শরিয়াহ আইনগণতন্ত্র

ইসলামে গণতন্ত্র: গণতন্ত্র কেন হারাম ও এর বিকল্প কী?

গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিমালা কীভাবে ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস, শরিয়াহ ও হুকুমাতের সাথে সাংঘর্ষিক তা জানুন - কোরআনের আয়াত, হাদীস এবং প্রখ্যাত আলেম-উলামাদের উদ্ধৃতির মাধ্যমে।

আমরা মুসলিম, আমাদের নিকট পথপ্রদর্শক হল আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাহ। দ্বীন ইসলাম নিছক কোন মতবাদ বা ধর্ম নয় বরং এটি হল স্বতন্ত্র জীবন বিধান যা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট হতে আমাদের জন্য নির্ধারিত। এই জীবন বিধানের রয়েছে আলাদা দর্শন, আলাদা আইন, আলাদা বিশ্বাস, আলাদা সংস্কৃতি। আমাদের জীবনে প্রতিটি কাজ করার পুর্বে আমাদেরকে জানতে হয় তা আমাদের শরিয়ত অনুসারে কতটুকু গ্রহণযোগ্য ও কতটুকু নয়। কারণ একজন হিন্দু তাদের দ্বীন পরিপূর্ণ না মানলেও হিন্দু থাকবে, ইহুদি ইহুদি থাকবে, পৌত্তলিক পৌত্তলিক থাকতে পারে, নাস্তিক নাস্তিক থাকতে পারে কিন্তু কোন মুসলিম যদি তার কিতাবের ছোট্ট একটা অংশও অস্বীকার করে তাহলে সে মুসলিম থাকতে পারে না। কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু।[1]সুরা বাকারা ২০৮

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা মুসলমান হওয়া ছাড়া মারা যেও না।[2]সুরা আলে ইমরান আয়াত ১০২

দ্বীন ইসলাম অন্য ধর্মের মত কিছু মানো কিছু ছাড়ো নীতির অনুসরণকে বৈধতা দেয় নি, কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে।[3]সুরা বাকারা আয়াত ৮৫

তারা (মুনাফিকরা) এর মধ্যে দোদুল্যমান, না এদের দিকে আর না ওদের দিকে। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি কখনো তার জন্য কোন পথ পাবে না। [4]সুরা নিসা আয়াত ১৪৩

আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।[5]সুরা আলে ইমরান আয়াত ৮৫

তাই সেই ধারাবাহিকতায় আজকের আলোচ্য বিষয় হল গণতন্ত্র। এটি আমার স্বাভাবিক লিখনির চাইতে ভিন্ন একটি বিষয়, প্রথমে ওয়েবসাইটে দিতে চাই নি, কিন্তু বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় মত পরিবর্তন করতেই হল।

আমাদের যারা গনতন্ত্রের বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন না তাদের অনেকে এই লিখাটা পড়ার পুর্বেই আমাকে ভুল বুঝতে পারেন, উগ্রবাদী ভাবতে পারেন, জঙ্গী অথবা খারেজী মনে করতে পারেন।

কিন্তু ভাই আমার, আমায় ভুল বুঝবেন না, আপনাকে কি করে বুঝাই আমি! আপনাকে একটা কথাই বলতে চাই ভাই আমার, ইল্ম হল সেই সমুদ্র যার কিনারায় না যাওয়া পর্যন্ত তার সৌন্দর্য, স্বাদ ও গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায় না। আপনি যদি না জেনে, না পড়ে নিছক বিষয় দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন তাহলে কি আপনি আল্লাহর ফরজ ইলম থেকে মাহরুম হয়ে যাচ্ছেন না? আপনি কি লেখককের প্রতি জুলুম করছেন না? সত্য প্রথম দিকে তিতা লাগতেই পারে, কিন্তু যখন ধীরে ধীরে সেটার গভীরে প্রবেশ করা হয়, তখন ইলম অনুসন্ধানীর নিকট তা ততই তৃপ্তিকর হতে থাকে।

গণতন্ত্র এখন আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে ওতোপ্রোতো ভাবেই জড়িয়ে রয়েছে। আমাদের বহু ভাই একে জায়েজ পন্থা হিসেবেই চিনে থাকেন, কিন্তু এর বাস্তবতা হল গণতন্ত্র সত্তাগত ভাবেই হারাম, এবং এই হারামকে অস্বীকার করা কুফুরি, তবে যারা জানে না তাদের জন্য বিষয়টি ভিন্ন। এর হারাম হওয়ার পিছনে কোরআন, হাদিসের আলোকে সুস্পষ্ট কারণ ও ওলামাগণের সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে।

অনেকে ইসলামিক গণতন্ত্রকে হালাল করতে চায়, অনেকে গণতন্ত্রকেই হালাল বানাতে চায়। কোরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিলের আলোকে ওলামাগণ একে হারাম প্রমাণ করার পর গণতন্ত্রকে হালাল প্রমাণ করতে চাওয়াটা নিশ্চয় মহৎ কোন উদ্দেশ্য নয়। হয়তো তারা গনতন্ত্রের মডিফাইড ভার্সন বের করে তাকে তাওয়ীল করে হালাল বলার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু তাওয়ীলের কারণে হারাম হালালে পরিণত হয়ে যায় না, তবে তাওয়ীলকারিদের উপর সরাসরি কুফুরির বিধান আরোপ না করা যায় না এই ক্ষেত্রে, কিন্তু এই কাজ চরম গোমরাহী পূর্ণ বটে।

দ্বীন ইসলামের সাথে আসলে গণতন্ত্র কখনোই একাত্মতা পোষণ করতে পারে নি, পারবেও না। ইসলাম একটি আলাদা দ্বীন ও গণতন্ত্র একটি আলাদা দ্বীন। ইসলামের সাথে অনেক বিষয়ে গণতন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, কয়েকটা উল্লেখ না করলেই নয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ এই সংক্রান্ত প্রতিটি পয়েন্টে বিস্তর দলিল প্রমাণ রয়েছে৷ সংক্ষিপ্ত করার স্বার্থে অল্প কিছু উল্লেখ করা হয়েছে শুধু, অনেকগুলো রেফারেন্স বাংলা অনুবাদ করা বই ও আর্টিকেল হতে সংগ্রহ করা হয়েছে বিধায় মুল টেক্সট উল্লেখ করতে অপারগ আমি।

গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের দ্বন্দ্ব

ক্ষমতা চাওয়া

আমাদের সকলের কাছেই এটা পরিচিত যে রাসুল (ﷺ) সেই ব্যক্তিকে কোন কর্তৃত্ব দেন নি যে নিজ থেকে ক্ষমতা পাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে৷ এক হাদিসে এসেছে রাসুল বলেছেন,

“আমরা সেই ব্যক্তিকে কোনো দায়িত্ব দিই না, যে তা প্রার্থনা করে।” [6]সহীহুল বুখারী ৭১৪৯, ২২৬১, ৬৯২৩, ৭১৫৬, ৭১৫৭

গণতন্ত্রে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে যোগ্য বলে দাবি করে এবং ক্ষমতা লাভের জন্য তৎপর হয়। এর জন্য বিভিন্ন প্রচার প্রচারণা চালায়, দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করে, ভবিষ্যতের ওয়াদা করে। অথচ এমন লোককে ক্ষমতা দেওয়ার প্রতি রাসুল () অনুৎসাহ প্রদান করেছেন।

বিভেদ সৃষ্টি

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বহু দল থাকে, সকলেই ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। প্রায় সময় দেখা যায়, দুই দলে মারামারি, অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে তর্ক বিতর্ক, দলাদলি, শত্রুতা, এক দল অন্যদলকে পছন্দ করে না, এক দল অপর দলের উপর জুলুম করে। এই দলীয় কোন্দল তাদের মাঝে চরম অশান্তি ও দুরত্বের সৃষ্টি করে।

অপর দিকে ইসলামে ঐক্যবদ্ধ থাকার উপর চরম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন কোরআনে আল্লাহ বলেছেন আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধর, বিভক্ত হয়ো না।[7]সুরা আলে ইমরান আয়াত ১০২, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে সীসা ঢালা প্রাচীরের ন্যায়।[8]সুরা সফ আয়াত ৪ হাদিসে এমনও এসেছে যে, যে ব্যক্তি ঐক্যবদ্ধ উম্মাতের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াস চালাবে, তোমরা তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে, সে যে কেউ হোক না কেন।[9]সহিহ মুসলিম হাদিস ১৮৫২

শাইখ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিন (রহ) বলেন,

ব্যক্তিবিশেষ বা দলের জন্য দলাদলি করা মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করে, যুবকদের ইলম ও ইবাদত থেকে সরিয়ে দেয়। মুসলিমের উচিত কিতাব ও সুন্নাহর উপর সালাফী হওয়া, কোন দলের অনুসারী হওয়া নয়।[10]লিকাউল বাবিল মাফতুহ, মিটিং ৬৬, প্রশ্ন ১০

শাইখ আবদুল আজিজ ইবনে বায (রহ) বলেন,

মুসলিমের জন্য দলীয় রাজনীতি বা গণতন্ত্রের রাজনীতিতে ব্যস্ত হওয়া জায়েজ নয়, যা মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে। বরং কর্তব্য হলো উপকারী ইলম অর্জন করা এবং بصيرة (দৃষ্টিশক্তি/জ্ঞান)-এর সাথে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়া।[11]মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায ৯/১৭৪

অধিকাংশের ভোট

গণতন্ত্রে শাসক নির্বাচিত হয় কীসের মাধ্যমে? জনগণের ভোটের মাধ্যমে, অধিকাংশ যার পক্ষে সেই হয় শাসক।

