ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাব

কুরআনের আয়াত বকরী খেয়ে ফেলা মিথের বাস্তবতা

ইবনে মাজাহয় বর্ণিত হাদিস “ছাগলের কুরআনের পৃষ্ঠা খেয়ে ফেলা” সংক্রান্ত অভিযোগের রদ্দ।

ভূমিকা

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।

আল্লাহ আযওয়াজ্জাল্লা তার কিতাব নাযিল করছেন, তিনি ওয়াদা করেন যে উক্ত কিতাব তিনি সংরক্ষণ করবেন। এইটা এমন এক ওয়াদা যা ইতিপূর্বেকার কোন আসমানি বার্তার প্রেরক করেন নাই। আল্লাহ আযওয়াজাল্লা সূরাহ হীজরে বলেন,

أنا نحن نزلنا الذكر وأنا له لحافظون

“নিশ্চয় আমিই এই উপদেশ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।” (সূরা হিজর, আয়াত ৯)

সহীহ মুসলিমে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর উদ্দেশ্যে আল্লাহ আযওয়াজাল্লাহর কালাম, ইমাম মুসলিম তার হাদিসে কুদসিতে সংরক্ষণ করেন। যেখানে আল্লাহ আযওয়াজাল্লা বলেন:

وانزلت عليك كتابا لا يغسله الماء تقرؤه نائما ويقظان

“আমি আপনার উপর এমন একটি কিতাব নাযিল করেছি, যাকে পানি ধুয়ে মুছে ফেলতে পারে না; আপনি তা নিদ্রায় ও জাগরণে পাঠ করবেন।”[1] Sahih Muslim 2865a

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী আদম ইবনে হাবশী এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলে:

> وقال القرطبي – رحمه الله: قوله : “وأنزلت عليك كتابا لا يغسله الماء”؛ أي: يسرت تلاوته، وحفظه، فخف على الألسنة، ووعته القلوب، فلو غسلت المصاحف لما انغسل من الصدور، ولما ذهب من الوجود، ويشهد لذلك قوله تعالى : {إنا نحن نزلنا الذكر وإنا له لحافظون (۹)) [الحجر: ] ، وقوله : ولقد يسرنا القرآن للذكر فهل من مدكر (۱۷)) [القمر: ۱৭]، وفي الإسرائيليات أن موسى – عليه السلام – قال: يا رب إني أجد أمة تكون أناجيلها في صدورها، فاجعلهم أمتي، قال: تلك أمة محمد -صلى الله عليه وسلم

আল-কুরতুবী (রা) (মৃ. ৬৭১ হি.) বলেছেন: আল্লাহর বাণী: “এবং আমি তোমার প্রতি এমন এক কিতাব নাজিল করেছি, যা পানি ধুইতে পারে না” – এর অর্থ হলো, আমি এর তিলাওয়াত ও সংরক্ষণ সহজ করে দিয়েছি, ফলে এটি জিহ্বার জন্য হালকা হয়েছে এবং অন্তর তা ধারণ করেছে। সুতরাং যদি কুরআনের লিখিত কপিগুলো পানিতে ধোয়া হয়, তবুও তা হৃদয় থেকে ধুয়ে যাবে না এবং অস্তিত্ব থেকে বিলুপ্ত হবে না।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী সাক্ষ্য দেয়: “নিশ্চয় আমিই এই কুরআন নাজিল করেছি এবং নিশ্চয় আমিই এর সংরক্ষক” (সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯) এবং “আর নিশ্চয় আমি কুরআনকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি, কাজেই আছে কি কেউ উপদেশ গ্রহণকারী?” (সূরা আল-কামার, আয়াত: ১৭)।

ইসরাঈলীয় বর্ণনায় আছে যে, মূসা (আ) বলেছিলেন: হে আমার রব! আমি এক উম্মতকে পাই, যাদের ইঞ্জিলসমূহ (অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব) তাদের অন্তরে থাকে, তাদেরকে আপনি আমার উম্মত বানিয়ে দিন। আল্লাহ বললেন: সেই হলো মুহাম্মদ (ﷺ)-এর উম্মত।[2] كتاب البحر المحيط الثجاج في شرح صحيح الإمام مسلم بن الحجاج 44/64

এরকম বহু দলিল ও বাস্তব ইতিহাস, কুরআনের তাওয়াতুর ইত্যাদি প্রমাণাদি সাক্ষ্য বহন করে যে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তিনি যেভাবে চাইছেন তা সংরক্ষিত আছে। তার ক্ষমতাবলে।

যেভাবে চাইছেন বলেন কেন বললাম? এর পিছনে অন্য কারণ আছে, আল্লাহ আযওয়াজ্জালাহ সূরাহ বাকারাহর ১০৬ নং বলেন:

ما ننسخ من آية أو ننسها نأت بخير منها أو مثلها ألم تعلم أن الله على كل شيء قدير

“আমি কোনো আয়াত রহিত করলে বা ভুলিয়ে দিলে, তা থেকে উত্তম অথবা তার অনুরূপ আয়াত নিয়ে আসি। তুমি কি জান না যে, নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান?”

এই আয়াতে বলা নাসখ হওয়া বা রোহিত হওয়া, তা তুলে নেওয়া বা ভুলিয়ে দেওয়া, এগুলা ইসলামের প্রথম যুগের সাহাবি, তাবেয়ী, তাবেয়িন, সালাফ ও ইমামদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত বিষয়। এটা হঠাৎ নব্য কোন উদ্ভাবিত বিষয় না। যেমনটা কুরআনের ক্বিরাত সংরক্ষণকারী ক্বারী সাহাবি উবাই ইবনে কাব (রা) বর্ননা করেন :

أن أبي بن كعب رضي الله عنه قال: أن سورة الاحزاب كانت تعادل سورة البقرة ، أو هي أطول من سورة البقرة

“নিশ্চয়ই উবাই ইবন কাব (রা.) বলেছিলেন: ‘সূরাহ আল-আহযাব (আমাদের যুগে) সূরাহ আল-বাকারাহর সমতুল্য ছিল, বরং এটি সূরাহ আল-বাকারাহ থেকে দীর্ঘতর ছিল।”[3] كتاب التعليقات الحسان على صحيح ابن حبان 6/426

ইবনে উমার (রা) এর বর্ণনা:

حدثنا سعيد، قال: نا إسماعيل بن إبراهيم، عن أيوب، عن نافع عن ابن عمر قال: لا يقولن أحدكم أخذت القرآن كله، وما يدريه ما كله، قد ذهب منه قرآن كثير، ولكن يقول: أخذنا ما ظهر منه

সাঈদ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীম আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি আইয়ূব থেকে, তিনি নাফি’ থেকে, তিনি ইবনু উমর (রা.) থেকে যে, তিনি বলেছেন: তোমাদের কেউ যেন না বলে, ‘আমি পুরো কুরআন শিখেছি’। কারণ সে কীভাবে জানবে পুরো কুরআন কী? অথচ এর থেকে অনেক কুরআন (আয়াত) চলে গেছে। বরং সে যেন বলে, ‘এর যেটুকু প্রকাশ্য (বিদ্যমান) রয়েছে আমরা সেটুকু শিখেছি’। এর সনদ সহীহ।[4] كتاب سنن سعيد بن منصور – بداية التفسير – ت الحميد 2/432

সাহাবিদের সাক্ষ্য হতে প্রতীয়মান যে কুরআনের আয়াত তুলে নেওয়া ও চলে যাওয়া অতি স্বাভাবিক বিষয় ছিল। এই রোহিতকরণ বা নাসখের প্রকার জানতে নিচের আর্টিকেল পড়তে পারেন। – https://www.hadithbd.com/books/email/?id=9455

এখন এতসব আলোচনার কারণ হল, ইবনে মাজাহর একটা হাদিস। আলোচনার আগে আপনাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে কুরআন এবং হাদিস যেটাই বলেন না কেন, এই উভয়ের মূল সংরক্ষণ পদ্ধতি ছিল মুখাস্তকরণ, বা মেমোরাইজেশনের মাধ্যমে। তারা এর সংরক্ষণের জন্য কখনই লেখনির উপর নির্ভরশীল ছিল না। যেমন সুনানে দারিমিতে সাহাবি আবু উমামাহ বাহিলির বক্তব্যে পাওয়া যায় যে তারা কখনই লিখিত কোন বইয়ের উপর নির্ভরশীল ছিলেন না।

أخبرنا الحكم بن نافع، أنبأنا حريز، عن شرحبيل بن مسلم الخولاني، عن أبي أمامة، أنه كان يقول: «اقرءوا القرآن ولا تغرنكم هذه المصاحف المعلقة، فإن الله لن يعذب قلبا وعى القرآن»

تعليق المحقق إسناده صحيح

৩৩৬২ – হাকাম ইবনু নাফি’ আমাদেরকে জানিয়েছেন, তিনি বলেন: হুরায়জ আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি শুরাহবীল ইবনু মুসলিম আল-খাওলানী থেকে, তিনি আবু উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলতেন: “তোমরা কুরআন পড়া (মুখস্থ করো ও তিলাওয়াত করো) এবং এসব ঝুলানো মুশাফ (লিখিত কপি) যেন তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে। নিশ্চয় আল্লাহ সেই হৃদয়কে শাস্তি দেবেন না যে হৃদয় কুরআন ধারণ করেছে (মুখস্থ করেছে)।”[5] كتاب مسند الدارمي – ت حسين أسد 4/2092

কোরআনের পৃষ্ঠা খেয়ে ফেলা নিয়ে ইবনে মাজাহর হাদিস

এখন আসি ইবনে মাজাহর হাদিসের আলোচনায়। হাদিসটা আমরা দুইটা এংগেলে আলোচনা করব। এক যারা হাদিসটা সহীহ মনে করেন না, আর দুই যারা হাদিসটা গ্রহণ করেন। উভয়ের দৃষ্টিকোণেই আমরা আলোচনা আগাব।

হাদিসটি সহিহ না হওয়ার মত

حَدَّثَنَا أَبُو سَلَمَةَ يَحْيَى بْنُ خَلَفٍ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْأَعْلَى عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَقَ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي بَكْرٍ عَنْ عَمْرَةَ عَنْ عَائِشَةَ و عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْقَاسِمِ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ لَقَدْ نَزَلَتْ آيَةُ الرَّجْمِ وَرَضَاعَةُ الْكَبِيرِ عَشْرًا وَلَقَدْ كَانَ فِي صَحِيفَةٍ تَحْتَ سَرِيرِي فَلَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَتَشَاغَلْنَا بِمَوْتِهِ دَخَلَ دَاجِنٌ فَأَكَلَهَا.

আয়েশা (রা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই রজমের আয়াত (অর্থাৎ ব্যভিচারী বিবাহিত নর-নারীর শাস্তি সম্পর্কে আয়াত) ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জন্য দশবার দুধপান (সম্পর্ক স্থাপনের বৈধতা সংক্রান্ত বিধান) নাযিল হয়েছিল। আর তা আমার বিছানার নিচে একটি পৃষ্ঠায় লিখিত ছিল। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকাল করলেন এবং আমরা তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি দাজিন (গৃহপালিত পশু) প্রবেশ করে তা খেয়ে ফেলল।”[6]সূত্র: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৯৪৪

হাদিসটার সনদ বিতর্কিত। সনদের ব্যাপারে আমরা আলোচনা দেখি, হাদিসটা কেউ হাসান বলেন, কেউ দুর্বল। যারা দুর্বল বলেন তাদের পক্ষের যুক্তি হলো:

মুসনাদে আবু ইয়ালার মুহাক্কিক সাঈদ ইবনে মুহাম্মাদ আস-সানআরী বলেন,

٤٥٨٧ – منكر: هذا حديث منكر، وله إسنادان:
فالأول: يرويه ابن إسحاق عن عبد الله بن أبى بكر بن محمد بن عمرو بن حزم عن عمرة بنت عبد الرحمن عن عائشة به …
أخرجه ابن ماجه [١٩٤٤]، وأحمد [٦/ ٢٦٩]، والدارقطنى في “سننه” [٤/ ١٧٩]، وفى “الأفراد” [رقم ٦٣٩٠/ أطرافه] وابن الجوزى في “نواسخ القرآن” [ص ١٠٦]، والبيهقى في “المعرفة” [رقم ٤٩٥٩]، والطبرانى في “الأوسط” [٩/ رقم ٧٨٠٥]، والبزار في “مسنده” كما في “تخريج الكشاف” للزيلعى [٣/ ٩٤]، ومن طريقه أبو محمد الفارسى في “المحلى” [١١/ ٢٣٥ – ٢٣٦]، وغيرهم من طريقين عن محمد بن إسحاق بن يسار بإسناده به نحوه …. قال الداقطنى: “تفرد به محمد بن إسحاق عن عبد الله بن أبى بكر عن عمرة”.
قلتُ: ومثل ابن إسحاق إذا صرح بالسماع يُحْتَمل له التفرد إن شاء الله، لكن ذلك فيما لم يُنْكَر عليه، أو لم يخالفه فيه من هو أثبت وأوثق منه وأجل قدرًا.

মুনকার: এই হাদিসটি মুনকার (পরিচিত হাদিসের বিপরীত ও দুর্বল)। এর দুটি সনদ রয়েছে:

প্রথম সনদ: ইবনু ইসহাক এটি বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনু আবি বকর ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আমর ইবনু হাযম থেকে, তিনি উমরাহ বিনত আবদুর রহমান থেকে, তিনি আয়িশাহ (রা.) থেকে – এভাবে …

এটি বর্ণনা করেছেন: ইবনে মাজাহ [১৯৪৪], আহমাদ [৬/২৬৯], দারাকুতনি তাঁর “সুনান” [৪/১৭৯] ও “আল-আফরাদ” [৬৩৯০ নম্বর, তার আওয়ালে], ইবনুল জাওজি “নাওয়াসিখুল কুরআন” [পৃ. ১০৬], বায়হাকি “আল-মা’রিফা” [৪৯৫৯], তাবারানি “আল-আওসাত” [৯/৭৮০৫], বাজ্জার তাঁর “মুসনাদ”-এ (যেমনটি যাইলাঈ “তাখরিজুল কাশশাফ” [৩/৯৪] এ উল্লেখ করেছেন), এবং তাঁর সূত্রে আবু মুহাম্মদ আল-ফারসি “আল-মুহাল্লা” [১১/২৩৫-২৩৬]-এ, এবং অন্যান্য- সবাই মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক ইবনু ইয়াসারের দুই পথ থেকে তার সনদে এ রকম বর্ণনা করেছেন।

দারাকুতনি বলেন: “এতে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক একক হয়েছেন – আবদুল্লাহ ইবনু আবি বকর থেকে, তিনি উমরাহ থেকে।”

আমি বলি: ইবনু ইসহাকের মতো ব্যক্তি যদি শ্রবণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ তার একক হওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে তা সেসব ক্ষেত্রে যেখানে তার ওপর আপত্তি নেই, অথবা যেখানে তার বিপরীতে তার চেয়ে অধিক প্রামাণ্য, বিশ্বস্ত ও সম্মানিত কেউ বিরোধিতা করেনি।

= وهذا الحديث قد خالفه فيه غريمه شيخ الإسلام، وعالم المدينة، وجبل الحفظ والإتقان، أعنى الإمام النجم مالك بن أنس، خالفه في متنه، فرواه عن عبد الله بن أبى بكر عن عمرة عن عائشة أنها قالت: (كان فيما أنزل من القرآن عشر رضعات معلومات يحرمن، ثم نسخن بخمس رضعات معلومات؛ فتوفى رسول الله – صلى الله عليه وسلم – وهو فيما يقرأ من القرآن).
هكذا أخرجه في “الموطأ” [١٢٧٠]- واللفظ له – ومن طريقه مسلم [١٤٥٢]، وأبو داود [٢٠٦٢]، والترمذى [عقب رقم ١١٥٠]، والنسائى [٣٣٠٧]، وجماعة كثيرة.
وتوبع عبد الله بن أبى بكر على نحوه عن عمرة: تابعه يحيى بن سعيد الأنصارى والقاسم بن محمد كما ذكرناه في “غرس الأشجار” ورواية القاسم تأتى قريبًا؛ وهذا اللفظ الماضى هو المحفوظ بلا تردد؛ ولا يحتمل من ابن إسحاق مخالفة مالك أصلًا، وبهذا أعله أبو محمد بن قتيبة في “تأويل مختلف الحديث” [ص ٣١٤]، وجزم بغلط ابن إسحاق في لفظه، ولم يفطن الإمام الألبانى إلى تلك المخالفة البتة! ومشى على ظاهر حديث ابن إسحاق، وحسَّنه في “صحيح ابن ماجه”.
وقبله قال أبو محمد الفارسى عقب روايته في “محلاه”: (وهذا حديث صحيح) ثم شرع يدرأ نكارة متنه، وهذا غلط منه عندنا لا ريب فيه، ولسنا نجادله في نكارة الحديث الآن، ولكن كيف غاب عنه مخالفة مالك لابن إسحاق فيه، أخدع هو الآخر بذكر ابن إسحاق سماعه فيه؟! ثم متى كانت المخاصمة مع أبى محمد في علل الأحاديث تجدى نفعًا؟! وهو الذي قد نسف أكثرها نسفًا في “إحكامه” وفى مواضع من “محلاه” بعبارات غليظة قد رددناها عليه في مكان آخر، ولعلنا نجمعها له مع المناقشة في حاشيتنا الكبرى المسماة: (ياقوت البحار على شواطئ المحلى بالآثار) الذي نأمل أن نكون خدمنا بها “المحلى” خدمة لم يخدم بمثلها قط، إن شاء الله، أعاننا الله على التهيؤ والفراغ له قريبًا إن شاء الله.
ثم إن أبا محمد … لا أدرى، تناقض أم ماذا؟! فإنى وجدته قد قال في إحكامه [٤/ ٤٧٩]: “وقد غلط قوم غلطًا شديدًا، وأتوا بأخبار ولدها الكاذبون، والملحدون، منها أن الداجن أكل صحيفة فيها آية متلوة، فذهب البتة منها، … ” ثم قال: “وهذا كله ضلال نعوذ باللَّه منه، ومن اعتقاده … “.
ثم طفق في إنكار هذا الحديث إنكارًا شديد جدًّا، لا يحتمله ابن إسحاق المتفرد به أصلًا، =

আর এই হাদিসে তার প্রতিদ্বন্দ্বী শাইখুল ইসলাম, মদিনার আলিম, হিফজ ও ইতকানের পাহাড় – অর্থাৎ ইমাম মালিক ইবনু আনাস – তার বিপরীত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি ইবনু ইসহাকের বিরোধিতা করেছেন মতনের ক্ষেত্রে। কারণ মালিক বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনু আবি বকর থেকে, তিনি উমরাহ থেকে, তিনি আয়িশাহ (রা.) থেকে যে, তিনি বলেছেন:

“কুরআনে যা নাযিল হয়েছিল তার মধ্যে ছিল – দশটি নির্দিষ্ট দুগ্ধপান (রাদা’আত) হারাম করে, পরে সেটি পাঁচটি নির্দিষ্ট দুগ্ধপান দ্বারা রহিত (নস্খ) করা হয়। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মৃত্যু হয়েছিল তখনও এ আয়াত (অর্থাৎ পাঁচ রাদা’আতের আয়াত) কুরআনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে তিলাওয়াত হতো।”

এভাবে তিনি এটি “মুওয়াত্তা” [১২৭০] – এ বর্ণনা করেছেন – এবং এটাই তার শব্দ – এবং তার সূত্রে মুসলিম [১৪৫২], আবু দাউদ [২০check২], তিরমিজি [১১৫০-এর পর], নাসাঈ [৩৩০৭] ও আরও অনেকে বর্ণনা করেছেন।

আবদুল্লাহ ইবনু আবি বকরের ওপর উমরাহ থেকে এ রকম বর্ণনায় আরও সমর্থন এসেছে: ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-আনসারি ও কাসিম ইবনু মুহাম্মদ তাঁকে সমর্থন করেছেন, যেমনটি আমরা “গারসুল আশজার”-এ উল্লেখ করেছি। আর কাসিমের বর্ণনা শীঘ্রই আসছে। এই পূর্ববর্তী শব্দটিই সংরক্ষিত (মাহফুজ) – এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইবনু ইসহাকের পক্ষে মালিকের বিরোধিতা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এই কারণেই আবু মুহাম্মদ ইবনু কুতাইবা “তাআউইলু মুখতালিফিল হাদিস” [পৃ. ৩১৪] -এ হাদিসটিকে দুর্বল (‘ইল্লাত’) বলেছেন এবং স্পষ্টভাবে বলেছেন যে ইবনু ইসহাক তার শব্দায়নে ভুল করেছেন। আর ইমাম আলবানি এই বিরোধিতার বিষয়টি মোটেই লক্ষ্য করেননি! তিনি ইবনু ইসহাকের হাদিসের আপাত অর্থের ওপর চলে গেছেন এবং “সহীহ ইবনে মাজাহ”-এ হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।

