আউল নীতি ও কুরআনের উত্তরাধিকার আইন: কুরআনে কি সত্যিই ভুল আছে?

ইসলামি উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ) কুরআনের অন্যতম সূক্ষ্ম ও সুসংগঠিত আইনব্যবস্থা। আত্মীয়তার সম্পর্ক, সামাজিক দায়িত্ব এবং ন্যায়বিচারের ভারসাম্য রক্ষা করে কে কতটুকু সম্পত্তি পাবে কুরআন অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তার মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই আইন বাস্তবে প্রয়োগ হয়ে আসছে এবং ইসলামী ফিকহের একটি স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ শাখায় পরিণত হয়েছে।
তবুও আধুনিক সময়ে ইসলামবিরোধীদের এই আইনকে কেন্দ্র করে বহুল প্রচারিত অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, কুরআনে নির্ধারিত উত্তরাধিকারের অংশ কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে একত্রে যোগ করলে মোট সম্পত্তির পরিমাণ অতিক্রম করে যায়। পরে সাহাবায়ে কেরাম এই সমস্যার সমাধানে “আউল” (العول) নীতি প্রবর্তন করেন, যেখানে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অংশ আনুপাতিকভাবে কিছুটা কমিয়ে মোট বণ্টনকে একশত শতাংশে নিয়ে আসা হয়। সমালোচকদের ভাষায়, এটি নাকি আল্লাহর নির্ধারিত হিসাবের “ভুল সংশোধন এবং যা কুরআনের নির্ধারিত অংশের বিপরীতে গিয়ে সবাইকে কম দিতে বাধ্য করে।
প্রথম দর্শনে এই আপত্তি কিছু মানুষের কাছে যৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অভিযোগটি মূলত ইসলামি উত্তরাধিকার আইন, কুরআনের ভাষা, ইজতিহাদের ধারণা এবং শরিয়াহর আইনগত কাঠামো সম্পর্কে অজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এই প্রবন্ধে আমরা আবেগ নয়, বরং কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদ, ফিকহি নীতিমালা এবং যুক্তিগত বিশ্লেষণের আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করব। আশা করি, আলোচনার শেষে পাঠক স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন যে “আউল” নীতিকে আল্লাহর ভুল সংশোধন বলে দাবি করার কোনো বৈজ্ঞানিক, ফিকহি বা যৌক্তিক ভিত্তি নেই; বরং এটি শরিয়াহর নমনীয়তা, প্রজ্ঞা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
“আউল” নীতি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত
“ইসলামে উত্তরাধিকার আইনে গাণিতিক ভুল রয়েছে”— এই অভিযোগটি দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামবিরোধী সমালোচনায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সূরা আন-নিসার ১১-১২ নং আয়াতে আল্লাহ উত্তরাধিকারীদের নির্দিষ্ট অংশ বর্ণনা করেছেন, কুরআনে নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অংশ কিছু নির্দিষ্ট পারিবারিক পরিস্থিতিতে একত্রে যোগ করলে মোট সম্পত্তির পরিমাণ অতিক্রম করে যায় – এ বিষয়টিকেই তারা তাদের দাবির প্রধান ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রী, মা এবং দুই বা ততোধিক বোন রেখে মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী—
স্ত্রী পাবেন ১/৪,
মা পাবেন ১/৬,
দুই বা ততোধিক বোন সম্মিলিতভাবে পাবেন ২/৩।
এখন এই অংশগুলো একত্রে যোগ করলে দাঁড়ায়—
(১/৪)+(১/৬)+(২/৩)
= (৩/১২) + (২/১২) + (৮/১২)
= ১৩/১২
অর্থাৎ মোট অংশ দাঁড়ায় ১৩/১২, যা সম্পূর্ণ সম্পত্তির চেয়েও বেশি। এ ধরনের পরিস্থিতি কেবল এই একটি ক্ষেত্রেই নয়; উত্তরাধিকারীদের কিছু বিশেষ সমন্বয়ে একই ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। ইসলামী ফিকহে এসব বিরল পরিস্থিতির সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে “আউল” (العول) নীতি। এ পদ্ধতিতে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অংশ একই অনুপাতে সামান্য হ্রাস করা হয়, যাতে মোট বণ্টন সম্পত্তির পরিমাণ অতিক্রম না করে।
উপরের উদাহরণে মূল হর ছিল ১২ এবং মোট অংশ হয়েছে ১৩। তাই ১২-এর পরিবর্তে ১৩-কে ভিত্তি ধরা হয়। ফলে বণ্টন দাঁড়ায়—
স্ত্রী: ৩/১৩
মা: ২/১৩
বোনেরা: ৮/১৩
এখন মোট অংশ—
(৩/১৩) + (২/১৩) + (৮/১৩)
= ১৩/১৩
= ১
অর্থাৎ সম্পূর্ণ সম্পত্তি কোনো ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত ছাড়াই ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টিত হয়ে যায়। কিন্তু এখানেই সমালোচকদের আপত্তি। তাদের বক্তব্য, যদি আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বপ্রজ্ঞ হন, তবে তিনি এমন অংশ নির্ধারণ করলেন কেন, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পত্তির পরিমাণ অতিক্রম করে? আর যদি পরে সাহাবায়ে কেরাম এসে “আউল” নীতির মাধ্যমে সেই হিসাব পরিবর্তন করে থাকেন, তাহলে কি সেটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান সংশোধনের শামিল নয়?
আউলের হিসাব নিকাশ নিয়ে মুশফিকুর রহমান মিনার ভাইয়ের একটি আর্টিকেল রয়েছে, সেটি দেখতে পারেন। সেখানে বিভিন্ন জনের বিস্তারিত অংশ উল্লেখ রয়েছে। এবং আব্বাস (রা)-এর মত ছিল কুরআনে উল্লেখিত ওয়ারিসদের সম্পত্তির ভগ্নাংশগুলোর যোগফল পাশাপাশি যোগ করে ১ হওয়া জরুরী নয়। কুরআনে যেভাবে ভগ্নাংশ দেয়া আছে, ঠিক সেভাবেই বণ্টন করে দেয়া হবে। যাদের দাবি কিছুটা কম, যেমনঃ কন্যাগণ ও ভগ্নিগণ বা অন্যরা – তাদেরকে অবশিষ্টাংশ দেয়া হবে। সেটাও বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন তিনি।[1]কুরআনে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টন আইনে গাণিতিক ভুলের অভিযোগ ও এর জবাব – https://response-to-anti-islam.com/show/কুরআনে-উত্তরাধিকার-সম্পদ-বণ্টন-আইনে-গাণিতিক-ভুলের-অভিযোগ-ও-এর-জবাব-/142 তাই আমি আর সেগুলো বিস্তারিত এখানে উল্লেখ করিনি, আপনারা চাইলে ভাইয়ের লিখাটি দেখে আসতে পারেন।
কুরআন কি প্রতিটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিস্তারিত সমাধান দিতে বাধ্য?
