আল্লাহ ও রাসুলের কুটুক্তিও কি আল্লাহর ইচ্ছায় হয়? আল্লাহ কি শাতিমের জন্য নিজে যথেষ্ট না?
সূরা তাকবীর আয়াত ২৯ ﴾ وَمَا تَشَاؤُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ) "তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, আল্লাহ-সমস্ত জগতের প্রতিপালক-ইচ্ছা না করলে।"প্রশ্ন ১ আল্লাহরে যারা কটুক্তি করলো বা করে এটি কি আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতিতে হয়? প্রশ্ন ২ যদি অনুমতিতে হয় তাহলে আল্লাহ এমন সম্মতি এলাও করেন কেন? প্রশ্ন ৩ যদি তিনি নিজেই এলাও করেন তাহলে এই নাটকবাজির দরকার টা কি?
আল্লাহ বিদ্রোপকারীদের মোকাবিলায় আমি যথেষ্ট )نَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِثِينَ) সুরা হিজর ৯৫প্রশ্ন ৪ আল্লাহ কি তারে কটুক্তির শাস্তি নিজে দিতে অক্ষম? তাহলে মানুষের সাহায্য কেন প্রয়োজন? মানুষ যদি বিচার করে তাহলে আল্লাহর ক্ষমতা মানুষের চেয়ে দুর্বল প্রমাণিত হয়।
আপনার ইচ্ছে আল্লাহ ইচ্ছের অধীন।
আল্লাহ আপনাকে করতে দিচ্ছে, আপনাকে বাঁধা দিচ্ছে না, এটাই আল্লাহ ইচ্ছে, আল্লাহ চাইলে আপনাকে বাঁধা দিতে পারেন, হয়তো কখনো দেন আর কখনো দেন না এটাই আল্লাহর ইচ্ছা, আল্লাহ কখনো আপনার সামনে হক স্পষ্ট করে দেন এটাই আল্লাহর ইচ্ছা, কখনো হেদায়েত দেন না এটাই আল্লাহর ইচ্ছা, আপনি দুনিয়ায় এসেছেন এটাই আল্লাহ ইচ্ছা, আপনাকে প্রয়োজন মত ফ্রি উইল দিয়েছেন তিনি এটাই আল্লাহর ইচ্ছা, সে অনুযায়ী কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছে এটাই আল্লাহর ইচ্ছা, সামর্থ্য দিয়েছেন এটাই আল্লাহর ইচ্ছা, উপকরণ দিয়েছেন এটাই আল্লাহর ইচ্ছা, আপনাকে আপনার ইচ্ছে মত ভন্ডামি, অহংকার, কুযুক্তি, অযুক্তি, বলদামি, প্রতিবন্ধিগীরী, ঢিলামি ইত্যাদি ইত্যাদি করতে দিচ্ছেন এটাই আল্লাহর ইচ্ছা, বাঁধা দিচ্ছেন না এটাই আল্লাহর ইচ্ছা।
সেহেতু আপনার ইচ্ছা কাজ করতো না বা কার্যকর হতে পারতো না যদি না আল্লাহ ইচ্ছা না করতেন। আল্লাহ ইচ্ছা করেছেন বিধান আপনি দুনিয়ায় এসে এত কিছু করতে পারছেন। আশা করি এই বিষয়টি পরিষ্কার হলো।
আর আল্লাহ আখিরাত এদের জন্যই তৈরী করে রেখেছেন যারা সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও অন্যায় করেছে আল্লাহ তাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন সেটার অপব্যবহার করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
"আর সেখানে তারা আর্তনাদ করে বলবে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করে দিন, আমরা পূর্বে যে আমল করতাম, তার পরিবর্তে আমরা নেক আমল করব’।
(আল্লাহ বলবেন) ‘আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি যে, তখন কেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল। কাজেই তোমরা আযাব আস্বাদন কর, আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।" [সুরা ফাতির, আয়াত ৩৭]
অন্য আয়াতে বলেন,
