ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাববিজ্ঞান

হৃদয় নাকি মস্তিষ্ক: মনের আসল স্থান

অনেক আগে এক ভাই প্রশ্ন করেছিলেন কলব নিয়ে, তখন উত্তর দিয়েছিলাম, ভাবলাম বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, তাই উত্তরগুলো আরো আপডেট করে শেয়ার করছি। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, আমরা কুরআন থেকে জানি- অনুধাবন করে ক্বলব (Heart) দিয়ে কিন্তু বিজ্ঞান বলে অনুধাবন করে Brain. ক্বলব হার্ট হলে Open heart surgery করার সময় কি দেহে ক্বলব থাকে না?

আমি উত্তর এই দুটো উত্তর দেখতে বলেছিলামঃ-

তিনি পালটা প্রশ্ন করেন যে ক্বলব অর্থ যদি হৃৎপিণ্ড হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো যাদের Heart transplant বা কৃত্রিম Artificial heart লাগানো হয় তারা কীভাবে চিন্তা করে? আর ক্বলব অর্থ মস্তিষ্ক ধরে নিলে তাহলে সেটা তো রাসুল (সা) এর বক্ষ বিদারণের ঘটনাসহ অনেক হাদিসের সাথে যায় না।

আমরা দেখি কেউ stroke করলে Unconscious হয়ে যায়। তাহলে মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানের আগে পর্যন্ত সময়ে যখন Body অকেজো, Brain অকেজো, তখন তো মানুষ Unconscious থাকবে। মুনকার নাকিরের প্রশ্নের উত্তর দিবে কীভাবে?

মিরাজের সময় বক্ষ বিদারণের ঘটনায় আমরা দেখি হিকমত বক্ষে ঢেলে দেওয়া হয়। তারপর অনেক সময় বিভিন্ন হাদিসে দেখবেন আছে- “অন্তর হাদিস সংরক্ষণ করেছে” এ জাতীয় কথা। কিন্তু আমরা জানি Memory থাকে Brain এ। আবার, এক হাদিসে দেখি তাকওয়া থাকে অন্তরে। কিন্তু তাহলে যাদের Heart নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর Artificial blood pumping machine লাগানো হয়েছে তাদের কি তাকওয়া থাকতে পারেনা?

এই উত্তরটি নতুন করে সাজিয়ে উপস্থাপন করছি।

মন কি? একটি গুণ?

মন কি ও কোথায় থাকে আসল বিতর্ক হল এটা নিয়ে। কেউ একে শুধুমাত্র মস্তিষ্ক আবদ্ধ রাখতে চায়, আবার কেউ কলবে।  মন নিয়ে ওলামাগণ মতভেদ করেছেন যা খুবই সুপরিচিত। আমরা যাকে ‘মন’ বলছি তাকে আরবিতে বুঝাতে আকল শব্দ ব্যবহার করা হয়। “আকল” শব্দটি “উকুল” থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ নিষেধ, বাধা, আটকানো এবং বাঁধন। ইবনে মানযুর তার লিসানুল আরব গ্রন্থে বলেন:[1]তার লিসানুল আরব ১১/৪৮৫, তাজুল আরূস ৩০/১৮

আকল হলো নিষেধ ও বিচক্ষণতা, যা মূর্খতার বিপরীত। এর বহুবচন হলো উকুল।
আমর ইবনুল আসের হাদীসে এসেছে: “এগুলো এমন মন, যা এর স্রষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন”, অর্থাৎ সেগুলোকে দুর্বল করেছেন।

আকল মানে বুঝা, বিচক্ষণতা এবং মাথা ঠাণ্ডা রাখা। সিবাওয়াই বলেন, এটি একটি গুণ

মাকুল হলো যা হৃদয় দিয়ে বোঝা যায়। এটি মাইসুর ও মাউসুর-এর মতো মাসদার।আকল অর্থ বিষয়গুলোতে স্থিরতা ও বিচক্ষণতা।

এখানে আকল বা মন হল একটি গুন। পারিভাষীক ভাবে মন সম্পর্কে আবুল মুআলী জুওয়াইনী আল-বুরহান গ্রন্থে বলেন:[2]আবুল মুআলী জুওয়াইনী আল-বুরহান ১/১৯

“মন নিয়ে আলোচনা সহজ নয়। আমাদের আলেমদের মধ্যে হারিস ইবন আসাদ মুহাসিবী এ বিষয়ে বলেছেন, মন হলো একটি সহজাত গুণ, যার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়, তবে তা জ্ঞানের অংশ নয়।” তিনি আরও বলেন, “এটি একটি গুণ; যখন তা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর মাধ্যমে জ্ঞানগত বিষয় ও এর অপরিহার্য ভিত্তি অর্জন করা যায়।”

যাবিদী (রহ) বলেন:[3]তাজুল আরূস ৩০/১৯

“মন হলো একটি প্রতিষ্ঠিত গুণ, যা এর অধিকারীকে বিষয়গুলো যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম করে, যতক্ষণ তা এর বিপরীত গুণে প্রভাবিত না হয়।”

রাঘিব আসফাহানী (রহ) বলেন:[4]আল-মুফরাদাত পৃ. ৫৭৭

“মন বলা হয় সেই শক্তিকে, যা জ্ঞান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত, এবং এটি সেই জ্ঞানকেও বোঝায়, যা মানুষ এই শক্তির মাধ্যমে অর্জন করে।”

গাযযালী (রহ) বলেন:[5]আল-মুসতাসফা পৃ. ২০

“মন শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি অপরিহার্য জ্ঞান, সহজাত গুণ যা জ্ঞানগত বিষয় উপলব্ধির জন্য মানুষকে প্রস্তুত করে, এবং অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞানকে বোঝায়।” তিনি আরও বলেন, “একটি দৃষ্টিকোণ থেকে মন হলো অপরিহার্য জ্ঞান, যেমন সম্ভবের সম্ভাব্যতা এবং অসম্ভবের অসম্ভবতা, যেমন কাযী আবু বকর বাকিল্লানী বলেছেন। দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি সেই সহজাত গুণ, যা জ্ঞানগত বিষয় বিশ্লেষণের জন্য প্রস্তুত করে।”

ইমাম আহমদ (রহ) এর সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন,

“هو غريزة في النفس، وقوة فيها؛ بمنزلة قوة البصر التي في العين”

এটি আত্মার একটি স্বভাবজাত প্রবৃত্তি এবং অন্তর্নিহিত শক্তি; ঠিক যেমন চোখে দৃষ্টিশক্তি।[6]আকীদাহ বায়নাস সালাফ ওয়াল মুতাকাল্লিমীন, হাসান বিন মুহাম্মাদ শাবানাহ, পৃষ্ঠা নং: ৪৭

ইমাম নাসাফি (রহ) বলেছেন:

أما العقل، وهو قوة للنفس، بها تستعد للعلوم والإدراكات، وهو المعني بقولهم: غريزة يتبعها العلم بالضروريات عند سلامة الآلات: [فهو سبب للعلم أيضا]” انظر: “تاج العروس

অর্থাৎ ‘মন’ হল একটি মানসিক শক্তি, যার মাধ্যমে আত্মা জ্ঞান ও উপলব্ধি অর্জনের জন্য প্রস্তুত হয়। এরই উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে যে, ‘এটি একটি স্বভাবজাত প্রবৃত্তি, যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সুস্থ থাকা অবস্থায় স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান লাভ করা যায়’।[7]তাজ আল-উরুস ৩০/১৯; আল-হাওয়াশি আল-বাহিয়্যাহ আলা আল-আকাইদ আন-নাসাফিয়া ১/৬০-৬১

আল-মুজামুল ওয়াসীতে বলা হয়েছে মন হল: যা দিয়ে চিন্তা, যুক্তি, ধারণা ও বিশ্বাসের সংমিশ্রণ হয়। যা দিয়ে সুন্দরকে কুৎসিত থেকে, ভালোকে মন্দ থেকে, সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথক করা হয়। এছাড়া মনের সঙ্গে বোঝা, উপলব্ধি, জ্ঞান, গভীর চিন্তা ইত্যাদির সম্পর্ক। মন দ্বারাই সত্য থেকে বিচ্যুতি, সন্দেহ, হক অস্বীকার ইত্যাদির আবির্ভাব হয়।[8].https://www.alukah.net/culture/0/173337/.

