
ভূমিকা
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.
ইসলাম মানবজাতির সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। মানুষের জীবন, সম্পদ, ধর্ম, বুদ্ধি এবং বংশ-মর্যাদা (العِرْض) সংরক্ষণকে শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য (مقاصد الشريعة) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ কারণেই ইসলাম মানুষের সম্ভ্রম ও পবিত্রতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে রক্ষা করেছে এবং এ বিষয়ে যেকোনো ধরনের আক্রমণ, নির্যাতন ও সীমালঙ্ঘনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
বর্তমান যুগে ধর্ষণ (الاغتصاب) এমন এক জঘন্য অপরাধ, যা শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক ক্ষতিই সাধন করে না; বরং তার মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনকেও গভীরভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এটি মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার ওপর নির্মম আঘাত। ফলে আধুনিক বিশ্বে ধর্ষণকে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধসমূহের একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং বিভিন্ন দেশে এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
দুঃখজনকভাবে কিছু মানুষ ইসলামি শরিয়তের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উত্থাপন করে যে, ইসলাম ধর্ষণ ও যিনাকে একই অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এবং ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী উপস্থিত করা বাধ্যতামূলক মনে করে। এর ফলে তারা দাবি করে যে, ইসলামে ধর্ষণের শিকার নারীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। বাস্তবে এ ধারণা ইসলামী ফিকহ ও শরিয়তের প্রকৃত শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ ফকীহগণ ধর্ষণ (الاغتصاب) ও স্বেচ্ছায় সংঘটিত যিনা (الزنا)-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করেছেন এবং উভয়ের বিধান, প্রমাণপদ্ধতি ও শাস্তিকেও পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন।
ইসলামী আইনশাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ধর্ষণকে কেবল ব্যভিচারের একটি রূপ হিসেবে নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে হিরাবাহ (الحرابة), সন্ত্রাস, বলপ্রয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তা বিনষ্টকারী অপরাধ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছে। এজন্য বহু ফকীহ ধর্ষণের ক্ষেত্রে সাধারণ যিনার চেয়েও কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। একইভাবে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে অপরাধী নয়, বরং নির্যাতিত ও মজলুম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং তার ওপর থেকে শরয়ী দণ্ড রহিত করা হয়েছে।
এ আলোচনায় আমরা প্রথমে ধর্ষণের ভাষাগত ও পারিভাষিক পরিচয় তুলে ধরব। এরপর ধর্ষণ ও যিনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আলোচনা করা হবে। তারপর ইসলামী ফিকহে ধর্ষণ প্রমাণের বিভিন্ন পদ্ধতি—যেমন সাক্ষ্য, স্বীকারোক্তি এবং পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ (القرائن)—সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে। সর্বশেষে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির বিধান এবং অপরাধীর জন্য নির্ধারিত শরয়ী শাস্তি সম্পর্কে কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবীদের ফয়সালা ও ফকীহদের বিশদ মতামত উপস্থাপন করা হবে।
আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে ন্যায় ও ইনসাফের পথ অনুসরণ করার তাওফীক দান করেন এবং ইসলামের প্রকৃত বিধানসমূহ সঠিকভাবে অনুধাবন ও উপস্থাপন করার সামর্থ্য দান করেন। আমিন
ধর্ষণের পরিচয়
মানবসমাজে ধর্ষণ (الاغتصاب) একটি জঘন্য, নিন্দনীয় ও মানবমর্যাদাবিরোধী অপরাধ। এটি শুধু ব্যক্তির শারীরিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়; বরং তার সম্মান, নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকারেরও গুরুতর লঙ্ঘন। ইসলাম মানুষের ইজ্জত, সম্ভ্রম ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং যেকোনো ধরনের জবরদস্তি, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এ কারণে ইসলামী ফিকহে ধর্ষণকে সাধারণ যিনা (ব্যভিচার) থেকে পৃথক একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং এর জন্য বিশেষ বিধান ও শাস্তির আলোচনা করা হয়েছে।
তবে প্রাচীন ফিকহি গ্রন্থসমূহে ‘ধর্ষণ’ (الاغتصاب) পরিভাষাটি খুব বেশি ব্যবহৃত না হয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘ইকরাহ’ (الإكراه) তথা জোরপূর্বক যৌন সংসর্গের আলোচনা পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য প্রথমে ধর্ষণের ভাষাগত ও পারিভাষিক পরিচয় জানা প্রয়োজন। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।
ধর্ষণের শাব্দিক পরিচয়
الاغتصاب في اللغة
الْغَصْبُ: أَخْذُ الشيء ظُلماً وقهراً، يقال: غَصَبَ الشيءَ يَغْصِبُه غَصْباً، واغْتَصَبَه، فَهُوَ غَاصِبٌ ، وغَصَبه على الشيء : قَهَره، وغَصَبَهُ مِنْهُ. والاغتصاب مثله، وغصب المرأة زني بها كرها ” تهذيب اللغة للأزهري ٦٢٨ ، لسان العرب لابن منظور ١/ ٦٤٨.وفي رواية أشهب وابن نافع عن مالك : فِي الْأَمَةِ الْفَارِهَةِ تَتَعَلَّقُ بِرَجُلٍ تَدَّعِي أَنَّهُ غَصَبَهَا نَفْسَها … أي جامعها على كره منها وبغير رضاها .
المدونة للإمام مالك بن أنس – ط دار الكتب العلمية – ط ١ / ١٤١٥هـ – ١٩٩٤م – ٤ / ٦٠١.
ভাষাগত অর্থে ধর্ষণ (الاغتصاب):
(الغصب) অর্থ হলো—কোনো জিনিস অন্যায়ভাবে ও জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া। বলা হয়:
غَصَبَ الشَّيْءَ يَغْصِبُه غَصْبًا، وَاغْتَصَبَهُ “
সে কোনো বস্তু জোরপূর্বক ও অন্যায়ভাবে নিয়ে নিল।”এ কারণে তাকে غَاصِبٌ (দখলকারী/বলপ্রয়োগে গ্রাসকারী) বলা হয়।
আর غَصَبَهُ عَلَى الشَّيْءِ অর্থ—তাকে কোনো বিষয়ে বাধ্য করল বা জোর করল।
غَصَبَهُ مِنْهُ অর্থ—তার কাছ থেকে বলপ্রয়োগে কেড়ে নিল।
الاغتصاب (ইগতিসাব/ধর্ষণ) শব্দটির অর্থও এর অনুরূপ। আরবরা বলে:غَصَبَ الْمَرْأَةَ অর্থাৎ, “সে নারীর সঙ্গে তার অনিচ্ছায় জিনা (যৌন সংসর্গ) করেছে।”[1]আল-আযহারী, তাহযীবুল লুগাহ, পৃ. ৬২৮; ইবন মানযূর, লিসানুল আরব, ১/৬৪৮।
আর ইমাম মালিক (রহ.)-এর বর্ণনা সম্পর্কে আশহাব ও ইবনু নাফি‘ বলেন:
> فِي الْأَمَةِ الْفَارِهَةِ تَتَعَلَّقُ بِرَجُلٍ تَدَّعِي أَنَّهُ غَصَبَهَا نَفْسَهَا
“এক সুন্দরী দাসী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যে, সে তার ওপর জোরপ্রয়োগ করেছে।”
অর্থাৎ,
> أَيْ جَامَعَهَا عَلَى كُرْهٍ مِنْهَا وَبِغَيْرِ رِضَاهَا
“সে তার সাথে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং তার সম্মতি ছাড়াই সঙ্গম করেছিল।”[2]মালিক ইবন আনাস, আল-মুদাওয়ানাহ, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৫ হি./১৯৯৪ খ্রি., ৪/৬০১।
সুতরাং ভাষাগতভাবে الاغتصاب (ধর্ষণ) বলতে বোঝায়—কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা।
ধর্ষণের পারিভাষিক পরিচয়
যিনা (ব্যভিচার)-এর ক্ষেত্রে ‘ইগতিসাব’ (الاغتصاب, ধর্ষণ) পরিভাষাটি খুব বেশি ব্যবহৃত নয়। এ বিষয়ে ফকীহগণের নিকট অধিক প্রচলিত পরিভাষা হলো ‘ইকরাহ’ (الإكراه), অর্থাৎ অপর পক্ষের সম্মতি ও ইচ্ছা ছাড়া তাকে জোরপূর্বক যিনায় লিপ্ত করা।৷ (যাকে আধুনিক ভাষায় ধর্ষণ বলে থাকি আমরা। )
এ কারণে প্রাচীন ফকীহগণ ধর্ষণের পৃথক কোনো সংজ্ঞা প্রদান করেননি। তবে সমকালীন কিছু গবেষক ধর্ষণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন:
«حَمْلُ الرَّجُلِ الْمَرْأَةَ عَلَى الِاتِّصَالِ بِهَا جِنْسِيًّا دُونَ رِضًا أَوِ اخْتِيَارٍ مِنْهَا»
) جريمة اغتصاب الإناث د. محمد الشحات الجندي – ط دار النهضة العربية – القاهرة – ( بدون ) – ص: .٣٦“কোনো পুরুষ কর্তৃক কোনো নারীকে তার সম্মতি ও স্বাধীন ইচ্ছা ব্যতীত জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করাকে ধর্ষণ বলা হয়।[3]”ড. মুহাম্মাদ আশ-শাহাত আল-জুন্দী, জারীমাতু ইগতিসাবিল ইনাস, দারুন নাহদাতিল আরাবিয়্যাহ, কায়রো, পৃ. ৩৬।
কিন্তু এই সংজ্ঞাটি অসম্পূর্ণ; কারণ এতে লিওয়াত (সমকামিতামূলক বলপূর্বক যৌনাচার) দ্বারা সংঘটিত ধর্ষণ এবং নারী কর্তৃক পুরুষকে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
পূর্ববর্তী সংজ্ঞার ওপর যে আপত্তি উত্থাপিত হয়েছিল, তা দূর করার জন্য কিছু গবেষক ধর্ষণের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন:
«إِرْغَامُ الرَّجُلِ أَوِ الْمَرْأَةِ غَيْرَهُمَا عَلَى الِاتِّصَالِ بِهِ جِنْسِيًّا دُونَ رِضَا الطَّرَفِ الْآخَرِ، أَوْ دُونَ اخْتِيَارٍ مِنْهُ إِذَا كَانَ ذَلِكَ حَرَامًا مَحْضًا»
أحكام جريمة اغتصاب العرض في الفقه الإسلامي – إبراهيم بن صالح بن محمد الليحدان – رسالة ماجستير – جامعة نايف العربية للعلوم الأمنية – الرياض – قسم العدالة الجنائية – سنة ٢٠٠٤م – ص: ١٩ وما بعدها.“কোনো পুরুষ বা নারী কর্তৃক অন্য কাউকে তার সম্মতি ছাড়া অথবা স্বাধীন ইচ্ছা ব্যতীত জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করাকে ধর্ষণ বলা হয়—যখন সেই যৌন সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়।”[4]ইবরাহীম আল-লুহাইদান, আহকামু জারীমাতি ইগতিসাবিল ইর্দ ফিল ফিকহিল ইসলামী, মাস্টার্স গবেষণাপত্র, নায়েফ আরব ইউনিভার্সিটি, রিয়াদ, ২০০৪ খ্রি., পৃ. ১৯ ও পরবর্তী পৃষ্ঠা।
‘ধর্ষণ’ (الاغتصاب) শব্দটির দুটি ধারণা রয়েছে:
- ১. ব্যাপক (সাধারণ) ধারণা
এটি পুরুষ বা নারী—উভয়ের পক্ষ থেকেই সংঘটিত হতে পারে এবং সব ধরনের অবৈধ জোরপূর্বক যৌন সংসর্গকে অন্তর্ভুক্ত করে। এর সংজ্ঞা হলো:
“কোনো ব্যক্তি কর্তৃক অন্য ব্যক্তির সঙ্গে শরয়ি অধিকার, বৈধ বিবাহ বা বিবাহ-সদৃশ (শুবহাতুন-নিকাহ) কোনো কারণ ছাড়া, তার সম্মতি বা স্বাধীন ইচ্ছা ব্যতীত জোরপূর্বক যৌন সংসর্গ স্থাপন করা।”
এই সংজ্ঞা থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বের হয়ে যায়:
- পারস্পরিক সম্মতিতে সংঘটিত যৌন সম্পর্ক; কারণ তা ধর্ষণ নয়, বরং যিনা।
- যিনার ভূমিকা বা প্রাক্-ধাপসমূহ এবং সমকামী নারী-নারীর যৌনাচার (السحاق); কারণ এগুলো স্বতন্ত্র অপরাধ, তবে ধর্ষণের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এদের শাস্তিও ধর্ষণের শাস্তির চেয়ে কম।
- স্ত্রী বা এমন নারীর সঙ্গে জোরপূর্বক সহবাস, যার ক্ষেত্রে বিবাহের শুবহা (বিবাহসদৃশ বৈধতার ধারণা) রয়েছে। কারণ যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীকে সহবাসে বাধ্য করে, সে শরয়ি পরিভাষায় ‘ধর্ষণ’ অপরাধে অভিযুক্ত হবে না; যদিও পারস্পরিক সম্মতির পরিবর্তে জোরপূর্বক সহবাস করা সুন্নাহর পরিপন্থী।
- ২. বিশেষ (সংকীর্ণ) ধারণা
এটি যিনার বিপরীতে ব্যবহৃত ধর্ষণের নির্দিষ্ট অর্থ। এর সংজ্ঞা হলো:
“কোনো পুরুষ কর্তৃক কোনো নারীর সঙ্গে বৈধ বিবাহ বা বিবাহের শুবহা ছাড়া, তার সম্মতি বা স্বাধীন ইচ্ছা ব্যতীত জোরপূর্বক যৌন সংসর্গ স্থাপন করা।”
এই সংজ্ঞা পূর্ববর্তী সব শর্তকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং অতিরিক্তভাবে পুরুষের সঙ্গে পুরুষের পায়ুকাম (লিওয়াত)-কেও এর বাইরে রাখে।
তৃতীয় শাখা: ধর্ষণ ও যিনা অপরাধের শরয়ি ধারণার তুলনামূলক আলোচনা
ফকীহগণ যিনা এবং ধর্ষণ—এই দুই অপরাধের ধারণার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাদের আলোচনায় স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, ধর্ষণ (الاغتصاب) ও যিনা (الزنا) একই বিষয় নয়; বরং উভয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পরবর্তী আলোচনায় সেই পার্থক্য আরও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হবে।
ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণের পদ্ধতি
ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণে কি চারজন সাক্ষী বাধ্যতামূলক? ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণাকারী অনেক নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী দাবি করে থাকে যে, ইসলামী শরীয়তে ধর্ষণ প্রমাণ করার জন্য অবশ্যই চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। তাদের ভাষ্যমতে, যদি চারজন সাক্ষী উপস্থিত না থাকে, তাহলে ধর্ষকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব নয়। এমনকি তারা আরও বলে যে, ধর্ষণ প্রমাণের একমাত্র উপায় হলো চারজন ব্যক্তি স্বচক্ষে ধর্ষণের ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন—এমন সাক্ষ্য প্রদান করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ধারণা ইসলামী শরীয়ত সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা ইচ্ছাকৃত অপপ্রচারের ফল। কারণ ইসলামী ফিকহে ধর্ষণ (اغتصاب) এবং ব্যভিচার (زنا) এক বিষয় নয়; বরং ধর্ষণ একটি স্বতন্ত্র অপরাধ, যার প্রমাণ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কেও ফকীহগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, চারজন সাক্ষীর শর্তটি ব্যভিচারের (যিনা) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে ইসলামী আইনবিদগণ বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ গ্রহণ করেছেন। যেমন—
- ভুক্তভোগীর অভিযোগ ও তার সমর্থনে বিদ্যমান পারিপার্শ্বিক আলামত (قرائن)।
- দুইজন সাক্ষীর সাক্ষ্য।
- অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি।
- চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রমাণ।
- ঘটনাস্থলের আলামত ও পরিস্থিতিগত প্রমাণ।
- বিচারকের নিকট অপরাধ প্রমাণকারী অন্যান্য গ্রহণযোগ্য দলিল-প্রমাণ।
এ কারণে ইসলামী শরীয়তে ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষীকে একমাত্র ও বাধ্যতামূলক শর্ত বলা সম্পূর্ণ ভুল এবং ইসলামী আইন সম্পর্কে একটি মারাত্মক বিভ্রান্তি। এখন আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো, ইসলামী শরীয়তে ধর্ষণ প্রমাণের বৈধ পদ্ধতিগুলো কী, ফকীহগণ এ বিষয়ে কী বলেছেন এবং চারজন সাক্ষীর দাবি কতটুকু সত্য।
ধর্ষণ (اغتصاب) অপরাধ নিম্নোক্ত উপায়ে প্রমাণিত হতে পারে:
প্রথমত: সাক্ষ্য (الشهادة)
সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে সেই বিস্তারিত বর্ণনা শর্ত হিসেবে প্রয়োজন, যা যিনার অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রেও উল্লেখ করা হয়।
সুতরাং সাক্ষীদেরকে বলতে হবে, কোন নারীর সাথে যিনা সংঘটিত হয়েছে; কারণ এমনও হতে পারে যে ওই নারীর ওপর হদ (শাস্তি) প্রযোজ্য না হয়। একইভাবে যিনা সংঘটনের পদ্ধতিও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে হবে; কারণ সম্ভাবনা থাকতে পারে যে সহবাসটি প্রকৃত যৌনমিলন (ফরজে প্রবেশ) ছাড়া অন্য কোনো রকমের ছিল।
তাই সাক্ষীরা বলবে: – “আমরা দেখেছি, সে তার লিঙ্গ অথবা অন্তত খতনার স্থান (حشفة) পর্যন্ত অমুক নারীর যৌনাঙ্গে যিনার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করিয়েছে। উভয়ের সম্মতিতে অথবা একজন অন্যজনকে জোরপূর্বক বাধ্য করে এটি করেছে।” – এভাবে বিস্তারিত বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো—এটি জবরদস্তিমূলক ধর্ষণ (اغتصاب) ছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়া।
ইবনু নুজাইম (রহ.) আল-বাহরুর রায়িক গ্রন্থে বলেন:
قَوْلُهُ: فَسَأَلَهُمُ الْإِمَامُ عَنْ مَاهِيَّتِهِ وَكَيْفِيَّتِهِ وَمَكَانِهِ وَزَمَانِهِ وَالْمَزْنِيِّ بِهَا
“অর্থাৎ বিচারক সাক্ষীদেরকে ঘটনাটির প্রকৃতি, পদ্ধতি, স্থান, সময় এবং যার সাথে যিনা সংঘটিত হয়েছে—এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন।”
এরপর তিনি বলেন:
وَالْكَيْفِيَّةُ هِيَ: الطَّوَاعِيَّةُ وَالْكَرَاهِيَّةُ
“আর ‘পদ্ধতি’ বলতে বোঝানো হয়েছে—এটি পারস্পরিক সম্মতিতে হয়েছে, নাকি জবরদস্তি ও অনিচ্ছার মাধ্যমে হয়েছে।”
অর্থাৎ, অপরাধটি ধর্ষণ ছিল নাকি উভয়ের সম্মতিক্রমে সংঘটিত যিনা ছিল—তা নির্ধারণের জন্য সাক্ষীদের কাছ থেকে এ বিষয়েও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
যদি যিনার ক্ষেত্রে জবরদস্তি ও ধর্ষণ (اغتصاب) প্রমাণিত হয়, তবে: যিনার অপরাধ প্রমাণের জন্য যেমন চারজন সাক্ষীর শর্ত রয়েছে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে তা আবশ্যক নয়। বরং এখানে দুজন সাক্ষী থাকাই যথেষ্ট। কারণ এ ধরনের অপরাধকে অনেক ফকীহ হিরাবাহ (حرابة) তথা সন্ত্রাসী ও সমাজবিধ্বংসী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, ধর্ষককে সর্বোচ্চ ও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা, কারণ ধর্ষন অনেক ভয়ংকর অপরাধ, এতে নারীর ও তার পরিবারিবারিক জীবনে ও তাদের মানুষিক দিকে অনেক প্রভাব পড়ে।[5]বিস্তারিত দেখুন : আল-সারখাসি, আল-মাবসুত (৯/২০১), ইবনু আবিদীনের হাশিয়ায় (৪/১১৩) হাশিয়াতুদ দাসূকীতে (৪/৩৫১), আসনা আল-মাতালিব, যাকারিয়া আল-আনসারী (৪/১৫৮),আল-মুগনী (৯/১৫৭), আততাশরীয়ুল জিনাইয়্যুল ইসলামী (২/৩৭৯-৩৮৫), আল-হুকম ফি’ল-সাতওয়াল-ইখতিতাফ ওয়া মুশকিরাত, (পৃ. ১০৪-১৯২)।
এখানে অনেকেই বলবে যে ধর্ষণের ক্ষেত্রে চার জন বা দুজন সাক্ষি কিভাবে পাওয়া যাবে? কেউ কি সাক্ষি রেখে ধর্ষণ করবে? অথবা ধর্ষণ হতে দেখে কেউকি চুপচাপ দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখবে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য? আটকাবে না? তাদের জন্য কিছু উদাহরণ:
উদাহরণ : ১
ধরুন একটা গ্রামে একটি ঘরে একজন নারী একাই থাকে। একজন লোক হঠাৎ করে ওই নারীর ঘরে ঠুকে তাকে ধর্ষণ করছিলো। এমতবস্থায় নারীটি চিৎকার করে এবং তার আশপাশের লোকজন জর হয়ে দেখতে পায় ওই লোকটি নারীটিকে ধর্ষণ করছে। তার পর ওই লোকজন মিলে নরীটিকে উদ্ধার করে।
এবার বলুন এক্ষেত্রে কি সাক্ষী পাওয়া কষ্টকর কিছু?
দ্বিতীয় বিষয়: স্বীকারোক্তি (الإقرار):
স্বীকারোক্তির ক্ষেত্রে শর্ত হলো, তা সাক্ষ্যের ন্যায় বিস্তারিত হতে হবে। আর একবার স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট বলে গণ্য হবে। মালিকী, শাফিঈ ও হাম্বলী মাযহাবের একটি বর্ণনা অনুযায়ী এ মত গ্রহণ করা হয়েছে। এর দলিল হলো নবী (ﷺ)-এর মায়িয (রাঃ) ও গামিদিয়া নারীর ঘটনার ক্ষেত্রে গৃহীত পদ্ধতি।
মাইয ইবনু মালিক নবী (ﷺ) এর নিকট এসে বলল,
হে আল্লাহর রসূল! আমাকে পবিত্র করুন। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমার দুর্ভাগ্য। তুমি প্রত্যাবর্তন কর এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তওবা কর। বর্ণনাকারী বলেন যে, লোকটি অল্প দূর চলে গিয়ে আবার ফিরে এলো। এরপর বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে পবিত্র করুন। বর্ণনাকারী বলেন যে, লোকটি অল্পদূর গিয়ে আবার ফিরে আসলো এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমার দুর্ভাগ্য। তুমি প্রত্যাবর্তন কর এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তওবা কর। তখন নবী (ﷺ) পূর্বের মতই কথা বললেন, যখন চতুর্থবার মাইয একই কথা বলল, আমাকে পবিত্র করুন হে আল্লাহর রসূল! রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেন, কোন বিষয়ে আমি তোমাকে পবিত্র করবো? তখন সে বলল, যিনার পাপ হতে।[6]মুসলিম, ৪৩২৩
অনুরূপভাবে, বোবা ব্যক্তির এমন ইঙ্গিতও স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হবে, যা তার উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়। এ মতটি জমহুর (অধিকাংশ) ফকীহের; তবে হানাফীগণ এ ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে বিস্তারিত দেখুন:-
ইবনু হাযম রচিত মারাতিবুল ইজমাʿ — পৃষ্ঠা ১২৯ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
ইবনু হাযম রচিত আল-মুহাল্লা — ১২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৭ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
ইবনু নুজাইম রচিত আল-বাহরুর রায়িক — ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৫ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
ইবনু আবিদীন-এর হাশিয়া — ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
আল-হাত্তাব রচিত মাওয়াহিবুল জলীল — ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৪ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
আদ-দাসূকী-এর হাশিয়া — ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৮ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
আল-হাইতামী রচিত তুহফাতুল মুহতাজ — ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১২ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
আল-খতীব আশ-শিরবীনী রচিত মুগনিল মুহতাজ — ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫১ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
আল-মারদাওয়ী রচিত আল-ইনসাফ — ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৮ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
আল-বুহূতী রচিত কাশ্শাফুল কিনাʿ — ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৮৬ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
তৃতীয় বিষয়: পারিপার্শ্বিক প্রমাণ (قرائن):
ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী উপস্থিত থাকে না। আবার ধর্ষকও তার অপরাধ স্বীকার করে না, কারণ সে তার জন্য নির্ধারিত শাস্তির ভয়ে থাকে। এমন অবস্থায় এই অপরাধ প্রমাণে পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের (قرائن) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আসে।
এ ক্ষেত্রে ফরেনসিক মেডিসিন (মেডিকেল-লিগ্যাল) বিশেষজ্ঞগণ এবং সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা তাদের দক্ষতার মাধ্যমে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না তা নির্ধারণ করতে পারেন। তারা এমন সব আলামত ও প্রমাণ পরীক্ষা করেন, যার মাধ্যমে যৌন সংসর্গটি ধর্ষণের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে নাকি স্বেচ্ছায় হয়েছে, তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
ইমাম ইবন ফারহূন (রহ.) তাঁর تبصرة الحكام في أصول الأقضية গ্রন্থে বলেন:
“على الناظر أن يلحظ الأمارات والعلامات إذا تعارضت فَمَا تَرَجَّحَ مِنْها قضى بِجَانِبِ التَّرْجِيحِ وَهُوَ قُوَّةُ النهمة ولا خلاف في الحكم بِهَا وَقَدْ جَاءَ الْعَمَلُ فِي مَسَائِلِ اتَّفَقَتْ عَلَيْهَا الطَّوائف الأربعة،
“বিচারকের জন্য আবশ্যক হলো, যখন বিভিন্ন আলামত ও লক্ষণ পরস্পরের বিরোধী হয়, তখন তিনি সেগুলোর প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করবেন। যে আলামত অধিক শক্তিশালী ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত হবে, সে অনুযায়ী তিনি ফয়সালা করবেন। আলামতের ভিত্তিতে বিচার করার ব্যাপারে মতভেদ নেই। বরং চার মাযহাবই এমন বহু মাসআলায় এর উপর আমল করেছে।[7]ইবন ফারহূন আল-ইয়ামুরী, তাবসিরাতুল হুক্কাম ফী উসূলিল আক্বদিয়া, আল-আজহারিয়্যাহ কলেজ লাইব্রেরি, ১৫তম সংস্করণ, ১৪০৬ হিজরি / ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১।
ইমাম ইবন ফারহূন (রহ.) تبصرة الحكام গ্রন্থে আরও বলেন:
“دعوى المرأة الاستكراه في الزنا وهي متعلقة بالمدعى عَلَيْهِ، أو بها أثر أو أَمَارَةً كَالصِّيَاحَ وَشَبَهِ ذَلِكَ، فإن ذلك قرينة يُدْرَأُ عَنْهَا الْحَدُ لأَجْلِهَا
“যদি কোনো নারী জিনার ব্যাপারে জবরদস্তির (ধর্ষণের) দাবি করে এবং সে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরে থাকে, অথবা তার শরীরে কোনো চিহ্ন বা আলামত বিদ্যমান থাকে—যেমন চিৎকার-চেঁচামেচি করা কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো লক্ষণ—তাহলে এগুলো এমন একটি শক্তিশালী قرينة (পারিপার্শ্বিক প্রমাণ), যার কারণে তার ওপর হদের শাস্তি রহিত করা হবে।” (অর্থাৎ ওই নারীকে মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং পুরুষকে শাস্তির আলতাভুক্ত করা হবে )[8]تبصرة الحكام لابن فرحون ٢ / ١٢٤.
