সমতলবাদীদের নিকট ওহী সমতুল্য কবিতা ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’ সমাচার

‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’ নামক কবিতাটি একটি জাল কবিতা। এর রচয়িতার কোন জীবনি পাওয়া যায়না। ‘হাদিস বিশারদ ‘আল-কাহতানি আল-আন্দালুসি রাহিমাহুল্লাহ’কে এই কবিতার রচয়িতা মনে করা হয়ে থাকে (যার জীবনী পাওয়া যায়)। তবে সঠিক মত হল, উনি ‘নুনিয়াহ’ কবিতার রচয়িতা নন। ধারনা করা হয় যে, ‘নূনিয়াহ’ কবিতার রচয়িতা ‘কাহতানি’ নামক অন্য কোন এক অজ্ঞাত ব্যক্তি (যার জীবনী সম্পর্কে কিছুই জানা যায়না)।
আমরা বিষয়টি বিস্তারিতভাবে খোলাসা করার চেষ্টা করার করবো, ইনশাআল্লাহ…
আল-কাহতানি আল-আন্দালুসীর পরিচয়
প্রথমে হাদিস বিশারদ ‘ইমাম কাহতানি’ রাহিমাহুল্লাহ’র ব্যাপারে কি জানা যায় তা এক নজরে দেখে নেই:
[হাদিস বিশারদ ‘ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-মুআফিরি আল-কাহতানি আল-আন্দালুসী…]যিনি ‘ইমাম আল-কাহতানি’ নামে পরিচিত। তিনি কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আন্দালুসে ইবনে ওয়াদ্দাহ, কাসিম ইবনে আসবাগ প্রমুখের কাছে এবং মাগরিবে (উত্তর আফ্রিকা) বকর ইবনে মুহাম্মদ আল-তাহেরতীর কাছে শিক্ষালাভ করেন।
তিনি হজের উদ্দেশ্যে প্রাচ্যে ভ্রমণ করেন। মিশরে তিনি ইউনুস ইবনে আব্দুল আলার শিষ্যদের এবং আবু ইব্রাহিম আল-মুজানির কাছ থেকে হাদিস শোনেন। এছাড়া তিনি হিজাজে আবু সাঈদ ইবনুল আরাবির কাছে, সিরিয়ায় খায়সামা ইবনে সুলাইমান আল-আত্রাবুলসির কাছে, জাজিরায় আলী ইবনে হারবের শিষ্যদের কাছে এবং বাগদাদে ইসমাইল ইবনে মুহাম্মদ আল সাফফারের কাছে শিক্ষালাভ করেন।
তিনি ইসফাহান হয়ে ৩৪১ হিজরির জিলহজ মাসে নিশাপুরে পৌঁছান। এরপর তিনি বুখারায় যান, যেখানে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু সন নিয়ে মতভেদ রয়েছে এবং অনেকগুলো মত রয়েছে। কেউ বলেছেন, তার মৃত্যু হয়েছে ৩৭৮ হিজরিতে, কেউ বলেছন ৩৭৯ হিজরিতে, কেউ বলেছেন ৩৮৩ হিজরিতে, কেউ বলেছেন ৩৮৭ হিজরিতে, আবার কেউ বলেছেন ৩৭০ হিজরির পরে। (তবে তার মৃত্যু যে ৩৭০ হিজরির পরে হয়েছে, এটা নিশ্চিত)।
তিনি ছিলেন একজন আন্দালুসীয় মালিকি ফিকহবিদ এবং হাদিস বিশারদ। তিনি প্রচুর হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। “তারিখে আহলিল আন্দালুস” নামে তার একটি গ্রন্থ রয়েছে ‘যা তার বিভিন্ন জীবনি থেকে জানা যায়।
তাঁর নাম নিয়েও মতানৈক্য রয়েছে। আমাদের কাছে তাঁর প্রসিদ্ধ নাম হল, “আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আল-কাহতানি আল-আন্দালুসি।” কিন্তু বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে বেশ কয়েকটি নাম পাওয়া যায়। কেউ তাঁকে বলেছেন ‘মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-কাহতানি আল-আন্দালুসি, কেউ বলেছেন ‘আবু মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আল-আন্দালুসি আল-কাহতানি আস-সালাফি আল-মালিকি, আবার কেউ বলেছেন ‘আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-কাহতানি আল-মাআফিরি আল-আন্দালুসি আল-মালিকি। (আর পরবর্তী আলোচনা অনুযায়ী এটিই তার সঠিক নাম। আল্লাহ ভালো জানেন)
বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে…
(১) ইমাম আল-সামআনির বর্ণনা: ৫৬২ হিজরিতে মৃত্যুবরণকারী ইমাম আবু সাদ আব্দুল করিম বিন মুহাম্মদ বিন মানসুর আত-তামিমি (যিনি আল-সামআনি নামে পরিচিত) তাঁর “আল-আনসাব” (১০/৬৮) গ্রন্থে কাহতানিদের বংশপরিচয় উল্লেখ করার সময় বলেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন: আবু আব্দুল্লাহ বিন সালিহ বিন আস-সামাহ বিন সালিহ বিন হাশিম বিন গারিব আল-কাহতানি আল-মালিকি আল-মাআফিরি আল-আন্দালুসি। – https://shamela.ws/book/1656/3588
(২) আবু সাঈদ আল-ইদ্রিসির বর্ণনা: আবু সাঈদ আল-ইদ্রিসি তাঁর “তারিখে সমরকন্দ” গ্রন্থে তাঁর কথা উল্লেখ করে বলেছেন: ফকিহ আবু আব্দুল্লাহ আল-কাহতানি ৩৫০ হিজরির আগে আমাদের কাছে সমরকন্দে এসেছিলেন। তিনি সেখানে আমাদের শায়খদের থেকে অনেক কিছু লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি “তারিখুল আন্দালুসিয়া” (আন্দালুসীয়দের ইতিহাস) নামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেছেন, যা আমরা তাঁর কাছ থেকে সমরকন্দে শুনেছি। তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য মানুষদের অন্যতম। তিনি আন্দালুস, মাগরিব, সিরিয়া, হিজাজ, ইরাক, জিবাল, খোরাসান এবং ট্রান্সঅক্সিয়ানার (মা’ ওরাউন নহর) শায়খদের থেকে এত বিপুল পরিমাণ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তিনি ৩৭০ হিজরির পরে বুখারায় ইন্তেকাল করেন। – https://shamela.ws/book/14463/1039