সুতরাং এই মন হলো একটি সহজাত গুণ, শক্তি এবং বোঝার, সচেতনতার ও জ্ঞানের ক্ষমতা।

ক্বলব কি ও মনের সম্পর্ক কিসের সাথে?

পূর্বেই দেখেছি মনকে অনেকে নফস বা আত্মার সাথে সম্পর্কিত যা রুহের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলেছেন। এই বিষয়ে আরো বহু ওলামাই এ রকম মতই দিয়েছেন। আলিমগণ একে ‘লাতীফা রাব্বানিয়া রূহানিয়া’ (একটি সূক্ষ্ম ও আধ্যাত্মিক সত্তা) বলে বর্ণনা করেছেন, যা দৈহিক হৃদয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত।[9].https://www.islamweb.net/amp/ar/fatwa/320353/, السادة المتقين بشرح إحياء علوم الدين 202 ; “المعجم الفلسفي” (2/86) ; كتاب الروح – ابن القيم – ط عطاءات العلم 2/520 ;  كتاب دروس للشيخ سعيد بن مسفر 2/6 ; كتاب شرح البخاري للسفيري = المجالس الوعظية في شرح أحاديث خير البرية 2/216 ;  كتاب تفسير النيسابوري = غرائب القرآن ورغائب الفرقان 4/73

ক্বলব কি এই বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিম (রহ) ওলামাদের মত বর্ণনা করে বলেছেন,

“কলব/হৃদয়” শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়:

প্রথমটি,  একটি স্থূল, ইন্দ্রিয়লব্ধ বস্তু। এটি বুকের বাম পাশে ভিতরে রাখা পাইন গাছের ফলের মতো দেখতে একটি মাংসপিণ্ড। এর ভিতরে একটি গহ্বর আছে, যেখানে কালো রক্ত থাকে। এটিই রূহের উৎস।

দ্বিতীয়টি: একটি অতিসূক্ষ্ম, আধ্যাত্মিক বিষয়; অর্থাৎ এটি হলো আল্লাহর দয়া ও রহমতপূর্ণ একটি দিব্য সত্তা, যা রূহানী প্রকৃতির, এবং এই মাংসপিণ্ডের সঙ্গে এর একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। আর এই সূক্ষ্ম সত্তাই মানুষের প্রকৃত মানবত্বের হাকিকত বা সারাংশ।

“ক্বলবে” দুই ধরনের সৈন্য রয়েছে: একটি সৈন্য চোখে দেখা যায়, অপরটি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখা যায়।

যে সৈন্য চোখে দেখা যায়, তা হলো শরীরের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহ। এগুলোকে কলবের খাদিম বা সেবক হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে তা কলবের বিরোধিতা করতে না পারে। যখন কলব চোখকে খোলার নির্দেশ দেয়, তা খুলে যায়; যখন জিহ্বাকে কথা বলার নির্দেশ দেয় তখন তা কথা বলে; যদি “হাতকে” আঘাত করার নির্দেশ দেয়, তবে তা আঘাত করে; যদি “পাকে” চলার নির্দেশ দেয়, তবে তা চলে; এবং এভাবে সমস্ত অঙ্গই কলবের জন্য সম্পূর্ণরূপে নত হয়ে থাকে।[10]কিতাবুত তিবিয়ান ফী আইমানিল কুরআন – প্রকাশনা: আতাউল ইলম, ৬২৬

মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আত-তুওয়াইজরি (রহ) বলেন,

“কলব/হৃদয়” শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়:

প্রথমটি: পাইন ফলের আকৃতির সেই মাংসপিণ্ড, যা বুকের বাম পাশে অবস্থিত। এটি একটি বিশেষ ধরনের মাংস, এর ভিতরে একটি গহ্বর আছে। সেই গহ্বরে কালো রক্ত রয়েছে, যা রূহের উৎস ও আধার। রক্ত এতে প্রবেশ করে, তারপর শিরা-উপশিরার মাধ্যমে তা শরীরের পুষ্টির জন্য ছড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয়টি: একটি দিব্য, রূহানী সূক্ষ্ম সত্তা, যার সঙ্গে এই শারীরিক হৃদয়ের একটি সম্পর্ক রয়েছে। আর এই সূক্ষ্ম সত্তাই মানুষের প্রকৃত সত্তা। এটিই মানুষের মধ্যে জ্ঞানী, উপলব্ধিকারী ও সচেতন অংশ। এটিই সম্বোধিত, দায়িত্বপ্রাপ্ত, পুরস্কৃত ও শাস্তিপ্রাপ্ত। এই সূক্ষ্ম সত্তার সঙ্গে শারীরিক হৃদয়ের একটি সম্পর্ক রয়েছে।

পক্ষান্তরে রূহ (প্রাণ): এটি একটি সূক্ষ্ম শরীর (জিসমু লাতীফ), যার উৎস হল দৈহিক কলবের গহ্বর। এটি শিরা-উপশিরার মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। দেহে এর প্রবাহিত হওয়া এবং এর থেকে জীবনীশক্তি, অনুভূতি, শ্রবণ, দর্শন ও ঘ্রাণশক্তির আলো শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে বিচ্ছুরিত হওয়া—এটা ঠিক সেইভাবে, যেমন একটি বাতি ঘরের বিভিন্ন কোণে ঘোরালে তার আলো সব কোণে ছড়িয়ে পড়ে।

‘আকল (বুদ্ধি-বিবেক): এটি হল সেই শক্তি যা মানুষকে নিকৃষ্ট ও অপবিত্র কথা ও কাজ থেকে বিরত রাখে। এর বিপরীত হল পাগলামি। ‘আকল শব্দটি দ্বারা কখনো বোঝানো হয় বস্তুর প্রকৃত সত্য জ্ঞান। তখন তা ‘ইলম বা জ্ঞানের একটি গুণবাচক শব্দ হয়, যার অবস্থানস্থল হল কলব (হৃদয়)।

আবার ‘আকল শব্দটি দ্বারা কখনো বোঝানো হয় জ্ঞান অর্জনকারী সেই সূক্ষ্ম সত্তাকে, তখন সেটিই হল কলব (হৃদয়)।

আর যখন আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি তাকে পরীক্ষা করলেন, যাতে তার সত্যতা ও মিথ্যাবাদিতা, আনুগত্য ও অবাধ্যতা, এবং তার পবিত্রতা ও অপবিত্রতা জানা যায়।

সেজন্য তিনি তার সৃষ্টি ও গঠনে চারটি উপাদান মিশ্রিত করলেন। ফলে তার মধ্যে চার প্রকার বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটল, সেগুলো হল: ১. সাব‘ঈয়্যাহ (হিংস্র পশুসুলভ) বৈশিষ্ট্য ২. বাহীমিয়্যাহ (পশুচারী) বৈশিষ্ট্য ৩. শাইত্বানিয়্যাহ (শয়তানী) বৈশিষ্ট্য
৪. রাব্বানিয়্যাহ (প্রভুত্বকামী) বৈশিষ্ট্য। এসব কিছুই তার কলবে (হৃদয়ে) সমবেত রয়েছে।[11]মাওসুআতু ফিকহিল কুলুব, ২/১২৭৭-১২৭৮

সুতরাং এটি সুস্পষ্ট হলো যে ক্বলব দ্বারা আদতে শুধুমাত্র মানব দেহের সেই মাংসপিণ্ডকেই বুঝায় না, আর মন ক্বলবের এই দ্বিতীয় প্রকারের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যদিও তা শারীরিক হৃদপিণ্ডের সঙ্গেও সম্পর্কিত। গাযযালি (রহ)-ও “মাংসপিণ্ড হৃদয়” ও “আধ্যাত্মিক হৃদয় (রব্বানি লতিফা)” এর মধ্যে পার্থক্য করেন। প্রথমটি শারীরিক অঙ্গ, আর দ্বিতীয়টি মানুষের বুদ্ধিমান সত্তা, যাকে হৃদয়, আত্মা বা নফস বলা হয়।[12].Ghazzali.

