলে। সে বলবে, আমার যুবক, আমার যুবতী, আমার নেতা। তোমাদের প্রত্যেকেই দাস, কেবল মহামহিম আল্লাহই হচ্ছেন রব (প্রভু)।[9]আল আদাবুল মুফরাদ: ২০৯
এছাড়াও সহীহ বুখারীর একটি হাদিস লক্ষ্য করুন
حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ عَنْ هَمَّامِ بْنِ مُنَبِّهٍ أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ يُحَدِّثُ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ لاَ يَقُلْ أَحَدُكُمْ أَطْعِمْ رَبَّكَ وَضِّئْ رَبَّكَ اسْقِ رَبَّكَ وَلْيَقُلْ سَيِّدِي مَوْلاَيَ وَلاَ يَقُلْ أَحَدُكُمْ عَبْدِي أَمَتِي وَلْيَقُلْ فَتَايَ وَفَتَاتِي وَغُلاَمِي
হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন এমন কথা না বলে ‘‘তোমার প্রভুকে আহার করাও’’ ‘‘তোমার প্রভুকে অযু করাও’’ ‘‘তোমার প্রভুকে পান করাও’’ আর যেন (দাস ও বাঁদীরা) এরূপ বলে, ‘‘আমার মনিব’’ ‘আমার অভিভাবক’, তোমাদের কেউ যেন এরূপ না বলে ‘‘আমার দাস, আমার দাসী’’। বরং বলবে- ‘আমার বালক’ ‘আমার বালিকা’ ‘আমার খাদিম’।[10]সহিহ বুখারী : ২৫৫২
সুতরাং ইসলামে কাউকে দাস-দাসী বা আমার গোলাম ইত্যাদি বলা হারাম। ইসলামে এই অনুমতি নেই।
এবার আসুন ইসলাম কর্তিক দাস দাসীর অধিকার গুলো এবং দাস-দাসী সাথে আচরণ বিধি গুলো দেখেনেই
১. খাদ্য-বস্ত্র ও বাসস্থানের অধিকার :
ইসলাম দাস-দাসীদেরকে খাদ্য-বস্ত্র ও বাসস্থান প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছে। মহান আল্লাহ পাক দাস-দাসীদেরকে সকল দিকে পূর্ণ অধিকার ও মর্যাদা প্রদানের কথা ঘোষণা করেছেন।
حَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ: حَدَّثَنَا وَاصِلٌ الأَحْدَبُ قَالَ: سَمِعْتُ الْمَعْرُورَ بْنَ سُوَيْدٍ يَقُولُ: رَأَيْتُ أَبَا ذَرٍّ وَعَلَيْهِ حُلَّةٌ وَعَلَى غُلاَمِهِ حُلَّةٌ، فَسَأَلْنَاهُ عَنْ ذَلِكَ، فَقَالَ: إِنِّي سَابَبْتُ رَجُلاً فَشَكَانِي إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، فَقَالَ لِيَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: أَعَيَّرْتَهُ بِأُمِّهِ؟ قُلْتُ: نَعَمْ، ثُمَّ قَالَ: إِنَّ إِخْوَانَكُمْ خَوَلُكُمْ، جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدَيْهِ فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلاَ تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ فَأَعِينُوهُمْ.