এর আগে আবু মুহাম্মদ আল-ফারসি তার “মুহাল্লা”-তে বর্ণনার শেষে বলেছেন: “এটি সহীহ হাদিস” – অতঃপর তিনি এর মতনের মুনকার (অগ্রহণযোগ্য) দিকটি দূর করার চেষ্টা করেছেন। আমাদের মতে এটি তার স্পষ্ট ভুল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা এখন তার সাথে হাদিসের মুনকার হওয়া নিয়ে বিতর্কে যাচ্ছি না, কিন্তু প্রশ্ন হলো – কীভাবে তার কাছে মালিকের ইবনু ইসহাকের বিরোধিতার বিষয়টি গোপন রইল? তিনিও কি ইবনু ইসহাকের ‘শ্রবণ’ উল্লেখের কারণে ধোঁকা খেয়েছেন? আর আবু মুহাম্মদের সাথে হাদিসের ‘ইল্লাত’ (দোষ) নিয়ে বিতর্ক কখনো লাভজনক হয়? তিনি তো তার “ইহকাম”-এ এবং “মুহাল্লা”-র অনেক জায়গায় কঠোর ভাষায় প্রায় সবগুলোই উড়িয়ে দিয়েছেন – যার জবাব আমরা অন্য জায়গায় দিয়েছি। সম্ভবত আমরা সেগুলো আমাদের বড় হাশিয়ায় (টীকায়) যা “ইয়াকুতুল বিহার আলা শাওয়াতিল মুহাল্লা বিল আসার” নামে – তাতে তার জন্য একত্র করব। আমরা আশা করি যে, এর মাধ্যমে আমরা “মুহাল্লা”-র এমন সেবা করতে পারব যা আর কখনো হয়নি, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের তা প্রস্তুত ও সম্পন্ন করার তাওফিক দান করুন।

অতঃপর আবু মুহাম্মদ… আমি জানি না, এটি কি তার বিরোধিতা না অন্য কিছু? কারণ আমি দেখেছি তিনি তার “ইহকাম” [৪/৪৭৯]-এ বলেছেন:

“কিছু লোক চরম ভুল করেছে এবং মিথ্যাবাদী ও নাস্তিকরা এমন সব বর্ণনা নিয়ে এসেছে – যেমন এই বর্ণনা যে, একটি গৃহপালিত পশু একটি সহীফা খেয়ে ফেলেছিল যাতে একটি তিলাওয়াতকৃত আয়াত ছিল, ফলে তা পুরোপুরি চলে গেছে… এ সবকিছুই গোমরাহী, আমরা আল্লাহর কাছে এর থেকে আশ্রয় চাই এবং এসব বিশ্বাস থেকেও…”

অতঃপর তিনি এই হাদিসটিকে এত কঠোরভাবে অস্বীকার করতে থাকেন যে, ইবনু ইসহাকের একক বর্ণনা মোটেও তা সহ্য করতে পারে না-

= لكن عادة أبى محمد في زيادة التشنيع والتهويل ربما كانت أحيانًا من قلة علمه بدليل المخالف أحيانًا، أو لضعف حجته هو في مكان آخر.
فنحن هنا: نجزم بخطأ ابن إسحاق في لفظ الحديث، ولا بأس بإطلاق النكارة عليه، أما أن نصفه بكونه خبرًا ولده الكاذبون والملحدون وأضرابهم، فهذه مجازفة بعيدة الغور، بل جرأة عجيبة لا تليق إلا بأبى محمد وحسب، وقد ناقشناه طويلًا في “غرس الأشجار”.
وابن إسحاق ما يسعنا إلا الاعتراف بإمامته في فنه وهو “المغازى”، و”السير” وقد تجافاه قوم في الأحكام والحلال والحرام، والكلام فيه طويل الذيل كما هو معلوم. والرجل عندنا مقبول الرواية في كل شئ صرح فيه بالسماع، ما لم يخالفه من هو أثبت منه، أو يأت بما ينكر عليه، وقد خولف هنا كما مضى، ولا تنس قولة الذهبى عنه في كتابه “العلو” [ص ٤٤ – ٤٥]، (وابن إسحاق حجة في المغازى إذا أسند، وله مناكير وعجائب) فلنعدُّ هذا الحديث من عجائب مناكيره، أو من مناكير عجائبه.
وأما الإِسناد الثاني: فيرويه ابن إسحاق أيضًا عن عبد الرحمن بن القاسم بن محمد بن أبى بكر الصديق عن أبيه عن عائشة به نحوه …. كما عند المؤلف مقرونًا مع الإسناد الماضى [برقم ٤٥٨٨]، وهكذا أخرجه ابن ماجه [١٩٤٤]، والدارقطنى في “سننه” [٤/ ١٧٩]، والبيهقى في “المعرفة” [٤٩٥٩]، والبزار في “مسنده” ومن طريقه ابن حزم في “المحلى” [١١/ ٢٣٥ – ٢٣٦]، من طريقين عن ابن إسحاق بإسناده به.
قلتُ: وهذا إسناد ضعيف معلول؛ أما ضعفه: فلكون ابن إسحاق لم يذكر فيه سماعًا، وهو قبيح التدليس كابن جريج، وأما كونه معلولًا: فإن ابن إسحاق قد خولف في سنده ومتنه؛ خالفه إمام البصرة ومحدثها، هو ذا شيخ الإسلام حماد بن سلمة الإمام العلم، فرواه عن عبد الرحمن بن القاسم فقال: عن أبيه عن عمرة عن عائشة أنها قالت: (كان فيما أنزل الله من القرآن ثم سقط، لا يحرم إلا عشر رضعات أو خمس معلومات).
هكذا أخرجه ابن ماجه [١٩٤٢]- واللفظ له – والطبرانى في “الأوسط” [٣/ رقم ٢٦١١]، وأبو محمد الفاكهى في “حديثه” [رقم ٣١]، والطحاوى في “المشكل” [٥/ ١٤١]، وغيرهم من طرق عن حماد بن سلمة به …
قال الطبراني: “لم يرو هذا الحديث عن عبد الرحمن بن القاسم إلا حماد”. =

কিন্তু আবু মুহাম্মদের অভ্যাস হলো – মাঝে মাঝে তিনি বাড়াবাড়ি ও ভয়-ভীতি দেখান, যা কখনও কখনও হয় বিপক্ষের দলিল সম্পর্কে তাঁর অল্প জ্ঞানের কারণে, অথবা অন্য জায়গায় তাঁর নিজের দলিল দুর্বল হওয়ার কারণে।

তাই আমরা এখানে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিচ্ছি যে, ইবনু ইসহাক হাদিসের শব্দায়নে ভুল করেছেন, আর এটিকে ‘মুনকার’ বলে অভিহিত করতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এটাকে ‘মিথ্যাবাদী, নাস্তিক ও তাদের মতো লোকদের বানোয়াট খবর’ বলে বর্ণনা করা – এটি সুদূরপ্রসারী দুঃসাহসিকতা, বরং এক অদ্ভুত নির্লজ্জতা যা শুধু আবু মুহাম্মদের জন্যই শোভা পায়। আমরা “গারসুল আশজার”-এ তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছি।

ইবনু ইসহাক সম্পর্কে আমাদের অবস্থান: আমরা তাঁর ইমামত্ব স্বীকার করি – তাঁর বিশেষ ক্ষেত্রে, অর্থাৎ ‘মাগাযি’ ও ‘সিয়ার’-এ। কিন্তু ফিকহ, হালাল ও হারাম সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক আলিম তাঁর বর্ণনা গ্রহণে কঠোরতা দেখিয়েছেন। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা দীর্ঘ, যেমনটা জানা আছে। আমাদের মতে, তিনি সব বিষয়েই গ্রহণযোগ্য – যেখানে তিনি শ্রবণ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন – যতক্ষণ না তাঁর চেয়ে অধিক প্রামাণ্য কেউ তার বিরোধিতা করেন, অথবা তিনি এমন কিছু বর্ণনা করেন যা ‘মুনকার’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। আর এখানে তাঁর বিরোধিতা করা হয়েছে, যেমনটি আমরা দেখলাম।

আর জাহাবি তাঁর “আল-উলুউ” [পৃ. ৪৪-৪৫] বইতে ইবনু ইসহাক সম্পর্কে যা বলেছেন তা ভুলবেন না: “ইবনু ইসহাক মাগাযিতে প্রমাণ (হুজ্জাত), যখন তিনি সনদ বাঁধেন। কিন্তু তার বর্ণনায় অনেক মুনকার ও আশ্চর্যজনক (আজায়িব) বর্ণনা আছে।” সুতরাং আমরা এই হাদিসটিকে তার আশ্চর্যজনক মুনকারগুলোর মধ্যে গণ্য করব, অথবা তার মুনকার আশ্চর্যজনক বর্ণনার মধ্যে।

দ্বিতীয় সনদ: ইবনু ইসহাক একে আবদুর রহমান ইবনুল কাসিম ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আবি বকর সিদ্দিক থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি আয়িশাহ (রা.) থেকে – এ রকমভাবে বর্ণনা করেছেন যেমনটি গ্রন্থকার পূর্বের সনদের সঙ্গে [৪৫৮৮ নম্বরে] উল্লেখ করেছেন। আর এভাবেই এটি বর্ণনা করেছেন: ইবনে মাজাহ [১৯৪৪], দারাকুতনি তাঁর “সুনান” [৪/১৭৯], বায়হাকি “আল-মা’রিফা” [৪৯৫৯], বাজ্জার তাঁর “মুসনাদ”-এ, এবং তাঁর সূত্রে ইবনে হাযম “আল-মুহাল্লা” [১১/২৩৫-২৩৬] – সবাই ইবনু ইসহাক থেকে দুই পথে তার সনদে এটি বর্ণনা করেছেন।

আমি বলি: এই সনদটি দুর্বল ও ‘মা’লুল’ (দোষযুক্ত)।

দুর্বল হওয়ার কারণ: ইবনু ইসহাক এখানে ‘শ্রবণ’ উল্লেখ করেননি, আর তিনি ইবনু জুরাইজের মতো কুৎসিত তাদলিসকারী।

‘মা’লুল’ হওয়ার কারণ: ইবনু ইসহাকের সনদ ও মতন উভয় ক্ষেত্রেই বিরোধিতা করা হয়েছে। তার বিরোধিতা করেছেন বসরার ইমাম ও মুহাদ্দিস – শাইখুল ইসলাম হাম্মাদ ইবনু সালামাহ, সেই বিশিষ্ট ইমাম। তিনি বর্ণনা করেছেন আবদুর রহমান ইবনুল কাসিম থেকে, তিনি বলেন: (তিনি বর্ণনা করেছেন) তার পিতা থেকে, তিনি উমরাহ থেকে, তিনি আয়িশাহ (রা.) থেকে যে, তিনি বলেছেন:

“আল্লাহ যা কুরআন হিসেবে নাযিল করেছিলেন, তারপর তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে – সেসবের মধ্যে (বিধান হলো) – দশটি দুগ্ধপান ছাড়া কিছু হারাম করে না, অথবা পাঁচটি নির্দিষ্ট দুগ্ধপান (ছাড়া না)।”

এভাবে এটি বর্ণনা করেছেন ইবনে মাজাহ [১৯৪২] – এবং এটাই তার শব্দ – তাবারানি “আল-আওসাত” [৩/২৬১১], আবু মুহাম্মদ আল-ফাকিহি তাঁর “হাদিস” [৩১ নম্বর], তাহাবি “আল-মুশকিল” [৫/১৪১] এবং আরও অনেকে – সবাই হাম্মাদ ইবনু সালামার পথ থেকে।

তাবারানি বলেন: “এই হাদিসটি আবদুর রহমান ইবনুল কাসিম থেকে শুধু হাম্মাদ ইবনু সালামাই বর্ণনা করেছেন।”

= قلتُ: وحماد حجة فيما لم يخالف فيه؛ أو يأت بما ينكر عليه. وروايته هذه قد كشفت لنا غلط ابن إسحاق في سياق الحديث الماضى وسنده.
أما السياق: فقد مضى لفظ.
وأما سنده: فإن حماد د زاد فبه (عمرة) بين القاسم وعائشة، وقول حماد أشبه بالصواب كما يقول الدارقطنى في “علله” [٥/ ١٥٠ – ١٥١/ مخطوط] بل هو عين الصواب بلا جدال.
وأنَّى يلحق ابن إسحاق حماد بن سلمة؟! أفى إتقانه؟! أم ضبطه وحفظه؟! أم صلابته في السنة؟! أم شدته على أهل البدع؟! أم ماذا؟! لا أعلمه يفوق حمادًا إلا في فنون “المغازى” و”السير”، فذا شئ مسلَّم إلى ابن إسحاق بلا ريب، لا يلحقه في ذلك حماد بن سلمة ولا ابن زيد ولا مالك ولا شعبة ولا الثورى وهؤلاء الكبار، وإن كان واحد هؤلاء يزن بابن إسحاق في الضبط عشرات مثله، فاعرف الناس بالإنصاف والعدل يعرفك الله؛ ولا يحملنك ما قيل في ابن إسحاق على أن تغمصه حقه ومنزلته، فهو واللَّه الإمام الصدوق المحدث العلامة الإخبارى الحسيب النسيب؛ غالى فيه جماعة ورفعوه فوق منزلته، وخفض منه آخرون وأسقطو حديثه كله، والحق ما قلته لك.
وقد بسطنا الكلام في شرح حاله واختلاف النقاد بشأنه في كتابنا “غرس الأشجار” واستوفينا هناك الكلام على هذا الحديث؛ وذكر ما أبداه جماعة من المتقدمين في نكارة متنه، وتلك النكارة مدفوعة عندى لو كان ابن إسحاق لم يخالف فيه، فمن عذيرنا وقد خولف الرجل؟!
وقد كنا قديمًا نحسن الظن بهذا الحديث، ونراه حديثًا حسن المتن والإسناد معًا، كما أشرنا إلى ذلك فيما علقناه على مختلف الحديث لابن قتيبة [ص ٣٩٥/ طبعة دار الحديث]، وكنا آنذاك قد أوتينا حَظّا من شدة الجهل، وقلة العلم والفهم، ولا نبرئ أنفسنا من بعض ذلك الآن، بل الجهل بنا محيط أبدًا إن لم يتقبل الله منا صالح الأعمال، فيا ويل نفسى ومصابها إن كنا أردنا بما نسطره وجوه الناس، ووافضيحتى يوم النشور إن كان غايتى من طلب العلم هو تحصيل الدرهم والدينار! والله لقد خبت وخسرت إن لم أكن أحتسب تعبى وسهرى وضعف نور عينى في تحضيل العلوم عند ربى وخالقى ومولاى، فيا قوم، من يرض عنى إذا كان الذي في السماء عليَّ ساخطًا؟! وأى شئ يجدينا إذا كان سيدى لا يرضى بى، فإلى من أذهب وأين المخرج؟! فكم أتجنى عليَّ نفسى وهى مهلكتى؟! وإلى متى أتجاوز قدرى وأنا الضعيف الحقير. =

আমি বলি: হাম্মাদ (ইবনু সালামাহ) হুজ্জাত (প্রমাণ) – যতক্ষণ না তিনি এমন কোনো বিষয়ে বিরোধিতা করেন বা এমন কিছু বর্ণনা করেন যা মুনকার হিসেবে পরিচিত। আর তাঁর এই বর্ণনাটি ইবনু ইসহাকের পূর্ববর্তী হাদিসের সিয়াক (বর্ণনার ধারা) ও সনদ-এর ভুল আমাদের কাছে উন্মোচিত করে দিয়েছে।

সিয়াক সম্পর্কে: পূর্ববর্তী শব্দ (ইবনু ইসহাকের বর্ণনা) ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

সনদ সম্পর্কে: হাম্মাদ এতে উমরাহ-কে কাসিম ও আয়িশাহ (রা.)-এর মাঝে যুক্ত করেছেন। আর হাম্মাদের বক্তব্যই সঠিকের নিকটতর – যেমনটি দারাকুতনি তাঁর “আল-ইলাল” [৫/১৫০-১৫১, পাণ্ডুলিপি] -এ বলেছেন। বরং এটি স্পষ্ট সঠিক, এতে কোনো বিতর্ক নেই।

ইবনু ইসহাক কোথায় হাম্মাদ ইবনু সালামাহর সমকক্ষ হতে পারে?! ইতকানে (হাদিস আয়ত্তে)? না তার নির্ভুলতা ও সংরক্ষণে? না সুন্নাতে তার দৃঢ়তায়? না আহলে বিদআতের বিরুদ্ধে তার কঠোরতায়? না অন্য কিছুতে? আমি জানি না, তিনি হাম্মাদের চেয়ে বেশি দক্ষ শুধু “মাগাযি” ও “সিয়ার” -এর শাখাগুলোতে। এটি একটি বিষয় যা নিঃসন্দেহে ইবনু ইসহাককে দেওয়া যায় – এতে হাম্মাদ ইবনু সালামাহ, ইবনু যায়দ, মালিক, শু’বাহ, সাওরি এবং এঁদের মতো বড় ইমামরাও তার সমকক্ষ হতে পারেন না। যদিও এঁদের প্রত্যেকেই নির্ভুলতা ও সংরক্ষণের দিক থেকে ইবনু ইসহাকের ওপর কয়েকগুণ ভারী।

সুতরাং মানুষকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের সাথে চেন – তাহলে আল্লাহ তোমাকে চিনবেন। ইবনু ইসহাক সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা যেন তোমাকে তার প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা অস্বীকার করতে না বাধ্য করে। কারণ আল্লাহর কসম, তিনি একজন ইমাম, সত্যবাদী, মুহাদ্দিস, আল্লামা, ইখবারি (বিশেষজ্ঞ বর্ণনাকারী), সম্ভ্রান্ত ও বংশমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। একটি দল তার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে ও তাকে তার মর্যাদার ওপরে তুলেছে, আর অন্য দল তাকে অবমূল্যায়ন করেছে ও তার সব হাদিস বাতিল বলে দিয়েছে। আর সত্য হলো যা আমি তোমাকে বললাম।

আমরা তাঁর অবস্থা ও নিন্দুকদের মতপার্থক্যের ব্যাখ্যা আমাদের “গারসুল আশজার” গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সেখানে এই হাদিসটির ওপর পূর্ণ আলোচনা করেছি এবং পূর্ববর্তীদের একটি দল এর মতনের মুনকার (অগ্রহণযোগ্য) দিক সম্পর্কে যা প্রকাশ করেছে তাও উল্লেখ করেছি। আমার কাছে সেই মুনকার হওয়ার দিকটি প্রত্যাখ্যাত হবে যদি ইবনু ইসহাক এতে বিরোধী না হতেন। কিন্তু যখন লোকটির (ইবনু ইসহাকের) বিরোধিতা করা হয়েছে, তখন আমাদের পক্ষে কী করার আছে?!