(৩) ইমাম আল-হাকিমের বর্ণনা: আল-হাকিম আবু আব্দুল্লাহ তাঁর “তারিখে নিশাপুর” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মদ বিন সাদ বিন নিযার বিন আমর বিন সালাবা আল-কাহতানি আল-মাআফিরি আল-ফকিহ আবু আব্দুল্লাহ আল-আন্দালুসি আল-মালিকি। তিনি মাগরিব থেকে প্রাচ্যে ভ্রমণকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ৩৪১ হিজরির শাওয়াল মাসে হামাদানে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। এরপর তিনি সেখান থেকে ইসফাহানের দিকে রওনা হন। তিনি তাঁর নিজ দেশে এবং মিসরে ইউনুস বিন আব্দুল আলা ও আবু ইবরাহিম আল-মুজানির ছাত্রদের কাছ থেকে, হিজাজে আবু সাঈদ ইবনুল আরাবির কাছ থেকে, সিরিয়ায় খাইসামা বিন সুলাইমানের কাছ থেকে, জাজিরায় আলী বিন হারবের ছাত্রদের কাছ থেকে এবং বাগদাদে ইসমাইল আস-সাফফারের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। ৩৪১ হিজরির জিলহজ মাসে তিনি নিশাপুরে আসেন এবং প্রচুর হাদিস শোনেন। এরপর তিনি মার্ভের দিকে যান এবং সেখান থেকে আবু বকর বিন হানিফের কাছে যান। তিনি বুখারায় থেকে যান এবং ৩৮৩ হিজরির রজব মাসে সেখানেই ইন্তেকাল করেন।
◑ তিনি ‘আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন’-এ (১০/৪৯৯) উল্লেখ করেছেন: “মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মদ বিন সাদ বিন নিযার বিন আমর বিন সালাবা, আবু আবদুল্লাহ আল-কাহতানি আল-মা’আফিরি আল-আন্দালুসি আল-কুরতুবি।” তার জীবনী ও পরিচয় পাওয়া যাবে নিম্নোক্ত গ্রন্থগুলোতে: তারিখ উলামা আল-আন্দালুস (২/ ৯১), তারিখ দামেস্ক (৫৩/ ২৭০), তারিখুল ইসলাম (৮/ ৫৪৮), আল-আনসাব; সাম’আনি (৪/ ৪৫৬) – https://shamela.ws/book/1200/6193
(৪) ইবনে আসাকিরের বর্ণনা: ৫৭১ হিজরিতে মৃত্যুবরণকারী হাফিজ ইমাম আবুল-কাসিম আলী বিন আল-হাসান ইবনে আসাকির তাঁর ‘তারিখে দামেস্ক লি ইবনে আসাকির’ (৫৩/২৭০) গ্রন্থে বলেছেন: মুহাম্মদ বিন সালিহ… (পুরো বংশলতিকা), তিনি খাইসামা বিন সুলাইমান, আবু সাঈদ ইবনুল আরাবি, ইসমাইল বিন মুহাম্মদ আস-সাফফার, আবু ইয়াযান হিমইয়ার বিন ইবরাহিম আল-হিময়ারি, বকর বিন হাম্মাদ আত-তাহিরাতি প্রমুখের কাছ থেকে হাদিস শুনেছেন। তাঁর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন আল-হাকিম আবু আব্দুল্লাহ আল-হাফিজ, আবু সাহল মুহাম্মদ বিন নাসরওয়াইহি আল-মারওয়াযি এবং মুফাসসির আবু আল-কাসিম বিন হাবিব। – https://shamela.ws/book/71/24645
(৫) ইমাম ইবনে মানযুর আল-আনসারির বর্ণনা: ইমাম ইবনে মানযুর আল-আনসারি ‘মুখতাসার তারিখে দিমাশক’ (২২/২৪২) গ্রন্থে তাঁর নাম ও বংশলতিকা উল্লেখ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সেই চিঠির হাদিসটি উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন: মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মদ বিন সাদ ৩৮৩ হিজরির রজব মাসে বুখারায় ইন্তেকাল করেন। – https://shamela.ws/book/3118/7826
(৬) ইমাম আয-যাহাবির বর্ণনা: ইমাম আয-যাহাবি তাঁর ‘তারিখুল ইসলাম’ (৮/৫৪৮) গ্রন্থে ৩৮৩ হিজরির মৃত্যু তালিকায় বলেছেন: মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মদ… আবু আব্দুল্লাহ আল-কাহতানি আল-আন্দালুসি আল-ফকিহ আল-মালিকি। তিনি বকর বিন হাম্মাদ, ইসমাইল আস-সাফফার, আবু সাঈদ ইবনুল আরাবি এবং খাইসামা আল-আত্রাবুলুসির কাছ থেকে হাদিস শুনেছেন। তিনি প্রাচ্যে সফর করেন এবং হজ্জ করেন। তাঁর কাছ থেকে আল-হাকিম প্রমুখ হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং তিনি রজব মাসে বুখারায় মারা যান। – https://shamela.ws/book/35100/8453
(৭) আল্লামা আল-মাক্কারি আল-মাগরিবির বর্ণনা: আল্লামা আল-মাক্কারি (মৃত্যু: ১০৪১ হিজরি) তাঁর ‘নাফহুত তাইয়্যিব’ (২/১৪২) গ্রন্থে বলেছেন: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-কাহতানি… প্রাচ্যে সফর করেন। তিনি সিরিয়ায়, মক্কায়, বাগদাদে, মাগরিবে এবং মিসরে বিভিন্ন পণ্ডিতের কাছে জ্ঞান অর্জন করেন। আল-হাকিম বলেছেন যে, হামাদানে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি ৩৮৩ হিজরিতে (মতান্তরে ৩৮৮ বা ৩৭৯ হিজরিতে) বুখারায় ইন্তেকাল করেন। আবু সাঈদ আল-ইদ্রিসি তাঁকে শ্রেষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য মানুষ বলেছেন, গুনজার তাঁকে ফকিহ ও হাফিজ বলেছেন এবং সামআনিও তাঁকে ফকিহ ও হাফিজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। – https://shamela.ws/book/1002/851
