দাসপ্রথা ও ইসলাম: নাস্তিকদের অভিযোগের খণ্ডন
“দাসপ্রথা ও ইসলাম: নাস্তিকদের অভিযোগের খণ্ডন, বিধান, প্রজ্ঞা ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ” পর্ব ১

ভূমিকা : ইসলামের আগমনের পূর্বে বিশ্বব্যাপী দাসপ্রথা ছিল একটি স্বীকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দাসপ্রথার ইতিহাস বহু প্রাচীন। যা পৃথিবীর সকল জাতি, রাষ্ট্র ও ধর্মে স্বীকৃত ছিল। এ প্রথাকে কখনও ভাল কাজে, কখনও বা অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। মানব ইতিহাসের প্রথম যুগ থেকে এই দাস প্রথা চালু ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। যেমন- The world wide Encyclopedia গ্রন্থে বলা হয়েছে,
Slavery has Existed from the Earliest times in verying degres
প্রাচীন পারসিকরা বিপুল সংখ্যক দাস থাকাকে অত্যন্ত গৌরবের বিষয় বলে মনে করত। এজন্য তারা বেশী বেশী দাস বা গোলাম রাখত। প্রাচীন গ্রীকে এই দাস ব্যবস্থাকে সেদেশের উন্নতি ও সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বলে মনে করা হ’ত। এ মর্মে World wide Encyclopedia গ্রন্থে Slavery সম্পর্কে বলা হচ্ছে-
It was the basis on which the ancient greece built up their civilization.
অর্থাৎ দাস প্রথা ছিল প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার ভিত্তি এবং এরই উপর গ্রীক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।
প্রাচীন গ্রীক সমাজে দু’টি কারণে গোলামী ব্যবস্থা চালু ছিল। একটি যুদ্ধ ও অপরটি প্রয়োজন। উক্ত গ্রন্থের বর্ণনা মতে যুদ্ধবন্দী কিংবা অপহৃত ব্যক্তিরা দাস হয়ে থাকত। গ্রীক সমাজে দাসদের ঔরসজাত সন্তানও দাস হিসাবে বিক্রি হ’ত এবং দাসদের শিশু সন্তানও দাস হিসাবে গণ্য হ’ত।[1]Encyclopedia of Religion and ethics vol. 8.
অর্থাৎ প্রাচীনতম যুগ হ’তেই দাস প্রথা বিভিন্ন রূপে ও মাত্রায় চালু হয়ে এসেছে। আরব সমাজসহ প্রায় সব সভ্যতায় যুদ্ধবন্দী, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি কিংবা জন্মসূত্রে মানুষ দাসে পরিণত হতো। সেই সময়ে দাসদের ওপর ছিল চরম অবিচার—মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার বা স্বাধীনতার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
ইসলাম যখন আবির্ভূত হয়, তখন তা দাসপ্রথাকে হঠাৎ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি; বরং একটি ধাপে ধাপে সংশোধন ও মানবিকীকরণের নীতি গ্রহণ করে। ইসলাম দাসদের মানবিক মর্যাদা স্বীকার করে, তাদের অধিকার নির্ধারণ করে, এবং তাদের মুক্তির জন্য বহু নৈতিক ও ধর্মীয় প্রণোদনা সৃষ্টি করে। কুরআন ও সুন্নাহে দাসমুক্তিকে অত্যন্ত সওয়াবপূর্ণ কাজ হিসেবে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং অনেক গুনাহের কাফ্ফারা হিসেবে দাসমুক্তির বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দাসদের প্রতি সদাচরণ, ন্যায্য খাদ্য-বস্ত্র, কাজের সীমা ও তাদের সাথে মানবিক আচরণের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল-কুরআন একটি নির্ভুল গ্রন্থ, যাতে কেবল আল্লাহ পাকের বাণী রয়েছে। এ বাণী নির্ভুল; এ ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। মানব সমাজে কখনও কখনও দাসদের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে, যে বিষয় অবশ্যই আল্লাহ অবগত। সে কারণে তিনি এটাকে একেবারে নির্মূল করেননি। এ গ্রন্থে কেবল দাসমুক্তির ফযীলতের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কোথাও সুস্পষ্টভাবে এ ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রতি উৎসাহ ও নির্দেশ দেয়া হয়নি।
পৃথিবীটা বড় ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ স্থান। এখানে যেমন ভাল-মন্দ ও সুখ-দুঃখ বিদ্যমান, তেমনি রয়েছে যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং হানা-হানিও। আর যতদিন বিশ্বে যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকবে ততদিন এ গোলামী ব্যবস্থা থাকবে। আর এ ব্যবস্থা যুদ্ধের একটি অনিবার্য পরিণতির ফল ছাড়া কিছুই নয়। এ যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা আনফালে একাধিকবার আলোচনা এসেছে। এ সূরায় যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে,
مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَكُوْنَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الأَرْضِ
‘দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নয়’। (আনফাল ৬৭)
অনেকের মতে বদর যুদ্ধের সাথে এ আয়াত সম্পর্ক যুক্ত। এ যুদ্ধে যেসব কাফির বন্দী হয়েছিল তাদের সম্পর্কে রাসূল (ﷺ) ছাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করে কিছু বন্দীকে মূল্য নিয়ে আর কিছুকে মূল্য না নিয়ে ছেড়ে দেন। এটা তখনকার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের উপর কিছুটা বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। সে কারণে এ ঘটনাটিতে আল্লাহ পাক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
,يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّمَنْ فِيْ أَيْدِيْكُمْ مِّنَ الأَسْرَى إِنْ يَعْلَمِ اللهُ فِيْ قُلُوْبِكُمْ خَيْراً يُؤْتِكُمْ خَيْراً مِّمَّا أُخِذَ مِنْكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ
‘হে নবী! আপনাদের হাতে যেসব যুদ্ধবন্দী রয়েছে, তাদেরকে বলুন যে, আল্লাহ যদি তোমাদের মধ্যে কল্যাণ দেখতে পান, তবে তোমাদের কাছ থেকে যা গ্রহণ করা হয়েছে, তদপেক্ষাও ভাল তোমাদেরকে দান করবেন। আর তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন’। (আনফাল ৭০)
এ আয়াতটি বদর যুদ্ধ সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। এখানেও যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন বর্ণনা আসেনি। তবে নিম্নে বর্ণিত আয়াতে সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে,
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنْتُمُوْهُمْ فَشُدُّوْا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنًّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا
‘তোমরা যখন কাফেরদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তখন তাদের গর্দানে আঘাত কর। পরিশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করবে তখন তাদেরকে খুব শক্ত করে বেঁধে ফেলবে। অতঃপর হয় অনুগ্রহ করবে কিংবা মুক্তিপণ গ্রহণ করবে। যতক্ষণ না তারা যুদ্ধের অস্ত্র সংরবণ করবে’। (মুহাম্মাদ ৪৭/৩)
এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, যুদ্ধবন্দীদের হয় বিনিময় মুল্য নিয়ে ছেড়ে দিতে হবে নতুবা না নিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। এখানে আরো একটা বিষয় স্পষ্ট যে যুদ্ধবন্দী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট শাসক তথা রাষ্ট্রপ্রধানকে এখতিয়ার দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রধান বন্দীদের ওপর জিযিয়া কর আরোপ করবে এবং তাদের কাছ থেকে শরী‘আত অনুযায়ী তা গ্রহণ করবে অথবা তাদেরকে হত্যা করবে, কিংবা গোলাম বানিয়ে নেবে, অথবা বিনিময় মূল্য নিয়ে বা না নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দিবে।
ইসলাম দাসপ্রথাকে প্রশ্রয় দেয়নি; বরং তৎকালীন বাস্তবতার ভেতর থেকে মানবিক সংস্কার ও ক্রমান্বয়ে বিলোপের পথ উন্মুক্ত করেছে। তাই ইসলামে দাসপ্রথা আলোচনার ক্ষেত্রে কেবল ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়, বরং ইসলামের সংস্কারমূলক দৃষ্টিভঙ্গিও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা জরুরি।
ইসলাম স্বীকৃতি দেয় যে, আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে পরিপূর্ণ দায়িত্বশীল করে সৃষ্টি করেছেন, তার উপর শারি‘আতের দায়িত্ব ও কর্তব্য দিয়েছেন এবং এগুলোর ব্যাপারে তাঁর ইচ্ছা ও পছন্দের উপর ভিত্তি করে পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। আর এই ইচ্ছাকে সীমাবদ্ধ করা অথবা এই পছন্দকে হরণ করার কোনো অধিকার কোনো মানুষের নেই। আর যে ব্যক্তি এই ব্যাপারে দুঃসাহস করবে, সে হবে যালিম ও সীমালঙ্ঘনকারী। এই বিষয়ে এটা ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান ও মূলনীতি।
কেউ কেউ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ব্যাপারে এই আপত্তি উত্থাপন করে যে, তিনি মানুষকে দাস বানানোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীকে যুদ্ধবন্দি ব্যক্তিদেরকে দাস হিসেবে গ্রহণ করার অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রথাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
অথচ বাস্তবতা ও ইনসাফের কথা হলো, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে দাসপ্রথায় উদ্বুদ্ধকারীর পরিবর্তে দাসমুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা! তবে দাসমুক্তির ব্যাপারে রাসুল (ﷺ)-এর চেষ্টা-প্রচেষ্টা সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আমাদের জানতে হবে, তাঁর আগমনের পূর্বে তৎকালীন জাজিরাতুল আরব এবং সমগ্র বিশ্বে এর শিকড় কতটুকু গভীরে প্রোথিত ছিল। তখন আমরা সহজইে বুঝতে পারব, বৈশ্বিকভাবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এমন ব্যাপক একটি প্রথার বিরুদ্ধে হঠাৎ করেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য নিষেধবাণী ঘোষণা করা সম্ভব ছিল কি না।
আরব অঞ্চলের অবস্থা ছিল এরকম যে, সময়ে-অসময়ে গোত্রীয় সাম্প্রদায়িকতার ইন্ধনে যুদ্ধের আগুন লেগেই থাকত। স্বাভাবিকভাবেই এ সকল যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়ত পরাজিত পক্ষের ওপর। তাদের মহিলা এবং ছোট বাচ্চাদেরকে বন্দি করা হতো, সম্ভব হলে পুরুষদেরকেও বন্দি বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। এরপর হয়তো তাদেরকে হত্যা করা হতো অথবা দাস-দাসী বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। বন্দিদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কিংবা বিনিময় ছাড়া মুক্ত করার মতো কোনো সৎকর্ম তাদের স্বভাবে ছিল না। আরবদের নিকট এ সকল যুদ্ধবিগ্রহ দাসব্যবসার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। আর এই দাসব্যবসা আরব অঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান একটি উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো।
এদিকে রোমান সাম্রাজ্যের দাস-দাসীরাও এর থেকে ভালো অবস্থায় ছিল না। এমনকি উন্নত নগরায়ণের প্রবর্তক গ্রিক দার্শনিক প্লেটো মনে করতেন, দাস-দাসীদের কখনোই নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত নয়।
