মুতাকাদ্দিমিন ইমামদের মতামত থেকে কি ‘পৃথিবী সমতল’ প্রমানিত? এর বাস্তবতা কি?

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ…
একটি মজার বিষয়। সমতলবাদীরা প্রায়ই চাপাবাজী করে বলে যে, “মুতাকাদ্দিমিন আলেমদের থেকে পৃথিবী সমতল হওয়াটা প্রমানিত! আর তাদের কথাই চুরান্ত।”
জবাব: মজার ব্যাপার হল, মুতাকাদ্দিমিনদের মধ্যে (৩০০ হিজরির আগের) মাত্র একজনের থেকে সুস্পষ্টভাবে ‘পৃথিবী সমতল বলা ও গোলাকার হওয়াকে নাকচ করার প্রমান পাওয়া যায়। তিনি হলেন ‘আল-জুব্বাই, আবু আলী মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব আল-বসরি (মৃ. ৩০৩ হি.)। ‘তাফসিরে আল-জুব্বাই’ নামক কিতাবে (৬৮ পৃ.) তার নামে ‘পৃথিবী সমতল হওয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়।
প্রথমত, এই ব্যাক্তি একজন মুতাজিলা। তিনি তৎকালীন মুতাজিলা সম্প্রদায়ের লোকেদের বড় শাইখ ছিলেন। ইমাম যাহাবি তাকে ‘বিদআতি, কালামি’ বলেছেন। তার সম্পর্কে বিস্তারিত, – [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৪/১৮৩]
দ্বিতীয়ত, আবু আলী আল-জুব্বাই এর নিজস্ব ‘তাফসীর’ নামে কোনো স্বতন্ত্র পাণ্ডুলিপি বা সনদসহ বিদ্যমান কিতাব নাই। বর্তমানে যে ‘তাফসীর আবি আলী আল-জুব্বাই’ নামে কিতাবটি পাওয়া যায়, সেটি আসলে তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর মুতাযিলা তাফসীরগুলোর বিক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি সংগ্রহ করে গবেষকদের তৈরি করা একটি সংকলন মাত্র। এটি ‘মাউসূআ তাফাসীর আল-মু’তাযিলা’ (موسوعة تفاسير المعتزلة) সিরিজের একটি খণ্ড, অর্থাৎ আধুনিক সংকলন, কোন প্রাচীন প্রমাণিত মূল গ্রন্থ নয়।
তৃতীয়ত, সমতলবাদীরা নিজেরদের সালাফি দাবী করে এবং বলে ‘পৃথিবী সমতল’ এটা সালাফদের আকিদা, এটা ইসলামি আকিদার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরাই আবার নিজেদের কথিত আকিদাকে সঠিক প্রমান করতে এসব বিদআতি, কালামি, ধর্মদ্রোহী মুতাজিলাদের উপর নির্ভর করে! অনুরুপভাবে এরাই আবার ‘মাসলামাহ আবুল-কাসিম আল-কুরতুবির মত মুশাব্বিহা, আব্দুল কাহির বাগদাদী’র মত আশআরিদের কথাকে নিজেদের কথিত আকিদার দলিল হিসেবে গ্রহন করে এবং প্রচার করে।
বিষয়টা আসলেই মজার, তাই না?
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই সমতলবাদীরা ৩০০ হিজরির আগের আরও দুইজনের থেকে ‘পৃথিবী সমতল’ হওয়ার দলিল দিয়ে থাকে।
(১) মুকাতিল ইবনে সুলায়মান (২) ইবনে মুজাহিদ
আমাদের পক্ষ থেকে এর সংক্ষিপ্ত জবাব হল:
(১) ‘মুকাতিল ইবনে সুলায়মান’ (রহ.) সর্বসম্মতিক্রমে অগ্রহনযোগ্য। আর তিনি তার তাফসিরে সুস্পষ্টভাবে কোথাও পৃথিবীর আকারকে সমতল বলেননি, বরং তিনি তার তাফসিরে ‘৫০০ বছরের পথ’ এর ব্যাপারে উল্লেখ করছেন। এটাকেই সমতলবাদীরা ‘পৃথিবী সমতল’ ধরে নিয়েছে, অথচ বাস্তবে তা নয়।
(২) ইবনে মুজাহিদ (রহ.) থেকে ইবনে আতিয়্যাহ তার তাফসিরে কোন সনদ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন (ইবনে মুজাহিদ রহ. বলেছেন: পৃথিবী গোলাকার হলে পৃথিবীতে কোন পানি অবশিষ্ট থাকতোনা)। আর ইবনে মুজাহিদ মানে তাবেঈ মুজাহিদ (রহ.) নন। এই ইবনে মুজাহিদ হল ‘আবু বকর আহমাদ ইবনে মূসা ইবনে মুজাহিদ আত-তামীমী আল-বাগদাদী’ (মৃ. ৩২৪ হি.)। তার সংরক্ষিত কোন কিতাবেও এরকম কোন বক্তব্য পাওয়া যায়না।
অতএব, সমতলবাদীদের এই চাপাবাজিও টিকলোনা। উল্টো এটা প্রমান হল যে, মুখে নিজেদের সালাফি আকিদার অনুসারী দাবী করলেও বাস্তবে তারা বিদআতি, কালামি, মু’তাজিলা, আশআরি, মুশাব্বিহাদের আকিদার অনুসারী। এটাই হল বাস্তবতা।




