ইসলাম পৃথিবীকে সমতল বলে?
ইসলাম পৃথিবীকে সমতল বলে এই মর্মে দলিলগুলো যাচাই - পর্ব ১

- ইসলামে সমতল পৃথিবীর বাস্তবতা কি?
- কোরআন হাদিসের দলিল পৃথিবী সমতল হওয়ার পক্ষে?
- ইসলাম পৃথিবীকে সমতল বলে?
- সমতল পৃথিবী ইজমায়ী আকিদা?
- তাবেঈ ওয়াহব বিন মুনাব্বিহ থেকে বর্ণিত সমতল পৃথিবীর বর্ণনার ভুল অনুবাদ
- তাবেঈ ওয়াহব বিন মুনাব্বিহ (রাহিমাহুল্লাহ) কি পৃথিবীকে সমতল বলেছেন?
- ইমাম কাহতানী আল আন্দালুসি (রাহিমাহুল্লাহ) পৃথিবীকে সমতল বলেছেন!
- কুরআন-সুন্নাহতে কি পৃথিবীকে সমতল বলা হয়েছে? – পর্ব ২
- কুরআন-সুন্নাহতে কি পৃথিবীকে সমতল বলা হয়েছে? – পর্ব ১
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তার হাবিব মুহাম্মদ ﷺ এর উপর।
ইসলাম পৃথিবীকে সমতল বলে এই মত প্রমাণ করতে ইধানিং অনেকে বিভিন্ন দলিল প্রমাণাদি পেশ করা শুরু করেছে। অনেকদিন যাবৎ দেখার পর ভাবলাম একটু যাচাই করে দেখি দলিলগুলো। আমার যাচাইকৃত ফলাফলগুলোই উপস্থাপন করছি নিম্নে।
পাহাড় পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে? (১ম দলিল)
বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে + অসংখ্য সাহাবীর ছাত্র…. •তাবি’ঈ আব্দুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ (رحمه الله) [১৫-১১৫ হিজরী] বলেছেন যে, পাহাড় পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে। পৃথিবী সমতল হলেই এটা সম্ভব…..
حدثنا أبو يَعْلَى، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ بْنِ أَبَانَ، حَدَّثَنَا أبو أسَامَةَ، عَنْ صَالِح بن حَيَّانَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بن بُرَيْدَةَ، قَالَ: «قَ جَبَل مُحِيطٌ بِالْأرْضِ مِن زُمْرُدَةٍ عَلَيْهَا كَيْفَا السَّمَاءِ»
আবু ইয়ালা – আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর ইবনু আবান আবু উসামা – সালিহ ইবনে হাইয়ান <- আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ বলেন, “পান্নার একটি পাহাড় পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে, তার কাঁধে আকাশ।”[1]أبو الشيخ الأصبهاني , Kitab Al-Azma by Shaykh Al-Ishabani 4/1489, Source: https://shamela.ws/book/13043/1066#p1
জবাবঃ
এই আসারটি আবুশ শাইখ আল আসবাহানি তার আল আজামা কিতাবে এবং আবু আব্দিল্লাহ আল হাকিম তার আল মুসতাদরাকে বর্ণনা করেছেন।
আবুশ শাইখ আল আসবাহানি বলেছেন,
حَدَّثَنَا أَبُو يَعْلَى، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ بْنِ أَبَانَ، حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، عَنْ صَالِحِ بْنِ حَيَّانَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ، قَالَ: «ق جَبَلٌ مُحِيطٌ بِالْأَرْضِ مِنْ زُمُرِّدَةٍ عَلَيْهَا كَنَفَا السَّمَاءِ»
আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আবু ইয়ালা, তিনি বলেছেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার ইবনি আবান, তিনি বলেছেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আবু উসামা, তিনি সালিহ ইবনু হাইয়ান থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু বুরাইদা থেকে, তিনি বলেছেন, কাফ একটি পান্নার তৈরি পাহাড় যার উপর আছে আকাশের দুই পাশ।[2]আল আজামা; ৪/১৪৪৯