একটি বিখ্যাত কওল রয়েছে,

قيل: تنزل الْمعَانِي الروحانيات أَولا إِلَى الرّوح، ثمَّ تنْتَقل مِنْهُ إِلَى الْقلب، ثمَّ تصعد إِلَى الدِّمَاغ، فينتقش بهَا لوح المتخيلة

“প্রথমে রূহের মধ্যে আধ্যাত্মিক অর্থসমূহ অবতীর্ণ হয়, তারপর সেখান থেকে হৃদয়ে স্থানান্তরিত হয়, তারপর তা মস্তিষ্কে উঠে যায়, যেখানে কল্পনার পাতায় তা প্রতিফলিত হয়।”[13]তাফসির আল-বাইদাউয়ী – আনওয়ারুত তানজিল ওয়া আসরারুত তাউইল ৪/১৪৯

বিজ্ঞান কি মনকে শুধুমাত্র মস্তিষ্কের সাথে সম্পর্কিত বলে?

চিকিৎসা বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে আমরা নতুন নতুন তথ্য জানতে পারছি, নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করছি। ভবিষ্যতে হার্টের আরো কার্যকারিতা যে আবিষ্কার হবে না এটার নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। হতে পারে আজ যা জানছি আগামীকাল আরো নতুন কিছু জানতে পারব এটা নিয়ে।

এখানে খুব ইন্টারেস্টিং একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে এই বিষয়ে। ক্লিনিক্যাল ভাষায় Near-Death Experience (NDE) বা মৃত্যুদুয়ারের অভিজ্ঞতা নামের একটি টার্ম সম্পর্কে জানা যায়। এগুলো হলো এমন কিছু অভিজ্ঞতা যার সম্মুখীন হন মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তি অথবা ক্লিনিক্যালি ডেড ব্যক্তি। সর্বপ্রথম এ নিয়ে আলোচনা করেন সাইকোলজিস্ট ড. রেমন্ড মুডি, তাঁর বেস্ট সেলিং বই Life after Life-এ।  গবেষকগণ NDE এর ১২ রকম প্রকার খুঁজে পেয়েছেন। বর্তমানে NDE বিষয়ে পিয়ার রিভিউড গবেষণাপত্রের সংখ্যা ২০০-রও বেশি। ড. জেফরি লং ১৩০০-রও বেশি NDE কেইস নিয়ে গবেষণা করার পর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাগুলোকে একাট্টা করে বই লিখেছেন Evidence of the Afterlife: The Science of Near-Death Experiences শিরোনামে। এই ঘটনায় দেখা যায় ক্লিনিক্যালি ডেড, বা কোমায় আছে, বা সাময়িক অজ্ঞান হওয়া ব্যক্তি হুস ফিরে পাওয়ার পর তার বেহুঁশ থাকা অবস্থার এমন সব কথা বলে যা তার জানার কথা নয়, এমনকি শতভাগ একরেসির সাথেও সে বর্ণনায় দিতে পারে। এমন এক ঘটনায় এল লোক এক সাপ্তাহ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে এই এক সাপ্তাহে তার চার পাশে ঘটা সকল ঘটনা হুবহু বর্ণনা করছে, তার দাবি সে তার দেহের বাহির থেকে সব কিছুই দেখছিল।[14]এসব বিষয়ে আরো জানতে দেখতে পারেন Jeffrey Long & Paul Perry, Evidence of the Afterlife: The Science of Near-Death Experiences, Introduction; Pim Van Lommel, Consciousness Beyond Life: The Science of the Near-Death Experiences; Chapter 2: What is a Near-Death Experience?

নাস্তিক বিজ্ঞানীরা NDE-কে খুব অপছন্দ করেন, নানা ব্যাখ্যা দিয়ে বাতিল করার চেষ্টা করেন; বলতে চান মৃতপ্রায় মগজ অক্সিজেনের অভাবে এসব হাবিজাবি দেখে! কিছু ঘটনা এমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে সকল ঘটনাকেই স্রেফ তড়িৎ-রসায়নের গোলমাল বলে চালিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। NDE ফিল্ডের সেক্যুলার বিজ্ঞানীরা তাই জানাচ্ছেন।[15]দেখুনঃ Emma Young, No Medical Explanation for Near-Death Experiences. The New-Scientist, 14 December 2001

NDE-এর ঘটনাগুলো বিজ্ঞানের যে অন্যতম বস্তুবাদী অনুমানকে চ্যালেঞ্জ করছে তা হলো, মন বলে কিছু নেই, সবই মস্তিষ্কের নানা তরল ও বিদ্যুতের খেল। এ সকল ঘটনায় দেখা যাচ্ছে মন-যেটাকে আমরা আত্মবোধ (Consciousness) বিবেচনা করতে পারি-তা মূলত জাগতিক মস্তিষ্ক থেকে ভিন্ন অস্তিত্বে বিরাজ করে (Dualism)। তাই যখন হার্টের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার ৩০ সেকেন্ড পরেই মস্তিষ্ক সকল সংবেদনে সাড়া দেওয়া থামিয়ে দেয়, তখনও মানুষ চারপাশের অনুভূতি পেতে পারে।[16]দেখুনঃ Matt McMillen, Does Your Brain Know When You’re Dead? WebMD, Nov. 8, 2017

আমরা মন সম্পর্কে আরো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাই রবার্ট এম. এগ্রোস এবং জর্জ এন. স্ট্যানসিয়ুর বইতে, তারা সংক্ষেপে বলেন:[17]“আল-ইলম ফী মানযুরহুল জাদীদ” (Science In A New Perspective) পৃষ্ঠা ২৬-৪৩

বিংশ শতাব্দী শারীরবিদ্যা সম্পর্কে চমকপ্রদ আবিষ্কার নিয়ে এসেছে… যা একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে, যা শুরু হয় স্যার চার্লস শেরিংটনের মাধ্যমে, যিনি আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত হন। স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণার ফলাফলে শেরিংটন নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তে পৌঁছান:

জীবন ও মনের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য প্রকাশ পেয়েছে। জীবন হল রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার বিষয়, অন্যদিকে মন রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার নাগালের বাইরে থাকে।

শেরিংটন ‘জীবন’ বলতে বুঝিয়েছেন: স্বয়ংসম্পূর্ণ পুষ্টি, কোষের মেটাবলিজম (বিপাক) এবং বৃদ্ধি। তিনি বলেন: এই ঘটনাগুলো পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের নিয়ম দ্বারা সংঘটিত হয় এবং এই দুটি বিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু মনের ক্রিয়াকলাপ পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে।

স্নায়ুবিজ্ঞানী স্যার জন একলসও এতে একমত পোষণ করে বলেন: «সচেতনতা প্রকাশকারী অভিজ্ঞতাগুলো (Consciousness) স্নায়বিক প্রক্রিয়ার ঘটনা থেকে সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন। তবুও, স্নায়বিক প্রক্রিয়ায় যা ঘটে তা এই অভিজ্ঞতার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত, যদিও তা পর্যাপ্ত নয়…»

এরপর তারা এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা উল্লেখ করেন, এমনকি তারা বলেন: “অতএব, বিজ্ঞানের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, মস্তিষ্কের শারীরবৃত্তীয় ও রাসায়নিক কার্যকলাপ ইন্দ্রিয় অনুভূতির জন্য প্রয়োজনীয় এবং এর সাথে সম্পৃক্ত, কিন্তু এটি স্বয়ং সেই ইন্দ্রিয় অনুভূতি নয়। বস্তুগত বিষয় একা ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি ব্যাখ্যা করতে পারে না। পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি আলোর তরঙ্গ, রাসায়নিক পরিবর্তন, স্নায়ুতে বৈদ্যুতিক স্পন্দন এবং মস্তিষ্কের কোষের ক্রিয়াকলাপ নিয়ে কথা বলতে পারে। কিন্তু দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্বাদ, শ্রবণ এবং স্পর্শের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বস্তুবাদের কিছু বলার নেই। ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি একটি বাস্তবতা, কিন্তু এটি বস্তু নয়, বা বস্তুর কোনো বৈশিষ্ট্যও নয়।”