আমরা আগে (পুরনো সময়ে) এই হাদিস সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করতাম এবং মনে করতাম এটি মতন ও সনদ উভয় দিক থেকেই হাসান – যেমনটি আমরা ইবনু কুতাইবার “মুখতালিফুল হাদিস”-এর ওপর আমাদের টীকায় ইঙ্গিত করেছি [পৃ. ৩৯৫, দারুল হাদিস সংস্করণ]। সে সময় আমাদের ভাগ্যে ছিল প্রচণ্ড অজ্ঞতা, অল্প জ্ঞান ও বোধের অংশ। এখনও আমরা নিজেদেরকে সেসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত দাবি করি না। বরং অজ্ঞতা সব সময় আমাদের ঘিরে থাকবে – যদি না আল্লাহ আমাদের সৎকর্ম কবুল করেন।

অতএব, ধ্বংস আমার নিজের জন্য ও তার বিপর্যয়ের জন্য – যদি আমরা যা লিখি তা দিয়ে মানুষের মুখ দেখতে চাই! আর কিয়ামতের দিন আমার জন্য ধিক্কার যদি আমার জ্ঞান অন্বেষণের লক্ষ্য হয় দিরহাম ও দীনার সংগ্রহ করা! আল্লাহর কসম, আমি ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হব – যদি আমি আমার রব, সৃষ্টিকর্তা ও মাওলার কাছে আমার কষ্ট, রাত জাগরণ ও চোখের দুর্বলতাকে সওয়াবের জন্য গণ্য না করি।

হে লোকেরা! যিনি আসমানে আছেন তিনি যদি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হন, তাহলে কে আমার ওপর সন্তুষ্ট হবে?! আর আমার প্রভু যদি আমার ওপর রাজি না হন, তাহলে কী লাভ? আমি কার কাছে যাব? আর কোথায় পালানোর পথ?! কতই না আমি নিজের ওপর জুলুম করি – অথচ আমিই নিজের ধ্বংসের কারণ! আর কতদিন আমি আমার মর্যাদা অতিক্রম করব – অথচ আমি দুর্বল, তুচ্ছ ও নগণ্য![7] كتاب مسند أبي يعلى – ت السناري 6/497-500

এতো গেল একজন মুহাক্কিকের আলোচনা। এখন আমরা শায়েখ শুয়াইব আরনাউত (রহ) (মৃ. ১৪৩৮ হি.) তাহকিক দেখব:

لا يصح، تفرد به محمَّد بن إسحاق -وهو المطلبي- وفي متنه نكارة. عبد الله بن أبي بكر: هو ابن محمَّد بن عمرو بن حزم.
وأخرجه أحمد (٢٦٣١٦)، وأبو يعلى (٤٥٨٧)، والطبراني في “الأوسط” (٧٨٠٥)، والدارقطني (٤٣٧٦) من طريق محمَّد بن إسحاق، عن عبد الله بن أبي بكر، بهذا الإسناد.
وأخرجه أبو يعلى (٤٥٨٨)، والطبراني في “الأوسط” (٧٨٠٥)، والدراقطنى (٤٣٧٦) من طريق ابن إسحاق، عن عبد الرحمن بن القاسم، به.
والحديث رواه غير ابن إسحاق عن عبد الله بن أبى بكر عن عمرة عن عائشة بلفظ آخر، انظره مع تخريجه عند الحديث السالف برقم (١٩٤٢)

এটি সহীহ নয়। এতে এককভাবে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (আল-মাত্তালিবী) এবং এর মূল বক্তব্যে নাকারাহ (অস্বাভাবিক ও অসঙ্গতি ) রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আবী বকর হলেন ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আমর ইবনে হাযম।

এ হাদীস আরও বর্ণনা করেছেন:

আহমাদ (২৬৩১৬)
আবূ ইয়া‘লা (৪৫৮৭)
তাবারানী তার আল-আওসাত গ্রন্থে (৭৮০৫)
দারাকুতনী (৪৩৭৬)
তারা সবাই মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক-এর সূত্রে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে আবী বকর থেকে এই সনদে বর্ণনা করেছেন।

এছাড়া আবূ ইয়া‘লা (৪৫৮৮), তাবারানী (৭৮০৫) এবং দারাকুতনী (৪৩৭৬) ইবনে ইসহাক-এর সূত্রে আব্দুর রহমান ইবনুল কাসিম থেকেও এটি বর্ণনা করেছেন।

আর এই হাদীসটি ইবনে ইসহাক ছাড়া অন্য বর্ণনাকারীরাও আব্দুল্লাহ ইবনে আবী বকর থেকে, তিনি আমরাহ থেকে, তিনি আয়েশা (রা.) থেকে ভিন্ন শব্দে বর্ণনা করেছেন। তার সনদসহ বিস্তারিত পূর্ববর্তী হাদীস নম্বর ১৯৪২-এ দেখুন (যে সনদে ছাগলের ঘটনা উল্লেখ নেই)।[8] كتاب سنن ابن ماجه – ت الأرنؤوط 3/125

মুহাক্কিকরা উপর্যপুরি দলিলাদির আলোকে উক্ত হাদিসের ইল্লত বা ত্রুটি দেখিয়েছেন। আমরা এখন হাদিসটা সম্পর্কে ও সূরাহ হিজরের ৯ নাম্বার আয়াতের অর্থ সম্পর্কে প্রাচীন ইমামদের আলোচনা ও সমালোচনা দেখব। নিন্মোক্ত আলোচনাগুলো ‘কিতাবু মাওসূ‘আতি মাহাসিনিল ইসলামি ওয়া রাদ্দি শুবুহাতিল লিআম[9] كتاب موسوعة محاسن الإسلام ورد شبهات اللئام 4/15-17 কিতাবে আলোচিত হয়েছে।

ইবনে কুতাইবা (রহ.) (মৃ. ২৭৬ হি.) দাজেন (গৃহপালিত প্রাণী) সংক্রান্ত হাদীস উল্লেখ করার পর বলেন:

وقد رجم رسول الله – صلى الله عليه وسلم -، ورجم الناس بعده وأخذ بذلك الفقهاء. وأما رضاع الكبير عشرًا، فنراه غلطًا من محمد بن إسحاق، ولا نأمن أيضًا أن يكون الرجم الذي ذكر أنه في هذه الصحيفة كان باطلًا؛ لأن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – قد رجم ماعز بن مالك، وغيره قبل هذا الوقت، فكيف ينزل عليه مرة أخرى، ولأن مالك بن أنس روى هذا الحديث بعينه عن عبد الله بن أبي بكر عن عمرة عن عائشة – رضي الله عنها – قالت: (كان فيما أنزل من القرآن عشر رضعات معلومات يحرمن ثم نسخن بخمس معلومات يحرمن، فتوفي رسول الله – صلى الله عليه وسلم – وهن مما يقرأ من القرآن)، إلى أن قال: “وألفاظ حديث مالك خلاف ألفاظ حديث محمد بن إسحاق. ومالك أثبت عند أصحاب الحديث من محمد بن إسحاق (١)
(١) تأويل مختلف الحديث (٣١٥: ٣١٤).

“রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রজম (পাথর মেরে হত্যা) করেছেন এবং তাঁর পরে লোকেরাও রজম করেছে এবং ফকীহগণ এটাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দশবার দুধপান আমরা মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের ভুল বলে মনে করি। আর আমরা এটাও নিরাপদ বোধ করি না যে, এই সহীফায় (কাগজে) উল্লেখিত রজমের ঘটনাটিও বাতিল ছিল। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মায়েজ ইবনে মালিক ও অন্যদের রজম করেছিলেন, এ ঘটনার আগেই। তাহলে কীভাবে আবার নতুন করে তার উপর আয়াত নাযিল হবে?

এবং এই কারণেও যে, মালিক ইবনে আনাস (রহ.) এই হাদীসটিই আব্দুল্লাহ ইবনে আবী বকর-আমরাহ-আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আয়েশা (রা.) বলেন: ‘কুরআনে যা নাযিল হয়েছিল তার মধ্যে দশবার নির্ধারিত দুধপান ছিল যা হারাম করত, অতঃপর সেটি পাঁচবার নির্ধারিত দুধপান দ্বারা মানসুখ (রহিত) করা হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকাল করেছেন অথচ সেগুলো তখনও কুরআনের (আয়াতরূপে) পাঠ করা হতো।’ মালিকের হাদীসের শব্দাবলি মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের শব্দাবলির বিপরীত। আর মুহাদ্দিসদের নিকট মালিক ইবনে আনাস মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য।” [তাঈলু মুখতালিফিল হাদীস, ৩১৪-৩১৫]

সারাখসী (রহ.) (মৃ. ৪৮৩ হি.) বলেন:

قال السرخسي: وحديث عائشة لا يكاد يصح؛ لأنه قال في ذلك الحديث: وكانت الصحيفة تحت السرير فاشتغلنا بدفن رسول الله – صلى الله عليه وسلم -، فدخل داجنٌ البيتَ فأكله، ومعلوم أن بهذا لا ينعدم حفظه من القلوب، ولا يتعذر عليهم إثباته في صحيفة أخرى؛ فعرفنا أنه لا أصل لهذا الحديث”. (٢)
(٢) أصول السرخسي (٢/ ٨٠).

“আয়েশা (রা.)-এর হাদীসটি প্রায় সহীহ নয়। কারণ সেই হাদীসে বলা হয়েছে: ‘সেই সহীফাটি (লিখিত কাগজটি) বিছানার নিচে ছিল, অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দাফনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি গৃহপালিত জন্তু ঘরে ঢুকে তা খেয়ে ফেলে।’ অথচ জানা কথা যে, এভাবে (কাগজ নষ্ট হয়ে গেলেই) অন্তর থেকে তা মুখস্থ করা বিলুপ্ত হয়ে যায় না এবং তারা অন্য একটি কাগজে তা লিখে রাখতে অক্ষম ছিল না। সুতরাং আমরা বুঝতে পারি যে, এই হাদীসটির কোনো ভিত্তি নেই।” [উৎস: উসূলুস সারাখসী, ২/৮০]

সারাখসী (রহ.) আরও বলেন:

وقال أيضًا: أما حديث عائشة – رضي الله عنها – فضعيف جدًا؛ لأنه إذا كان متلوا بعد رسول الله – صلى الله عليه وسلم -، ونسخ التلاوة بعد رسول الله – صلى الله عليه وسلم – لا يجوز فلماذا لا يتلى الآن؟ ! وذُكر في الحديث (فدخل داجن البيت فأكله)، وهذا يقوي قول الروافض الذين يقولون: كثير من القرآن ذهب بعد رسول الله – صلى الله عليه وسلم – فلم يثبته الصحابة – رضي الله عنهم – في المصحف وهو قول باطل بالإجماع (٣).
(٣) المبسوط للسرخسي (٥/ ١٣٤).

“আয়েশা (রা.)-এর হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ, যদি তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরে তিলাওয়াতের আয়াত হিসেবে থাকত এবং রাসূলের পরে তিলাওয়াতের আয়াত রহিত করা সম্ভব না হতো, তাহলে বর্তমানে তা তিলাওয়াত করা হয় না কেন?”

“আর হাদীসে উল্লেখ রয়েছে: ‘একটি গৃহপালিত জানোয়ার ঘরে ঢুকে তা খেয়ে ফেলে।’ এটি রাফেযীদের সে কথাকে শক্তি দেয় যারা বলে: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরে কুরআনের অনেকাংশ হারিয়ে গেছে, আর সাহাবাগণ তা মুসহাফে সংরক্ষণ করেননি। অথচ ইজমার দৃষ্টিতে এটি বাতিল কথা।” [আল-মাবসূত লিস সারাখসী, ৫/১৩৪]

ইমাম ইবনু হাযম (মৃ. ৪৫৬ হি.) (রহ) বলেন:

وقد غلط قوم غلطًا شديدًا، وأتوا بأخبار ولَّدها الكاذبون والملحدون، منها أن الداجن أكل صحيفة فيها آية متلوة فذهب البتة.

إلى أن قال: وهذا كله ضلال نعوذ بالله منه ومن اعتقاده، وأما الذي لا يحل اعتقاد سواه فهو قول الله تعالى: {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} [الحجر: ٩]، فمن شك في هذا كفر، ولقد أساء الثناء على أمهات المؤمنين، ووصفهن بتضييع ما يتلى في بيوتهن؛ حتى تأكله الشاة فيتلف، مع أن هذا كذب ظاهر، ومحال ممتنع؛ لأن الذي أكل الداجن لا يخلو من أحد وجهين: إما أن يكون رسول الله – صلى الله عليه وسلم – حافظًا له، أو كان قد أنسيه، فإن كان في حفظه، فسواء أكل الداجن الصحيفة أو تركها، وإن كان رسول الله – صلى الله عليه وسلم – قد أنسيه، فسواء أكله الداجن أو تركه قد رفع من القرآن، فلا يحل إثباته فيه. كما قال تعالى: {سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى (٦) إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ}. فنص تعالى على أنه لا ينسى أصلا شيئا من القرآن، إلا ما أراد تعالى رفعه بإنسائه، فصح أن حديث الداجن إفك وكذب وفرية، ولعن الله من جوّز هذا أو صدَّق به، بل كل ما رفعه الله تعالى من القرآن فإنما رفعه في حياة النبي – صلى الله عليه وسلم -، قاصدًا إلى رفعه، ناهيًا عن تلاوته إن كان غير منسي، أو ممحوًا من الصدور كلها. ولا سبيل إلى كون شيء من ذلك بعد موت رسول الله – صلى الله عليه وسلم -، ولا يجيز هذا مسلم؛ لأنه تكذيب لقوله تعالى: {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ}. ولكان ذلك أيضًا تكذيبًا لقوله تعالى: {الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ} ولكان ما يرفع منه بعد موت رسول الله – صلى الله عليه وسلم – خرما في الدين، ونقصًا منه، وإبطالا للكمال المضمون. ولكان ذلك مبطلًا لهذه الفضيلة التي خصصنا بها، والفضائل لا تنسخ. (١).
(١) الإحكام في أصول الأحكام (١/ ٤٩٢: ٤٩١).

কতিপয় লোক চরম ভুল করেছে এবং মিথ্যাবাদী ও নাস্তিকরা যা উদ্ভাবন করেছে, সেসব বর্ণনা তারা গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে একটি হলো যে, একটি গৃহপালিত পশু একটি সহীফা খেয়ে ফেলেছিল যাতে একটি তিলাওয়াতযোগ্য আয়াত ছিল, ফলে তা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এসব সম্পূর্ণ পথভ্রষ্টতা। আমরা আল্লাহর কাছে এর থেকে এবং এরূপ বিশ্বাস থেকে আশ্রয় চাই। আর যা ছাড়া অন্য কোনো কিছু বিশ্বাস করা বৈধ নয়, তা হলো আল্লাহর বাণী: “নিশ্চয় আমি এই কুরআন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয় আমিই এর সংরক্ষক।” (সূরা হিজর, ১৫:৯)

তাই যে কেউ এতে সন্দেহ করে, সে কাফির। এসব বর্ণনা উম্মাহাতুল মুমিনীন (মুসলিম মাতৃগণ)-এর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে এবং তাদেরকে তাঁদের ঘরে তিলাওয়াতযোগ্য বিষয়গুলো এমনভাবে নষ্ট করার বৈশিষ্ট্য দেয় যেন একটি বকরী সেগুলো খেয়ে নষ্ট করে ফেলতে পারে। অথচ এটি সুস্পষ্ট মিথ্যা, অসম্ভব ও অসঙ্গত।

কারণ দাজিন (গৃহপালিত পশু) যা খেয়েছে, সে ব্যাপারে দুটি অবস্থা হতে পারে:

১. হয় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা মুখস্থ রেখেছিলেন, তাহলে পশু কাগজটি খাক বা না খাক, সমান কথা।
২. অথবা আল্লাহ তা রাসূল (ﷺ)-কে ভুলিয়ে দিয়েছিলেন, তাহলে পশু কাগজটি খাক বা না খাক—যে আয়াতটি কুরআন থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা কুরআনে প্রমাণিত করা বৈধ নয়।

আল্লাহ বলেন: “আমি তোমাকে পড়াব, ফলে তুমি ভুলবে না—আল্লাহ যা চান তা ছাড়া।” (সূরা আ’লা, ৮৭:৬-৭) অতএব, সুস্পষ্ট হয়েছে যে দাজিনের কাগজ খাওয়ার হাদীসটি একটি মিথ্যা, বানোয়াট ও অপবাদ। যে ব্যক্তি এটিকে সম্ভব বলেছে বা সত্য বলে মেনে নিয়েছে, আল্লাহ তার উপর লানত করুন।

বস্তুতঃ আল্লাহ কুরআন থেকে যা কিছু উঠিয়ে নিয়েছেন, তিনি তা নবী (ﷺ)-এর জীবদ্দশায়ই উঠিয়ে নিয়েছেন, ইচ্ছা করেই তা উঠিয়েছেন, যদি তা ভুলে যাওয়ার কারণে না হয় তবে তার তিলাওয়াত নিষেধ করেছেন, বা অন্তরসমূহ থেকে পুরোপুরি মুছে দিয়েছেন। রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর কুরআনের কোনো কিছু হারিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। কোনো মুসলিম তা বৈধ মনে করতে পারে না, কারণ তা আল্লাহর বাণীর প্রত্যাখ্যান হবে: “নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি আর নিশ্চয় আমিই এর সংরক্ষক।” (সূরা হিজর, ১৫:৯) এবং তা এ বাণীরও প্রত্যাখ্যান হবে: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম।” (সূরা মায়িদা, ৫:৩)

কারণ রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর যদি কুরআনের কিছু উঠিয়ে নেওয়া হতো, তাহলে দ্বীনের মধ্যে ফাটল ও ঘাটতি সৃষ্টি হতো, এবং কামিল (পূর্ণাঙ্গ) দ্বীনের নিশ্চয়তা বাতিল হয়ে যেত। এটি সেই বিশেষ মর্যাদাকেও বাতিল করত যা দিয়ে আমাদের বিশেষায়িত করা হয়েছে, অথচ মর্যাদাসমূহ রহিত হয় না। [আল-ইহকাম ফী উসূলিল আহকাম, ১/৪৯১-৪৯২]

বিখ্যাত মুফাস্সির ইমাম কুরতুবি (রহ) বলেন,

 وأما ما يحكى من أن تلك الزيادة، كانت في صحيفةٍ في بيت عائشة فأكلتها الداجن فمن تأليف الملاحدة والروافض. (٢).
(٢) تفسير القرطبي (١٤/ ١١٢) وبنحوه قال الزمخشري في الكشاف (٣/ ٥١٨).

“যে কথা বর্ণিত হয় যে, সেই বাড়তি অংশ (আয়াত) আয়েশার ঘরের একটি সহীফায় লিখিত ছিল, অতঃপর সেটি একটি গৃহপালিত পশু খেয়ে ফেলে — তা নাস্তিক ও রাফেযীদের বানানো কথা।” [তাফসীরুল কুরতুবী (১৪/১১২) এবং জামাখশারী কাশশাফে (৩/৫১৮) অনুরূপ বলেছেন।]

ইবনে আশূর (রহ.) (মৃ. ১৩৯৩ হি.) বলেন:

قال ابن عاشور: ووضع هذا الخبر ظاهر مكشوف، فإنه لو صدق هذا؛ لكانت هذه الصحيفة قد هلكت في زمن النبي – صلى الله عليه وسلم – أو بعده، والصحابة متوافرون، وحفاظ القرآن كثيرون، فلو تلفت هذه الصحيفة لم يتلف ما فيها من صدور الحفاظ، وكون القرآن قد تلاشى منه كثير هو أصل من أصول الروافض ليطعنوا به في الخلفاء الثلاثة، والرافضة يزعمون أن القرآن مستودع عند الإمام المنتظر فهو الذي يأتي بالقرآن وقر بعير (٣).
(٣) التحرير والتنوير ٢١/ ٢٤٧.

“এই সংবাদটি বানোয়াট ও উন্মোচিত। কেননা এটি সত্য হলে — এই সহীফাটি নবী (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় বা পরে ধ্বংস হয়ে যেত, অথচ সাহাবাগণ তখন উপস্থিত ছিলেন এবং কুরআনের হাফিজরা বহু ছিলেন। তাই এই সহীফাটি নষ্ট হয়ে গেলেও তাতে যা ছিল তা হাফেজদের অন্তর থেকে নষ্ট হতো না। আর কুরআনের অনেকাংশ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার দাবি রাফেযীদের মূল ভিত্তি, যার মাধ্যমে তারা তিন খলীফার ওপর আক্রমণ করে। রাফেযীরা ধারণা করে যে, কুরআন ইমাম মুন্তাজারের (প্রতীক্ষিত ইমাম) নিকট সংরক্ষিত আছে; তিনিই কুরআন নিয়ে আসবেন — ‘উটের বোঝা পরিমাণ কুরআন’ নিয়ে।” [আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, ২১/২৪৭]

যদি হাদিসটিকে সহিহ মনে করি?