ইমাম ইবন আবদিল বার (রহ.) الاستذكار গ্রন্থে বলেন,
إِذا وُجِدَتِ الْمَرْأَةُ حَامِلا فقالت تزوجت أو استكرفت لم يقبل ذلك منها إلا بالبيِّنَةِ عَلَى مَا ذكرت إِلَّا أَن تكون جَاءَتْ تَسْتَغِيثُ وهي تدمى أو نحو ذلك من فضيحة نفسها الاستذكار لابن عبد البر ٧ / ٠٤٨٦
“যদি কোনো নারীকে গর্ভবতী অবস্থায় পাওয়া যায় এবং সে দাবি করে যে তার বিবাহ হয়েছে অথবা তাকে জোরপূর্বক ভোগ করা হয়েছে (ধর্ষণ করা হয়েছে), তাহলে তার দাবির পক্ষে প্রমাণ (বাইয়্যিনা) না থাকলে তার কথা গ্রহণ করা হবে না। তবে যদি সে এমন অবস্থায় আসে যে সাহায্য প্রার্থনা করছে এবং রক্তাক্ত অবস্থায় রয়েছে, অথবা নিজের নির্দোষিতার পক্ষে অনুরূপ কোনো প্রকাশ্য আলামত থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা।”[9]ইবনু আবদিল বার, আল-ইস্তিযকার, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৬
সার কথা : এটি ইসলামী ফিকহে নতুন কোনো বিষয় নয়। ফকীহগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ধর্ষণের ঘটনা যে কোনো আলামত, পরিবেশগত প্রমাণ বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণ (قرينة) দ্বারা প্রমাণিত হতে পারে, যাতে অভিযোগকারীর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হয়।
তাঁরা এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন:
কোনো নারী যদি কুমারী হয় এবং তার সতীচ্ছদ (হাইমেন) ছিঁড়ে যাওয়ার ফলে রক্তাক্ত অবস্থায় আসে; অথবা সে যদি চিৎকার-চেঁচামেচি করে সাহায্য প্রার্থনা করে, যাতে লোকজন একত্রিত হয়ে অপরাধীকে ধরতে পারে; অথবা এ ধরনের অন্য কোনো সুস্পষ্ট আলামত প্রকাশ পায়। তাহলে ওই ব্যক্তির উপর কোন সাক্ষী ছাড়াই শাস্তি প্রয়োগ করা যাবে।
একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, ইসলামী আইনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমেও সহবাস হয়েছে বলে সাব্যস্ত হ’তে পারে। কিন্তু শতভাগ সন্দেহমুক্ত নয় বলে শুধু মাত্র এটির ভিত্তিতে ধর্ষণের চুরান্ত শাস্তি বা ‘হদ’ আরোপিত হবে না; কেননা সন্দেহের অবস্থায় ‘হদ’ প্রযোজ্য নয়। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে সবসময় অপরাধ সাব্যস্তও হয় না।
কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়:-
১. জোর করে লিঙ্গ প্রবেশ করিয়েছে, বীর্যপাত করতে পারেনি। ডিএনএ টেস্টে কি আসবে?
২. ভিকটিমের গোপনাঙ্গ প্রচুর পানি ঢেলে ধুয়ে ফেললে ডিএনএ টেস্টে তেমন কিছু পাওয়া যায় না।
৩. ধরা যাক, বীর্য পাওয়া গেল। টেস্টে কার বীর্য সেটাও পাওয়া গেল। এতেও জবরদস্তি প্রমাণিত হয় না। সম্মতি বা জবরদস্তি পার্থক্য ডিএনএ টেস্ট ইটসেলফ যথেষ্ট না।
৪. ডিএনএ টেস্ট দিয়ে সর্বোচ্চ বুঝতে পারা যায় যে তার স্পার্ম মেয়ের সেখানে আছে। কিন্তু এর মাধ্যমে বোঝা সম্ভব না যে মেয়ে স্বেচ্ছায় ব্যভিচার করেছে, নাকি ধর্ষন হয়েছে, নাকি মেয়ে স্পার্ম ব্যাংক থেকে স্পার্ম কিনে ইউজ করেছে, এসব।
সুতরাং ডিএনএ টেস্ট একটা সাপোর্টিভ প্রমাণ। কনফার্মেটরি না। ফাইনাল না। আরও অনেক কিছু ডট কানেক্ট করতে হয়। ডিএনএ টেস্ট অনেক ডটের মধ্যে একটা ডট। তাই কোন আইনেই শুধুমাত্র ডিএনএ টেস্টের ভিত্তিতেই চুরান্ত ফয়সালা দেওয়া হয় না, যেটি হয়তো ইসলামের বিধান নিয়ে অভিযোগ করা লোকজন নিজেরাও জানে না।
ধর্ষণ অপরাধের শাস্তি
“ধর্ষণ অপরাধের ক্ষেত্রে ফকীহগণ (ইসলামী আইনবিদরা) ভুক্তভোগী (যার উপর জোরপূর্বক ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে) এবং অপরাধী (যে ধর্ষণ করেছে)—এই দুই পক্ষের বিধান ও শাস্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন, নিম্নরূপঃ
প্রথমত: যার উপর ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে (ভুক্তভোগী / মজনি আলাইহি/ ধর্ষিতা)-এর বিধান
ধর্ষণের ঘটনা হয়তো কোনো নারীর উপর সংঘটিত হতে পারে, অথবা কোনো পুরুষের উপর।
“যদি যার উপর ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে সে নারী হয়: তাহলে অধিকাংশ ফকীহ এ বিষয়ে একমত যে, জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার নারীর উপর কোনো হদ (শরঈ নির্ধারিত শাস্তি) প্রযোজ্য হবে না—যদি তার ওপর জোর-জবরদস্তির (ইস্তিকরাহ) সুস্পষ্ট আলামত/প্রমাণ পাওয়া যায়। এ অবস্থায় জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য হওয়া নারীর ক্ষেত্রে হদ রহিত হয়ে যায়, তা সম্পূর্ণ জবরদস্তি হোক বা আংশিক; কারণ এতে তার ইচ্ছা ও সম্মতি বিদ্যমান থাকে না।
এ বক্তব্যের পিছনে দলিলসমূহ
ইসলামি শরীয়া অনুসারে যদি কোনো পুরুষ কোনো নারীকে ধর্ষণ করে তাহলে ওই নারীর উপর কোনো শাস্তি প্রয়োগ কারা হবে না। কেননা ওই নারীর উপর জুলুম করা হয়েছে।
কুরআনুল কারীম থেকে দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
اللّٰهِۚ فَمَنِ اضۡطُرَّ غَيۡرَ بَاغٍ وَّلَا عَادٍ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَيۡهِؕ اِنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ رَّحِيۡمٌ
যে নিরূপায় অথচ নাফরমান এবং সীমালংঘনকারী নয় তার কোন পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [10]সূরা বাকারা, আয়াত ১৭৩
وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا لِتَبْتَغُوا عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَن يُكْرِهْهُنَّ فَإِنَّ اللَّهَ مِنْ بَعْدِ إِكْرَاهِهِنَّ غَفُورٌ رَحِيمٌ
“তোমরা তোমাদের দাসীদেরকে দুনিয়ার জীবনের সামান্য স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে ব্যভিচারে বাধ্য করো না—যদি তারা পবিত্র থাকতে চায়। আর যে ব্যক্তি তাদেরকে অর্থাৎ নারীদেরকে (এ কাজে) বাধ্য করবে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে (অর্থাৎ নারীদের ) বাধ্য করার পর ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [11]সূরা আন-নূর: ৩৩
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় শাওকানী (রহ.) তাফসীর ফাতহুল কাদীরে বলেন:
وَمَنْ يُكْرِهْهُنَّ فَإِنَّ اللَّهَ مِنْ بَعْدِ إِكْرَاهِهِنَّ غَفُورٌ رَحِيمٌ هَذَا مُقَرِّرٌ لِمَا قَبْلَهُ وَمُؤَكَّدٌ لَهُ، وَالْمَعْنَى : أَنَّ عُقُوبَةَ الْإِكْرَاهِ رَاجِعَةً إِلَى الْمُكْرِهِينَ لَا إِلَى الْمُكْرَهَاتِ، كَمَا تَدُلُّ عَلَيْهِ قِرَاءَةُ ابْنِ مَسْعُودٍ وَجَابِرُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ وَسَعِيدُ بْنُ جبير : فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ لَهُنَّ قِيلَ: وَفِي هَذَا التَّفْسِيرِ بُعْد، لِأَنَّ الْمُكْرَهَةَ عَلَى الزِّنَا غَيْرُ آثِمَةٍ
এই পবিত্র আয়াতে আল্লাহ তাআলা জবরদস্তি করে ব্যভিচারে বাধ্য করা নারীর ওপর থেকে গুনাহ ও জবাবদিহি তুলে নিয়েছেন। ফলে বোঝা যায় যে, বাধ্যকৃত নারীর ওপর শরয়ী শাস্তি (হদ) প্রযোজ্য নয়।[12]তাফসীর ফাতহুল কাদীরে ৪/৩৫
হাদিসে নববী থেকে দলিল
এ বিষয় কিছু হাদিস দেখে নেয়া যাক
عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ امْرَأَةً خَرَجَتْ عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تُرِيدُ الصَّلَاةَ، فَتَلَقَّاهَا رَجُلٌ، فَتَجَلَّلَهَا، فَقَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا، فَصَاحَتْ، وَانْطَلَقَ، فَمَرَّ عَلَيْهَا رَجُلٌ، فَقَالَتْ: إِنَّ ذَاكَ فَعَلَ بِي كَذَا وَكَذَا، وَمَرَّتْ عِصَابَةٌ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ، فَقَالَتْ: إِنَّ ذَلِكَ الرَّجُلَ فَعَلَ بِي كَذَا وَكَذَا، فَانْطَلَقُوا، فَأَخَذُوا الرَّجُلَ الَّذِي ظَنَّتْ أَنَّهُ وَقَعَ عَلَيْهَا، فَأَتَوْهَا بِهِ، فَقَالَتْ: نَعَمْ هُوَ هَذَا، فَأَتَوْا بِهِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمَّا أَمَرَ بِهِ قَامَ صَاحِبُهَا الَّذِي وَقَعَ عَلَيْهَا، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَنَا صَاحِبُهَا، فَقَالَ لَهَا اذْهَبِي فَقَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَكِ وَقَالَ لِلرَّجُلِ قَوْلًا حَسَنًا، قَالَ أَبُو دَاوُدَ: يَعْنِي الرَّجُلَ الْمَأْخُوذَ، وَقَالَ لِلرَّجُلِ الَّذِي وَقَعَ عَلَيْهَا: ارْجُمُوهُ، فَقَالَ: لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ تَابَهَا أَهْلُ الْمَدِينَةِ لَقُبِلَ مِنْهُمْ قَالَ أَبُو دَاوُدَ: رَوَاهُ أَسْبَاطُ بْنُ نَصْرٍ، أَيْضًا عَنْ سِمَاكٍ
আলকামাহ ইবনু ওয়াইল (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী (ﷺ)-এর যুগে জনৈকা মহিলা সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে এক ব্যক্তি তাকে নাগালে পেয়ে তার উপর চেপে বসে তাকে ধর্ষণ করে। সে চিৎকার দিলে লোকটি সরে পড়ে। এ সময় অপর এক ব্যক্তি তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে (ভুলবশত) বললো, এ লোকটি আমার সঙ্গে এরূপ এরূপ করেছে। এ সময় মুহাজিরদের একটি দল এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। স্ত্রীলোকটি বললো, এ লোকটি অমার সঙ্গে এরূপ করেছে। অতএব যার সম্পর্কে মহিলাটি অভিযোগ করেছে তারা দ্রুত এগিয়ে লোকটিকে ধরলো।
অতঃপর তারা তাকে তার নিকট নিয়ে আসলে সে বললো, হ্যাঁ, এ সেই ব্যক্তি। তারা তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হলেন। তিনি তার সম্পর্কে ফায়সালা করতেই আসল অপরাধী দাঁড়িয়ে বললো, হে আল্লাহ রাসূল! আমিই অপরাধী। তিনি ধর্ষিতা মহিলাটিকে বললেনঃ তুমি চলে যাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন আর নির্দোষ ব্যক্তি সম্পর্কে উত্তম কথা বললেন। যে ধর্ষনের অপরাধী তার ব্যাপারে তিনি বললেনঃ তোমরা একে পাথর মারো। তিনি (ﷺ) বললেনঃ সে এমন তওবা করেছে যে, মদীনাবাসী যদি এরূফ তওবা করে, তবে তাদের পক্ষ থেকে তা অবশ্যই কবূল হবে।[13]আবু দাউদ : ৪৩৭৯