আর পারস্যসাম্রাজ্যে নাগরিকরা সাতটি স্তরে বিভক্ত ছিল। সবচেয়ে নিম্নস্তরে ছিল সাধারণ জনগণ। অথচ তাদের সংখ্যার হার ছিল মোট অধিবাসীদের ৯০% থেকেও বেশি! এই শ্রেণিতে ছিল শ্রমিক, কৃষক, সৈনিক এবং দাস-দাসী। সমাজে তাদের কোনো অধিকার ছিল না। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে তাদেরকে শেকলে আবদ্ধ করে হলেও যুদ্ধে লিপ্ত রাখা হতো।
ইসলাম আগমনের পূর্বে এমনই এক জটিল অবস্থায় ছিল দাসপ্রথা। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ রিসালাত নিয়ে আগমন করলেন, তখন তিনি দাসপ্রথাকে অকার্যকর (অর্থাৎ সীমিত) করার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যথা:
- এক. দাসত্বের উৎসধারাকে সীমিত করা, যা একে ব্যাপকতা দান করত এবং এর স্থায়ী হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতো।
- দুই. দাস-দাসী মুক্তির পথগুলোকে আরও প্রশস্ত করা।
এই দুটি নীতির সর্বোত্তম প্রয়োগ দেখা যায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনাচারে। সদ্য মুকুল ফোটা মুসলিম সমাজকে তিনি দাসমুক্তির ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন।
তদ্রূপ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মানুষকে তার পাপের কারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাসমুক্তির ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য সর্বোচ্চসংখ্যক দাসমুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, পাপ ও গুনাহ এমন একটি বিষয়, যা কখনো বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। প্রতিটি আদম সন্তানই তো গুনাহগার।
দাস প্রথা কি ও দাসের পরিচয়
দাস শব্দটি সংস্কৃত শব্দ। ইংরেজীতে একে Slave বলে। এই দাসদের নিয়ে সমাজে বিদ্যমান প্রথাকে দাস প্রথা বলে। এই প্রথা বহুকাল থেকে চালু ছিল। ‘ধর্ম ও নৈতিকতার বিশ্বকোষে’ দাস প্রথার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে- ‘এটি একটি সামাজিক রেওয়াজ, এর দরুন এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির মালিকানাধীন হয়ে যায়।’ The world wide Encyclopedia-তে লেখা হয়েছে, ‘Slavery, the status one who is the property of another. ‘কোন ব্যক্তির অন্যের সম্পত্তিতে পরিণত হওয়ার অবস্থাকে দাসত্ব বলা হয়’। ওয়েস্টার মার্ক (Wester mark) দাসত্বের সংজ্ঞায় বলেন, ‘গোলামের মালিকানায় মালিকের অধিকার যদিও অনিবার্য ও নিরংকুশ নয়, তবুও এটা একটি বিশেষ রকম পদ্ধতি। অন্য কথায়, এই মালিকানা অধিকার এমন একটি অধিকার যে, কেবল মাত্র মনিবই এর থেকে হাত তুলে নিতে পারে, পরিত্যাগ করতে পারে। কিন্তু একে নিরংকুশ মালিকানা বলা যায় না। কেননা আইন গোলামকেও এক রকম অধিকার দান করেছে।‘[2]দাসপ্রথা ও ইসলাম, পৃঃ ১০
মোটকথা দাস প্রথা হ’ল এমন একটি সামাজিক চিরাচরিত ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থায় একজন মানুষ অন্য কোন মানুষের অধীনে চুক্তি অনুযায়ী তার বশ্যতা স্বীকার করতঃ নিজের সার্বিক স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়ে মানুষের অধীনে এক প্রকার গৃহবন্দী হয়ে জীবন পরিচালনা করে।
দাস প্রথা চালু হওয়ার কারণ
মানুষ সাধারণতঃ একে অপরের উপর কর্তৃত্ব করতে চায়। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে উঁচু শ্রেণীর মানুষ দরিদ্র ও নীচু শ্রেণীর মানুষগুলোকে অধীনস্ত রাখতে চায়। এর সাথে সে বিস্তীর্ণ এলাকা নিজের কর্তৃত্বে রাখতে চায়। আর ঐ মানুষগুলোকে উক্ত মনিব কর্তৃক নানাভাবে ব্যবহারের চিন্তা উদয় হওয়া থেকে দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। হয়তো এভাবে এক পর্যায়ে নানা প্রয়োজনে ও বাস্তবতার কারণে দাসত্বের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে মিঃ এ.এন গুলবার্টসন লিখেছেন যে, “উত্তর আমেরিকাস্থ ভারতীয়দের মধ্যে একটা রেওয়াজ ছিল যাকে Adoption (এডাপশান) বলা হয়। এতে যুদ্ধ শেষে বিজিত পক্ষের পুরুষদেরকে হত্যা করা হ’ত এবং শিশু ও নারীদেরকে জীবিত রেখে নিজেদের ঘরে রেখে দেয়া হ’ত।” এই লেখকই বলেছেন যে, “দাসপ্রথা এই প্রথারই একটি উন্নত রূপ, যাতে শিশু ও নারীদের ন্যায় পুরুষদেরকেও জীবিত থাকতে দেয়া হ’ত এবং তাদেরকে গোলাম বানানো হ’ত।” এ প্রসঙ্গে মনস্তাত্বিক কারণের দিকে ইঙ্গিত করে Nieboer সুন্দর কথা বলেছেন, “পশু পালন মানুষের একটি স্বভাব। এই স্বভাবই ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেয়ে মানুষকে পালবার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এবং একেই বলা হয় গোলামী বা দাস প্রথা।”[3]Excyclopedia of religion and ethics
অতীতে সমাজে পাশবিকতা ও বর্বরতা বিদ্যমান ছিল। যুদ্ধ-বিগ্রহ সব সময় লেগে থাকতো। তখন যুদ্ধবন্দীদেরকে হত্যা করা হ’ত। এভাবে সমাজে কর্মক্ষম মানুষের শূন্যতা দেখা দেয়। ফলে যুদ্ধবন্দীদেরকে দাসত্বে রেখে বিভিন্ন কার্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়। এ প্রসঙ্গে হার্বাট স্পেন্সার বলেন, “একথা খুব সমর্থনযোগ্য যে, একপক্ষ যখন আধিপত্য ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিরোধী পক্ষকে হজম করার পরিবর্তে নিজেদের গোলাম বানিয়ে নেয়, তখন তাদেরকে জীবিত রাখাই উন্নতির দিকের পদক্ষেপ। দাস প্রথা যতই খারাপ হোক না কেন তা আপেক্ষিকভাবে ভাল। আর কোন কোন সময় সাময়িকভাবে এটাই হয় একমাত্র কর্ম উপযোগী পথ বা পন্থা।”[4]Study of soiology
লর্ড একটিন বলেছেন, “অনেক সময় এমন অবস্থা হয়, যখন সেই অবস্থা দৃষ্টে একথা বলা মোটেই অসমীচীন হয় না যে, গোলামী মূলত আযাদী মঞ্জিলের এক পর্যায়।”[5]Slavery in his Roman Empire p. 15.