“আউল” নিয়ে উত্থাপিত আপত্তির মূল সমস্যা গাণিতিক নয়; বরং এটি শরিয়াহর প্রকৃতি সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সমালোচকেরা ধরে নেন, কুরআন এমন একটি আইনগ্রন্থ, যেখানে ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন প্রতিটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য আলাদা আলাদা সমাধান থাকা আবশ্যক। তারা ধরে নেয় যে আল্লাহ প্রতিটি সম্ভাব্য পারিবারিক পরিস্থিতির জন্য একটি নিখুঁত, স্বয়ংসম্পূর্ণ সূত্র দিতে ‘বাধ্য’ ছিলেন, আর তা না দেওয়াটাই “ভুল”। কিন্তু বাস্তবে কুরআন নিজে কখনো এমন দাবি করেনি, কুরআন সব সম্ভাব্য কম্বিনেশন আলাদা করে উল্লেখ করেনি, বরং মূল নীতি দেয় মাত্র।
কোরআন প্রদত্ত সমাধান – ইজতিহাদ
কুরআনের বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূলনীতি (Principles) প্রদান করে। এরপর সেই মূলনীতির ব্যাখ্যা, বাস্তব প্রয়োগ এবং নতুন উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল ﷺ-কে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে ইজতিহাদের পথ উন্মুক্ত রেখেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর।”[2]সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩; সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭
এ আয়াত কেবল একটি প্রশ্ন করার নির্দেশ নয়; বরং এটি প্রমাণ করে যে সব বিষয়ে প্রত্যক্ষ ও বিস্তারিত উত্তর কুরআনের প্রতিটি আয়াতে থাকবে এমন কোনো শর্ত আল্লাহ আরোপ করেননি। বরং তিনি জ্ঞানী ও যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে শরিয়াহর সঠিক প্রয়োগ শেখার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ও ইজতিহাদের বৈধতা সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন,
“যখন কোনো বিচারক ইজতিহাদ করে ফায়সালা দেয় এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তার জন্য দুটি সওয়াব। আর ইজতিহাদ করার পরও ভুল করলে তবুও তার জন্য একটি সওয়াব।”[3]মিশকাত ৩৭৩২
এই হাদিস থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, ইসলামী শরিয়াহ এমন একটি জীবন্ত আইনব্যবস্থা, যেখানে নতুন বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে। কোরআনে আল্লাহ বলেন,
আল্লাহ, যিনি নাযিল করেছেন সত্যসহকারে কিতাব এবং মীযান/দাঁড়িপাল্লা।[4]সুরা আশ শূরা আয়াত ১৭
তাফসিরকারকগণ লিখেছেন এখানে মিযান দৃবারা বুঝানো হয়েছে মানদণ্ড। অর্থাৎ আল্লাহ কোরআন দিয়েছেন এবং সেখানে মানদন্ডও দিয়েছেন। যা দ্বারা দাঁড়িপাল্লার মত ওজন করে ভুল ও শুদ্ধ, হক ও বাতিল, জুলুম ও ন্যায়বিচার এবং সত্য ও অসত্যের পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়।
অর্থাৎ শরিয়াহ মূলত দুটি স্তরে কাজ করে—
- প্রথমত, কুরআন মৌলিক নীতি ও বিধান নির্ধারণ করে।
- দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদ এবং পরবর্তী ফুকাহাদের গবেষণা সেই নীতিগুলোর বাস্তব প্রয়োগ ব্যাখ্যা করে।
এ কারণেই ইসলামী ফিকহে ইজমা, ও ইজতিহাদকে শরিয়াহর স্বীকৃত উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যদি প্রতিটি সম্ভাব্য ঘটনার জন্য পৃথক আয়াত নাজিল হওয়া বাধ্যতামূলক হতো, তবে ইজতিহাদের কোনো প্রয়োজনই থাকত না।
বাস্তবতা হলো, মানুষের জীবন সীমাহীন বৈচিত্র্যময়। যুগে যুগে এমন অসংখ্য নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে ঘটেনি। যদি প্রতিটি সম্ভাব্য ঘটনার জন্য আলাদা বিধান কুরআনে উল্লেখ করা হতো, তাহলে কুরআন হিদায়াতের গ্রন্থ না হয়ে একটি বিশাল বিশ্বকোষে পরিণত হতো।
অতএব, কোনো বিশেষ বা বিরল পরিস্থিতির সমাধান সাহাবায়ে কেরাম ইজতিহাদের মাধ্যমে নির্ধারণ করেছেন — এটি কুরআনের অপূর্ণতা বা ভুলের প্রমাণ নয়। বরং এটি সেই পদ্ধতিরই বাস্তব প্রয়োগ, যার অনুমতি ও ভিত্তি কুরআন এবং সুন্নাহ পূর্ব থেকেই প্রদান করেছে। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন,
আমার উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ।
আরেক স্থানে বলা হয়েছে তোমরা আমার সাহাবিগণকে সম্মান করবে; কারণ তাঁরাই তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।[5]বুখারী ৩৬৫০-৫১; তাহাবী, শারহু মা‘আনীল আসার ৪/১৫০
অন্য এক হাদিসে এসেছে,
আর তোমাদের কেউ জীবিত থাকলে সে বহু মতভেদ দেখতে পাবে। তখন আমার সুন্নাত এবং সঠিক নির্দেশনাপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত অনুসরণ করাই হবে তোমাদের অবশ্য কর্তব্য।[6]রিয়াদুস সলেহিন ১৫৭, আবু দাউদ ৪৬০৭
পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ কোন আয়াতে সাহাবীদের মত ইমান আনতে বলেছেন[7]সূরা আল-বাকারা: ১৩৭, কোন আয়াতে নবী (ﷺ)-এর সাথে সংগ্রামকারীদের কল্যাণের ঘোষণা দিয়েছেন[8]সূরা আত-তাওবা: ৮৮, তাদের প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন[9] সূরা আত-তাওবা: ১০০, বিভিন্ন সময়ে সাহাবীদের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন।[10]সুরা তাওবা আয়াত ১১৭-১১৮, সুরা ফাতাহ আয়াত ১৮, ২৯, সূরা আল-বাকারা ২১৮, সূরা আলে ইমরান: ১২১-১৭৯
এই মৌলিক বিষয় বুঝতে পারলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে “আউল” নীতি কোনো “ভুল সংশোধন” নয়; কিংবা কোনো ব্যতিক্রম বা বিশেষ পরিস্থিতির জন্য সরাসরি কুরআনে সমাধান না থাকা মানে ভুল নয় বরং শরিয়াহ প্রদত্ত ইজতিহাদের বৈধ ও স্বাভাবিক প্রয়োগ যা একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবস্থা। আর কোরআনের সমস্যা কোরআন থেকেই সমাধানের রাস্তা পাওয়া যাচ্ছে এখানে।
কুরআন প্রদত্ত সমাধান – উমর (রা)-এর ইজতিহাদ ও সাহাবীদের ঐকমত্য
ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে “আউল” নীতির প্রয়োগ প্রথম দেখা যায় আমীরুল মু’মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর খিলাফতকালে। কিন্তু তিনি এটি ব্যক্তিগত মতামত বা খেয়ালখুশি থেকে প্রবর্তন করেননি। বরং কুরআনের নির্ধারিত মূলনীতি, ন্যায়বিচারের দাবি এবং সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শের ভিত্তিতেই এই ইজতিহাদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। আর পরামর্শ করা কোরআনেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা শিখিয়েছেন।[11]সূরা আলে ইমরান: ১৫৯, ১৯৫, সূরা আশ-শুরা: ৩৮
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার ইসলামে ইজতিহাদ কোনো অনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত মতামতের নাম নয়। এটি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যোগ্য আলিমের গভীর গবেষণা ও বিচার-বিশ্লেষণের ফল। আর সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন এই উম্মাহর সর্বাধিক জ্ঞানী ও শরিয়াহ সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত প্রজন্ম বিশেষ করে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)।
হাদিসে এসেছে,
“যাকে কোন প্রমাণ ছাড়াই ফতোয়া দেওয়া হয়েছে, তার গুনাহ তার উপর ফিরে যাবে যে তাকে ফতোয়া দিয়েছে।”[12]সহীহ; ইমাম আহমদ বর্ণনা করেছেন, ২/৩২১
সম্পত্তি বণ্টনের এই সমাধান যদি উমর (রা) এর ভুল সমাধান হতো, বা তা যদি কোরআন সুন্নাহর অনুকুলে না হতো যার ধরুন কারো হক নষ্ট হচ্ছে তাহলেতো দুনিয়ায় যারা উনার এই নীতি অবলম্বন করবে, করেছে সেগুলোর দায়ভার উনার উপর যাওয়ার কথা। অথচ উমর (রা) হলেন আশারায়ে মুবাশশারাদের একজন, এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আল্লাহর রাসুল উনার জান্নাতি হওয়া সার্টিফাই করেছেন। তাহলে সেই লোকের দ্বারা কি আল্লাহ এত বড় ভুল সংগঠিত হতে দিতে পারেন?
তিনি ছিলেন ফকিহ, মুজতাহিদ, দ্বীন সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী, আর তিনি কোরআন ও সুন্নাহ ভালোভাবে বুঝার পরই এই ইজতিহাদি ফয়সালা নিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উনার মর্যাদা সম্পর্কে বলেন,
– “তোমরা আমার পরে আবূ বকর ও উমারের অনুসরণ করবে।”[13]তিরমিযী ৩৬৬২-৬৩
– “আমার পরে কেউ নবী হওয়ার সুযোগ থাকলে উমর হতেন।”[14]তিরমিযী ৩৬৮৬
– “আল্লাহ তা’আলা উমরের জবানে ও হৃদয়ে সত্য প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন।”[15]তিরমিযী ৩৬৮২
উনার জ্ঞান, দ্বীনের বুঝ নিয়ে আরো বর্ণিত হয়েছে, যেমন ইবনু উমার (রা) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ
আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন আমার কাছে এক পেয়ালা দুধ আনা হয়েছে, তা হতে আমি পান করলাম এবং বাকি অংশটুকু উমার ইবনুল খাত্তাবকে দিলাম। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এর কি ব্যাখ্যা করেন? তিনি বললেনঃ “জ্ঞান”।[16]তিরমিজি ৩৬৮৭
আয়িশাহ (রা) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ
সাবেক উম্মতদের মাঝে মুহাদ্দাস’ (তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও সূক্ষ্মদশী লোক) আবির্ভাব হতেন। আমার উম্মাতের মাঝে কেউ মুহাদ্দাস হলে তা উমার ইবনুল খাত্তাবই।[17]তিরমিজি ৩৬৯৩