এই হাদিসের ব্যাখায় মেশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থের মিরকাত প্রণেতা বলেন
دل فعل النبي – مع هذه المرأة على عدم إقامة الحد على المرأة
নবী (ﷺ)-এর এই ঘটনার থেকে বোঝা যায় যে, যদি কোনো নারী জোরপূর্বক (مُكْرَهَة) ব্যভিচারে বাধ্য হয় এবং তার পক্ষে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তার ওপর শরীয়তের দণ্ড (হদ) আরোপ করা হবে না।[14]مرقاة المفاتيح للملا الهروي ٢٣٤٥/٦
এ কথাকে আরও শক্তিশালী করে সেই হাদীস, যেখানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যেসব কাজে তাদেরকে জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়—তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।”[15]ইবনে মাজাহ:২০৪৩
চলুন এ ব্যাপারে আরো একটি হাদিস দেখে নেই আমরা,
عَنِ ابْنِ الْمُسَيِّبِ، أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ، أُتِيَ بِامْرَأَةٍ لَقِيهَا رَاعٍ بِفَلَاةٍ مِنَ الْأَرْ وَهِيَ عَطْشَى، فَاسْتَسْقَتْهُ، فَأَبَى أَنْ يَسْقِيَهَا إِلَّا أَنْ تَتْرُكَهُ فَيَقَعَ بِهَا، فَنَاشَدَتْهُ بِاللَّهِ فَأَبَى، فَلَمَّا بَلَغَتْ جَهْدَهَا أَمْكَنَتْهُ، فَدَرَأَ عَنْهَا عُمَرُ الْحَدَّ بِالضَّرُورَةِ ”
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কাছে এক নারীকে আনা হয়। সে জনমানবহীন প্রান্তরে এক রাখালের মুখোমুখি হয়েছিল। সে ছিল প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত। তাই সে রাখালের কাছে পানি চাইল। কিন্তু রাখাল পানি দিতে অস্বীকার করল, যতক্ষণ না সে তাকে সুযোগ দেয় যে সে তার সঙ্গে সহবাস করবে।
নারীটি আল্লাহর দোহাই দিয়ে তাকে অনুরোধ করল, কিন্তু সে তবুও অস্বীকার করল। অবশেষে যখন তার অবস্থা চরম সংকটপূর্ণ হয়ে উঠল (অর্থাৎ তৃষ্ণায় প্রাণনাশের উপক্রম হলো), তখন সে বাধ্য হয়ে তাকে সুযোগ দিল।
এরপর ওমর (রা.) জরুরি অবস্থা (দারুরাহ)-এর কারণে তার ওপর থেকে হদ্দ শাস্তি প্রত্যাহার করেন।[16]“মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক (৭/৪০৭, আল-আয’যামী কর্তৃক সম্পাদিত/তাহকীককৃত সংস্করণ)”
এ হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট ভাবে প্রমানিত হয় যে, যদি কোন নারী বিপদাগ্রস্ত হয়ে নিরুপায় অবস্থায় কোনো পুরুষের সাথে নিজের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বা কারো জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় তাহলেও ওই নারীর কোনো শাস্তি পতিত হবে না।
এ বিষয় আরেকটি হাদিস লক্ষ্য করুন
عن أبي موسَى الأشعَرِيِّ قال: أُتِيَ عُمَرُ بن الخطابِ رضي الله عنه بامرأةٍ مِن أهلِ اليَمَنِ قالوا: بَغَت. قالَتضِ: إنِّي كُنتُ نائمَةً فلَم أستَيقِظْ إلا برَجُلٍ رَمَى فيَّ مِثلَ الشِّهابِ. فقالَ عُمَرُ رضي الله عنه: يَمانيَةٌ نَئومَةٌ شابَّةٌ. فخَلَّى عَنها ومَتَّعَها(3).
আবু মূসা আল-আশআরী (রা.) বর্ণনা করেন:
ইয়েমেনের এক নারীকে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কাছে আনা হলো। লোকেরা বলল, “সে ব্যভিচার করেছে।”
নারীটি বলল, “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ জেগে দেখি, একজন লোক আমার মধ্যে উল্কার মতো কিছু নিক্ষেপ করেছে (অর্থাৎ আমার সঙ্গে সহবাস করেছে)।”তখন উমর (রা.) বললেন, “সে একজন ইয়েমেনি নারী, ঘুমপ্রবণ এবং তরুণী।”
অতঃপর তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন (কোনো শাস্তি দিলেন না) এবং তাকে কিছু উপহার বা আর্থিক সহায়তা দিলেন।[17]“আস-সুনানুল কাবীর (ইমাম বাইহাকী) ১৭/২২৮, তুর্কী (তাহকীক/সম্পাদনা).
ধর্ষীতার আত্মরক্ষা
ধর্ষীতা নারী শুধুমাত্র নিরপরাধ হিসেবেই গণ্য হন না, বরং উনার নিজের সম্ভ্রম রক্ষার চেষ্টা করাও উনার উপর ওয়াজিব। এমনকি এটি করতে গিয়ে যদি ধর্ষক ধর্ষীতার হাতে নিহত হয় তাহলে ধর্ষীতা এই ক্ষেত্রে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন না।
আব্দুর রাজ্জাক বর্ণনা করেন:
উবায়দ ইবন উমাইর বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি হুদায়ল গোত্রের কিছু লোককে আমন্ত্রণ জানায়। তারা একটি দাসী মহিলাকে কিছু জ্বালানি কাঠ আনতে পাঠিয়েছিল এবং নিমন্ত্রক তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, তাই সে (জঙ্গলে) তার অনুসরণ করেছিল এবং তার সাথে তার পথ পেতে চেয়েছিল (অর্থাৎ তাকে অবৈধভাবে পেতে চেয়েছিল) কিন্তু সে (দাসীটি) অস্বীকার করেছিল। সে (দাসীটি) তার সাথে কিছুক্ষণ লড়াই করে, যতক্ষণ না সে তার কাছ থেকে পালিয়ে যায় এবং তার দিকে একটি ঢিল ছুড়ে তাকে হত্যা করে। তার মালিক উমারের কাছে গিয়ে তাকে পরিস্থিতির কথা জানালেন। ‘উমার তদন্তকারীদের পাঠিয়েছিলেন যারা তাদের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছিল এবং তারপরে ‘উমার বললেন, “আল্লাহর দ্বারা নিহত ব্যক্তির জন্য কোন দিয়াহ (বা কিসাস – রক্তপণ বা ইত্যাদির ক্ষেত্রে কাফফারা) প্রদান করা হবে না।”
তিনি আত্মরক্ষাকে একটি বৈধ কারণ হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন যে, দাস মেয়েটি সেই হানাদারের রক্তপাত করেছিল যে তাকে ধর্ষণ করতে চেয়েছিল তাই এর কোনো কিসাস বা দিয়াহ হবে না এবং কোনো কাফফারা দেওয়া হবে না [কারণ সে আত্মরক্ষার জন্য তাকে হত্যা করেছিল] ইমাম যুহরি আরও মন্তব্য করেছেন যে, পরবর্তীতে উমারের রায়ের অনুসরণে সমস্ত মুসলিম বিচারক অনুরূপ দৃষ্টান্তে একই রকম রায় দিয়েছিলেন।[18]মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, ৯/৪৩৪ হা: ১৭৯১৯; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ ৫/৪৩৯ হা: ২৭৭৯৩ ইত্যাদি। আলেমগণ আত্মরক্ষার অধীনে এর উপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছেন যেমনটা ইমাম মাওয়ার্দী রহ. রচিত শাফেয়ী মাযহাবের হাউইউল কাবীরে ১৩/৪৫১ বর্ণিত হয়েছে
আল-বাগাভী (রহ) বলেছেন:
যদি কোন পুরুষ জোরপূর্বক কোন মহিলার সাথে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে এবং সে (মহিলাটি) তাকে তার থেকে বাধা দেয় এবং তাকে হত্যা করে তাহলে তার উপর কিছুই (অর্থাৎ কোন পাপ বা কিসাস) নেই। উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি একজন মহিলাকে [ধর্ষণ করতে] চেয়েছিল, তাই সে (মহিলাটি) তাকে একটি ঢিল ছুড়ে মেরে ফেলে। এতে ‘উমার বললেন, ‘আল্লাহ তাকে হত্যা করেছেন, আল্লাহর কসম, তার জন্য কোন দিয়াহ নেই’ অর্থাৎ, তাকে তার জন্য ‘রক্তপন’ দিতে হবে না… এটি ইমাম শাফেয়ী থেকেও বর্ণিত হয়েছে।[19]শারহুস সুন্নাহ: ১০/২৫২
মোল্লা আলী আল ক্বারী হানাফীও একইভাবে উল্লেখ করেছেন।[20]মিরকাত আল মাফাতিহ: ৩৫১১ ইবনে কুদামাহ আল-হাম্বলী উল্লেখ করেছেন,
একজন মহিলা সম্পর্কে যাকে একজন পুরুষ তাড়া করেছিল এবং সে নিজেকে রক্ষা করার জন্য তাকে হত্যা করে, আহমাদ বলেন: ‘যদি সে জানে যে, সে তাকে [ধর্ষণ] করতে চায় এবং সে নিজেকে রক্ষা করার জন্য তাকে হত্যা করে, তাহলে এতে তার দোষ নেই।’ ইমাম আহমাদ সেই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন যা আল-যুহরি আল-কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ থেকে, উবায়দ ইবনে উমায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে একজন ব্যক্তির [হুদাইল গোত্রের] দর্শনার্থী ছিল এবং সে একজন মহিলাকে [ধর্ষণ করতে] চেয়েছিল, তাই সে তার দিকে ঢিল ছুড়ে তাকে হত্যা করে। ‘উমার বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তার জন্য কোন দিয়াহ নেই’ অর্থাৎ তাকে তার জন্য ‘রক্তপণ’ দিতে হয়নি। যদি নিজের সম্পদ রক্ষা করা জায়েয হয়, যা কেউ দিতে পারে, তবে একজন মহিলার নিজেকে রক্ষা করা এবং তার সম্মান রক্ষা করা যা দান করা যায় না – একজন পুরুষের তার সম্পদ রক্ষা করার চেয়ে স্পষ্টতই বেশি জায়েজ। যদি এটি স্পষ্ট হয়, তবে সে যদি পারে তবে নিজেকে রক্ষা করতে বাধ্য, কারণ কাউকে তার উপর [তাকে ধর্ষণ] করতে দেওয়া হারাম, এবং নিজেকে রক্ষা না করে সে তাকে তার উপর কর্তৃত্ব করতে দেয়।”[21]আল-মুগনি: ৮/৩৩১
দ্বিতীয়তঃ যদি যার ওপর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সে পুরুষ হয়
তাহলে ফকীহগণ তার উপর হদ (শরয়ী দণ্ড) কায়েম করার বিধান সম্পর্কে তিনটি মত দিয়েছেন, যা নিম্নরূপ:
প্রথম মত: যদি কোনো পুরুষকে জোরপূর্বক যিনা করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তার উপর হদ প্রযোজ্য হবে না।
এই মতের দিকে গিয়েছেন—
হানাফি মাযহাব (তাদের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত অনুযায়ী), মালিকি মাযহাবের নির্বাচিত মত, শাফিঈ মাযহাবের অধিক প্রসিদ্ধ (আযহার) মত, হাম্বলি মাযহাবের একটি বর্ণনা, এবং জাহিরী মতাবলম্বীরা।[22]بدائع الصنائع للكاساني / ۱۸۰، حاشية ابن عابدين ۲۹٤، شرح الخرشي على مختصر خليل طيار الفكر للطباعة – بيروت بدون ۸۰/۸، حاشية الدسوقي ۳۱۸، أسنى المطالب الزكريا الأنصاري ۱۲٧/٤، مغني المحتاج للخطيب الشربيني ٤٤٤/٥ المبدع لابن مفلح ٣٩٠/٧ وما بعدها، الإنصاف للمرادي ۱۰ ۱۸۲، المحلى لابن حزم ٢٠٤/٧
কারণ হিসেবে তারা বলেন, নবী (ﷺ)-এর হাদীস: “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, ভুলে যাওয়া এবং যেগুলোর জন্য তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে—তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।”[23]ইবনে মাজাহ: ২০৪৩