দ্বিতীয় দিক: যাঁরা হাদীসটিকে হাসান বলেছেন অথবা সহীহ বলেছেন, তাঁদের উত্তরও নিম্নোক্ত কয়েকটি দিক থেকে দেওয়া যায়:[10] كتاب موسوعة محاسن الإسلام ورد شبهات اللئام 4/17-24 

প্রথম উত্তর: আয়েশা (রা.) একা নয় যে তাঁর কাছেই কাগজপত্র ছিল, বরং কোরআন সংরক্ষণ ছিল রাসুলের সাহাবাদের অন্তরে।

তাই এটি কোনো দলীল নয়। কারণ মুসলমানদের কাছে বহু মুসহাফ (কুরআনের লিখিত কপি) ছিল। একটি কাগজ কোনো পশু খেয়ে ফেললেই কয়েক লাখ মুসলমানের অন্তর থেকে কুরআনের আয়াতসমূহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না। আর আয়েশা (রা.) একা নন যে শুধুমাত্র তাঁর কাছেই কুরআনের কাগজপত্র ছিল, আর তিনি ওহী লেখকদের মধ্যে ছিলেন না যাঁরা নবী (ﷺ)-এর উপর নাযিলকৃত প্রতিটি আয়াত বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ করতেন।

আয়েশা (রা.) একা নয় যে তাঁর কাছেই কাগজপত্র ছিল, বরং সংরক্ষণ ছিল অন্তরে

এটাও কোনো দলিল নয়। কারণ মুসলিমদের মুশাফ অনেক, আর গৃহপালিত পশু যদি একটি কাগজ খেয়ে ফেলে, তাহলে আমরা লক্ষ লক্ষ মুসলিমের বক্ষ থেকে কুরআনের আয়াত দূর করতে পারি না। আর আয়িশাহ (রা.) একা নন যাঁর কাছে কুরআনের কাগজপত্র ছিল, আর তিনি নবী (ﷺ)-এর ওপর নাযিলকৃত প্রতিটি আয়াতের জন্য বিশেষ ওহি লেখকও ছিলেন না।

ইবনে হাযম (রহ.) বলেন:

এই হাদীসটি সহীহ, কিন্তু লোকেরা যেভাবে মনে করে তা নয়। কারণ রজমের আয়াত যখন নাযিল হয়েছিল, তা সংরক্ষিত হয়েছিল, জানা ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা অনুযায়ী আমল করেছিলেন। তবে কুরআনের লেখকগণ তা মুশাফসমূহে লিখেননি এবং এর লিখন কুরআনে অন্তর্ভুক্ত করেননি। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) এ ব্যাপারে রাসূল (সা.)-কে অনুরোধ করেছিলেন — যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি — কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে সে অনুমতি দেননি। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, এর লিখন রহিত হয়ে গেছে। আর যে কাগজে তা লেখা ছিল — যেমনটি আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন — তা একটি গৃহপালিত পশু খেয়ে ফেলে। আর কারোরই এ কাগজটির কোনো প্রয়োজন নেই। দুধপানসংক্রান্ত আয়াতের ক্ষেত্রেও একই কথা, কোনো পার্থক্য নেই। এর প্রমাণ হলো যে, তাঁরা তা (আয়াতটি) মুখস্থ রেখেছিলেন, যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি। কাজেই এটি যদি কুরআনে লিপিবদ্ধ থাকত, তাহলে একটি পশু কাগজ খেয়ে ফেললেই তাদের মুখস্থ থেকে তা কুরআনে লিপিবদ্ধ থাকতে বাধা হতো না।

সুতরাং আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, দুই মুসলমানের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো ভিন্নমত নেই যে, আল্লাহ তার রাসূল (ﷺ)-এর ওপর পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ফরজ করেছেন এবং তিনি যেমনটি আদিষ্ট হয়েছিলেন, তেমনি পৌঁছেছেন। আল্লাহ বলেন:

“হে রাসূল! পৌঁছে দাও যা তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে; আর যদি তা না করো, তবে তুমি তাঁর রিসালাত পৌঁছাতে পারলে না।” (সূরা মায়িদা, ৫:৬৭)
আরও বলেন: “নিশ্চয় আমিই এই কুরআন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয় আমিই এর সংরক্ষক।” (সূরা হিজর, ১৫:৯)
আরও বলেন: “আমি তোমাকে পাঠাব, ফলে তুমি ভুলবে না — আল্লাহ যা চান তা ছাড়া।” (সূরা আ’লা, ৮৭:৬-৭)
আরও বলেন: “আমি যখন কোনো আয়াত রহিত করি অথবা ভুলিয়ে দিই, তখন তার চেয়ে উত্তম বা অনুরূপ আয়াত নিয়ে আসি।” (সূরা বাকারা, ২:১০৬)

সুতরাং প্রমাণিত হলো — যেসব আয়াত চলে গেছে (উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে) সেগুলো যদি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো, তবে তিনি পৌঁছে দিতেন। আর তিনি যদি পৌঁছে দিতেন, তবে তা সংরক্ষিত হতো। আর তা সংরক্ষিত হলে তাঁর মৃত্যু তার কোনো ক্ষতি করতে পারত না, যেমন কুরআনের যতটুকু তিনি পৌঁছেছিলেন তার সবকিছু তাঁর মৃত্যুর পরও টিকে আছে।

আর যদি তিনি তা পৌঁছানোর নির্দেশ না পেয়ে থাকেন, অথবা পৌঁছে দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি ও লোকেরা তা ভুলে গিয়েছিলেন, অথবা তিনি তা কুরআনে লেখার নির্দেশ দেননি — তবে তা নিশ্চিতভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহিত। তা কুরআনের সাথে যুক্ত করা বৈধ নয়।” [আল-মুহাল্লা, ১১/২৩৬; আরও দেখুন: আল-ইহকাম ফী উসূলিল আহকাম, ১/৪৯১-৪৯২]

আয়াতের মধ্যে ‘হিফজ’ (সংরক্ষণ)-এর অর্থ সম্পর্কে আলিমদের ব্যাখ্যা

ইমামুত তাফসির ইমাম তাবারি (রহ) (মৃ. ৩১০ হি.)বলেন,

يقول تعالى ذكره: {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ} وهو القرآن {وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ}، قال: وإنا للقرآن لحافظون من أن يزاد فيه باطل ما ليس منه، أو ينقص منه ما هو منه من أحكامه وحدوده وفرائضه، والهاء في قوله: (لَهُ) من ذكر الذكر.ثم ذكر بإسناده إلى قتادة {وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} قال: حفظه الله من أن يزيد فيه الشيطان باطلا أو ينقص منه حقا، وقيل: الهاء في قوله {وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} من ذكر محمد – صلى الله عليه وسلم – بمعنى: وإنا لمحمد حافظون ممن أراده بسوء من أعدائه (١).
(١) تفسير الطبري ٨/ ٨.

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ} অর্থাৎ ‘নিশ্চয় আমরাই এই যিকির (কুরআন) নাযিল করেছি’ {وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} — তিনি বলেন: ‘আমরা কুরআনকে সংরক্ষণ করব’ এ থেকে যে, তাতে তার অন্তর্ভুক্ত নয় এমন বাতিল কিছু যুক্ত করা হবে, অথবা তার বিধান, সীমারেখা ও ফরজসমূহের মধ্যে যা আছে তা থেকে কিছু বাদ দেওয়া হবে। আর ‘লাহু’ শব্দের সর্বনাম ‘যিকির’-এর দিকে ফিরে যায়।’

অতঃপর তিনি তার সনদে কাতাদা থেকে বর্ণনা করেন — কাতাদা {وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} আয়াত সম্পর্কে বলেন: ‘আল্লাহ কুরআনকে এ থেকে রক্ষা করেছেন যে, শয়তান তাতে বাতিল কিছু বাড়িয়ে দেবে অথবা সত্য থেকে কিছু কমিয়ে দেবে।’ আর কারও মতে, {وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} -এর সর্বনাম মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর দিকে ফিরে যায়, অর্থ: ‘আমি মুহাম্মাদকে তার শত্রুদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করব।’ [তাফসীরুত তাবারী, ৮/৮]

ইমাম ইবনু কাসির (রহ) (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেন:

ثم قرر تعالى أنه هو الذي أنزل الذكر، وهو القرآن، وهو الحافظ له من التغيير والتبديل. ومنهم من أعاد الضمير في قوله تعالى: {لَهُ لَحَافِظُونَ} على النبي – صلى الله عليه وسلم -، كقوله: {وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ} [المائدة: ٦٧] والمعنى الأول أولى، وهو ظاهر السياق (٢).
(٢) تفسير ابن كثير ٨/ ٢٤٦.

“অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নিশ্চিত করে দিলেন যে, তিনিই যিকির (কুরআন) নাযিল করেছেন এবং তিনিই তা পরিবর্তন-পরিবর্ধন থেকে সংরক্ষণকারী।

কেউ কেউ {وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} -এর সর্বনাম নবী (ﷺ)-এর দিকে ফিরিয়েছেন — যেমন আল্লাহর বাণী: {وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ} (সূরা মায়িদা, ৫:৬৭) — তবে প্রথম অর্থটিই অধিক গ্রহণযোগ্য এবং এটি সিয়াকের (বাক্য প্রসঙ্গের) সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।” [তাফসীর ইবনে কাসীর, ৮/২৪৬]

মাওয়ারদী (রহ) (মৃ. ৪৫০ হি) বলেন:

قال الماوردي: {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ} وقال الحسن والضحاك يعني: القرآن.
{وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ}، فيه قولان:
أحدهما: وإنا لمحمد حافظون ممن أراده بسوء من أعدائه، حكاه ابن جرير.
الثاني: وإنا للقرآن لحافظون.
وفي هذا الحفظ ثلاثة أوجه:
أحدها: حفظه حتى يجزى به يوم القيامة، قاله الحسن.
الثاني: حفظه من أن يزيد فيه الشيطان باطلًا، أو يزيل منه حقًا، قاله قتادة.
الثالث: إنا له لحافظون في قلوب من أردنا به خيرًا، وذاهبوان به من قلوب من أردنا به شرًّا (٣).
(٣) النكت والعيون ٣/ ١٤٩.

আল্লাহর বাণী {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ} — হাসান ও দাহহাক বলেছেন: অর্থাৎ কুরআন।

{وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} — এ প্রসঙ্গে দুটি মত রয়েছে:

প্রথমটি: অর্থাৎ নিশ্চয় আমি মুহাম্মাদকে তার শত্রুদের অনিষ্ট থেকে রক্ষাকারী। এটি ইবনে জারীর (তাবারী) বর্ণনা করেছেন।
দ্বিতীয়টি: অর্থাৎ নিশ্চয় আমি কুরআনের সংরক্ষক।

আর এই সংরক্ষণের তিনটি দিক রয়েছে:

১. কুরআনকে সংরক্ষণ করা যাতে কিয়ামতের দিন এর প্রতিদান দেওয়া যায় — হাসান বসরী (রহ.) বলেছেন।
২. কুরআনকে এ থেকে সংরক্ষণ করা যে, শয়তান তাতে বাতিল কিছু বাড়িয়ে দেবে অথবা সত্য থেকে কিছু কমিয়ে দেবে — কাতাদা (রহ.) বলেছেন।
৩. আমরা যার জন্য কল্যাণ কামনা করি, তার অন্তরে কুরআন সংরক্ষিত রাখি; আর যার জন্য অকল্যাণ কামনা করি, তার অন্তর থেকে তা সরিয়ে নিই। [আন-নুকাতু ওয়াল উয়ুন (তাফসীরুল মাওয়ারদী), ৩/১৪৯]

কানুজি (রহ) বলেন:

قال القنوجي: ثم أنكر سبحانه على الكفار استهزاءهم برسول الله – صلى الله عليه وسلم – بقولهم المذكور، فقال سبحانه: “إنا نحن نزلنا الذكر” الذي أنكروه، ونسبوك بسببه إلى الجنون وهو القرآن، واعتقدوا أنه مختلق من عندك، {وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} عن كل ما لا يليق به من تصحيف، وتحريف، وزيادة، ونقص، ونحو ذلك. فالقرآن محفوظ من هذه الأشياء كلها، لا يقدر واحد من جميع الخلق من الإنس والجن أن يزيد فيه أو ينقص منه حرفًا واحدًا أو كلمة واحدة. وهذا مختص بالكتاب العزيز بخلاف سائر الكتب المنزلة، فإنه قد دخل على بعضها تلك الأشياء، ولما تولَّى الله حفظ ذلك الكتاب بقي مصونًا على الأبد، محروسًا من الزيادة والنقصان وغيرهما، وفيه دليل على أنه مُنزّل من عنده آية إذ لو كان من البشر لتطرق إليه الزيادة والنقصان كما يتطرق إلى كل كلام سواه، وقيل: المعنى نزله محفوظًا من الشياطين، وقيل: حفظه بأن جعله معجزة باقية إلى آخر الدهر، وقيل: حفظه من المعارضة، فلم يقدر أحد من الخلق أن يعارض ولو بأقصر آية.

وقيل: أعجز الله الخلق عن إبطاله وإفساده بوجه من الوجوه، فقيض له العلماء الراسخين يحفظونه، ويذبون عنه إلى آخر الدهر، لأن دواعي جماعة من الملاحدة واليهود متوفرة على إبطاله وإفساده، فلم يقدروا على ذلك بحمد الله. ومن أسباب حفظه حدوث العلوم الكثيرة الآلية التي تذب عن الدخول في أبواب إفساده، وإبطاله، وتحريفه، وتصحيفه، وزيادته، ونقصانه كالصرف والنحو والمعاني والبيان وأصول الحديث والفقه والتفسير، وغير ذلك مما له مدخل في هذا الشأن.

وعن عياض عن النبي – صلى الله عليه وسلم – عن ربه تعالى: وَأَنْزَلْتُ عَلَيْكَ كِتَابًا لَا يَغْسِلُهُ الْمَاء (١). (٢)

(١) مسلم (٢٨٦٥). قال النووي: أَمَّا قَوْله تَعَالَى: “لَا يَغْسِلُهُ الْمَاء” فَمَعْنَاهُ: مَحْفُوظ فِي الصُّدُور، لَا يَتَطَرَّق إِلَيْهِ الذَّهَاب، بَلْ يَبْقَى عَلَى مَرّ الْأَزْمَان. وَأَمَّا قَوْله تَعَالَى “تَقْرَأهُ نَائِمًا وَيَقْظَان”، فَقَالَ الْعُلَمَاء: مَعْنَاهُ يَكُون مَحْفُوظًا لَك فِي حَالَتَيْ النَّوْم وَالْيَقَظَة، وَقِيلَ: تَقْرَأهُ فِي يُسْر وَسُهُولَة. شرح النووي ٩/ ٢١٧.
(٢) فتح البيان في مقاصد القرآن (٧/ ١٤٨: ١٤٩).

অতঃপর আল্লাহ কাফিরদের সে কথার প্রতি উত্তরে তাদের উপহাস নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন:

নিশ্চয় আমরাই এই যিকির (কুরআন) নাযিল করেছি” — যা তারা অস্বীকার করেছিল এবং যার কারণে তারা আপনাকে পাগল বলেছিল, অথচ এই কুরআনই (আল্লাহর বাণী)। তারা ধারণা করেছিল যে, এটি আপনার নিজের বানানো কথা।

আর নিশ্চয় আমরাই এর সংরক্ষক” — অর্থাৎ, সকল প্রকার বিকৃতি, পরিবর্তন, বাড়তি, ঘাটতি ও অনুরূপ অসঙ্গতি থেকে আমরা এটিকে রক্ষা করি। সুতরাং কুরআন এসব বিষয় থেকে সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত। সৃষ্টিজগতের মানুষ ও জ্বিন — কেউই এতে একটি হরফ বা একটি শব্দও বাড়াতে বা কমাতে সক্ষম নয়।

এটি কুরআনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, অন্য নাযিলকৃত কিতাবগুলোর ক্ষেত্রে এমন নয়; কারণ সেগুলোর কিছুতে এসব পরিবর্তন ঘটেছে। যেহেতু আল্লাহ নিজে এই কিতাবের সংরক্ষণভার গ্রহণ করেছেন, তাই এটি চিরকাল সুরক্ষিত থাকবে, বাড়তি, ঘাটতি ও অন্যান্য বিকৃতি থেকে হেফাজত থাকবে। আর এতে এও প্রমাণ রয়েছে যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত — কেননা তা যদি মানবকথা হতো, তাহলে অন্যান্য কথা ও গ্রন্থের ন্যায় এতেও বাড়তি-ঘাটতি ঘটত।

কেউ বলেছেন, অর্থ: আল্লাহ এটিকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে সংরক্ষিত করে নাযিল করেছেন।
আবার কেউ বলেছেন: তিনি এটিকে সংরক্ষণ করেছেন যুগের শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী মুজিযা হিসেবে রেখে।
কেউ বলেছেন: তিনি প্রতিদানের মুখোমুখি হওয়া থেকে এটিকে সংরক্ষিত করেছেন — ফলে কেউ একটি ক্ষুদ্রতম আয়াতেরও প্রতিদান দিতে সক্ষম হয়নি।

আর কেউ বলেছেন: আল্লাহ সব সৃষ্টিকে যেকোনোভাবে কুরআন বাতিল বা ধ্বংস করতে অক্ষম করে দিয়েছেন। বরং তিনি এজন্য গভীর জ্ঞানী আলিমদের সৃষ্টি করেছেন যারা যুগের শেষ পর্যন্ত কুরআন সংরক্ষণ করবে এবং এর পক্ষে বক্তব্য রাখবে। কারণ নাস্তিক ও ইয়াহুদীদের দল কুরআন বাতিল ও ধ্বংস করতে সদা চেষ্টা করে, কিন্তু সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য — তারা এতে সক্ষম হয়নি।

আর কুরআন সংরক্ষণের কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে: বহুবিধ আনুষঙ্গিক ইলমের সৃষ্টি হওয়া; যেসব ইলম কুরআনে প্রবেশপথ বন্ধ করে — যেমন: ভাষা বিজ্ঞান (সরফ), ব্যাকরণ (নাহু), অর্থবিদ্যা (মা‘আনী), অলংকারশাস্ত্র (বায়ান), হাদীসের উসূল, ফিকহের উসূল, তাফসীর ও অন্যান্য বিষয় যা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

আল্লাহর বাণী প্রসঙ্গে ইয়ায (রহ.) নবী (ﷺ)-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন: “আমি তোমার উপর এমন এক কিতাব নাযিল করেছি যা পানি ধুইয়ে ফেলতে পারে না।” (মুসলিম, ২৮৬৫)

[ইমাম নববী (রহ.) এর ব্যাখ্যায় বলেন: ‘পানি ধুইয়ে ফেলতে পারে না’ অর্থ — এটি অন্তরে সংরক্ষিত, বিনাশ এতে পৌঁছতে পারে না; বরং যুগ যুগ ধরে তা টিকে থাকে। আর ‘তুমি তা নিদ্রিত ও জাগ্রত অবস্থায় পাঠ করো’— আলিমগণ বলেন: অর্থাৎ, নিদ্রা ও জাগ্রত অবস্থায় তা তোমার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। আরও বলা হয়েছে: অর্থাৎ, সুগম ও সহজভাবে তুমি তা পাঠ করো। (শারহুন নববী, ৯/২১৭)] [ফাতহুল বায়ান ফী মাকাসিদিল কুরআন, ৭/১৪৮-১৪৯]
আল্লাহ নিজেই পবিত্র কুরআনের সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, অন্যান্য কিতাবের ক্ষেত্রে নয়

আল্লাহ সুবহানাহু অন্যান্য কোনো কিতাব এভাবে সংরক্ষণ করেননি; বরং তিনি রব্বানী ও আহবারদের (বিদ্বানদের) ওপর সেগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, ফলে সেগুলোতে যা হওয়ার ঘটেছে তা ঘটেছে। আর কুরআনের সংরক্ষণের দায়িত্ব তিনি নিজে নিয়েছেন। তাই এটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংরক্ষিত রয়েছে। আল্লাহ কুরআন নবী (ﷺ)-এর অন্তরে নাযিল করেছেন এবং তিনি নিজেই তা নবী (ﷺ)-এর অন্তরে একত্রিত করার এবং তাকে তা ভুলে না যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। আর তিনি নবী (ﷺ)-কে এ বিষয়ে তাড়াহুড়া না করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন:

لَا تُحَرِّكۡ بِهٖ لِسَانَكَ لِتَعۡجَلَ بِهٖؕ‏ ١٦ اِنَّ عَلَيۡنَا جَمۡعَهٗ وَقُرۡاٰنَهٗۚ  ۖ‏ فَاِذَا قَرَاۡنٰهُ فَاتَّبِعۡ قُرۡاٰنَهٗ​ۚ‏ ثُمَّ اِنَّ عَلَيۡنَا بَيَانَهٗؕ‏

“তুমি তাড়াতাড়ি ওয়াহী আয়ত্ত করার জন্য তোমার জিভ নাড়াবে না। এর সংরক্ষণ ও পড়ানোর দায়িত্ব আমারই। কাজেই আমি যখন তা পাঠ করি, তখন তুমি সে পাঠের অনুসরণ কর। অতঃপর তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা আমারই দায়িত্ব।” (সূরা কিয়ামাহ, ৭৫:১৬-১৯)

ইবনু কাসির (রহ) বলেন,

قال ابن كثير: هذا تعليم من الله – عز وجل – لرسوله – صلى الله عليه وسلم – في كيفية تلقيه الوحي من الملك، فإنه كان يبادر إلى أخذه، ويسابق الملك في قراءته، فأمره الله عز وجل إذا جاءه الملك بالوحي أن يستمع له، وتكفل له أن يجمعه في صدره، وأن ييسره لأدائه على الوجه الذي ألقاه إليه، وأن يبينه له ويفسره ويوضحه. فالحالة الأولى جمعه في صدره، والثانية تلاوته، والثالثة تفسيره وإيضاح معناه (١).

(١) تفسير ابن كثير (١٤/ ١٩٦).

এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রাসূল (ﷺ)-কে শিক্ষা দেওয়া যে, কীভাবে তিনি ফেরেশতার কাছ থেকে ওহী গ্রহণ করবেন। কেননা তিনি (ﷺ) তা দ্রুত আয়ত্ত করতে ও ফেরেশতার সাথে তাল মিলিয়ে পাঠ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তাই তিনি তাকে নির্দেশ দিলেন — যখন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসে, তখন তিনি যেন মনোযোগ দিয়ে শোনেন। আর আল্লাহ নিজে দায়িত্ব নিলেন যে, তিনি তা তাঁর অন্তরে একত্রিত করবেন, সহজ করে দেবেন যেন তিনি ঠিক যেভাবে ওহী পৌঁছানো হয়েছে সেভাবে তা পরিবেশন করতে পারেন, এবং তিনি তা ব্যাখ্যা ও স্পষ্ট করে দেবেন। সুতরাং প্রথম অবস্থা হলো — অন্তরে একত্রিত করা, দ্বিতীয় — তা পাঠ করা, তৃতীয় — তার তাফসীর ও অর্থ পরিষ্কার করে দেওয়া। [তাফসীর ইবনে কাসীর ১৪/১৯৬]

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত

وعَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ فِي قَوْلِهِ – عز وجل -: {لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ} قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ – صلى الله عليه وسلم – إِذَا نَزَلَ عَلَيْهِ جِبْرِيلُ بِالْوَحْيِ كَانَ مِمَّا يُحَرِّكُ بِهِ لِسَانَهُ وَشَفَتَيْهِ فَيَشْتَدُّ عَلَيْهِ فَكَانَ ذَلِكَ يُعْرَفُ مِنْهُ فَأَنْزَلَ الله تَعَالَى {لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ (١٦)} أَخْذَهُ {إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ (١٧)} إِنَّ عَلَيْنَا أَنْ نَجْمَعَهُ فِي صَدْرِكَ وَقُرْآنَهُ فَتَقْرَؤُهُ {فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ (١٨)} قَالَ أَنْزَلْنَاهُ فَاسْتَمِعْ لَهُ {إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ (١٩)} أَنْ نُبيِّنَهُ بِلِسَانِكَ فَكَانَ إِذَا أَتَاهُ جِبْرِيلُ أَطْرَقَ فَإِذَا ذَهَبَ قَرَأَهُ كَمَا وَعَدَهُ الله (٢).

(٢) البخاري (٤٩٢٩)، مسلم (٤٤٨) واللفظ له.

তিনি আল্লাহর বাণীঃ لاَ تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ সম্পর্কে বলেন, কুরআন নাযিলের সময় নবী (ﷺ) তড়িঘড়ি তা আয়ত্ত করার নিমিত্ত ওষ্ঠ সঞ্চালন করতেন। এতে তাঁর অত্যধিক কষ্ট হতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা এই আয়াত নাযিল করলেনঃ لاَ تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ * إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ “তাড়াতাড়ি মুখস্ত করার লক্ষে আপনি জিহ্বা নাড়াবেন না। আমরা আপনার সীনায় তা সংরক্ষণ করব। যেন পরে আপনি তা পাঠ করতে পারেন।” এরপর জিবরীল (আ) যখন ওহীসহ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট আগমন করতেন, তখন তিনি তা নীরবে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতেন এবং জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নির্গমন করলে পর নবী (ﷺ) হুবহু তা আবৃতি করতেন। [বুখারী (৪৯২৯), মুসলিম (৪৪৮) — শব্দ মুসলিমের]

আবার কেউ বলেছেন: এখানে “নিস্ইয়ান” (ভুলে যাওয়া) বলতে ’পরিত্যাগ করা’ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ: হে মুহাম্মাদ! আমি তোমাকে কুরআন পাঠাব — ফলে তুমি এর কোনো কিছু আমল করতে পরিত্যাগ করবে না, তবে যা আল্লাহ রহিত করতে চান — তার আমল করা ছেড়ে দেবে।

Read More...  রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় পবিত্র কুরআন সংরক্ষণ

তাবারি (রহ) বলেন:

والقول الذي هو أولى بالصواب عندي قول من قال: معنى ذلك: فلا تنسى إلا أن نشاء نحن أن نُنسيكه بنسخه ورفعه؛ وإنما قلنا ذلك أولى بالصواب، لأن ذلك أظهر معانيه (١).

(١) تفسير الطبري ١٥/ ١٥٤، تفسير القرطبي ٢٠/ ٢٢.

আমার নিকট সবচেয়ে সঠিক মত হলো — এর অর্থ: ‘তুমি ভুলবে না, তবে যদি আমরা নিজেরা তা ভুলিয়ে দিতে চাই — নসখ (রহিত) করে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে।’ আমি একেই বেশি সঠিক বলেছি, কারণ এটিই আয়াতের সবচেয়ে সুস্পষ্ট অর্থ। [তাফসীরুত তাবারী, ১৫/১৫৪; তাফসীরুল কুরতুবী, ২০/২২]

এটি ছিল পবিত্র কুরআনের বিষয় — যার সংরক্ষণের দায়িত্ব বিশ্বজগতের রব নিজে নিয়েছেন। আর অন্যান্য কিতাবের ব্যাপারে আল্লাহ তাদের সংরক্ষণের দায়িত্ব তাদের (পূর্ববর্তী উম্মতের আলিমদের) ওপর অর্পণ করেছিলেন। ফলে তারা সেগুলোতে পরিবর্তন-বিকৃতি ঘটিয়েছে; আর এটাই তাদের অবস্থা। আল্লাহ বলেন: “তারা শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে।”(সূরা মায়িদা, ৫:১৩) আরও বলেন: “নিশ্চয় আমি তাওরাত নাযিল করেছি, তাতে ছিল হিদায়াত ও আলো, এর মাধ্যমে ইয়াহূদীদের জন্য ফয়সালা প্রদান করত অনুগত নবীগণ এবং রববানী ও ধর্মবিদগণ। কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল এবং তারা ছিল এর উপর সাক্ষী।”(সূরা মায়িদা, ৫:৪৪)

ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন:

 قيل: نزلت في أقوام من اليهود، قتلوا قتيلا وقالوا: تعالوا حتى نتحاكم إلى محمد، فإن أفتانا بالدية فخذوا ما قال، وإن حكم بالقصاص فلا تسمعوا منه. والصحيح أنها نزلت في اليهوديَّيْن اللذين زنيا، وكانوا قد بدلوا كتاب الله الذي بأيديهم، من الأمر برجم من أحْصن منهم، فحرَّفوا، واصطلحوا فيما بينهم على الجلد مائة جلدة، والتحميم والإركاب على حمار مقلوبين، فلما وقعت تلك الكائنة بعد هجرة النبي – صلى الله عليه وسلم -، قالوا فيما بينهم: تعالوا حتى نتحاكم إليه، فإن حكم بالجلد والتحميم فخذوا عنه، واجعلوه حجة بينكم وبين الله، ويكون نبي من أنبياء الله قد حكم بينكم بذلك، وإن حكم بالرجم فلا تتبعوه في ذلك (٢).

(٢) تفسير ابن كثير ٥/ ٢٢٠: ٢١٩.

কেউ কেউ বলেছেন: এ আয়াত ইয়াহুদীদের একটি গোষ্ঠী সম্পর্কে নাযিল হয়েছে — যারা একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বলেছিল: ‘এসো আমরা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট মীমাংসার জন্য যাই। তিনি যদি দিয়াতের (রক্তমূল্য) ফতোয়া দেন তাহলে তা গ্রহণ করব; আর যদি কিসাসের (প্রতিশোধ) নির্দেশ দেন, তাহলে তা শুনব না।’ কিন্তু সহীহ মত হলো: এ আয়াত তাদের দুইজন ইয়াহুদি সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল যারা ব্যভিচার করেছিল। তারা তাদের নিজেদের হাতে থাকা আল্লাহর কিতাব পরিবর্তন করেছিল — যাতে বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচারকারীদের রজমের (পাথর মেরে হত্যা) নির্দেশ ছিল। তারা তা পরিবর্তন করে একশো বেত্রাঘাত, কালো মুখ করা এবং উল্টো করে গাধায় চড়ানোর শাস্তি নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নিয়েছিল।

নবী (ﷺ)-এর হিজরতের পর যখন সেই ঘটনা (দুই ইয়াহুদির ব্যভিচার) সংঘটিত হলো, তখন তারা নিজেদের মধ্যে বলল: ‘এসো আমরা তার কাছে মীমাংসা নিয়ে যাই। সে যদি বেত্রাঘাত ও কালো মুখ করার শাস্তি দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করব এবং আল্লাহর নিকট আমাদের পক্ষে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করব যে, আল্লাহর একজন নবী আমাদের মধ্যে সে ফয়সালা দিয়েছেন। আর সে যদি রজমের ফয়সালা দেয়, তাহলে আমরা তা মানব না।’ [তাফসীর ইবনে কাসীর, ৫/২১৯-২২০]

বুখারি ও মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, একবার রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট একজন ইয়াহুদী পুরুষ এবং একজন ইয়াহুদী মহিলাকে আনা হল, যারা উভয়েই ব্যভিচার করেছিল। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের কাছে জানতে চাইলেন তাওরাতে ব্যভিচার ব্যক্তির শাস্তি কী? তারা বলল, উভয়ের মুখমণ্ডলে কালি লাগিয়ে দেই এবং উভয়কে বিপরীতমুখী করে উটের উপর উঠিয়ে পরিভ্রমণ করাই। রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন তাওরাত হতে দেখাতে। তারা তখন তাওরাত কিতাব নিয়ে এলো এবং পাঠ করতে শুরু করল।

যখন رجم (ব্যভিচারের শাস্তি) এর আয়াত আসলে তারা হাত آيَةِ الرَّجْمِ (পাথর নিক্ষেপের আয়াত) এর উপর রেখে এর আগের ও পেছনের অংশ পাঠ করলো। তখন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাযিঃ), বললেন, আপনি তাকে নির্দেশ করুন- যেন সে নিজের হাত উঠিয়ে ফেলে। তারপর দেখা গেল যে, এর নিচেই آيَةِ الرَّجْمِ (পাথর নিক্ষেপের আয়াত) রয়েছে। সুতরাং রসূলুল্লাহ (ﷺ) উভয়কে পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন।[11]বুখারী ৬৮৪১, মুসলিম ১৬৯৯

এটি বিকৃতি ও পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট দলিল। এই কারণেই সম্মানের অধিপতি আল্লাহ স্বয়ং তাঁর সম্মানিত কিতাব সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন।

ইমাম কুরতুবি (রহ) নিজের সনদে বলেন,

وقد أخرج القرطبي بسنده إلى يحيى بن أكثم قال: كان للمأمون – وهو أمير إذ ذاك – مجلس نظر، فدخل في جملة الناس رجل يهودي، حسن الثوب، حسن الوجه، طيب الرائحة، قال: فتكلم فأحسن الكلام والعبارة، قال: فلما أن تقوض المجلس، دعاه المأمون فقال له: إسرائيلي؟ قال نعم. قال له: أسلم حتى أفعل بك وأصنع، ووعده. فقال: ديني ودين آبائي! وانصرف.

قال: فلما كان بعد سنة جاءنا مسلمًا، قال: فتكلم على الفقه، فأحسن الكلام، فلما تقوض المجلس دعاه المأمون وقال: ألست صاحبنا بالأمس؟ قال له: بلى. قال: فما كان سبب إسلامك؟ قال: انصرفت من حضرتك، فأحببت أن أمتحن هذه الأديان، وأنت مع ما تراني حَسَنُ الخَطِّ، فعمدت إلى التوراة، فكتبت ثلاث نسخ، فزدت فيها، ونقصت، وأدخلتها الكنيسة فاشتُريت منى، وعمدت إلى الإنجيل، فكتبت ثلاث نسخ، فزدت فيها، ونقصت، وأدخلتها البيعة فاشتُريت منى، وعمدت إلى القرآن، فعملت ثلاث نسخ، وزدت فيها ونقصت، وأدخلتها الوراقين فتصفحوها، فلما أن وجدوا فيها الزيادة والنقصان؛ رموا بها فلم يشتروها، فعلمت أن هذا كتاب محفوظ، فكان هذا سبب إسلامي.

قال يحيى بن أكثم: فحججت تلك السنة، فلقيت سفيان بن عيينة فذكرت له الخبر فقال لي: مصداق هذا في كتاب الله عز وجل، قال قلت: في أي موضع؟ قال: في قول الله تبارك وتعالى في التوراة والإنجيل: “بما استحفظوا من كتاب الله”، فجعل حفظه إليهم فضاع، وقال عز وجل: “إنا نحن نزلنا الذكر وإنا له لحافظون”، فحفظه الله – عز وجل – علينا فلم يضع (٢).

(٢) تفسير القرطبي ١٠/ ١٠.

কুরতুবী (রহ.) ইয়াহইয়া ইবনে আকসামের সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন:

মামূন (রশীদ) তখনকার আমীর ছিলেন। তার একটি ‘মাজলিসে নাযার’ (বিতর্ক সভা) ছিল। একদিন এক ইহুদি লোক এসে উপস্থিত হল—সুন্দর পোশাক, সুন্দর চেহারা, সুগন্ধি মাখানো। তিনি আলোচনায় অংশ নিয়ে খুব সুন্দর বক্তব্য ও ভাষা ব্যবহার করলেন। সভা শেষ হলে মামূন তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘তুমি কি ইসরাঈলী (ইহুদি)?’ সে বলল: ‘হ্যাঁ।’ মামূন বললেন: ‘ইসলাম গ্রহণ কর; আমি তোমাকে অনেক দেব, অনেক করব’—এবং তাকে প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু সে বলল: ‘আমার ধর্ম ও আমার পূর্বপুরুষদের ধর্ম!’—এ বলে চলে গেল।

ইয়াহইয়া ইবনে আকসাম বলেন: এর এক বছর পর সে আমাদের কাছে মুসলমান হয়ে এল। তখন সে ফিকহ নিয়ে আলোচনা করল এবং খুব সুন্দর বক্তব্য দিল। সভা শেষ হলে মামূন তাকে ডেকে বললেন: ‘তুমি কি গত বছরের সেই ব্যক্তি?’ সে বলল: ‘হ্যাঁ।’ মামূন বললেন: ‘তাহলে ইসলাম গ্রহণের কারণ কী?’ সে বলল:

‘আপনার সভা থেকে ফিরে আমি ধর্মগুলোকে পরীক্ষা করার ইচ্ছা করলাম। আপনি তো আমাকে দেখেছেন, আমার লেখা খুব সুন্দর। আমি তাওরাত তিনটি কপি লিখলাম, তার মধ্যে কিছু বাড়ালাম, কিছু কমালাম। সেগুলো গির্জায় নিয়ে যাওয়ায় সেগুলো ক্রয় করা হলো। তারপর ইঞ্জিল তিনটি কপি লিখলাম, তাতেও বাড়ালাম ও কমালাম। সেগুলো গির্জায় নিয়ে যাওয়ায় সেগুলোও ক্রয় করা হলো। তারপর কুরআন তিনটি কপি লিখলাম, তাতেও বাড়ালাম ও কমালাম। সেগুলো কিতাব বিক্রেতাদের দোকানে রাখলাম। তারা সেগুলো পরিদর্শন করে, যখন বাড়তি ও কমতি দেখতে পেল, তখন ছুড়ে ফেলে দিল এবং কেউ কিনল না। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, এটি একটি সংরক্ষিত কিতাব। আর এটাই আমার ইসলাম গ্রহণের কারণ।’

ইয়াহইয়া ইবনে আকসাম বলেন: সেদিন আমি হজ করলাম এবং সেখানে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহর সাথে সাক্ষাৎ হলে আমি তাকে এ ঘটনা বললাম। তিনি বলেন: ‘এর সত্যতা আল্লাহর কিতাবে রয়েছে।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘কোন আয়াতে?’ তিনি বললেন: আল্লাহ তাওরাত ও ইঞ্জিল সম্পর্কে বলেন: ‘বিপরীত অর্থে তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের হিফাজতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল’ — ফলে তাদের হাতে হিফাজতের দায়িত্ব দেওয়ায় তা নষ্ট হয়ে গেছে। আর কুরআন সম্পর্কে বলেন: ‘নিশ্চয় আমরাই এই যিকির (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক’ — ফলে আল্লাহ নিজে কুরআন আমাদের জন্য সংরক্ষণ করেছেন, তাই তা নষ্ট হয়নি। [তাফসীরুল কুরতুবী, ১০/১০]

বকরির খাওয়া আয়াত সাহাবিদের স্মরণে থাকার প্রমান

এত আলোচনার পরেও যদি কেউ বলতে চায়, যে কুরআনের দুইটা আয়াত হারিয়ে গেছে। তাহলে তাকে নিশ্চয়ই অজ্ঞতা বলতে হয়। লিখিত কাগজ হারিয়ে যাওয়া এক জিনিস। কিন্তু বিপুল সংখ্যক সাহাবি ও নবীর স্ত্রীদের স্মৃতি হতে আয়াত দুটি চলে যাওয়া অবাস্তব জিনিস। কাগজটা যদি ছাগলে ভক্ষণও করে, তাহলে কিভাবে সম্ভব যে কুরআন মুখস্তকারী সাহাবিরা আর নবীর স্ত্রী আয়িশা, যিনি কুরআনের হাফিজা ছিলেন, তিনি আয়াত দুইটা ভুলে গেলেন? এটা অসম্ভব বিষয়।

আমরা সহীহ বুখারি মুসলিমের হাদিস সমূহ উপস্থাপন করব, যে এই লিখিত আয়াত দুইটা সাহাবিদের স্মরণে ছিল :
যেমন উমর (রা) এর বাণী:

اللَّهَ قَدْ بَعَثَ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم بِالْحَقِّ وَأَنْزَلَ عَلَيْهِ الْكِتَابَ فَكَانَ مِمَّا أُنْزِلَ عَلَيْهِ آيَةُ الرَّجْمِ قَرَأْنَاهَا وَوَعَيْنَاهَا وَعَقَلْنَاهَا فَرَجَمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَجَمْنَا بَعْدَهُ فَأَخْشَى إِنْ طَالَ بِالنَّاسِ زَمَانٌ أَنْ يَقُولَ قَائِلٌ مَا نَجِدُ الرَّجْمَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَيَضِلُّوا بِتَرْكِ فَرِيضَةٍ أَنْزَلَهَا اللَّهُ وَإِنَّ الرَّجْمَ فِي كِتَابِ اللَّهِ حَقٌّ عَلَى مَنْ زَنَى إِذَا أَحْصَنَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ إِذَا قَامَتِ الْبَيِّنَةُ أَوْ كَانَ الْحَبَلُ أَوْ الاِعْتِرَافُ

নিশ্চয় আল্লাহ মুহাম্মদকে (আল্লাহ তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন) সত্য সহকারে প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁর ওপর কিতাব নাযিল করেছিলেন। অতঃপর যা তাঁর ওপর নাযিল হয়েছিল তার মধ্যে রজমের আয়াত ছিল। আমরা তা পড়েছিলাম, তা মুখস্থ করেছিলাম এবং তা বুঝেছিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রজম করেছিলেন এবং আমরা তাঁর পরে রজম করেছিলাম। অতঃপর আমি আশঙ্কা করি — যদি মানুষের ওপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয় — তাহলে কোনো ব্যক্তি বলবে: “আমরা আল্লাহর কিতাবে রজম পাই না” ; ফলে তারা সেই ফরজটি পরিত্যাগ করার কারণে পথভ্রষ্ট হবে যা আল্লাহ নাযিল করেছিলেন। আর নিশ্চয় রজম আল্লাহর কিতাবে সত্য — সেই পুরুষ ও নারীর ওপর যে ব্যভিচার করে, যদি তারা বিবাহিত/সুযুক্ত (মুহসান) হয় — যখন প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়, অথবা গর্ভধারণ থাকে, অথবা (অভিযুক্তের) স্বীকারোক্তি থাকে।[12] Sahih Muslim 1691a

এই হাদিসে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে রজমের আয়াত উমার (রা) ও অন্যান্য সাহাবিরা মুখস্ত করেছেন তা তাদের স্মরণেও ছিল। পক্ষান্তরে তা কুরআনে অনুপস্থিত হওয়া স্বত্তেও তার হুকুম বলবত থাকা নাস্খের একটা বিশেষ ধরণ এবং এই ধরনের নাসখের কারণ নিয়ে, ইমাম সুয়ুতি তার ইকতানে আলোচনা করেছেন,

الضرب الثالث: ما نسخ تلاوته دون حكمه.
وقد أورد بعضهم فيه سؤالا.
وهو: ما الحكمة في رفع التلاوة مع بقاء الحكم، وهلا أبقيت التلاوة ليجتمع العمل بحكمها وثواب تلاوتها؟.
وأجاب صاحب الفنون بأن ذلك ليظهر به مقدار طاعة هذه الأمة في المسارعة إلى بذل النفوس بطريق الظن من غير استفصال لطلب طريق مقطوع به، فيسرعون بأيسر شيء، كما سارع الخليل إلى ذبح ولده بمنام، والنائم أدنى طريق الوحي.
وأمثلة هذا الضرب كثيرة، قال أبو عبيد: حدثنا إسماعيل بن إبراهيم، عن أيوب، عن نافع، عن ابن عمر، قال: لا يقولن أحدكم قد أخذت القرآن كله وما يدريه ما كله، قد ذهب منه قرآن كثير، ولكن ليقل قد أخذت منه ما ظهر

তৃতীয় প্রকার: যে আয়াতের তিলাওয়াত রহিত হয়েছে, কিন্তু বিধান বহাল আছে।

এ প্রসঙ্গে কেউ কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: হিকমত কী যে তিলাওয়াত উঠিয়ে নেওয়া হলো অথচ বিধান বহাল রাখা হলো? কেন তিলাওয়াতও বহাল রাখা হলো না, যেন মানুষ তার বিধানের ওপর আমলও করত এবং তিলাওয়াতের সওয়াবও পেত?