এমনকি উনার মতের পক্ষে আল্লাহ বিভিন্ন আয়াত পর্যন্ত নাজিল করেছেন।[18]ওমর (রাঃ)-এর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কুরআন মাজীদের মোট কতটি আয়াত নাযিল হয়? – https://at-tahreek.com/article_details/5037
এসব হাদিসের উদ্দেশ্য উমর (রা)-কে নির্ভুল (মাসূম) প্রমাণ করা নয়; কারণ নবী ব্যতীত কেউই নিষ্পাপ নন। বরং এগুলো প্রমাণ করে যে দ্বীনের জটিল বিষয়ে তাঁর বিচারবোধ, ফিকহ এবং ইজতিহাদের ওপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিশেষ আস্থা ছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, “আউল” নীতি উমর (রা)-এর একক মত হিসেবে রয়ে যায়নি। সাহাবায়ে কেরামের একজন (আব্বাস রা.) ব্যতিত সকলেই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তী যুগের ফকীহগণের সকলেই এটিকেই অনুসরণ করেন। অর্থাৎ এটি একটি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত মত নয়; বরং উম্মাহর প্রাথমিক যুগের সম্মিলিত ফিকহি ঐতিহ্যের অংশ।
যেমন Islam QA-এ তে বলা হয়েছে,
“এই ধরনের সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি হলো: প্রতিটি উত্তরাধিকারীর অংশ থেকে সেই অনুপাতে কিছুটা কমিয়ে দেওয়া, যতটুকু সমস্যাটিতে “আওল” হয়েছে। এটাই ন্যায়বিচার, যাতে কোনো একক উত্তরাধিকারী বাদ না পড়ে শুধুমাত্র তার অংশ কমিয়ে দেওয়া হয়।
উমর (রা)-এর যুগ এভাবেই অতিবাহিত হলো। এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এই বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করলেন; তিনি “আওল” এর পক্ষে মত দেননি। কিন্তু পরে এই মতভেদ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সকল আলিম উমর ও অধিকাংশ সাহাবীর মতের দিকে ফিরে আসেন।”[19]اعتراض من ملحد على مسائل العَوْل في المواريث – https://islamqa.info/ar/answers/131556/
ইমাম ইবন কুদামাহ (রহ) বলেন,
“আমরা আজ ইবনে আব্বাস (রা)-এর মতের অনুসারী কাউকে জানি না, এবং বর্তমান যুগের ফকীহগণের মধ্যে ‘আউল’ গ্রহণের ব্যাপারে কোনো মতভেদ আমরা জানি না।”[20]আল-মুগনী, ৬/২৮৩
এখানে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে।
যদি “আউল” সত্যিই আল্লাহর বিধান পরিবর্তনের শামিল হতো বা এটি ভুল হতো, তাহলে কীভাবে ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্মের প্রায় সকল ফকীহ এ বিষয়ে একমত হতে পারলেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
“আমার উম্মত গোমরাহির উপর ঐকমত্য পোষণ করবে না।”[21]আবূ দাউদ ৪২৫৩, ইবনে মাজাহ ৩৯৫০, তিরমিযী ২১৬৭
এ কারণেই ইসলামী উসূলুল-ফিকহে ইজমা-কে শরিয়াহর অন্যতম প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়। কুরআন, সুন্নাহ ও ইজতিহাদের আলোকে গঠিত এই ঐকমত্য পরবর্তী যুগের মুসলিম আইনজ্ঞদের জন্যও অনুসরণীয় হয়ে ওঠে। ইজমা যে শরিয়তের অন্যতম একটি দলিল এটির আরো প্রমাণ পাওয়া যায় সুরা বাকারাহ আয়াত ১৪৩, সূরা নিসা আয়াত ১১৫, সূরা আলে ইমরান আয়াত ১১০ এ। এগুলোর বিস্তারিত তাফসির দেখলেই আরো জানতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। উম্মতের মুজতাহিদগণের ঐকমত্য’। আর ইমাম শাফেয়ী, ইবনে কাসির, ইবনে তাইমিয়া প্রমুখ ওলামা নিশ্চিত করেছেন এটি ইসলামের অন্যতম দালিলিক উৎস।[22]আল-বাহরুল মুহীত্ব, ৬/৩৭৯ পৃ.; তাফসীরে ইবনু কাছীর, ২/৪১৩ পৃ.; মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ২৮/১২৫ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং ১৯৭৯৩৭
অতএব, “আউল” কোনো ব্যক্তির মনগড়া উদ্ভাবন নয়; বরং কুরআনের মূলনীতি, সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদ এবং উম্মাহর ঐকমত্য দ্বারা সমর্থিত একটি প্রতিষ্ঠিত শরিয়াহ-নীতি।
আব্বাস (রা) ব্যতিত বাকি সাহাবীদের ঐক্যমত হতে এটি সুস্পষ্ট তারা বুঝেছেন কোরআনের এই হিসাব সর্বদা ধ্রুব থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। তাই ন্যায় বিচারের দাবিতে সকলের পরিমান কমিয়ে আউল পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন তারা।
“আউল” কি আল্লাহর বিধান পরিবর্তন, নাকি কুরআনের নীতিরই প্রয়োগ?
সমালোচকদের সবচেয়ে বড় দাবি হলো সাহাবায়ে কেরাম “আউল” নীতি প্রয়োগ করে কুরআনে নির্ধারিত অংশ পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু এই দাবিটি তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি কুরআনে এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় যে, নির্ধারিত অংশগুলো প্রত্যেক সম্ভাব্য অবস্থায় অপরিবর্তিত থাকবে অথবা সেগুলোর সমষ্টি কখনোই সম্পত্তির পরিমাণ অতিক্রম করবে না। বাস্তবে কুরআনে এমন কোনো বক্তব্য নেই।
কুরআন উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করেছে, কিন্তু কোথাও বলেনি যে, সম্ভাব্য সব পারিবারিক অবস্থায় সেই অংশগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় যোগ করলে অবশ্যই শতভাগ হবে। অর্থাৎ সমালোচকদের মূল অনুমানটি কুরআনের বক্তব্য নয়; বরং এটি তাদের নিজের আরোপিত একটি পূর্বধারণা মাত্র।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় লক্ষণীয়। কুরআনের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াতগুলো বিভিন্ন আত্মীয়ের জন্য শর্তসাপেক্ষ (conditional) অংশ নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট আত্মীয় থাকলে এক ধরনের অংশ, অন্য আত্মীয় না থাকলে অন্য ধরনের অংশ প্রযোজ্য হবে। এগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়নি যে, ভবিষ্যতের সব সম্ভাব্য পারিবারিক সমন্বয়ে এগুলো অপরিবর্তিত সংখ্যাগত মান (absolute value) হিসেবেই কার্যকর থাকবে।
সাহাবাদের আমলই বুঝা যায় কুরআনের শেয়ারের অংশ গুলা সবসময়ের জন্য absolute value রিপ্রেজেন্ট করেনা। এগুলো রিলেটিভ, যদি এগুলো absolute value হতো তাহলে সেটা অনেক ক্ষেত্রে inconsistency তৈরি করবেই। কিন্তু যেহেতু এগুলো আদোতে রিলেটিভ ভ্যালু সেহেতু এগুলো কোনো সমস্যা সৃষ্টি করেনা। সাহাবায়ে কেরাম বিষয়টি ভালো ভাবেই বুঝেছিলেন, এখানে মূল উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট ভগ্নাংশকে যান্ত্রিকভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা নয়; বরং প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর আপেক্ষিক অধিকার (relative entitlement) সংরক্ষণ করা। কোরআনেই আল্লাহ বলেছেন,
তা থেকে কম হোক বা বেশি হোক- নির্ধারিত হারে।[23]সুরা নিসা আয়াত ৭
“আউল” নীতিতে ঠিক সেটিই করা হয়েছে। কারও অংশ বাতিল করা হয়নি, কাউকে বঞ্চিত করা হয়নি, আবার কাউকে অন্যায্যভাবে অগ্রাধিকারও দেওয়া হয়নি। বরং প্রত্যেকের অংশ একই অনুপাতে সমন্বয় করা হয়েছে, যাতে কুরআনের নির্ধারিত অগ্রাধিকার বজায় রেখেই সম্পত্তি ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টিত হয়।
এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় “আউল”-এর বিপরীত অবস্থা “রাদ্দ” (الرّد) বুঝলে। অনেক সময় নির্ধারিত অংশ বণ্টনের পর সম্পত্তির একটি অংশ অবশিষ্ট থেকে যায়। তখন সেই অবশিষ্ট সম্পদও নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীদের মধ্যেই আনুপাতিকভাবে পুনর্বণ্টন করা হয়। ফলে তাদের অংশ বৃদ্ধি পায়।
অর্থাৎ শরিয়াহয় দুই ধরনের অবস্থাই বিদ্যমান—
- কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত অংশের সমষ্টি সম্পত্তির চেয়ে বেশি হলে আউল প্রয়োগ করা হয়।
- আবার কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত অংশের সমষ্টি সম্পত্তির চেয়ে কম হলে রাদ্দ প্রয়োগ করা হয়।
প্রশ্ন হলো, যদি “আউল”কে আল্লাহর বিধান পরিবর্তন বলা হয়, তাহলে একই যুক্তিতে “রাদ্দ”-কেও কি আল্লাহর বিধান পরিবর্তন বলতে হবে?
বাস্তবে কোনো ইসলামবিরোধী সমালোচক এ দাবি করেন না। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য একটিই—কুরআনের নির্ধারিত ন্যায়বিচারকে বাস্তবে কার্যকর করা। একটি ক্ষেত্রে অংশ আনুপাতিকভাবে হ্রাস পায়, অন্য ক্ষেত্রে আনুপাতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কুরআনের মূল নীতি বাতিল করা হয় না।
এ কারণেই সমসাময়িক বহু আলেম স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আউল” আল্লাহর বিধানের বিরোধী নয়। বরং আল্লাহ নির্ধারিত অংশসমূহ বর্ণনা করেছেন, কিন্তু কোথাও বলেননি যে, প্রত্যেক সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে সেগুলোর সমষ্টি অবশ্যই এককের সমান হবে। তাই কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আনুপাতিক সমন্বয় করা কুরআনের বিরোধিতা নয়; বরং তারই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন।
Islam QA-এর একটি প্রামাণ্য ফতোয়ায় এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে,
এটি (আউল) আল্লাহর নির্ধারিত বণ্টন পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত অংশসমূহ বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তিনি বলেননি যে, এগুলোর সমষ্টি অবশ্যই সম্পূর্ণ এককের (সম্পত্তির) সমান হবে বা তার চেয়ে বেশি হবে না!