এই হাদীসটি নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য না করে উভয়ের ক্ষেত্রেই পাপ ও দায়মুক্তির বিষয়টি প্রযোজ্য করে। যেমনভাবে ইকরাহ (জোর-জবরদস্তি) নারীর ক্ষেত্রে হদ শাস্তি রহিত করে, তেমনিভাবে পুরুষের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে—এতে কোনো পার্থক্য নেই।
তাছাড়া, ইকরাহ (জবরদস্তি) একটি “শুবহা” (সন্দেহ) সৃষ্টি করে, যা হদ শাস্তি বাতিল করে দেয়। কারণ পুরুষের যৌনাঙ্গের উত্তেজনা (ইনতিশার) স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে যেতে পারে—এটি সর্বদা তার সন্তুষ্টি বা সম্মতির প্রমাণ নয়। বরং এটি এমন একটি বিষয় যা আল্লাহ পুরুষের স্বভাবগত প্রকৃতির মধ্যে সৃষ্টি করেছেন, যা ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক ঘটতে পারে—এতে তার কোনো স্বাধীন ইচ্ছা নাও থাকতে পারে।
দ্বিতীয় মত: যদি কোনো পুরুষকে জোরপূর্বক (ইকরাহের মাধ্যমে) ব্যভিচারে বাধ্য করা হয়, তবে তার ওপরও হদ (শরঈ শাস্তি) প্রযোজ্য হবে। মালিকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত, শাফিঈদের এক মত (অপর প্রামাণ্য মতের বিপরীতে), এবং হাম্বলী মাযহাবও এই মত গ্রহণ করেছে।[24]شرح الخرشي على مختصر خليل ۸۰/۸، حاشية الدسوقي ۳۱۸٤، تحفة المحتاج للهيتمي . المكتبة التجارية الكبرى – مصر – ١٣٥٧هـ – ۱۹۸۲م – ١٠٥/٩، مغني المحتاج للخطيب الشربيني ٥ ٤٤٤، المغني لابن قدامة ٦٠ الإنصاف المرادي ۱۰/ ۱۸۲
এর কারণ হলো, সহবাস (যৌন মিলন) বাস্তবায়িত হয় কেবল তখনই যখন কামনা, ইচ্ছা ও স্বেচ্ছাসম্মতির মাধ্যমে পুরুষাঙ্গে স্ফীতি (উত্থান) ঘটে। আর ইকরাহ (জবরদস্তি) এসব বিষয়ের পরিপন্থী। কারণ ভয় ও হত্যা-হুমকির মতো পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে যৌন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় না। তাই যদি এমন অবস্থায়ও তা ঘটে, তবে তা প্রমাণ করে যে সে ব্যক্তি হারাম কাজটিতে স্বেচ্ছায় সম্মতি দিয়েছে; ফলে তার ওপর ব্যভিচারের শাস্তি (হদ) প্রযোজ্য হবে।
তৃতীয় মত: এতে বলা হয়েছে যে, ইকরাহ (জবরদস্তি) যদি শাসক (হাকিম/রাষ্ট্রপ্রধান) কর্তৃক হয় অথবা অন্য কারও পক্ষ থেকে হয়—এই দুই অবস্থার মধ্যে পার্থক্য করা হবে।
যদি শাসকের পক্ষ থেকে জোরপূর্বক জিনা (ব্যভিচার) করানো হয়, তাহলে পুরুষের উপর হদ (শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তি) প্রযোজ্য হবে না। আর যদি শাসক ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে জবরদস্তি করা হয়, তাহলে তার উপর হদ প্রযোজ্য হবে। এই মতটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর দিকে সম্পৃক্ত, যিনি প্রথমে এ মতের বিপরীত মত পোষণ করতেন—অর্থাৎ তিনি আগে বলেছিলেন যে, যেকোনো অবস্থায় পুরুষের উপর হদ ওয়াজিব হবে, পরে তিনি সে মত থেকে ফিরে আসেন। (অবশ্যই উনার দুই প্রধান ছাত্র ইমাম আবূ ইউসুফ ও মুহামাদ (রহ.) উনার পরবর্তী মতেরও সমর্থক নন, তাদের মতে হদ আরোপ হবে না কোন ক্ষেত্রেই।)[25]بدائع الصنائع للكاساني /۷ ۱۸۰ وما بعدها، البحر الرائق لابن نجيم ٥ ٢٠.
এর কারণ হলো, যদি জবরদস্তি শাসকের পক্ষ থেকে হয়, তাহলে তা “পূর্ণ ও বাধ্যতামূলক ইকরাহ” (إكراه ملجئ تام) হিসেবে গণ্য হবে। কারণ শাসকের শক্তির কারণে মজবুর ব্যক্তি অন্য কারও সাহায্য নেওয়া বা প্রতিরোধ করার সুযোগ পায় না; ফলে তার জন্য প্রতিরোধ বা পালানোর কোনো বাস্তব উপায় থাকে না।
অন্যদিকে, যদি জবরদস্তি শাসক ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হয়, তাহলে তা “অসম্পূর্ণ বা আংশিক ইকরাহ” (إكراه غير ملجئ ناقص) হবে। কারণ তখন মজবুর ব্যক্তি অন্যদের সাহায্য নিতে পারে এবং মুসলমানদের সমষ্টির মাধ্যমে প্রতিরোধের সুযোগ থাকে। তাই এ অবস্থায় তার উপর হদ আবশ্যক হয়।
তবে এই মতটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর যুগ ও পরিবেশের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। কারণ তাঁর সময় শাসক ছাড়া অন্য কারও এমন শক্তি ছিল না, যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমানভাবে প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে।[26]جاء في بدائع الصنائع للكاساني ۱۸۰۷
যিনা করতে বাধ্য (ইকরাহ) করা হলে পুরুষের উপর হদ (শরয়ী দণ্ড) প্রয়োগ হবে কি না—এ বিষয়ে ফকীহদের মতামত পর্যালোচনা করার পর প্রতীয়মান হয় যে, প্রথম মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ, যদি কোনো পুরুষকে জোরপূর্বক যিনায় বাধ্য করা হয়, তাহলে তার উপর হদ কার্যকর করা হবে না।
এর কারণ হলো, এ বিষয়ে বিদ্যমান সাধারণ দলিলসমূহ নারী ও পুরুষ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে এবং তাদের মধ্যে হুকুমের ক্ষেত্রে পার্থক্য প্রমাণকারী কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই। সুতরাং যেভাবে জোরপূর্বক যিনায় বাধ্য হওয়া নারীর উপর হদ প্রয়োগ করা হয় না, একইভাবে জোরপূর্বক যিনায় বাধ্য হওয়া পুরুষের উপরও হদ প্রয়োগ করা হবে না।
ইবনু আবিদীন (রহ) তাঁর হাশিয়াহ-তে বলেন:
«وَلَفْظُ الْمُكْرَهِ شَامِلٌ لِلرَّجُلِ وَالْمَرْأَةِ، فَمَنْ ادَّعَى التَّخْصِيصَ فَعَلَيْهِ إِثْبَاتُهُ بِالنَّقْلِ الصَّرِيحِ»
“‘মুকরাহ’ (জোরপূর্বক বাধ্যকৃত ব্যক্তি) শব্দটি নারী ও পুরুষ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। অতএব, যে ব্যক্তি এ সাধারণ বিধানকে কোনো এক পক্ষের জন্য বিশেষায়িত বলে দাবি করবে, তার ওপর সুস্পষ্ট বর্ণনাগত (নকলি) প্রমাণ উপস্থাপন করা আবশ্যক।”[27]حاشية الدسوقي ٤٣٨/٤
ধর্ষণ সংঘটনকারী অপরাধী অর্থাৎ ধর্ষকের বিধান
ধর্ষণ সংঘটনকারী অপরাধীর শাস্তি সম্পর্কে ফকীহগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তবে এ মতভেদ মূলত ঘটনার ধরন ও পরিস্থিতির ভিন্নতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দুটি অবস্থা উল্লেখ করা হয়:
প্রথম অবস্থা: যদি অপহরণ, ভীতি প্রদর্শন, সন্ত্রাস সৃষ্টি, জোরপূর্বক ঘরে প্রবেশ, অস্ত্রের মুখে হুমকি প্রদান, অথবা হত্যা কিংবা অঙ্গহানির ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ সংঘটিত করা হয়, তাহলে এ ধরনের অপরাধীকে হিরাবাহ (ডাকাতি ও সন্ত্রাসমূলক অপরাধ)-এর হদ অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে।
এর দলিল হলো আল্লাহ তাআলার বাণী:
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ۚ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হলো—তাদের হত্যা করা হবে, অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা তাদের বিপরীত দিকের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে, অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা, আর আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”[28]সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩৩
এ ধরনের ধর্ষণ আল্লাহ তাআলার বাণী— وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا – “এবং তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়” এর অন্তর্ভুক্ত।
অতএব, এ ধরনের অপরাধ হিরাবাহ (حرابة)-এর বিধানের আওতাভুক্ত হবে এবং অপরাধী উক্ত আয়াতে নির্ধারিত কঠোর শাস্তির উপযুক্ত বলে গণ্য হবে।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি (রহ) বলেন,
أن يُريد إخافة الطريق بإظهار السَّلَاحِ قَصْدًا لِلْغَلَبَةِ عَلَى الْفُرُوجِ، فَهَذَا أَفْحَشُ الْمُحَارَبَةِ، وَأَقْبَحُ مِنْ أُخْذِ الْأَمْوَالِ وقد دخل فِي مَعْنَى قَوْلِهِ تَعَالَى: وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَساداً .
“কোন ব্যক্তি যদি মানুষের চলাচলের পথে অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে ভীতি সৃষ্টি করে এবং বলপ্রয়োগের উদ্দেশ্যে নারীর সম্ভ্রম (যৌন সতীত্ব) হরণ করতে চায়, তবে এটি হিরাবাহ (সন্ত্রাস ও দস্যুতা)-এর সবচেয়ে জঘন্য ও নিকৃষ্ট রূপ। এটি সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার চেয়েও অধিক নিকৃষ্ট। আর তা আল্লাহ তাআলার এই বাণীর অন্তর্ভুক্ত:
﴿وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا﴾ ‘এবং তারা পৃথিবীতে অনর্থ ও বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য প্রচেষ্টা চালায়।’”(تفسير القرطبي ١٥٦/٦)
ইমাম ইবনুল আরাবী (রহ.) আহকামুল কুরআন-এ বলেন:
الْحِرَابَةَ فِي الْفُرُوجِ أَفْحَشُ مِنْهَا فِي الْأَمْوَالِ، وَأَنَّ النَّاسَ كُلُّهُمْ لَيَرْضَوْنَ أَنْ تَذْهَبَ أَمْوَالُهُمْ وَتُحْرَبَ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَلَا يُحْرَبُ الْمَرْءُ مِنْ زَوْجَتِهِ وَبِئْتِهِ، وَلَوْ كَانَ فَوْقَ مَا قَالَ اللَّهُ عُقُوبَةٌ لَكَانَتْ لِمَنْ يَسْلُبُ الْفُرُوجِ
“সম্ভ্রমহরণ ও যৌনাঙ্গ-সংক্রান্ত হিরাবাহ সম্পদ-সংক্রান্ত হিরাবাহর চেয়েও অধিক জঘন্য। কারণ, মানুষ তার সম্পদ লুট হয়ে যাওয়া বা ধ্বংস হওয়াকে কোনোভাবে সহ্য করতে পারে; কিন্তু তার স্ত্রী, পরিবার ও সম্ভ্রমের ওপর আঘাত আসা সহ্য করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত শাস্তির চেয়েও যদি আরও কঠোর কোনো শাস্তি থাকত, তবে তা সেই ব্যক্তির জন্যই উপযুক্ত হতো, যে মানুষের সম্ভ্রম হরণ করে।”[29]أحكام القرآن لابن العربي ٢/ ٩٥
হারাবাহের শাস্তি: ‘أو’ কি ঐচ্ছিকতা বোঝায়, নাকি অপরাধভেদে শাস্তির তারতম্য?