‘ফুনুন’ গ্রন্থের লেখক এভাবে উত্তর দেন: এতে এই উম্মতের আনুগত্যের মাত্রা প্রকাশিত হয় — যে তারা নিছক ধারণার ভিত্তিতেই (অর্থাৎ সরাসরি দলিল ছাড়াও) প্রাণ বিলাতে তৎপর হয়, যেমন ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নের ভিত্তিতে নিজের পুত্রকে কুরবানি দিতে তৎপর হয়েছিলেন, অথচ স্বপ্ন ওহী লাভের ন্যূনতম পথ মাত্র।

এ প্রকারের উদাহরণ অনেক। আবূ উবাইদ (রহ.) বলেন: ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম আইয়ূব-নাফি-ইবনে উমার (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন:

“তোমাদের কেউ যেন না বলে: ‘আমি পুরো কুরআন আয়ত্ত করেছি’ — কারণ সে কী জানবে পুরো কুরআন কী! কুরআনের অনেকাংশই (তিলাওয়াত থেকে) চলে গেছে। বরং সে বলুক: ‘যা প্রকাশ্য (অবশিষ্ট) আছে, তা আমি আয়ত্ত করেছি’।”[13] كتاب معترك الأقران في إعجاز القرآن 1/94

কেউ যদি, আমাদের সামনে এই প্রশ্ন উত্থাপন করে, যে রজমের আয়াতটা আসলে কি ছিল এবং রজমের আয়াতটার অস্তিত্ব যেহেতু এখন পাওয়া যায় না, সেহেতু আয়াতটা হারিয়ে গেছে, এবং মুসলিম উম্মাহ তা সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের জবাবে আমরা নিম্মোক্ত হাদিসকে উপস্থাপন করতে চাই, যে মুসলিম উম্মাহর নিকট এই নাসখ হওয়া আয়াতটিও মওজুদ আছে:

] حدَّثنا سعيدٌ، قال: نا حمَّادُ بنُ زيدٍ، عن عاصمِ بنِ بَهْدَلةَ، عن زِرِّ بنِ حُبيشٍ، قال: قال لي أُبيُّ بنُ كعبٍ: كأيِّنْ تَعُدُّ – أو كأيِّنْ تقرأُ – سورةَ الأحزابِ؟ قلتُ: كذا وكذا آية. قال: أقط؟! لقد رأيتها وإنها لتعدل سورة البقرة، وإن فيها: “الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة نكالا من الله والله عزيز حكيم”
سنده حسن؛

সাঈদ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: হাম্মাদ ইবনু যায়দ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি আসিম ইবনু বাহদালা থেকে, তিনি যির ইবনু হুবাইশ থেকে। তিনি বলেন: উবাই ইবনু কা’ব (রা.) আমাকে বললেন: ‘তুমি সূরা আল-আহযাবকে কত আয়াত মনে কর — বা তুমি কত আয়াত পড়?’ আমি বললাম: এত এত আয়াত। তিনি বললেন: ‘এতটুকুই?! আমি তা দেখেছি (অবস্থা পেয়েছি), নিশ্চয় এটি সূরা আল-বাকারার সমান দীর্ঘ ছিল। আর নিশ্চয় এর মধ্যে (নিম্নের আয়াতটি) ছিল: “বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধ নারী যখন ব্যভিচার করে, তখন তাদের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করো — আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি হিসেবে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।'” (এর সনদ হাসান।)[14] كتاب سنن سعيد بن منصور – تكملة التفسير – ط الألوكة 7/92

প্রশ্ন উঠতে পারে, যে উসমান (রা) এর সংকলিত কুরআনে এই আয়াতটির অনুপস্থিতি কি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর অনুমোদন সাপেক্ষে হয়েছিল কিনা?

এর স্বপক্ষে একটি হাদিস উপস্থাপন করা যায় যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রজমের আয়াত মুসআফে অন্তর্ভুক্ত করতে নারাজ ছিলেন:

حدثنا محمد بن جعفر، حدثنا شعبة، عن قتادة، عن يونس بن جبير، عن كثير بن الصلت قال: كان سعيد (١) بن العاص وزيد بن ثابت يكتبان المصاحف، فمروا على هذه الآية، فقال زيد: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: “الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة “، فقال عمر: لما أنزلت (٢) أتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم فقلت: أكتبنيها، قال شعبة:، فكأنه كره ذلك، فقال عمر: ألا ترى أن الشيخ إذا لم يحصن جلد، وأن الشاب إذا زنى وقد أحصن

মুহাম্মদ ইবনু জা’ফর আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: শু’বাহ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি কাতাদা থেকে, তিনি ইউনুস ইবনু জুবায়র থেকে, তিনি কাসির ইবনু সালত থেকে। তিনি বলেন: সাঈদ ইবনুল আস ও যায়েদ ইবনু সাবিত মুসহাফ (কুরআনের কপি) লিখছিলেন। তারা এই আয়াতটির কাছে পৌঁছলে যায়েদ বললেন: আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি: “বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধ নারী যখন ব্যভিচার করে, তখন তাদের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করো (রজম করো) — সম্পূর্ণরূপে।”

অতঃপর উমর (রা.) বললেন: যখন এটি নাযিল হলো, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বললাম: ‘আমার জন্য এটি লিখে দিন’।

শু’বাহ বলেন: যেন তিনি (নবী (ﷺ) ) তা অপছন্দ করলেন।

অতঃপর উমর (রা.) বললেন: তুমি কি দেখ না যে, বৃদ্ধ যদি বিবাহিত না হয় (অর্থাৎ অবিবাহিত হয়) তবে তাকে বেত্রাঘাত করা হয়, আর যুবক যদি ব্যভিচার করে এবং সে বিবাহিত হয় তবে তাকে রজম করা হয়?[15] كتاب مسند أحمد – ط الرسالة 35/472

উপরিউক্ত হাদিস প্রসঙ্গে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর ইমাম ত্বাবারী, প্রদান করেছেন:

الْقَوْلُ فِي الْبَيَانِ عَمَّا فِي هَذِهِ الْأَخْبَارِ مِنَ الْأَحْكَامِ إِنْ قَالَ لَنَا قَائِلٌ: مَا وَجْهُ هَذَا الْخَبَرِ الَّذِي ذَكَرْتَ عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ , عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: (الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ إِذَا زَنَيَا فَارْجُمُوهُمَا أَلْبَتَّةَ) , وَمَا مَعْنَى قَوْلِ عُمَرَ: «لَمَّا نَزَلَتْ أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ أَكْتِبْنِيهَا , فَكَأَنَّهُ كَرِهَ ذَلِكَ» وَقَوْلِهِ: «أَلَا تَرَى أَنَّ الشَّيْخَ إِذَا زَنَى وَقَدْ أُحْصِنَ جُلِدَ وَرُجِمَ , وَأَنَّ الشَّابَّ إِذَا زَنَى وَقَدْ أُحْصِنَ رُجِمَ وَلَمْ يُجْلَدْ» , أَمَرْجُومٌ الشَّيْخُ إِذَا زَنَى بِكُلِّ حَالٍ مُحْصَنًا كَانَ أَوْ غَيْرَ مُحْصَنٍ؟ , مَا الْمَعْنَى الَّذِي فَرَّقَ بَيْنَ حُكْمِهِ وَحُكْمِ الشَّابِّ إِذَا زَنَى , كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا وَقَدْ أُحْصِنَ؟ قِيلَ: أَمَّا خَبَرُ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَمْرِهِ بِرَجْمِ الشَّيْخِ وَالشَّيْخَةِ فَارْجُمُوهُمَا أَلْبَتَّةَ إِذَا زَنَيَا , فَإِنَّ مَعْنَاهُ: فَارْجُمُوهُمَا أَلْبَتَّةَ إِذَا كَانَا قَدْ أُحْصِنَا , فَإِنْ قَالُوا: وَمَا الْبُرْهَانُ عَلَى أَنَّ ذَلِكَ كَذَلِكَ وَلَيْسَ ذَلِكَ مَوْجُودًا فِي الْخَبَرِ؟ قِيلَ: الْبُرْهَانُ عَلَى أَنَّ ذَلِكَ كَذَلِكَ إِجْمَاعُ الْجَمِيعِ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ قَدِيمِهِمْ

যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে: যায়িদ ইবনে সাবিত (রা.) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে যে বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন — ‘বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা নারী যদি ব্যভিচার করে, তবে তাদের উভয়কে পূর্ণরূপে রজম করো’ — এর ব্যাখ্যা কী? এবং ওমর (রা.)-এর উক্তি: “যখন এই আয়াত নাযিল হলো, আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললাম, ‘আমার জন্য এটি লিখে দিন।’ তখন তিনি (ﷺ) তা অপছন্দ করলেন বলে মনে হলো” — এবং তাঁর আরও উক্তি: “তোমরা কি দেখছ না যে, বৃদ্ধ (মুহসান) ব্যভিচার করলে তাকে বেত্রাঘাত ও রজম উভয়ই করা হয়, অথচ যুবক (মুহসান) ব্যভিচার করলে তাকে শুধু রজম করা হয়, বেত্রাঘাত নয়?” — এসবের মানে কী?

প্রশ্ন হলো: বৃদ্ধ ব্যভিচারীকে সব অবস্থায় রজম করতে হবে — মুহসান (বিবাহিত সাবেক) হোক বা অ-মুহসান? যে কারণে তার এবং ব্যভিচারী যুবকের (উভয়ে মুহসান) মধ্যে বিধানের পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে, তার কারণ কী?

উত্তর: যায়িদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর বর্ণিত হাদীস — যেখানে বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ব্যভিচারীকে ‘পূর্ণরূপে রজমের’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে — তার অর্থ হলো: যখন তারা উভয়ে মুহসান (বিবাহিত সাবেক) হয়, তখনই তাদের রজম করতে হবে।

যদি তারা বলে: এর প্রমাণ কী যে এটি সেভাবেই, অথচ হাদীসের বক্তব্যে স্পষ্ট উল্লেখ নেই?

উত্তর: এর প্রমাণ হলো প্রাচীন ও আধুনিক সব আলিমের ঐকমত্য (ইজমা) যে এটি সেভাবেই।

وَأَمَّا قَوْلُ عُمَرَ: لَمَّا نَزَلَتْ أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , فَقُلْتُ أَكْتِبْنِيهَا , وَكَأَنَّهُ كَرِهَ ذَلِكَ , فَفِيهِ بَيَانٌ وَاضِحٌ أَنَّ ذَلِكَ لَمْ يَكُنْ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ الْمُنَزَّلِ كَسَائِرِ آي الْقُرْآنِ , لِأَنَّهُ لَوْ كَانَ مِنَ الْقُرْآنِ لَمْ يَمْتَنِعْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ إِكْتَابِهِ عُمَرَ ذَلِكَ , كَمَا لَمْ يَمْتَنِعْ مِنْ إِكْتَابِ مَنْ أَرَادَ تَعَلُّمَ شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ مَا أَرَادَ تَعَلُّمَهُ مِنْهُ , وَفِي إِخْبَارِ عُمَرَ عَنْ رَسُولِ

আর উমরের বক্তব্য: “যখন এটি নাযিল হলো, আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললাম: ‘আমার জন্য এটি লিখে দিন’ — যেন তিনি তা অপছন্দ করলেন” — এতে স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, এটি আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের অংশ ছিল না অন্যান্য কুরআনের আয়াতের মতো। কেননা যদি এটি কুরআনের অংশ হতো, তাহলে নবী (ﷺ) উমরকে তা লিখে দিতে অস্বীকার করতেন না — যেমন তিনি কুরআনের কোনো কিছু শিখতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে তা লিখে দিতে অস্বীকার করেননি। আর উমরের নবী (ﷺ) থেকে এ সংবাদ দেওয়ার মধ্যে —

القول في البيان عما في هذه الأخبار من الأحكام إن قال لنا قائل: ما وجه هذا الخبر الذي ذكرت عن زيد بن ثابت , عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه قال: (الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما ألبتة) , وما معنى قول عمر: ” لما نزلت أتيت النبي صلى الله عليه وسلم

এই সংবাদগুলোর মধ্যে যে বিধান রয়েছে তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে — যদি কোনো প্রশ্নকারী প্রশ্ন করে: আপনি যায়েদ ইবনু সাবিত (রা.) থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সূত্রে যে সংবাদটি উল্লেখ করেছ — “বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধ নারী যখন ব্যভিচার করে, তখন তাদের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করো — সম্পূর্ণরূপে” — এর ব্যাখ্যা কী? আর উমরের বক্তব্য “যখন এটি নাযিল হলো, আমি নবী (সা.)-এর কাছে এসে বললাম…” এর অর্থ কী?

الله صلى الله عليه وسلم أنه كره كتابة ما سأله إلا كتابه إياه من ذلك الدليل البين على أن حكم الرجم – وإن كان من عند الله تعالى ذكره – فإنه من غير القرآن الذي يتلى ويسطر في المصاحف , وَأَمَّا قَوْلُ عُمَرَ: أَلا تَرَى أَنَّ الشَّيْخَ إِذَا زَنَى وَقَدْ أَحْصَنَ جُلِدَ وَرُجِمَ , وَإِذَا لَمْ يُحْصَنْ جُلِدَ , فَفِيهِ أَيْضًا الدَّلِيلُ عَلَى صِحَّةِ مَا قُلْنَا مِنْ أَنَّ تَأْوِيلَ خَبَرِ زَيْدٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «الشَّيْخُ وَالشَّيْخَةُ فَارْجُمُوهُمَا أَلْبَتَّةَ» , إِنَّمَا هُوَ إِذَا كَانَا قَدْ أَحْصَنَا , لِأَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَوْ كَانَ أَمَرَ بِرَجْمِ الشَّيْخَيْنِ مُحْصِنَيْنِ كَانَا أَوْ غَيْرَ مُحْصِنَيْنِ , لَمْ يَكُنْ عُمَرُ مَعَ سَمَاعِهِ ذَلِكَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالَّذِي يَقُولُ: وَإِذَا لَمْ يُحْصِنَا جُلِدَا , فَيُبْطِلُ عَنْهُمَا الرَّجْمَ , مَعَ عِلْمِهِ بِحُكْمِ اللَّهِ فِيهِمَا بِالرَّجْمِ فَإِنْ قَالَ قَائِلٌ: فَمَا وَجْهُ قَوْلِ عُمَرَ: أَلَا تَرَى أَنَّ الشَّيْخَ إِذَا زَنَى وَقَدْ أَحْصَنَ جُلِدَ وَرُجِمَ؟ قِيلَ: ذَلِكَ قَوْلٌ قَدْ ذَكَرْنَاهُ عَنْ أَبِي أَنَّهُ كَانَ يُوَافِقُهُ عَلَيْهِ , وَذَكَرْنَا فِيمَا مَضَى مِنْ كِتَابِنَا هَذَا أَنَّ عَلِيًّا رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ كَانَ يَرَى جَلْدَ الزَّانِي الْمُحْصَنِ ثُمَّ رَجْمَهُ – شَابًّا كَانَ أَوْ شَيْخًا – وَقَدْ خَالَفَ ذَلِكَ مِنْ قَوْلِهِ جَمَاعَةٌ مِنَ السَّلَفِ وَعَامَّةٌ مِنَ الْخَلَفِ , وَقَالُوا: لَمْ نَجِدْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَ ذَلِكَ بِأَحَدٍ مِمَّنْ رَجَمَهُ فِي عَهْدِهِ , بَلْ كَانَ يَرْجُمُ الْمُحْصَنَ إِذَا زَنَى شَيْخًا كَانَ أَوْ شَابًّا , وَيَجْلِدُ الْبِكْرَ شَابًّا كَانَ أَوْ شَيْخًا

আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তিনি যা লেখার অনুরোধ করেছিলেন তা লিখতে অপছন্দ করেছেন — এটাই স্পষ্ট প্রমাণ যে, রজমের বিধান — যদিও তা আল্লাহর পক্ষ থেকে (সত্য) — তবে তা সেই কুরআনের অন্তর্ভুক্ত নয় যা তিলাওয়াত করা হয় এবং মুশাফসমূহে লিখিত হয়।

আর উমরের বক্তব্য: “তুমি কি দেখ না যে, বৃদ্ধ যখন ব্যভিচার করে এবং সে বিবাহিত (মুহসিন) হয়, তখন তাকে বেত্রাঘাত ও রজম উভয়ই করা হয়? আর যদি সে বিবাহিত না হয় তবে শুধু বেত্রাঘাত করা হয়?” — এতেও আমাদের কথার সঠিকতার প্রমাণ রয়েছে যে, যায়েদের হাদিসের ব্যাখ্যা — যেখানে তিনি বলেন: “বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধ নারীকে রজম করো সম্পূর্ণরূপে” — তা তখনই যখন তারা উভয়ে বিবাহিত (মুহসিন) হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা.) যদি বিবাহিত ও অবিবাহিত — উভয় অবস্থায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে রজম করার নির্দেশ দিতেন, তাহলে উমর (রা.) — যিনি তা রাসূলের কাছ থেকে শুনেছিলেন — তিনি কখনো বলতেন না: “যদি তারা বিবাহিত না হয় তবে তাদের বেত্রাঘাত করা হয়” — ফলে তাদের থেকে রজম বাতিল করে দেন — অথচ তিনি জানেন যে আল্লাহর বিধানে তাদের জন্য রজম আছে।

যদি কোনো প্রশ্নকারী বলে: “উমরের বক্তব্য ‘তুমি কি দেখ না যে, বৃদ্ধ যখন ব্যভিচার করে এবং সে বিবাহিত হয়, তখন তাকে বেত্রাঘাত ও রজম উভয়ই করা হয়?’ — এর ব্যাখ্যা কী?” উত্তর: এটি একটি মত — যা আমরা আবু (উবাই ইবনু কা’ব) থেকে উল্লেখ করেছি যে, তিনি এর সাথে একমত ছিলেন। আর আমরা আমাদের এই কিতাবের পূর্ববর্তী অংশে উল্লেখ করেছি যে, আলী (রা.)-এর মত ছিল — বিবাহিত ব্যভিচারীকে — যুবক হোক বা বৃদ্ধ — প্রথমে বেত্রাঘাত, তারপর রজম করা। তবে এই মতের বিরোধিতা করেছেন অনেক সালাফ (পূর্ববর্তী) এবং সাধারণভাবে পরবর্তী আলিমরা। তারা বলেছেন: আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তাঁর যামানায় যাদের রজম করেছেন — তাদের কারোর ওপর বেত্রাঘাত করতে দেখিনি। বরং তিনি বিবাহিত ব্যক্তিকে রজম করতেন — সে যুবক হোক বা বৃদ্ধ — আর অবিবাহিত ব্যক্তিকে বেত্রাঘাত করতেন — সেও যুবক হোক বা বৃদ্ধ।[16] كتاب تهذيب الآثار – مسند عمر 2/877

আর দুধপানের আয়াতের ব্যাপারে তো সরাসরি আয়িশা (রা) এর নিকট হতে সাক্ষ্য পাওয়া যায় যে তা রোহিত হয়ে গেছিল রাসূলুল্লাহর জীবদ্দশাতেই, সুতরাং তা হারিয়ে যাওয়ার প্রশ্নেই আসে না। এই সংক্রান্ত দলিল:

عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ ‏.‏ ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ فَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُنَّ فِيمَا يُقْرَأُ مِنَ الْقُرْآنِ ‏.‏

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরআনে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিলঃ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ ‘দশবার দুধপানে হারাম সাবিত হয়।’ তারপর তা রহিত হয়ে যায় خَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ এর দ্বারা। (পাঁচবার পান দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হয়) তারপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকাল করেন অথচ ঐ আয়াতটি কুরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত।[17] Sahih Muslim 1452a

এই হাদিসটার ব্যাখ্যা বিশদ, একটি আর্টিক্যালে[18] دعوى إنكار حديث نسخ الرضعات العشر المحرمات بخمس এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা আনা হয়েছে, আমরা প্রয়োজনীয় অংশটুকু এখানে উপস্থাপন করছি:

وقد قال الإمام النووي في تعليقه على هذا الحديث: “أراد بآية الرجم: الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما ألبتة وهذا مما نسخ لفظه وبقي حكمه، وقد وقع نسخ حكم دون اللفظ، وقد وقع نسخهما جميعا، فما نسخ لفظه ليس له حكم القرآن في تحريمه على الجنب ونحو ذلك، وفي ترك الصحابة كتابة هذه الآية دلالة ظاهرة أن المنسوخ لا يكتب في المصحف”.