এটি আরও স্পষ্ট হয় ‘আওল’-এর বিপরীত অবস্থা ‘রাদ্দ’ (অবশিষ্টাংশ পুনর্বণ্টন) জানলে। ‘রাদ্দ’ হলো নির্ধারিত অংশসমূহের সমষ্টি সম্পত্তির চেয়ে কম হওয়া। তখন আমরা প্রত্যেক নির্ধারিত অংশপ্রাপ্তকে তার অংশ দেই, এবং অবশিষ্টটুকু তাদের মধ্যেই অনুপাতে পুনর্বণ্টন করি। ফলে সবার অংশে বৃদ্ধি আসে, যেমন ‘আওল’-এর ক্ষেত্রে সবার অংশে সমান হারে হ্রাস আসে। উভয় অবস্থাতেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই বলে যে, আল্লাহ তাআলা হিসাবে ভুল করেছেন—এটা চরম কুফরী। এমন কথা কেবল সেই জাহিল ও অন্ধকার হৃদয়ের অস্বীকারকারীই বলতে পারে। অথচ যে ব্যক্তি আল্লাহর ক্ষমতা, জ্ঞান ও মহত্ত্ব উপলব্ধি করে, এবং এই মহাবিশ্বের দিকে তাকায় যা অতি সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের ওপর প্রতিষ্ঠিত; বরং নিজের দেহ ও এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিকে, নিজের হৃদয় ও অন্ত্রের চলাচলের দিকে তাকায়—তার পক্ষে এ রকম কুফরী উচ্চারণ করা সম্ভব নয়।
বরং আল্লাহ, যিনি সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত, তিনি পরিমাণগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং সেগুলো যখন পরস্পর সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে তখন তা সঠিকভাবে নিরূপণ করার দায়িত্ব জ্ঞানীদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এজন্যই সাহাবায়ে কেরাম ‘আওল’-এর পক্ষে ঐকমত্য পোষণ করেছেন, যেমনটি আমরা পূর্বের (১৩১৫৫৬ নং) প্রশ্নের উত্তরে বর্ণনা করেছি।
সংক্ষেপে বলতে গেলে: আল্লাহ তাআলা বলেননি যে, নির্ধারিত অংশসমূহের সমষ্টি কখনো এককের বেশি হবে না বা কম হবে না। বরং এটি সমস্যার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। কিছু সমস্যায় ‘আওল’ হয়, আবার কিছু সমস্যায় নির্ধারিত অংশপ্রাপ্তদের মধ্যে ‘রাদ্দ’ (অবশিষ্টাংশ পুনর্বণ্টন) হয়।[24] جواب شبهة حول مسألة العول – https://islamqa.info/ar/answers/302362/
অতএব, “আউল”কে আল্লাহর ভুল সংশোধন বলা একটি ভুল উপস্থাপন। প্রকৃতপক্ষে এটি কুরআনের নীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে বাস্তব জীবনের একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পদ্ধতি মাত্র।
আউল” বিতর্ক: প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে কী?
এ পর্যন্ত আলোচনার পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে “আউল” নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু গাণিতিক নয়; বরং এটি শরিয়াহকে কীভাবে বোঝা হবে, সেই পদ্ধতিগত (methodological) প্রশ্ন।
সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, কুরআনের প্রতিটি নির্ধারিত ভগ্নাংশকে এমন একটি স্বতন্ত্র ও অপরিবর্তনীয় সংখ্যা হিসেবে দেখতে হবে, যা প্রতিটি সম্ভাব্য পারিবারিক অবস্থায় একইভাবে কার্যকর থাকবে। এই পূর্বধারণা থেকেই তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, কোথাও ভগ্নাংশের সমষ্টি একের বেশি হলে কুরআনে “গাণিতিক ভুল” রয়েছে।
কিন্তু ইসলামী আইনশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। শরিয়াহর উদ্দেশ্য কেবল কিছু সংখ্যাগত অনুপাত নির্ধারণ করা নয়; বরং উত্তরাধিকারীদের ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করা। তাই যখন কোনো বিরল পরিস্থিতিতে নির্ধারিত অংশসমূহের সমষ্টি সম্পত্তির পরিমাণ অতিক্রম করে, তখন প্রত্যেকের আপেক্ষিক অধিকার বজায় রেখে আনুপাতিক সমন্বয় করা হয়। এটিই “আউল”।
অর্থাৎ এখানে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে।
- প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি সংখ্যাকে উদ্দেশ্য (end) হিসেবে দেখে।
- দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি সংখ্যাকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম (means) হিসেবে দেখে।
কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ কুরআন বারবার ন্যায়বিচার, ভারসাম্য এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। উত্তরাধিকার আইনও সেই বৃহত্তর নীতিরই অংশ।
এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম “আউল” প্রয়োগের সময় কুরআনের বিরুদ্ধে নতুন কোনো বিধান তৈরি করেননি। বরং তাঁরা কুরআনের উদ্দেশ্য—প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অধিকার রক্ষা—বাস্তবে কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তারই সমাধান খুঁজেছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিও স্মরণ রাখা উচিত। ইসলামী শরিয়াহ কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু বিধানের সমষ্টি নয়; এটি একটি সুসংহত আইনব্যবস্থা, যেখানে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং ইজতিহাদ পরস্পরের পরিপূরক। তাই কোনো একটি ব্যতিক্রমী মাসআলাকে এই সামগ্রিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিচার করলে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আশঙ্কা থেকেই যায়।
অতএব, “আউল” বিতর্কের প্রকৃত প্রশ্ন “১৩/১২ কেন হলো?”—এটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কুরআন ও শরিয়াহকে আমরা কোন পদ্ধতিতে বুঝব? যদি শরিয়াহর নিজস্ব ব্যাখ্যাগত নীতিমালা, সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদ এবং ইসলামী আইনশাস্ত্রের ধারাবাহিকতাকে গ্রহণ করা হয়, তাহলে “আউল” কোনো অসঙ্গতি নয়; বরং শরিয়াহর ন্যায়ভিত্তিক ও বাস্তবমুখী প্রয়োগের একটি স্বাভাবিক উদাহরণ।
তাই বলা হয়েছে, এটি (আউল) আল্লাহর নির্ধারিত বণ্টন পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত অংশসমূহ বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তিনি বলেননি যে, এগুলোর সমষ্টি অবশ্যই সম্পূর্ণ এককের (সম্পত্তির) সমান হবে বা তার চেয়ে বেশি হবে না!
“আউল” কেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে প্রয়োগ করা হয়নি?
“আউল” নীতি নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উপেক্ষিত হয়, সেটি হলো যদি এটি এত বড় একটি “সমস্যা” হয়ে থাকে, তাহলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগেই কেন এর সমাধান দেওয়া হলো না?
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পর আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকাল পর্যন্ত অসংখ্য সম্পত্তি বণ্টনের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না, যেখানে “আউল” প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছিল বা এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে উত্থাপিত হয়েছিল।
অর্থাৎ যে ধরনের পারিবারিক সমন্বয়ে নির্ধারিত অংশগুলোর সমষ্টি একের বেশি হয়ে যায়, সে ধরনের ঘটনা অন্তত সে সময়ে সামনে আসেনি। ফলে এ বিষয়ে কোনো ওহি নাযিল হওয়া বা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে আলাদা নির্দেশনা দেওয়ারও প্রয়োজন হয়নি।
পরবর্তীকালে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর খিলাফতকালে প্রথমবারের মতো এমন একটি বাস্তব ঘটনা সামনে আসে, যেখানে নির্ধারিত অংশগুলো একত্রে যোগ করলে সম্পত্তির পরিমাণ অতিক্রম করে যায়। তখন তিনি বিষয়টি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেননি; বরং সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে এমন একটি সমাধান গ্রহণ করেন, যাতে কোনো উত্তরাধিকারী সম্পূর্ণ বঞ্চিত না হয় এবং প্রত্যেকের অধিকার আনুপাতিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। এই সমাধানই পরবর্তীকালে “আউল” নামে পরিচিত হয়।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন বিবেচনা করা উচিত। যে সমস্যাটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে কখনো উত্থাপিতই হয়নি, সেই সমস্যার সমাধান কুরআনে বা সুন্নাহয় পৃথকভাবে উল্লেখ না থাকার কারণে কীভাবে বলা যায় যে “আল্লাহ ভুল হিসাব দিয়েছেন”? যে সমস্যার সমাধান কখনো আল্লাহর কাছে (রাসূলের মাধ্যমে) চাওয়াই হয়নি, তার জন্য “আল্লাহ ভুল সমাধান দিয়েছেন” — এই দাবির ভিত্তি কী?
সমালোচনাকারীগণ যে কনটেক্সটে উত্তরাধিকার আইন নিয়ে অভিযোগটি করে থাকে সেই একই কনটেক্সট নিয়ে কি প্রশ্ন নবীকে করা হয়েছিল? সেই কনটেক্সটের উপর কি কোরআনের আয়াত নাজিল হয়েছিল?