এ প্রসঙ্গে মিঃ আর. এইচ. বারোর একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তার ‘রোমান সাম্রাজ্যে দাস প্রথা’ শীর্ষক গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, “গোলামী এমন একটি শব্দ যা শুনতেই খারাপ লাগে। এই শব্দ কানে প্রবেশ করা মানেই লৌহশৃংখলের ঝংকার, চাবুকের শপাং শপাং ধ্বনি এবং মযলূম গোলামদের মর্মবিদারী চিৎকার কর্ণকুহরে ধ্বনিত হ’তে শুরু করে। গোলামীকে সাধারণতঃ খারাপভাবে দেখা হয়। কিন্তু গভীর সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে চিন্তা করলে এতে কোন সন্দেহ থাকে না যে, গোলাম খুব বেশী কিছু মহান আর পবিত্র না হ’লেও সভ্যতার অগ্রগতি ও উৎকর্ষ সাধনে তাদেরও যথেষ্ট অংশ রয়েছে। তবুও গোলামী রেওয়াজ বন্ধ করা যেতে পারে, কিন্তু পুরাকালের দাস প্রথাকে সর্বোতভাবে খারাপ বলা এবং একে চূড়ান্ত ঘৃণিত মনে করা আমাদের উচিত নয়।”
হার্বাট স্পেন্সার তাঁর ‘The principal of sociology’ গ্রন্থে লিখেছেন, “দাস প্রথা ব্যতীত রাষ্ট্রনীতি পূর্ণতা লাভ করতে পারে না।”
তাহ’লে বুঝা যায়, দাস প্রথা চালু হওয়ার পিছনে সুদূর অতীতে কিছু জন্মগত বা বংশ-গোত্রীয় প্রভাব এবং বাস্তব প্রয়োজনীয়তা কাজ করেছিল। এর প্রচলনের আর একটি অন্যতম করণ হ’ল যুদ্ধবন্দী। সম্ভবতঃ পৃথিবীতে যখন থেকে যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু হয়েছে তখন থেকেই যুদ্ধবন্দী তথা দাসপ্রথা চালু হয়েছে। যার বাস্তব প্রমাণ এখনও দেখা দেখা যাচ্ছে। তবে বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন জাতি-ধর্ম ও রাষ্ট্রে যুদ্ধবন্দীদের সাথে যে অমানবিক ও বর্বর আচরণ করা হচ্ছে ইসলাম তা কখনও স্বীকৃতি দেয়নি ও সমর্থন করেনি। বরং যুদ্ধবন্দী তথা দাস-দাসীদের ব্যবস্থাকে এক রকম মানবিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে, যা বিশ্বের সকলের কাছে এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ইসলাম দাস প্রথাকে একেবারে নিষিদ্ধ করেনি কেন?
ইসলাম কেন দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করেনি সে বিষয়ে আলোচনার পূর্বে দাসদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা প্রাসঙ্গিক মনে করি। ইহুদী, খৃষ্টান ধর্মে এবং বর্তমান সভ্য ও আধুনিক বিশ্বে দাস সৃষ্টির উপায়-উপকরণ ও সুযোগ থাকলেও সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে, ইসলাম কেন দাস প্রথাকে নিষিদ্ধ করেনি সেদিকেই বিরোধীরা অভিযোগের অঙ্গুলি নির্দেশ করে। কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টি ও উন্মুক্ত মন নিয়ে তাকালে ইসলাম দাসপ্রথার ব্যাপারে যে সূক্ষ্ম বিধান প্রবর্তন করেছে, তা তাদের চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। এজন্য ইসলামে দাস সৃষ্টির মূল উৎস ও উপায়-উপকরণ, তাদের সাথে ব্যবহার, তাদের অধিকারের ক্ষেত্রে সমতা বিধান, তাদের প্রতি আযাদ ব্যক্তিদের দায়িত্ব-কর্তব্য এবং তাদের স্বাধীনতা লাভের যে অবারিত সুযোগ-সুবিধা ও পথ-পন্থা ইসলাম রেখেছে তার দিকে লক্ষ্য রাখা আবশ্যক। পাশাপাশি বর্তমান সভ্য, উন্নত ও অগ্রসরমান বিশ্বে নতুনভাবে দাস সৃষ্টির বিভিন্ন ধরন ও পদ্ধতির প্রতি সচেতন দৃষ্টি দিতে হবে, তাহ’লে ইসলামের প্রতি কারো অন্তরে কোন অভিযোগ থাকবে না। এমনকি অজ্ঞতায় যাদের মনে এ ব্যাপারে ক্ষোভের অগ্নি ধূমায়িত হয়েছে, তা মোমের ন্যায় বায়বীয় আকারে উবে যাবে। আর ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধায় তার মস্তক অবনত হবে ইনশাআল্লাহ।
ইসলামের আবির্ভাব কালে দাসত্ব সৃষ্টির যে সকল উৎস ও পথ ছিল ইসলাম সেসব বন্ধ করার মাধ্যমে দাস প্রথাকে প্রায় উচ্ছেদ করেছিল। সে সাথে দাসদের আযাদ করার হাজারো দুয়ার উন্মুক্ত করেছিল। কেবল যুদ্ধের মাধ্যমে কাফির, মুশরিক ও তাদের নারী-শিশুদের দাস হওয়ার ব্যাপারটাকে আবশ্যক করে। আর মুসলমানরা গণীমত হিসাবে কাফির যুদ্ধবন্দীদের দাস-দাসী হিসাবে লাভ করলেও তারা ইসলাম গ্রহণ করে আযাদী লাভ করতে পারত। এরূপ ন্যায়-ইনছাফ ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মে অকল্পনীয়। ইসলামই কেবল দাসদের সাথে উত্তম আচরণ করার ও ইসলাম গ্রহণ করার পর স্বাধীন হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তাছাড়া ইসলাম যুদ্ধে-বিগ্রহে বন্দীদের দাস হওয়ার যে সুযোগ রেখেছে, সেটা সব যুদ্ধে নয়। কেবল ইসলাম ও মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বন্দীরাই দাস হবে; ব্যক্তিগত, দলগত, গোত্রগত যুদ্ধের ক্ষেত্রে তা বৈধ নয়।