অথচ কোরআনে আল্লাহ একাধিকবার বলেছেন অধিকাংশ মানুষ গোমরাহ, অধিকাংশ মানুষ জানে না, অধিকাংশের অনুসরণ করলে তারা তোমাকেও গোমড়া বানাবে৷[12]সুরা ইউনুস ৩৬, ৬৮, ১০৩, সুরা মায়েদা ১০৩, সুরা আনআম ৩৭, ১১১, ১১৬, সুরা আরাফ ১৩১ এই বিষয়ে শামসুল হক আফগানি (রহ.) বলেন,

ইসলামে গণতন্ত্র বৈধ নয়। গণতন্ত্র একটি মূর্খতা, কখনো কি দেখা গেছে যে কলেজের প্রিন্সিপাল, হাসপাতালের এমএস বা জেলা প্রশাসকের নিয়োগের জন্য রিকশাচালক বা সাধারণ মানুষদের ভোট নেওয়া হয়েছে? তবে কেন একটি রাষ্ট্র বা জাতিকে ধ্বংস করতে মূর্খদের ভোট নেওয়া হয়? গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের উপর নির্ভরশীল, অথচ কোরআন সংখ্যাগরিষ্ঠকে ‘মূর্খ’ বলে অভিহিত করেছে।”[13]নিকাতে আফগানি, পৃষ্ঠা ১২

আমরা জন্মগত মুসলিম, এছাড়া আমাদের মাঝে ইসলামের কিছু নেই৷ পাকিস্তানের একজন সুপরিচিত স্কলার ড. ইসরার আহমেদ এক বয়ানে বলেছিলেন আমাদের আকিদা আছে আমরা মুসলিম, কিন্তু মুসলিম হওয়ার ইমান নেই আমাদের, তাই আমাদের যে আকিদা রয়েছে তার উপর আসলেই কি আমাদের ইমান রয়েছে কিনা তা নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার।

আমাদের অধিকাংশ পাপচারী, বিদআতি, দ্বীন পালন থেকে গাফেল, সিয়াসাত সম্পর্কে অজ্ঞ, মানুষের ভণ্ডামি বুঝি না, হক ও বাতিল স্পষ্ট করতে পারি না, ষড়যন্ত্র বুঝি না, বহিঃশক্তির প্রভাব বুঝতে পারি না, তাদের প্রোপাগান্ডা চিনতে পারি না।

সেখানে অধিকাংশ কীভাবে একজন সৎ, ইমানদান, দ্বীনদার যে শরিয়াহ অনুসারে দেশ চালাতে পারে এমন কাউকে নির্বাচন করতে পারবে! না পারবে না, এটাই বাস্তবতা। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ” এর “সিয়াসাতুল মাদিনাহ” অধ্যায়ে বলেন:

“যেহেতু একটি শহর হলো মানুষের বড় সমাবেশের নাম, সুতরাং সকল মানুষের মতামত ন্যায়সঙ্গত সুন্নতের সংরক্ষণে একমত হওয়া কখনোই সম্ভব নয়।”

পাকিস্তানের “বেফাকুল মাদারিস” এর সভাপতি মাওলানা সলীমুল্লাহ খান (রহ.) বলেন,

নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় এবং গণতন্ত্রের মাধ্যমেও ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের মূল্য দেওয়া হয়, কিন্তু এই সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকেরা অজ্ঞ, যারা ইসলামের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নয়। তাদের থেকে কোনো আশা করাও অর্থহীন।”[14]মাসিক “সনাবিল”, করাচি, মে ২০১৩, খণ্ড-৮, সংখ্যা-১১

নির্বাচনে সকলেই সমান

এই পয়েন্টটা পূর্বের কারণগুলোর চাইতেও জঘন্য। গণতন্ত্রে শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ছোট, বড়, বিজ্ঞ, মুর্খ, আধা পাগল, মদখোর, জুয়ারি, সুদখোর, ঘুসখোর, চোর, ডাকাত, বাটপার, মানুষের হক আত্মসাৎকারী, ওজনে কম দেওয়া ব্যক্তি, জিনাকারী, মদ ব্যবসায়ী, পতিতালয়ের মালিক, মিথ্যাচারী, আমানতের খিয়ানতকারী, নাস্তিক, মুরতাদ, কাফের, মুশরিক, ইসলাম বিদ্বেষী সবাই ভোট দিতে পারে। নির্বাচনে ভোটাধিকারে এরা সকলেই সমান।

এটা দ্বীন ইসলামের মেজাজ নয়। একজন ১৮ বছরের ছেলে ও একজন ৩০-৩৫ বছরের পুরুষের আকলের পরিপক্বতা কি এক হওয়া সম্ভব? একজন শিক্ষিত, অভিজ্ঞ, বিজ্ঞ লোকের এবং একজন অশিক্ষিত, অনভিজ্ঞ ও অজ্ঞ লোক কি কখনো সমান হতে পারে! তাদের রায়, বিচার, চিন্তা কি কখনো সমান হতে পারে! একজন কাফেরের চাওয়া ও মুসলিমের চাওয়া কি এক হওয়া সম্ভব? শরিয়াহ কায়েমের ক্ষেত্রে সেক্যুলার লিবারেল মুরতাদ, ইসলাম বিদ্বেষী, নাস্তিকদের কোন ভোট কীভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে!

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:

“এই প্রচলিত গণতন্ত্র সম্পূর্ণরূপে একটি মনগড়া ও মিথ্যা ধারণা। বিশেষত এমন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, যা মুসলিম ও অমুসলিমদের সমন্বয়ে গঠিত, তা তো প্রকৃতপক্ষে একটি অমুসলিম শাসনব্যবস্থাই হবে।”[15]মালফুজাতে থানভী, পৃষ্ঠা-২৫২; এছাড়াও দেখুন “আহসানুল ফাতাওয়া”, কিতাবুল জিহাদ, অধ্যায়: সিয়াসাতে ইসলামিয়া

আর বাকি অপরাধীরাতো চাইবেই এমন কেউ আসুক যার শাসন আমলে তারা কোন বাধা ছাড়া যেন অপরাধ করে বেড়াতে পারে। মুফতী আযম দারুল উলুম দেওবন্দ, মাহমুদ হাসান গাংগুহী (রহ.) বলেন,

“আজকাল গণতন্ত্রের অর্থ হলো যে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলা, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, বুদ্ধিমান বা অজ্ঞ সকলকে ভোট দেয়ার অধিকার প্রদান করা হয় এবং তাদের ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে শাসক নির্বাচিত হয়। ইসলামে এ ধরনের গণতন্ত্রের কোনো অস্তিত্ব নেই এবং একজন সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এটির মধ্যে কোনো উপকারিতা খুঁজে পেতে পারে না।”[16]ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া, খণ্ড ৪, কিতাবুস সিয়াসাহ

গণতন্ত্র মানুষের মধ্যে সমতার ক্ষেত্রে ইসলামের বিরোধিতা করে, কুফফারদের মুসলিমদের সমান করে, যেখানে আল্লাহ বলেন,

“তবে কি আমি মুসলিমদেরকে অপরাধীদের মতই গণ্য করব? তোমাদের কী হল, তোমরা কিভাবে ফয়সালা করছ?”[17]আল-কালাম, আয়াত ৩৫-৩৬

গণতন্ত্রে, ধার্মিক-অধার্মিক, জ্ঞানী মুর্খ, সমকামী বা পৃথিবীতে দুর্নীতি ছড়ানোর ব্যক্তিরা সমান—এবং এটি একটি মহা অন্যায়।

নারী নেতৃত্ব

নারী নেতৃত্ব সুস্পষ্ট ভাবে হারাম, আহনাফ, হানাবিলা, শাফেয়ী, মালেকি, প্রায় সকলেই এই বিষয়ে একমত, এমনকি এই বিষয়ে ইজমা রয়েছে বসে সকলেই স্বীকার করেন।[18]মারাতিবুল ইজমা (ইবনে হাযাম রহঃ) পৃ: ১২৬; আল মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ ২১/২৭০; শারহুস সুন্নাহ, ১০/৭৭; ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; ১৩/১৭; মাজিল্লাতুল-মুজতামাঈ: সংখ্যা: ৮৯০ শাফেয়ীগণতো নারী শাসককে শাসকই মানেন না, তাদের নিকট নারী শাসক হলে তাকে অপসারণ বৈধ।[19]গিয়াছুল উমাম ফি তায়াসিয যুলম পৃষ্ঠা ৭৭, এছাড়া “আল-আহকামুস সুলতানিয়া” – আল-মাওয়ার্দী; “আল-গিয়াসী: গিয়াসুল উমাম ফিল তিয়াসিয যুলম” – ইমাম আল-জুয়াইনী: “তাহরীরুল আহকাম ফি তাদবীরি আহলিল ইসলাম” – আল-বদর ইবনে জামাআহ; “মুঈদুন নিয়াম ওয়া মুবীদুন নিকাম” – তাজুদ্দীন আস-সুবকী এই কিতাবগুলো দেখা যেতে পারে আর কেউ যদি জায়েজ বলেও তাতে কিছু যায় আসে না, কারণ তাদের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য, ইজমার বিরোধী এবং জায়েজ হওয়াটাও হকের নিকটবর্তী নয়।

অথচ গণতন্ত্র নারী নেতৃত্বকে আরো বেশি উৎসাহ প্রধান করে, তাদের জন্য নির্দিষ্ট আসনের কথা বলে, তাদের ক্ষমতায়নের কথা বলে, যারা এর বিরুদ্ধে তাদেরকে দমনের বুদ্ধি দেয়।

সকল ক্ষমতার অধিকারী জনগণ?