আবু আব্দিল্লাহ আল হাকিম বর্ণনা করেছেন,
حَدَّثَنَا أَبُو الْعَبَّاسِ مُحَمَّدُ بْنُ يَعْقُوبَ، ثنا الْحَسَنُ بْنُ عَلِيِّ بْنِ عَفَّانَ الْعَامِرِيُّ، ثنا أَبُو أُسَامَةَ، عَنْ صَالِحِ بْنِ حَيَّانَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ فِي قَوْلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ: {ق وَالْقُرْآنِ الْمَجِيدِ} [ق: ١] قَالَ: «جَبَلٌ مِنْ زُمُرُّدٍ مُحِيطٌ بِالدُّنْيَا عَلَيْهِ كَنَفَا السَّمَاءِ»
এখানেও সালিহ ইবনু হাইয়ান আব্দুল্লাহ ইবনু বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এই আসারটি বর্ণনা করেছেন।
সালিহ ইবনু হাইয়ান দুর্বল বর্ণনাকারী। ইবনু হাজার আল আসকালানি বলেছেন,
صالح ابن حيان القرشي الكوفي ضعيف من السادسة
সালিহ ইবনু হাইয়ান আল কুরাশি আল কুফি ষষ্ঠ স্তরের দুর্বল বর্ণনাকারী।[3]তাকরিবুত তাহজিব, পৃ ২৭১
যদি এই আসারটি যদি শুদ্ধও হয় তবুও এটা কোনো দলিল হবে না।
আবুল ফিদা ইবনু কাসির বলেছেন,
وقد روي عن بعض السلف أنهم قالوا: ﴿ق﴾ جبل محيط بجميع الأرض يقال له جبل قاف، وكأن هذا، والله أعلم، من خرافات بني إسرائيل التي أخذها عنهم بعض الناس لما رأى من جواز الرواية عنهم مما لا يصدق ولا يكذب، وعندي أن هذا وأمثاله وأشباهه من اختلاق بعض زنادقتهم، يلبسون به على الناس أمر دينهم،
কিছু সালাফ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তারা বলেছেন, কাফ হলো একটি পাহাড় যা পুরো জমিনকে ঘিরে আছে। একে জাবালে কাফ বলা হয়। আল্লাহই ভালো জানেন, এটা যেন বনি ইসরাইলের ওই কুসংস্কার গুলোর অন্তর্ভুক্ত যেগুলো কিছু মানুষ তাদের থেকে গ্রহণ করেছে যখন তারা দেখলো যে সত্য বা মিথ্যা বলা যায় না এমন বিষয়গুলো তাদের থেকে বর্ণনা করা জায়েজ। আর আমি এটা এবং এর অনুরূপ যা আছে এগুলো তাদের মধ্যকার জিন্দিকদের তৈরি মনে করি যারা এগুলো দিয়ে মানুষকে তাদের ধর্মের ব্যাপারে সংশয়ে ফেলে দেয়।
তিনি আরো বলেছেন,
وإنما أباح الشارع الرواية عنهم في قوله:
«وحدثوا عن بني إسرائيل ولا حرج» فيما قد يجوزه العقل، فأما فيما تحيله العقول ويحكم عليه بالبطلان ويغلب على الظنون كذبه فليس من هذا القبيل، والله أعلم.শরিয়ত প্রণেতা তার এই বক্তব্যে , ‘আর তোমরা বনি ইসরাইলের থেকে বর্ণনা করো কোনো সমস্যা নেই’ শুধু তাই বর্ণনা করা জায়েজ করেছেন যা আকল সম্ভব মনে করে। অপরদিকে আকলসমূহ যাকে অসম্ভব মনে করে, যাকে বাতিল বলে ফায়সালা দেয় এবং প্রবল ধারণা অনুযায়ী যা মিথ্যা মনে হয় তা এটার অন্তর্ভুক্ত হবে না। আল্লাহই ভালো জানেন।[4]তাফসির ইবনি কাসির, ৭/৩৬৭-৩৬৮
পরিশেষে দুটি বিষয়ের দিকে ইশারা করবো। এখানে অনুবাদে বলা হয়েছে, ‘তার কাঁধে আকাশ’ এই অনুবাদ সঠিক নয়।
এখানে বলা হয়েছে,
عَلَيْهِ كَنَفَا السَّمَاءِ،
তার উপর আছে আকাশের দুই পাশ।