"নিশ্চয় যারা হিদায়াতের পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পর তাদের পৃষ্টপ্রদর্শনপূর্বক মুখ ফিরিয়ে নেয়, শয়তান তাদের কাজকে চমৎকৃত করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দিয়ে থাকে। এটি এ জন্য যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা যারা অপছন্দ করে। তাদের উদ্দেশ্যে, তারা বলে, ‘অচিরেই আমরা কতিপয় বিষয়ে তোমাদের আনুগত্য করব’। আল্লাহ তাদের গোপনীয়তা সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন। অতঃপর তাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন ফেরেশতারা তাদের মুখমণ্ডল ও পৃষ্ঠদেশসমূহে আঘাত করতে করতে তাদের জীবনাবসান ঘটাবে? এটি এ জন্য যে, তারা এমন সব বিষয়ের অনুসরণ করেছে যা আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করেছে এবং তারা তাঁর সন্তোষকে অপছন্দ করেছে। ফলে আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।" [সুরা মুহাম্মদ আয়াত ২৫-২৮]
আল্লাহ এই অপব্যবহারের শাস্তি উল্লেখ করেছেনই, অসংখ্য আয়াত ও হাদিস আছে এই নিয়ে।
এখন আমাকে একজন ক্ষমতা দিল, নিষেধও করলো যেন ক্ষমতার অপব্যবহার না করি, এই এই কাজ না করি, এই এই কাজ যেন করি, নিষিদ্ধ কাজ করলে আমার কঠিন শাস্তি হবে, কিন্তু আমি তা জানি তারপরও অপরাধ করলাম, এখন কি এতে যে আমাকে ক্ষমতা দিল সে অপরাধী হিসেবে গন্য হবে? যে বন্ধুকের লাইসেন্স দেয় সে অপরাধী হয় নাকি যে লাইসেন্স পেয়ে নীতিমালা মান্য না করে অপরাধ করে সে অপরাধী হয়? এসব কমন সেন্সের বিষয়। সেহেতু এখানে আল্লাহকে দোষ দেওয়া সেই যে এতক্ষণ বললাম আল্লাহ আপনাকে বলদামি, ঢিলামি করতে দিচ্ছেন বাঁধা না দিয়ে সেটাই।
আর দুনিয়ায় আল্লাহর এসে সরাসরি বিচার করবেন এই ভাগ্য এখনো কারো হয় নি। কারণ যেদিন আল্লাহ বিচার করবেন সেদিন আর সুযোগ পাবে না কেউ। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“বিচারের দিনটি কি, তা কিসে আপনাকে জানাবে? আবার জিজ্ঞাসা করি, কিসে আপনাকে জানাবে বিচারের দিনটি কি? তাহা এমন একটি দিন, যে দিন কেউই নিজের রক্ষার জন্য কোনই সাহায্যকারী পাবে না, এবং সমগ্র ব্যাপার নিরঙ্কুশ ভাবে আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত হবে” [সূরা আল-ইনফিতার: ১৭-১৯]
আজকের দিনে আল্লাহ লোকদের প্রকৃত কর্মফল পূর্ণ করে দিবেন” [সূরা আন-নূর: ২৫]
তারা কি এরই অপেক্ষা করছে যে, তাদের নিকট ফিরিশতাগণ হাযির হবে কিংবা তোমার রব উপস্থিত হবে অথবা প্রকাশ পাবে তোমার রবের নিদর্শনসমূহের কিছু? যেদিন তোমার রবের নিদর্শনসমূহের কিছু প্রকাশ পাবে, সেদিন কোনো ব্যক্তিরই তার ঈমান উপকারে আসবে না। যে পূর্বে ঈমান আনে নি কিংবা যে তার ঈমানে কোনো কল্যাণ অর্জন করে নি। বলুন, তোমরা অপেক্ষা কর, আমরাও অপেক্ষা করছি। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত ১৫৮]