গণতান্ত্রিক সরকারকে বলা হয়ে অব দা পিপল, ফর দা পিপল, বাই দা পিপল। জনগণ যা চাইবে তাই হবে, তারা ইসলাম চাইলে ইসলাম, তারা না চাইলে ইসলাম চলবে না।

এই পয়েন্টে দুইটা সমস্যা প্রতীয়মান।

ক) আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতার সাথে শরিক

অথচ আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতা অধিকারী, তিনিই একমাত্র একচ্ছত্র ক্ষমতা রাখেন হুকুম দানে, বিধান শুধু আল্লাহই এবং এর বিপরীতে বিধান দেওয়ার কারো অধিকার নেই , তিনিই ক্ষমতা দেন ও তিনিই কেড়ে নেন।[20]সূরা আল বাকারা আয়াত ২৮৪-২৮৫, সূরা আন নূর, আয়াত ৪২, বনী ইসরাঈল আয়াত ১১১, আলে ইমরান আয়াত ২৬, ১৮৯, সুরা মুলক আয়াত ১, সূরা ইউনুস আয়াত ৪০, সূরা আনআম, আয়াত ৫৭, সূরা ক্বাসাস, আয়াত ৭০

মুফতি তাকি উসমানি (হাফি.) বলেন,

‘পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যার ভিত্তি জনগণের শাসনক্ষমতার চেতনার ওপর, তা সুনিশ্চিতভাবে ইসলাম পরিপন্থী। কেননা, ইসলামের ভিত্তি হলো “আল্লাহ সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক” এ বিশ্বাসের ওপর। কুরআন মাজিদে যা সংক্ষেপে إن الحكم إلا لله তথা “শাসনক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর-ই জন্য” বলে ইরশাদ হয়েছে। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় পশ্চিমা গণতন্ত্রকে হক মনে করা বর্তমান যুগের জঘন্যতম ভ্রান্তিগুলোর অন্যতম।[21]ফাতাওয়ায়ে উসমানি: ৩/৫০৭, প্রকাশনী: মাকতাবা মাআরিফুল কুরআন, করাচি

খ) শরিয়াহকে মানুষের ইচ্ছার অধীন করা বা আল্লাহর আনুগত্যে শরিক

এই বিষয়ে মাওলানা হাকিম আখতার (রহ.) অনেক সুন্দর একটা কথা বলেছেন৷ তিনি বলেন,

“ইসলামে গণতন্ত্র বলে কিছু নেই, যেখানে বেশি ভোট পড়বে, সেখানেই যেতে হবে। বরং ইসলামের সৌন্দর্য হলো, সারা দুনিয়া একদিকে হলেও মুসলমান শুধু আল্লাহরই অনুসরণ করবে। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ে নবুওয়াতের ঘোষণা দেন, তখন ভোট বা নির্বাচনের দৃষ্টিকোণ থেকে কেউই নবীর পক্ষে ছিল না। নবীর কাছে শুধু নিজের ভোট ছিল। কিন্তু নবী কি আল্লাহর বার্তা থেকে বিরত থেকেছিলেন এই কারণে যে গণতন্ত্র তার বিপক্ষে ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট তার বিপক্ষে ছিল? কখনোই নয়।”[22]খাজাইনে মারিফাত ও মুহাব্বাত, পৃষ্ঠা-২০৯

মূল কথা ইসলাম, শরিয়ত আপনার চাওয়া না চাওয়ার উপর নির্ভরশীল না, আপনি মুসলিম হলে আপনাকে ইসলামকে সাধরে গ্রহণ করেই নিতে হবে, না হয় আপনি মুসলিমই না। আপনি যদি ইসলাম না চান তাহলে মুরতাদ হয়ে যেতে পারেন, মুসলিম পরিচয় দিয়ে ইসলাম চাইনা বলার সুযোগ আপনার নিকট নেই। মানুষ চাইবে তাহলেই ইসলাম অনুসারে দেশ চলবে এই কথাটাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ও তার দ্বীন ইসলামের অপমান করার নামান্তর।

আবু কাতাদা ওমর বিন মাহমুদ বলেন,

‘যে-সব লোক ইসলামকে গণতন্ত্রের সাথে এক করে দেখতে চায়, তাদের প্রচেষ্টা যিন্দীকদের মত, যারা আল্লাহর দ্বীনকে মানুষের প্রবৃত্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য পরিবর্তন করে ফেলে। … ইসলাম জনগণকে বিধানগত ক্ষেত্রে পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতা দেয়নি; যেহেতু জনগণের জন্য ইসলামি বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া এবং শাসককে মুসলিম হওয়া আবশ্যকীয়। অপরদিকে গণতন্ত্র জনগণকে তাদের উপর প্রযোজ্য বিধি-বিধান প্রণয়নে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। এটাই গণতন্ত্রের মৌলিক তত্ত্ব, যা সম্পূর্ণ ইসলাম বিনষ্টকারী’।[23]আল-জিহাদ ওয়াল ইজতিহাদ, পৃঃ ১০৩-১০৪

শাইখ আবু বাসির মুস্তফা হালিমাহ বলেন,

প্রথমতঃ যে নীতির উপর গণতন্ত্র স্থাপিত তা হল ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’। এই ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে আইন প্রণয়ন ক্ষমতা, সাধারণ জনগণের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন, যে প্রতিনিধিরা আইন তৈরী ও প্রণয়নের কাজ করবে। অন্য কথায় গণতন্ত্রে যে আইন প্রণয়ঙ্কারী এবং যার আনুগন্য করা হয় আসলে সে আল্লাহ নয় বরং একজন সাধারণ মানুষ। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, আইন প্রণয়ন ও বৈধ-অবৈধ নির্ধারণের ক্ষেত্রে যার ইবাদাত অথবা আনুগত্য করা হয় সেও একজন জনগণ, একজন মানুষ, একজন সৃষ্টি, সে মহান আল্লাহ নয়। এটাই হল কুফর, শিরক এবং পথভ্রষ্টতার মুল অস্তিত্ব এবং দ্বীনের মৌলিক বিষয় সমূহ ও তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক। এভাবেই দুর্বল এবং অজ্ঞ লোকেরা শাসন-কর্তৃত্ব ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহর একক ইলাহ্যিয়াতের সাথে শরীক করে”।[24]হুকুম আল ইসলাম ফী আদ-দিমুক্রাতিয়্যাহ আত-তা’দ্দুদিয়্যাহ আল-হিযবিয়্যাহ, পৃঃ ২৮

মুকবিল বিন হাদি আল ওয়াদী (রহ) বলেন,

গণতন্ত্র কুফরি (অবিশ্বাস), কারণ এর অর্থ হলো জনগণ নিজেরাই নিজেদের শাসন করে। এর অর্থ হলো কোনো কিতাব (আল্লাহর কিতাব) নেই, কোনো সুন্নাহ নেই, কোনো ইসলাম নেই এবং ব্যভিচার ও সমকামিতার অনুমতি দেয়া হয়…’ [25]তুহফাতুল-মুজীব, পৃষ্ঠা ৩০৩

শাইখ আবু নাসর মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ আর-রায়মী আল-ইমাম (হাফি) বলেছেন:

“নির্বাচনে অংশ নেওয়া আল্লাহর সাথে শরীক (অংশীদার) সাব্যস্ত করার অন্তর্ভুক্ত, এবং তা হলো আনুগত্যের শিরক। কারণ নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ, আর এই ব্যবস্থাটি ইসলামের শত্রুরা মুসলিমদেরকে তাদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেছে। সুতরাং যারা এটি গ্রহণ করে, এতে সন্তুষ্ট হয়, এটি প্রচার করে এবং এটিকে সঠিক বলে বিশ্বাস করে, নিঃসন্দেহে সে আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করে ইসলামের বিরোধীদের আনুগত্য করল। আর এটাই হলো আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে শরীক করার মূল সারাংশ।

আল্লাহ তা’আলা বলেছেন: তাদের জন্য কি এমন কিছু শরীক আছে, যারা তাদের জন্য দীনের বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? আর ফয়সালার ঘোষণা না থাকলে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েই যেত। আর নিশ্চয় যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। তুমি যালিমদেরকে তাদের কৃত কর্মের জন্য ভীত-সন্ত্রস্ত দেখতে পাবে। অথচ তা (তাদের কর্মের শাস্তি) তাদের উপর পতিত হবেই। আর যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারা জান্নাতের উদ্যানসমূহে থাকবে। তারা যা চাইবে, তাদের রবের নিকট তাদের জন্য তাই থাকবে। এটাই তো মহাঅনুগ্রহ। (সুরা শুরা আয়াত ২১-২২)[26] শাইখ মুহাম্মাদ আল-ইমামের কিতাব ‘তানবীরুয-যুলামাত বিকাশফ মাফাসিদ ওয়া শুবুহাত আল-ইন্তিখাবাত’ পৃষ্ঠা ৩৯-৪০

হাকিমিয়্যার সাথে সাংঘর্ষিক

গণতন্ত্র আমাদেরকে কুফুরি আইন দিয়ে শাসন এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংসদ পরিবর্তন, আইন প্রণয়ন ও পরিবর্ধন, সংশোধন করার সুযোগ দিয়ে রেখেছে। অথচ আল্লাহ আইন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, প্রতিস্থাপন, বাতিল করা সুস্পষ্ট কুফুরি। আল্লাহর আইনের বিপরীতে আইন তৈরি সরাসরি শিরক।[27]কোরআনের সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩১ (তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৯৫, সনদ হাসান), আয়াত: ২৯, সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৯, সূরা আল মায়িদা, আয়াত ৮৭ তে এই বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।