প্রাচীনকালে যুদ্ধবন্দীদের কোন সম্মান ও অধিকার ছিল না। তখন তাদের জন্য কেবল দু’টি পথ খোলা ছিল; হত্যা অথবা দাসত্ব। ইসলাম এসে এই দু’টি পথের সাথে মুক্তিপণ গ্রহণ কিংবা অনুগ্রহ করার বিষয়টি সংযুক্ত করেছে। যেমন আল্লাহ বলেন,
فَإِمَّا مَنّاً بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً
‘অতঃপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ’ (মুহাম্মাদ ৪)।
এভাবে দাসত্বের সকল পথ-পন্থা বন্ধ করা ও তাদের জন্য উত্তম ব্যবস্থা করার পরেও ইসলাম দাস প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেনি। কারণ কাফের যুদ্ধবন্দীরা হক ও ন্যায়-নীতির বিরোধী এবং হকের পথে প্রতিবন্ধক। তারা নিজেরা যেমন অত্যাচার করে, তেমনি যুলমকে সমর্থন দেয় এবং তা বিস্তারে সহায়তা করে। সুতরাং তাদের স্বাধীনতার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে অবাধ্যতা ও সীমালংঘন বিস্তার এবং অন্যের প্রতি তাদের নির্যাতন করার সুযোগ দেওয়া। আর হক্বের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা এবং মানুষের নিকটে হক পৌঁছার পথ রুদ্ধ করা। পক্ষান্তরে দাসত্বের মাধ্যমে যুদ্ধবন্দীদের আটক রাখার ফলে ঐ সময়টাতে মানব সমাজ তাদের অনিষ্টতার কবল থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে
এই দাসপ্রথা বাহ্যত দৃষ্টিকটু মনে হলেও একেবারে সেটাকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। কারণ এর পক্ষে অনেক বাস্তব উপযোগিতা ও যৌক্তিকতা উপলব্ধি করা যায়। তথাপিও এই দাস প্রথাকে ইসলাম কখনও আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেনি বরং সেটাকে অধিক নিরুৎসাহিত করেছে। এর পরেও পাশ্চাত্য পন্ডিতগণ এই দাসপ্রথা নিয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলাম সম্পর্কে নানা কটুক্তি ও বিতর্কের ঝড় তুলেছে, কেন সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম এই জঘন্য প্রথাকে নিষিদ্ধ করল না? আশা করি নিম্নবর্ণিত কারণগুলো পড়লে উক্ত বিষয়টির প্রতি সকলের সুস্পষ্ট ধারণা জন্মাবে। নিম্নে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হ’ল-
১. প্রথাগত কারণ :
দাসপ্রথা ছিল বহু প্রাচীনকালের একটি সামাজিক ব্যবস্থা। যেখানে একটা সমাজ বা পরিবারের আভিজাত্যের প্রকাশ পেত। যার যত দাস ছিল সে সমাজে একটা বড়ত্বের পরিচয় দিতে পারত। আর সে প্রথাকে সকল যুগে সকল সমাজ মেনে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করত। এ ব্যবস্থা সমাজের মধ্যে এমনভাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল যে, হঠাৎ করে তা কারু পক্ষে উচ্ছেদ বা নিষিদ্ধ করা খুবই কঠিন ছিল। তৎপরিবর্তে সর্বযুগের দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব মহানবী (ﷺ) এটাকে একেবারে বন্ধ না করে বরং ধীর পদ্ধতিতে এ প্রথাকে বিলুপ্ত করার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
২. সামাজিক কারণ :
দাস প্রথা বিদ্যমান থাকার মাঝে সামাজিক বড় কল্যাণের বিষয় নিহিত আছে। এর দ্বারা সমাজদেহ অশ্লীলতা বিস্তারের হাত থেকে রক্ষা পায়। মানুষের জৈবিক চাহিদা অনস্বীকার্য, যা বিবাহের মাধ্যমে পূরণ হয়। কিন্তু অনেকের পক্ষে মোহরানার উচ্চ হার বা অন্যান্য কারণে স্বাধীনা নারী বিবাহ করা সম্ভব হয় না। তাদের জন্য দাসী ক্রয় করে তাকে বিবাহের মাধ্যমে নিজেকে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন ও ব্যভিচারের মত মর্যাদাহানিকর কাজ থেকে রক্ষার সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ বলেন,
وَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنْكُمْ طَوْلاً أَنْ يَنْكِحَ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ فَمِن مِّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُم مِّن فَتَيَاتِكُمُ الْمُؤْمِنَاتِ وَاللهُ أَعْلَمُ بِإِيْمَانِكُمْ بَعْضُكُم مِّن بَعْضٍ فَانكِحُوْهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُوْرَهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلاَ مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنْكُمْ وَأَن تَصْبِرُواْ خَيْرٌ لَّكُمْ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ-
