গুজবের ফিতনা ও দ্বীনের শিক্ষা: আমরা কেন বিপথগামী?

গুজব, মিথ্যা তথ্যের প্রচারণা, অপবাদ দেওয়ার ফিতনায় আমাদের মুসলিম সমাজ ওতোপ্রোতো ভাবে আজ লিপ্ত, বিশেষ করে যুবক শ্রেণি, বিভিন্ন মিডিয়া ও রাজনৈতিক – অরাজনৈতিক দলসমূহ। নিজের দলের, মতের বাহিরের সবার জন্য গুজব ছড়ানোকে আমভাবে জায়েজ করে ফেলেছি যেন, এটা যে অন্যায়, এটা যে অপরাধ সেই বোধশক্তি যেন আমাদের মাঝে নেই, সেই অপরাধবোধ আমাদের মাঝে নেই, বরং নিজের অপরাধকে বিভিন্ন যুক্তি-কারণ দেখিয়ে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করি। অথচ এটা দ্বীন ইসলামের শিক্ষা ছিলই না কখনো।
আফসোসের বিষয় হলো, এমন হওয়ার কারণ হল আজ আমাদের সমাজ দ্বীন থেকে অনেক দূরে চলে গেছে, দ্বীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বসে রয়েছে। তারা অ্যাকাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিন্তু দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত না। এখনতো একটা কমন স্লোগান হল মুসলিমদের এই দুর্দশার কারণ নাকি তারা জ্ঞান বিজ্ঞানে পিছিয়ে আছে তাই, কিন্তু যে সময় মুসলিমরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, জ্ঞান বিজ্ঞানে এগিয়ে ছিল সেই সময় যে মুসলিমদের সাথে তাদের দ্বীনের সম্পর্ক খুব গভীর ছিল, তাদের মাঝে দ্বীনদারিতা বেশি ছিল, সব কিছুকে দ্বীনের লেন্সে আনতো তারা এই সত্যটা কেউ আমাদেরকে বলে না৷
আমরা প্রায়শই ভুল করে মনে করে বসি, যে স্কুল-কলেজ, ভার্সিটিতে পড়েছে তাই সে শিক্ষিত, সে নৈতিকতার মানদণ্ডে উন্নীত হবে, ন্যায়পরায়ণ হবে, সত্যবাদী, সৎ, মানবিক হবে। কিন্তু বাস্তবতা-তো ভিন্ন, স্কুল, কলেজ ও ভার্সিটির বইয়ের ২/১ চ্যাপ্টারের নৈতিক আলাপ আমাদের সমাজকে পরিবর্তন করতে যথেষ্ট নয় কখনো। অ্যাকাডেমিক শিক্ষা আমাদেরকে ২/১ চ্যাপ্টারে নৈতিকতার জ্ঞান দিলেও, বাকি পুরো সিস্টেম জুড়ে আমাদেরকে বস্তুবাদের দিকে ঠেলতে থাকে, যার প্রভাব নৈতিকতার শিক্ষার ছোট অংশটির উপর প্রবল।
আর এই কারণে শিক্ষিত অপরাধীর পরিমাণ আমাদের মাঝে বেশি, তাই শিক্ষিতকে দেখা যায় গরিবের সাথে অপমানজনক ভঙ্গিতে কথা বলতে ও পশ ক্লাসের নিকট অশিক্ষিত যারা তাদের দেখা যায় শিক্ষিতদের সাথে সম্মানসূচক ভঙ্গিতে কথা বলতে।
আমাদেরকে-তো শিখানো হয়নি যে, সুরা নুরের ৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুসলিমদেরকে জমিনে প্রতিনিধিত্ব দান করার, দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার এবং নিরাপত্তা দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ১। ইমান আনা, ২। সৎকর্ম করা ৩। শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং ৪। শিরক না করার শর্তে।
আমাদেরকেতো সেই আবু দাউদ, ৪২৯৭ এর সেই সহিহ হাদিসটা শিখানো হয়নি, যেখানে বলা হয়েছে, অচিরেই অন্যান্য জাতিসমূহ তোমাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হবে যেমন খাবারের পাত্রে লোকেরা একত্রিত হয়। কিন্তু আমাদের সংখ্যা কম হবে না, বরং আমরা সেদিন সংখ্যায় অনেক বেশি হব। কিন্তু আমরা হব বন্যার ফেনার মতো। আল্লাহ শত্রুদের মন থেকে আমাদের ভয় তুলে নেবেন এবং তোমাদের মনে “দুনিয়ার মোহ ও মৃত্যুর অপছন্দ।” ঢেলে দিবেন