শাইখ মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম আলে আশ-শাইখ (রহ) বলেন,

“গণতন্ত্রের পদ্ধতি আধুনিক যুগের শিরকের একটি রূপ, কারণ এতে আইন প্রণয়নের অধিকার আল্লাহর পরিবর্তে মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।”[28]তাহযিরুল উকালা’ মিন মাজালিমিদ-দিমুকরাতিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৭

মাউসূআতুল আদইয়ান ওয়াল মাযাহিব আল-মুআসিরা’ গ্রন্থে[29]২/১০৬৬-১০৬৭ এসেছে,

কোন সন্দেহ নেই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর প্রতি নতি শিকার কিংবা আইন প্রণয়নের অধিকারের ক্ষেত্রে নব্য শিরকের একটি রূপ। এ পদ্ধতিতে মহামহিম স্রষ্টার কর্তৃত্বকে বাতিল করে দেয়া হয়; অথচ আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র অধিকার হচ্ছে- স্রষ্টার; কিন্তু সে অধিকার তাঁর থেকে ছিনিয়ে মাখলুককে প্রদান করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা তাঁকে বাদ দিয়ে নিছক কতগুলো নামের (প্রতিমার) ইবাদত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পূর্বপুরুষগণ ও তোমরা রেখেছ; এর পক্ষে কোন প্রমাণ আল্লাহ অবতীর্ণ করেননি। বিধান দেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহর। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন শুধুতাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে। এটাই শাশ্বত ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০] আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: “বিধান দেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহর।” [সূরা আনআম, আয়াত: ৫৭]

শেখ মুকবিল (রহ) বলেন,

এবং এই ভোট প্রদান ও নির্বাচনের মাধ্যমে হারাম কাজগুলো হালাল হয়ে যায়। কুফরি দেশগুলোর জনগণ ব্যভিচারের পক্ষে ভোট দেয় এবং অধিকাংশ মানুষ এতে সম্মত হয়। … … … “…পক্ষান্তরে এই (নির্বাচন) এর ক্ষেত্রে, সেই দুষ্ট ব্যভিচারিণী নারী, মদ বিক্রেতা এবং কমিউনিস্টের মতামতও কুরআনের মতামতের সমান হয়ে যায়। সুতরাং কুরআনকে কেবল একটি মতামত হিসেবে অন্যান্য মতামতের সাথে সমতুল্য করে উপস্থাপন করা হয় এবং তারপর (সেই সমস্ত মতামতের মধ্যে) ভোটগ্রহণের মাধ্যমে মদ ও ব্যভিচারকে বৈধ করা হয়…” [30]নাসাইহ ওয়া ফাদাইহ, পৃষ্ঠা ৫০-৫৩

মুফতী হামিদুল্লাহ জান (রহ.)-এই বিষয়টি নিয়ে বলেছে,

“প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে প্রমাণিত যে, বর্তমান পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিজেই অশান্তি, অবৈধতা ও সকল বিপদ-বিপত্তির মূল কারণ, বিশেষত এতে সংসদকে আইন প্রণয়ন (আইন তৈরী) ও শাসন করার অধিকার দেওয়া সম্পূর্ণভাবে কিতাব ও সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মতের খেলাফ। আর ভোটদান পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যত মেনে নেওয়া এবং এর সমস্ত মন্দত্বে অংশীদার হওয়া, তাই পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোট দেওয়া শরীয়ত অনুযায়ী নিষিদ্ধ।”[31]ভোট কা তাহকিকী ওয়া তানকিদী জায়েযা, পৃষ্ঠা ৪৩

আল্লাহর আইন দ্বারা শাসন করা ব্যতিত অন্য  আইন দ্বারা শাসন কার্য চালানোর ভয়াবহতা কতটুকু তা এ বিষয়ে ইজমা দ্বারা উপলব্ধি করা যেতে পারে। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ) বলেছেন, ‘ইজমা আছে এমন কোনো বিষয়কে হারাম করা যা হালাল, হালাল করা যা হারাম, অথবা শরীয়াহর যেসব বিষয়ে ইজমা আছে এগুলোর কোনোটির পরিবর্তন বা বিকৃতি করা ফকিহদের ইজমা অনুসারে সুস্পষ্ট কুফুরি যা একজনকে দ্বীন থেকে বের করে দিতে যথেষ্ট।[32]মাজমুউল ফাতওয়া ৩/২৬৭ ইবনুল কায়্যিম (রহ.)-ও আলোচনা করেছেন যে, ‘কুরআনে এবং বিশুদ্ধ সূত্রে আলিমদের ইজমা রয়েছে, দ্বীন ইসলাম পূর্ববর্তী সকল ধর্মের রহিতকারী। তাই এখন তাওরাত, ইনজিলের বিধি-বিধান আঁকড়ে থাকা এবং কুরআন অনুসরণ কর না করা সুস্পষ্ট কুফুরি।[33]আহকামু আহলিয যিম্মাহ ১/২৫৯

ইবনু কাসীর (রহ) এই ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট করে বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি নবীদের সিলমোহর (খাতামুন্নাবিয়্যিন) মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ-এর প্রতি নাযিলকৃত বিধিবিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং (পূর্ববর্তী নবীদের) রহিত হয়ে যাওয়া কোনো আইনকানুনের মাধ্যমে বিচার প্রার্থনা করবে, সে একজন কাফির। সুতরাং, যে ব্যক্তি শরীয়াহর পরিবর্তে ইয়াসিকের বিধানকে প্রাধান্য দেবে, এর মাধ্যমে বিচার প্রার্থনা করবে তার ওপর কী হুকুম প্রযোজ্য হবে তা সহজেই অনুমেয়। যে এটা করবে, মুসলিমদের ঐকমত্য অনুসারে সে কাফির সাব্যস্ত হবে।[34]আল হিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৩/১১৯

এখানে ব্যক্তি বিশেষকে তাকফির করার ক্ষেত্রে অবশ্যই কিছু নির্দিষ্ট শর্ত ও উসুলাদী রয়েছে। তাই এই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকাও জরুরি।

আরো কিছু

এই সিস্টেমটাতো শরিয়ার বাধ্যবাধকতাকেই স্বীকার করে না। এই সিস্টেম সবাইকে প্রায়োরিটি দেয়। বাম ডান কলা পেপে সবাইকে। এই সিস্টেমে শাসক নির্বাচনে সকলেই সমান, এমনকি যে কেউ দল গঠন করতে পারে বা প্রার্থি হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারে। এই সিস্টেমটায় শরিয়াহ হল সিস্টেমের অনুগত, মানুষের অনুগত। আপনি যদি শরিয়াহ চাপিয়ে দিতে চান আপনাকে জোর করে নামিয়ে দেওয়া হবে। এই সিস্টেমের মূল দর্শন হল আল্লাহর পরিবর্তে মানুষকে সন্তুষ্ট করা, আল্লাহর পরিবর্তে মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। এমনই আরো বহু সমস্যা রয়েছে ইসলামের সাথে গনতন্ত্রের। সমস্যাগুলোর আরো শাখা প্রশাখা রয়েছে। যেমন, শেখ ইয়াহিয়া আল-হাজুরী (রহ)-কে ভোটদান ও নির্বাচনের বিধান কী প্রশ্ন করা হয় তখন তিনি উত্তর দেন,

এটি সেই সকল গণতান্ত্রিক আইনের অন্তর্ভুক্ত যা আল্লাহর সত্য বিধানকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে পরিচালিত। এগুলোকে কাফিরদের অন্ধ অনুসরণও গণ্য করা হয়, আর তাদের অনুসরণ করা জায়েয নয়। এতে অত্যন্ত ক্ষতিকর দিক রয়েছে এবং মুসলমানদের জন্য এতে কোন উপকার বা লাভ নেই।

তন্মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসমূহ হলো:

১। (এটি) সত্য ও মিথ্যার মধ্যে এবং সত্যনিষ্ঠ মানুষ ও মিথ্যার অনুসারীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সমতা স্থাপন করে।
২। আল-ওয়ালা ওয়াল বারা  বিলুপ্ত করে, মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করে।
৩। এটি এরূপ বিষয় ডেকে আনে – ঘৃণা, শত্রুতা, গোষ্ঠীবাদ, উগ্রতা মুসলমানদের মধ্যে।
৪। এটি আরও কারণ হয় প্রতারণা, কপটতা, জালিয়াতি, মিথ্যা এর।
৫। এটি সময় ও অর্থের অপচয় করে
৬। নারীর লজ্জাস্থান উন্মুক্ত করে এবং পাশাপাশি
৭।  ইসলামী জ্ঞানতার ধারক-বাহক (উলামায়ে কেরাম) এর প্রতি একজন মুসলিমের আস্থাকেও বিনষ্ট করে[35]আল-মাবাদী আল-মুফীদাহ ফী আত-তাওহীদ ওয়াল ফিকহ ওয়াল-আকীদাহ, নতুন আরবী সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২৯, প্রশ্ন নং ৪৮।

শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি) বলেন:

আজকাল বিভিন্ন দেশে যে নির্বাচনগুলো সুপরিচিত এবং প্রয়োগ করা হয়, তা ইসলামী ব্যবস্থার অংশ নয়। এতে বিশৃঙ্খলা, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লোভ এবং পক্ষপাতিত্ব প্রবেশ করে। এর ফলে ফিতনা ও রক্তপাত ঘটে, এবং এর দ্বারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয় না। বরং, এগুলো শুধু প্রচারণা, ক্রয়-বিক্রয় এবং মিথ্যা দাবির মাঠ।[36]নির্বাচন ও বিক্ষোভের হুকুম আল-জারীদাতুল-জাযীরাহ, ইস্যু ১১৩৫৮, রমজান ১৪২৪

এমনও কিছু আইন রয়েছে যা গণতন্ত্রের দ্বারা আসলে বাস্তবায়ন সম্ভব না, গনতন্ত্র কখনোই সেগুলোকে বাস্তবায়ন করতে দিতে চাইবে না, এমন বহু বিধানের ক্ষেত্রেই দেখা যায় মডরেট মুসলিমরা সেগুলোকে পশ্চিমা প্রভাবের দরুন সম্পুর্ন অস্বীকারই করতে চায়।

Read More...  ধর্ষক-ব্যভিচারীদের জন্য জান্নাত?