মারূর ইবনে সুয়াইদ (রহঃ) বলেন, আমি আবু যার (রাঃ)-এর পরনে একটি লাল বর্ণের চাদর এবং তার গোলামের পরনেও একই রকম চাদর দেখলাম। আমরা তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে গালি দিয়েছিলাম। সে নবী (ﷺ)-এর নিকট আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে নবী (ﷺ) আমাকে বলেনঃ তুমি কি তার মাকে তুলে গালি দিয়েছো? আমি বললাম, হাঁ। তিনি বলেনঃ তোমাদের দাসগণ তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং যার অধীনে তার ভাই আছে সে যা খায়, তাকেও যেন তা খাওয়ায়, সে যা পরে তাকেও তাই পরায় এবং তাদের উপর তাদের সাধ্যাতীত কাজ চাপাবে না। এরূপ কোন কাজ তাদের করতে দিলে সে যেন তাদের সেই কাজে সাহায্য করে।[11]আদাবুল মুফরাদ : ১৮৮
২। শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার :
ইসলামে মনিবদের অধীনে দাস-দাসীদেরকে শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। আর শিক্ষার অধিকার একটি মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত, জিও দিকে একটি ইসলাম একজন দাসের জন্য নিশ্চিত করেছে।
আববাস (রাঃ) তাঁর গোলাম ইকরামাকে কুরআন-হাদীছের শিক্ষা দান করেছিলেন। আবু আমের সালীম গ্রেফতার হয়ে মদীনায় নীত হ’লে তাকে লেখাপড়া শিক্ষার জন্য পাঠশালায় বসিয়ে দেয়া হয়। ওছমান (রাঃ)-এর গোলাম ইমরানকে ক্রয় করে লেখাপড়া শিক্ষার কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। গোলামদের ন্যায় দাসীদেরকেও শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা হ’ত। এজন্য তাদেরকে বিশেষভাবে উৎসাহ দেয়া হ’ত। রাসূল (ﷺ) এজন্য নিজে ছাহাবীগণকে বিশেষ উপদেশ দিতেন। তিনি বলেন,
ثَلاَثَةٌ يُؤْتَوْنَ أَجُورَهُمْ مَرَّتَيْنِ رَجُلٌ كَانَتْ لَهُ أَمَةٌ فَأَدَّبَهَا فَأَحْسَنَ تَأْدِيبَهَا وَعَلَّمَهَا فَأَحْسَنَ تَعْلِيمَهَا ثُمَّ أَعْتَقَهَا فَتَزَوَّجَهَا
‘তিন ব্যক্তি দু’টি বড় শুভ কর্মফল লাভ করবে। একজন সে, যে তার দাসীকে বিদ্যা শিক্ষা দিবে এবং খুব ভালভাবে প্রশিক্ষিত করে তুলবে। তাকে খুব ভালভাবে আদব-কায়দা শিখাবে এবং পরে তাকে মুক্ত করে দিয়ে নিজে তাকে বিয়ে করবে’।[12]বুখারী হা/২৫৪৭
৩। রাজনৈতিক তথা নেতৃত্ব পাবার অধিকার :
ইসলাম দাসদের রাজনৈতিক অধিকার তথা নেতৃত্ব পাওয়ার সকল পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যা অন্য কোন ধর্ম বা মানবাধিকার সনদে দেখা যায় না। এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে,
وَعَنْ أُمِّ الْحُصَيْنِ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنْ أُمِّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ مُجَدَّعٌ يَقُودُكُمْ بِكِتَابِ اللَّهِ فَاسْمَعُوا لَهُ وَأَطيعُوا» . رَوَاهُ مُسلم
উম্মুল হুছায়েন (রাঃ) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেন, ‘যদি তোমাদের উপর নাককাটা কৃষ্ণকায় গোলামও আমীর নিযুক্ত হন, যিনি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী পরিচালিত করেন তোমরা তার কথা শোন ও মান্য কর’।[13]মুসলিম ১২৯৮, সহীহ আল জামি‘ ১৪১১, মিশকাত হা/৩৬৬২
দাসদেরকে ইসলাম সেনাপতিত্ব ও নেতৃত্বের মর্যাদায় ভূষিত করেছিল। মহানবী (ﷺ)-এর ঘনিষ্ঠতম ছাহাবীদের সমন্বয়ে গঠিত এক সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করলেন এক সময়ের কৃতদাস যায়েদকে। সে বাহিনীতে আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ)-এর মত বিশিষ্ট ছাহাবীগণ থাকা সত্ত্বেও যায়েদের মৃত্যুর পর সেনাপতিত্ব দেয়া হ’ল তদীয় পুত্র উসামাকে। এভাবে ইসলাম দাসকে শুধু মনিবদের সমান মর্যাদাই দেয়নি; বরং কখনও কখনও মনিবেরা দাসদের আনুগত্যও করত। আর এসব ছিল মহানবী (ﷺ)-এর অনুসৃত নীতির কিছু নমুনা। সুতরাং ইসলাম দাসদেরকে গোত্রীয় নেতা ও রাষ্ট্রনেতা বানাতেও স্বীকৃতি দিয়েছে।
৪। দাস দাসীর উপর সমর্থের অধিক কাজ চাপিয়ে দেওয়া নিষেধ
ইসলামের জুলুম করা হারাম কোন ব্যক্তিকে যদি তার সাধ্যের বাহিরে কোন কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সে তার জুলুম হয় চাই সেটা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে হোক অথবা কোন দাস দাসীর ক্ষেত্রে হোক। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুল ইরশাদ করেছেন:
