হাদিসমুনকিরে হাদিস

সহীহ মুসলিমে ইমাম মুসলিমের হাদিস সংকলনের মানহাজ কেমন ছিল?

আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস ছলাতু ওয়াস সালামু আলা রসূলিল্লাহ।

অতঃপর শায়খ আবদুর রহমান আল-মু‘আল্লিমি[1]আল-আনওয়ার আল-কাশিফা গ্রন্থের ১/২৯ পৃষ্ঠায় বলেছেনঃ

ثم أخرجه عن رافع بن خديج وفيه «فقال لعلكم لولم تفعلوا كان خيرًا. فتركوه فنقضت.. فقال: إنما أنا بشر، إذا أمرتكم بشيء من دينكم فخذوا به، وإذا أمرتكم بشيء من رأيي فإنما أنا بشر. قال عكرمة: أو نحو هذا»

ثم أخرجه عن حماد بن سلمة عن هشام بن عروة عن أبيه عن عائشة، وعن ثابت عن أنس …» وفيه «فقال: لو لم تفلعوا لصلح» وقال في آخره «أنتم أعلم بأمر دنياكم»

عادة مسلم أن يرتب روايات الحديث بحسب قوتها: يقدم الأصح فالأصح. قوله ﷺ في حديث طلحة «ما أظن يغني ذلك شيئًا، إخبار عن ظنه، وكذلك كان ظنه، فالخبر صدق قطعًا، وخطأ الظن ليس كذبًا، وفي معناه قوله في حديث رافع «لعلكم …» وذلك كما أشار إليه مسلم أصح مما في رواية حماد، لأن حمادًا كان يخطئ.

তারপর তিনি (ইমাম মুসলিম) এটি (হাদিসটি) রাফে‘ ইবন খাদিজ থেকে বর্ণনা করেছেন, যাতে আছে: “অতঃপর তিনি (নবী ﷺ) বললেন: সম্ভবত তোমরা তা না করলে ভালো হতো। তখন তারা তা পরিত্যাগ করল এবং শস্য নষ্ট হয়ে গেল… তারপর তিনি বললেন: নিশ্চয় আমি একজন মানুষ মাত্র। যখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীনের কোনো বিষয়ে আদেশ করি, তখন তোমরা তা গ্রহণ করো। আর যখন আমি তোমাদেরকে আমার নিজস্ব মতামত থেকে কোনো কিছু আদেশ করি, তবে নিশ্চয় আমি একজন মানুষ মাত্র।” ইকরিমা (রহ.) বলেন: অথবা এরকমই কিছু বলেছেন।”

তারপর তিনি (ইমাম মুসলিম) এটি হাম্মাদ ইবন সালমাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হিশাম ইবন ‘উরওয়া থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ‘আয়িশাহ (রাযি.) থেকে। এবং তিনি সাবিত থেকে, তিনি আনাস (রাযি.) থেকে… এতে আছে: “অতঃপর তিনি (নবী ﷺ) বললেন: যদি তোমরা তা না করতেই তবে ঠিক হতো।” এবং এর শেষে তিনি বলেছেন: “তোমরা নিজেদের পার্থিব বিষয়ে বেশি জান।”

[ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর অভ্যাস হলো হাদিসের রেওয়ায়াতগুলো তাদের শক্তির ক্রমানুসারে সাজানো: তিনি সর্বাধিক সহীহ (শক্তিশালী) থেকে শুরু করে পরবর্তী সহীহগুলোর ক্রম বজায় রাখেন। তালহা (রাযি.)-এর হাদিসে তাঁর ﷺ বাণী “আমার মনে হয় না এতে কোনো উপকার হবে” এটি তাঁর ধারণা সম্পর্কে অবহিত করা। আর সেটাই ছিল তাঁর ধারণা। সুতরাং এ বাণী (খবর) একেবারে সত্য। আর ধারণার ভুল মিথ্যা নয়। এরই সমার্থবোধক তাঁর ﷺ বাণী রাফে‘ (রাযি.)-এর হাদিসে “সম্ভবত তোমরা…”। আর এটি, যেমনটি মুসলিম ইঙ্গিত করেছেন, হাম্মাদের রেওয়ায়েতের চেয়ে বেশি সহীহ (নির্ভরযোগ্য)। কারণ হাম্মাদ ভুল করতেন। (সমাপ্ত)]

ফাহাম: ইমাম মুসলিম (রহ.) হাদিস সংকলনের সময় রেওয়ায়াতগুলো তাদের সহীহতার ক্রম অনুযায়ী সাজিয়েছেন, সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য থেকে শুরু করে কম নির্ভরযোগ্য পর্যন্ত। হাদিস বিশারদ শাইখ মুক্ববিল বিন হাদী আল-ওয়াদি’ঈ (রহ.) দারাকুতনির[2]আল-ইলযামাত ওয়াত-তাতাব্বু’ গ্রন্থের তাহকীকে লিখেছেন:

ص / 147: لعل مسلماً ــ رحمه الله ــ أخرجه ليبين علته كما وعد بذلك في المقدمة.