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মায়িদার ৩৩ নম্বর আয়াতে হারাবাহকারীদের জন্য যে বিভিন্ন শাস্তি উল্লেখ করেছেন, সে সম্পর্কে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
মতভেদের মূল কারণ হলো আয়াতে ব্যবহৃত “أو” (অথবা) শব্দের ব্যাখ্যা। প্রশ্ন হলো, এখানে কি “أو” দ্বারা শাসককে ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো একটি শাস্তি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, নাকি অপরাধের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে?[30]সূত্র: بداية المجتهد لابن رشد ٤/٢٣٩
হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি ফকীহদের মতে, এখানে “أو” শব্দটি বিস্তারিত বর্ণনার (للتفصيل) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ হারাবাহের শাস্তিগুলো অপরাধের মাত্রা ও প্রকৃতি অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। তাই প্রত্যেক ধরনের অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি রয়েছে; শাসক ইচ্ছামতো যে কোনো শাস্তি প্রয়োগ করতে পারবেন না।
অতএব তাদের মতে, হারাবাহের অপরাধ যত গুরুতর হবে, শাস্তিও তত কঠোর হবে এবং প্রতিটি অপরাধের জন্য শরিয়ত নির্ধারিত নির্দিষ্ট শাস্তিই কার্যকর করা হবে।[31]সূত্র: بدائع الصنائع ٧/٩٣، البحر الرائق ٥/٧٣، الحاوي للماوردي ١٣/٣٥٣، مغني المحتاج ٥/٤٩٩ وما بعدها، المغني لابن قدامة ٩/١٤٥، كشاف القناع ٦/١٥٠ وما بعدها
মালিকী ও যাহিরী মাযহাবের আলেমগণ মনে করেন যে, আয়াতে ব্যবহৃত “أو” (অথবা) শব্দটি বিকল্প প্রদানের (التخيير) অর্থে এসেছে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি হিরাবাহ (ডাকাতি, সন্ত্রাস সৃষ্টি, পথরোধ ইত্যাদি) অপরাধে লিপ্ত হয়, তাহলে শাসক বা বিচারক আয়াতে উল্লেখিত শাস্তিগুলোর মধ্য থেকে যে কোনো একটি শাস্তি অপরাধীর জন্য উপযুক্ত মনে করলে তা প্রয়োগ করতে পারবেন।
অর্থাৎ, অপরাধী হিরাবাহর যে ধরনের কাজই করুক না কেন, বিচারক পরিস্থিতি, অপরাধের মাত্রা এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করে কুরআনে বর্ণিত শাস্তিসমূহের (হত্যা, শূলবিদ্ধ করা, বিপরীত দিকের হাত-পা কেটে দেওয়া, অথবা দেশ থেকে নির্বাসন) মধ্য থেকে যে কোনো একটি শাস্তি নির্ধারণ করার অধিকার রাখেন[32] مواهب الجليل للحطاب ٣١٥/٦، حاشية الدسوقي ٣٤٩٤ المحلى لابن حزم ۱۲ ۲۹۸
দ্বিতীয় অবস্থা: যদি ধর্ষণ (الاغتصاب) প্রথম অবস্থায় উল্লিখিত পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো ধরনের জবরদস্তি (الإكراه) দ্বারা সংঘটিত হয়, তাহলে ধর্ষকের শাস্তি হবে জিনার হদ (حد الزنا) তাজিরিয় শাস্তি যার সর্বোচ্চ সীমা মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত হয়ে থাকে। সে বিবাহিত (محصن) হোক বা অবিবাহিত—উভয় ক্ষেত্রেই পূর্বে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী তার উপর জিনার হদ কার্যকর হবে।
ইসলামি দন্ডবিধির প্রকার:-
ইসলামী শরীয়তে শাস্তি মূলত তিন প্রকারঃ[33]“আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ” : ইমাম মাওয়ারদী পৃষ্ঠা ২৩৬
১- কিসাস : হত্যা, অঙ্গহানি ও জখমের অপরাধসমূহে নির্ধারিত প্রতিশোধমূলক শাস্তি।
২- হদ্দ : হদ হলো এমন শাস্তি যা সরাসরি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। যেমন : চোরের হাত কাটা, হত্যার বদলে হত্যা, বেভিচার করলে রজম বা বেতের আঘাত ইত্যাদি।
৩- তাআযীর : এমন গুনাহ বা অপরাধের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যার জন্য শরীয়তে নির্দিষ্ট হদ্দ নির্ধারিত নেই।
যদি কেউ এমন কোনো শরয়ী অপরাধ করে যার জন্য শরীয়তে নির্দিষ্ট শাস্তি বর্ণিত হয়নি, এবং বিচারক মনে করেন যে অপরাধটি এতটাই গুরুতর যে শাস্তিযোগ্য, তাহলে তিনি অপরাধ ও গুনাহ অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারেন। ফকীহগণ একে “তাআযীর” বলে অভিহিত করেছেন। এ বিষয়ে ফিকহের বিস্তৃত গ্রন্থগুলোতে বহু আলোচনা ও বিস্তারিত বিধান রয়েছে।
তাযির শাস্তি সম্পর্কে ইসলামবিরোধীরা নানা রকমের মন্তব্য করে। তাদের অনেককে বলতে দেখা যায় এটা নাকি খুব লঘু শাস্তি বা নামমাত্র শাস্তি যার দ্বারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয় না! আমরা এখন যাচাই করে দেখবো তাদের দাবি কতোটুকু সঠিক।
কেউ কেউ এখানে দাবি করে হাদিসে নাকি ১০ বেত্রাঘাতের চেয়ে বেশি তাযির শাস্তি দিতে নিষেধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তারা এই হাদিসটি দেখায়ঃ
عَنْ أَبِي بُرْدَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ “ لاَ يُجْلَدُ فَوْقَ عَشْرِ جَلَدَاتٍ إِلاَّ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ ”.
অর্থঃ আবু বুরদা(রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলতেনঃ আল্লাহর নির্ধারিত হদ সমুহের কোনো হদ ব্যতিত অন্য ক্ষেত্রে দশ কশাঘাতের ঊর্ধ্বে দণ্ড প্রয়োগ করা যাবে না।[34]সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৬৩৮৪
রাসূল (ﷺ) এর এই বক্তব, যে হদের ব্যপারে ১০ টি অঘাতের বেশি দেওয়া যাবে না এটি কি সকল ক্ষত্রে প্রজোয্য নাকি শুধু কিছু ক্ষত্রে? আসুন এবার এ বিষয় আলোচনা করি:
ইসলামি আইন বা ফিকহ শাস্ত্রের সবচেয়ে বৃহৎ এবং আধুনিক বিশ্বকোষগুলোর মধ্যে অন্যতম “আল-মাওসূ‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ” -এ বলা হয়েছে—
“মূলনীতি হলো, তাআযীরের ক্ষেত্রে হত্যা পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে না। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
‘আর তোমরা সেই প্রাণকে হত্যা করো না, যাকে আল্লাহ হারাম করেছেন, ন্যায়সঙ্গত কারণ ব্যতীত।’ [সূরা আন‘আম : ১৫১]এবং নবী (ﷺ) বলেছেনঃ «لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ: الثَّيِّبُ الزَّانِي، وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ، وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ» ‘তিনটি কারণ ব্যতীত কোনো মুসলিমের রক্ত হালাল নয়ঃ বিবাহিত ব্যভিচারী, হত্যার বদলে হত্যা, এবং যে ব্যক্তি দ্বীন ত্যাগ করে জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।’ — বুখারী ও মুসলিম
তবে কিছু ফকীহ নির্দিষ্ট কিছু অপরাধে বিশেষ শর্তসাপেক্ষে তাআযীর হিসেবে হত্যাকে বৈধ বলেছেন। এবং দলিল সম্পর্কে তারা রাসূল (ﷺ) এর বক্তব্য কি উল্লেখ করেছেন নিম্নে তা আলোচনা করা হবে।[35]আল-মাওসূ‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ ১২/২৬৩
তাযির শাস্তির প্রকৃতি সম্পর্কে ইমাম নববী (রহ) এর মিনহাজুত ত্বালিবীন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে,
“যেসব অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে হদ প্রয়োগ করা যায় না, এবং যেগুলোর কাফফারা নেই, সেসব ক্ষেত্রে (ইসলামী) আদালত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে বন্দী করে রাখা, কশাঘাত, চপেটাঘাত অথবা কঠোর তিরস্কার করে শাস্তি দেবে। এই শাস্তির প্রকৃতি ও কঠোরতা শাসক, তার সহকারী অথবা কাজির এখতিয়ারে।”[36]মিনহাজুত ত্বালিবীন – ইমাম নববী (র.), পৃষ্ঠা ৪৫২
ইমাম আবু হানীফা বলেছেন, যদি কোনো অপরাধ বারবার সংঘটিত হয় এবং সেই অপরাধের ধরণ মূলত হত্যাযোগ্য হয়, তবে তাআযীর হিসেবে হত্যা করা বৈধ। যেমন বারবার সমকামিতায় লিপ্ত ব্যক্তি অথবা ভারী বস্তু দ্বারা হত্যাকারী। তাদের এই বক্তব্য মনগড়া কোন বক্তব্য নয় বরঞ্চ রাসূল (ﷺ)-এর হাদিস ধারাই প্রমাণিত সামনে আলোচনা আসছে।
প্রথমেই আমরা আলোচ্য হাদীসটির ব্যাখ্যা ইমামদের বক্তব্য দেখে নেব।
আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবন হাজার আসকালানী (রহ.) তাঁর সুবিখ্যাত শারহ গ্রন্থ ফাতহুল বারীতে উল্লেখ করেছেন,
أن المراد بالحدود هنا الحقوق التي هي أوامر الله ونواهيه ، وهي المراد بقوله : ومن يتعد حدود الله فأولئك هم الظالمون ، وفي أخرى : فقد ظلم نفسه ، وقال : تلك حدود الله فلا تقربوها ، وقال : ومن يعص الله ورسوله ويتعد حدوده يدخله نارا ، قال : فلا يزاد على العشر في التأديبات التي لا تتعلق بمعصية كتأديب الأب ولده الصغير
“…এখানে “হুদুদ” শব্দ দ্বারা উদ্যেশ্য হলো আল্লাহর ঐ সমস্ত হক যা আদেশ ও নিষেধের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন [আল্লাহর] এই বাণীর উদ্যেশ্যঃ “আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ (হুদুদ) লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। (বাকারাহ ২২৯)”। এবং এই বাণীতেওঃ “যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ (হুদুদ) অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে (সুরা তালাক্ব ১)”। এবং এই বাণীতেওঃ “এগুলো আল্লাহর সীমারেখা (হুদুদ) । কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ে না (সুরা বাকারাহ ১৮৭)”। এবং এই বাণীতেওঃ “আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা (হুদুদ) লঙ্ঘন করে আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন (সুরা নিসা ১৪)”।
এবং তিনি বলেন, দশের বেশি বেত্রাঘাত করা যাবে না ঐ সমস্ত শাস্তিদানের ক্ষেত্রে যা গুনাহের সাথে সম্পৃক্ত না। যেমন পিতা তার ছোট শিশুকে শিক্ষাদানের উদ্যেশ্যে শাস্তি দেয়া।”[37]ফাতহুল বারী- ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৮৫ / ১৭৭
অর্থাৎ এ থেকে বোঝা গেলো আলোচ্য হাদিসে “حُدُودِ اللَّهِ” (হুদুদিল্লাহ) দ্বারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সীমা লঙ্ঘনের অপরাধ অর্থাৎ অনেক বড় ধরণের অপরাধ ব্যতিত অন্য অপরাধে ১০ বেত্রাঘাতের বেশি শাস্তি দিতে নিষেধ করা হচ্ছে। ‘হদ’ (শাব্দিক অর্থ সীমারেখা, বহুবচন হুদুদ) শব্দ দ্বারা শরিয়া আইনে নির্ধারিত শাস্তিকে যেমন বোঝানো হয়, তেমনি আল্লাহ তা’আলার নির্ধারিত আদেশ-নিষেধের সীমারেখাকেও বোঝানো হয় (হুদুদিল্লাহ)। আলোচ্য হাদিসের উদ্যেশ্য হচ্ছে এই ২য় টি। আল কুরআনের অনেকগুলো আয়াতের সাহায্যে ফাতহুল বারীতে আলোচ্য হাদিসের এই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর দ্বারা এটা বোঝানো হয়নি যে শরিয়া নির্ধারিত কিছু অপরাধের হদ শাস্তি বাদে ১০ বেত্রাঘাতের বেশি তাযির দেয়া যাবে না। উম্মাহর অধিকাংশ উলামার ব্যাখ্যা এটিই, এটিই ছিলো সাহাবীদের বুঝ। ফাতহুল বারীতে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বিস্তারিত আলোচনায় এটি উল্লেখ করা হয়েছে যে এ হাদিসের দ্বারা তাযির শাস্তির সীমা ১০ বেত্রাঘাতের বেশি দেয়া নিষিদ্ধ হয় না। আগ্রহীরা এখান থেকে ফাতহুল বারীর বিস্তারিত আলোচনা পড়ে নিতে পারেন। এখানে বিষয়টি দলিলসহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তা’যির শাস্তির ক্ষত্রে ১০ আঘাতের বেশি শাস্তি দেওয়া যাবে এমন কি মৃত্যু দন্ড পর্যন্ত দেওয়া যাবে। এ বিষয় রাসূল (ﷺ) এর একটি হাদিস লক্ষ করুন
بَشَّارٍ : حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ ، عَنْ زِيَادِ بْنِ عِلَاقَةَ ، قَالَ : سَمِعْتُ عَرْفَجَةَ ، قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، يَقُولُ : ” إِنَّهُ سَتَكُونُ هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ ، فَمَنْ أَرَادَ أَنْ يُفَرِّقَ أَمْرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ وَهِيَ جَمِيعٌ ، فَاضْرِبُوهُ بِالسَّيْفِ كَائِنًا مَنْ كَانَ “
আরফাজাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আমি বলতে শুনেছি, অচিরেই নানা প্রকার ফিৎনা-ফাসাদের উদ্ভব হবে। যে ব্যক্তি ঐক্যবদ্ধ উম্মাতের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াস চালাবে, তোমরা তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দেবে, সে যে কেউ হোক না কেন।[38]মুসলিম ১৮৫২, ইরওয়া ২৪৫২, সহীহ আল জামি‘ ৫৯৪৬
এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, যার ফিৎনা-ফাসাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য তাকে হত্যা করা ব্যতীত অন্য কোনো পথ না থাকে তাকে হত্যা করা বৈধ। আসুন এ বিষয় আরো কিছু হাদিস দেখে নেয়া যাক :
وَحَدَّثَنِي وَهْبُ بْنُ بَقِيَّةَ الْوَاسِطِيُّ، حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، عَنِ الْجُرَيْرِيِّ، عَنْ أَبِي، نَضْرَةَ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” إِذَا بُويِعَ لِخَلِيفَتَيْنِ فَاقْتُلُوا الآخَرَ مِنْهُمَا ” .