لِلْمَمْلُوكِ طَعَامُهُ وَكِسْوَتُهُ، وَلَا يُكَلَّفُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا يُطِيقُ
‘অন্ন ও বস্ত্র গোলামের অধিকার। আর তার ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না, যা তার সাধ্যের বাইরে।[14]সহিহু মুসলিম: ১৬৬২
নববি বলেন, ‘উলামায়ে কিরাম এই ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, গোলাম বা চাকরকে তার সাধ্যের অধিক কাজ ও দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যাবেনা। যদি একান্তই তার প্রয়োজন হয় তবে নিজে অথবা অন্য কারো মাধ্যমে তার সাহায্য করা আবশ্যক।[15]শরহে মুসলিম : ১১/১৩৩
৫। অসুস্থ খাদেম বা দাস দাসীকে দেখতে যাওয়া
অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া ইসলামে মহা গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত পূর্ণ কাজ। দাস দাসির ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অসুস্থ হলে তাদেরকে দেখতে যেতেন।
আনাস (রা:) বলেন, ‘এক ইহুদি বালক রাসুল-এর খিদমত করত। একদিন সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন রাসুল তাকে দেখতে গেলেন। তিনি তার শিয়রে বসে বললেন, “ইসলাম কবুল করো।” বালকটি তার পাশে থাকা পিতার দিকে তাকালে তিনি বললেন, “আবুল কাসিমের কথা মেনে নাও।” তখন বালকটি মুসলমান হয়ে গেল। অতঃপর রাসুল এই বলতে বলতে সেখান থেকে বের হলেন:
الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ مِنَ النَّارِ
“সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেমে মুক্তি দিয়েছেন।”[16]সহীহ বুখারী ১৩৫৬
এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হলো, রাসুল তাঁর খাদিমদের দেখতে যাওয়া এবং তাদের দাওয়াত দিয়ে কল্যাণের পথে নিয়ে আসার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন।
৬। দাস দাসীর সকল ইচ্ছা পূরণ করা
রাবিআ বিন কাব আসলামি বলেন,
‘আমি রাসুল-এর সাথে রাত্রি যাপন করলাম। তারপর অজু ও প্রয়োজন সারার জন্য পানি এনে দিলাম। তখন রাসুল বললেন, “চাও আমার কাছে।” আমি বললাম, “আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই।” তিনি বললেন, “এ ছাড়া অন্য কিছু চাও।” আমি বললাম, “আমি এটাই চাই।” তিনি বললেন, “তাহলে অধিক সিজদার মাধ্যমে তোমার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো।”[17]সহিহ মুসলিম ৪৮৯
রাবিআ বলেন, ‘আমি রাসুল-এর খিদমত করতাম এবং সারা দিন তাঁর প্রয়োজন পূরণ করার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখতাম। এমনকি যখন তিনি ইশার নামাজ পড়ার পর বাড়িতে প্রবেশ করে দরোজায় দাঁড়াতেন, তখন আমি মনে মনে চাইতাম, রাসুল-এর কোনো প্রয়োজন দেখা দিক (যেন আমি তা পূরণ করতে পারি)। তবে তখন তাঁকে শুধু “সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” বলতে শুনতাম। এতে একসময় আমার বিরক্তি এসে যেত, ফলে আমি ফিরে আসতাম। অথবা আমার চোখ লেগে আসত, ফলে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম।’
তিনি বলেন, ‘রাসুল তাঁর খিদমতের প্রতি আমার আগ্রহ অনুধাবন করতে পারতেন বিধায় একদিন তিনি আমাকে বললেন, “হে রাবিআ, আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দান করব।” আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি একটু ভেবে দেখি, তারপর আপনাকে এ ব্যাপারে জানাব।”
এরপর আমি চিন্তাভাবনা করে বুঝতে পারলাম যে, দুনিয়া অস্থায়ী আর এখানে যা রিজিক পাই, তা আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, রাসুল -এর কাছে আখিরাতের সফলতা চাইব। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন।
অতঃপর তাঁর কাছে আসলে তিনি জানতে চাইলেন, কী সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার কাছে আমি এটা চাই বে, আপনি আপনার প্রভুর কাছে আমার জন্য সুপারিশ করবেন, তিনি যেন আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন।”
তিনি বললেন, “হে রাবিআ, তোমাকে এটি কে শিখিয়ে দিয়েছে?
