কোরআনের আররি ভাষায় সিরিয়াক ভাষার প্রভাব ছিল? ইসমাঈল (আ.)-এর ভাষা আরবি ছিল কিভাবে?
উত্তর ১
এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে — ভাষা আসলে কীভাবে কাজ করে। ভাষা কোনো স্থির বা বদ্ধ সত্তা নয়। এটা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়, বিবর্তিত হয়, এবং অন্য ভাষা থেকে শব্দ ধার নেয়।
বাংলাকেই ধরুন। বাংলায় আজ যে শব্দগুলো আমরা ব্যবহার করি, তার একটা বড় অংশ এসেছে বাইরে থেকে —
- আরবি ও ফারসি থেকে — কলম, কিতাব, দোকান, বাজার
- পর্তুগিজ থেকে — আলমারি, বালতি, আনারস
- সংস্কৃত ও পালি থেকে — অনেক তৎসম শব্দ
- ইংরেজি থেকে — টেবিল, চেয়ার, স্কুল, ডাক্তার
এছাড়াও উর্দু, গ্রিক, পাঞ্জাবি, মাদ্রাজ ইত্যাদি থেকেও এসেছে বহু শব্দ। শত শত বছর ধরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে এবং এক পর্যায়ে এতটাই মিশে গেছে যে এখন আর এগুলোকে বিদেশি বলে মনেই হয় না। "কলম" শব্দটা আরবি, কিন্তু কোনো বাংলাভাষী এটাকে বিদেশি মনে করেন না।
ইমাম যারকাশী (রহ.) যে ১৮টি শব্দের উল্লেখ করেছেন, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দুইটি মত রয়েছে —
প্রথম মত — ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ও অনেক মুহাক্কিকের মত: কুরআনে কোনো অনারবি শব্দ নেই। কারণ এই শব্দগুলো আরবিতে এতটাই আত্মীকৃত হয়ে গিয়েছিল যে নবীজি ﷺ-এর যুগে এগুলো পূর্ণাঙ্গ আরবি শব্দ হিসেবেই গণ্য হতো।
দ্বিতীয় মত — ইমাম যারকাশী, আবু উবাইদা প্রমুখের মত: এই শব্দগুলোর মূল উৎস অন্য ভাষায় ছিল, তবে আরব ব্যবহার করতে করতে এগুলো আরবিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
দুই মতের মধ্যে মূলত কোনো বিরোধ নেই। উভয় পক্ষই স্বীকার করছেন যে শব্দগুলো কুরআন নাযিলের সময় ফাসীহ আরবি ভাষারই অংশ ছিল। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে এগুলোর আদি উৎস কোথায় ছিল।
এটা আসলে ভাষার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য — প্রতিটা সমৃদ্ধ ভাষাই আশেপাশের ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে এবং সেগুলোকে নিজের ছাঁচে ঢেলে নেয়। আল্লাহ নিজেই কুরআনে ভাষাকে তাঁর একটি বিশেষ নিদর্শন (آيَة) হিসেবে উল্লেখ করেছেন — এই বৈচিত্র্যও সেই নিদর্শনের অংশ। (সূরা আর-রূম আয়াত ২২)
১৪শত বছর আগে রাসুলের সময়কার আরবী ও ১৪শত বছর পরে আমাদের বর্তমান সময়ের আরবির মাঝে বেশ কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত।
ভাষার বিভিন্ন বাপ, দাদা, চাচা, মামা থাকে, মানে ব্রাঞ্চ থাকে৷ মানে এরা আস্তে আস্তে বিচের দিকে আসে৷ আর নিচেরগুলো স্বাভাবিক ভাবেই পুর্বের কিছুর বৈশিষ্ট্য ধারণ করবেই। আরবীতেও একই রকম। ইব্রাহিম (আ) বা উনার পরের সময়কার আরবী ও রাসুলের সময়কার আরবী এক রকম হবে না। তাদের থেকে রাসুল (সা.) পর্যন্ত আসতে আসতে ভাষা অনেক পরিবর্তন হয়েছে এটাই স্বাভাবিক।