আমি শুধু গনতন্ত্রের যেই বিষয়গুলো প্রায় সকলের জন্য একই রকম কাজ করে সেইসব নিয়ে আলাপ আলোচনা করেছি, কিন্তু গনতান্ত্রিক সংবিধানের অবস্থাতো এর চাইতে আরো করুন, আরো ভয়াবহ। একেক দেশের সংবিধানে একেক রকম, একেক ধরণের, একেক পর্যায়ের কুফুরি বিধান রয়েছে। কোন দেশের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘ধর্মীয় অনুশীলনের সাথে সম্পর্কিত আর্থিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা অন্যান্য কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বা সীমাবদ্ধ করতে পারে আইন।’ আবার কোথাও বলা হয়েছে, ‘দেশের সর্বোচ্য আইন সংবিধান এবং অন্যান্য সকল আইন সংবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক সকল আইন মত বাতিল বলে গণ্য হবে।’ অর্থাৎ প্রতিটা মানুষ তার ধর্মের ততটুকু অনুসরণ করে যতটুকু রাষ্ট্র তাকে অনুসরণ করার অনুমতি দিয়ে রেখেছে, ততটুকু মান্য করা বৈধ যতটুকু সংবিধান ও আইনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়৷

আমাদের দেশেও সংবিধানে রয়েছে, ধর্ম নিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য ৪টি জিনিস বিলুপ্ত করা হবে যার একটি হল ‘রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান’, এছাড়া আরো বলা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা-ও বিলোপ করা হইবে।[37]সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ (২০১১ সনের ১৪নং আইন)-এর ১১ ধারাবলে ১২ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত। ধর্মনিরপেক্ষতাই যেখানে কুফুরি সেখানে এটি প্রতিষ্ঠা ও কায়েম রাখার উদ্দেশ্যে বিলোপ করতে চাওয়া বিষয়গুলোর নিশ্চয় সুস্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদর্শন করা জরুরী, না হয় এটি আরো ভয়াবহ ব্যাপার। এছাড়া সংবিধানের ৪টি মূলনীতি হল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।[38]সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ (২০১১ সনের ১৪নং আইন)-এর ৮ ধারাবলে (১) ও (১ক) দফার পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত। এগুলোর সবগুলোই দ্বীন ইসলামের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ রাখে। এই দেশের সংবিধান নিয়ে প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব স্যার বহু পুর্বেই লিখেছেন।[39] https://at-tahreek.com/article_details/1522 তাই এখানে আর এসব বিষয়ে কথা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি না।

গণতন্ত্র ও ইসলামে একত্র করে পাশাপাশি চালানো আসলেই সম্ভব নয়। বহু জনই গনতন্ত্রের ইসলামাইজেশন করে ইসলামীক গনতন্ত্রের একটি হাঁস-জারু সদৃশ রুপ রেখা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু দিন শেষে কি হয়েছে? কিছুই অর্জিত হয় নি। ইসলামের উপর ঠিকই বারে বারে কুফুরি জীবন ব্যবস্থা প্রবল থেকেছে, প্রভাব বিস্তার করেছে। তাই হক ও বাতিল কখনো এক হওয়া সম্ভব নয়, তারা কখনো পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে না।

মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদুদী (রহ) বলেন,

“ইসলাম মূলত এ জন্য দুনিয়ায় আসেনি যে, কুফরী ব্যবস্থার অধীনে দেশ শাসিত হবে এবং মুসলমানরা এ বাতিল শাসন ব্যবস্থার পদানত হয়ে থাকবে। ইসলাম এসেছে এ জন্যে যে, পৃথিবীতে কর্তৃত্ব ও প্রভুত্বের চাবিকাঠি মুসলমানদের হাতেই নিবদ্ধ থাকবে আর অমুসলিমরা তার অধীন হয়ে থাকবে। এ দিক থেকে ইসলামী রাষ্ট্র মূলত একটি প্রচার ও দাওয়াত সর্বস্ব রাষ্ট্র। দুনিয়ায় আল্লাহর কালেমাকে সমুন্নত করাই তার কাজ। আর জিহাদেরও প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে কুফরের উপর ইসলামকে জয়যুক্ত করা”[40]জামায়াতে ইসলামির উনত্রিশ বছর পৃষ্ঠা ১৩-১৪

ইসলামি গণতন্ত্র?

আমি এই কথা বলবো না যে ইসলামের ইতিহাসের রাসুল, সাহাবা, তাবেই, তাবেতাবেইন, ৪ ইমাম ও পরবর্তীকালের মুজতাহিদ স্কলারগণ কেউ গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম কায়েম করেনি, শাসক বসান নি তাই এটা হারাম। কারণ হারাম হওয়ার দলিল এটা না। হারাম হওয়ার কিছু কারণ আমরা পুর্বেই আলোচনা করে এসেছি।

কিন্তু যারা ইসলামি গণতন্ত্র আবিষ্কার করেছে, ইসলামে গণতন্ত্র খুঁজে পায় আমাদের সমস্যা তাদেরকে নিয়ে। এদের মস্তিষ্ক আসলে কতটুকু তা খুব আশ্চার্য হয়ে চিন্তা করি! এদের জন্য আমি কয়েকজনের উদ্ধৃতি কোট করেই সন্তুষ্ট হতে চাই। যেমন আল্লামা সৈয়দ সুলায়মান নদভী (রহ.)-এর বক্তব্য, তিনি “ইসলামী গণতন্ত্র” এর ধারণা খণ্ডন করে লিখেন,

“গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ইসলামের সাথে কী সম্পর্ক? এবং খিলাফতে ইসলামের সাথে এর কী সম্পর্ক? বর্তমান গণতন্ত্র তো সপ্তদশ শতাব্দীর পর সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি গ্রিক গণতন্ত্রও বর্তমান গণতন্ত্রের থেকে আলাদা ছিল। সুতরাং ‘ইসলামী গণতন্ত্র’ একটি অর্থহীন পরিভাষা। আমরা ইসলামি ব্যবস্থায় পশ্চিমা গণতন্ত্রের কোনো রূপই খুঁজে পাইনি, এবং ‘ইসলামী গণতন্ত্র বলে কোনো জিনিসের অস্তিত্বই নেই। গণতন্ত্র একটি নির্দিষ্ট সভ্যতা ও ইতিহাসের ফলাফল। এটি ইসলামের ইতিহাসে খোঁজার চেষ্টা শুধু ব্যর্থতাই নয়, বরং পরাজিত মানসিকতা।”[41]মাসিক “সনাবিল”, করাচি, মে ২০১৩, খণ্ড-৮, সংখ্যা-১১, পৃষ্ঠা-২৭; সম্পাদক: মাওলানা হাফিজ মুহাম্মদ আহমদ

শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন,

ইসলাম ও গণতন্ত্র দু’টি বিপরীতমুখী ব্যবস্থা। যা কখনো এক হওয়ার নয়। একটি আল্লাহর উপর ঈমান ও আল্লাহ নির্দেশিত পন্থায় জীবন পরিচালনার নির্দেশ দেয়, অপরটি ত্বাগূতের প্রতি ঈমান ও তদনুযায়ী জীবন পরিচালনার উপর নির্ভরশীল।[42]সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, রেকর্ড নং-৩৫৩

মুফতি নিজামুদ্দিন শামজায়ি শহিদ (রহ.) বলেন,

‘যেমন প্রস্রাবের দ্বারা কখনো অজু হয় না এবং নাপাকের দ্বারা কখনো পবিত্রতা অর্জন হয় না, তেমন ধর্মহীনতা ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের মাধ্যমে কখনো ইসলামের বিজয় আসতে পারে না। পৃথিবীতে ইসলামের বিজয় অর্জনের একটিই উপায়, যে উপায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গ্রহণ করেছেন। আর সেটা হলো জিহাদের রাস্তা, যার মাধ্যমে এ পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হবে।'[43]মাসিক সানাবিল, করাচি: ৮/৩৩, সংখ্যা: ১১-ই মে, ২০১৩ ইং

আমাদের দেশের খ্যাতনামা আহলেহাদীছ বিদ্বান মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী আল-কোরায়শী ইসলামী দলগুলোর গণতন্ত্র নিয়ে শিথিলতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, (পাকিস্তানের প্রস্তাবিত ‘ইসলামের নির্দেশিত গণতন্ত্র’ সম্পর্কে)

‘বর্তমান সময়ে ওয়াইন এন্ড ফুডের হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিড়ি, সূদী লেনদেনের প্রতিষ্ঠান … থেকে আরম্ভ করিয়া ন্যাশনালিজম ও সোশিয়ালিজম পর্যন্ত ‘ইছলামি’ সাইনবোর্ড ও লেবেলে সুশোভিত হইয়া উঠিয়াছে। সুতরাং ইসলামী ও কুফরী ব্যভিচার, ইসলাম ও কুফরী ন্যাশনালিজম ও সোশিয়ালিজমের মধ্যে প্রভেদ করা যেরূপ অসম্ভব, সেইরূপ ইছলামি ও কুফরী গণতন্ত্রের আকৃতি ও প্রকৃতি সম্বন্ধে সম্যক ধারণা সুগঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইছলামি গণতন্ত্রের স্বরূপ উপলব্ধি করা কাহারো সাধ্যায়াত্ম নয়’।[44]গণতন্ত্রের প্রকৃতি ও আকৃতি, তর্জুমানুল হাদীছ ১/২ সংখ্যা, ১৯৪৯ইং, পৃ. ৮৫।