আমি বললাম, “সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্যা বীনা দিয়ে পাঠিয়েছেন, আমাকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি। কিন্তু আপনার মতো। আল্লাহর দরবারে মর্যাদাশীল ব্যক্তি যখন আমাকে বললেন, “আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দান করব”, তখন আমি চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, দুনিয়া। যেহেতু অস্থায়ী আর এখানে যা রিজিক পাই, তা আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়, তাই রাসুল -এর কাছে আখিরাতের সফলতাই চাইব।”
তখন রাসুল চুপ হয়ে গেলেন। অতঃপর আমাকে বললেন, “আমি তা করব, তবে অধিক সিজদার (অধিক নামাজ পড়ার) মাধ্যমে আমাকে সহযোগিতা করতে হবে।”[18]মুসনাদে আহমদ ১৬১৪৩
৭। কিয়ামতের দিন দাস দাসীর ওপর প্রকৃত জুলুমের বদলা নেওয়া হবে
ইসলামের জুলুমের কোন ছাড় নেই কোন ব্যক্তি কারো উপর জুলুম করলে সে ব্যক্তিকে তার শাস্তি ভোগ করতে হবে চাই সে মজলুম ব্যক্তি মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম স্বাধীন হোক কিংবা দাস।
عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَجُلاً، قَعَدَ بَيْنَ يَدَىِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي مَمْلُوكَيْنِ يُكْذِبُونَنِي وَيَخُونُونَنِي وَيَعْصُونَنِي وَأَشْتُمُهُمْ وَأَضْرِبُهُمْ فَكَيْفَ أَنَا مِنْهُمْ قَالَ ” يُحْسَبُ مَا خَانُوكَ وَعَصَوْكَ وَكَذَبُوكَ وَعِقَابُكَ إِيَّاهُمْ فَإِنْ كَانَ عِقَابُكَ إِيَّاهُمْ بِقَدْرِ ذُنُوبِهِمْ كَانَ كَفَافًا لاَ لَكَ وَلاَ عَلَيْكَ وَإِنْ كَانَ عِقَابُكَ إِيَّاهُمْ دُونَ ذُنُوبِهِمْ كَانَ فَضْلاً لَكَ وَإِنْ كَانَ عِقَابُكَ إِيَّاهُمْ فَوْقَ ذُنُوبِهِمُ اقْتُصَّ لَهُمْ مِنْكَ الْفَضْلُ ” . قَالَ فَتَنَحَّى الرَّجُلُ فَجَعَلَ يَبْكِي وَيَهْتِفُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” أَمَا تَقْرَأُ كِتَابَ اللَّهِ : ( ونَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلاَ تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ ) الآيَةَ . فَقَالَ الرَّجُلُ وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا أَجِدُ لِي وَلِهَؤُلاَءِ شَيْئًا خَيْرًا مِنْ مُفَارَقَتِهِمْ أُشْهِدُكُمْ أَنَّهُمْ أَحْرَارٌ كُلَّهُمْ ” . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ حَدِيثِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ غَزْوَانَ وَقَدْ رَوَى أَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ غَزْوَانَ هَذَا الْحَدِيثَ .
আয়িশাহ (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, নবী (ﷺ)-এর সম্মুখে বসে এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কয়েকটি গোলাম আছে। আমার নিকট এরা মিথ্যা কথা বলে, আমার সম্পদে ক্ষতিসাধন (খিয়ানাত) করে এবং আমার অবাধ্যতা করে। এ কারণে তাদেরকে আমি বকাবকি ও মারধর করি। তাদের সাথে এমন ব্যবহারে আমার অবস্থা কি হবে? তিনি বললেনঃ তারা যে তোমার সাথে খিয়ানাত করে, তোমার অবাধ্যতা করে এবং তোমার নিকট মিথ্যা বলে, আর এ কারণে তাদের সাথে তুমি যেমন আচরণ কর- এ সবেরই হিসাব-নিকাশ হবে। যদি তোমার দেয়া শাস্তি তাদের অপরাধের সমান হয় তবে ঠিক আছে। তোমারও কোন অসুবিধা হবে না তাদেরও কোন অসুবিধা হবে না। যদি তোমার দেয়া শাস্তি তাদের অপরাধের তুলনায় কম হয় তাহলে তোমার জন্য অতিরিক্ত (সাওয়াব) রয়ে গেল। তোমার প্রদত্ত শাস্তি যদি তাদের অপরাধের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত অংশের জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে।
বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে লোকটি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আলাদা হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলার কিতাবে তুমি কি এ কথা পড় না (অনুবাদ) “আমরা কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের দাড়িপাল্লা স্থাপন করব। সুতরাং কোন লোকের উপর কোন যুলম করা হবে না। কারো বিন্দু পরিমাণও কিছু কৃতকর্ম থাকলে আমরা তাও হাযির করব। আর হিসাব সম্পন্ন করার জন্য আমরাই যথেষ্ট”— (সূরা আম্বিয়া ৪৭)। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম! তাদের মাঝে এবং আমার মাঝে বিচ্ছিন্নতা ছাড়া আমার ও তাদের কল্যাণের আর কোন পথ দেখছি না। আপনাকে আমি সাক্ষী রেখে বলছি, তাদের সবাই এখন হতে মুক্ত।[19]তিরমিজি : ৩১৬৫
৮। দাসদাসীর ছোটখাটো অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া
মানুষ মাত্রই ভুল কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয় চাই সে দাস দাসী হোক কিংবা সাধারণ মানুষ ভুল সকলের ধারাই হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন দাস দাসী অপরাধ করলে তাদেরকে ক্ষমা করার পরামর্শ দিতেন,
আব্দুল্লাহ বিন উমর বিন খাত্তাব (রা:) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসুল-এর নিকট এসে আরজ করলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার একজন খাদিম আছে। সে অপরাধ করে এবং অবিচার করে। আমি কি তাকে মারতে পারব?” [অপর বর্ণনায়: “আমি কতবার তাকে ক্ষমা করব?”