ইমাম নববী (রহ.) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: “আয়াতুর রজম দ্বারা তিনি (উমার রা.) বোঝাতে চেয়েছেন: ‘বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা নারী যদি ব্যভিচার করে, তবে তাদের উভয়কে পূর্ণরূপে রজম করো’ — এটি সেই আয়াত যার লিখন রহিত হয়ে গেছে, কিন্তু বিধান বহাল আছে।”

“কখনো শুধু বিধান রহিত হয়েছে, লিখন বহাল আছে; আবার কখনো উভয়ই রহিত হয়েছে। যে আয়াতের লিখন রহিত হয়ে গেছে, তা কুরআনের আয়াতের মর্যাদা পায় না — যেমন অপবিত্র ব্যক্তির জন্য তা স্পর্শ করা হারাম নয়, ইত্যাদি। আর সাহাবাগণ এই আয়াত মুসহাফে না লেখার মাধ্যমে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন যে, রহিতকৃত (লিখন) মুসহাফে লেখা হয় না।” (শরহু সহীহ মুসলিম, ইমাম নববী (রহ.), তাহকীক: আদেল আব্দুল মাওজুদ ও আলী মু‘আওয়াজ, লাইব্রেরি: নিযার মুস্তাফা আল-বায, মক্কা মুকাররমা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪২২ হিজরি / ২০০১ খ্রিস্টাব্দ, ৬/২৬৩৩।)

وهذا الحديث الذي ذكر فيه أقوى دليل على ثبوت الرضاع بعشر، ثم نسخه بخمس قرآنا، ونسخ الأول تلاوة وحكما، والثاني تلاوة لا حكما.

এই হাদীসটি, যাতে উল্লেখ আছে, তা দশবার দুধপানের অস্তিত্বের ওপর সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ, অতঃপর তা কুরআন হিসেবে পাঁচবার দ্বারা রহিত করা হয়। প্রথমটি (দশবার) রহিত হয়েছে তিলাওয়াত ও বিধান উভয় দিক থেকে, আর দ্বিতীয়টি (পাঁচবার) রহিত হয়েছে শুধু তিলাওয়াতের দিক থেকে, বিধানের দিক থেকে নয়।

إذن الآية من القرآن، وبعد نسخها تلاوة أجمع على عدم كتابتها في المصحف. وإذا اعترض على هذا الحديث “بأنه لو كان من القرآن آية: عشر رضعات إلى آخره، ثم نسخت بآية خمس رضعات، لكان هناك ما يدل على نسخها لفظا حتى يعلم الحكم منها، مع أننا لم نجد ما يدل على ذلك.

অতএব আয়াতটি কুরআনের অন্তর্ভুক্ত ছিল, অতঃপর এর তিলাওয়াত রহিত হওয়ার পর এটিকে মুসহাফে না লেখার ওপর ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর যদি এই হাদীসটির বিরুদ্ধে এ বলে আপত্তি উত্থাপন করা হয় যে, “এটি যদি কুরআনের আয়াত হতো — দশবার দুধপান… ইত্যাদি — অতঃপর তা পাঁচবার দুধপানের আয়াত দ্বারা রহিত করা হতো, তাহলে এর লিখন রহিত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যেত, যেন এর বিধান জানা যায়; অথচ আমরা এরূপ কোনো দলীল পাই না”

أو أنه لو جاز نسخ آية بغير دليل لاحتج أعداء الدين بأن القرآن يتطرق إليه الاحتمال. وهذا يدل على أنه غير محفوظ مع أن الله – تبارك وتعالى – يقول: إنا نحن نزلنا الذكر وإنا له لحافظون (الحجر: 9)، أو أنها لو كانت قرآنا لكانت متواترة وليس كذلك؛ لأنها لم ترد إلا عن عائشة رضي الله عنها.

অথবা বলা হয়, “যদি কোনো প্রমাণ ছাড়াই আয়াত রহিত করা জায়েজ হয়, তাহলে দ্বীনের শত্রুরা বলবে যে, কুরআনের মধ্যে সংশয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। আর এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন সংরক্ষিত নয়, অথচ আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয় আমি এই স্মারক কুরআন নাজিল করেছি এবং নিশ্চয় আমি এর সংরক্ষক’ (সূরা হিজর, ৯)। অথবা বলা হয়, এটি যদি কুরআন হতো, তাহলে তাওয়াতুর (অকাট্য ও বহু বর্ণিত) মাধ্যমে প্রমাণিত হতো, কিন্তু তা নয়; কারণ এটি শুধু আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে।”

نقول: كل هذه الأوجه مدفوعة بأنه لا يلزم من نسخ الآية الثانية ذكر آية تدل على النسخ؛ لأن الحديث الذي ذكرته عائشة كاف في ثبوت الحكم، وهو كاف أيضا في الدلالة على النسخ، وعن قولهم: أنه لو جاز نسخ آية… إلى آخره، بأن هذا مسلم إذا لم يكن هناك ما يدل على النسخ، وقد قلنا: إن حديث عائشة دال عليه، واعترض على هذا أن ذلك يجوز نسخ القرآن بخبر الواحد، والقرآن قطعي وخبر الواحد ظني، ولا يجوز نسخ القطعي بالظني، قلنا: لا نسلم أنه مقطوع بقرآنيته؛ لأن القائل بذلك هي السيدة عائشة فهو ظني، فجاز نسخه بالظن، واعترض على هذا بأن القرآن شرطه التواتر، وما لم يتواتر ليس بقرآن، وأجيب بأن هذا لا يقدح في تواتر القرآن الكريم، فإن السيدة عائشة رضي الله عنها تقول: وتوفي رسول الله – صلى الله عليه وسلم- وهن فيما يتلى من القرآن، وكون التلاوة كانت موجودة في حياة النبي صلى الله عليه وسلم، ومدة بعد وفاته يؤكد أنها كانت من القرآن ومتلوة، وقد وقع الإجماع على ذلك ثم بعد ذلك على نسخها، فهي إذن قراءة متواترة.

আমরা বলি: এসব আপত্তির সবকটিই প্রত্যাখ্যাত। কারণ দ্বিতীয় আয়াতটি রহিত হওয়ার জন্য আলাদা করে কোনো আয়াত নাযিল হওয়া আবশ্যক নয়; আয়েশা (রা.)-এর বর্ণিত হাদীসটিই বিধান প্রমাণের জন্য যথেষ্ট এবং তা রহিত হওয়ার জন্যও যথেষ্ট। তাদের কথার জবাব: “আমি যদি দলিল ছাড়া আয়াত রহিত করা বৈধ হতো…” — তখন বলা হয়, যদি রহিত হওয়ার কোনো দলিল না থাকত তবে তা বৈধ হতো না; কিন্তু আমরা বলেছি আয়েশার হাদীসই তার দলিল।

আপত্তি: “এতে খবরে ওয়াহিদ (একক বর্ণনা) দ্বারা কুরআন রহিত করা হয়, অথচ কুরআন কাতি (নিশ্চিত) আর খবরে ওয়াহিদ জন্নি (অনিশ্চিত); নিশ্চিত জিনিসকে অনিশ্চিত দিয়ে রহিত করা যায় না।” উত্তর: আমরা স্বীকার করি না যে এটি (পাঁচবারের আয়াত) কুরআন হওয়া নিশ্চিত; কারণ এর বক্তা আয়েশা (রা.) — তাই এটি জন্নি। ফলে জন্নি দিয়ে জন্নি রহিত হওয়া বৈধ।

আপত্তি: “কুরআনের শর্ত তাওয়াতুর; যা তাওয়াতুরবিহীন তা কুরআনই নয়।” উত্তর: এতে পবিত্র কুরআনের তাওয়াতুরের কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ আয়েশা (রা.) বলেছেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকাল করেছেন অথচ এগুলো (দশ ও পাঁচবারের আয়াত) তিলাওয়াত হতো। নবী (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় ও তার মৃত্যুর পর কিছুকাল তিলাওয়াত বিদ্যমান থাকা প্রমাণ করে যে, তা কুরআনের অংশ ছিল এবং তিলাওয়াত হতো। পরে তার ওপর ইজমা হয় — প্রথমে তিলাওয়াত ছিল বলে ইজমা, পরে রহিত হওয়ার ওপর ইজমা। সুতরাং এটি তাওয়াতুরসম্পন্ন কিরাআত।  (আদেল আব্দুল মাওজুদ ও আলী মু‘আওয়াজ, লাইব্রেরি: নিযার মুস্তাফা আল-বায, মক্কা মুকাররমা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪২২ হিজরি / ২০০১ খ্রিস্টাব্দ, ৫/২২৫৮ — তাহকীককারীদের বক্তব্য থেকে সংক্ষেপিত।)

وقد دل حديث عائشة – رضي الله عنها – على الناسخ والمنسوخ من القرآن، وأن الثابت والراجح من أقوال أهل العلم هو التحريم بخمس رضعات، وقد قال به عدد من الصحابة – رضي الله عنهم- كعائشة وعبد الله بن الزبير وغيرهما، وهو مذهب الشافعي وأحمد في ظاهر مذهبه.

আয়েশা (রা.)-এর হাদীসটি কুরআনের নাসেখ (রহিতকারী) ও মানসূখ (রহিতকৃত) হওয়ার ব্যাপারে দলিল হিসেবে কাজ করে। আর আলিমদের মধ্যে স্থির ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হলো পাঁচবার দুধপান দ্বারা হারাম হয়। কয়েকজন সাহাবী এ মত গ্রহণ করেছেন, যেমন: আয়েশা (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের (রা.) ও অন্যান্য। এটি ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এবং ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর একাধিক মতে একটি প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। (আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, ড. ওয়াহবাহ আয-যুহায়লী, দারুল ফিকর, দামেস্ক, সংস্করণ তৃতীয়, ১৪০৯ হিজরি / ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ, খণ্ড ও পৃষ্ঠা: ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭১০)

এ থেকে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে, হাদিসটি সহীহ ও প্রমাণিত। আর আয়াতটি সেই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত যার উচ্চারণ রহিত হয়েছে কিন্তু বিধান বহাল আছে। তাই মুসহাফে এর অনুপস্থিতি প্রমাণ করে না যে, মুসহাফে বিকৃতি বা জালিয়াতি হয়েছে; বরং এর উচ্চারণ রহিত করা হয়েছে। আর উচ্চারণ রহিত হওয়া বিষয় মুসহাফে থাকা জরুরি নয়।

ثانيا. ليس في قول عائشة رضي الله عنها: توفي رسول الله -صلى الله عليه وسلم- وهن فيما يقرأ من القرآن – ما يدل على أن هذه الآيات قد حذفت من المصحف بتلاعب من النساخ:

দ্বিতীয়ত: আয়েশা (রা.)-এর এই উক্তি যে, “রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকাল করেছেন অথচ সেগুলো কুরআনের তিলাওয়াতকৃত অংশের অন্তর্ভুক্ত ছিল” — এতে কোনো প্রমাণ নেই যে, এই আয়াতগুলো নবী (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর লেখকদের হেরফের দ্বারা মুসহাফ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে

إن قول السيدة عائشة رضي الله عنها: توفي رسول الله- صلى الله عليه وسلم- وهن فيما يقرأ من القرآن ليس دليلا على حذف هذه الآيات من المصحف بعد موت رسول الله صلى الله عليه وسلم، إنما معناه: “أن النسخ بخمس رضعات، تأخر إنزاله جدا حتى أنه – صلى الله عليه وسلم- توفي وبعض الناس يقرأ خمس رضعات، ويجعلها قرآنا متلوا؛ لكونه لم يبلغه النسخ؛ لقرب عهده، فلما بلغهم النسخ بعد ذلك رجعوا عن ذلك، وأجمعوا على أن هذا لا يتلى”.

আয়েশা (রা.)-এর এই উক্তি: “রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকাল করেছেন অথচ এগুলো (এ আয়াতগুলো) কুরআনের মধ্যে তিলাওয়াত হতো” — এটি প্রমাণ করে না যে, রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুর পর এ আয়াতগুলো মুশহাফ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বরং এর অর্থ হলো: “পাঁচবার দুধপানের রহিতকারী আয়াতটি এত দেরিতে নাযিল হয়েছিল যে, রাসূল (সা.) ইন্তেকাল করলেন অথচ তখনো কিছু লোক পাঁচবার দুধপানের আয়াত তিলাওয়াত করত এবং এটিকে তিলাওয়াতযোগ্য কুরআন হিসেবে গণ্য করত — কারণ তাদের নিকট রহিত হওয়ার সংবাদ পৌঁছেনি; তা নাযিল হওয়ার সময় খুব কাছাকাছি ছিল। পরে যখন তাদের কাছে রহিত হওয়ার বিষয়টি পৌঁছল, তখন তারা তা থেকে ফিরে গেলেন এবং ইজমা হলো যে, এটি তিলাওয়াত করা যাবে না।” (শরহু সহীহ মুসলিম, ইমাম নববী (রহ.), তাহকীক: আদেল আব্দুল মাওজুদ ও আলী মু‘আওয়াজ, লাইব্রেরি: নিযার মুস্তাফা আল-বায, মক্কা মুকাররমা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪২২ হিজরি / ২০০১ খ্রিস্টাব্দ, ৫/২২৫৭।)

فلم تقصد السيدة عائشة – رضي الله عنها – بقولها: توفي رسول الله – صلى الله عليه وسلم- وهن فيما يقرأ من القرآن أن هذه الآيات – التي نسخت بعد ذلك – كانت تقرأ على مسمع من الجميع، إنما تقتصر على أنها كانت تقرأ لدى بعض الناس الذين لم يبلغهم حكم النسخ، حتى إذا بلغهم النسخ رجعوا عن ذلك.

সুতরাং আয়েশা (রা.) তাঁর এই উক্তির মাধ্যমে বোঝাতে চাননি যে, এই আয়াতগুলো (যা পরে রহিত হয়েছে) সবার শ্রুতিতে তিলাওয়াত হতো। বরং তিনি সীমাবদ্ধ করে বলতে চেয়েছেন যে, এগুলো কিছু লোকের কাছে তিলাওয়াত হতো, যারা রহিত হওয়ার বিধান জানত না। পরে যখন তারা রহিত হওয়ার কথা জানতে পারল, তখন তারা তা ছেড়ে দিল।

ومما يدل على ذلك أن السيدة عائشة – رضي الله عنها – لم تقل: توفي – صلى الله عليه وسلم- وهن من القرآن أي لم تؤكد قرآنيتها، بل قالت: فتوفي رسول الله – صلى الله عليه وسلم- وهن فيما يقرأ من القرآن أي: أرادت أنه توفي وبعض الناس يقرأه في جملة القرآن المنسوخ خطه.

এর প্রমাণ হলো, আয়েশা (রা.) বলেননি: “তিনি ইন্তেকাল করেছেন অথচ সেগুলো কুরআনের অংশ ছিল” — অর্থাৎ তিনি কুরআন হিসেবে সুনিশ্চিত করেননি। বরং বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকাল করেছেন অথচ সেগুলো কুরআনের তিলাওয়াতকৃত অংশের অন্তর্ভুক্ত ছিল” — অর্থাৎ তিনি ইন্তেকাল করেছেন এবং কিছু লোক তা সেই কুরআনের অংশ হিসেবে তিলাওয়াত করত, যার লেখা রহিত হয়েছিল।

ولا تعارض بذلك بين ما تقصده السيدة عائشة – رضي الله عنها – وبين حفظ كتاب الله من التحريف، وتدل على ذلك عدة مسائل:

এতে আয়েশা (রা.) যা বোঝাতে চেয়েছেন এবং আল্লাহর কিতাব বিকৃতি থেকে সংরক্ষিত — এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। নিচের কয়েকটি বিষয় এ প্রমাণ করে:

الأولى: أنه من المعلوم لكل من وقف على تواتر القرآن وسلامة نقله وحفظه بعناية رب العالمين أنه إذا تعارض حديث مع ما نعلمه عن هذا التواتر والنقل والحفظ يكون الإشكال في الحديث وليس في القرآن؛ لأن الأخير متواتر ثابت ثبوتا قطعيا لا شك فيه، لذا عند التعارض لا يجوز عقلا التشكيك في القرآن، وهذا من بدهيات المنطق.

প্রথমত: এটি প্রত্যেকের জানা বিষয় যে, পবিত্র কুরআন তাওয়াতুর (অজস্র সূত্রে বর্ণিত), এর সংক্রমণ নির্ভেজাল এবং বিশ্বজগতের রবের যত্নে এটি সংরক্ষিত। সুতরাং যখন কোনো হাদীস কুরআনের এই তাওয়াতুর ও সংরক্ষণের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখন সমস্যাটি হাদীসের মধ্যে, কুরআনে নয়। কেননা কুরআন তাওয়াতুর দ্বারা সুপ্রমাণিত, নিশ্চিত ও সন্দেহাতীত। কাজেই এ দুয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে কুরআন সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা বুদ্ধিসম্মত নয় — এটি যুক্তির প্রাথমিক ও সুস্পষ্ট বিষয়।

الثانية: أن منطوق الحديث لا يستوجب كون الآية غير منسوخة قبل وفاة النبي – صلى الله عليه وسلم- بل إن غاية ما يدل عليه أنه كان هناك من لا يزال يعتبرها جزءا من القرآن حتى بعد وفاة النبي – صلى الله عليه وسلم- ويجعلها في تلاوته، وهذا غالبا لجهلهم بوقوع النسخ.

দ্বিতীয়ত: হাদীসের সুস্পষ্ট বক্তব্য এ দাবি করে না যে, আয়াতটি নবী (ﷺ)-এর মৃত্যুর আগে রহিত হয়নি। বরং এর দ্বারা সর্বোচ্চ যা প্রমাণিত হয় তা হলো — নবী (ﷺ)-এর মৃত্যুর পরও এমন কিছু লোক ছিল যারা এ আয়াতটিকে এখনো কুরআনের অংশ মনে করত এবং তাদের তিলাওয়াতে অন্তর্ভুক্ত করত; এবং এটি মূলত রহিত হওয়া সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার কারণেই ঘটেছিল।

الثالثة: أن من تأمل وضع الإسلام وقت وفاة النبي – صلى الله عليه وسلم- واتساع رقعته، حتى شملت الجزيرة العربية واليمن وجنوب الشام – أدرك أنه من المحال عقلا أن يعلم كل المسلمين بوقوع النسخ في أي آية في نفس الوقت، وأنه من الوارد جدا – بل من المؤكد – أن العديدين كانوا يتلون بعض الآيات المنسوخة تلاوتها؛ لبعدهم المكاني عن مهبط الوحي، وهذا مما لا مناص من الاعتراف به. وما كلام عائشة – رضي الله عنها – إلا إقرار بهذا الوضع.

তৃতীয়ত: যে ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর ইন্তেকালের সময় ইসলামের বিস্তৃতি সম্পর্কে চিন্তা করবে যা আরব উপদ্বীপ, ইয়েমেন ও দক্ষিণ সিরিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল, সে বুঝতে পারবে যে, যেকোনো আয়াত রহিত হওয়ার খবর সব মুসলিম একই সময়ে জানতে পারে — এটি যুক্তিসিদ্ধ নয় বরং অসম্ভব। বরং এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় — বরং নিশ্চিত — যে, অনেক মুসলিম ওহী নাযিলের কেন্দ্রস্থল থেকে দূরবর্তী থাকার কারণে তিলাওয়াতরহিত কিছু আয়াত তখনও তিলাওয়াত করত। এটি এমন একটি বাস্তবতা যা স্বীকার করতেই হবে। আর আয়েশা (রা.)-এর বক্তব্য এ অবস্থারই স্বীকৃতি মাত্র।

الرابعة: أن من يرى أن الآية قد حذفها النساخ عند جمع القرآن عليه البيان: فما هو الداعي لحذف مثل هذه الآية من القرآن إن كانت حقا غير منسوخة؟ وما الفائدة التي تعود من حذفها؟ فليس لها أي أهمية عقدية، بل هي تختص بأحد الأحكام الفقهية، وهو حكم ثابت في العديد من الأحاديث الشريفة، ولا يمكن إنكاره، فما الداعي لحذف هذه الآية إذن؟!