আবুল আব্বাস আল ফাইয়ুমি বলেছেন,
الْكَنَفُ بِفَتْحَتَيْنِ الْجَانِبُ،
দুই জবর দিয়ে আল কানাফ অর্থ পার্শ্ব।[5]মিসবাহুল মুনির, ২/৫৪২
এর দ্বিবচন হলো كنفان। এর অর্থ দুই পাশ।
তাহলে এখানে,
كنفا السماء
এর অর্থ হলো আকাশের দুই পাশ।
আরেকটি হলো কিতাবের নাম আল আজমা নয় বরং আল আজামা। আর লেখকের নাম আশ শাইখ আল ইসহাবানি নয় বরং আবুশ শাইখ আল আসবাহানি।
পৃথিবীর প্রান্ত আছে? (২য় দলিল)
রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
কোন মুসলিম যখন তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডানে ও বামের যত পাথর, গাছ, মাটি, সবকিছুই তার সাথে তালবিয়াত পাঠ করে। এমনকি পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যেয়ে তা শেষ হয়।[6]সুনান আত-তিরমিযী (হাদীস নং: ৮২৮), তাহক্বীক শায়খ নাসির উদ্দিন আল-আলবানী: সহীহ, তাহক্বীক হাফিয যুবাইর আলী যাঈ এর সনদ হাসান
জবাবঃ
আবু ইসা আত তিরমিজি বলেছেন,
حَدَّثَنَا هَنَّادٌ، قَالَ: حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ عَيَّاشٍ ، عَنْ عُمَارَةَ بْنِ غَزِيَّةَ، عَنْ أَبِي حَازِمٍ ، عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُلَبِّي إِلَّا لَبَّى مَنْ عَنْ يَمِينِهِ أَوْ عَنْ شِمَالِهِ مِنْ حَجَرٍ أَوْ شَجَرٍ أَوْ مَدَرٍ»، حَتَّى تَنْقَطِعَ الْأَرْضُ مِنْ هَاهُنَا وَهَاهُنَا.
আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন হান্নাদ, তিনি বলেছেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন ইসমাইল ইবনু আইয়াশ, তিনি উমারা ইবনু গাজিয়্যা থেকে, তিনি আবু হাজিম থেকে, তিনি সাহল ইবনু সাদ থেকে, তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো মুসলিম যখন তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডানে ও বামে যে পাথর, অথবা গাছ অথবা পাথুরে মাটি আছে তাও তালবিয়া পড়ে। এমনকি এভাবে জমিন এখান থেকে ও এখান থেকে শেষ হয়ে যায়।[7]জামি আত তিরমিজি, ২/১৭৯
আব্দুল হক আদ দিহলাওয়ি বলেছেন,
وقوله: (من ههنا وههنا) إشارة إلى المشرق والمغرب، والغاية محذوفة، أي: إلى منتهى الأرض.
তাঁর কথা, ‘এখান থেকে ও এখান থেকে’ এখানে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ইশারা করা হয়েছে। এখানে এটা কোন পর্যন্ত তা ঊহ্য আছে। অর্থাৎ জমিন যেখানে শেষ হয়ে গিয়েছে সেই পর্যন্ত।[8]লুমাআতুত তানকিহ, ৫/৩০১
আবুল ফিদা ইবনু কাসির বলেছেন,
وقوله : ( حتى إذا بلغ مغرب الشمس ) أي : فسلك طريقا حتى وصل إلى أقصى ما يسلك فيه من الأرض من ناحية المغرب ، وهو مغرب الأرض . وأما الوصول إلى مغرب الشمس من السماء فمتعذر ، وما يذكره أصحاب القصص والأخبار من أنه سار في الأرض مدة والشمس تغرب من ورائه فشيء لا حقيقة له . وأكثر ذلك من خرافات أهل الكتاب ، واختلاق زنادقتهم وكذبهم،
وقوله : ( وجدها تغرب في عين حمئة ) أي : رأى الشمس في منظره تغرب في البحر المحيط ، وهذا شأن كل من انتهى إلى ساحله ، يراها كأنها تغرب فيه ، وهي لا تفارق الفلك الرابع الذي هي مثبتة فيه لا تفارقه .