পৃষ্ঠা ১৪৭: সম্ভবত মুসলিম (রহ.) এটি বর্ণনা করেছেন এর দুর্বলতা (বা ত্রুটি) স্পষ্ট করার জন্য, যেমন তিনি তার গ্রন্থের ভূমিকায় এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ص / 351: والذي يظهر أن مسلماً رحمه الله ما ذكره إلا ليبين علته.

পৃষ্ঠা ৩৫১: এবং যে কথা স্পষ্ট হয় তা হলো মুসলিম (রহ.) এটি শুধুমাত্র এর দুর্বলতা (বা ত্রুটি) স্পষ্ট করার জন্যই উল্লেখ করেছেন।

ص / 366: والظاهر أن مسلماً أخرجه ليبين علته، لأنه قد ذكره.

পৃষ্ঠা ৩৬৬: এবং প্রতীয়মান হয় যে মুসলিম (রহ.) এটি বর্ণনা করেছেন এর দুর্বলতা (বা ত্রুটি) স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে, কেননা তিনি ইতিমধ্যেই এটি উল্লেখ করেছেন।

বিঃদ্রঃ এখান থেকে বোঝা যায় যে ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ কখনো কখনো হাদিসের দুর্বলতা ত্রুটি নির্দেশ করার জন্য হাদিস বর্ণনা করতেন। আর এটি তৃতীয় স্তরের অন্তর্ভুক্ত। যা মূল হাদিসের অন্তর্ভুক্ত নয়। মুতাবায়াত ও শাহাওয়ীদ এর অন্তর্ভুক্ত।

হাসান আবুল আশবাল আল-জুহায়রী ইমাম মুসলিমের সহীহ গ্রন্থ বিন্যাসের মানহায সম্পর্কে লিখেন:

منهج الإمام مسلم في ترتيبه لصحيحه

أما عن منهج الإمام مسلم في كتابه صحيح مسلم، فقد قسّم الكتاب إلى ثلاثة أقسام، والطبقات إلى ثلاث طبقات؛ أي أنه قسّم الحديث نفسه إلى ثلاثة أقسام، وقسّم الرواة إلى ثلاث طبقات، وكل طبقة مرتبطة بقسم، فالطبقة الأولى من الرواة مرتبطة بالقسم الأول من الحديث، والطبقة الثانية بالقسم الثاني، والطبقة الثالثة بالقسم الثالث.

فهو يروي عن الحفاظ الضابطين المتقنين الأئمة الأعلام القسم الأول، لكن كثيراً من الناس فهم خطأ هذا التقسيم، فقال: إن الإمام مسلماً حين صنّف الصحيح على ثلاث طبقات، جعل الثلث الأول من الكتاب حديث الحفاظ، والثلث الثاني من الكتاب حديث أهل الصدق والأمانة، ثم جعل القسم الثالث رواية المختلف فيهم، وهذا كلام غير صحيح، وأما قولنا: إنه صنّف الأبواب على هذه التقاسيم وهذه الطبقات، فهذا يعني: أنه فعل ذلك في الباب الواحد، يقول مثلاً: باب تحريم الكذب، فيأتي بثلاث روايات: الرواية الأولى من رواية أهل الحفظ والضبط والإتقان من الأئمة الحفاظ، فيكون اعتماد الإمام مسلم على هذه الطبقة وعلى هذا القسم في الاحتجاج بهذه الرواية على صحة الباب.

والطبقة الثانية من طبقات الرواة هم من نزلوا عن الطبقة الأولى درجة، ولكنهم لم يخرجوا عن حد الاحتجاج، فهم أهل صدق وهم أهل أمانة وعدل، ولكن كل ما في الأمر أن روايتهم تنزل درجة عن رواية الحفاظ المتقنين أصحاب الطبقة الأولى.

فـ مسلم عليه رحمة الله يأتي بأهل هذه الطبقة وهذا القسم استئناساً وتأصيلاً بجوار القسم الأول والطبقة الأولى.