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা উত্তর দিয়েছেন এক প্রেক্ষাপট বা কনটেক্সটে, আর সমালোচনাকারীগণ দেখাচ্ছে আরেক প্রেক্ষাপট বা কনটেক্সট, তাহলে এখানে কি করে কোরআনকে ভুল প্রমাণিত করা যায়? পবিত্র কোরআনে কিন্তু আল্লাহ বলেন নি যে, প্রত্যেক সম্ভাব্য পারিবারিক অবস্থায় উক্ত বিধান সমান ভাবে কাজ করবে। তাই তাদের দাবি তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি প্রমাণ করা যায় যে—
- এমন ঘটনা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগেই ঘটেছিল,
- বিষয়টি তাঁর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল,
- অথচ তিনি বা আল্লাহ কোনো সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
কিন্তু ইতিহাসে এর কোনো প্রমাণ নেই। বরং যা প্রমাণিত, তা হলো—একটি নতুন বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের নির্ধারিত নীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে এমন একটি সমাধান গ্রহণ করেছেন, যা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সর্বাধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এখানেই শরিয়াহর প্রাণশক্তি নিহিত। ইসলাম এমন একটি আইনব্যবস্থা, যা নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে নিজস্ব মূলনীতি ও পদ্ধতির আলোকে সমাধান দিতে সক্ষম। এ কারণেই যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন মাসআলার সমাধানে ইজতিহাদের প্রয়োজন হয়েছে, কিন্তু তা কখনো কুরআনের অপূর্ণতা বা ভুলের প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়নি। অতএব, “আউল” নীতির উদ্ভব কুরআনের কোনো ত্রুটির ফল নয়; বরং একটি বিরল ও পূর্বে অঘটিত পরিস্থিতির জন্য শরিয়াহসম্মত সমাধান অনুসন্ধানের স্বাভাবিক ফল।
সম্ভাব্য পরিস্থিতির আগাম সমাধান না মূলনীতি বর্ণনা — কোনটি বেশি উপযুক্ত
একজন বাদশাহ তার মন্ত্রী ও তার অধীনস্থ কয়েকজনকে দায়িত্ব দিয়ে সব শিখিয়ে বললেন মন্ত্রী ও অন্য দায়িত্বপ্রাপ্তরা যা বলে তা শুনবে তোমরা। এখন এই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একজন তার অধীনস্থদেরকে বললো মসজিদ পরিষ্কার কর, কিন্তু তারা বলা শুরু করলো আমরা করবো না, বাদশা তোমার কথা শুনতে বলেছে, মসজিদ পরিষ্কার করতেতো বলেনি! তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত বললো, বাদশাহতো এটাই করতে বলেছে, আমার কথা শুনো, মানো। আমি যদি মসজিদ পরিষ্কার করতে বলি, ওজুখানা পরিষ্কার করতে বলি তাহলে তোমাদেরকে সেটাই করতে হবে। কারণ বাদশাহতো আমার হুকুম মানতে বলেছে। তাই এখন বাদশাহকেতো আর বার বার এসে এটা কর সেটা কর ওটা কর এসব হুকুম দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারন বাদশা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং কিভাবে তা পালন করতে হবে সেটাও শিখিয়েছেন।
ঠিক একই রকম ভাবে প্রতিটি ছোট থেকে ছোট বিষয়ে আল্লাহকে হুকুম দেওয়ার বা কোরআনে তা বিস্তারিত বলে দেওয়ার আর প্রয়োজনীয়তা থাকে না। কারণ আল্লাহ আগেই সমাধানের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি যদি সেই রাস্তা না রাখতেন তাহলে উনার কথার উপর আপত্তি করা যেত।
“আউল” নিয়ে আপত্তির কেন্দ্রবিন্দুতে একটি অলিখিত পূর্বধারণা কাজ করে। সেটি হলো, যেহেতু আল্লাহ সর্বজ্ঞ, তাই ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন প্রতিটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির সমাধান কুরআনে আগে থেকেই বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা তাঁর জন্য অপরিহার্য ছিল। আর যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতির সমাধান পরে ইজতিহাদের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তাহলে সেটি নাকি কুরআনের অপূর্ণতার প্রমাণ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই দাবির ভিত্তি কী? কুরআনের কোথায় আল্লাহ বলেছেন যে তিনি ভবিষ্যতের প্রতিটি সম্ভাব্য ঘটনার জন্য পৃথক পৃথক বিধান প্রদান করবেন? অথবা কোথায় বলেছেন যে শরিয়াহর কোনো বিধান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে কখনো ইজতিহাদের প্রয়োজন হবে না?
বাস্তবে এমন কোনো ঘোষণা কুরআন বা সুন্নাহয় নেই। বরং আল্লাহ এমন একটি শরিয়াহ দান করেছেন, যা একদিকে সুস্পষ্ট মূলনীতি প্রদান করে, অন্যদিকে নতুন ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে সেই মূলনীতির আলোকে সমাধান বের করার সুযোগও রাখে। এ কারণেই কুরআন জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করার নির্দেশ দিয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইজতিহাদকে বৈধতা দিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম বাস্তব জীবনে সেই পদ্ধতির প্রয়োগ করেছেন।
কুরআন ইজমালান (সংক্ষিপ্ত, মূলনীতি আকারে) বর্ণনা করে, কিন্তু তাফসিলান (প্রতিটি খুঁটিনাটি বিস্তারিত) সব ক্ষেত্রে আলোচনা করে না। কী করতে হবে তা আল্লাহ বলে দিয়েছেন, কিন্তু কীভাবে, কখন, কোন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ হবে — তার বিস্তারিত দায়িত্ব রাসূলের হুকুম আহকাম, সিদ্ধান্ত ও সাহাবীদের ইজতিহাদের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি সাধারণ উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে।
ধরুন, একজন প্রতিষ্ঠাতা তাঁর প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নীতিমালা (Policy Manual) প্রণয়ন করে গেলেন। সেই নীতিমালার মাধ্যমে শত শত সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। বহু বছর পরে এমন একটি নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হলো, যা তাঁর জীবদ্দশায় কখনো ঘটেনি। তখন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সেই নীতিমালার আলোকে বসে নতুন সমস্যাটির সমাধান নির্ধারণ করলেন। এখন কি বলা হবে যে প্রতিষ্ঠাতার নীতিমালা ভুল ছিল? নাকি বলা হবে, তিনি এমন একটি নীতিমালা রেখে গেছেন, যার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের নতুন সমস্যারও সমাধান বের করা সম্ভব?
স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় কথাটিই সঠিক। ঠিক একইভাবে, কুরআন এমন একটি হিদায়াতগ্রন্থ, যা মৌলিক নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং সেই নীতির আলোকে শরিয়াহর প্রয়োগের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতিও প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই নতুন কোনো পরিস্থিতিতে ইজতিহাদের মাধ্যমে সমাধান নির্ধারিত হওয়া কুরআনের অপূর্ণতার প্রমাণ নয়; বরং তার কার্যকারিতারই প্রমাণ।
যদি প্রতিটি সম্ভাব্য পারিবারিক কম্বিনেশনের জন্য আলাদা আয়াত নাজিল হতো, তাহলে কুরআন একটি “পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন নামা”র বিশাল সংকলনে পরিণত হতো — যা কুরআনের মূল প্রকৃতি ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
কোরআন অর্থনীতির, বায়োলজির, পদার্থের, রসায়নের, আইনের, সামাজিক বিজ্ঞানের কিতাব না। আল্লাহ সকল সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেও বাধ্য নন। কোরআন হেদায়েতের জন্য নাজিল হয়েছে, এখানে প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত আকারে কিছু মূলনীতি বলেছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা, যার আলোকে আল্লাহর রাসুলকে আল্লাহ যা শিখিয়েছেন সেভাবে মানুষের মাঝে আরো বিস্তারিতভাবে বুঝিয়েছেন।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। আজ আমরা “আউল” নিয়ে প্রশ্ন শুনি, ডাইনোসর নিয়ে প্রশৃন শুনি। আগামীকাল কেউ প্রশ্ন করতে পারে—কুরআনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন (Organ Transplant)-এর বিধান কোথায়? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল সম্পদ, টেস্টটিউব বেবি, মহাকাশে ইবাদত, ট্রাফিক আইন কিংবা আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতিটি খুঁটিনাটি বিধান কোথায়?