তাঁর কথা, ‘এমনকি যখন সে সূর্য অস্ত যাওয়ার স্থানে পৌঁছালো’ এর অর্থ হলো সে একটি পথ অবলম্বন করলো অবশেষে পশ্চিম দিকে যতটুকু চলা সম্ভব তার প্রান্তে এসে পৌঁছেলো। আর এটাই হলো পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্ত। অপরদিকে সূর্য অস্তমিত হওয়ার স্থানে পৌঁছা সম্ভব নয়। আর গল্পকাররা যা বলে যে কেউ জমিনে কিছু সময় চলার পর দেখলো যে সূর্য তার সামনে অস্ত যাচ্ছে এর কোনো বাস্তবতা নেই। এর অধিকাংশই আহলে কিতাবের কুসংস্কার গুলোর অন্তর্ভূক্ত এবং তাদের মধ্যকার জিন্দিকদের তৈরি ও তাদের মিথ্যাচার।
আর তাঁর কথা٫ ‘তখন সে তাকে পেলো যে তা কালো সাগরে অস্ত যাচ্ছে’ এর অর্থ হলো, সে তার দৃষ্টিতে সূর্যকে দেখলো যে তা বেষ্টনকারী সাগরে অস্ত যাচ্ছে। এটা হলো প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির অবস্থা যে তার তীরে থেমে যায়। সে দেখতে পায় যেনো সূর্য তার মধ্যে অস্ত যাচ্ছে। অথচ তা যেখানে স্থাপিত সেই চতুর্থ কক্ষপথ সে পরিত্যাগ করে না।[9]তাফসির ইবনি কাসির, ৫/১৭২
উক্ত দলিলে হাদিসটির শেষের বাক্যটির অর্থ করা হয়েছে, ‘এমনকি পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যেয়ে তা শেষ হয়।’ এটা কি হাদিসে বলা হয়েছে? তাহলে এটা দিয়ে ‘পৃথিবী গোলাকার নয় বরং সমতল’ এই ব্যাপারে দলিল দেওয়া কি সঠিক হলো?
সূরা নূহ এর ১৯ নং আয়াতে পৃথিবীকে সমতল বলেছে? (৩য় দলিল)
আবু হাইয়ান আল-বাগদাদী [৩১০-৪১৪ হিজরী] সূরা নূহ এর ১৯ নং আয়াতের বিসাতান শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে বলেছেনঃ
“যাহের অর্থ হল পৃথিবী গোলাকার নয়, বরং সমতল।”[10]المصدر : أصول الدين – ص 124 , তাফসীর আবু হাইয়ান ৮/৩৩৪ , https://waqfeya.net/book.php?bid=1230
জবাবঃ
দলিলে লিখেছে আবু হাইয়ান আল বাগদাদি। তিনি বাগদাদি না বরং আন্দালুসি ছিলেন। তিনি আবু হাইয়ান আল আন্দালুসি হিসেবে পরিচিত। তারপরে তার জন্ম ও মৃত্যু সাল দেওয়া হয়েছে ৩১০ ও ৪১৪ হিজরি। এটা সঠিক নয়। বরং তার জন্ম সাল হলো ৬৫৪ হিজরি ও মৃত্যু সাল ৭৪৫ হিজরি। তিনি ইবনু তাইমিয়্যাহর সমসাময়িক ছিলেন। এখানে যে তাফসির থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে তার নাম হলো আল বাহরুল মুহিত। জেনে রাখা ভালো যে এর লেখক আবু হাইয়ান আল আন্দালুসি আল্লাহর সিফাতের তাওয়িল করেছেন এই তাফসিরে।
সুরা নুহের এই আয়াত,
وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ بِسَاطًا،
আর আল্লাহ তোমাদের জন্য জমিনকে বানিয়েছেন বিছানা।
আবু হাইয়ান তার তাফসিরে বলেছেন,