রাসুল সা: চুপ রইলেন। তৃতীয়বার প্রশ্নটি করলে রাসুল বললেন: চুপ রইলেন। লোকটি প্রশ্নটি পুনরায় করলেন। রাসুল আগের মতই চুপ রইলেন। তার পর বললেন
اعْفُوا عَنْهُ فِي كُلِّ يَوْمٍ سَبْعِينَ مَرَّةً
“তাকে প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমা করবে।”[20]আবু দাউদ ৫১৬৪
৯। দাস দাসী কাজে দেরি করলে তাদেরকে শাস্তি না দেওয়া
দাস-দাসী বা খাদেমদের কাজের দেরি বা ত্রুটির কারণে শাস্তি না দিয়ে, দয়া, হাস্যোজ্জ্বল আচরণ এবং কোমল উপদেশের মাধ্যমে সংশোধন করাই রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ। এটি ইসলামের দাস-ব্যবস্থার মানবিক ও নৈতিক সৌন্দর্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ ব্যাপারে মুসলিম শরীফের একটি হাদিস দেখে নেওয়া যাক,
حَدَّثَنِي أَبُو مَعْنٍ الرَّقَاشِيُّ، زَيْدُ بْنُ يَزِيدَ أَخْبَرَنَا عُمَرُ بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا عِكْرِمَةُ، – وَهُوَ ابْنُ عَمَّارٍ – قَالَ قَالَ إِسْحَاقُ قَالَ أَنَسٌ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ أَحْسَنِ النَّاسِ خُلُقًا فَأَرْسَلَنِي يَوْمًا لِحَاجَةٍ فَقُلْتُ وَاللَّهِ لاَ أَذْهَبُ . وَفِي نَفْسِي أَنْ أَذْهَبَ لِمَا أَمَرَنِي بِهِ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَخَرَجْتُ حَتَّى أَمُرَّ عَلَى صِبْيَانٍ وَهُمْ يَلْعَبُونَ فِي السُّوقِ فَإِذَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَدْ قَبَضَ بِقَفَاىَ مِنْ وَرَائِي – قَالَ – فَنَظَرْتُ إِلَيْهِ وَهُوَ يَضْحَكُ فَقَالَ “ يَا أُنَيْسُ أَذَهَبْتَ حَيْثُ أَمَرْتُكَ ” . قَالَ قُلْتُ نَعَمْ أَنَا أَذْهَبُ يَا رَسُولَ اللَّهِ .
আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একদা তিনি আমাকে একটি কাজে যাওয়ার আদেশ করলেন, তখন আমি বললাম, আল্লাহর শপথ আমি যাব না; কিন্তু আমার মনে এ বিশ্বাস ছিল, যে কাজে আমাকে নবী (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছেন আমি সে কাজে যাব। অতঃপর আমি বের হয়ে ছেলেদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তারা বাজারে খেলাধূলায় লিপ্ত ছিল। হঠাৎ করে রসূলুল্লাহ (ﷺ) পশ্চাৎদকে এসে আমার ঘাড় ধরলেন। আনাস (রাযিঃ) বলেন, আমি তার প্রতি দৃষ্টি দিলাম তখন তিনি হাসছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, হে উনায়স! তুমি কি সেখানে গিয়েছিলে যেখানে তোমাকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম? তিনি বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ! হে আল্লাহর রসূল! অবশ্যই আমি যাচ্ছি।[21]সহীহ মুসলিম ২৩১০
১০। দাস দাসীকে প্রহার করা বা মারধর করা ইসলামের সম্পূর্ণ নিষেধ
ইসলাম অত্যাচার, জুলুম ও কষ্টদায়ক মারধর কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। অন্যায় প্রহারের জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করেছে। দাসদের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে
এবং বাস্তবে নবী (ﷺ) নিজে কখনো তাদের প্রহার করেননি । যেমনটি সহীহ মুসলিমের ২৩২৮ নাম্বার হাদিসে এসেছে
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ مَا ضَرَبَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم شَيْئًا قَطُّ بِيَدِهِ وَلاَ امْرَأَةً وَلاَ خَادِمًا إِلاَّ أَنْ يُجَاهِدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا نِيلَ مِنْهُ شَىْءٌ قَطُّ فَيَنْتَقِمَ مِنْ صَاحِبِهِ إِلاَّ أَنْ يُنْتَهَكَ شَىْءٌ مِنْ مَحَارِمِ اللَّهِ فَيَنْتَقِمَ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ .
