সুলতান মাহমুদ ও সোমনাথ মন্দির – পর্ব ২

প্রথম পর্বে দেখানো হয়েছে যে বিভিন্ন প্রখ্যাত গবেষক ও ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে সুলতান মাহমুদ ভারত অভিযান ও সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করেছিলেন জাগতিক কারণে, ধন-সম্পদের লোভে।
এই পর্বে এর বিপরীত দিক দেখার চেষ্টা করবো। বেশকিছু ঐতিহাসিক মনে করেন তাঁর ভারত অভিযান ছিলো সম্পূর্ণ ধর্মকেন্দ্রিক, যেমন
বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা কাদিরবিল্লাহ (৯৯১-১০৩১) সুলতান মাহমুদকে ‘ইয়ামিন-উদ্ দৌলা’ (সাম্রাজ্যের দক্ষিণ হস্ত) ও ‘আমিন-উল-মিল্লাত’’ (ধর্মের রক্ষক) উপাধি প্রদান করেন।
সেহেতু মাহমুদ স্বাধীন সুলতান হিসেবে এই উপমহাদেশে পৌত্তলিকতা এবং বর্ণবাদ প্রথা ধ্বংস করে ইসলাম প্রচারের নিমিত্ত যুদ্ধাভিযানে প্রবৃত্ত হন বলে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ঈশ্বরীপ্রসাদ মনে করেন। তিনি বলেন,
বাগদাদের খলিফা কাদিরবিল্লাহ সুলতান মাহমুদের উপর পাক-ভারতে ইসলাম প্রচারের দায়িত্বভার ন্যস্ত করেন। এই দায়িত্ব পালনের জন্যই মাহমুদ বার বার পাক ভারতে অভিযান চালান। তিনি এই উপমহাদেশে ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেন। হিন্দুদের সুবিখ্যাত নগরকোট ও সোমনাথ মন্দির এবং আরও কয়েকটি অঞ্চল তাঁর হস্তে বিধ্বস্ত হয়। কতিপয় রাজাসহ পাক-ভারতের শত শত হিন্দুকে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন।[1]ঈশ্বরীপ্রসাদ, এ শর্ট হিস্ট্রি অব মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া, পৃ ৪৪-৪৫
অবশ্য ভারতকে ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্যই সুলতান মাহমুদ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এই মত প্রথম ব্যক্ত করেন সমসাময়িক ঐতিহাসিক উৎবী তাঁর তারিখ-ই- ইয়ামিনী গ্রন্থে।
ভি এ স্মিথ মাহমুদকে ‘ইসলামের অন্যতম গৌরব বলে মনে করেন’। তিনি বলেছেন,
ভারতের মূর্তি পূজকদের বিরুদ্ধে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ বলতে তিনি যা বুঝতেন, তা চালিয়ে যেতে ওয়াদা গ্রহণ করেছিলেন।[2]ভি এ স্মিথ, অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, পৃ ২০৮
ঐতিহাসিক হেগ বলেছেন,
তিনিই সর্বপ্রথম ভারতের মধ্যস্থলে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন।[3]ডব্লিউ হেগ সম্পাদিত, অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া[4]উল্লেখ্য, সুলতান মাহমুদের আগেই এই অঞ্চলে ইসলাম প্রবেশ করে বলে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত – সম্পাদক
শ্রীবিনয় ঘোষও মনে করেন যে সুলতান মাহমুদ ধর্মীয় কারণে ভারত অভিযান করেছিলেন।
সুলতান মাহমুদের ‘মূর্তি বিনাশ’ ও ‘ভারত অভিযান’ সম্পর্কে প্রাচ্যের মুসলমান দুনিয়ার একজন অন্যতম কবি ‘ফারুখী সিসতানী’র একটি চমকপ্রদ ব্যাখ্যা আছে।