وَظَاهِرُهُ أَنَّ الْأَرْضَ لَيْسَتْ كُرَوِيَّةً بَلْ هِيَ مَبْسُوطَةٌ
এর প্রকাশ্য অর্থ হলো যে জমিন গোলাকার নয় বরং তা ছড়ানো।[11]আল বাহরুল মুহিত, ১০/২৮৪
এটা তার বুঝ। এখানে পৃথিবীকে বিছানা বলা হয়েছে কোন অর্থে সেটা তার পরের আয়াতে বলা হয়েছে,
لِّتَسْلُكُوا مِنْهَا سُبُلًا فِجَاجًا ،
যাতে তোমরা তার প্রশস্ত পথসমূহে চলাচল করতে পারো।
আব্দুর রহমান ইবনু সিদি বলেছেন,
فلولا أنه بسطها، لما أمكن ذلك،
যদি তিনি তাকে প্রসারিত না করতেন তাহলে তা সম্ভব হতো না।[12]তাইসিরুল কারিম, পৃ ৮৮৯
ইবনু আশুর বলেছেন,
فَالْإِخْبَارُ عَنِ الْأَرْضِ بِبِسَاطٍ تَشْبِيهٌ بَلِيغٌ، أَيْ كَالْبِسَاطِ، وَوَجْهُ الشَّبَهِ تَنَاسُبُ سَطْحِ الْأَرْضِ فِي تَعَادُلِ أَجْزَائِهِ بِحَيْثُ لَا يُوجِعُ أَرْجُلَ الْمَاشِينَ وَلَا يُقِضُّ جُنُوبَ الْمُضْطَجِعِينَ، وَلَيْسَ الْمُرَادُ أَنَّ اللَّهَ جَعَلَ حَجْمَ الْأَرْضِ كَالْبِسَاطِ لِأَنَّ حَجْمَ الْأَرْضِ كُرَوِيٌّ، وَقَدْ نَبَّهَ عَلَى ذَلِكَ بِالْعِلَّةِ الْبَاعِثَةِ فِي قَوْلِهِ:
لَكُمُ، وَالْعِلَّةِ الْغَائِبَةِ فِي قَوْلِهِ: لِتَسْلُكُوا مِنْها سُبُلًا وَحَصَلَ مِنْ مَجْمُوعِ الْعِلَّتَيْنِ الْإِشَارَةُ إِلَى جَمِيعِ النِّعَمِ الَّتِي تَحْصُلُ لِلنَّاسِ مِنْ تَسْوِيَةِ سَطْحِ الْأَرْضِ مِثْلَ الْحَرْثِ وَالزَّرْعِ، وَإِلَى نِعَمِهِ خَاصَّةً وَهِيَ السَّيْرُ فِي الْأَرْضِ،
জমিনকে বিছানা হিসেবে সংবাদ প্রদান এমন একটি সাদৃশ্য প্রদান যা অলঙ্কারপূর্ণ। অর্থাৎ বিছানার মতো। সাদৃশ্যর দিকটি হলো, জমিনের উপরিভাগের অংশসমূহ পরস্পর সমান হওয়ার সাথে মিল থাকা এমনভাবে যে চলাচলকারীদেরকে কষ্ট দেয় না এবং শয়নকারীদের পাশকে কষ্ট দেয় না। এর দ্বারা এই উদ্দেশ্যে নয় যে আল্লাহ জমিনের আকৃতি বিছানার মতো করেছেন। কেননা জমিনের আকৃতি গোলাকার। তিনি এর কারণ বর্ণনা করে বলছেন, ‘তোমাদের জন্য’। আর অনুপস্থিত কারণটি হলো, ‘যেন তোমরা তার পথসমূহে চলতে পারো’। এই দুটি কারণ থেকে জমিনের উপরিভাগ সমান হওয়ার ফলে যে উপকারিতা পাওয়া যায় তার সবগুলোর প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন চাষ করা, বীজ রোপণ করা এবং জমিনে চলাফেরা করার বিশেষ নেয়ামত।[13]আত তাহরির ওয়াত তানওয়ির, ২৯/২০৫
শাইখ মুক্ববিল পৃথিবীকে সমতল বলেছেন? (৪র্থ দলিল)
গোলাকারবাদী/ঘূর্ণনবাদী/পৃথিবীকে গ্রহ দাবিদার কুফরী হেলিওসেন্ট্রিক মডেলের অনুসারীদের সংশয়ের নিরসন…
শাইখ সালেহ আল-ফাওজান হাফিযাহুল্লহ…..