তারপর তারা মানুষের মন এবং ইচ্ছাশক্তি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। এরপর তারা  এক হাজারেরও বেশি ব্যক্তির মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা আমেরিকান নিউরোসার্জন ওয়াইল্ডার গ্রিভস পেনফিল্ডের পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া গত শতাব্দীর কিছু আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করেন। তারা এই পরীক্ষাগুলো উল্লেখ করে বলেন: “শত শত রোগীর এইভাবে পর্যবেক্ষণের ফলে পেনফিল্ড উপসংহারে পৌঁছান যে, রোগীর মন, যা এমন নির্জনতা ও সমালোচনামূলকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, তা অবশ্যই এমন কিছু, যা অনৈচ্ছিক স্নায়বিক ক্রিয়াকলাপ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও সচেতনতার বিষয়বস্তু অনেকাংশে স্নায়বিক ক্রিয়াকলাপের উপর নির্ভর করে, তবুও উপলব্ধি নিজেই এর উপর নির্ভরশীল নয়।

এই পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে পেনফিল্ড মস্তিষ্কের এমন একটি সম্পূর্ণ মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হন, যা কথা, চলাফেরা এবং সমস্ত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের জন্য দায়ী অঞ্চলগুলো দেখায়। কিন্তু মন বা ইচ্ছাশক্তির অবস্থান মস্তিষ্কের কোনো অংশে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি!

মস্তিষ্ক হলো সংবেদন, স্মৃতি, আবেগ এবং চলাফেরার ক্ষমতার আধার, কিন্তু দেখা যায়, এটি মন বা ইচ্ছাশক্তির আধার নয়। পেনফিল্ড ঘোষণা করেন যে, মনের সাথে সম্পর্কিত কোনো কাজ বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা (ইলেকট্রোড) বা মৃগীরোগজনিত নিঃসরণ দ্বারা সৃষ্ট হয়নি। তিনি আরও বলেন: ‘মস্তিষ্কের বাইরের স্তরে এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা রোগীকে কিছু বিশ্বাস করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে… ইলেকট্রোড সংবেদন এবং স্মৃতি জাগাতে পারে, কিন্তু এটি রোগীকে যৌক্তিক বিশ্লেষণ করতে, বীজগাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে বা এমনকি সবচেয়ে সাধারণ যৌক্তিক চিন্তার সহজতম উপাদানও তৈরি করতে পারে না। ইলেকট্রোড রোগীর শরীরকে নড়াচড়া করাতে পারে, কিন্তু তাকে নড়াচড়ার ইচ্ছা করাতে পারে না। এটি ইচ্ছাশক্তিকে বাধ্য করতে পারে না।’

সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে, মানুষের মন এবং ইচ্ছাশক্তির কোনো শারীরিক অঙ্গ নেই!”

স্কলারগণের কথাও হল হিম্যান কনশাসনেস হৃদয়, অন্তর বা কলবের সাথে সম্পর্কিত, আত্মা বা রুহের সাথে সম্পর্কিত, যা বিজ্ঞান এখনো বুঝতে পারে নি যা আমরা পূর্বেই আলাপ করেছি। মন হলো একটি আধ্যাত্মিক আলো, যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞানগত ও অপরিহার্য বিষয়গুলো উপলব্ধি করে। যিনি মনকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে অস্তিত্বে এনেছেন, তিনিই ভালো জানেন যে এটি কোথায় ও কিভাবে অবস্থিত এবং তাদের কিভাবে কাজ করে।[18].هل العقل في القلب أم الدماغ.[19].Does The Brain Does The Thinking or The Heart?.[20].কলব কোথায় থাকে মাথায় না বুকে?.

এসব আলোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় মন কোনো বস্তুগত জিনিস নয়, বরং এটি একটি মেটাফিজিকাল বিষয়, যা সাধারণ বস্তুগত অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে। তবে শরীরের সাথে এর একটা সম্পর্ক রয়েছে। মনের অবস্তুগত প্রকৃতি থেকে স্পষ্ট যে, এ নিয়ে আলোচনা দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক বা প্রায়োগিক নয়। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, বিজ্ঞান কেবল শারীরবৃত্তীয় বিষয় পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণ করতে পারে, যা সচেতনতা ও উপলব্ধিকে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমের সাথে সংযুক্ত করে।

এটি অবশ্যই প্রমাণ করে না যে মনের স্থান মস্তিষ্ক। ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি ও স্নায়বিক ক্রিয়া হলো মনের জন্য উপকরণ, মনের সমার্থক নয়। মস্তিষ্ক ও ইন্দ্রিয়গুলো মনের জন্য তথ্য ও উপলব্ধি সরবরাহ করে, যা মন জ্ঞান গঠনের জন্য ব্যবহার করে। তাই মস্তিষ্কে আঘাতের ফলে উপলব্ধির অভাব হতে পারে, যা মনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ইন্দ্রিয়ের ক্ষতি মনের জ্ঞান গঠনের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। মানুষ ও পশুদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক ও ইন্দ্রিয়ের ভূমিকা একই। মস্তিষ্কের ক্ষতি মনের ক্ষতির কারণ হয়, কিন্তু এটি প্রমাণ করে না যে মনের স্থান মস্তিষ্ক। বরং এটি প্রমাণ করে যে, মন ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রভাব রয়েছে।

সেহেতু, সুস্পষ্টতই এটা প্রতিয়মা যে আপনি যে আপত্তিগুলো তুলছেন সেগুলো ভ্যালিড হচ্ছে না, এর প্রমাণ রয়েছে যে মানুষের হৃদপিন্ডই নয় শুধু, মস্তিষ্কও যদি বন্ধ হয়ে যায় সাময়িক সময়ের জন্য, তারপরও তার কনশাসনেস থাকা সম্ভব। আর মানুষের মস্তিষ্কই একমাত্র সকল কার্যক্রম চালায় এটাও ভুল প্রতীয়মান হয়, এটা শতভাগ বিশুদ্ধই নয়। আর যারা বলে মনের স্থান শুধুমাত্র মস্তিষ্ক, তাদের প্রধান যুক্তি হলো, মস্তিষ্কে যা কিছু প্রভাব ফেলে, তা মনের উপরও প্রভাব ফেলে। আমরা অস্বীকার করি না যে মস্তিষ্কের প্রভাব মনের উপর পড়তে পারে। কিন্তু আমরা বলি, এটা মানলেও তা প্রমাণ করে না যে মনের স্থান শুধুমাত্র মস্তিষ্কই। মানুষের অনেক অঙ্গ মস্তিষ্কের বাইরে থাকে, তবু মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণে সেগুলো প্রভাবিত হয়। যেমন, মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণে শরীরের কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মন মস্তিষ্কের বাইরে থাকলেও, তার সুস্থতা মস্তিষ্কের সুস্থতার উপর নির্ভর করতে পারে, ঠিক যেমন অন্যান্য অঙ্গ মস্তিষ্কের সুস্থতার উপর নির্ভর করে।

হৃদপিন্ডের কি আর কাজ নেই?

হতে পারে কিছুদিন পর মস্তিষ্কও প্রতিস্থাপন করা শুরু হয়ে গেল। যদি আপনার কথা মত আমরা তর্কের খাতিরে ধরি কলব মস্তিষ্কে তাহলে কি তখন মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের সময় কলব দেহে থাকবে না? কৃত্রিম মস্তিষ্ক যদি লাগানো হয় তাহলে তারা চিন্তা করতে পারবে না? সার্জারি সাময়িক সময়ের বিষয়, তাই সে সময় কলব থাকবে কি থাকবে না দেহে সেটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই ভালো বলতে পারেন। এছাড়া সেই মুহুর্তে তাকে জাগ্রত রেখে তার সার্জারি করা হয় না সেহেতু কলব সেই সময় টুকুতে থাকলেও কি বা না থাকলেও কি!