তাই আল্লাহ দুনিয়াতে আইন দিয়েছেন, সেটার অনুসরণ করে বিচার বিধান কার্যকর করার হুকুম দিয়েছেন। এতে যদি কেউ মনে করে এটা আল্লাহর ক্ষমতার লিমিটেশন বুঝায় তাহলে সে এই দুনিয়ায় হয়তো ব্রেন ব্যবহার করতেই ভুলে গেছে।
তিনি বোধহয় আল্লাহর হাকিমিয়্যাহ বা তাওহীদুল হাকিমিয়্যা সম্পর্কে কোন কিছু পড়েন নাই কখনো। অথচ আল্লাহর হাকিমিয়্যাহ নিয়ে পড়া কোন ব্যাক্তির দ্বারা এমন গন্ড, মুর্খ, চরম বলদা, ব্রেনলেস, প্রতিবন্ধি মার্কা অজ্ঞতাপুর্ণ আর্গুমেন্ট পাওয়ার কথা না।
যাইহোক আল্লাহর হাকিমিয়্যা বলতে সৃষ্টি যার হুকুমও শুধুমাত্র তার, অর্থাৎ হুকুম শুধু আল্লাহর চলবে, আইন আল্লাহর চলবে, বিচার ব্যবস্থা আল্লাহর চলবে। এই নিয়ে ওলামাগণের বহু আলাপ আলোচনা রয়েছে আপনারা খুজলেই পাবেন ইনশাআল্লাহ।
সেহেতু আল্লাহ বলেছেন তিনি যথেষ্ট, আবার একই সাথে আল্লাহ আইনও দিয়েছেন। আল্লাহ কাফিরদের ষড়যন্ত্র সময়ে সময়ে নাস্তানাবুদ করেছেন, কিন্তু তাই বলে আমাদেরকে হাতের উপর হাত রেখে বসে থাকতে বলেন নাই, আমাদেরও চেষ্টা করতে বলেছেন।
আল্লাহ কোররআন ও হাদিসে কোথাও বলেন নি তিনি যথেষ্ট তাই সেই ব্যক্তির উপর আইন প্রয়োগ করা নিষিদ্ধ৷ এখন এই যথেষ্ট হওয়া মানেতো আখিরাতও হতে পারে! আমরাতো জানি না, তাই আমাদেরকে যেহেতু আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচার করার হুকুম দিয়েছেন ও আল্লাহ আইন দিয়েই বিচার করাকে ফরজ করেছেন সেহেতু সেটা করা আমাদের উপর বাধ্যতামুলক দায়িত্ব, তাই আমরা সেই অনুসারেই বিচার করবো, আল্লাহ যথেষ্ট তাই বিচার করতে হবে না এটাতো আল্লাহ বলেন নাই।
ইবনে কাসির বলেন,
"এবং আমরা লোহাকে রাদি‘ (নিবারক) বানিয়েছি তার জন্য যে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে এবং হুজ্জত কায়েম হওয়ার পরও তার বিরোধিতা করে।" এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত লাভের পর মক্কায় তেরো বছর অবস্থান করেছেন; তাঁর প্রতি মক্কী সূরাসমূহ নাযিল হয়েছে, যা সবই মুশরিকদের সাথে তর্ক-বিতর্ক, তাওহীদের স্পষ্ট বর্ণনা, দলীল-প্রমাণ এবং নিদর্শনসমূহ নিয়ে গঠিত। অতঃপর যখন আল্লাহর শরী‘আতের বিরোধিতাকারীদের উপর হুজ্জত পুরোপুরি কায়েম হয়ে গেল, তখন তিনি তাদেরকে হিজরতের নির্দেশ দিলেন এবং কুরআনের বিরোধিতাকারী, এর প্রতি মিথ্যারোপকারী ও একগুয়েভাবে বিরোধিতাকারীদের গর্দান ও মাথা কাটার জন্য তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিলেন। (ইবন কাসীর: ৪/৩১৫)
তারপরও এখন কেউ যদি বলে কোরআনে আল্লাহর যথেষ্ট হওয়া বলা এবং আবার সেটার শাস্তিও নির্ধারণ করা পরষ্পরের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ তাহলে এটা হবে তার অজ্ঞতা।
আপনি কিভাবে বিরোধ বলবেন? কোরআন নাজিলের প্রথম দিকের আয়াত এটা আর আল্লাহ আকিমিয়্যাহ সংক্রান্ত আয়াতগুলো পরের, এবং চুরান্ত। তাহলে আপনি কি করে বিরোধ প্রমাণ করবেন?
খালি এটা নয়, আল্লাহ তাদের শাস্তি আখিরাতে রেখেছেন, আর দুনিয়ায় তার শাস্তি আমাদেরকে করার বিধান দিয়েছেন।
আপনি এখানে বিরোধ কিভাবে প্রমাণ করবেন?