আয়িশাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) তার স্বহস্তে কোন দিন কাউকে আঘাত করেননি, কোন নারীকেও না, খাদিমকেও না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত। আর যে তার অনিষ্ট করেছে তার থেকে প্রতিশোধও নেননি। তবে আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন বিষয়ে তিনি তার প্রতিশোধ নিয়েছেন।[22]সহীহ মুসলিম ২৩২৮
শুধু তাই নয় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অন্যদেরকেউ দাস দাসী উপর প্রহার করতে নিষেধ করতেন,
حَدَّثَنَا أَبُو كَامِلٍ الْجَحْدَرِيُّ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ، – يَعْنِي ابْنَ زِيَادٍ – حَدَّثَنَا الأَعْمَشُ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ قَالَ أَبُو مَسْعُودٍ الْبَدْرِيُّ كُنْتُ أَضْرِبُ غُلاَمًا لِي بِالسَّوْطِ فَسَمِعْتُ صَوْتًا مِنْ خَلْفِي ” اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ ” . فَلَمْ أَفْهَمِ الصَّوْتَ مِنَ الْغَضَبِ – قَالَ – فَلَمَّا دَنَا مِنِّي إِذَا هُوَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا هُوَ يَقُولُ ” اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ ” . قَالَ فَأَلْقَيْتُ السَّوْطَ مِنْ يَدِي فَقَالَ ” اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ أَنَّ اللَّهَ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَى هَذَا الْغُلاَمِ ” . قَالَ فَقُلْتُ لاَ أَضْرِبُ مَمْلُوكًا بَعْدَهُ أَبَدًا .
আবূ মাসউদ বাদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আমার এক ক্রীতদাসকে চাবুক দিয়ে প্রহার করছিলাম। হঠাৎ আমার পিছনে থেকে একটি শব্দ শোনলাম, হে আবূ মাসউদ! জেনে রেখো! রাগের কারণে আমি শব্দটি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না। বর্ণনাকারী বলেন, যখন তিনি আমার কাছাকাছি এলেন তখন দেখতে পেলাম, তিনি রসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তিনি বলছেনঃ হে আবূ মাসউদ! তুমি জেনে রেখো, হে আবূ মাসউদ! তুমি জেনে রেখো! বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমি চাবুকটি আমার হাত থেকে ফেলে দিলাম। এরপর তিনি বললেন, হে আবূ মাসউদ! তুমি জেনে রেখো যে, এ গোলামের উপর তোমার ক্ষমতার চেয়ে তোমার উপর আল্লাহ তা’আলা অধিক ক্ষমতাবান। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, এরপর কখনও কোন কৃতদাসকে আমি প্রহার করবো না।[23]মুসলিম : ১৬৫৯
শুধু তাই নয় যদি কোন মনিব তার দাসকে একটি চড়ও মারে তাহলে তার আটপাড়া হলো তাকে আজাদ করে দেওয়া অর্থাৎ তাকে মুক্তি করে দেওয়া
أَنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ “ مَنْ لَطَمَ مَمْلُوكَهُ أَوْ ضَرَبَهُ فَكَفَّارَتُهُ أَنْ يُعْتِقَهُ ”
আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি নিজ ক্রীতদাসকে চপেটাঘাত করল অথবা প্রহার করল, এর কাফফারা হল তাকে মুক্ত করে দেয়া।[24]মুসলিম ১৬৫৭
১১। দাসের প্রতি অভিশাপমূলক কথা বলতে নিষেধ করাঃ
প্রহার, জুলুম ইত্যাদি তো অনেক দূরের বিষয় – দাসের প্রতি অভিশাপমূলক কথা বলা থেকে নিষেধের কথাও হাদিসে পাওয়া যায়। আবু বকর (রা.) একবার একজন দাসকে অভিশাপমূলক কিছু কথা বলে ফেললে নবী (ﷺ) তাঁকে এমনটি করতে বারণ করেন। আবু বকর (রা.) এরপর সেই দাসকে মুক্ত করে দেন।
أَخْبَرَتْنِي عَائِشَةُ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ لَعَنَ بَعْضَ رَقِيقِهِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: يَا أَبَا بَكْرٍ، اللَّعَّانِينَ وَالصِّدِّيقِينَ؟ كَلاَّ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ، مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا، فَأَعْتَقَ أَبُو بَكْرٍ يَوْمَئِذٍ بَعْضَ رَقِيقِهِ، ثُمَّ جَاءَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: لا أَعُودُ.