ওয়াহব ইবনু বাকিয়্যাহ্ ওয়াসিতী (রহঃ) …… আবূ সাঈদ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যদি দু’ খলীফার জন্য বাই’আত গ্রহণ করা হয় তবে তাদের শেষোক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করবে। [39]সহীহ মুসলিম হাদিস নম্বরঃ 4693 ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৪৬, ইসলামিক সেন্টার ৪৬৪৮
অপর এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় যার মদ্যপান করার অভ্যাস কোনো ক্রমেই বন্ধ করা যায় না। জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেন,
«من لم ينته عنها فاقتلوه»
“যে ব্যক্তি এহেন কাজ থেকে বিরত না হয় তাকে হত্যা কর।”[40]মাজমু আল ফাতাওয়া: ২৮/১০৯
অপর এক হাদিসের মধ্যে এসেছে নির্দিষ্ট এক ব্যক্তি রাসূল (ﷺ) এর নামে মিথ্যা কথা বলছিল তখন রাসূল (ﷺ) সেই ব্যক্তিকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর ওপর মিথ্যা আরোপ করেছিল।”[41]মাজমু আল ফাতাওয়া: ২৮/১০৯
এসব প্রান্ত আরো কিছু হাদিস রয়েছে এগুলোকে সামনে রেখে জগৎবিখ্যাত ইমামগণ বক্তব্য দিয়েছেন যে তা’যির শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা বৈধ।
এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শাইখ বকর আবু যায়দ (রহ) বলেন
” يظهر من مباحث القتل تعزيرا على سبيل الإجمال والتفصيل : أن القتل تعزيرا مشروع عند عامة الفقهاء ، على التوسع عند البعض ، والتضييق عند آخرين في قضايا معينة .
وأن القول الصحيح الذي يتمشى مع مقاصد الشرع وحماية مصالح الأمة وحفظ الضروريات من أمر دينها ودنياها : هو القول بجواز القتل تعزيرا حسب المصلحة ، وعلى قدر الجريمة ، إذا لم يندفع الفساد إلا به ، على ما اختاره ابن القيم رحمه الله تعالى .
“তাআযীর হিসেবে হত্যার ব্যাপারে সার্বিক ও বিশদ আলোচনাগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, অধিকাংশ ফকীহের নিকট তাআযীরমূলক হত্যা বৈধ। তবে কেউ এতে কিছুটা বিস্তৃতি দিয়েছেন, আবার কেউ সীমিত করেছেন নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে।
আর শরীয়তের উদ্দেশ্য, উম্মাহর স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দ্বীন ও দুনিয়ার মৌলিক প্রয়োজনসমূহ রক্ষার সাথে সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ মত হলো— প্রয়োজন ও জনকল্যাণ অনুযায়ী, এবং অপরাধের মাত্রা অনুসারে, যদি হত্যা ছাড়া ফাসাদ প্রতিরোধ সম্ভব না হয়, তাহলে তাআযীর হিসেবে হত্যা বৈধ। এ মতই ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ গ্রহণ করেছেন।”[42]“আল-হুদূদ ওয়াত-তা‘যীরাত ‘ইন্দা ইবনিল কাইয়্যিম” পৃষ্ঠা ৪৯৩
শাইখ আবদুল কাদির আউদাহ (রহ) বলেন—
“শরীয়তের মূলনীতি হলো, তাআযীরের উদ্দেশ্য সংশোধন ও শিক্ষা প্রদান। তাই এমন তাআযীর বৈধ, যার পরিণতি সাধারণত নিরাপদ। সুতরাং তাআযীরের শাস্তি প্রাণঘাতী হওয়া উচিত নয়। এ কারণেই মূলনীতিগতভাবে তাআযীরে হত্যা বা অঙ্গচ্ছেদ বৈধ নয়।
কিন্তু বহু ফকীহ এ সাধারণ নীতির ব্যতিক্রম হিসেবে বলেছেন— যদি জনস্বার্থ হত্যার শাস্তি দাবি করে, অথবা অপরাধীর অনিষ্ট হত্যা ছাড়া দূর করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাকে তাআযীর হিসেবে হত্যা করা বৈধ। যেমন— গুপ্তচর, বিদআতের প্রচারক, অথবা ভয়ংকর অপরাধে অভ্যস্ত অপরাধী।
যেহেতু তাআযীরমূলক হত্যা একটি ব্যতিক্রমী বিধান, তাই এতে ব্যাপকতা আনা যাবে না এবং অন্যান্য তাআযীর শাস্তির মতো বিচারকের ব্যক্তিগত বিবেচনার উপর পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বরং রাষ্ট্রপ্রধানকে নির্দিষ্ট করে দিতে হবে কোন কোন অপরাধে হত্যার হুকুম দেওয়া যাবে।[43]“আত-তাশরী‘ আল-জিনাঈ ফিল ইসলাম” ১/৬৮৭-৬৮৯
হুদূদ ও তা’যীরাতের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন-
১. অপরাধ প্রমাণে কিংবা অপরাধের শর্তাবলীর মধ্য থেকে কোন একটিতে সামান্যটুকু সন্দেহ দেখা দিলে হদ্দ অকার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু সন্দেহ দেখা দিলে তা’যীর কার্যকর করা যায়।
২. হুদূদের বেলায় স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নেয়া বিধিসম্মত। কিন্তু তা’যীরের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নিলে তা’যীর মাফ হবে না।
৩. হুদুদ অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রযোজ্য হয় না। কিন্তু তা’যীর অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যও প্রযোজ্য হয়।
৪. কারো কারো মতে, অপরাধে লিপ্ত হবার পর দীর্ঘ সময় ধরে নালিশ পেশ না হওয়ার কারণে বা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে শাস্তি না হবার কারণে কোন কোন হদ্দ রহিত হয়ে যায়; কিন্তু তা’যীর রহিত হয় না।
৫. হুদূদ ও কিসাস নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে কেবল উপযুক্ত সাক্ষ্য-দলীল ও স্বীকারোক্তি দ্বারা প্রমাণ করা যায়। কিন্তু তা’যীর সাক্ষ্য-দলীল ও স্বীকারোক্তি ছাড়া অন্যভাবেও যেমন শপথ, গণসাক্ষ্য ও বদনাম বা অন্য কিছু দ্বারাও প্রমাণ করা যায়।
৫. হুদূদ সকলের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ও যথাযথ কার্যকর করা কর্তব্য। কিন্তু তা’যীর পরিবেশ, পরিস্থিতি, লোকদের পার্থক্যানুপাতে বিভিন্ন হতে পারে।[44]ইবনু ‘আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, ৪/৬১; আল-মাওসূ’আতুল ফিকহিয়্যা, ১২/২৫৭; আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ.২৯৩; আবদুর রহীম, মুহাম্মাদ, অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম, ঢাকাঃ ইফাবা, ২০০৭, পৃ-২০৩-২০৪
মুফতি তাকি উসমানি উল্লেখ করেন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর বিশেষজ্ঞ সাহাবীগণ হাদিসের উপর আমল করে ধর্ষকদের শাস্তি দিতেন। তাঁদের মতে, যে নারীকে জোরপুর্বক জিনায় বাধ্য করা হয়েছে (ধর্ষিতা) সে হদমুক্ত (জিনার শাস্তিমুক্ত)।[45]দারসে তিরমিযি – মুফতি তাকি উসমানী, ৪/৩৮৬
এ বিষয় সহিহ বুখারীর হাদিস টি দেখুন, লায়স (র.) নাফি’ (র.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, সাফিয়্যা বিন্ত আবূ উবাইদ তাকে সংবাদ দিয়েছেন যে,
সরকারী মালিকানাধীন এক গোলাম গনীমতের পঞ্চমাংশে প্রাপ্ত একটি দাসীর সাথে জবরদস্তিমূলকভাবে যিনা করে। এমন কি তার কুমারীত্ব টুটে দেয়। উমর (রা.) উক্ত গোলামকে কশাঘাত করলেন ও নির্বাসন দিলেন। কিন্তু দাসীটিকে সে বাধ্য করেছিল বলে কশাঘাত করলেন না।[46]বুখারী: ৬৯৪৯
মুসান্নাফ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে,
এক হাবশি ব্যক্তি এক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করলে উমর ইবনে আবদুল আজিজ তার উপর শরিয়তি শাস্তি কার্যকর করেন।[47]مصنف ابن أبي شيبة 15/ 409
এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু আবদিল বার (رحمه الله) তাঁর «الاستذكار» গ্রন্থে বলেন:
«أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ عَلَى أَنَّ عَلَى الْمُسْتَكْرِهِ الْمُغْتَصِبِ الْحَدَّ إِنْ شَهِدَتِ الْبَيِّنَةُ عَلَيْهِ بِمَا يُوجِبُ الْحَدَّ أَوْ أَقَرَّ بِذَلِكَ»
“আলেমগণ এ ব্যাপারে ঐকমত্য (إجماع) পোষণ করেছেন যে, যে ব্যক্তি জবরদস্তির মাধ্যমে ধর্ষণ করে, তার উপর হদ কার্যকর করা হবে—যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ (البينة) দ্বারা এমন বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয় যা হদকে আবশ্যক করে, অথবা সে নিজেই তা স্বীকার (إقرار) করে।[48]আল-ইস্তিদকার, ৭/১৪৬
১ম ও ২য় অবস্থায় অর্থদন্ডের-ও শাস্তি: এছাড়াও ধর্ষকের শাস্তি নিয়ে আরো একটি বিধান রয়েছে। ইমাম মালেক (রহ), শায়খ সালমান আল-বাজি (রহ), ইমাম শাফেঈ (রহ), আল-লায়ছ (রহ) ও আলী ইবনে আবী তালিব (রা) এর মতে ধর্ষীতাকে মোহরানা দিতে হবে। তবে আবু হানিফাহ (রহ) ও আল-সাওরী (রহ) বলেন: হাদ্দের শাস্তি তার উপর কার্যকর করা হবে কিন্তু তিনি “মোহরানা” দিতে বাধ্য নন।[49]আল-মুওয়াত্তা, ২/৭৩৪; আল-মুনতাকা শরহুল মুওয়াত্তা, ৫/২৬৮-২৬৯; আল-ফাওয়াকিহু আদ-দাওয়ানী ‘আলা রিসালাতি ইবনে আবী যায়দ আল-কায়রাওয়ানী ২/২০৮
মাওয়ারদী (রহ.) ইমাম শাফেয়ীর মত উল্লেখ করেছেন যে, যদি কেউ কোনো নারীকে জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করে, তবে তার (পুরুষের) ওপর হদ প্রযোজ্য হবে, নারীর ওপর নয় এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে; এবং তাকে ঐ নারীকে মোহর দিতে হবে। তবে ইমাম আবূ হানিফা (রহ.)-এর মতে তার ওপর কোনো মোহর নেই। তিনি বলেন, হদ্দ ওয়াজিব হয় যখন কোনো সন্দেহ (শুভহা) থাকে না; আর মোহর ওয়াজিব হয় যখন সন্দেহ থাকে — তাই এ দুটি একসঙ্গে থাকা অসম্ভব।[50]الحاوي الكبير في فقه مذهب الإمام الشافعي 13/240-241
মোহর ওয়াজিব নয় এই মতের পক্ষে দলিল হল, আল্লাহর রসূল (ﷺ) নিষেধ করেছেন,
কুকুরের মূল্য, ব্যভিচারীনির বিনিময় এবং গণকের পারিশ্রমিক (গ্রহণ করতে)।[51]বুলুগুল মারাম ৭৮৪
এই মতের ওলামাগণ এই হাদিসের ব্যভিচারীনির সঙ্গে ধর্ষীতার অবস্থানকে কিয়াস করেন। তাই উনারা মোহরানা ওয়াজিব না হওয়ার মত দিয়ে থাকেন।
কিন্তু মোহর ওয়াজিব হওয়া মতের পক্ষে দলিল হল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ
যে কোনো নারী তার ওয়ালীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবে; তার বিয়ে বাত্বিল, তার বিয়ে বাত্বিল, তার বিয়ে বাত্বিল। যদি এরূপ বিয়েতে স্বামীর সাথে সহবাস হয়ে থাকে, তবে স্ত্রীর মোহর দিতে হবে তার (লজ্জাস্থান) উপভোগ করার কারনে। আর যদি তাদের (ওয়ালীগণের) মধ্যে আপোসে মতবিরোধ দেখা দেয়, তবে যার ওয়ালী নেই শাসক তার ওয়ালী (বলে বিবেচিত) হবে।[52]মিশকাত, ৩১৩১