তিনি আরো বলেন,

‘দুনিয়ার বাযারে গণতন্ত্রের যে বেসাতির তেজারৎ চলিতেছে, ইছলামের সহিত তাহার আপোষহীন বৈষম্যের জন্য তাহাকে ইছলামি মার্কা দিয়া স্বতন্ত্র করিয়া দেখাইবার প্রয়োজন, উদ্দেশ্য প্রস্তাবের রচয়িতাগণ বোধ করিয়া থাকিলে, সেরূপ গণতন্ত্রকে টানিয়া হেঁচড়াইয়া শুদ্ধি করাইবার আবশ্যক কি ছিল? প্রকৃত প্রস্তাবে রাষ্ট্রসমূহ কেবল গণতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র ও রাজতন্ত্রে বিভক্ত নয়, পঞ্চমশ্রেণীর আর এক প্রকার রাষ্ট্র আছে যাহার নাম ইছলামি রাষ্ট্র। ইছলামি রিয়াছৎ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন, উহা রাজতান্ত্রিক, সামন্ততান্ত্রিক ও পুরোহিত তান্ত্রিক নয়, এই পঞ্চবিধ রাষ্ট্রের অমিশ্রযোগের প্রচেষ্টা নিরর্থক’[45]গণতন্ত্রের প্রকৃতি ও আকৃতি, তর্জুমানুল হাদীছ ১/২ সংখ্যা, ১৯৪৯ইং, পৃ. ৮৬

অনেকে আবার শূরা পদ্ধতিকে গণতন্ত্রের নির্বাচনের সঙ্গে মেলানোর অপচেষ্টা চালিয়ে থাকেন। সাহাবাগণের নির্বাচনকে গণতন্ত্র বলে থাকেন। কিন্তু আমার ভাইয়েরা ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ’ এর বোর্ড গঠন করতে চান না। যেখানে শুধু ভূ-রাজনীতি নিয়ে যোগ্য, জ্ঞানী, পারদর্শী, আলেম ওলামা, ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী ব্যক্তিবর্গ থাকবে। যারা কারো চাপে, কারো নিকট হতে ঘুস খেয়ে কাউকে নির্বাচন করবে না। আর যেকোনো রাস্তার ধারে বিড়ি টানা, টংয়ের দোকানে ছায়াছবি দেখা অজ্ঞ-মুর্খ, মদ খোর, ঘুসখোর, সুদ খোর, শাতিম, কাফেরদের আনুগত্যকারী কেউ ভোট দিতে পারবে না।

শূরা ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের সঙ্গে জড়ানোর পূর্বে এমন ব্যবস্থা তৈরি করুন যেখানে কেউ একচ্ছত্র ক্ষমতা পেলেও যেন শরিয়াহর আইন বাদ দিয়ে কুফুরি আইন প্রয়োগ করতে না পারে। যতক্ষণ সম্পূর্ণ শাসন ব্যবস্থা একে বারে ধ্বংস না করা হবে ততক্ষণ কারো দ্বারা যেন শরিয়াহ বাদ দিয়ে কুফুরি আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হয়।

এর পূর্বে বর্তমানের কুফুরি গণতন্ত্রের পক্ষে সাহাবা ও শুরায় নির্বাচনের দলিল দেওয়া ইউনিকর্ণের পিঠে চড়ে মাল্টিভার্স ভ্রমণ করার মত বিষয় হিসেবেই পরিগণিত হবে।

কুরআনে বর্ণিত শূরা পদ্ধতি সেসব লোকের জন্য সীমাবদ্ধ যারা প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী, যারা মানুষের ভাল-মন্দ অবস্থা সম্পর্কে অবহিত। সেখানে একজন মুমিন, একজনের কাফেরের মধ্যে, একজন আলেম ও জাহেলের মধ্যে, ভাল ও ফাসিক লোকের মধ্যে পার্থক্য করা হয়। কিন্তু প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থায় মানুষের মধ্যে এ ধরনের কোন মূল্যমান নির্ধারণ করা হয় না। তাই এর সাথে শূরা পদ্ধতির সাদৃশ্যতা বের করা নিতান্তই অলিক সম্পত্তি অর্জন করার নামান্তর।

শায়খ মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আর-রাইমী আল-ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কিছু লোকের এই বক্তব্য সম্পর্কে: “গণতন্ত্র এবং ভোটদান ইসলামী শূরার (পরামর্শ) সমতুল্য।” শায়খ উত্তর দিলেন:

আল্লাহর কসম, যদি আমাদের এই ভয় না থাকতো যে অজ্ঞরা এই ধরনের কথার দ্বারা প্রভাবিত হবে, তবে এই (বক্তব্যের) উত্তর দেওয়াও বাধ্যতামূলকভাবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল। যাই হোক, গণতন্ত্র এবং ভোটদান ইসলামী শূরার সাথে মিলিত নয়, যা আল্লাহ বিধান করেছেন, না ধর্মের মূলনীতিতে, না এর শাখাগুলোতে, না সম্পূর্ণভাবে, না আংশিকভাবে, না অর্থে, না ভিত্তিতে।

তারপর শায়খ—আল্লাহ তাকে উম্মাহর কল্যাণের জন্য হিফাজত করুন—এই বক্তব্যের খণ্ডনের জন্য আটটি বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপন করেন, যার শীর্ষে ছিল যে আল্লাহ ইসলামী শূরা বিধান করেছেন, যেখানে অবিশ্বাসী, অপরাধী এবং অজ্ঞ লোকেরা গণতন্ত্র বিধান করেছে।[46]শায়খ মুহাম্মাদ আল-ইমামের বই তানউইরুদ্ধ-ধুলামাত বিব কাশফ মাফাসিদ ওয়া শুবুহাত আল-ইন্তিখাবাত, পৃষ্ঠা ৩১-৩৫

আমাদের করণীয় ও গণতন্ত্রের বিকল্প

আমাদের মুসলিমদের নিকট শরিয়াহ অনুসারে চালিত হওয়া, শরিয়া অনুযায়ী বিচার ও ফয়সালা করা, দেশ চালানো, সমরনীতি প্রণয়ন, অর্থনীতির ভিত্তি করা ইত্যাদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর গুরুত্ব সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া বলেছেন,

জনগণের যাবতীয় ব্যাপার সুসম্পন্ন করা-রাষ্ট্র কায়েম করা দীনের সর্বপ্রধান দায়িত্ব। বরং রাষ্ট্র ছাড়া দীন প্রতিষ্ঠা হতেই পারে না। আরো কথা এই যে, আল্লাহ তায়ালা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ এবং নিপীড়িতদের সাহায্য করা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। এভাবে তিনি জিহাদ, ইনসাফ ও আইন-শাসন প্রভৃতি যেসব কাজ ওয়াজিব করে দিয়েছেন তা রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্র কর্তৃত্ব ছাড়া কিছুতেই সম্পন্ন হতে পারে না।[47]আস-সিযাসাতুশ শরইয়্যাহ, পৃষ্ঠা-১৭২-১৭৩; এছাড়া উনার একটি কিতাব রয়েছে ‘আল খিলাফতু ওয়াল মুলক’ যার বাংলা অনুবাদ হয়েছে ‘খিলাফত ও রাজতন্ত্র’ নামে, সেখানেও এই বিষয়ে আলাপ আলোচনা রয়েছে

সৌদির সর্বোচ্চ ফতোয়া বোর্ড আল-লাজনাহ আদ-দায়েমাহ লিল-বুহূছ আল-ইলমিইয়া ওয়াল-ইফতা থেকে একটি প্রশ্নের বলা হয়েছে,

যে সব দেশে ইসলামী শরিয়াভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চালু নাই সেসব দেশের মুসলমানদের উপর ফরজ ইসলামী হুকুমত ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা নিয়োজিত করা এবং যে দল ইসলামী হুকুমত বাস্তবায়ন করবে বলে তারা ধারনা করেন সে দলকে একজোটে সবাই মিলে সহযোগিতা করা। পক্ষান্তরে, যে দল ইসলামী শরিয়া বাস্তবায়ন না করার প্রতি আহ্বান জানায় সে দলকে সহযোগিতা করা নাজায়েয। বরং এ ধরনের সহযোগিতা ব্যক্তিকে কুফরের দিকে ধাবিত করে। দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী:

“আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের মাঝে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী বিধান দিন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, যাতে করে আল্লাহ আপনার প্রতি যা নাযিল করেছেন তারা এর কোন কিছু হতে আপনাকে বিচ্যুত করতে না পারে। অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে রাখুন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের কিছু পাপের শাস্তি দিতে চান। নিশ্চয় মানুষের মধ্যে অনেকেই ফাসেক। তারা কি জাহেলিয়াতের বিধান কামনা করে? যারা (আল্লাহর প্রতি) একীন রাখে তাদের কাছে আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা কে?”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৪৯-৫০]

এ কারণে যারা ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে না আল্লাহ তাদেরকে কাফের হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের সাথে সহযোগিতা করা থেকে, তাদেরকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করা থেকে সাবধান করেছেন। যদি মুমিনগণ প্রকৃত ঈমানদার হয় তাদেরকে তাকওয়া অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:

“হে মুমিনগণ, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করেতাদেরকে এবং অন্য কাফেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।”।[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৫৭]

আল্লাহই তাওফিকদাতা, আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।[48]গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি

শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায, শাইখ আব্দুর রাজ্জাক আফিফি, শাইখ আব্দুল্লাহ গুদইয়ান। – স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১/৩৭৩) থেকে সমাপ্ত

তাই আমাদের কর্তব্য হল শরিয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রচেষ্টা চালানো। এখন আমাদের বহু ভাইয়েরা ভাবেন গণতন্ত্রের বুঝি আর বিকল্প নেই, ইসলাম পশ্চিমা রীতি নীতির আলোকেই চালাতে হবে, এ ছাড়া আর উপায় নেই। গণতন্ত্র ছাড়া আর কোন উপায় নেই শরিয়াহ কায়েমের।

এমন চিন্তা চেতনা আসলেই দ্বীন ইসলাম নিয়ে হীনমন্যতা ও পরাজিত মনমানসিকতার ফলাফল, অন্যপন্থাগুলো পশ্চিমা লেন্সে হয়তো খারাপ বা গ্রহণযোগ্য না তাই আজ তাদের নিকটও তা সমস্যাজনক। তারা আসলে পশ্চিমা জ্ঞান ছাড়া আর বেশি কিছুই আয়ত্ত করতে পারে নি বিধায় আজ তাদের এই দশা৷ অথচ ড. সাদ বিন মাতর আল ওতাইবি একটি আর্টিকেল লিখেছিলেন, যেখানে তিনি ইমাম ক্বাযী আবুল হাসান মাওয়ার্দী (৪৫০ হি.) রচিত আহকামুস সুলতানিয়্যাহ কিতাব রাজনীতিতে আগ্রহী ছাত্রদের পড়তে বলেন এবং উল্লেখ করেন পশ্চিম রাজনীতিবিদরা কিভাবে এই কিতাব থেকে ইসলামী রাজনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক নকল করেছে। এই বিষয়ে একাধিক থিসিস লেখা হয়েছে। চিন্তা করে দেখুন একবার!

যাইহোক এটাতো হলো ইসলামী রিয়াসাতে সিয়াসাত কেমন হবে তার বিষয়, যা পরবর্তী ধাপ, এই নিয়ে আলাপ না হয় আজ রাখি, কারণ এত গভীর ও বিস্তর আলাপ এখানে সম্ভব নয়। কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আমাদের করণীয় কি হবে?

শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের নিকট একমাত্র একটাই পথ রয়েছে, তা হল বিপ্লবের মাধ্যমে।

বৃটিশদের বিরুদ্ধে আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী (রহ) মুসলিম লীগের সমর্থনে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তখন স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, তিনি আসলে এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে। নিতান্তই বাধ্য হয়ে এতে শামিল হয়েছেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতিনিধিদলকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যুদ্ধের জন্য এখন কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত? সাংবিধানিক পদ্ধতি নাকি বিপ্লবী পদ্ধতি? উত্তরে জমিয়তের প্রতিনিধি বলেছিলেন, এখন যেহেতু যুদ্ধের শক্তি ও অস্ত্র নেই, তাই বাধ্য হয়েই আমরা সাংবিধানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছি।[49]ইয়াদে রফতেগাঁ, পৃঃ ৩৯০, ৩৯১ (মজলিসে নশরিয়্যাতে ইসলাম, করাচি) ; মুকালামাতুস সদরইন, পৃ: ১৩ মাওলানা তাহের কাসেমীর সংকলন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যখন তিনি দেখলেন, আইন প্রণয়নকারী কমিটির মাধ্যমে ইসলামী আইন প্রণয়ন সম্ভব না, তখন গণবিপ্লব তৈরির জন্য ঢাকা গিয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে বললেন, সরকার যেন ইসলামী আইন জারি করে, নতুবা আমরা বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত আছি।[50]তা’মীরে পাকিস্তান আওর উলামায়ে রব্বানী, পৃ: ১৫৪, ১৫৫ (এদারায়ে ইসলামিয়্যাত, লাহোর)

এছাড়া মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম (রহ) এরশাদের শাসনকালে একটি ছোট বই লিখেছিলেন ‘গণতন্ত্র নয় পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব‘ এই নামে। সেখানেও তিনি বেশ কিছু বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেছেন ও সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি বইটির শেষের দিকে লিখেন,

বস্তুতঃ পুরাতনকে (গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে) মেরামত করে, জোড়াতালি দিয়ে দুর্নীতি ও কুসংস্কারের জঞ্জালে নিমজ্জিত বর্তমান মুসলিম সমাজকে ইসলামী বানানো সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ ইসলামের বাস্তবায়ন সম্ভব একটি ইসলামী বিপ্লবের দ্বারা; সেই বিপ্লবই হওয়া উচিত মুসলমানদের একমাত্র লক্ষ্য।[51]গণতন্ত্র নয় পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব, পৃষ্ঠা ১৬

এখন প্রশ্ন আসতে পারে এই বিপ্লব কি করে হবে? এর পন্থা কেমন? এই বিষয়ে ইবনে তাইমিয়া (রহ)-এর লিখায় আমরা পাই তিনি বলেন,

দ্বীন কায়েম হবে কেবল কিতাব, ইনসাফ ও তরবারির দ্বারা। সুতরাং কিতাব দিয়ে জ্ঞান ও দ্বীন প্রতিষ্ঠা পায়। মিজান বা ইনসাফ দিয়ে অর্থনৈতিক চুক্তি ও অধিগ্রহণের অধিকার সাব্যস্ত হয়। আর তরবারি দিয়ে হুদুদ কায়েম হয় কাফির ও মুনাফিকদের ওপর।[52]খিলাফত ও রাজতন্ত্র, পৃষ্ঠা ৬৪-৬৫

মোহাম্মদ আব্দুর রহিম (রহ) বলেন,

তারা (নবী-রাসূলগণ) প্রতিষ্ঠিত সকল প্রকারের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করে একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব কবুল করার, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার দাওয়াত দিয়েছেন এবং তা-ই হচ্ছে ইসলাম ও ইসলামী হুকুমাত কায়েমের একমাত্র পথ ও পন্থা। এ পথ ও পন্থা চিরন্তন। সর্বকালে সর্ব দেশের সকল অবস্থায় এই দাওয়াতই হচ্ছে আল্লাহর বান্দাহগণের একমাত্র পথ। একমাত্র সঠিক ও নির্ভুল পন্থা।[53]গণতন্ত্র নয় পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব, পৃষ্ঠা ১৩-১৪

আমরা পুর্বেই দেখেছি মুফতি নিজামুদ্দিন শামজায়ি শহিদ (রহ.) এর বক্তব্য, যেখানে তিনি বলেছেন,

পৃথিবীতে ইসলামের বিজয় অর্জনের একটিই উপায়, যে উপায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গ্রহণ করেছেন। আর সেটা হলো জিহাদের রাস্তা, যার মাধ্যমে এ পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হবে।'[54]মাসিক সানাবিল, করাচি: ৮/৩৩, সংখ্যা: ১১-ই মে, ২০১৩ ইং

সু-পরিচিত সালাফি আলেম আসাদুল্লাহ আল গালিব (হাফি)-ও এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন,

ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার উপায় হ’ল দু’টি : দাওয়াত ও জিহাদ। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোন বিপ্লব সংগঠিত করতে হলে উদ্দিষ্ট বিষয়ের জোরালো প্রচার-প্রচারণা চালানের কোন বিকল্প নেইনীতি, আদর্শ আর কর্মসূচী অক্ষুণ্ণ রেখে জনমত সৃষ্টি করতে হয়যাতে করে মানুষের চিন্তা জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)ও তার আদর্শ প্রচার করে যিন্দাদিল মর্দে মুজাহিদরূপী একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবাহিনী তৈরী করেছিলেনতাদের ত্যাগপুত মানসিকতায় ইসলাম একদিন মক্কা-মদীনার গন্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলমানদের কাংখিত খেলাফতআজকের দিনেওএকই পদ্ধতি অনুসরণ করলে আবারও খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহসুতরাং প্রথমোক্তটির মাধ্যমেখেলাফতপ্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে হবেতাদের চিন্তাধারায় বিপ্লব আনতে হবেদ্বিতীয়টির জন্য ব্যাপক বস্ত্তগত যোগ্যতাক্ষমতা অর্জন করতে হবেএজন্য ইসলাম বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে প্রথমে সীসাঢালা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করতে হবেএটাই হবে জিহাদের সর্বপ্রধান হাতিয়ার।[55]ইসলামী খেলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন ১৮-১৯ পৃঃ

শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি (রহ) বলেন,

আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ‘খিলাফতে আম্মাহ’ (ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করা) দিয়ে প্রেরণ করেছেন। (এবং পুরো দুনিয়ার সকল জীবনব্যবস্থার উপর খেলাফতকে প্রতিষ্ঠা করা) আল্লাহর দীনকে সকল দীনের উপর বিজয় করা শুধু মাত্র জিহাদ ও জিহাদের হাতিয়ার প্রস্তুত করার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে। আর যখন তোমরা জিহাদ ছেড়ে দিবে তখন লাঞ্চনা তোমাদের ঘিরে ফেলবে এবং সকল ধর্ম তোমাদের উপর বিজয়ী হয়ে যাবে।”[56]হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা ২/২৬৭