প্রথম দিকে লিংক দুটোতে দেখানো হয়েছে হার্টের অবদান রয়েছে ব্রেনের ফাংশনালিটির সাথে, কিন্তু সেখানে এটা বলা হয় নি হার্টই সব চিন্তা করে। আর এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে, ওলামাগণ এটা বলছেন না আমাদের বুকের ভেতর থাকা হৃৎপিণ্ড নামের মাংস পিণ্ডের মধ্যেই শুধু আকল ও কনশাসনেস আবদ্ধ থাকে, যেমনটা আমরা মন কীসের সাথে সম্পর্কিত সেই আলোচনায় দেখেছি। তাই বিষয়টাকে সেই দিকে নিয়ে গিয়ে বিজ্ঞান বিরোধী দাবি করার কোনো যৌক্তিকতা ও ভেলিডিটি থাকে না। সেহেতু হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করলেও মানুষ চিন্তা করতে পারবে, কারণ তার ব্রেন তো রয়েছেই, সাথে ট্রান্সপ্লেন্ট করলে তো আরেকটি ভিন্ন হার্ট তো থাকছে, একে বারে হার্ট ফেলে দেয় বিষয়টা তো তেমন নয়।

Read More...  ইসলামে পশুকামের শাস্তি

আর কৃত্রিম হৃদপিণ্ডতো পার্মানেন্ট রাখাও যায় না। কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড লাগানো মানুষের বহু লিমিটেশন চলে আসে, এটাতে অরজিনালের মতো কাজ করে না, কার্যক্রম স্থির করে দেয়, অরিজিনালের মতো এত শক্তিশালী নয়, অরিজিনালে যে অন্যান্য কার্যক্রমও চালাতে পারে সেগুলোও কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড চালাতে পারে না। সেহেতু এটা প্রকৃত হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতার চাইতে অনেক অনেক পিছিয়ে আছে, সেহেতু এটি মস্তিষ্কের উপরও প্রভাব ফেলতেই পারে, অস্বাভাবিক কিছু না৷

আপনি আরেকটি প্রশ্ন করেছেন মৃত্যুর পর Brain অকেজো, তখন তো মানুষ Unconscious থাকবে। মুনকার নাকিরের প্রশ্নের উত্তর দিবে কীভাবে, এই প্রশ্নটায় কবরের জীবনের সাথে দুনিয়ার জীবনের তুলনা করছেন যা ভুল। কবরের জীবন শুরু হয় মৃত্যুর পর, এর সাথে দেহ, ব্রেন, হৃদয় কোনো কিছুর সম্পর্ক নেই। কবরের জীবন রুহের সাথে সম্পর্কিত। মুনকার নাকির জবাব চাইবে রুহের কাছে। শাস্তিও রুহই পাবে। তাই তার দেহ পুড়িয়ে ছাই করে ফেললেও সে কবরের জীবনের প্রশ্ন হতে বাঁচতে পারে না।[21]বিস্তারিত ইসলামি আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৭-১২০

এরপর প্রশ্ন করেছেন হৃদয় হাদিস মুখস্থ করে, কিন্তু এমন কিছু আমার খুঁজে পাইনি, একটি হাদিস রয়েছে তিরমিজির ৩৫৭০ এ কিন্তু আমার জানা মতে সেটা জাল হাদিস।[22].মুখস্তশক্তি বাড়ানোর দু’আ, তিরমিজি ৩৫৭০. হতে পারে তৎকালীন সময়ে বলার বা ভাষার সুবিধার্থে ওলামাগণ বা সালাফগণ কেউ মুখস্থ করার বিষয়ের সাথে অন্তরকে মিলিয়ে থাকতে পারেন, যেহেতু তখন এত অ্যাডভান্স নলেজ ছিল না।

আর মেরাজের সময় রাসুলের হৃদয় পরিশুদ্ধ করার যে ঘটনাটি তা কলবের সাথে জড়িত। কলব বুকে থাকে, ব্রেনে নয়, কলবের সাথে তাকওয়া, ইমান, হেদায়েতের সম্পর্ক। কলব এর বাংলা আক্ষরিক অনুবাদ হৃৎপিণ্ড নয়, আর হৃদপিণ্ডেই শুধু কলব সীমাবদ্ধ না বরং তার সাথে আরো কিছু জড়িত।[23]এটা দেখুন প্রশ্ন উত্তর পর্ব ।। Dr. Imam Hossain শায়েখের ভিডিও এর  ৩:৫৬-৪:২০ অংশটি বিশেষ ভাবে দেখতে পারেন, এছাড়া প্রথমেই বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে।

ইসলামের মতে ইমান আনয়ন, হেদায়েত পাওয়া এসব কলব বা হৃদয়ের সাথে সম্পর্কিত। এখন কেউ বলতে পারে ব্রেনের সাথে। কিন্তু এখানে সমস্যা হলো হিউম্যান কনশাসনেস-এর জটিলতা এখনও দর্শন ও বিজ্ঞান দূর করতে পারেনি, ব্রেনের সাথে এর প্রপার কানেকশন সমন্বয় করতে পারে নি, ব্যাখ্যা করতে পারে নি। যা আমরা কিছুক্ষণ আগেও বিস্তারিত আলোচনা করেই এসেছি।[24]আরো দেখুন How does the human brain create consciousness, and why?. অসংখ্য গবেষক, ডাক্তার হৃদয় যে ব্রেনের সাথে কানেক্টেড তার স্বীকার করেছেন, মানুষের দুঃখ, কষ্ট, দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ যে হৃদয় বা হৃৎপিণ্ডের উপর প্রভাব ফেলে তা স্বীকার করেন।[25].The Fascinating Relationship Between the Heart and Brain. [26].SCIENTIFIC DISCOVERY! “A Little Brain In The Heart”.[27].Heart/Mind Connection – Dr. Burchill , The mind, heart and body connection.

এছাড়া আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে হৃদয় কেবল রক্তের পাম্প নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় অঙ্গ, যা মানুষের আবেগ, অনুভূতি, সহজাত প্রবৃত্তি এবং চিন্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বায়ান আল ইসলাম ওয়েবসাইটের এই বিষয়ে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বেশ কিছু তথ্যের আলোকে একটি আর্টিকেল লিখা হয়েছে, তা হতে গবেষণার মূল বিষয়বস্তুগুলোর কয়েকটি উল্লেখ করছি,[28].دعوى خطأ القرآن في وصف القلب بأنه يعقل.

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদয় এবং এটির চারপাশের ঝিল্লি মিলিয়ে বহু স্নায়ু কোষ রয়েছে যা মস্তিষ্কের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ রক্ষা করে। হৃদয় বিভিন্ন হরমোন নিঃসরণেও অনেক ভুমিকা রাখে। হৃদয়ের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক শক্তি মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যোগাযোগে ভূমিকা রাখে। হৃদয় স্নায়ু ও রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করে তথ্য সংরক্ষণের কাজও করতে পারে।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে হৃদয় প্রতিস্থাপনের সময় নতুন হৃদয় রোগীর বুকে স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে স্পন্দন শুরু করে, মস্তিষ্কের নির্দেশের অপেক্ষা না করে। হৃদয় ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি রেডিও ট্রান্সমিটারের মতো সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে হৃদয়ের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র মস্তিষ্কের তুলনায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। পরীক্ষায় দেখা যায় বিভিন্ন আবেগীয় প্রভাবের ছবি—যেমন ভয়, মৃত্যু, হত্যা, বন্ধুত্ব বা রোমান্স— যখন দেখানো হয়, তখন হৃদয় মস্তিষ্কের তুলনায় অনেক দ্রুত সাড়া দেয়।

হৃদয় প্রতিস্থাপনের সময় দেখা গেছে, প্রতিস্থাপনকারী ব্যক্তি দাতার কিছু স্মৃতি ফিরে পেতে পারেন ও প্রতিস্থাপনকারীর মানসিকতা ৫ থেকে ১০% পরিবর্তিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা বলে আসছিলেন যে হৃদয় মস্তিষ্ক থেকে আসা সংকেতে সাড়া দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা আবিষ্কার করেছেন যে এই সম্পর্ক দ্বিমুখী, অর্থাৎ উভয়ে একে অপরকে প্রভাবিত করে। কিছু হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের ঘটনায় দেখা যায় গ্রহিতা দাতার কিছু ত্রুটি বা শারীরিক সমস্যার মত সমস্যার সম্মুখীন হওয়া শুরু করেন।