কবির দাবি অনুযায়ী, ‘সোমনাথ অভিযানে তিনি মহমুদের একজন সহযাত্রী ছিলেন। আধুনিক ঐতিহাসিকরা অতিরিক্ত কল্পনা প্রবণতার দায়ে তাঁর বক্তব্য খারিজ করলেও মূর্তিপূজা বিরোধিতার মূল্যায়নে এই ব্যাখ্যাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, ‘সোমনাথের মূর্তিটি কোনো হিন্দু বিগ্রহ নয়, বরং প্রাক-ইসলাম আরবের কোনো দেবী মূর্তি। তিনি আরও বলেন যে ‘সোমনাত’ (পারসীয় ভাষায় প্রায়শই লেখা হত) নামটি আসলে, সু-মনত বা মনাত- এর স্থান। আমরা কোরান থেকেই জানতে পারি যে লাত, উজ্জাহ এবং মনাত এই তিন দেবী প্রাক-ইসলাম যুগে ব্যাপকভাবে পূজিত হতেন এবং স্বয়ং সন্ত মোহম্মদ (সাঃ) তাঁদের দেবগৃহ ও মূর্তি ধ্বংসের আদেশ দেন।
অন্যদুটি মুর্তি ধ্বংস করা হলেও ‘মনাত’-এর মূর্তিটি গোপনে সরিয়ে গুজরাটের কোনো পূজাস্থলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বলে বিশ্বাস।[5]Narratives And The Making of History, Two Lectures, p – 38-39
কিছু বর্ণনা অনুসারে মনাত কোনো মূর্তি নয়, একটি অবয়বহীন কৃষ্ণবর্ণ শিলাখণ্ড। ফলে ‘লিঙ্গম’- এর সাথে এর সাদৃশ্য পাওয়া স্বাভাবিক। বহু তুর্ক-পারসি আখ্যানে এই কাহিনি ছায়াপাত করেছে। তার মধ্যে অনেকে কাহিনিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন, আবার অনেকেই মুর্তিটিকে হিন্দু বিগ্রহ বলেই তাঁদের ক্ষীণ দাবি জানিয়েছেন।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পারস্যের বিখ্যাত কবি সা’দী একটি বিভ্রান্তিকর বর্ণনা দিয়েছিলেন।তাঁর দাবি, তিনি সোমনাথ মন্দির দর্শন করেছেন, যদিও এ বিষয়ে অন্যত্র কোনো উল্লেখ নেই। তাঁর দেখা বিগ্রহটি ছিল হাতির দাঁতে তৈরি মনাতের মতোই অলংকৃত একটি নিখুঁত নারী মূর্তি, যাঁর হাত দুটি ইন্দ্রজালে নড়ে। কিন্তু গোপন তদন্তে ‘সা’দী’ জানতে পারেন যে বিগ্রহের আড়াল থেকে একজন মানুষ সূক্ষ্ম রজ্জুর সাহায্যে এই হস্ত সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে।তাঁর মতে মন্দিরের সমস্ত আচার অনুষ্ঠানের পরিচালনা করতেন ইরান থেকে আগত পুরোহিতগণ।[6]সাদী বুস্তান, এ এইচ এডওয়ার্ডস, ১৯১১, দ্য বুস্তান অব সাদী, লন্ডন, পৃ ১০৯
মুহাম্মদ নাজিম বলেছেন,
….‘মনাত’-এর সাথে এই যোগসূত্রটি মহমুদের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করে। তিনি শুধু হিন্দু মূর্তি ধ্বংসকারী বিগ্রহ-বিদ্বেষী বীরই নন, ‘মনাত’ ধ্বংসের মাধ্যমে তিনি মোহম্মদের নির্দেশেরও প্রতিপালনকারী। সুতরাং তিনি উভয়ভাবেই ইসলামের পতাকাবাহী।[7]এফ সিস্তানি, এম নাজিম, ১৯৩১, দ্য লাইফ এন্ড টাইমস অব সুলতান মামুদ গজন
Footnotes
| ⇧1 | ঈশ্বরীপ্রসাদ, এ শর্ট হিস্ট্রি অব মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া, পৃ ৪৪-৪৫ |
|---|---|
| ⇧2 | ভি এ স্মিথ, অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, পৃ ২০৮ |
| ⇧3 | ডব্লিউ হেগ সম্পাদিত, অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া |
| ⇧4 | উল্লেখ্য, সুলতান মাহমুদের আগেই এই অঞ্চলে ইসলাম প্রবেশ করে বলে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত – সম্পাদক |
| ⇧5 | Narratives And The Making of History, Two Lectures, p – 38-39 |
| ⇧6 | সাদী বুস্তান, এ এইচ এডওয়ার্ডস, ১৯১১, দ্য বুস্তান অব সাদী, লন্ডন, পৃ ১০৯ |
| ⇧7 | এফ সিস্তানি, এম নাজিম, ১৯৩১, দ্য লাইফ এন্ড টাইমস অব সুলতান মামুদ গজন |