যদি দাবি করা হয় যে ভবিষ্যতের প্রতিটি সম্ভাব্য ঘটনার বিস্তারিত সমাধান কুরআনেই থাকতে হবে, তাহলে কুরআনের পরিসর কার্যত অসীম হতে হতো। অথচ আল্লাহ কুরআনকে একটি হিদায়াতের কিতাব হিসেবে নাযিল করেছেন, যেখানে মৌলিক নীতি, উদ্দেশ্য এবং জীবন পরিচালনার ভিত্তি তুলে ধরা হয়েছে; প্রতিটি যুগের প্রতিটি নতুন ঘটনার পৃথক নির্দেশিকা নয়।
এ কারণেই ইসলামের আইনব্যবস্থা গত চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নতুন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও কার্যকর রয়েছে। কারণ এটি কেবল বিধানের একটি তালিকা নয়; বরং একটি নীতিনির্ভর (principle-based) আইনব্যবস্থা।
সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী স্কলারগণ কোরআন হতে বিভিন্ন মূলনীতি ও উসুল বের করেছেন ইসলামের বিভিন্ন হুকুম আহকাম আরো ভালোভাবে বুঝার জন্য। যেমন ইমাম আশ-শাতিবি তাঁর বিখ্যাত আল-মুওয়াফাকাত গ্রন্থে একটি নীতির কথা উল্লেখ করে লিখেছেন:
“শরীয়াহর মাকসাদ সম্পর্কে সালাফে সালিহীন ভালো করেই জানতেন। পাশাপাশি তাঁরা ছিলেন আরব। তাদের বুঝ ছিল এই যে, কুরআনের আয়াতগুলোর প্রয়োগযোগ্যতা ব্যাপক (আম)। যদিও আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট ভিন্ন কিছু নির্দেশ করে। এ থেকে বোঝা যায়, তাদের অবস্থান ছিল, আয়াতের শব্দের আপাত অর্থের সার্বিক প্রয়োগকে প্রাধান্য দিতে হবে।”
তিনি এরপর বলেছেন,
“যেমন এই আয়াতটির কথাই ধরুন, ‘আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না, তারাই ‘কাফিরুন’।’ নাযিলের প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায় যে, এটি ইহুদিদের ব্যাপারে অবতীর্ণ। কিন্তু আলিমগণ এর প্রযোজ্যতাকে কুফফারদের মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে সার্বিকভাবে বিবেচনা করেছেন।[25]আল-মুওয়াফাকাত, ৪/৩৪, দারু ইবনি আফফান সংস্করণ।
অতএব, “আউল”-এর অস্তিত্ব কুরআনের কোনো দুর্বলতার প্রমাণ নয়। বরং এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম এমন একটি শরিয়াহ প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে মৌলিক নীতির পাশাপাশি পরিবর্তিত বাস্তবতায় ন্যায়সঙ্গত সমাধান বের করার বৈধ ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা বিদ্যমান।
সুতরাং, “আল্লাহ আগে থেকেই এর সমাধান দিয়ে দেননি কেন?”—এই প্রশ্নের আগে প্রমাণ করতে হবে যে আল্লাহর জন্য তা করা অপরিহার্য ছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত এই দাবির পক্ষে কোনো দলিল বা যৌক্তিক ভিত্তি উপস্থাপন করা না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল “আমার মতে দেওয়া উচিত ছিল”—এ ধরনের ব্যক্তিগত প্রত্যাশা কুরআনের বিরুদ্ধে কোনো বৈধ আপত্তি হতে পারে না।
ব্যতিক্রম (Exception) কোনো আইনকে ভুল প্রমাণ করে না
“আউল” নীতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তির আরেকটি মৌলিক দুর্বলতা হলো সমালোচনাকারীরা এটি ধরে নেয়, একটি আইন বা নীতি যদি প্রতিটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে একইভাবে প্রযোজ্য না হয়, তবে সেটি ভুল বা অসম্পূর্ণ, তারা একটি সাধারণ সূত্র এবং একটি ব্যতিক্রম পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য বিশেষ সমাধানের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হন।
মানবসভ্যতার প্রতিটি আইনব্যবস্থা, এমনকি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বগুলোতেও সাধারণ নীতির পাশাপাশি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির জন্য পৃথক বিধান বা বিশেষ প্রয়োগ রয়েছে। এটিই একটি পরিপক্ব ও বাস্তবমুখী আইনব্যবস্থার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
পৃথিবীর প্রতিটি জ্ঞানশাখায় — পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, আইন ইত্যাদিতে সাধারণ সূত্র বা নীতির পাশাপাশি ব্যতিক্রম পরিস্থিতির জন্য বিশেষ নিয়ম থাকে। নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে (যেমন অতি উচ্চ গতি বা ভরের ক্ষেত্রে) সঠিক ফলাফল দেয় না, বিগ ব্যাংগ থিউরীও বেশ কিছু সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। তাই বলে কি এগুলোকে “ভুল” ঘোষণা করে তাঁদের তত্ত্ব বাতিল করা হয়? না। কারণ তাঁর সময়ে এই ব্যতিক্রম পরিস্থিতির প্রশ্নই ওঠেনি; পরবর্তীতে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সেই ব্যতিক্রম পরিস্থিতির সমাধান দেয়, যা নিউটনের মূল তত্ত্বকে বাতিল করে না, বরং সম্প্রসারিত করে। সৃষ্টির জন্য অবশ্যই সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা স্রষ্টার জন্য নেই। তবে স্রষ্টা যখন কোনো কিছুর মাঝে ফাঁকফোকর রাখেন, কোন কিছু বাদ দেন তখন সেটি নিশ্চয়ই ইচ্ছাকৃত, পূর্ব নির্ধারিত ও উনার হিকমাহর প্রতিনিধিত্ব করে। কারণ তিনি হাকিম, জ্ঞানময়, প্রজ্ঞাবান, সর্বজ্ঞ এবং তিনি জানেন, কিন্তু আমরা জানি না।[26]সূরা আল-বাকারা: ৩২, ২১৬, সুরা মুলক আয়াত ১৪, সূরা আন-নিসা: ১১, ২৬, ১৭০, সূরা আল-আনআম: ৭৩, ৮৩, সূরা আলে ইমরান: ১৫৪, সূরা ইউসুফ: ১০০, সূরা আল-মায়িদা: ৩৮, সূরা আল-মুমতাহানা: ১০, সূরা আদ-দুখান: ৩৮-৩৯
দুনিয়ার বিজ্ঞানের থিওরি, পদার্থ বিজ্ঞানের সুত্র, পরমাণুর পারমাণবিক ধর্ম, রসায়নের বিক্রিয়া, গণিতের সুত্র, মার্কেটিং এর নীতি রীতি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে এক্সেপশন থাকে। যে সূত্র, আইন, নীতি বানানো হয় এর কিছু ক্ষেত্রে এক্সেপশন থাকে, ব্যতিক্রম থাকে অথবা এক্সেপশন বানাতে হয়। এতে সাধারণ নীতিটি ভুল হয়ে যায় না। একটি সূত্র ১০০টির মধ্যে ৯৮টি সমস্যার সঠিক সমাধান দিলে, বাকি ২টি ব্যতিক্রম পরিস্থিতির জন্য সেই সুত্র ব্যবহার না করা যাওয়ায় ভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োজন হওয়াটা মূল সূত্রকে ভুল প্রমাণ করে না, বরং এটাই স্বাভাবিক জ্ঞানতাত্ত্বিক নিয়ম যে একটি সুত্র সর্বদা, সব পরিস্থিতিতে, সকল ধরনের সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হবে না। ম্যথমেটিক্স এর সাধারণ নীতি এটি, প্রয়োজনে ব্যতিক্রম কোন ঘটনার জন্য ভিন্ন ফর্মুলা ব্যবহার করতে হলে পুর্বের আম ফর্মুলা ভুল প্রমাণিত হয় না।
একটি দেশের ফৌজদারি আইনে চুরি দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু সব ধরনের চুরির শাস্তি এক নয়। অভিযুক্তের বয়স, মানসিক অবস্থা, বাধ্যবাধকতা, অপরাধ সংঘটনের পরিবেশ কিংবা অন্যান্য বিশেষ পরিস্থিতির ভিত্তিতে আইনের প্রয়োগ পরিবর্তিত হতে পারে। এতে আইনটি ভুল হয়ে যায় না; বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্যই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির পৃথক মূল্যায়ন করা হয়।
একইভাবে বিজ্ঞানের ইতিহাসেও দেখা যায়, একটি তত্ত্ব নির্দিষ্ট পরিসরে অত্যন্ত সফল হলেও কিছু বিশেষ অবস্থায় আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। এর অর্থ এই নয় যে পূর্ববর্তী তত্ত্বটি “ভুল” ছিল; বরং সেটি একটি নির্দিষ্ট পরিসরের জন্য প্রযোজ্য ছিল এবং পরে তার প্রয়োগক্ষেত্র আরও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে।
শরিয়াহও এর ব্যতিক্রম নয়। কুরআন বহু ক্ষেত্রে একটি সাধারণ নীতি প্রদান করেছে, আর সুন্নাহ সেই নীতির প্রয়োগের সীমা, শর্ত ও ব্যতিক্রম ব্যাখ্যা করেছে।
উদাহরণস্বরূপ,
– জিনার শাস্তি রজম নির্ধারিত থাকলেও, ধর্ষণের শিকার নারীর কোনো শাস্তি নেই — এটি কুরআনে সরাসরি বলা নেই, বরং অন্যান্য দলিল ও সাহাবী-ফকীহদের বুঝ থেকে প্রতিষ্ঠিত।
– চুরির শাস্তি হাত কাটা নির্ধারিত থাকলেও, ক্ষুধার তাড়নায় বা উন্মুক্ত স্থান থেকে চুরির ক্ষেত্রে এই শাস্তি প্রযোজ্য নয় — এটাও রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট করেছেন, কুরআনে বিস্তারিত নেই।
– ভুলবশত মৃত্যুর ক্ষেত্রে কিসাস (প্রাণদণ্ড) প্রযোজ্য নয়।
– সূরা তাওবা ৯:৫ আয়াতে “মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর” — এই আম (সাধারণ) নির্দেশনা হাদিস দ্বারা যুদ্ধরত হারবি কাফেরদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে, সর্বকালের সকল অমুসলিমের জন্য নয়।
এসব বিস্তারিত সুন্নাহ ও সাহাবাদের বুঝের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এগুলাকে কি অসম্পুর্ণ আইন বলা সম্ভব? অবশ্যই না। কারন আল্লাহ সব কিছু কোরআনে বিস্তারিত বলে দিবেন এমনটা তিনি কখনো বলেন নি। কুরআনে বিভিন্ন অপরাধের মৌলিক বিধান বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক সম্ভাব্য পরিস্থিতির পৃথক নির্দেশনা সেখানে নেই। তাই এগুলোর কোনোটির ক্ষেত্রেই আমরা বলি না যে কুরআন ভুল বা অসম্পূর্ণ, কারণ আল্লাহ রাসূলকে কোরআনের ব্যাখ্যা, ইজতিহাদ ও কিয়াসের পূর্ণ অথরিটি দিয়েছেন, তিনি নিজের রাসুলকে কোরআনের বাহিরেও শিক্ষা দিয়েছেন দ্বীনের, আর সাহাবীদের সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। শরিয়াহর উদ্দেশ্য প্রতিটি ঘটনার জন্য অসংখ্য আলাদা বিধান প্রদান করা নয়; বরং এমন একটি নীতিনির্ভর কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, যার মাধ্যমে নতুন ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিরও ন্যায়সঙ্গত সমাধান করা সম্ভব।
“আউল” নীতিও ঠিক এই ধরনের একটি ব্যতিক্রমী প্রয়োগ। এটি কোনো নতুন উত্তরাধিকার আইন প্রবর্তন করেনি, কুরআনের নির্ধারিত অংশও বাতিল করেনি। বরং এমন একটি বিরল পরিস্থিতিতে, যেখানে নির্ধারিত অংশসমূহের সমষ্টি সম্পত্তির পরিমাণ অতিক্রম করে, সেখানে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর আপেক্ষিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের ব্যবস্থা করেছে।
বিশেষ পরিস্থিতি বা ব্যতিক্রম ঘটনার উদ্ভব হতেই পারে যা একদম স্বাভাবিক একটি ঘটনা। এর জন্য ভিন্ন বিধানও থাকতেই পারে, কিছু বিশেষ কেসে ভিন্ন বিধান থাকাটা সেটার আম বিধানকে অসম্পুর্ণ করে না। মদ খেলে শাস্তি হল বেত্রাঘাত, কিন্তু পাগল মদ খেলে তাকে কি এই শাস্তি দেওয়া হয়? বিবাহিত জিনা করলে শাস্তি রজম, কিন্তু কোন নারীকে ঘুমের মধ্যে ধর্ষণ করলে নারীকে কি শাস্তি দেওয়া হয়? কাউকে জোর করে ধর্ষণ করলে ধর্ষীতাকে কি শাস্তি দেওয়া হয়? না, শাস্তি দেওয়া হয় না, কারণ এসব এক্সেপশন, এসব ব্যতিক্রম কেসের জন্য বিধান ভিন্ন। অন্যান্য দলিল থেকে সাহাবা ও ওলামাগণ বুঝেছেন ধর্ষিতা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য না, তেমনই সাহাবীগণ বুঝেছেন কোরআনে দেওয়া পরিমান সর্বদা দ্রুব থাকতে হবে এমন শর্ত আল্লাহ আরোপ করেন নি।
আল্লাহ স্রষ্টা তাই তিনি অগ্রিম সকল সমস্যার সমাধান সুস্পষ্ট করে উল্লেখ করতে বাধ্য নন। কেন দিতে হবে আল্লাহকে উত্তর? আল্লাহকে কেন, কোন কারনে, কিসের ভিত্তিতে সব কিছু নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে সমাধান দিয়ে যেতে হবে তা কি সমালোচনাকারীগণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন?