‘তোমাদের মধ্যে কারো স্বাধীনা ঈমানদার নারী বিবাহের সামর্থ্য না থাকলে তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার দাসী বিবাহ করবে; আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত। তোমরা একে অপরের সমান। সুতরাং তাদেরকে বিবাহ করবে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে এবং তাদেরকে তাদের মোহর ন্যায়সংগতভাবে দিয়ে দিবে। তারা হবে সচ্চরিত্রা, তারা ব্যভিচারিণী নয় ও উপপতি গ্রহণকারিণীও নয়। বিবাহিতা হবার পর যদি তারা ব্যভিচার করে তবে তাদের শাস্তি স্বাধীনা নারীর অর্ধেক; তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারকে ভয় করে এটা তাদের জন্য; ধৈর্য ধারণ করা তোমাদের জন্য মঙ্গল। আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু’ (নিসা ২৫-২৬)।
এছাড়া সমাজে এমন অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে পূর্ণাঙ্গ পর্দানশীন নয় এমন মহিলাদের প্রয়োজন পড়ে। দাসীরা হচ্ছে এই শ্রেণী, যাদের উপর ইসলাম স্বাধীনা মহিলাদের ন্যায় পূর্ণাঙ্গ পর্দার বিধান আরোপ করেনি। বরং তাদের জন্য ধাধিনা মহিলাদের তুলনায় পর্দার বিধান ছিল কম।[6]আবু দাউদ হা/৪১১৩-১৪; মিশকাত হা/৩১১১
যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দী নারীদের দাসী হওয়ার ফলে এটি তাকে রক্ষণাবেক্ষণ, তার ইয্যত-আব্রুর হেফাযত ও মানবিক সম্মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। কেননা যুদ্ধ শেষে সাধারণত নারীরা স্বীয় স্বামী, ভাই বা পিতার তত্ত্বাবধানে বা আশ্রয়ে চলে যায়। কিন্তু যুদ্ধ বন্দীদের স্বজন থাকে না। এ ক্ষেত্রে তাকে খোলামেলা রাখলে এটা তার জীবন ও ইয্যতের জন্য ক্ষতির কারণ হ’তে পারে।
আর এটা সর্বজন বিদিত যে, ইসলামী শরী‘আতে নারী দাসী হ’লে তার নিকটে মনিব ব্যতীত অন্য কোন পুরুষ যেতে পারে না। আবার মালিকের সাথে চুক্তির মাধ্যমে কিংবা মনিবের সন্তান ধারণ করলে তার মৃত্যুর পরে তাৎক্ষণিক সে স্বাধীন হয়ে যায়।[7]দারাকুতনী, মুওয়াত্ত্বা মালেক, ইরওয়া হা/১৭৭৬ এছাড়া মনিবের পক্ষ থেকে তার দেখা-শুনা, ভরণ-পোষণ, শিক্ষা-দীক্ষা ও সুন্দর আচরণ পাওয়ার অধিকার জন্মে যায়।
৩. রাজনৈতিক কারণ :
পূর্ব যুগে গোত্রীয় যুদ্ধ অথবা আন্ত:রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ-বিগ্রহে পরাজিত বাহিনীকে বন্দী করা হ’ত। বন্দীরা সমাজে বা রাষ্ট্রে নতুন করে যেন কোনরূপ বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে না পারে সেকারণে তাদেরকে দাস-দাসী হিসাবে রেখে দেয়া হ’ত। তবে সমাজপতি বা রাষ্ট্রনায়ক মনে করলে তাদেরকে শর্ত-সাপেক্ষে মুক্তি দিতে পারতেন। এখনও সেরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হ’লে বন্দীদেরকে মুক্তি দেয়া হয়। অর্থাৎ সামাজিক পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সুসংহ’ত করতে দাস-প্রথাকে পূর্ণাঙ্গভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি।
৪. অর্থনৈতিক কারণ :
তৎকালে আরব দেশগুলোতে মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকট বিদ্যমান ছিল। অধিকাংশ গরীব মানুষের অবস্থা এমন শোচনীয় হয়ে পড়েছিল যে তারা কাজ না পেয়ে মনিবের নিকট স্বেচ্ছায় গিয়ে বিক্রি হ’ত অথবা দাসত্বে আবদ্ধ হ’ত। মনিবদের নিকট গিয়ে তারা বলত, ‘আমাকে আবার আপনার গোলাম বানিয়ে রাখুন’। আমেরিকা ও সুদানে ঠিক তাই ঘটেছিল।[8]মাওলানা আব্দুর রহীম, দাস প্রথা ও ইসলাম, (ঢাকা : খায়রুন প্রকাশনী, ২০০৯), পৃঃ ২১।
একইভাবে যুদ্ধ বন্দীদেরকে ছাহাবীদের মধ্যে গণীমতের মাল হিসাবে বণ্টন করলেও সেখানে অর্থনৈতিক বিষয়টাও মাথায় রাখা হয়েছিল। কারণ সে সময়ে আধুনিক জেলখানা ছিল না। তার প্রয়োজনও মনে করা হ’ত না। এছাড়া তাদেরকে জেলখানায় রাখলে তাদেরকে বসিয়ে খাওয়া-পরার পিছনে প্রচুর অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হ’ত। বন্দীদের দাস-দাসীরূপে রেখে দেওয়ায় অন্তত সে ব্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। উপরন্তু দাস-দাসীদেরকে সমাজের নানা উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হ’ত। যার জন্য সমাজে ও রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা দারুণ ভূমিকা রাখত। অর্থাৎ দাস-দাসী সমাজের বোঝা না হয়ে বরং সামাজিক তথা রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ড যেমন কৃষি, মেষ চরানো, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কলকারখানা, শিক্ষা-দীক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। যে কারণে এই প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে রহিত করা হয়নি।
৫. ধর্মীয় কারণ :