(৮) আল-জারকালির বর্ণনা: আল-জারকালির ‘আল-আলাম’ (৬/১৬২) গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে: আল-মাআফিরি (মৃত্যু: ৩৮৩ হিজরি) মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-কাহতানি আল-মাআফিরি আল-আন্দালুসি আল-মালিকি, আবু আব্দুল্লাহ: তিনি কর্ডোভার একজন জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি প্রাচ্যে সফর করেন, হজ্জ করেন, ইরাকে প্রবেশ করেন এবং খোরাসানে যান। তিনি বুখারায় স্থায়ী হন এবং সেখানেই মারা যান। তাঁর ‘তারিখে আহলিল আন্দালুস’ নামে একটি গ্রন্থ রয়েছে। – https://shamela.ws/book/12286/5442
(৯) ইবনুল ফারদির বর্ননা: ইবনুল ফারদি তার ‘কিতাবুত তারিখি উলামা-ইল আন্দালুস’ (২/৯১) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-মা’আফিরি: তিনি কর্ডোভার (কুরতুবা) অধিবাসী ছিলেন। তিনি কর্ডোভাতে কাসেম বিন আসবাগ এবং আরও অনেকের নিকট (হাদিস) শ্রবণ করেছেন। এরপর তিনি প্রাচ্যের দেশসমূহে (মাশরিক) সফর করেন এবং মক্কায় ইবনুল আরাবি ও অন্যান্য মক্কাবাসীদের নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ইরাকেও প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানকার অনেক হাদিস বিশারদদের কাছ থেকে হাদিস লিখে নিয়েছিলেন। তিনি হাদিস অনুলিখনে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি খোরাসান সফর করেন এবং সেখানে যাতায়াত করেন। সবশেষে তিনি বুখারাতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। আব্দুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আত-তাজিরের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ৩৭৮ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন (রাহিমাহুল্লাহ)। – https://shamela.ws/book/30743/498
(১০) আবুৎ তাইয়্যিব নায়েফ আল-মানসুরির বর্ননা: আবুৎ তাইয়্যিব নায়েফ আল-মানসুরি তার ‘কিতাবুর রওদ্বিল বাসিম ফী তারাজিমি শুয়ুখিল হাকিম’ (২/১০৩৮) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মদ বিন সাদ বিন নিযার বিন আমর বিন সালাবা। মতান্তরে বলা হয়েছে: মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মদ বিন আস-সামাহ বিন সালিহ বিন হিশাম বিন উরাইব—আবু আব্দুল্লাহ আল-কাহতানি, আল-মা’আফিরি, আল-আন্দালুসি; তিনি ছিলেন মালিকি মাজহাবের একজন ফকিহ। — তিনি যাদের নিকট থেকে (হাদিস) শুনেছেন: খাইসামাহ বিন সুলাইমান, আবু সাঈদ ইবনুল আরাবি, ইসমাইল বিন মুহাম্মদ আস-সাফফার, আবু ইয়াযান হিমইয়ার বিন ইব্রাহিম বিন আব্দুল্লাহ আল-হিমইয়ারি, বকর বিন হাম্মাদ আত-তাহেরতি, মুহাম্মদ বিন ওয়াদদাহ, কাসিম বিন আসবাগ, মুহাম্মদ বিন রিফাআহ, ইব্রাহিম আল-কাযযায, হাসান বিন সাদ, আহমাদ বিন হাযম আল-আন্দালুসি এবং আরও অনেকের নিকট। — তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন: আবু আব্দুল্লাহ আল-হাকিম, আবু সাহল মুহাম্মদ বিন নাসরুয়াইহ বিন আহমাদ আল-মারওয়াযি এবং আবুল-কাসিম বিন হাবিব আল-মুফাসসির। – https://shamela.ws/book/14463/1038
(১১) আল-মাক্বরিযীর বর্ননা: আল-মাক্বরিযী তার ‘আল-মুক্বাফফাল কাবীর’ (৫/৩৮৭) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-মা’আফিরি আল-আন্দালুসি” [মৃত্যু: ৩৮৩ হিজরি]। — “মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মদ বিন আস-সামাহ বিন সালিহ বিন হিশাম বিন উরাইব।” মতান্তরে বলা হয়েছে: “মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন সাদ বিন নিযার বিন আমর বিন সালাবা; (কুনিয়াত বা উপনাম) আবু আবদুল্লাহ, আল-কাহত্বানি, আল-মা’আফিরি, আল-আন্দালুসি, আল-মালিকি।” – https://shamela.ws/book/145334/2191
সমতলবাদীদের দাবি
দাবি করা হয় যে, এই হাদিস বিশারদ ও ফকিহ ইমাম কাহতানি রাহিমাহুল্লাহ-ই এই ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’ নামক কবিতার রচয়িতা। তবে বাস্তবে এই কবিতার সাথে হাদিস বিশারদ ও মালেকি ফকিহ ‘আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-মুআফিরি আল-আন্দালুসি আল-কাহতানির সরাসরি কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বরং ধারণা করা হয় যে, এর রচয়িতা সম্ভবত আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-কাহতানি নামের অন্য কোনো এক অজ্ঞাত ব্যক্তি।