চতুর্থ: যারা মনে করে যে, কুরআন সংকলনের সময় লেখকরা আয়াতটি বাদ দিয়েছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন: আয়াতটি যদি সত্যিই অ-রহিত হতো, তাহলে কুরআন থেকে এমন আয়াত বাদ দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? বাদ দেওয়ার দ্বারা কী লাভ হতো? এর কোনো আকিদাগত গুরুত্ব নেই, বরং এটি একটি ফিক্বহি বিধান বিশেষ, যা বহু হাদিসে প্রমাণিত এবং অস্বীকার করা যায় না। তাহলে এই আয়াত বাদ দেওয়ার কী যুক্তি ছিল?

الخامسة: أن السيدة عائشة رضي الله عنها راوية الحديث لا يمكن أن يكون قصدها من الرواية الطعن في جمع القرآن؛ لأنها عاصرت هذا الجمع، وكانت من أبرز المناصرين له، وبخاصة في الجمع الأخير الذي قام به أمير المؤمنين عثمان بن عفان رضي الله عنه، ولو كان لها أية مؤاخذات لجاهرت بها ولاعترضت على عثمان رضي الله عنه، ولكن هذا لم يحدث ولو حدث لعلمناه، بل إن موقف عائشة رضي الله عنها من قتلة عثمان يدل على أنها لم تشكك يوما في إمامته وخلافته.

পঞ্চম: হাদিসের বর্ণনাকারী উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) তাঁর বর্ণনার মাধ্যমে কুরআন সংকলনের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার উদ্দেশ্য রাখতে পারেন না। কারণ তিনি এই সংকলন প্রত্যক্ষ করেছেন এবং এর সবচেয়ে বড় সমর্থকদের মধ্যে ছিলেন, বিশেষ করে আমিরুল মুমিনীন উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর করা সর্বশেষ সংকলনের ব্যাপারে। তাঁর যদি কোনো আপত্তি থাকত, তিনি তা প্রকাশ করতেন এবং উসমান (রা.)-এর বিরোধিতা করতেন। কিন্তু তা ঘটেনি; ঘটলে আমরা তা জানতাম। বরং উসমানের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আয়েশা (রা.)-এর অবস্থান প্রমাণ করে যে, তিনি কখনো তাঁর ইমামত ও খিলাফত নিয়ে সন্দেহ করেননি।(আল-মুফাসসাল ফির রাদ্দি আলা শুবুহাতি আ‘দাইল ইসলাম — সংকলন ও প্রণয়ন: আলী ইবনে নায়েফ আশ-শাহুদ, ১০/৪৬০ (সংক্ষেপিত ও সামান্য পরিবর্তিত)।)

একই কথা তাকীউদ্দিন সুবকি (রহ)-ও (মৃ. ৭৭১ হি.) বলেছেন, তিনি বলেন:

النسائي عن أبي أمامة اسعد بن سهل بن حنيف عن خالته قالت لقد أقرأناها رسول الله صلى الله عليه وسلم آية الرجم والشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البته بما قضينا من لديهما وإسناده جيد والمراد بالشيخ والشيخة المحصن والمحصنة قلت وأنا لا يبين لي معنى قول عمر رضي الله عنه لولا ان يقول الناس زاد عمر في كتاب الله لكتبتها إذ ظاهر هذا ان كتابتها جائزة وإنما منعه من ذلك قول الناس والجائز في نفسه قد يقوم من خارج ما يمنعه.

وإذا كانت كتابتها جائزة لزم ان تكون التلاوة باقية لأن هذا شأن المكتوب وقد يقول القائل في مقابلة هذا لو كانت التلاوة باقية لبادر عمر رضي الله عنه الى كتابتها ولم يعرج على مقال الناس لأن مقال الناس لا يصلح مانعا من فعل هذا الواجب وبالجملة لا يبين لي هذه الملازمة اعني لولا قول الناس لكتبت ولعل الله ان ييسر علينا حل هذا الأثر بمنه وكرمه فانا لا نشك في ان عمر رضوان الله عليه إنما نطق بالصواب ولكنا نتهم فهمنا واما نسخهما معا فكما روي عن عائشة رضي الله عنها أنها قالت كان فيما انزل عشر رضعات معلومات فتوفي رسول الله صلى الله عليه وسلم وهي فيما يقرأ من القرآن رواه مسلم ونحن نعلم انه ليس في القرآن اليوم وان حكمه غير ثابت وقد تكلم العلماء في قولها وهي فيما يقرا من القرآن فإن ظاهره يقتضي ان التلاوة باقية وليس كذلك فمنهم من أجاب بان المراد قارب الوفاة والأظهر في الجواب ان التلاوة نسخت ايضا ولم يبلغ ذلك كل الناس الا بعد وفاة رسول الله صلى الله عليه وسلم فتوفي وبعض الناس يقرأها فيصدق انه توفي وهي فيما يقرأ.

واعترض الهندي بأن ثبوت نسخ تلاوة ما هو من القرآن وحكمه يتوقف على كونه من القرآن وكونه من القرآن لا يثبت بخبر الواحد فلا يثبت به تلاوة ما هو من القرآن وحكمه معا قلت والاعتراض وارد ايضا في منسوخ التلاوة دون الحكم فلا ينبغي ان يقصره على هذا القسم ثم قال الهندي ممكن ان يجاب بان القرآن المثبت بين الدفتين هو الذي لا بد في نقله من التواتر وأما المنسوخ فلا نسلم أنه لا يثبت بخبر الواحد سلمنا لكن الشيء قد يثبت ضمنا بما لا يثبت به استقلالا كما قال بعض الأصوليين

ص243 – المسألة الخامسة: نسخ الحكم دون التلاوة وبالعكس

إذا قال الصحابي في أحد الخبرين المتواترين إنه كان قبل الآخر قبل ولزم منه نسخ المتأخر وان لم يقبل قوله في نسخ المعلوم ولقائل ان يقول لا يندفع السؤال بواحد من الجوابين أما الأول فأنا لا نعقل كونه منسوخا حتى نعقل كونه قبل ذلك من القرآن وكونه من القرآن لا يثبت بخبر الواحد قلنا وقوله لا نسلم ان القرآن المنسوخ لا يثبت بخبر الواحد لأن نسخه لا يكون الا بعد ثبوت كونه من القرآن ثم يرد النسخ بعد ذلك متأخرا في الزمان فيصدق إثبات قرآن غير منسوخ بخبر الواحد ثم إثبات نسخه بخبر الواحد ويوضح هذا ان قول الراوي كانت الكلمة الفلانية من القرآن ثم نسخت تلاوة وحكما في قوة خبرين احدهما أنها من القرآن والثاني أنها منسوخة وكلا الخبرين لا يكفي فيه خبر الواحد واما الثاني ففيما نحن فيه لم يتعارض وليلان وفيما استشهد به تعارض دليلان فلذلك رجحنا في موضع التعارض بمرجح ما وهو قول الصحابي هذا متقدم وإنما الذي يظهر في الجواب عن هذا السؤال أن زماننا هذا ليس زمان النسخ وفي زمان النسخ لم يقع النسخ بخبر الواحد.

فرع: قال الآمدي هل يجوز بعد نسخ تلاوة الآية ان يمسها المحدث ويتلوها الجنب تردد فيه الأصوليون والأشبه المنع من ذلك قلت الخلاف وجهان لأصحابنا والصحيح جواز المس والحمل وقول الآمدي ان المنع أشبه ممنوع وذكر الرافعي في أول باب خلافه حد الزنا ان القاضي ابن كج حكى عن بعض الأصحاب وجها انه قرأ قارىء آية الرجم في الصلاة لم تفسد والصحيح خلافه

নাসাঈ আবূ উমামাহ আসআদ ইবনে সাহল ইবনে হুনাইফের মাধ্যমে তার খালা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে রজমের আয়াতটি এভাবে পড়িয়েছিলেন: ‘বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা নারী যদি ব্যভিচার করে, তবে তাদের উভয়কে পূর্ণরূপে রজম করো — আমাদের পক্ষ থেকে নির্ধারিত শাস্তি হিসেবে।’ এর সনদ ভালো। আর ‘বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা’ বলতে এখানে মুহসান (বিবাহিত সাবেক) পুরুষ ও নারী বোঝানো হয়েছে।

আমি বলছি: ওমর (রা)-এর উক্তি — ‘লোকে যদি না বলত যে, ওমর আল্লাহর কিতাবে বাড়তি কিছু করল, তাহলে আমি অবশ্যই তা লিখতাম’ — এর অর্থ আমার কাছে স্পষ্ট নয়। কেননা এর আপাত অর্থ হলো, তা লেখা জায়েজ ছিল; কিন্তু লোকের কথা তাকে বাধা দিয়েছে। যে কাজ নিজে বৈধ, বাইরের কোনো কারণ এসে তাকে বাধা দিতে পারে। যদি তা লেখা জায়েজ হতো, তাহলে এর তিলাওয়াতও অবশিষ্ট থাকা আবশ্যক, কারণ লিখিত বিষয়টিই তিলাওয়াতের ক্ষেত্রেও একই। কেউ বলতে পারে: যদি তিলাওয়াত অবশিষ্ট থাকত, তাহলে ওমর (রা.) দ্রুত তা লিখতেন এবং লোকের কথায় কর্ণপাত করতেন না, কেননা মানুষের বাক্য কোনো ওয়াজিব কাজ করার পথে বাধা হতে পারে না। সংক্ষেপে, ‘লোকের কথা না থাকলে লিখতাম’ — এই কথাটির অর্থ আমার কাছে স্পষ্ট নয়। হয়তো আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে আমাদের এ সমস্যার সমাধান দান করবেন। ওমর (রা.) নিশ্চয়ই সত্যই বলেছেন; বরং আমাদের বুঝতে সমস্যা হচ্ছে।

উভয় (তিলাওয়াত ও বিধান) রহিত হওয়া প্রসঙ্গে — যেমন আয়েশা (রা.) বলেন: ‘দশবার নির্ধারিত দুধপান কুরআনের আয়াত হিসেবে নাযিল হয়েছিল, আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকাল করেছেন অথচ তা কুরআনের মধ্যে তিলাওয়াত হতো’ (মুসলিম)। অথচ আজ কুরআনে তা নেই এবং এর বিধানও বহাল নেই। আলিমগণ আয়েশার বক্তব্য ব্যাখ্যায় বলেন: উদ্দেশ্য মৃত্যু ঘনিয়ে আসার সময় পর্যন্ত। আরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা হলো: তিলাওয়াতও রহিত হয়েছিল, কিন্তু তা সকলের কাছে রাসূলের মৃত্যুর আগে পৌঁছে নি। ফলে তিনি ইন্তেকাল করলেন অথচ তখনও কিছু লোক তা তিলাওয়াত করছিল — এ অবস্থায় বলা যায়, ‘তিনি ইন্তেকাল করেছেন অথচ তা তিলাওয়াত হতো’।

হিন্দি আপত্তি করেন: কুরআনের তিলাওয়াত রহিত হওয়া ও বিধান বহাল থাকা — এ কথা প্রমাণিত হওয়া নির্ভর করে প্রথমে তা কুরআন ছিল কি না, অথচ একক বর্ণনা দিয়ে কুরআন হওয়া প্রমাণিত হয় না; কাজেই একক বর্ণনা দিয়ে তিলাওয়াত ও বিধান উভয় রহিত হওয়াও প্রমাণিত হয় না। আমি বলছি: এ আপত্তি শুধু তিলাওয়াত রহিত ও বিধান বহাল অংশের জন্য নয়, বরং তিলাওয়াত ও বিধান উভয় রহিত হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে হিন্দির এ আপত্তি শুধু এক প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। হিন্দি বলেন: এ জবাব দেওয়া যেতে পারে যে, কুরআন যেটি দুই মলাটের মধ্যে সংরক্ষিত তা তাওয়াতুর দ্বারাই প্রমাণিত। কিন্তু রহিতকৃত কুরআন একক বর্ণনা দিয়ে প্রমাণিত হবে কি না — তা আমরা স্বীকার করি না। আর স্বীকার করলেও কিছু বিষয় পরোক্ষভাবে প্রমাণিত হয় যদিও সরাসরি না হয় — যেমন কেউ কেউ উসূলবিদ বলেছেন।

পৃষ্ঠা ২৪৩ – পঞ্চম বিষয়: বিধান রহিত হওয়া তিলাওয়াত রহিত না হয়ে, এবং এর বিপরীত।

যখন কোনো সাহাবি দুটি আপাত তাওয়াতুরসম্পন্ন বর্ণনার মধ্যে একটিকে অপরটির আগে বলে দেন, তখন দ্বিতীয়টি মানসুখ (রহিত) প্রমাণিত হয় — যদিও তার একক বর্ণনা সরাসরি গৃহীত না হয়। উত্তরে বলা যায়: রহিত হওয়ার জন্য সেটি আগে কুরআন ছিল তা জানা আবশ্যক — আর কুরআন হওয়া একক বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় না। আমরা বলি: রহিতকৃত কুরআন একক বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় না — এটা আমরা স্বীকার করি না। স্পষ্টত: বর্ণনাকারীর ‘এটি কুরআনের আয়াত ছিল, অতঃপর তিলাওয়াত ও বিধান রহিত হয়েছে’ — এ বক্তব্য দুটি খবরের মর্যাদা রাখে: (ক) এটি কুরআন ছিল, (খ) এটি রহিত হয়েছে। আর এ দুটির কোনোটিই একক বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। আর দ্বিতীয় বিষয়ে: এখানে দুটি দলিল পরস্পর সাংঘর্ষিক নয়; যেখানে সাংঘর্ষিক, সেখানে সাহাবির বক্তব্য (‘এটি আগের’) দ্বারা একটিকে প্রাধান্য দেওয়া যায়। প্রকৃত জবাব হলো: আমাদের সময় রহিত হওয়ার সময় নয়; আর যেসব সময়ে রহিত হওয়া ঘটেছে, সেসব সময়ে একক বর্ণনার ভিত্তিতে রহিত হওয়া ঘটেনি।

শাখা প্রশ্ন: তিলাওয়াত রহিত হওয়ার পর অপবিত্র ব্যক্তি কি সেই আয়াত স্পর্শ করতে পারবে এবং জানাবাতকারী কি তা পড়তে পারবে? উসূলবিদগণ এ ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত। নিকটবর্তী মত হলো — নিষেধ করা। আমি বলছি: এ ব্যাপারে আমাদের আলিমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে। সঠিক মত হলো — স্পর্শ করা ও বহন করা জায়েজ। আর আমাদির ‘নিষেধ করাই বেশি সঠিক’ — এ বক্তব্য ঠিক নয়। রাফেয়ী বর্ণনা করেছেন যে, কাজী ইবনে কুজ আমাদের আলিমদের কারও কারও মত উদ্ধৃত করেছেন যে, কেউ যদি নামাজে রজমের আয়াত পড়ে, তবে তার নামাজ নষ্ট হয় না। আর সঠিক মত হলো এর বিপরীত।[19] كتاب الإبهاج في شرح المنهاج – ط العلمية 2/242

কেউ যদি প্রশ্ন করেন, সূরাহ বাকারাহর ১০৬ নম্বর আয়াত্ত অনুসারে তো কোন আয়াত উঠিয়ে নিলে নতুন উত্তম আয়াত দেবার কথা, তাহলে পাচবার দুধপানের আয়াতের তেলাওয়াত রহিত হওয়ার পরেও এর স্থলে নতুন কোন বিধান পাওয়া কেন যায়না?

এর জবাবে বদরউদ্দিন যারকাসী (মৃ. ৭৯৪ হি.) বলেন:

لا يشترط في النسخ أن يخلفه بدل؛ كما في نسخ الصدقة في مناجاة الرسول، والإمساك بعد الإفطار في ليالي رمضان

রহিতকরণের (নাসখ) জন্য এটা শর্ত নয় যে, তার পরিবর্তে কোনো বিকল্প বিধান আসবে; যেমন রাসূলের সাথে গোপনে কথোপকথনের সময় সাদকা (দান) দেওয়ার বিধান রহিত হওয়া এবং রমজানের রাতগুলোতে ইফতারের পর (যদি ঘুমিয়ে পড়ে) আহার-পান থেকে বিরত থাকার বিধান রহিত হওয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়।[20] كتاب البحر المحيط في أصول الفقه – ط الكتبي 5/236

ইবনে নাজ্জার আল হানবালি (রহ) (মৃ. ৯৭২ হি.) বলেন:

ويجوز نسخ بلا بدل عن المنسوخ عند أكثر العلماء

অধিকাংশ আলিমের মতে, রহিতকৃত বিধানের পরিবর্তে কোনো বিকল্প বিধান ছাড়াই রহিতকরণ জায়েজ।[21] كتاب شرح الكوكب المنير = شرح مختصر التحرير 3/545

কাজেই যারা বলেন, যে দুইটা আয়াত ছাগলে খেয়ে ফেলছিল, তা নিতান্তই ভিত্তিহীন দাবি। ইসলামের প্রাথমিক যুগের সালাফ ও স্কলারদের মাঝে এই আয়াত দুইটা হারায়ে যাওয়া বা সত্যিকার অর্থেই যদি তা ছাগলে খেয়ে ফেলার মতন ঘটনা ঘটেও থাকে তা নিয়ে কোন সংশয় বা বিচলতা পাওয়া যায় না। সুতরাং ইবনে মাজাহর উক্ত হাদিস হাসান পর্যায় ভুক্ত হলেও তা কুরআনের সংরক্ষণে কোন সমস্যা সৃষ্টি করেনা। কারণ এই ঘটনা ঘটনার সময় ও তার পরে অর্থাৎ উসমান (রা) এর কুরআন সংকলনের সময় পর্যন্ত স্বয়ং আয়িশা (রা) ও অন্যান্য সাহাবি যেমন উবাই ইবনে কাব, যায়িদ ইবনে সাবিত সহ অনেকে জীবিত ছিলেন। মুসআফ যদি খাটের নিচে থেকে ছাগলে খেয়েও ফেলে তাহলে, ওহী লেখক সাহাবি, হাফেজ সাহাবী ও নবীর স্ত্রীর স্মৃতিতে তা অবশ্যই সংরক্ষিত ছিল। So it does not make any difference.. এটা এমন কোনই কন্ট্রোভর্সিয়াল ইস্যু না। এই ভিত্তিহীণ অভিযোগের সূত্রপাত খ্রিস্টান পাদ্রীদের হাতে যারা ধারণা করে, কুরআন কোন লিখিত বই, বা তাদের মাজহুল বা অজ্ঞাত লেখকের রচিত বাইবেলের মতন যা ম্যানুস্ক্রিপ্টের উপর নির্ভরশীল সংরক্ষণের জন্য। কুরআন সংরক্ষণের পদ্ধতি কখনই লেখনি ছিলনা। ছিল কিরআত আত্নস্থ করণ।

যা এই সমগ্র কন্ট্রোভর্সির গলায় ফাস ধরিয়ে দেবার জন্য একাই যথেষ্ট।

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 Sahih Muslim 2865a
2 كتاب البحر المحيط الثجاج في شرح صحيح الإمام مسلم بن الحجاج 44/64
3 كتاب التعليقات الحسان على صحيح ابن حبان 6/426
4 كتاب سنن سعيد بن منصور – بداية التفسير – ت الحميد 2/432
5 كتاب مسند الدارمي – ت حسين أسد 4/2092
6 সূত্র: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৯৪৪
7 كتاب مسند أبي يعلى – ت السناري 6/497-500
8 كتاب سنن ابن ماجه – ت الأرنؤوط 3/125
9 كتاب موسوعة محاسن الإسلام ورد شبهات اللئام 4/15-17
10 كتاب موسوعة محاسن الإسلام ورد شبهات اللئام 4/17-24 
11 বুখারী ৬৮৪১, মুসলিম ১৬৯৯
12 Sahih Muslim 1691a
13 كتاب معترك الأقران في إعجاز القرآن 1/94
14 كتاب سنن سعيد بن منصور – تكملة التفسير – ط الألوكة 7/92
15 كتاب مسند أحمد – ط الرسالة 35/472
16 كتاب تهذيب الآثار – مسند عمر 2/877
17 Sahih Muslim 1452a
18 دعوى إنكار حديث نسخ الرضعات العشر المحرمات بخمس
19 كتاب الإبهاج في شرح المنهاج – ط العلمية 2/242
20 كتاب البحر المحيط في أصول الفقه – ط الكتبي 5/236
21  كتاب شرح الكوكب المنير = شرح مختصر التحرير 3/545
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button