উত্তর ২
এই প্রশ্নের মূল সমস্যাটা হলো — আমরা "আরবি" বলতে একটাই নির্দিষ্ট ভাষাকে ধরে নিচ্ছি। কিন্তু বাস্তবে ভাষার বিষয়টা এতটা সরলরৈখিক নয়।
প্রতিটা ভাষার একটা বংশপরম্পরা থাকে। ভাষাবিজ্ঞানীরা একে বলেন ভাষা-পরিবার বা Language Family। বাংলার উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে —
ইন্দো-ইউরোপীয় → শতম শাখা → ইন্দো-আর্য → প্রাকৃত → গৌড়ীয় অপভ্রংশ → বাংলা
এখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে বাংলা ভাষার বয়স সপ্তম শতাব্দী থেকে — অর্থাৎ প্রায় ১৩শত বছর। কিন্তু তার মানে কি এই যে তার আগে মানুষ কোনো ভাষায় কথা বলত না? বলত — শুধু সেটা তখন ভিন্ন রূপে ছিল। তারপরও সেই পুরো ধারাটাকে বাংলার পূর্বসূরি হিসেবেই গণ্য করা হয়।
একই যুক্তি আরবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য —
স্তর
বিবরণ
প্রোটো-সেমিটিক
আরবি, হিব্রু, আরামাইক, সিরিয়াকের আদি পূর্বপুরুষ ভাষা
পুরনো আরবি / আরবিয়্যাহ বায়িদাহ
আদ, সামুদ, জুরহুম গোত্রের ভাষা
ইসমাঈলী আরবি
জুরহুম থেকে শিখে পরিশীলিত রূপ
ফাসীহ কুরাইশি আরবি
নবীজি ﷺ-এর সময়কার আরবি
আধুনিক স্ট্যান্ডার্ড আরবি
বর্তমান লিখিত আরবি
তাহলে হাদীসের মর্ম কী?
ইবনু কাসীর (রহ.) আল-বিদায়াহতে উল্লেখ করেছেন যে ইসমাঈল (আ.) জুরহুম গোত্রের কাছ থেকে আরবি শিখেছিলেন — অর্থাৎ আরবি তার আগে থেকেই ছিল। হাদীসে যা বলা হয়েছে তার সঠিক মর্ম হলো —
"أَوَّلُ مَنْ فَتَقَ لِسَانَهُ بِالْعَرَبِيَّةِ الْمُبِينَةِ"
অর্থাৎ তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ আরবিতে কথা বলেছেন।
এখানে দাবি করা হচ্ছে না যে ইসমাঈল (আ.) আরবি আবিষ্কার করেছেন। বরং বলা হচ্ছে যে তিনি আরবিকে এমন একটি পরিশীলিত ও ফাসীহ মানে নিয়ে গেছেন যা পরবর্তীতে কুরাইশ বংশ → নবীজি ﷺ → কুরআনের ভাষায় পরিণত হয়েছে।
আরেকটু সহজে বুঝতে চাইলে দেখুন — বাংলাদেশে সিলেটি ভাষার নিজস্ব লিপি আছে (নাগরী লিপি), উচ্চারণ ও শব্দভাণ্ডার আলাদা — কিন্তু তবুও এটাকে বাংলাই বলা হয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা বিভিন্নভাবে উচ্চারিত হয় — রাঢ়ি, বরেন্দ্রি, ময়মনসিংহী — কিন্তু সবই বাংলা। একইভাবে ইসমাঈল (আ.)-এর আরবি ও কুরআনের আরবির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও উভয়ই একই ভাষা-পরিবারের ধারাবাহিকতা।
আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা
ভাষাবিজ্ঞানীরা যে "দেড় হাজার বছরের" হিসাব দেন, সেটা নির্ভর করে প্রাপ্ত লিখিত নিদর্শনের উপর। কিন্তু —
- লেখার আগেও মানুষ কথা বলত
- আরব অঞ্চল ছিল মূলত মৌখিক সংস্কৃতির অঞ্চল
- লিখিত প্রমাণ না পাওয়া মানে ভাষার অস্তিত্ব না থাকা নয়
মানুষ যে সীমানা নির্ধারণ করে বলে "এটা আরবি, ওটা প্রোটো-আরবি" — এই বিভাজন মানুষের একাডেমিক সুবিধার জন্য তৈরি, কোনো চিরন্তন সত্য নয়।
আরো বিস্তারিত পড়তে পারেন