এবং উপরে উল্লেখিত সব জীবনী থেকে আমাদের কাছে এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম আল-কাহতানির আসল নাম হলো: “আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মদ বিন সাদ বিন নিযার বিন আমর বিন সালাবা আল-কাহতানি আল-মাআফিরি আল-আন্দালুসি আল-ফকিহ আল-মালিকি”। তিনি ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’ কবিতার রচয়িতা হিসাবে আমাদের কাছে পরিচিত ‘আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-কাহতানি’ নন।
📄 “মু’জামুশ শু’আরা-ইল আরাব” (আরব কবিদের অভিধান বা আরব কবিদের জীবনি) গ্রন্থে (১/১৬৪৫) বলা হয়েছে: আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আল-কাহতানি, আবু মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আল-আন্দালুসি আল-কাহতানি আস-সালাফি আল-মালিকি। তিনি একজন ফকিহ ও হাফিজ ছিলেন… তাঁর একটি মুদ্রিত ‘নুনিয়্যাহ’ কবিতা রয়েছে।
https://ketabonline.com/ar/books/2572/read?part=1&page=1645&index=2046886/2046997
জবাব: এই অভিধান প্রণেতাদের কর্মপদ্ধতিতে যা লক্ষ্য করা যায় তা হলো:
প্রথমত: তারা ‘নুনিয়াহ’ কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা আল-কাহতানিকে তার বহুল পরিচিত নামেই অভিহিত করেছেন। এরপর তার জীবনবৃত্তান্তে বলেছেন: ‘আবু মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আল-আন্দালুসি আল-কাহতানি আস-সালাফি আল-মালিকি’। অথচ তারা তাকে সেই নামে ডাকেননি, যে নামে তার জীবনী বর্ণনাকারীরা তাকে অভিহিত করেছেন (অর্থাৎ মুহাম্মদ বিন সালিহ)। তারা এই দুই ব্যাক্তিকে একজন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করেছেন, কিন্তু তাদের এই পরিবর্তনের কারণ বা ভিত্তি ব্যাখ্যা করেননি।
দ্বিতীয়ত: তারা ‘তারিখে আন্দালুস’-এর লেখক হাদিস বিশারদ ইমাম কাহতানির সাথে এই ‘নূনিয়াহ’ কাব্যগ্রন্থকে সম্পর্কিত করেছেন (অর্থাৎ তাকেই এর রচয়িতা বলেছেন), অথচ তাদের পূর্বে আর কেউ-ই এমন কথা কখনও বলেনি, অর্থাৎ ‘নুনিয়াহ’ কবিতাটিকে কেউ-ই হাদিস বিশারদ ইমাম কাহতানির দিকে নিসবত করেননি।
📄 ‘নুনিয়াহ’ কবিতাটি হাদিস বিশারদ, মালেকি ফকিহ ইমাম আল-কাহতানির নয়, এর আরেকটি সুস্পষ্ট প্রমান হল, “অনেকেই এই কবিতাটি হাদিস বিশারদ ইমাম কাহতানির রচিত হওয়ার ব্যাপারে প্রবল সন্দেহ পোষণ করেন। কারণ, এই কবিতায় আরেক কবি ‘আবুল আলা আল মা’আররি’ এর তিব্র সমালোচনা করা হয়েছে, তাকে কুকুর বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
অথচ, আল-মা’আররি ৩৬৩ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যা কাহতানির মৃত্যুর মাত্র দশ বা পনেরো বছর আগের ঘটনা। একজন শিশুর ব্যাপারে তার এই ধরনের সমালোচনা কোনভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হল…
কবি আল-কাহতানি তার রচিত ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’-তে আবুল আলা মা’আররি সম্পর্কে বলেছেন,
٥٨٢- من قال في القران ما قد قاله … عبد الجليل وشيعة اللحيان
৫৮২. যে ব্যক্তি কুরআন সম্পর্কে এমন কথা বলে, যা আব্দুল জলীল এবং লিহয়ানের অনুসারীরা বলেছে,
٥٨٣- فقد افترى كذبا وأثما واقتدى … بكلاب كلب معرة النعمان
৫৮৩. সে নিশ্চিতভাবেই মিথ্যা ও পাপ রচনা করেছে এবং সে ‘মা’আররাতুন নুমান’-এর কুকুরের (আবুল আলা আল-মা’আররি-কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে) কুকুরগুলোর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে।
٥٨٤- خالطتهم حينا فلو عاشرتهم … لضربتهم بصوارمي ولساني
৫৮৪. আমি তাদের সাথে কিছুকাল মিশেছিলাম; যদি আমি তাদের সাথে বসবাস করতাম, তবে আমি আমার তরবারি ও জিহ্বা (বাক্যবাণ/কাব্য) দিয়ে তাদের আঘাত করতাম।
٥٨٥- تعس العمي أبو العلاء فانه … قد كان مجموعا له العميان
৫৮৫. অন্ধ আবুল-আলা (আল-মাআ’ররি) ধ্বংস হোক! কারণ, তার মধ্যে দ্বৈত অন্ধত্ব (চোখ ও অন্তরের অন্ধত্ব) একত্রিত হয়েছিল।
٥٨٦- ولقد نظمت قصيدتين بهجوه … أبيات كل قصيدة مئتان
৫৮৬. আমি তার নিন্দায় (বা প্রতিবাদে) দুটি কাসীদা (কবিতা) রচনা করেছি, যার প্রতিটি কাসীদায় দুইশত করে পঙক্তি রয়েছে।
٥٨٧- والآن أهجو الأشعري وحزبه … وأذيع ما كتموا من البهتان
৫৮৭. আর এখন আমি আল-আশআরী এবং তার দলের নিন্দা করছি এবং তারা যেসব মিথ্যা বা অপবাদ গোপন করে রেখেছিল তা প্রকাশ করে দিচ্ছি।