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে ডিজাইন করা যে আমাদের মনে দুনিয়ার মোহ বেশি বেশি প্রবেশ করে, ইমান আনা ও সকল প্রকার শিরক হতে দূরে থাকার গুরুত্ব লঘু করে চিত্রিত করে। সৎ কাজ করা যে শুধুমাত্র হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কনসেপ্টটাই নেই আমাদের শিক্ষায়। আমাদের অভিভাবক সমাজও একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবে এই জিকিরে লিপ্ত, কিন্তু উনারা সন্তানকে যে দ্বীনি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই বিষয়টি উপলব্ধিই করতে চান না।
আমাদেরতো মিথ্যা, গুজব, ভুল তথ্য প্রচার, অপবাদ না দেওয়ার পিছনে একটা শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে, কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষীদেরতো সেই ভিত্তিটাও নেই, তাদের কাছে আছে কিছু উপদেশ যার উপর তারা নিজেরাই আমল করে না। কিন্তু তারপরও মুসলিমদের মাঝে কেন এসব অপরাধ দেখা যায়? সেই যে প্রথমেই বললাম, দ্বীন থেকে আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন করা। আর এর পিছনে ইসলাম বিরোধীদের হাতটাও কম না, ক্ষমতায়তো ছিল তারাই।
ভূমিকা পর্ব-তো বেশি বড়ো করে ফেললাম, তাহলে এবার ফেরা যাক মূল আলোচনায়, দ্বীনতো আমাদের নিকট সত্যবাদীতার দাবি করে, দ্বীনতো আমাদেরকে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে বলে প্রচারের আগে। এই নিয়ে কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসেক (পাপাচারী) তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের উপর আঘাত না হানো, অতঃপর তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। [সূরা হুজুরাত, আয়াত ৬]
শুধু পাপাচারীর কাছ থেকে তথ্যই না, বরং অনুমানেের উপর ভিত্তি করে কথা বলতেও নিষেধ করেছেন আল্লাহ তায়ালা। তিনি বলেন,
হে মুমিনগণ! অনেক অনুমান থেকে বিরত থাকো, কারণ কিছু অনুমান গুনাহ। [সূরা হুজুরাত, আয়াত ১২]
কারণ বেশির ভাগ সময়ে অনুমান বা ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না, আল্লাহ নিজেই বলেছেন,
অথচ এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞানই নেই। তারা তো কেবল অনুমানেরই অনুসরণ করে। আর নিশ্চয় অনুমান সত্যের মোকাবেলায় কোনই কাজে আসে না। [সুরা নাজম আয়াত ২৮]
আল্লাহর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাক। কেননা, ধারণা মিথ্যা কথার নামান্তর।’ [বুখারী: ৪০৬৬, মুসলিম: ২৫৬৩]
ইলম ছাড়া, কোনো বিষয়ে জানা ছাড়াই তা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করাটা যে কত ভয়াবহ তা অনেকেই বুঝে না, এই কাজ আমাদের নিজেদেরকেই যে অন্যদের নিকট অপমানিত করে আমরা সেটিও উপলব্ধি করতে পারি না৷ এমনকি না জেনে কথা বলাটাও যে গুনাহ তাও বুঝতে চাই না অনেক সময়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
আর যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পিছনে ছুটো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর—এসবের প্রত্যেকটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। [সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৩৬]