অর্থঃ আয়েশা (রাঃ) বলেন, আবু বাকর (রাঃ) তার কোন গোলামকে অভিসম্পাত করেন। নবী (ﷺ) বলেনঃ হে আবু বাকর! কাবার প্রভুর শপথ! একই ব্যক্তি একই সাথে পরম সত্যবাদী ও অভিসম্পাতকারী হতে পারে না। তিনি দুই বা তিনবার একথা বলেন। আবু বাকর (রাঃ) সেদিনই ঐ গোলামকে আযাদ করে দেন এবং নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলেন, আমি আর কখনো এরূপ আচরণ করবো না।[25]আল-আদাবুল মুফরাদ (ইমাম বুখারী), হাদিস নং : ৩১৯ (সহীহ).
ইসলামের দৃষ্টিতে দাস-দাসী কোনো জড় বস্তু নয়; বরং তারা পূর্ণ মানবিক মর্যাদা ও অধিকারসম্পন্ন মানুষ। উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম দাসপ্রথাকে শুধু একটি সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেনি; বরং ধাপে ধাপে মানবিকীকরণ, সংস্কার এবং অবশেষে মুক্তির দিকে পরিচালিত করেছে।
খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ন্যায় মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, তাদেরকে ভাইয়ের মর্যাদা দেওয়া, সাধ্যাতীত কাজ চাপিয়ে না দেওয়া, শিক্ষা ও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করা, অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া, ভুলত্রুটি ক্ষমা করা—এসব নির্দেশনা প্রমাণ করে যে, ইসলাম দাস-দাসীদের উপর কোনো প্রকার জুলুম-নির্যাতনকে সহ্য করে না। বরং নবী (ﷺ) নিজে বাস্তব জীবনে এসব আদর্শের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
শুধু তাই নয় মৃত্যু শয্যায়ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সর্বশেষ উপদেশের মধ্যে দাস দাসীদের ব্যাপারে যত্নবান হওয়ার বিষয়টি ও লক্ষণীয় হয়। যেমন সুনানে ইবনে মাজার ২৬৯৭ নাম্বার হাদিস আমরা লক্ষ্য করতে পারি
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ كَانَتْ عَامَّةُ وَصِيَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حِينَ حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ وَهُوَ يُغَرْغِرُ بِنَفْسِهِ “ الصَّلاَةَ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ” .
আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর অন্তিম মুহূর্তে তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তার ওসিয়াত এই ছিল যে, ’’নামায পড়বে এবং তোমাদের দাস-দাসীর সাথে সদ্ব্যবহার করবে’’।[26]আহমাদ ১১৭৫৯, ইরওয়া ২১৭৮, ফিকহুস সিরাহ ৫০১
এছাড়াও আরেকটি হাদিস আমরা লক্ষ্য করতে পারি যা আবু দাউদ এর ৫১৫৬ নম্বর হাদিস এর অধীনে এসেছে
عَنْ عَلِيٍّ عَلَيْهِ السَّلَام، قَالَ: كَانَ آخِرُ كَلَامِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، الصَّلَاةَ الصَّلَاةَ، اتَّقُوا اللَّهَ فِيمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ
আলী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শেষ উপদেশ ছিলো। সালাত, সালাত এবং দাস-দাসীর সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো।
বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, দাসকে প্রহার করা পর্যন্ত কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; এমনকি অন্যায়ভাবে আঘাত করলে তাকে মুক্ত করে দেওয়া কাফফারা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের প্রতি সামান্য জুলুমেরও হিসাব নেওয়া হবে—এ হুঁশিয়ারি দাস-দাসীদের অধিকারকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট করে।