কিছু গবেষণা পরামর্শ দেয় যে হৃদয় ও উপলব্ধির মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে, হৃদয় মানুষের উপলব্ধি ও বোধের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি বেশ কিছু ঘটনায় যেসব রোগীর হৃদয় কৃত্রিম হৃদয় দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে, তারাদের বেলায় দেখা গিয়েছে তারা অনুভূতি, আবেগ এবং ভালোবাসার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন বা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।

এরকম এক ঘটনার বিষয়ে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা নীতিবিদ্যা বিভাগের প্রধান প্রফেসর আর্থার ক্যাপলান বলেন,

“বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। আমরা শরীরের সঙ্গে আবেগ ও মানসিকতার সম্পর্ক অধ্যয়ন করিনি। আমরা শরীরকে শুধু একটি যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করি।”

সেহেতু এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, সব কাজ শুধুমাত্র মস্তিষ্কের এই ধারণাটিই ভুল। বিজ্ঞান পরম সত্য না, পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই বিষয়টি মেনে নিতে না পাড়ায় অনেকে নতুন কিছু সহজে হজম করতে পারে না। চিকিৎসা বিজ্ঞানও দিন দিন উন্নতি করছে, গত ১০ বছর আগের চিকিৎসা ও এর পরের চিকিৎসা শাস্ত্রে অনেক বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

আরেকটি বিষয় বলেছিলেন হিকমত নিয়ে, এখন হিকমত বক্ষে ঢেলে দেওয়া থেকে কি বোঝায়, হিকমত অন্তরে থাকে? হিকমত অর্থ প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, গভীর জ্ঞান, যুক্তি বা অন্তর্নিহিত কারণ। এটাও মনের সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যা মোটামুটি হিউম্যান কনশাসনেস-এর সাথে কিছুৃটা সম্পর্কিত। আমরা জানি, Heart এর সাথে সবকিছুই রক্তের মাধ্যমে কানেকটেড, শুধু রক্ত নয়, বহু স্নায়ু কোষ ও ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক শক্তি দ্বারাও। এখন এরকমও তো হতে পারে যে, হিকমত হার্টে দেওয়া হলো যেন মস্তিষ্ক, স্নায়ু রজ্জু বা Spinal cord থেকে শুরু করে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

আবার, এমনও তো হতে পারে যে, আল্লাহ হৃৎপিণ্ডে হিকমত ঢেলে দিলেন যেন তা হৃৎপিণ্ড থেকে সবার সারা দেহে ছড়িয়ে পরে ও ভালো কোনো signal পেলে খুশি হয়, তার প্রতিই আগ্রহ প্রকাশ করে, হারাম কিছু সামনে পড়লে তাতে কেঁপে ওঠে, তা থেকে দূরে থাকার প্রতি ইন্টারনালি সংকেত পাঠায়। রাসুলের বক্ষ বিদীর্ণ করার ঘটনার হাদিসটিতে দেখা যায়,

জিবরীল (আঃ) তাঁর গলায় নিচ হতে বুক পর্যন্ত বিদীর্ণ করলেন এবং তাঁর বুক ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিস্কার করলেন, তারপর সোনার একটি তশ্তরী আনা হল। এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিক্মাতে। তাঁর বুক ও গলার রগগুলো এর দ্বারা পূর্ণ করলেন। তারপর সেগুলো যথাস্থানে রেখে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে পৃথিবীর আসমানের দিকে উঠলেন।[29]সহিহ বুখারী, হাদিস ৭৫১৭

উক্ত হাদিসে তো ডিরেক্টলি বলা হয়নি যে হিকমত হার্টে থাকে। এখন হার্টে ঢেলে দেওয়ার উপরে উল্লিখিত অর্থও তো হতে পারে! হাদিস এর এই সনদে দেখুন গলার শিরার কথা বলা আছে। আমরা জানি Carotid Artery দিয়েই Brain Blood supply পায়। এক হাদিসে এসেছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

মানুষের মধ্যে শায়ত্বন (শয়তান) (তার) শিরা-উপশিরায় রক্তের মধ্যে বিচরণ করে থাকে।[30]মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৬৮

এই হাদিসটিও উক্ত ব্যাখ্যার সমর্থন করে। আর আল্লাহ উনার রাসুলের ক্ষেত্রে শয়তানের প্রবেশের রাস্তাটাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন[31]মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৬৭; সহিহ বুখারী, হাদিস ৭৫১৭ কলব পরিষ্কার করার দ্বারা। আর এসব এমন বিষয় যা বিজ্ঞান হয়তো কখনো বুঝতেও পারবে না, বিশ্বাস ও স্বীকার করাতো দূরের বিষয়।

বৈজ্ঞানিক আলোচনা বাদই দিলাম, এখন বৈজ্ঞানিক কারণ ছাড়াও আল্লাহ যদি হৃদয়ের মাধ্যমে হেদায়েত প্রবেশ করার পথ রাখেন, তাহলে কি বিজ্ঞান তা ব্যাখ্যা করতে পারবে? আল্লাহ হেদায়েত কীভাবে প্রবেশ করাচ্ছেন, কীভাবে হেদায়েত দিচ্ছেন সেটাও তো ব্যাখ্যা করতে পারবে না। শয়তান যদি কলবের মাধ্যমে মানুষকে ওয়াস ওয়াসা দেয় তাহলে কি বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারবে? পারবে নাতো! শয়তান কীভাবে আসে, কীভাবে প্রবেশ করে, কীভাবে ওয়াস ওয়াসা দেয়, কীভাবে সেটা কাজ করে কিছুরই ব্যাখ্যা দিতে পারবে না বিজ্ঞান। তাকওয়া, দ্বীন, হেদায়েত, কনশাসনেস এসব কিছুর সাথেইতো রক্ত চলাচলের সম্পর্ক নেই, কারণ এগুলো ফিজিক্যাল অবজেক্ট না, কিন্তু আল্লাহ চাইলে রক্তের মাধ্যমেও এসব প্রবেশ করাতেই পারেন, যা বিজ্ঞানের দ্বারা বোঝাই সম্ভব না। কারণ বিজ্ঞান বস্তুবাদে বিশ্বাসী; সে অতিপ্রাকৃত বিষয়াদি ব্যাখ্যাই করতে পারে না।

ওলামাগণের ব্যাখ্যা

আমরা দেখেছি মন হলো একটি সহজাত গুণ, শক্তি এবং বোঝার, সচেতনতার ও জ্ঞানের ক্ষমতা। কোরআনেও আল্লাহ বারবার হৃদয় বা কলবের সাথে বুদ্ধি ও চিন্তার সম্পর্কই স্থাপন করা হয়েছে।[32]সূরা হজ: ৪৬, সূরা আ’রাফ: ১৭৯, সূরা তাওবা: ৪৫, সূরা তাওবা: ৯৩, সূরা কাফ: ৩৭, সূরা মুনাফিকুন: ৩, সূরা ফাতহ: ১১, সূরা আনফাল: ৭০, সূরা আহযাব: ৫, সূরা বাকারা: ২২৫ এই কারণে কেউ কেউ বলেছেন কলব শব্দের আক্ষরিক অর্থ হৃপিন্ড বা হার্ট নয়। তাদের মতে এটি আক্ষরিক ভাবে হৃদপিণ্ড বুঝায় না বরং আকল বা যৌক্তিকতা এবং ইমেশনের বেলেন্স করার মত একটি বিষয়কে বুঝায়। কলব দিয়ে চিন্তা করা, বুঝা এসব আরবী ভাষায় প্রচলিত রূপক।[33]এই মতটি আরো ভালো ভাবে বুঝতে দেখতে পারেন – هل العقل في القلب أم الدماغ؟ ; The LOST meaning of قلب and فؤاد (HEART) in the Qur’an ; What is the Difference Between the “Heart” (Qalb), “Kindling Heart” (fuaad), and the “Pure Intellect” (lubb)?.

দার্শনিকদের অধিকাংশ—কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া—বলেছেন যে, মন বা আকলের স্থান হলো মস্তিষ্ক। তাদের অনুসরণ করেছে কিছু মুসলিম। ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, মনের স্থান হলো মস্তিষ্ক, ইমাম আহমদ হতেও এমন একটি মত পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ের কিছু স্কলারও এই মতটি লালন করেন।[34].هل العقل في القلب أم الدماغ.[35].مسألة العقل في القلب أو الدماغ.[36].هل العقل في القلب أم الدماغ؟.