শাইখ সালেহ আস-সুহাইমি হাফিজাহুল্লাহ ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি (نونية القحطاني) এর উপর করা তার ব্যাখা ‘আল-কুুতুফুদ দাওয়ানী ফী শারহি নূনিয়্যাতিল কাহতানী’-তে বলেছেন,
٥٨٢- من قال في القران ما قد قاله … عبد الجليل وشيعة اللحيان
৫৮২. যে ব্যক্তি কুরআন সম্পর্কে এমন কথা বলে, যা আব্দুল জলিল এবং লিহইয়ানের অনুসারীরা বলেছে।
“এখানে জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় এবং তাদের থেকে উদ্ভূত যারা বলে যে, ‘কুরআন আল্লাহর কালাম নয়’ – তাদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে; যেমন আব্দুল জলিল নামের এক ব্যক্তি এবং লিহইয়ানি নামের আরেক ব্যক্তি। এই দু’জন এবং তাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যারা তাদের মতাদর্শের অনুসারী, তারা সকলেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার ‘কালাম’ (কথা বলা) গুণের ক্ষেত্রে অথবা কুরআন যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার কালাম— তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে সরল পথ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়েছে।
সুতরাং, যে ব্যক্তি কুরআন আল্লাহর কালাম হওয়াকে অস্বীকার করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত। আর একারণেই কবি (আল-কাহতানি) বলেছেন:
٥٨٣- فقد افترى كذبا وأثما واقتدى … بكلاب كلب معرة النعمان
৫৮৩. সে অবশ্যই মিথ্যা ও পাপ রচনা করেছে এবং মা’আররাতুন নু’মানের কুকুরের কুকুরদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে।
অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার কালামকে নিষ্ক্রিয় করে এবং এর অপব্যাখ্যা করে, সে মূলত মিথ্যা রচনা করেছে, সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং জুলুম করেছে। কারণ সে আল্লাহ তা’আলার ওপর মিথ্যা আরোপ করেছে এবং এ ক্ষেত্রে সে ঐ সকল লোকদের অন্ধ অনুকরণ করেছে যাদেরকে কবি “মা’আররাতুন নু’মানের কুকুরের কুকুর” বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আর তারা হলো নাস্তিক দার্শনিক আবুল আলা আল-মা’আররির অনুসারী। সে (আবুল আলা) তার নাস্তিকতা, ধর্মদ্রোহিতা, দর্শনের গভীরে নিমজ্জন, আল্লাহ তায়ালা’র কালামকে অস্বীকার করা এবং কুরআন সৃষ্টবস্তু— এমন বিশ্বাস রাখার জন্য পরিচিত।
٥٨٥- تعس العمي أبو العلاء١ فانه … قد كان مجموعا له العميان
৫৮৫. অন্ধ আবুল আলা ধ্বংস হোক! কারণ তার মাঝে দুটি অন্ধত্ব একত্রিত হয়েছিল।
٥٨٦- ولقد نظمت قصيدتين بهجوه … أبيات كل قصيدة مئتان
৫৮৬. আর আমি তার নিন্দায় দুটি কাসিদা (কবিতা) রচনা করেছি, যার প্রতিটি কাসিদার পঙক্তি সংখ্যা দুইশত।
‘তাঈসা’ (تَعِسَ) অর্থ ধ্বংস হোক বা নিপাত যাক। ‘অন্ধ’ বলতে তিনি আবুল আলা আল-মা’আররিকে [১] বুঝিয়েছেন। আর তিনি খবর দিয়েছেন যে, তার (আবুল আলার) মাঝে দুটি অন্ধত্ব একত্রিত হয়েছিল: চোখের অন্ধত্ব এবং অন্তরের অন্ধত্ব; কারণ সে একজন নাস্তিক, সে শরীয়ত অস্বীকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
[১] সে হলো আবুল আলা আহমাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সুলাইমান, একজন নাস্তিক দার্শনিক। মৃত্যু: ৪৪৯ হিজরি। দেখুন: তারিখে বাগদাদ, ৪/২৪০ (তারিখে বাগদাদ, শামেলা, ৪/১৭১ – অনুবাদক) – https://shamela.ws/book/736/1793
📕 [আল-কুুতুফুদ দাওয়ানী ফী শারহি নূনিয়্যাতিল কাহতানি, ৬২১ ও ৬২৩ পৃ.]
— কবি ‘আবুল আলা আল-মা’আররি’র জন্ম ৩৬৩ হিজরি এবং মৃত্যু ৪৪৯ হিজরি।
https://shamela.ws/book/12286/406
https://www.aldiwan.net/cat-poet-almaarri
https://ar.wikipedia.org/wiki/أبو_العلاء_المعري
অন্যদিকে নুনিয়াহ কবিতার রচয়িতা হিসাবে সমতলবাদীরা যাকে প্রচার করে ‘সেই হাদিস বিশারদ ‘আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-কাহতানি রাহিমাহুল্লাহ’র মৃত্যু ৩৭০ হিজরির পর। তাহলে ইমাম আল-কাহতানির মৃত্যুর মাত্র দশ বা পনেরো বছর আগে (৩৬৩ হিজরি) জন্ম নেওয়া একজন শিশুর ব্যাপারে তার এই ধরনের সমালোচনা করা কিভাবে যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে?
কবি কাহতানি ‘আল-মা’আররি’র অনুসারীদের ব্যাপারেও বলেছেন (মা’আররাতুন নু’মানের কুকুরের কুকুরদের)… প্রশ্ন হল, একজন ১০-১৫ (সর্বোচ্চ ২০ বছর) বছরের শিশুর কিভাবে মতাদর্শিক দল ও তার অনুসারী থাকতে পারে?