ইসলাম আগমনের প্রাক্কালে দাস প্রথা ছিল বিশ্বব্যাপী প্রচলিত একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এটা তখন মানুষের জীবন যাত্রার সাথে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল যে একে নিষিদ্ধ করা ছিল দুরূহ। এমনি একে পরিবর্তন করার কথাও কেউ ভাবেনি। পরবর্তীতে দেখা যায় ইলাহী বিধান নাযিলের মাধ্যমে কিংবা ইসলাম কোন আকস্মিক ঘোষণার মাধ্যমে দাস প্রথাকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং শরী‘আত এমন কতিপয় নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার ফলে কোন বিরূপ প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া ব্যতিরেকেই দাস প্রথা উচ্ছেদ ও নির্মূল হ’তে বাধ্য।
আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং জনকল্যাণকর বিধান প্রবর্তন করেছেন। তার জন্য যা ক্ষতিকর তা রহিত করেছেন এবং যা ব্যক্তি, সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর তা বহাল রেখেছেন। যেমন মদ ও সূদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে মানবতার কল্যাণের জন্য। পক্ষান্তরে দাসপ্রথা বহাল রাখায় মানবতার কল্যাণ নিহিত রয়েছে বিধায় তিনি তা হারাম করেননি। যেমন আল্লাহ বলেন,
أَلاَ يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيْفُ الْخَبِيْرُ
‘যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত’ (মূলক ১৪)।
তাছাড়া রাসূল (ﷺ)-এর যুগে যদি এ ব্যবস্থা না থাকত মুসলিমরা বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হত। কারণ যুদ্ধাবস্থায় মুসলমান ও কাফিরদের মধ্যে বন্দী বিনিময় হত। এছাড়া ইসলামের শত্রুদেরকে যদি দাস-দাসী না বানানো হ’ত তাহলে এরা আবার সঙ্গবদ্ধ হয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের উপর আঘাত হানতে পারত। যার জন্য সাময়িক অথবা অনির্দিষ্টকালের জন্য হ’লেও দাস ব্যবস্থাকে বহাল রাখতে হয়েছিল।
৬. মানবিক কারণ :
ইসলাম মানবতার ধর্ম। মানবতা প্রতিষ্ঠা করাই ইহার বৈশিষ্ট্য। ইসলাম যুদ্ধ ছাড়া অন্য সব ধরনের ক্রীতদাস সৃষ্টির উৎস বন্ধ করে দিয়েছে। এজন্য সকলের জানা যে, যেকোন যুদ্ধ-বিগ্রহে অবশ্যই জয়-পরাজয় রয়েছে। পরাজিত বাহিনীর সবকিছুই বিজয়ী বাহিনীর হয়ে যায়। তখন বাস্তবে দেখা যায় পুরুষের পাশাপাশি নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থসহ সকল শ্রেণীর মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। ঠিক সে মুহূর্তে ইসলামের নির্দেশ শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ ব্যতীত বাকী সকল পুরুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ দাস-দাসীর আওতার বাইরে থাকবে। তবে ইসলামিক রাষ্ট্রে যিযিয়া কর দিয়ে ইসলাম তাদেরকে থাকার অনুমতি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এদেরকে পূর্ণ মানবিক সহযোগিতাও করতে হবে। পক্ষান্তরে বর্তমান বিশ্বে মুসলমান কিংবা ভিন্ন পন্থী সে যেই হৌক না কেন, সেসকল বন্দিদের সাথে যে অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বিশেষ করে ইরাক, ফিলিস্তীন, আফগান, বার্মা ও অন্যান্য দেশের মুক্তিকামী যুদ্ধ বন্দী ও নারী-শিশুদের ওপর ইঙ্গ-মার্কিনী এবং অন্যান্যরা যেভাবে পৈশাচিক অত্যাচার ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালাচ্ছে তা বিশ্বমানবতাকে পদদলিত করার নামান্তর ছাড়া কিছুই নয়।
অপরদিকে দাসত্ব ও দাসপ্রথা উচ্ছেদ করার কথা অনেকে মুখে বললেও বস্ত্ততঃ জিইয়ে রাখতে চায়। আমেরিকা সভ্যতা গড়তে, নতুন ইমারত কলকারখানা তৈরীর জন্য ইতিপূর্বে আফ্রিকা থেকে বহু সংখ্যক দাস আমদানী করেছে। দেশটি উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশ থেকে এখনও শ্রম ও মেধা আকর্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমেরিকার স্বাধীনতা (৪ জুলাই ১৭৭৬) সম্পর্কে মতামত বর্ণনা করতে গিয়ে Claude M. lightfood যে মন্তব্য করেন তাতে উপরোক্ত কথাটির প্রমাণ মেলে। তিনি বলেন,
Black remained Slaves Until about 80 years later, women did not receive the right to vote until 112 years later and the working class did not get the legal right to organise and collectively burgain until 150 years later.
অর্থাৎ ‘এই স্বাধীনতালাভের পরবর্তী ৮০ বছরেও নিগ্রোরা দাসই রয়ে গিয়েছিল। মহিলারা পরবর্তী ১১২ বছর পর্যন্ত ভোটাধিকার পায়নি। শ্রমিকরাও সংগঠিত হওয়া বা জোটবদ্ধভাবে কোন দাবী-দাওয়া উপস্থাপনের কোন আইনগত অধিকার পায়নি পরবর্তী ১৫০ বছর পর্যন্ত’।[9]ড. রেবা মন্ডল ও শাহজাহান মন্ডল, মানবাধিকার আইন সংবিধান ইসলাম এনজিও, (ঢাকা : শামছ্ পাবলিকেশন্স, ২০০৯, পৃঃ ১২২; Claude M. Light food, Human Rights, U.S. style from colonical Times through the new Deal. (New York: International Publishers, 1977), P. 16.