আল্লাহ কোরআনেই প্রয়োজনে সময়ে সময়ে বিভিন্ন মাসআলা কিছু মডিফাইড করে আরেক হুকুমে আমল করার নির্দেশ দিয়ে নজির রেখেছেন, তিনি মূল নীতি সমূহ বর্ণনা করেছেন। অতএব, “আউল” প্রয়োগ করতে হয়েছে – এই তথ্য থেকে কুরআনের ভুল প্রমাণিত হয় না। বরং এটি প্রমাণ করে যে শরিয়াহ একটি গতিশীল ও বাস্তবমুখী আইনব্যবস্থা, যা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিকেও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সমাধান করার সক্ষমতা রাখে।
আপত্তির মূল ত্রুটি কোথায়?
“আউল” নিয়ে উত্থাপিত আপত্তি প্রথম দৃষ্টিতে গাণিতিক মনে হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি মূলত একটি যৌক্তিক (logical) ত্রুটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সমালোচকদের যুক্তিকে সংক্ষেপে এভাবে উপস্থাপন করা যায়—
> কুরআনে কিছু উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সেই অংশগুলোর সমষ্টি ১০০ শতাংশের বেশি হয়। অতএব, কুরআনে গাণিতিক ভুল রয়েছে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তারা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পূর্বধারণা হিসেবে ধরে নিয়েছেন, অথচ সেই ধারণার পক্ষে কুরআন থেকে কোনো দলিল উপস্থাপন করতে পারেননি।
সেই পূর্বধারণাটি হলো—
> “কুরআনে নির্ধারিত অংশগুলো প্রত্যেক সম্ভাব্য পারিবারিক অবস্থায় অপরিবর্তিত (absolute) থাকবে এবং সবসময় যোগ করলে ঠিক একশত শতাংশ হবে।”
প্রশ্ন হলো, কুরআনের কোথায় এই কথা বলা হয়েছে? কোথায় আল্লাহ বলেছেন যে, সব সম্ভাব্য পারিবারিক সমন্বয়ে এই ভগ্নাংশগুলো অপরিবর্তিত থাকবে? কোথায় বলেছেন, এগুলোর সমষ্টি কখনো এককের বেশি বা কম হতে পারবে না? বাস্তবে এমন কোনো বক্তব্য কুরআনে নেই।
অর্থাৎ সমালোচকেরা প্রথমে নিজেদের পক্ষ থেকে একটি অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করছেন, তারপর সেই আরোপিত শর্ত পূরণ না হওয়ায় কুরআনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছেন। এটি ন্যায্য সমালোচনার পদ্ধতি নয়।
কোনো গ্রন্থের সমালোচনা করতে হলে আগে প্রমাণ করতে হয় যে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ সত্যিই সেই দাবি করেছে। কিন্তু কুরআন যে দাবি করেনি, সেটিকে কুরআনের দাবি হিসেবে ধরে নিয়ে তার সমালোচনা করা একটি যুক্তিগত ভ্রান্তি।
আরও লক্ষণীয় যে, কুরআন কোথাও “আউল” নিষিদ্ধ করেনি, আবার কোথাও বলেনি যে উত্তরাধিকারীদের অংশ কোনো অবস্থাতেই আনুপাতিকভাবে সমন্বয় করা যাবে না। বরং কুরআন ইজতিহাদ, জ্ঞানীদের অনুসরণ, ইজমার অনুসরণ এবং শরিয়াহর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নীতিকে সমর্থন করেছে।
ফলে সাহাবায়ে কেরামের গ্রহণ করা সমাধান কুরআনের বিরোধিতা নয়; বরং কুরআনের উদ্দেশ্য, ন্যায়ভিত্তিক সম্পত্তি বণ্টন বাস্তবায়নেরই একটি প্রয়োগ।
এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদি সত্যিই “আউল” আল্লাহর বিধানের বিরোধী হতো, তাহলে সাহাবায়ে কেরাম কেন সেটিকে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করলেন? কেন পরবর্তী যুগের মুজতাহিদ ইমামগণও একই পদ্ধতি অনুসরণ করলেন? কেন ইসলামী আইনশাস্ত্রে এটি চৌদ্দ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্বীকৃত রয়ে গেছে?
অতএব, “আউল” নিয়ে আপত্তির মূল সমস্যা কুরআনের মধ্যে নয়; বরং সমালোচনার পদ্ধতির মধ্যেই নিহিত। তারা কুরআনের বক্তব্য নয়, বরং নিজেদের কল্পিত একটি শর্তকে মানদণ্ড বানিয়ে কুরআনের বিচার করতে চান। আর এই কারণেই তাদের সিদ্ধান্তটি যৌক্তিকভাবে টেকসই হয় না।
গণিতশাস্ত্র
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ) খুব জটিল গাণিতিক শাস্ত্র। ইতিহাসে মুসলিম গণিতবিদরা এই বিষয়কে আলাদা শাস্ত্র হিসেবে উন্নত করেছিলেন।
আনকভার ট্রুথ ব্লাগ সাইটে মাসুদুল হক ভাই উনার, “ইসলামে উত্তরাধিকার আইন কতটা গাণিতিক ব্যবহারিক আইন?” আর্টিকেলে লিখেন,
এ আইন বহু বিখ্যাত গণিতবিদদের দ্বারা পরীক্ষীত হয়েছে। মুসা আল খোয়ারজমী, ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের সময়কালীন একজন গণিতবিদ, যার বইয়ের প্রভাব ইউরোপে এতটাই ছিল যে তখন তার হিসাব আল জাবর ওয়াল মুকাবিলাহ ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ল্যাটিনে অনূদিত হয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে পড়ানো হয়। তার বইয়ের আল জাবর থেকে আলজেবরা শব্দের উৎপত্তি। তার এই গ্রন্থে ইসলামিক উত্তরাধিকার আইনটির গানিতিক দিক নিয়ে একটা অধ্যায় আছে, যেখানে তিনি সম্পদ বন্টণের জন্য লিনিয়ার ইকুইশন প্রবর্তন করেন। উত্তরাধিকার আইন এতটাই গনিতের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ যে এটি গণিতের একটি শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।[27]Gandz, Solomon (1938), “The Algebra of Inheritance: A Rehabilitation of Al-Khuwarizmi”, Osiris (University of Chicago Press 5: 319-91).
তাছাড়া উত্তরাধিকার আইন তৎকালীন মুসলিম গণিতবিদদের জন্য একধরনের প্রেরণা ছিল, এটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অর্থাৎ গানিতিক ভাবে কুরআনের মূলনীতির মাধ্যমে সম্পদ হিসাব করার জন্য গণিতের অনেক নতুন বিষয় আবিষ্কৃত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য উত্তর আফ্রিকার ১২ শতাব্দীর গণিতবিদ আল হাসার লব ও হরের হিসাবের জন নতুন গানিতিক নোটেশনের ধারণা প্রদান করেন। তার এই গাণিতিক নিয়ম পরবর্তীতে ১৩ শতাব্দীতে ইউরোপের বিখ্যাত গণিতবিদ ফিবোনক্কির কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।[28]Prof. Ahmed Djebbar (June 2008). “Mathematics in the Medieval Maghrib: General Survey on Mathematical Activities in North Africa”. FSTC Limited.