অতএব, আবুল আলা আল-মা’আররি’র বিষয়টি পর্যালোচনার পর এটাই প্রমানিত হয় যে, ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’ নামক কাসিদাটির লেখক ‘আমাদের পরিচিত হাদিস বিশারদ ও ফকিহ ‘ইমাম কাহতানি হওয়াটা অসম্ভব। বরং এর লেখক হতে পারে ইমাম কাহতানির মৃত্যুর পরের ‘কাহতানি’ নামক অন্য কোন ব্যাক্তি (যে একজন কবি ছিল, আলেম নয়)।
📄 ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’ সম্পর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
(১) ‘নুনিয়্যাহ’ কবিতার শামেলা সংস্করণে (‘দারুয যিকরা’ থেকে প্রকাশিত) লেখকের নামের জায়গায় ‘হাদিস বিশারদ ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল-কাহতানি, আল-মুআফিরি আল-আন্দালুসি আল-মালিকি’ রাহিমাহুল্লাহ’র নাম থাকলেও ‘নামের আগে (لعله) ‘সম্ভবত’ বলা হয়েছে।
المؤلف: لعله أبو عبد الله محمد بن صالح القحطاني، المعافري الأندلسي المالكي
অর্থাৎ এর লেখক ‘পরিচিত হাদিস বিশারদ ইমাম ‘কাহতানি’ কিনা তা নিশ্চিত নয়। – https://shamela.ws/book/7533
(২) আমরা দেখতে পাই যে, ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) তার নিজের ‘নুনিয়াহ’ গ্রন্থে কবি কাহতানির ‘নুনিয়াহ’ থেকে দুটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেছেন। তিনি লিখেছেন,
إن الذي هو في المصاحف مثبت … بأنامل الأشياخ والشبان
هو قول ربي آيه وحروفه … ومدادنا والرق مخلوقانএই পঙক্তি দুটি ‘কাহতানির ‘নুনিয়াহ’-তেও আছে (দেখুন: ৭৭০, ৭৭১ নং পঙক্তি)
তবে ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ শুধু দুটি পঙক্তিই নকল করেছে এবং কোথাও এর রচয়িতা কাহতানির কোন পরিচয় উল্লেখ করেননি। এবং ইবনুল কাইয়্যিম-এর “আন-নূনিয়াহ: আল-কাফিয়াতুশ শাফিয়া” এর আতাআ’তুল-ইলম সংস্করণ দেখুন (শামেলা)। সেখানে ভূমিকা পর্বের ১৪৯ পৃষ্ঠার টীকায় বলা হয়েছে—
نونية القحطاني (١): وهو عبد الله بن محمد القحطاني الأندلسي المالكي
নুনিয়াহ আল-কাহতানি [১]: তিনি হলেন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ আল-কাহতানি আল-আন্দালুসি আল-মালিকি।
(١) لم أعثر له على ترجمة، إلا أن قصيدته مشهورة متداولة، وقد نقل عنها الإمام ابن القيم في نونيته. انظر البيتين: ٧٧٠ و ٧٧١.
টীকা: [১] আমি তার কোনো জীবনী (বিস্তারিত পরিচয়) খুঁজে পাইনি; তবে তাঁর কাসিদাটি (কবিতা) অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও বহুল প্রচলিত। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর নিজস্ব ‘নূনিয়াহ’ কাব্যে এটি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। দেখুন (ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ’র নূনিয়াহ কবিতার) পঙক্তি নম্বর: ৭৭০ ও ৭৭১
ইবনুল কাইয়্যিম; আন-নূনিয়াহ: আল-কাফিয়াতুশ শাফিয়া, ভূমিকা, ১৪৯ পৃ. – https://shamela.ws/book/16422/449
— প্রাচীন আহলুস সুন্নাহর আলেমদের মধ্যে কেউ-ই এই পঙক্তিগুলো বর্ণনা করেননি, এই কবিতাটির ব্যাপারে উল্লেখ করেননি এবং গুরুত্ব দেননি। যতক্ষণ না ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এর কিছু অংশ উদ্ধৃত করেন, এরপর এটি সমসাময়িক আলেমদের কাছে পরিচিতি পায়।
(৩) আশ্চর্যজনকভাবে, এই দীর্ঘ কবিতার কোনো হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি বা সনদ পৃথিবীতে নেই। প্রাচীন যুগের কোনো আলেম এই কবিতার কথা উল্লেখ করেননি। পরবর্তীতে শুধুমাত্র ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর নিজের লেখায় এখান থেকে কিছু পঙক্তি ধার করলেও কোন সনদ বা লেখক পরিচিতি উল্লেখ করেননি। এবং সমসাময়িক সময়ে ২০০৭ সালে “জামাল বিন আস-সাইয়্যিদ বিন রিফায়ি” নামক একজন “আল-ফাতহুর রব্বানি ফি শারহি নুনিয়াহ আল-কাহতানি” নামে এর একটি (খুবই) সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেন।
(৪) কবিতাটির রচয়িতা যেই হোক না কেন, চুরান্ত সত্য এটাই যে, এটি একজন কবির রচনা, কোনো আলেম বা ফকিহের নয়। কারণ লেখক নিজেই বলেছেন:
٦٦٤- وأنا المحب لأهل سنة أحمد … وأنا الأديب الشاعر القحطاني
৬৬৪. আমি আহমাদ এর সুন্নাতের অনুসারীদের একান্ত প্রেমিক … আর আমিই সেই আদিব (সাহিত্যিক) ও কবি আল-কাহতানি।
— কবিতাটির রচয়িতা যদি পরিচিত হাদিস বিশারদ ও ফকিহ ‘ইমাম কাহতানি’ই হন, তাহলে তিনি নিজেকে কেন সাহিত্যিক ও কবি হিসেবে পরিচয় দিবেন? এবং যারা এই কবিতাটিকে আকিদার দলিল হিসেবে প্রচার করে, তাদের নিকট প্রশ্ন হল— “সাহিত্যিক ও কবিদের থেকে কীভাবে আকিদা ও আহকাম গ্রহণ করা হবে? বিশেষ করে যখন তিনি মাজহুল হন?”