মাওয়ার্দী (রহ) বলেন,
বাতিল বিবাহে যা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ওয়াজিব হয়, তা জবরদখল ও জবরদস্তির ক্ষেত্রেও ওয়াজিব — যেমন মালের ব্যাপারে। কারণ এটি মালিকানাবিহীন সঙ্গম।…
আরও কারণ, বাতিল বিবাহে স্ত্রী মোহর পায় — তবে জোরপূর্বক ব্যভিচারিতা তার চেয়ে বেশি মোহরের উপযুক্ত। দুটি দিক থেকে:
(১) বাতিল বিবাহের নারী জেনেশুনে পাপ করে, আর জোরপূর্বক বাধ্যদের নারী পাপ করে না।
(২) বাতিল বিবাহের নারী নিজের সম্মতি দেয়, জোরপূর্বক বাধ্যদের নারী দেয় না।[53]الحاوي الكبير في فقه مذهب الإمام الشافعي 13/240-241
সমাপিকা
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী শরিয়তে ধর্ষণ (الاغتصاب) একটি অত্যন্ত জঘন্য, নিকৃষ্ট ও সমাজবিধ্বংসী অপরাধ। এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা, সম্ভ্রম ও সামাজিক স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে এক গুরুতর আগ্রাসন। এ কারণেই ইসলাম মানুষের ইজ্জত ও মর্যাদা সংরক্ষণকে শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহের (مقاصد الشريعة) অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং সম্ভ্রমহরণকে কঠোরভাবে দমন করার জন্য কঠিন শাস্তির বিধান প্রণয়ন করেছে।
আলোচনার মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামী ফিকহে ধর্ষণ ও স্বেচ্ছায় সংঘটিত যিনা কখনোই এক বিষয় নয়। বরং ধর্ষণ একটি স্বতন্ত্র অপরাধ, যার নিজস্ব সংজ্ঞা, প্রমাণপদ্ধতি ও শাস্তি রয়েছে। তাই ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী বাধ্যতামূলক—এ ধরনের প্রচলিত অভিযোগ বাস্তবতা ও ফিকহি ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফকীহগণ সাক্ষ্য, স্বীকারোক্তি, পারিপার্শ্বিক আলামত (القرائن), চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতসহ বিভিন্ন প্রমাণের মাধ্যমে ধর্ষণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গ্রহণ করেছেন।
একইভাবে ইসলামী শরিয়ত ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে নয়; বরং নির্যাতিত, মজলুম ও অধিকারবঞ্চিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবীদের ফয়সালা এবং ফকীহদের বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ওপর কোনো হদ বা শাস্তি আরোপ করা হয় না। বরং সমস্ত দায় ও অপরাধের বোঝা অপরাধীর ওপর বর্তায়।
অন্যদিকে ধর্ষকের ব্যাপারে ইসলামী শরিয়তের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। যদি ধর্ষণের সঙ্গে সন্ত্রাস, অপহরণ, অস্ত্রের ভয় প্রদর্শন কিংবা জননিরাপত্তা বিনষ্ট করার উপাদান যুক্ত থাকে, তবে তা হিরাবাহ (الحرابة)-এর আওতাভুক্ত হয়ে যায়, যার শাস্তি ইসলামী দণ্ডবিধির সর্বাধিক কঠোর শাস্তিগুলোর অন্তর্ভুক্ত। আর যদি তা সাধারণ জবরদস্তিমূলক যৌন সহিংসতা হয়, তবুও অপরাধী জিনার হদ কিংবা উপযুক্ত তাআযীর শাস্তির আওতাভুক্ত হবে। ফলে ইসলামী আইন ধর্ষকের প্রতি কোনো প্রকার নমনীয়তা প্রদর্শন করে না; বরং ভুক্তভোগীর অধিকার সংরক্ষণ এবং সমাজকে এ ধরনের অপরাধ থেকে নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
অতএব, ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারিত এ ধারণা যে, “ধর্ষণ প্রমাণে চারজন সাক্ষী না থাকলে বিচার হয় না” অথবা “ধর্ষণ ও যিনা একই অপরাধ”—এসব বক্তব্য গবেষণাহীন, বিভ্রান্তিকর এবং ইসলামী আইনশাস্ত্রের প্রকৃত অবস্থানের পরিপন্থী। ন্যায়ভিত্তিক বিচার, মজলুমের অধিকার সংরক্ষণ এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়তের অবস্থান গভীর, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত।
পরিশেষে আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে সত্যকে সত্য হিসেবে চেনার এবং তা অনুসরণ করার তাওফীক দান করেন; অসত্যকে অসত্য হিসেবে চেনার এবং তা থেকে বেঁচে থাকার সামর্থ্য দান করেন। তিনি যেন মানবসমাজকে সকল প্রকার জুলুম, নির্যাতন, সম্ভ্রমহানি ও অন্যায় থেকে হেফাজত করেন এবং ন্যায়, ইনসাফ ও নিরাপত্তাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার তাওফীক দান করেন।
Footnotes
| ⇧1 | আল-আযহারী, তাহযীবুল লুগাহ, পৃ. ৬২৮; ইবন মানযূর, লিসানুল আরব, ১/৬৪৮। |
|---|---|
| ⇧2 | মালিক ইবন আনাস, আল-মুদাওয়ানাহ, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৫ হি./১৯৯৪ খ্রি., ৪/৬০১। |
| ⇧3 | ”ড. মুহাম্মাদ আশ-শাহাত আল-জুন্দী, জারীমাতু ইগতিসাবিল ইনাস, দারুন নাহদাতিল আরাবিয়্যাহ, কায়রো, পৃ. ৩৬। |
| ⇧4 | ইবরাহীম আল-লুহাইদান, আহকামু জারীমাতি ইগতিসাবিল ইর্দ ফিল ফিকহিল ইসলামী, মাস্টার্স গবেষণাপত্র, নায়েফ আরব ইউনিভার্সিটি, রিয়াদ, ২০০৪ খ্রি., পৃ. ১৯ ও পরবর্তী পৃষ্ঠা। |
| ⇧5 | বিস্তারিত দেখুন : আল-সারখাসি, আল-মাবসুত (৯/২০১), ইবনু আবিদীনের হাশিয়ায় (৪/১১৩) হাশিয়াতুদ দাসূকীতে (৪/৩৫১), আসনা আল-মাতালিব, যাকারিয়া আল-আনসারী (৪/১৫৮),আল-মুগনী (৯/১৫৭), আততাশরীয়ুল জিনাইয়্যুল ইসলামী (২/৩৭৯-৩৮৫), আল-হুকম ফি’ল-সাতওয়াল-ইখতিতাফ ওয়া মুশকিরাত, (পৃ. ১০৪-১৯২)। |
| ⇧6 | মুসলিম, ৪৩২৩ |
| ⇧7 | ইবন ফারহূন আল-ইয়ামুরী, তাবসিরাতুল হুক্কাম ফী উসূলিল আক্বদিয়া, আল-আজহারিয়্যাহ কলেজ লাইব্রেরি, ১৫তম সংস্করণ, ১৪০৬ হিজরি / ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১। |
| ⇧8 | تبصرة الحكام لابن فرحون ٢ / ١٢٤. |
| ⇧9 | ইবনু আবদিল বার, আল-ইস্তিযকার, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮৬ |
| ⇧10 | সূরা বাকারা, আয়াত ১৭৩ |
| ⇧11 | সূরা আন-নূর: ৩৩ |
| ⇧12 | তাফসীর ফাতহুল কাদীরে ৪/৩৫ |
| ⇧13 | আবু দাউদ : ৪৩৭৯ |
| ⇧14 | مرقاة المفاتيح للملا الهروي ٢٣٤٥/٦ |
| ⇧15 | ইবনে মাজাহ:২০৪৩ |
| ⇧16 | “মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক (৭/৪০৭, আল-আয’যামী কর্তৃক সম্পাদিত/তাহকীককৃত সংস্করণ)” |
| ⇧17 | “আস-সুনানুল কাবীর (ইমাম বাইহাকী) ১৭/২২৮, তুর্কী (তাহকীক/সম্পাদনা). |
| ⇧18 | মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, ৯/৪৩৪ হা: ১৭৯১৯; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ ৫/৪৩৯ হা: ২৭৭৯৩ ইত্যাদি। আলেমগণ আত্মরক্ষার অধীনে এর উপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছেন যেমনটা ইমাম মাওয়ার্দী রহ. রচিত শাফেয়ী মাযহাবের হাউইউল কাবীরে ১৩/৪৫১ বর্ণিত হয়েছে |
| ⇧19 | শারহুস সুন্নাহ: ১০/২৫২ |
| ⇧20 | মিরকাত আল মাফাতিহ: ৩৫১১ |
| ⇧21 | আল-মুগনি: ৮/৩৩১ |
| ⇧22 | بدائع الصنائع للكاساني / ۱۸۰، حاشية ابن عابدين ۲۹٤، شرح الخرشي على مختصر خليل طيار الفكر للطباعة – بيروت بدون ۸۰/۸، حاشية الدسوقي ۳۱۸، أسنى المطالب الزكريا الأنصاري ۱۲٧/٤، مغني المحتاج للخطيب الشربيني ٤٤٤/٥ المبدع لابن مفلح ٣٩٠/٧ وما بعدها، الإنصاف للمرادي ۱۰ ۱۸۲، المحلى لابن حزم ٢٠٤/٧ |
| ⇧23 | ইবনে মাজাহ: ২০৪৩ |
| ⇧24 | شرح الخرشي على مختصر خليل ۸۰/۸، حاشية الدسوقي ۳۱۸٤، تحفة المحتاج للهيتمي . المكتبة التجارية الكبرى – مصر – ١٣٥٧هـ – ۱۹۸۲م – ١٠٥/٩، مغني المحتاج للخطيب الشربيني ٥ ٤٤٤، المغني لابن قدامة ٦٠ الإنصاف المرادي ۱۰/ ۱۸۲ |
| ⇧25 | بدائع الصنائع للكاساني /۷ ۱۸۰ وما بعدها، البحر الرائق لابن نجيم ٥ ٢٠. |
| ⇧26 | جاء في بدائع الصنائع للكاساني ۱۸۰۷ |
| ⇧27 | حاشية الدسوقي ٤٣٨/٤ |
| ⇧28 | সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩৩ |
| ⇧29 | أحكام القرآن لابن العربي ٢/ ٩٥ |
| ⇧30 | সূত্র: بداية المجتهد لابن رشد ٤/٢٣٩ |
| ⇧31 | সূত্র: بدائع الصنائع ٧/٩٣، البحر الرائق ٥/٧٣، الحاوي للماوردي ١٣/٣٥٣، مغني المحتاج ٥/٤٩٩ وما بعدها، المغني لابن قدامة ٩/١٤٥، كشاف القناع ٦/١٥٠ وما بعدها |
| ⇧32 | مواهب الجليل للحطاب ٣١٥/٦، حاشية الدسوقي ٣٤٩٤ المحلى لابن حزم ۱۲ ۲۹۸ |
| ⇧33 | “আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ” : ইমাম মাওয়ারদী পৃষ্ঠা ২৩৬ |
| ⇧34 | সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৬৩৮৪ |
| ⇧35 | আল-মাওসূ‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ ১২/২৬৩ |
| ⇧36 | মিনহাজুত ত্বালিবীন – ইমাম নববী (র.), পৃষ্ঠা ৪৫২ |
| ⇧37 | ফাতহুল বারী- ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৮৫ / ১৭৭ |
| ⇧38 | মুসলিম ১৮৫২, ইরওয়া ২৪৫২, সহীহ আল জামি‘ ৫৯৪৬ |
| ⇧39 | সহীহ মুসলিম হাদিস নম্বরঃ 4693 ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৬৪৬, ইসলামিক সেন্টার ৪৬৪৮ |
| ⇧40, ⇧41 | মাজমু আল ফাতাওয়া: ২৮/১০৯ |
| ⇧42 | “আল-হুদূদ ওয়াত-তা‘যীরাত ‘ইন্দা ইবনিল কাইয়্যিম” পৃষ্ঠা ৪৯৩ |
| ⇧43 | “আত-তাশরী‘ আল-জিনাঈ ফিল ইসলাম” ১/৬৮৭-৬৮৯ |
| ⇧44 | ইবনু ‘আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, ৪/৬১; আল-মাওসূ’আতুল ফিকহিয়্যা, ১২/২৫৭; আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ.২৯৩; আবদুর রহীম, মুহাম্মাদ, অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম, ঢাকাঃ ইফাবা, ২০০৭, পৃ-২০৩-২০৪ |
| ⇧45 | দারসে তিরমিযি – মুফতি তাকি উসমানী, ৪/৩৮৬ |
| ⇧46 | বুখারী: ৬৯৪৯ |
| ⇧47 | مصنف ابن أبي شيبة 15/ 409 |
| ⇧48 | আল-ইস্তিদকার, ৭/১৪৬ |
| ⇧49 | আল-মুওয়াত্তা, ২/৭৩৪; আল-মুনতাকা শরহুল মুওয়াত্তা, ৫/২৬৮-২৬৯; আল-ফাওয়াকিহু আদ-দাওয়ানী ‘আলা রিসালাতি ইবনে আবী যায়দ আল-কায়রাওয়ানী ২/২০৮ |
| ⇧50, ⇧53 | الحاوي الكبير في فقه مذهب الإمام الشافعي 13/240-241 |
| ⇧51 | বুলুগুল মারাম ৭৮৪ |
| ⇧52 | মিশকাত, ৩১৩১ |