অতএব, ইসলামি দাস-ব্যবস্থা ছিল নিছক শোষণমূলক কোনো কাঠামো নয়; বরং এটি ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক ব্যবস্থা, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল দাসদের মুক্তি এবং সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করলে স্পষ্ট হয়—ইসলাম দাসপ্রথাকে স্থায়ী করতে নয়, বরং মানবিক রূপান্তরের মাধ্যমে বিলুপ্তির পথ সুগম করতেই এসেছে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায়, ইসলাম দাস প্রথাকে নিষিদ্ধ না করে মানবাধিকার লংঘন করেনি। বরং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। কারণ যুদ্ধের ময়দানের পুরুষ-নারী যেই হৌক না কেন বন্দী হ’লে তাদের হত্যা করার কথা; কিন্তু তা না করে এবং তাদেরকে দ্বীপান্তর না করে, রাষ্ট্রীয় বন্দীশালায় খারাপ পরিবেশে অমানবিকভাবে না রেখে, তাদের ওপর কুকুর লেলিয়ে না দিয়ে, ইলেকট্রিক শক না দিয়ে, অনাহারে না রেখে, নিষ্ঠুর আচরণ না করে, নানা নির্যাতন না করে অপরের অধীনস্থ রেখে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। দাসপ্রথাকে একবারে নিষিদ্ধ করা হয়নি। আর নিষিদ্ধ না করার পিছনে রয়েছে মানবকল্যাণের এক দূরদর্শী ও ফলপ্রসু পরিকল্পনা, যা অবিশ্বাসীদের কাছে গৃহীত নাও হ’তে পারে। তাতে আল্লাহর কাছে কিছু যায় আসে না। আল্লাহ যে সর্বশক্তিমান, মহাদার্শনিক ও মহাজ্ঞানী এই মৌলিক বিশ্বাসের উপর অটল থাকলে এসকল বিষয়ে কারও বিভ্রান্তিকর চিন্তা আসবে না। অতএব নিঃসন্দেহে বলতে পারি, বাহ্যিকভাবে দাস ব্যবস্থা খারাপ মনে হ’লেও প্রকৃত অর্থে এ ব্যবস্থাকে বহাল রাখা মানব সভ্যতা ও মানবাধিকার পরিপন্থী নয়।
চলবে….
Footnotes
| ⇧1 | সহীহ বুখারী, হাদীস: ২২২৭ |
|---|---|
| ⇧2 | ইবনে সাইয়েদিন নাস; উয়ুনুল আছার: ১/৩৫২ |
| ⇧3 | ফতহুল আল্লাম, টীকা বুলুগুল মারাম,নবাব সিদ্দিক হাসান খান প্রণীত,২/২৩২ |
| ⇧4 | আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ২/৪৫৭। |
| ⇧5 | আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৩/৩১১ |
| ⇧6 | সীরাত ইবনু হিশাম ১/৬৪৩; আহমাদ হা/২২৮১৪, হাসান লিগায়রিহী; আলবানী, ফিক্বহুস সীরাহ ২৩৪ পৃঃ সনদ ছহীহ। |
| ⇧7 | সীরাত ইবনু হিশাম ১/৬৪৪; আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়া ৩/৩০৫ |
| ⇧8 | বুখারী, ফাৎহুল বারী হা/৬৩৭৮, ৫২০ |
| ⇧9 | আল আদাবুল মুফরাদ: ২০৯ |
| ⇧10 | সহিহ বুখারী : ২৫৫২ |
| ⇧11 | আদাবুল মুফরাদ : ১৮৮ |
| ⇧12 | বুখারী হা/২৫৪৭ |
| ⇧13 | মুসলিম ১২৯৮, সহীহ আল জামি‘ ১৪১১, মিশকাত হা/৩৬৬২ |
| ⇧14 | সহিহু মুসলিম: ১৬৬২ |
| ⇧15 | শরহে মুসলিম : ১১/১৩৩ |
| ⇧16 | সহীহ বুখারী ১৩৫৬ |
| ⇧17 | সহিহ মুসলিম ৪৮৯ |
| ⇧18 | মুসনাদে আহমদ ১৬১৪৩ |
| ⇧19 | তিরমিজি : ৩১৬৫ |
| ⇧20 | আবু দাউদ ৫১৬৪ |
| ⇧21 | সহীহ মুসলিম ২৩১০ |
| ⇧22 | সহীহ মুসলিম ২৩২৮ |
| ⇧23 | মুসলিম : ১৬৫৯ |
| ⇧24 | মুসলিম ১৬৫৭ |
| ⇧25 | আল-আদাবুল মুফরাদ (ইমাম বুখারী), হাদিস নং : ৩১৯ (সহীহ). |
| ⇧26 | আহমাদ ১১৭৫৯, ইরওয়া ২১৭৮, ফিকহুস সিরাহ ৫০১ |