(৫) ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’র প্রচারকারী সমতলবাদীরা বলে যে, আল-কাহতানি অপরিচিত নন, এবং তারা উল্লেখ করে যে, “আল-সাম’আনি সহ অনেকেই তাঁর জীবনি উল্লেখ করেছেন।
জবাব: আমরা আগেই প্রমান করেছি যে, হাদিস বিশারদ ইমাম কাহতানি ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’ কবিতার রচয়িতা নন। তার সাথে এই কবিতার কোন যোগসূত্র নেই। সমতলবাদীরা অজ্ঞাত কবী কাহতানি ও হাদিস বিশারদ ‘ইমাম কাহতানি’কে একই ব্যাক্তি মনে করে গুলিয়ে ফেলেছে।
সমতলবাদীদের নিকট প্রশ্ন: “আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মদ বিন সাদ বিন নিযার বিন আমর বিন সালাবা আল-কাহতানি আল-মাআফিরি আল-আন্দালুসি আল-ফকিহ আল-মালিকি” – যার জীবনী ইমাম সাম’আনি সহ অন্যান্যরা লিখেছেন। তিনিই কি ‘নুনিয়াহ’ কবিতাটির রচয়িতা? যদি তিনিই ‘নুনিয়াহ’ কবিতার রচয়িতা হন, তাহলে সাম’আনি সহ অন্যান্যরা তার জীবনী লেখার সময় কেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘নুনিয়াহ’ এর কথা কেউই উল্লেখ করেননি?
হাদিস বিশারদ ইমাম কাহতানির জীবনি যারা উল্লেখ করেছেন, তাদের কেউই তার জীবনিতে এই ‘নুনিয়াহ’ নামক কোন কবিতার কথা উল্লেখ করেনি। সবাই শুধু ‘তারিখে আন্দালুস’ কিতাবের নামটিই উল্লেখ করেছেন। এত বিখ্যাত ও প্রসিদ্ধ কবিতা হওয়া সত্যেও ‘লেখকের জীবনিতে তার উল্লেখ না থাকা কিভাবে যৌক্তিক হয়? – আর উল্লেখ না থাকার বিষয়টি মূলত অযৌক্তিক নয়, কারন কবিতাটির রচয়িতা ’হাদিস বিশারদ ইমাম কাহতানি’ নয়-ই, বরং এর রচয়িতা হল ‘কাহতানি’ নামক অন্য কোন এক মাজহুল ব্যাক্তি।
(৬) বিশ্ব বিখ্যাত ফাতাওয়া’র ওয়েবসাইট IslamQA-তে ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’ সম্পর্কে আলোচনায় বলা হয়েছে:
‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’র রচয়িতার ব্যক্তিত্ব নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। কারণ, আমরা তার এমন কোনো বিস্তারিত জীবনী পাইনি যা তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিচয় দেয়, যার মাধ্যমে গবেষকরা নিশ্চিত হতে পারেন যে তিনিই ‘নুনিয়াহ’ এর রচয়িতা। বরং এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায় না যা নির্দেশ করে যে নুনিয়াহর রচয়িতা নির্দিষ্ট ও পরিচিত কোনো ব্যক্তি, যাঁর জীবনী বিদ্যমান। কিছু গবেষক বর্ণনা করেছেন—যেমন “মুলতাকা আহলিল হাদিস” ফোরামে রয়েছে যে, তারা ফজিলাতুশ শাইখ আল্লামা আব্দুল্লাহ আস-সাদকে বলতে শুনেছেন যে, তিনি এর রচয়িতার কোনো জীবনী খুঁজে পাননি।
আমরা পূর্ববর্তী কোনো সংস্করণেই কবিতাটির পাণ্ডুলিপির কোনো উল্লেখ পাইনি, না পেয়েছি লেখকের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচিতি, আর না পেয়েছি আলেমদের বক্তব্যের মাধ্যমে কাসিদাটির প্রামাণ্যতার স্বীকৃতি। আমরা আশা করি এর এমন একটি সংস্করণ পাব যাতে মূল পান্ডুলিপিগুলোর মাধ্যমে এর একটি বৈজ্ঞানিক প্রামাণ্যতা থাকবে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট রচয়িতার দিকে এই কাসিদার সম্বন্ধটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
এই কাসিদার অধ্যায় এবং পরিচ্ছেদ গুলোর বিন্যাস না থাকা পাঠকের মনে অস্বস্তি তৈরি করে। রচয়িতা হঠাৎ করেই আকিদা এবং ফিকহের বিষয়গুলোর মধ্যে স্থান পরিবর্তন করেন, আবার আকিদা ও শিষ্টাচারের দিকে ফিরে যান। এই বিষয়টি পাঠকের মনে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং তার পড়ার ধারাবাহিকতা ছিন্ন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ১১৬ নম্বর পঙ্ক্তিতে তিনি নামাজের রুকন সম্পর্কে আলোচনা করেছেন, এরপর কিছু আকিদাগত বিষয় উল্লেখ করেছেন। তারপর ২৮১ নম্বর পঙ্ক্তি থেকে আবার ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের আলোচনা শুরু করেছেন, যার মধ্যে নামাজও রয়েছে।
(হাদিস বিশারদ ইমাম কাহতানির মত দ্বীনের জ্ঞানসম্পন্ন একজন বিজ্ঞ ফকিহ আলেম ও লেখক কখনোই এমনটা করতে পারেন না। এটা একজন অজ্ঞ ও অগভীর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যাক্তির কাজ ছাড়া কারও কাজ হতে পারেনা — অনুবাদক।)
আমরা যদি ওপরের আলোচনা নিয়ে চিন্তা করি, তাহলে রচয়িতার পর্যাপ্ত জীবনীর অভাব (যাতে প্রমাণ হতো যে এই কবিতা তারই এবং আলেমদের মাঝে তার মর্যাদা স্পষ্ট হতো), এবং পূর্ববর্তী যুগে কাসিদাটির প্রতি আলেমদের মনোযোগের অভাব (যদিও রচয়িতার মৃত্যু অনেক আগে হয়েছে) — এই বিষয়গুলো কাসিদাটিকে আকিদার মৌলিক কিতাবগুলোর স্তরে পৌঁছাতে বাধা দেয়, যেগুলো পড়ার জন্য ত্বলেবুল ইলমদের পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিশেষ করে আকিদার বিষয়গুলো পূর্বসূরি সালাফদের ব্যাখ্যার আলোকেই হতে হয়। এই কারণেই শাইখ সালেহ আলুশ শাইখের মতো কিছু সমসাময়িক আলেম আহলুস সুন্নাহর আকিদা বর্ণনার ক্ষেত্রে এই কাসিদাটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না।
