দাসপ্রথা ও ইসলাম: নাস্তিকদের অভিযোগের খণ্ডন “
দাসপ্রথা ও ইসলাম: নাস্তিকদের অভিযোগের খণ্ডন, বিধান, প্রজ্ঞা ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ” পর্ব : ৪

এর পূর্বের পর্ব গুলো পড়ে আসুন: পর্ব :১, পর্ব: ২, পর্ব : ৩
অভিযোগ ও খন্ডন- ২: ইসলাম পূর্ব যুগে কি দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্কের বিধান ছিল না?
নাস্তিকদের অভিযোগঃ
ইসলামের আগে আরব সমাজে দাসপ্রথা থাকলেও দাসীদের সাথে যৌন সম্পর্ককে বৈধ বা স্বীকৃত কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। দাসীদের সাথে জোরপূর্বক সম্পর্ক বা নির্যাতন থাকলেও সেটিকে কখনো বৈধ সম্পর্ক হিসেবে ধর্মীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ইসলামই প্রথম একটি ধর্ম হিসেবে দাসীদের সাথে যৌন সম্পর্ককে বৈধতা দেয় এবং সেটিকে “মা মালাকাত আইমানুকুম” (مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ) শিরোনামে শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত করে।
ইসলামে একজন মালিক তার দাসীর সাথে বিবাহ ছাড়াই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে—এটি একটি নতুন বিধান, যা ইসলাম প্রবর্তন করেছে। এই বিধানের মাধ্যমে ইসলাম দাসপ্রথাকে শুধু টিকিয়েই রাখেনি, বরং তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে এবং দাসীদেরকে যৌন ভোগের উপকরণ হিসেবে বৈধতা দিয়েছে।
অভিযোগের খন্ডন
নাস্তিকদের এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কেন না ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই আমরা দেখতে পাই ইসলাম পূর্ব যুগে ও দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এবং এটি তৎকালীন সমাজে স্বাভাবিক বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল। আসুন আমরা এ বিষয়ে শুধু অল্প কিছু তথ্য আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব ঐতিহাসিকদের কিতাব থেকে :
♦ প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ লেখক শওকী দিয়াফ এর বক্তব্য
প্রাচীন যুগের প্রখ্যাত ইতিহাসবীদ ও লেখক শওকী দিয়াফ তার তারীখুল আদাবিল আরাবী নামক কিতাবে দাস দাসী প্রথা ইসলাম পূর্ব যুগেও যে বিদ্যমান ছিল সে ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন শুধু তাই নয়, তখনকার যুগে দাস-দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক করা হতো এবং তাদের থেকে সন্তান নেওয়া হতো এব্যাপারেও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নিম্নে তার বক্তব্যের কিছু অংশ উল্লেখ করছি :
وحتى الآن لم نتحدث عن المرأة ومكانتها فى هذا المجتمع، وقد كان هناك نوعان من النساء: إماء وحرات، وكانت الإماء كثيرات، وكان منهن عاهرات يتخذن الأخدان، وقينات يضربن على المزهر وغيره فى حوانيت الخمارين، كما كان منهن جوار يخدمن الشريفات، وقد يرعين الإبل والأغنام. وكن فى منزلة دانية، وكان العرب إذا استولدوهن لم ينسبوا إلى أنفسهم أولادهن، إلا إذا أظهروا بطولة تشرفهم على نحو ما هو معروف عن عنترة بن شداد، فإن أباه لم يلحقه بنسبه إلا بعد أن أظهر شجاعة فائقة ردّت إليه اعتباره
“এখনও আমরা এই সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা করিনি। সেখানে নারীদের দু’টি শ্রেণি ছিল: দাসী (ইমা) এবং স্বাধীন নারী (হুররা)। দাসীদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল ব্যভিচারিণী, যারা গোপন উপপতি (অখদান) গ্রহণ করত। আবার কেউ কেউ ছিল গায়িকা-নর্তকী (কিয়ান), যারা মদের দোকানগুলোতে বাদ্যযন্ত্র—যেমন ‘মিজহার’ ইত্যাদি বাজিয়ে গান পরিবেশন করত।
তাদের মধ্যেই কিছু দাসী ছিল, যারা সম্ভ্রান্ত নারীদের সেবা করত। আবার কেউ কেউ উট ও ভেড়া চরানোর কাজেও নিয়োজিত থাকত। তাদের সামাজিক মর্যাদা ছিল অত্যন্ত নিম্ন।
আরবরা যখন দাসীদের মাধ্যমে সন্তান লাভ করত, তখন সাধারণত তারা সেই সন্তানদের নিজেদের বংশে অন্তর্ভুক্ত করত না—যতক্ষণ না সেই সন্তান কোনো অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করে সম্মান অর্জন করত। যেমনটি সুপরিচিত ঘটনা عنترة بن شداد-এর ক্ষেত্রে দেখা যায়—তার পিতা তাকে নিজের বংশে অন্তর্ভুক্ত করেননি, যতক্ষণ না সে অসাধারণ সাহসিকতা প্রদর্শন করে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে।”[1]তারীখুল আদাবিল আরাবী : ১/৭২
♦ ইতিহাসবিদ জাওয়াদ আলীর বক্তব্য
জাওয়াদ আলী একজন ধর্মনিরপেক্ষ পণ্ডিত যিনি জার্মানিতে বিদেশি প্রাচ্যবিদদের (Orientalists) কাছে শিক্ষালাভ করেছেন। চলুন এবার তার লেখা কিতাব থেকে বিষয়ে আমরা দেখিনেই
وبعد انتهاء الحرب توزع الغنائم بين المحاربين المنتصرين، ويعطى الرئيس إذا غنم الجيش معه “المرباع” أي: ربع الغنيمة١. وقد رده الإسلام خمسًا، بنزول الأمر بالخمس في القرآن الكريم٢.