ইয়েমেনের মুহাদ্দিস শাইখ মুক্ববিল বিন হাদী-আল ওয়াদিঈ রহিমাহুল্লাহকে পৃথিবী কি গোলাকার নাকি সমতল? এবং এই আয়াত সম্পর্কে “এবং পৃথিবীর দিকে, কিভাবে এটিকে সমতল করা হয়েছে?” [৮৮:২০] প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দেন, “আলেমগণ দ্বিমত পোষণ করেন। জমহুর [সংখ্যাগরিষ্ঠ] আলেমগণ বলেছেন এটা সমতল [ফ্ল্যাট], এবং আবু মুহাম্মাদ ইবনু হাযম, এবং শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, এবং হাফেয ইবনু কাসীর এবং তাদের একটি গ্রুপ বলেছেনঃ এটি গোলাকার, এবং কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এমন কোন স্পষ্ট দলিল নেই যে এটি গোলাকার বা [কুরআন] এটিকে গোলাকারও বলে না।”[14]শাইখ মুক্ববিলের সমতল এর বিস্তারিত ফতোয়া, https://www.muqbel.net/fatwa.php?fatwa_id=1674
জবাবঃ
মুহাদ্দিসুল ইয়ামান আশ শাইখুল আল্লামা মুকবিল ইবনু হাদি আল ওয়াদিয়ি রাহিমাহুল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করা হয়,
هل الأرض كروية أم مسطحة ؟ وما معنى قوله تعالى : ” وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ ” (الغاشية : ٢٠) ؟
পৃথিবী কি সমতল নাকি গোলাকার? আর আল্লাহ তাআলার এই কথার, ‘আর জমিনের দিকে কীভাবে তাকে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে?’ [আল গাশিয়া; ২০] অর্থ কি?
জবাবে তিনি বলেছেন,
اختلف العلماء فجمهور أهل العلم يقولون : إنها مسطحة ، وأبو محمد بن حزم وشيخ الإسلام ابن تيمية والحافظ ابن كثير وجمعٌ معهم يقولون : إنها كروية ، وليس هناك دليل من القرآن والسنة صريح بأنها كروية ولا أنها ليست بكروية ، أما مسطحة فممكن أن في حقنا مسطحة ولا يمنع أن أطرافها يلتف ويرتفع إلى فوق ، فما هناك دليل صريح يدل على ذلك فيٌرجع إلى الواقع ، فالذي يظهر أن أبا محمد ابن حزم وشيخ الإسلام ابن تيمية ومن جرى مجراهما أنهم واسعوا الأفق وأنهم عرفوا أن أطراف الدنيا مكورة والله المستعان . هذا وليس في الآية ما يمنع ذلك أعني قوله تعالى : ”
وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ ” ( الغاشية : ٢٠)
আলেমগণ এই বিষয়ে মতভেদ করেছেন। জুমহুর আহলুল ইলম বলেছেন, এটা সমতল। অন্যদিকে আবু মুহাম্মাদ ইবনু হাজম, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, হাফেজ ইবনু কাসির এবং তাদের সাথে একটি গোষ্ঠী বলেছেন, এটা গোলাকার। এটা গোলাকার কিংবা এটা গোলাকার না এই ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নতে কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই। আর সমতলের ব্যাপারে বলা যায় যে, এটা হতে পারে যে তা আমাদের কাছে সমতল এবং তার