সোর্স: IslamQA ওয়েব প্রশ্নোত্তর। – https://islamqa.info/ar/answers/161853/نبذة-عن-نونية-القحطاني
📄 ‘নুনিয়াহ আল-কাহতানি’-তে পৃথিবী সমতল হওয়ার ব্যাপারে যে পঙক্তি এসেছে (যা সমতলবাদীরা ওহীর মত প্রচার করে) ‘তার ব্যাখায় শাইখ সালেহ আস-সুহাইমি হাফিজাহুল্লাহ বলেছেন,
“মনে হয়, রচয়িতা (কবী কাহতানি) রাহিমাহুল্লাহ যখন পৃথিবীর গোলাকার হওয়াকে অস্বীকার করেছিলেন, তখন পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার প্রমাণ বহনকারী কিছু ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণা তাঁর কাছে পৌঁছায়নি; যা বর্তমানে একটি স্বতঃসিদ্ধ (সর্বজনস্বীকৃত) বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আর শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) পৃথিবী গোলাকার হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের ইজমা বর্ণনা করেছেন।
পৃথিবীর গোলাকার হওয়াটা এর সমতল, স্থিতিশীল, সুগম ও বিস্তৃত হওয়ার এবং এর ওপর পর্বতমালা সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত থাকার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তবে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কথাটির বিষয়ে বলা যায়: এটি কুরআনের বাহ্যিক অর্থের পরিপন্থী। কুরআনের (বাহ্যিক অর্থের) ভাষ্যমতে পৃথিবী স্থির এবং সূর্য চলমান। আমাদের শাইখ, শাইখ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ’র এ বিষয়টি প্রমাণের ওপর একটি মূল্যবান পুস্তিকা রয়েছে।
আর এর গোলাকার হওয়ার বিষয়ে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এবং অন্যান্য আলেমগণ যা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ‘তা হলো: পৃথিবী দেখতে প্রায় ডিম্বাকৃতির মতো গোলাকার। তবে পৃথিবীর ব্যাপকতা, বিশালতা এবং আয়তনের কারণে মানুষের কাছে এটিকে সমতল মনে হতে কোনো বাধা নেই। এবং এর একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র রয়েছে, যার ওপর এটি স্থিতিশীল থাকে।”
📕 [আল-কুুতুফুদ দাওয়ানী ফী শারহি নূনিয়্যাতিল কাহতানী, পৃ. ৩৮২]
NOTE: শাইখ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ পৃথিবীকে স্থীর বললেও, এর ঘূর্ননে বিশ্বাস করা সম্পর্কে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন,
“যদি (পৃথিবীর ঘূর্ননের) এমন অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সেটির এমন ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর কম্পন (বা অস্থিরতা) বোঝায় না; এবং মানুষের ক্ষতি করে না এমন নড়াচড়া বা ঘূর্ণন আল্লাহর আয়াতে উল্লিখিত ‘মাইদ’ (পৃথিবীর কাঁপুনি বা দোদুল্যমানতা)-এর বিরোধী নয়। কিন্তু ‘মাইদ’-কে শুধু ক্ষতিকর কম্পন হিসেবে ব্যাখ্যা করা এবং বলা যে পৃথিবী ঘোরে ও নড়াচড়া করে কিন্তু কাঁপে না—এর জন্য প্রমাণের প্রয়োজন।
যে ব্যক্তি এই বিষয়ে (পৃথিবীর ঘূর্ণনের বিষয়ে) নিশ্চিত হয়েছে, স্বচক্ষে দেখেছে এবং এটি বিশ্বাস করেছে, তাতে তার কোনো ক্ষতি নেই। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি এটি বুঝতে বা বিশ্বাস করতে পারে না এবং তার কাছে এর বিপরীত কোনো কিছু স্পষ্ট হয়নি, সে যদি নিজের স্থির থাকার বিশ্বাসকে সঠিক ও আল্লাহর কিতাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মনে করে, তবে সেই বিশ্বাসও তার কোনো ক্ষতি করবে না। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিশ্বাস রয়েছে। আল্লাহর কিতাব থেকে যার কাছে যা প্রতীয়মান হয়, সে তা বিশ্বাস করলে তাকে তিরস্কার করা যাবে না।
আর যে ব্যক্তি চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়েছে এবং নিশ্চিতভাবে জেনেছে যে, পৃথিবীর এমন একটি গতি আছে যা তার স্থিতিশীলতাকে অস্বীকার করে না—বরং এটি এমন একটি বিশেষ ধরনের ঘূর্ণন যা পৃথিবীর স্থির থাকার পরিপন্থী নয়, পর্বতমালার মাধ্যমে পেরেকবদ্ধ হওয়ার পরিপন্থী নয় এবং এটি যে দোদুল্যমান নয় তারও পরিপন্থী নয়—যে ব্যক্তি এটি নিশ্চিতভাবে জানে, হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে এবং নিজ চোখে দেখে বিশ্বাস করে, তার এই বিশ্বাসে কোনো দোষ নেই।” (কি চমৎকার ইনসাফপূর্ণ কথা)
শাইখের সম্পূর্ণ অডিও বক্তব্যটি শুনুন আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে।
https://t.me/globeearthbd/1777
সম্পূর্ণ আর্টিকেলটির PDF ফাইল ডাউনলোড করুন আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে এবং সমতলবাদীদের জবাবে আরও বিভিন্ন লেখনী পড়তে ভিজিট করুন আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটি।
▪️জাযাকুমুল্লাহ খাইরান ফা-ইন্নাল্লাহা শাকিরুন।