وإذا وقع أحد في أيدي عدو وأسر فيقال له عندئذ: “أسير”. ويعبر عنه بـ”اخذ” في السبئية في حالة المفرد، وبـ”اخذتم” “أخذت” “اخذيت” في حالة الجمع٢. وتطلق هذه اللفظة على الأسرى الذين يقعون في الأسر من دون قتال، وذلك عند اكتساح جيش أو غزاة جيش العدو أو مكان ما، فيؤخذ من فيه من ناس من غير قتال ولا مقاومة. فهم مثل الغنائم التي تقع في أيدي الغزاة والمحاربين يؤخذون دون قتال. أما الذين يؤخذون بعد مقاومة وبقتال، فيقال لهم: “سبيم”, أي: “سبي”، بمعنى “مسبي”. وأما الجمع فـ”اسبى”, أي: سبايا. وأما الإسباء فيعبر عنه بـ”يسبيو”، وتعني “يسبي” و”يسبون”
“যুদ্ধ শেষ হলে বিজয়ী যোদ্ধাদের মধ্যে গনীমত (লুণ্ঠিত সম্পদ) বণ্টন করা হতো। আর যদি সেনাবাহিনীর সাথে প্রধান (নেতা) অংশগ্রহণ করতেন, তাহলে তাকে ‘মিরবা‘ (المرباع) দেওয়া হতো—অর্থাৎ গনীমতের এক-চতুর্থাংশ। ইসলাম এসে এটিকে পরিবর্তন করে এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস) নির্ধারণ করে দেয়, কুরআনে খুমুস সংক্রান্ত নির্দেশ অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে।
যদি কেউ শত্রুর হাতে বন্দী হয়ে যেত, তখন তাকে বলা হতো ‘আসীর’ (أسير) অর্থাৎ বন্দী। সাবাইয়ি (দক্ষিণ আরবীয়) ভাষায় একবচনে তাকে ‘আখধ’ (أخذ) বলা হতো এবং বহুবচনে ‘আখধতুম’ (أخذتم), ‘আখধাত’ (أخذت), ‘আখধীত’ (أخذيت) ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হতো।
এই শব্দটি তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যারা যুদ্ধ ছাড়াই বন্দী হতো—যেমন কোনো বাহিনী বা আক্রমণকারী দল হঠাৎ শত্রু সেনা বা কোনো স্থানে আক্রমণ করে সেখানে থাকা লোকদের বিনা লড়াই ও প্রতিরোধে ধরে ফেলত। এরা মূলত সেই গনীমতের মতোই, যা আক্রমণকারীরা যুদ্ধ ছাড়াই লাভ করত।
আর যারা প্রতিরোধ ও যুদ্ধের পর বন্দী হতো, তাদেরকে বলা হতো ‘সাবিইম’ (سبيم), অর্থাৎ ‘সাবি’—মানে বন্দী বা ‘মাসবী’ (বন্দীকৃত)। এর বহুবচন হলো ‘আসবা’ (اسبى), অর্থাৎ ‘সাবায়া’ (বন্দিনী নারীগণ)। আর ‘ইসবা’ (الإسباء) বোঝাতে ‘ইয়াসবিউ’ (يسبيو) শব্দ ব্যবহৃত হতো, যার অর্থ ‘সে বন্দী করে’ বা ‘তারা বন্দী করে’।”
ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসবিদ জাওয়াদ আলী নিজেই স্বীকার করেছেন যে ইসলামের আগে জাহেলিয়াত যুগে যুদ্ধবন্দিনী বা ‘সাবায়া’ রাখার প্রথা বিদ্যমান ছিল। শুধু তাই নয় তার লিখনীর মধ্যে একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে ইসলামপূর্ব যুগে যুদ্ধলব্ধ মাল কেউ বন্টন করা হতো কিন্তু আজকাল কিছু নাস্তিক দাবি করে থাকেন যে ইসলামপূর্ব যুগে নাকি যুদ্ধলব্ধ মাল তথা গনীযমতের বৈধতা নাকি তৎকালীন সমাজে ছিল না।[2]আল-মুফাসসাল ফি তারিখ আল-আরব, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১৩৬
তিনি তার বইয়ের ১০ম খন্ডের ২৪৩ পৃষ্ঠায় দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন
ولما كان الرقيق ملكًا ومن حق المالك أن يتصرف بملكه كيف يشاء، صار من حق المالك بيع رقيقه أو إهدائه، أي: إعطاءه هبة إلى من يشاء دون حاجة إلى أخذ ذلك الرقيق، كما كان من حقه عتق رقبته. كما كان له حق الاستمتاع بالإماء وإكراههن على البغاء للإتيان بالمال أو لإنجاب الأولاد. ولم يكن للرقيق أن يملك شيئًا؛ لأن الرقيق وما يملكه ملك للمالك. ولم يكن للرقيق حق التوريث إذ لا مال له؛ لأنه وما يملكه ملك مالكه. فإرثه لسيده وحده