আরেকটি মত হল মন কলব, হৃদয়ে, অন্তরে বা বুকে। ক্লাসিকাল ওলামাগণ প্রায় সবাই এটাই মানতেন, ইমাম মালেক ও শাফেয়ীর অনুসারীগণের মাযহাব ছিল এটি। উনাদের বক্তব্য হল মন হৃদয়ে থাকে, এর আলো মস্তিষ্কে পৌঁছে এবং সেখান থেকে ইন্দ্রিয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। মস্তিষ্কের সাথে হৃদয়ের একটি সম্পর্ক রয়েছে, আল্লাহ এমন প্রথা চালু করেছেন যে মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণে মনের ক্ষতি হয়, যদিও মন সেখানে নেই। [37].هل العقل في القلب أم الدماغ؟.

এই মতভেদের মাঝে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যাটি দিয়েছেন শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ), আধুনিক বিজ্ঞান ও দ্বীনি মতভেদ উভয় সাবজেক্টেই উনার ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে সুন্দর ও যৌক্তিক অবস্থান ধারণ করে, উনার ব্যাখ্যা মস্তিষ্কের ভুমিকাও অস্বীকার করে না আবার কলবের ভূমিকাও অস্বীকার করে না। উনাকে মনের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দেন,

“মন হলো মানুষের আত্মার সাথে সম্পৃক্ত, যা বোঝার ক্ষমতা রাখে। আর দেহের দিক থেকে এটি হৃদয়ের সাথে সম্পৃক্ত, যেমন আল্লাহ বলেছেন: ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি, যাতে তাদের হৃদয় থাকে যা দিয়ে তারা বুঝতে পারে।’ [সূরা হজ: ৪৬]। ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘তুমি কীভাবে জ্ঞান অর্জন করলে?’ তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসু জিহ্বা ও বুদ্ধিমান হৃদয় দিয়ে।’”

তবে, হৃদয় শব্দ দ্বারা কখনো সেই শারীরিক মাংসপিণ্ড বোঝানো হয়, যা শরীরের বাঁ দিকে অবস্থিত এবং যার ভিতরে কালো রক্তের একটি গুটি থাকে। এটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে: “দেহে একটি মাংসপিণ্ড আছে, যখন তা সুস্থ থাকে, পুরো দেহ সুস্থ থাকে; আর যখন তা নষ্ট হয়, পুরো দেহ নষ্ট হয়।” কখনো হৃদয় বলতে মানুষের ভিতরের সত্তাকে বোঝানো হয়, যেমন গম, বাদাম বা আখরোটের ভিতরের অংশকে তার ‘হৃদয়’ বলা হয়। এ থেকেই কূপকে ‘কলীব’ বলা হয়, কারণ তার ভিতরের অংশ বের করা হয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি হৃদয় বলতে এটি বোঝানো হয়, তবে মন মস্তিষ্কের সাথেও সম্পৃক্ত। এ কারণে অনেক চিকিৎসক বলেন, মনের স্থান মস্তিষ্ক। ইমাম আহমদের থেকেও এই মত বর্ণিত আছে। তাঁর কিছু অনুসারী বলেন, মনের মূল উৎস হৃদয়ে, কিন্তু যখন তা পূর্ণতা পায়, তখন তা মস্তিষ্কে পৌঁছে।

প্রকৃত সত্য হলো, আত্মা বা রূহ, যা মানুষের সত্তা, তা হৃদয় ও মস্তিষ্ক উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত। মনের যে বৈশিষ্ট্য, তা উভয়ের সাথেই সম্পর্কিত। তবে চিন্তা ও বিশ্লেষণের সূচনা মস্তিষ্কে, আর ইচ্ছা ও সংকল্পের মূল উৎস হৃদয়ে। ইচ্ছা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন কোনো বিষয় মনে কল্পনা করা হয়। তাই হৃদয়েরও এতে ভূমিকা থাকে। এটি মস্তিষ্ক থেকে শুরু হয় এবং এর প্রভাব মস্তিষ্কে ফিরে আসে। অর্থাৎ, শুরু ও শেষ উভয়ই মস্তিষ্কে, এবং উভয় মতেরই সঠিক দিক আছে।[38].مسألة العقل في القلب أو الدماغ.

বিজ্ঞানবাদ হতে সতর্কতা

আমাদের একটা বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, সেটা হল বিজ্ঞানবাদীদের প্রতারণা হতে। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানবাদ এক জিনিস নয়, বস্তুবাদ হল বিজ্ঞানবাদের দর্শন, বিশ্বাস, আদর্শের মূল ভিত্তিগুলোর অন্যতম একটি। এই বিষয়ে আমাদের ইফতেখার হোসেন সীমান্ত ভাইয়ের আলোচনা রয়েছে ইউটিউবে, এছাড়া সংশয়বাদী বইতেও এই নিয়ে আলোচনা রয়েছে, শামসুল আরেফিন শক্তি ভাইয়ের ওয়েবসাইটে এই নিয়ে আলোচনা রয়েছে এবং ‘বিজ্ঞান বনাম বিজ্ঞানবাদ’ নামের একটি বইও রয়েছে, সেগুলো দেখতে পারেন।

তাই বিজ্ঞানবাদীদেরকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে অজ্ঞতার পরিচয় দেওয়া যাবে না। বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল, বিজ্ঞান অনেক কিছু জানে না, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় জানছে, মত পরিবর্তন করছে, অনেক বিষয়ে পরিক্ষা করতে পারে না, অনেক কিছুর ব্যাখ্যা দিতে পারে না, কারণ বিজ্ঞান বস্তুজগত নিয়ে কাজ করে। কিন্তু বিজ্ঞানবাদীরা বিষয়টাকে স্বীকারতো করেই না বরং বিজ্ঞানকে ভিত্তি বানিয়েই ধর্ম ও স্রষ্টাকে অস্বীকার করে। আমি এখানে ছোট করে কয়েকটা উদাহরণ দিই (নিম্নোক্ত তথ্যগুলো অবিশ্বাসী কাঠগড়ায় বই হতে সংগৃহীত), বিস্তারিত আপনি আমাদের অন্য লেখক ভাইদের আলোচনাগুলো দেখলেই জানতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। যেমন বিজ্ঞানী ড. লোমেল বলেন,

যখন কোনো নতুন ধারণা সাধারণভাবে গৃহীত (প্রকৃতিবাদী) দৃষ্টিভঙ্গির সাথে খাপ খায় না, তখন অনেক বিজ্ঞানী একে হুমকিস্বরূপ মনে করেন। তাই যখন প্রমাণলব্ধ গবেষণায় নতুন কোনো ঘটনা বা ফ্যাক্ট উঠে আসে-যা কিনা বিজ্ঞানের প্রভাবশালী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিলে না-তখন হয় এদের অস্বীকার করা হয়, অথবা দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়, এমনকি বিদ্রূপও করা হয়। এতে আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ বিজ্ঞানের ইতিহাস এমনটা ঘটেছে বারবার। নবধারণা কদাচিৎ উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করে, সর্বদাই তারা বাধার সম্মুখীন হয়।[39]Pim Van Lommel, Consciousness Beyond Life: The Science of the Near-Death Experiences; Chapter 15: Some Implications of NDE Studies

ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন (ID) বিজ্ঞানীদের বড় অংশই অত্যন্ত অপছন্দ করেন। এমনকি এ নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করার চেষ্টা করলে চাকরিচ্যুতও করা হয় পশ্চিমা অ্যাকাডেমিয়া থেকে। একজন অজ্ঞেয়বাদির ভাষ্যে জানা যায়,

প্রচলিত বুনিয়াদি ধারণাগুলো যুক্তির আতশকাঁচে যাচাই করার জন্য দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক সততা। কিন্তু ডারউইনকে নিয়ে খটকা প্রকাশ করা মানেই নিজেকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেয়া; কোনো নিস্তার নেই। অ্যাকাডেমিয়াতে এমন ভাবনা মাথায়ই আনা যাবে না। এ যেন অমার্জনীয় অপরাধ।[40]Richard T. Halvorson, Confessions of a Skeptic, The Harvard Crimson, April 7, 2003