কিন্তু ইসলাম কখনও দাস দিয়ে সভ্যতা গড়তে চায়নি এবং চায়না। মুহাম্মাদ (ﷺ) দাসদের শুধু মুক্তি দিতেই বলেননি, তাদেরকে ভাই হিসাবে গ্রহণ করতেও বলেছেন।
ঠিক এ মুহূর্তে ইসলামী সৈনিকদের কাছে যদি ভিন্ন ধর্মীয় বন্দি দাস-দাসী হিসাবে অবস্থান করত তাহলে তারা কতই না সম্মানের হালতে থাকতে পারত যা কল্পনার বাইরে। এমতাবস্থায় কেউ হয়ত স্ত্রীর মর্যাদায়, কেউ সন্তান হিসাবে, কেউ বা মাতা-পিতা অর্থাৎ যার যেখানে মর্যাদা পাওয়ার কথা সে মর্যাদায়ই সে পেত। এটা রাসূল (ﷺ)-এর চরম নির্দেশমূলক বাণী। যেমন রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা যা খাবে, দাস-দাসীদের তা খেতে দিবে। তোমরা যা পরবে তাদেরকে তা পরতে দিবে। কখনও তাদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করবে না’।[10]সিলসিলা ছহীহাহ হা/৭৪০; আদাবুল মুফরাদ হা/১৮৮। এ বিষয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা আসবে। মোদ্দাকথা সকল দিক বিবেচনা করে ইসলাম দাস প্রথাকে নিষিদ্ধ করেনি বরং এ প্রথাকে উচ্ছেদ করার জন্য বহুমুখী কর্মপন্থা দেখিয়েছেন মহামুক্তির মহান দূত সর্বকালের সকলের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (ﷺ)।
৭. বৈশ্বিক কারণ :
আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ইসলাম আগমনের প্রাক্কালে দাস প্রথা বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে চালু ছিল। মানুষের আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ড এর উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল। এটাকে কেউ ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতো না এবং একে পরিবর্তনের কল্পনাও করত না।
তাছাড়া বর্তমানে জাতিসংঘ সার্বজনীন মানবাধিকার সনদে কেবল কাগজে-কলমে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ, এর বাস্তবায়ন প্রকৃত অর্থে নেই। কারণ এখানে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বন্দিতব আজও বিদ্যমান। তাছাড়া কালের পরিক্রমায় দাসপ্রথা যে বিশ্বে আবার চালু হবে না এটা কোন মানুষ হলপ করে বলতে পারবে না। পার্থিব পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে এর প্রয়োজন কখনও দেখা দিতেও পারে, যা মানুষের আর্থ-সামাজিক কল্যাণ বয়ে আনবে। আর সেকারণে ইসলাম এ প্রথাকে নিষিদ্ধ করেনি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিংশ শতাব্দীতে দাসত্বের ধরণ পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে ব্যক্তি ও গোত্রের দাসত্বের স্থলে পুরা জাতি ও সমগ্র দেশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও কম্যুনিষ্ট নাস্তিকদের দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে জাতি যন্ত্রণাদায়ক এক অদৃশ্য আক্রমণের অসহনীয় শিকারে পরিণত হয়। এতে তার নিজস্ব ক্ষমতা রহিত হয়, স্বাধীনতা খর্ব হয়, আর তাদেরকে ঐ শক্তিধররা তাদের অধীনস্ত দাসে পরিণত করে শাসন করে পেশী শক্তির বলে। এতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর, মুখ খুলে কথা বলার সামর্থ্য তাদের থাকে না। জাতির স্বাতন্ত্র্য বলতেও কিছু অবশিষ্ট থাকে না। কর্মক্ষেত্রে ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে তাদের কোন ভূমিকা থাকে না। ফলে জাতি সম্পূর্ণরূপে সাম্রাজ্যবাদী, নাস্তিক শক্তির করতলগত হয়ে যায়। জাতি লাঞ্ছনা, অপমানে পদানত হয়, মানবিক ইয্যত-সম্মান তিরোহিত হয়, স্বাধীনতা দূরীভূত হয়। মূলতঃ পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ হয়ে গোলামী বা দাসত্বের জিঞ্জিরে জড়িয়ে পড়ে। এক কথায় সাম্রাজ্যবাদী নাস্তিক শক্তি আজ ব্যক্তি, পরিবার, বংশ-গোত্রের পরিবর্তে পুরা জাতি ও দেশকে সাহায্য-সহযোগিতা ও সেবার ছদ্মাবরণে আধুনিক দাসত্বের বৃত্তে বন্দী করেছে। যা ইসলাম আদৌ সমর্থন করে না। পক্ষান্তরে ইসলাম উপযুক্ত কারণে দাস-দাসীদেরকে গ্রহণ করেছে এবং মর্যাদা ও নিরাপত্তা দিয়েছে। বিধায় এ প্রথাকে নিষিদ্ধ করা হয়নি।
৮. সংশোধনের সুযোগ :
অমুসলিম যুদ্ধ বন্দীদেরকে সংশোধনের জন্য দারুণ সুযোগ করে দিয়েছে ইসলাম। যুদ্ধবন্দী দাস-দাসী যদি তাদের ভুল বুঝতে পেরে মুসলমান হয়ে যায়, তাহ’লে তাদেরকে কর্তৃপক্ষ মুক্ত করে দিবেন। দাস-দাসী থাকা অবস্থায় তাদেরকে মনিবেরা শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে থাকেন, যে কারণে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে। অতঃপর তারা মুসলমানদের আনুগত্য মেনে নেয়।
এছাড়া ইসলাম দাস-দাসীদেরকে গ্রহণ করেছে বটে, কিন্তু মুসলমানদের অধীনে যে মর্যাদা, মুক্তির ব্যবস্থা, সদাচরণ, নিরাপত্তা প্রদান ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেছে সঙ্গত কারণে এই প্রথাকে আর নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন পড়েনি এবং পড়বেও না। এ বিষয়ে পরবর্তী কিস্তিতে প্রকাশ পাবে ইনশআল্লাহ।
অতএব উপরোক্ত কারণগুলো ও অন্যান্য দিক বিশ্লেষণ করলে সহজেই বুঝা যায় যে, ইসলাম কেন দাস প্রথাকে একেবারে নিষিদ্ধ করেনি। মহাজ্ঞানী ও মহাদার্শনিক আল্লাহই এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত।
চলবে…
Footnotes
| ⇧1 | Encyclopedia of Religion and ethics vol. 8. |
|---|---|
| ⇧2 | দাসপ্রথা ও ইসলাম, পৃঃ ১০ |
| ⇧3 | Excyclopedia of religion and ethics |
| ⇧4 | Study of soiology |
| ⇧5 | Slavery in his Roman Empire p. 15. |
| ⇧6 | আবু দাউদ হা/৪১১৩-১৪; মিশকাত হা/৩১১১ |
| ⇧7 | দারাকুতনী, মুওয়াত্ত্বা মালেক, ইরওয়া হা/১৭৭৬ |
| ⇧8 | মাওলানা আব্দুর রহীম, দাস প্রথা ও ইসলাম, (ঢাকা : খায়রুন প্রকাশনী, ২০০৯), পৃঃ ২১। |
| ⇧9 | ড. রেবা মন্ডল ও শাহজাহান মন্ডল, মানবাধিকার আইন সংবিধান ইসলাম এনজিও, (ঢাকা : শামছ্ পাবলিকেশন্স, ২০০৯, পৃঃ ১২২; Claude M. Light food, Human Rights, U.S. style from colonical Times through the new Deal. (New York: International Publishers, 1977), P. 16. |
| ⇧10 | সিলসিলা ছহীহাহ হা/৭৪০; আদাবুল মুফরাদ হা/১৮৮। |