“যেহেতু দাস ছিল মালিকের সম্পত্তি, আর মালিক তার সম্পত্তি নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করার অধিকার রাখত, তাই তার জন্য বৈধ ছিল নিজের দাসকে বিক্রি করা বা কাউকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেওয়া—অর্থাৎ যাকে ইচ্ছা তাকে দান করে দেওয়া, দাসের সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই। তেমনি তার দাসকে মুক্ত করে দেওয়ার অধিকারও ছিল।
এছাড়াও মালিকের অধিকার ছিল দাসীদের থেকে ভোগলাভ করা এবং তাদেরকে অর্থ উপার্জনের জন্য বা সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে ব্যভিচারে বাধ্য করা। দাসের নিজের কোনো সম্পদের মালিকানা ছিল না; কারণ দাস নিজে এবং তার যা কিছু আছে—সবই মালিকের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হতো।
দাসের উত্তরাধিকার লাভেরও কোনো অধিকার ছিল না; কারণ তার নিজস্ব কোনো সম্পদ ছিল না—সে এবং তার সম্পদ সবই মালিকের। তাই তার রেখে যাওয়া যা কিছু, তা একমাত্র তার প্রভুর কাছেই ফিরে যেত।” আল-মুফাসসাল ফি তারিখ আল-আরব, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৪৩))
তিনি (জাওয়াদ আলী) ২৩২ পৃষ্ঠায় আরও বলেন:
“জাহেলিয়াত যুগের মানুষ যে জেনার জন্য শাস্তি দিত, তা ছিল কোনো বিবাহিত স্বাধীন নারীর তার স্বামীর অগোচরে কোনো অপরিচিত পুরুষের সাথে লিপ্ত হওয়া, যাকে তারা বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা হিসেবে গণ্য করত। আর দাসীদের ব্যভিচারের ক্ষেত্রে, একে কোনো দোষ মনে করা হতো না যদি তা তাদের মালিকের জ্ঞাতসারে এবং তার নির্দেশে হতো।”
এবং তিনি ২৩১ পৃষ্ঠায় লিখেন:
وإذا استلحق الرجل ولد أمته به، صار ولده؛ لأن سادات الإماء كانوا يتصلون بإمائهم في الجاهلية من غير عقد زواج، باعتبار أن الأمة ملك مالكها وسيدها، فله حق إلحاق أنبائها به إن شاء.
“জাহেলিয়াত যুগে দাসীদের মালিকরা কোনো নিকাহচুক্তি ছাড়াই তাদের দাসীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করত, এই ভিত্তিতে যে দাসী তার মালিক ও মুনীবের মালিকানাধীন সম্পত্তি; ফলে মালিকের এই অধিকার ছিল যে তিনি চাইলে (দাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া) সন্তানদের নিজের বংশের (নসব) সাথে যুক্ত করতে পারতেন।”
তদুপরি, জাওয়াদ আলী ৯ম খণ্ড, ১৩৮ পৃষ্ঠায় বলেন:
“দাসীদের সাথে ব্যভিচারের (শারীরিক সম্পর্ক) ক্ষেত্রে, জাহেলিয়াত যুগের মানুষ কাউকে তিরস্কার করত না, যেমনটি আমি আগেই বর্ণনা করেছি।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট ভাবে প্রমাণ করলাম যে ইসলাম পূর্ব যুগে ও দাস-দাসীদের সাথে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি সমাজে স্বীকৃত বিষয় ছিল অতএব নাস্তিকদের করা অভিযোগের ভিত্তি দিয়ে একেবারেই ভুল। বরংচ আমরা একথা বলতে চাই যে নাস্তিকদের অজ্ঞতার ফলেই তারা এ সমস্ত আপত্তি করে থাকে।