পদার্থবিদ পল ডেভিস এই বাস্তবতা ইঙ্গিত করে তার অভিজ্ঞতা জানান,

জগত নিয়ে একটি পুর্ণাঙ্গ তত্ত্ব দাঁড় করাতে সংগ্রামরত অনেক বিজ্ঞানী প্রকাশ্যেই স্বীকার করেন-এই তত্ত্ব দাঁড় করানোর মাধ্যমে তারা স্রষ্টাকে ঝেড়ে ফেলতে চান। তারা এতটাই গোঁড়া যে-স্রষ্টার দিকে ইঙ্গিত করতে পারে এমন কোনো শব্দও তারা সহ্য করতে পারেন না। যেমন প্রকৃতিতে কোনো ‘অর্থ’, ‘উদ্দেশ্য’ অথবা ‘পরিকল্পনা’ প্রভৃতির ছাপ দেখা। তাদের দৃষ্টিতে খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাস হলো বিপজ্জনক ও শিশুসুলভ মতিভ্রম। এরা ধর্মকে এতটাই ভণ্ডামিপূর্ণ এবং ক্ষতিকর ভাবেন যে ধর্মকে আমূলে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে চান।… বিজ্ঞান ও ধর্মকে তারা দুটি চরম পরস্পর বিরোধী ওয়ার্ল্ডভিউ মনে করেন।[41]Paul Davis, The Goldilocks Enigma: Why is the Universe Just Right for Life, Chapter 1: The Big Question, subheading

জিনতত্ত্ববিদ রিচার্ড লেউনটিন অকপটে স্বীকার করেছেন,

কমনসেন্স-বিরোধী বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মেনে নিতে আমাদের কতই-না আগ্রহ,… শুরু থেকেই (a priori) বস্তুবাদের প্রতি আনুগত্যের কারণে আমরা বাধ্য হই, জগৎ অনুসন্ধানের এমন কিছু উপকরণ ও ধারণা তৈরি করতে যা কেবল জাগতিক ব্যাখ্যারই জন্ম দেবে। সে ব্যাখ্যা যতই কাণ্ডজ্ঞানহীন হোক, আমজনতার কাছে যতই দুর্বোধ্য ঠেকুক! আসল কথা হলো, আমরা ঈশ্বর নিয়ে কথাবার্তা সহ্য করব না। তাই আমাদের নিকট বস্তুবাদ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।[42]Richard Lewontin, Billions and Billions of Demons; Available at: http://www.nybooks.com/articles/1997/01/09/billions-and-billions-of-demons.

আল্লাহু আলাম

এই লিখায় যত কল্যাণকর ও সঠিক বিষয় তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার তরফ হতে, এবং
যত অকল্যাণকর ও ভুলত্রুটি তা শয়তান ও আমার তরফ হতে।

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 তার লিসানুল আরব ১১/৪৮৫, তাজুল আরূস ৩০/১৮
2 আবুল মুআলী জুওয়াইনী আল-বুরহান ১/১৯
3 তাজুল আরূস ৩০/১৯
4 আল-মুফরাদাত পৃ. ৫৭৭
5 আল-মুসতাসফা পৃ. ২০
6 আকীদাহ বায়নাস সালাফ ওয়াল মুতাকাল্লিমীন, হাসান বিন মুহাম্মাদ শাবানাহ, পৃষ্ঠা নং: ৪৭
7 তাজ আল-উরুস ৩০/১৯; আল-হাওয়াশি আল-বাহিয়্যাহ আলা আল-আকাইদ আন-নাসাফিয়া ১/৬০-৬১
8 .https://www.alukah.net/culture/0/173337/.
9 .https://www.islamweb.net/amp/ar/fatwa/320353/, السادة المتقين بشرح إحياء علوم الدين 202 ; “المعجم الفلسفي” (2/86) ; كتاب الروح – ابن القيم – ط عطاءات العلم 2/520 ;  كتاب دروس للشيخ سعيد بن مسفر 2/6 ; كتاب شرح البخاري للسفيري = المجالس الوعظية في شرح أحاديث خير البرية 2/216 ;  كتاب تفسير النيسابوري = غرائب القرآن ورغائب الفرقان 4/73
10 কিতাবুত তিবিয়ান ফী আইমানিল কুরআন – প্রকাশনা: আতাউল ইলম, ৬২৬
11 মাওসুআতু ফিকহিল কুলুব, ২/১২৭৭-১২৭৮
12 .Ghazzali.
13 তাফসির আল-বাইদাউয়ী – আনওয়ারুত তানজিল ওয়া আসরারুত তাউইল ৪/১৪৯
14 এসব বিষয়ে আরো জানতে দেখতে পারেন Jeffrey Long & Paul Perry, Evidence of the Afterlife: The Science of Near-Death Experiences, Introduction; Pim Van Lommel, Consciousness Beyond Life: The Science of the Near-Death Experiences; Chapter 2: What is a Near-Death Experience?
15 দেখুনঃ Emma Young, No Medical Explanation for Near-Death Experiences. The New-Scientist, 14 December 2001
16 দেখুনঃ Matt McMillen, Does Your Brain Know When You’re Dead? WebMD, Nov. 8, 2017
17 “আল-ইলম ফী মানযুরহুল জাদীদ” (Science In A New Perspective) পৃষ্ঠা ২৬-৪৩
18 .هل العقل في القلب أم الدماغ.
19 .Does The Brain Does The Thinking or The Heart?.
20 .কলব কোথায় থাকে মাথায় না বুকে?.
21 বিস্তারিত ইসলামি আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৭-১২০
22 .মুখস্তশক্তি বাড়ানোর দু’আ, তিরমিজি ৩৫৭০.
23 এটা দেখুন প্রশ্ন উত্তর পর্ব ।। Dr. Imam Hossain শায়েখের ভিডিও এর  ৩:৫৬-৪:২০ অংশটি বিশেষ ভাবে দেখতে পারেন, এছাড়া প্রথমেই বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে।
24 আরো দেখুন How does the human brain create consciousness, and why?.
25 .The Fascinating Relationship Between the Heart and Brain.
26 .SCIENTIFIC DISCOVERY! “A Little Brain In The Heart”.
27 .Heart/Mind Connection – Dr. Burchill , The mind, heart and body connection.
28 .دعوى خطأ القرآن في وصف القلب بأنه يعقل.
29 সহিহ বুখারী, হাদিস ৭৫১৭
30 মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৬৮
31 মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস ৬৭; সহিহ বুখারী, হাদিস ৭৫১৭
32 সূরা হজ: ৪৬, সূরা আ’রাফ: ১৭৯, সূরা তাওবা: ৪৫, সূরা তাওবা: ৯৩, সূরা কাফ: ৩৭, সূরা মুনাফিকুন: ৩, সূরা ফাতহ: ১১, সূরা আনফাল: ৭০, সূরা আহযাব: ৫, সূরা বাকারা: ২২৫
33 এই মতটি আরো ভালো ভাবে বুঝতে দেখতে পারেন – هل العقل في القلب أم الدماغ؟ ; The LOST meaning of قلب and فؤاد (HEART) in the Qur’an ; What is the Difference Between the “Heart” (Qalb), “Kindling Heart” (fuaad), and the “Pure Intellect” (lubb)?.
34 .هل العقل في القلب أم الدماغ.
35, 38 .مسألة العقل في القلب أو الدماغ.
36, 37 .هل العقل في القلب أم الدماغ؟.
39 Pim Van Lommel, Consciousness Beyond Life: The Science of the Near-Death Experiences; Chapter 15: Some Implications of NDE Studies
40 Richard T. Halvorson, Confessions of a Skeptic, The Harvard Crimson, April 7, 2003
41 Paul Davis, The Goldilocks Enigma: Why is the Universe Just Right for Life, Chapter 1: The Big Question, subheading
42 Richard Lewontin, Billions and Billions of Demons; Available at: http://www.nybooks.com/articles/1997/01/09/billions-and-billions-of-demons.
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button