অংশগুলো বাঁকা হয়ে উপরে উঠাকে এটা মানা করে না। যেহেতু এই বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই তাই বাস্তবতার দিকেই ফিরে যেতে হবে। যেটা প্রকাশ পাচ্ছে যে আবু মুহাম্মাদ ইবনু হাজম ও শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এবং যারা তাদের পথে চলেছেন তারা অনেক বেশি অধ্যয়ন করেছেন এবং জানতে পেরেছেন যে পৃথিবীর প্রান্তগুলো গোলাকার। আল্লাহুল মুসতাআন। আর আয়াতটিতে এমন কিছু নেই যা এটাকে নিষেধ করে অর্থাৎ আমি তাঁর এই কথাকে বোঝাতে চাচ্ছি, ‘আর জমিনের দিকে কিভাবে তাকে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে?’ [সুরা গাশিয়া, আয়াত ২০]
(ফাতওয়ার লিঙ্ক উপরোক্ত দলিলেই দেওয়া আছে)
নিচের প্রশ্নে বলা হয়েছে, গোলাকারবাদী/ঘূর্ণনবাদী/পৃথিবীকে গ্রহ দাবিদার কুফরি হোলিওসেন্ট্রিক মডেলের অনুসারীদের সংশয় নিরসন। এখানে পৃথিবীকে গোলাকার বলার সাথে বাকি দুটিকে মিশ্রিত করে কুফরি বলে দিয়েছেন। তারপরে আল্লামা সালিহ আল ফাউজান হাফিজাহুল্লাহ ও আল্লামা মুকবিল আল ওয়াদিয়ি রাহিমাহুল্লাহর ফাতওয়া উল্লেখ করেছেন। শাইখ ফাওজানের ক্ষেত্রে লিঙ্ক দিয়েছেন এবং শাইখ মুকবিলের ক্ষেত্রে অর্ধেক ফাতওয়া উল্লেখ করেছেন। তারা দুজনই পৃথিবী গোলাকার হওয়ার মত পোষণ করেন। তাহলে এই শিরোনামে উল্লেখ করে তারা কেমন কাজ করলেন সেটা তাদের উপরই ছেড়ে দিলাম।
তারপর শাইখ মুকবিল রাহিমাহুল্লাহর ফাতওয়ার অনুবাদে বলা হয়েছে,
এবং কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এমন কোনো স্পষ্ট দলিল নেই যে এটি গোলাকার বা [কুরআন] এটিকে গোলাকারও বলে না।
লেখা: জুবায়ের হাসান
ফেইসবুক: Jobayer Hasan
Footnotes
| ⇧1 | أبو الشيخ الأصبهاني , Kitab Al-Azma by Shaykh Al-Ishabani 4/1489, Source: https://shamela.ws/book/13043/1066#p1 |
|---|---|
| ⇧2 | আল আজামা; ৪/১৪৪৯ |
| ⇧3 | তাকরিবুত তাহজিব, পৃ ২৭১ |
| ⇧4 | তাফসির ইবনি কাসির, ৭/৩৬৭-৩৬৮ |
| ⇧5 | মিসবাহুল মুনির, ২/৫৪২ |
| ⇧6 | সুনান আত-তিরমিযী (হাদীস নং: ৮২৮), তাহক্বীক শায়খ নাসির উদ্দিন আল-আলবানী: সহীহ, তাহক্বীক হাফিয যুবাইর আলী যাঈ এর সনদ হাসান |
| ⇧7 | জামি আত তিরমিজি, ২/১৭৯ |
| ⇧8 | লুমাআতুত তানকিহ, ৫/৩০১ |
| ⇧9 | তাফসির ইবনি কাসির, ৫/১৭২ |
| ⇧10 | المصدر : أصول الدين – ص 124 , তাফসীর আবু হাইয়ান ৮/৩৩৪ , https://waqfeya.net/book.php?bid=1230 |
| ⇧11 | আল বাহরুল মুহিত, ১০/২৮৪ |
| ⇧12 | তাইসিরুল কারিম, পৃ ৮৮৯ |
| ⇧13 | আত তাহরির ওয়াত তানওয়ির, ২৯/২০৫ |
| ⇧14 | শাইখ মুক্ববিলের সমতল এর বিস্তারিত ফতোয়া, https://www.muqbel.net/fatwa.php?fatwa_id=1674 |