এসব কারনে ইসলামের ও কোরআনের অনেক বড় সমালোচক গনও উত্তরাধিকার আইন নিয়ে কোন বিরূপ মন্তব্য করার চিন্তাও করেনি-যেমন ড. ক্যাম্পবেল, যার পিএইচডি এর বিষয় ছিল কুরআন তথা ইসলামের দুর্বল দিক গুলো তুলে ধরা, সেও উত্তরাধিকার আইন নিয়ে কোন সভায় কোন মন্তব্য করেনি। শুধুমাত্র এ আইনে স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন অতি উৎসাহী ইসলামের সমালোচকরা নানা বাগাড়ম্বর করে থাকে।
এই আইন এতটা সুচিন্তিত, বিস্তৃত ও গণিতবান্ধব যে, অনেক অমুসলিম আইনবিদও এটাকে অকুন্ঠচিত্তে সমর্থণ জানিয়েছে, যেমন: কিংস কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের প্রফেসর,আইনবিষয়ক অনেক গ্রন্থের লেখক ও আইনবিদ (ব্যরিস্টার অ্যাট ল) আলমারিক রামসে তার এক বইয়ে বলেন-মুসলিম উত্তরাধিকার আইন হল সভ্য সমাজে প্রচলিত সবচেয়ে বিস্তৃত ও বিশুদ্ধ্ উত্তরাধিকার আইন ও সব প্রশ্নের উর্ধ্বে।[29]Rumsey, A. Moohummudan Law of Inheritance. 1880
উপসংহার
“আউল” নীতি নিয়ে উত্থাপিত আপত্তি দীর্ঘদিন ধরে ইসলামবিরোধী আলোচনায় পুনরাবৃত্তি হলেও, নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যায়—এটি কুরআনের গাণিতিক ভুলের অভিযোগ নয়; বরং শরিয়াহর প্রকৃতি ও ইসলামী আইনব্যবস্থা সম্পর্কে একটি মৌলিক ভুল বোঝাবুঝির ফল।
এই প্রবন্ধে আমরা দেখেছি, কুরআন উত্তরাধিকারীদের মৌলিক অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে, কিন্তু কোথাও দাবি করেনি যে প্রত্যেক সম্ভাব্য পারিবারিক সমন্বয়ে সেই অংশগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় যোগ করলে অবশ্যই শতভাগ হবে। আবার কোথাও এমনও বলেনি যে বিশেষ পরিস্থিতিতে আনুপাতিক সমন্বয় করা যাবে না। বরং কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী আইনশাস্ত্র সম্মিলিতভাবে এমন একটি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে নতুন বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সমাধানে ইজতিহাদের বৈধ সুযোগ রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবেও আমরা দেখেছি, “আউল”-এর প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে দেখা দেয়নি। পরবর্তীকালে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর খিলাফতকালে প্রথম এমন একটি বিরল পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তিনি সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে এমন একটি সমাধান গ্রহণ করেন, যা কারও অধিকার বাতিল না করে সকলের অংশকে আনুপাতিকভাবে সমন্বয় করে। এই সমাধান পরবর্তীকালে উম্মাহর সকল আলিম ও ফকীহ গ্রহণ করেন এবং ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের একটি স্বীকৃত নীতিতে পরিণত হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, “আউল” কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী উদ্ভাবন নয়। শরিয়াহর বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আমরা দেখি, সাধারণ নীতির পাশাপাশি বিশেষ পরিস্থিতির জন্য পৃথক প্রয়োগ রয়েছে। এটি কোনো আইনের দুর্বলতা নয়; বরং একটি পরিপূর্ণ আইনব্যবস্থার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কারণ বাস্তব জীবনের সব পরিস্থিতি এক রকম নয়, তাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কখনো কখনো একই মূলনীতির ভিন্ন প্রয়োগ প্রয়োজন হয়।
এছাড়াও সমালোচকদের যুক্তিগত ত্রুটিও স্পষ্ট। তারা প্রথমে একটি পূর্বধারণা স্থির করেন—যে কুরআনের নির্ধারিত অংশগুলো প্রত্যেক সম্ভাব্য অবস্থায় অপরিবর্তিত থাকবে এবং সবসময় শতভাগ হবে। অথচ কুরআনে এমন কোনো দাবি নেই। তারপর সেই কল্পিত শর্ত পূরণ না হওয়ায় কুরআনের বিরুদ্ধে “গাণিতিক ভুল”-এর অভিযোগ তোলেন। স্বাভাবিকভাবেই এমন যুক্তি বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ক্লাসে গণিতের শিক্ষক ছাত্রদের বললেন, নেক্সট পরীক্ষায় যে অংকগুলি থাকবে তা বোঝার জন্য টেক্সট বইয়ের বাইরে আরও কয়েকটি রেফারেন্স বইয়ের সূত্র লাগবে, সেগুলো দেখে এসো। কিন্তু পরীক্ষার আগে কোন ছাত্র শুধু টেক্সট বই পড়ে গেলো এবং যথারীতি পরীক্ষায় আসা কয়েকটি অংক পারলো না। পরে সবাইকে বলে বেড়াল ঐসব অংকে ভুল ছিল বা টিচার অংক জানে না।
আল্লাহ বলেছেন যে রাসুলের সাহায্য নেওয়ার জন্য, জ্ঞানীদেরকে প্রশ্ন করার জন্য, পরামর্শ করার জন্য, প্রয়োজনে ইজতিহাদ করার জন্য, ইজমার অনুসরণ করার জন্য। কিন্তু সেগুলো না করে গাণিতিক ভুলের দাবিটা কিছুটা সেরকম।
সুতরাং, “আউল” নীতি আল্লাহর বিধান সংশোধনের প্রচেষ্টা নয়; বরং কুরআনের নির্ধারিত নীতিমালার আলোকে শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি। এটি কুরআনের বিরুদ্ধে নয়, বরং কুরআনের উদ্দেশ্যেরই বাস্তবায়ন।
পরিশেষে বলা যায়, “আউল” নিয়ে বিতর্কের প্রকৃত সমাধান গাণিতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কুরআন, সুন্নাহ, ইজতিহাদ এবং ইসলামী আইনশাস্ত্রের সামগ্রিক কাঠামোকে একসঙ্গে বোঝার মধ্যেই নিহিত। যে ব্যক্তি এই সামগ্রিক কাঠামোকে সামনে রেখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করবে, তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
Footnotes
| ⇧1 | কুরআনে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টন আইনে গাণিতিক ভুলের অভিযোগ ও এর জবাব – https://response-to-anti-islam.com/show/কুরআনে-উত্তরাধিকার-সম্পদ-বণ্টন-আইনে-গাণিতিক-ভুলের-অভিযোগ-ও-এর-জবাব-/142 |
|---|---|
| ⇧2 | সূরা আন-নাহল ১৬:৪৩; সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭ |
| ⇧3 | মিশকাত ৩৭৩২ |
| ⇧4 | সুরা আশ শূরা আয়াত ১৭ |
| ⇧5 | বুখারী ৩৬৫০-৫১; তাহাবী, শারহু মা‘আনীল আসার ৪/১৫০ |
| ⇧6 | রিয়াদুস সলেহিন ১৫৭, আবু দাউদ ৪৬০৭ |
| ⇧7 | সূরা আল-বাকারা: ১৩৭ |
| ⇧8 | সূরা আত-তাওবা: ৮৮ |
| ⇧9 | সূরা আত-তাওবা: ১০০ |
| ⇧10 | সুরা তাওবা আয়াত ১১৭-১১৮, সুরা ফাতাহ আয়াত ১৮, ২৯, সূরা আল-বাকারা ২১৮, সূরা আলে ইমরান: ১২১-১৭৯ |
| ⇧11 | সূরা আলে ইমরান: ১৫৯, ১৯৫, সূরা আশ-শুরা: ৩৮ |
| ⇧12 | সহীহ; ইমাম আহমদ বর্ণনা করেছেন, ২/৩২১ |
| ⇧13 | তিরমিযী ৩৬৬২-৬৩ |
| ⇧14 | তিরমিযী ৩৬৮৬ |
| ⇧15 | তিরমিযী ৩৬৮২ |
| ⇧16 | তিরমিজি ৩৬৮৭ |
| ⇧17 | তিরমিজি ৩৬৯৩ |
| ⇧18 | ওমর (রাঃ)-এর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কুরআন মাজীদের মোট কতটি আয়াত নাযিল হয়? – https://at-tahreek.com/article_details/5037 |
| ⇧19 | اعتراض من ملحد على مسائل العَوْل في المواريث – https://islamqa.info/ar/answers/131556/ |
| ⇧20 | আল-মুগনী, ৬/২৮৩ |
| ⇧21 | আবূ দাউদ ৪২৫৩, ইবনে মাজাহ ৩৯৫০, তিরমিযী ২১৬৭ |
| ⇧22 | আল-বাহরুল মুহীত্ব, ৬/৩৭৯ পৃ.; তাফসীরে ইবনু কাছীর, ২/৪১৩ পৃ.; মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ২৮/১২৫ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং ১৯৭৯৩৭ |
| ⇧23 | সুরা নিসা আয়াত ৭ |
| ⇧24 | جواب شبهة حول مسألة العول – https://islamqa.info/ar/answers/302362/ |
| ⇧25 | আল-মুওয়াফাকাত, ৪/৩৪, দারু ইবনি আফফান সংস্করণ। |
| ⇧26 | সূরা আল-বাকারা: ৩২, ২১৬, সুরা মুলক আয়াত ১৪, সূরা আন-নিসা: ১১, ২৬, ১৭০, সূরা আল-আনআম: ৭৩, ৮৩, সূরা আলে ইমরান: ১৫৪, সূরা ইউসুফ: ১০০, সূরা আল-মায়িদা: ৩৮, সূরা আল-মুমতাহানা: ১০, সূরা আদ-দুখান: ৩৮-৩৯ |
| ⇧27 | Gandz, Solomon (1938), “The Algebra of Inheritance: A Rehabilitation of Al-Khuwarizmi”, Osiris (University of Chicago Press 5: 319-91). |
| ⇧28 | Prof. Ahmed Djebbar (June 2008). “Mathematics in the Medieval Maghrib: General Survey on Mathematical Activities in North Africa”. FSTC Limited. |
| ⇧29 | Rumsey, A. Moohummudan Law of Inheritance. 1880 |