মুফতি সাইদ আহমদ পালনপুরি (রহ) এই কথার ব্যাখ্যা লেখেন,

“রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ দুনিয়াতে ইসলামি খিলাফত ও শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পাঠিয়েছেন। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস্লাম কর্তৃক এই দীনের বিজয় শুধুই জিহাদের দ্বারাই বাস্তবায়িত হবে। আর জিহাদ আসবাব ও উপকরনের উপর নির্ভরশীল, আর ঘোড়া হলো জিহাদের অন্যতম একটি বাহন, তাই তা প্রস্তুত করার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহিত করেছেন।’’[57]রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিয়াহ ৫/৩৯৪

আশা করি আমি এই ক্ষুদ্র লিখায় মোটামুটি গণতন্ত্রের ইসলামের সঙ্গে সমস্যা বা দ্বন্দ্ব কি ও কেন গণতন্ত্র হারাম, ইসলামি গণতন্ত্রের বাস্তবতা কি এবং আমাদের করণীয় কি হওয়া দরকার সেসব বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে সব কিছু সুস্পষ্ট ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি।

এই লিখায় যত কল্যাণকর ও সঠিক বিষয় তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার তরফ হতে, এবং যত অকল্যাণকর ও ভুলত্রুটি তা শয়তান ও আমার তরফ হতে।

দোয়া করি আল্লাহ আমাদের সকল ভাই-বোনদেরকে বুঝার তাওফিক দিন, সঠিক পথ দেখান, হেদায়েত দিন ও তা অনুসারে আমল করার তৌফিক দিন।

শারঈ সম্পাদনাঃ মাওলানা সালিম উদ্দিন (হাফিঃ)।

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 সুরা বাকারা ২০৮
2, 7 সুরা আলে ইমরান আয়াত ১০২
3 সুরা বাকারা আয়াত ৮৫
4 সুরা নিসা আয়াত ১৪৩
5 সুরা আলে ইমরান আয়াত ৮৫
6 সহীহুল বুখারী ৭১৪৯, ২২৬১, ৬৯২৩, ৭১৫৬, ৭১৫৭
8 সুরা সফ আয়াত ৪
9 সহিহ মুসলিম হাদিস ১৮৫২
10 লিকাউল বাবিল মাফতুহ, মিটিং ৬৬, প্রশ্ন ১০
11 মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায ৯/১৭৪
12 সুরা ইউনুস ৩৬, ৬৮, ১০৩, সুরা মায়েদা ১০৩, সুরা আনআম ৩৭, ১১১, ১১৬, সুরা আরাফ ১৩১
13 নিকাতে আফগানি, পৃষ্ঠা ১২
14 মাসিক “সনাবিল”, করাচি, মে ২০১৩, খণ্ড-৮, সংখ্যা-১১
15 মালফুজাতে থানভী, পৃষ্ঠা-২৫২; এছাড়াও দেখুন “আহসানুল ফাতাওয়া”, কিতাবুল জিহাদ, অধ্যায়: সিয়াসাতে ইসলামিয়া
16 ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া, খণ্ড ৪, কিতাবুস সিয়াসাহ
17 আল-কালাম, আয়াত ৩৫-৩৬
18 মারাতিবুল ইজমা (ইবনে হাযাম রহঃ) পৃ: ১২৬; আল মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ ২১/২৭০; শারহুস সুন্নাহ, ১০/৭৭; ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; ১৩/১৭; মাজিল্লাতুল-মুজতামাঈ: সংখ্যা: ৮৯০
19 গিয়াছুল উমাম ফি তায়াসিয যুলম পৃষ্ঠা ৭৭, এছাড়া “আল-আহকামুস সুলতানিয়া” – আল-মাওয়ার্দী; “আল-গিয়াসী: গিয়াসুল উমাম ফিল তিয়াসিয যুলম” – ইমাম আল-জুয়াইনী: “তাহরীরুল আহকাম ফি তাদবীরি আহলিল ইসলাম” – আল-বদর ইবনে জামাআহ; “মুঈদুন নিয়াম ওয়া মুবীদুন নিকাম” – তাজুদ্দীন আস-সুবকী এই কিতাবগুলো দেখা যেতে পারে
20 সূরা আল বাকারা আয়াত ২৮৪-২৮৫, সূরা আন নূর, আয়াত ৪২, বনী ইসরাঈল আয়াত ১১১, আলে ইমরান আয়াত ২৬, ১৮৯, সুরা মুলক আয়াত ১, সূরা ইউনুস আয়াত ৪০, সূরা আনআম, আয়াত ৫৭, সূরা ক্বাসাস, আয়াত ৭০
21 ফাতাওয়ায়ে উসমানি: ৩/৫০৭, প্রকাশনী: মাকতাবা মাআরিফুল কুরআন, করাচি
22 খাজাইনে মারিফাত ও মুহাব্বাত, পৃষ্ঠা-২০৯
23 আল-জিহাদ ওয়াল ইজতিহাদ, পৃঃ ১০৩-১০৪
24 হুকুম আল ইসলাম ফী আদ-দিমুক্রাতিয়্যাহ আত-তা’দ্দুদিয়্যাহ আল-হিযবিয়্যাহ, পৃঃ ২৮
25 তুহফাতুল-মুজীব, পৃষ্ঠা ৩০৩
26 শাইখ মুহাম্মাদ আল-ইমামের কিতাব ‘তানবীরুয-যুলামাত বিকাশফ মাফাসিদ ওয়া শুবুহাত আল-ইন্তিখাবাত’ পৃষ্ঠা ৩৯-৪০
27 কোরআনের সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩১ (তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৯৫, সনদ হাসান), আয়াত: ২৯, সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৯, সূরা আল মায়িদা, আয়াত ৮৭ তে এই বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।
28 তাহযিরুল উকালা’ মিন মাজালিমিদ-দিমুকরাতিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৭
29 ২/১০৬৬-১০৬৭
30 নাসাইহ ওয়া ফাদাইহ, পৃষ্ঠা ৫০-৫৩
31 ভোট কা তাহকিকী ওয়া তানকিদী জায়েযা, পৃষ্ঠা ৪৩
32 মাজমুউল ফাতওয়া ৩/২৬৭
33 আহকামু আহলিয যিম্মাহ ১/২৫৯
34 আল হিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৩/১১৯
35 আল-মাবাদী আল-মুফীদাহ ফী আত-তাওহীদ ওয়াল ফিকহ ওয়াল-আকীদাহ, নতুন আরবী সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২৯, প্রশ্ন নং ৪৮।
36 নির্বাচন ও বিক্ষোভের হুকুম আল-জারীদাতুল-জাযীরাহ, ইস্যু ১১৩৫৮, রমজান ১৪২৪
37 সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ (২০১১ সনের ১৪নং আইন)-এর ১১ ধারাবলে ১২ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত।
38 সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ (২০১১ সনের ১৪নং আইন)-এর ৮ ধারাবলে (১) ও (১ক) দফার পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত।
39 https://at-tahreek.com/article_details/1522
40 জামায়াতে ইসলামির উনত্রিশ বছর পৃষ্ঠা ১৩-১৪
41 মাসিক “সনাবিল”, করাচি, মে ২০১৩, খণ্ড-৮, সংখ্যা-১১, পৃষ্ঠা-২৭; সম্পাদক: মাওলানা হাফিজ মুহাম্মদ আহমদ
42 সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, রেকর্ড নং-৩৫৩
43, 54 মাসিক সানাবিল, করাচি: ৮/৩৩, সংখ্যা: ১১-ই মে, ২০১৩ ইং
44 গণতন্ত্রের প্রকৃতি ও আকৃতি, তর্জুমানুল হাদীছ ১/২ সংখ্যা, ১৯৪৯ইং, পৃ. ৮৫।
45 গণতন্ত্রের প্রকৃতি ও আকৃতি, তর্জুমানুল হাদীছ ১/২ সংখ্যা, ১৯৪৯ইং, পৃ. ৮৬
46 শায়খ মুহাম্মাদ আল-ইমামের বই তানউইরুদ্ধ-ধুলামাত বিব কাশফ মাফাসিদ ওয়া শুবুহাত আল-ইন্তিখাবাত, পৃষ্ঠা ৩১-৩৫
47 আস-সিযাসাতুশ শরইয়্যাহ, পৃষ্ঠা-১৭২-১৭৩; এছাড়া উনার একটি কিতাব রয়েছে ‘আল খিলাফতু ওয়াল মুলক’ যার বাংলা অনুবাদ হয়েছে ‘খিলাফত ও রাজতন্ত্র’ নামে, সেখানেও এই বিষয়ে আলাপ আলোচনা রয়েছে
48 গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি

শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায, শাইখ আব্দুর রাজ্জাক আফিফি, শাইখ আব্দুল্লাহ গুদইয়ান। – স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র (১/৩৭৩) থেকে সমাপ্ত

49 ইয়াদে রফতেগাঁ, পৃঃ ৩৯০, ৩৯১ (মজলিসে নশরিয়্যাতে ইসলাম, করাচি) ; মুকালামাতুস সদরইন, পৃ: ১৩ মাওলানা তাহের কাসেমীর সংকলন।
50 তা’মীরে পাকিস্তান আওর উলামায়ে রব্বানী, পৃ: ১৫৪, ১৫৫ (এদারায়ে ইসলামিয়্যাত, লাহোর)
51 গণতন্ত্র নয় পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব, পৃষ্ঠা ১৬
52 খিলাফত ও রাজতন্ত্র, পৃষ্ঠা ৬৪-৬৫
53 গণতন্ত্র নয় পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব, পৃষ্ঠা ১৩-১৪
55 ইসলামী খেলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন ১৮-১৯ পৃঃ
56 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা ২/২৬৭
57 রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিয়াহ ৫/৩৯৪
3 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button