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তো আরো ভয়াবহ সতর্কবার্তা দিয়ে গিয়েছে আমাদেরকে, তিনি বলেছেন,
কোন লোকের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে (সত্যতা যাচাই না করে) তা-ই বলে বেড়ায়। [মুসলিম ৫, মিশকাত ১৫৬]
তিনি অন্য হাদিসে বলেছেন,
চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়। [বুখারী, হাদিস ৩৪]
যদিও এখানে কর্মগত নিফাকের কথা বলেছেন রাসুল, যা দ্বীন থেকে কাউকে বের করে দেয় না, কিন্তু তারপরও এটি খুবই গুরুতর একটি সতর্কবার্তা আমাদের সকলের জন্য।
গ্রামেগঞ্জে ও শহুরে নারীদের মাঝে এই কাজটি অনেক বেশি লক্ষ্য করা যায়, যা শুনে তাই প্রচার করে বেড়ানো, অপবাদ দেওয়া বিশেষ করে আসে পাশের বাড়ির বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে ও ছেলেদের জন্য। অথচ উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ ব্যতিত এমন অপবাদের শাস্তি গুরুতর, এর জন্য ৮০ বেত্রাঘাত করার মতো শাস্তিও কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। [সুরা নুর আয়াত ৪-৫]
আয়শা (রা)-কে অপবাদ দেওয়ার ঘটনাকে নিয়ে আল্লাহ কতই না সুন্দর করে আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যেন আমাদের কাছে যে জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে না বলে বেড়াই, আর কোনো গুজব, মিথ্যা অপবাদ শুনলে যেন সেটার বিরোধ করি, সেটার বিরুদ্ধে অবস্থান নি। তিনি বলেন,
যখন এটা তোমরা তোমাদের মুখে মুখে ছড়াচ্ছিলে এবং তোমরা তোমাদের মুখ দিয়ে এমন কথা বলছিলে, যাতে তোমাদের কোন জ্ঞান ছিল না; আর তোমরা এটাকে খুবই তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ এটা আল্লাহর নিকট খুবই গুরুতর। আর তোমরা যখন এটা শুনলে, তখন তোমরা কেন বললে না যে, ‘এ নিয়ে কথা বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহ অতি পবিত্র মহান, এটা এক গুরুতর অপবাদ’। [সুরা নুর আয়াত ১৫-১৬]
শেষে এটাই বলবো, ভাই দুই দিনের এই দুনিয়ায় আল্লাহর এই জমিনে আল্লাহ আমাকে ৫০-৬০ বছরের হায়াত দিয়ে এই কারণে পাঠান নি যে আমি এসে অমুক-তমুক দল বা মতের দালালী করে বেড়াবো, তাদের কারণে সিমালঙ্গণ করবো, আল্লাহর দেওয়া শরিয়তের লঙ্গন করবো, তাদের হয়ে অপকর্ম করে বেড়াবো।
কোরআনে আল্লাহ বলেছেন জ্বীন এবং ইনসানকে তিনি শুধুমাত্র আল্লাহর এবাদত করার জন্য পাঠিয়েছে। অর্থাৎ আমাদেরকে পাঠানোর কারণ সুস্পষ্ট। আবার মজার বিষয় হল দ্বীন ইসলামে প্রতিটা কাজই এবাদতে পরিণত হতে পারে।
যাই করবো আমাদের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করা, তাই আমাদের চিন্তা করা উচিৎ যার জন্য করছি তার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন বা হতে পারেন এমন আলামত তার মাঝে আছে কিনা। আর যদি এমন আলামত না থাকে তাহলেতো…
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেন আমাদের সকলকে হেদায়েত দেন। আমাদেরকে দ্বীনের সঙ্গে আরো বেশি গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার তাওফিক দেন।
নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকট আত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি আশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। [সূরাঃ আন-নাহাল, আয়াত ৯০]