ইমাম মুসলিমের তাঁর সহীহ গ্রন্থের বিন্যাস পদ্ধতি সম্পর্কে বলতে গেলে, তিনি গ্রন্থটিকে তিনটি ভাগে এবং বর্ণনাকারীদের তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছেন; অর্থাৎ তিনি হাদীসকে নিজেই তিনটি বিভাগে এবং বর্ণনাকারীদের তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন, এবং প্রতিটি স্তর একটি বিভাগের সাথে সম্পর্কিত। প্রথম স্তরের বর্ণনাকারীরা হাদীসের প্রথম বিভাগের সাথে সম্পর্কিত, দ্বিতীয় স্তর দ্বিতীয় বিভাগের সাথে এবং তৃতীয় স্তর তৃতীয় বিভাগের সাথে।

তিনি প্রথম বিভাগে হাফেজ, নির্ভুল, দক্ষ, মহান ইমামগণের কাছ থেকে বর্ণনা করেন। কিন্তু অনেক মানুষ ভুলভাবে এই বিভাজন বুঝে নিয়েছে। তারা বলে: ইমাম মুসলিম যখন সহীহ গ্রন্থকে তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করেছিলেন, তখন তিনি গ্রন্থের প্রথম এক-তৃতীয়াংশকে হাফেজগণের হাদীস, দ্বিতীয় এক-তৃতীয়াংশকে সত্যবাদী ও আমানতদার লোকদের হাদীস এবং তৃতীয় বিভাগকে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বর্ণনা হিসেবে স্থান দিয়েছেন। এটি সঠিক নয়। আর আমরা বলি: তিনি এই বিভাজন ও স্তরগুলোর ভিত্তিতে অধ্যায়গুলো সাজিয়েছেন, এর অর্থ হলো: তিনি একটি অধ্যায়ের ভিতরে এই কাজ করেছেন। তিনি উদাহরণস্বরূপ বলেন: মিথ্যা বলার হারাম হওয়া অধ্যায়। এরপর তিনি তিনটি বর্ণনা উপস্থাপন করেন: প্রথম বর্ণনা হাফেজ, নির্ভুল ও দক্ষ ইমাম হাফেজগণের কাছ থেকে, যারা প্রথম স্তরের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, ইমাম মুসলিম এই অধ্যায়ের সত্যতা প্রমাণে এই বর্ণনার ওপর নির্ভর করতে এই স্তর ও বিভাগের উপর ভিত্তি করে।

আর বর্ণনাকারীদের দ্বিতীয় স্তর হলো তারা যারা প্রথম স্তর থেকে এক ধাপ নিচে, কিন্তু তারা প্রমাণযোগ্য হওয়ার সীমা থেকে বেরিয়ে যাননি। তারা সত্যবাদী, আমানতদার ও ন্যায়পরায়ণ, কিন্তু কেবল তাদের বর্ণনা প্রথম স্তরের দক্ষ হাফেজগণের বর্ণনার তুলনায় এক ধাপ নিচে।

সুতরাং ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) এই স্তর ও বিভাগের লোকদের বর্ণনা আনয়ন করেন সমর্থন ও ভিত্তি স্থাপনের জন্য, প্রথম বিভাগ ও প্রথম স্তরের পাশাপাশি।

وأما الطبقة الثالثة فهم قوم اختلف فيهم أهل العلم بين جرح وتعديل، فـ مسلم عليه رحمة الله حين أورد روايتهم إنما أوردها استئناساً أي: لمجرد أن تكون شاهداً للرواية الأولى والثانية، ولم يوردها تأصيلاً واحتجاجاً، وأنه ليس في الباب غيرها، وإنما قد صح الباب من خلال الطبقة الأولى والقسم الأول، والطبقة الثانية والقسم الثاني، فكونه أوردها أو لم يوردها لا يؤثر ذلك في الحكم العام، فبان لنا بهذا أن الإمام مسلماً قسّم كتابه إلى ثلاثة أقسام كما قسّم الرواية إلى ثلاث طبقات.

আর তৃতীয় স্তর হলো এমন কিছু লোক যাদের সম্পর্কে বিদ্বানগণের মধ্যে মন্তব্য (জারহ ও তাদীল)-এ মতবিরোধ রয়েছে। সুতরাং ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) যখন তাদের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, তিনি কেবল (শাহিদ) সমর্থনস্বরূপ তা উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ শুধুমাত্র প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ণনার জন্য সাক্ষ্য হিসেবে। তিনি এগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে কোনো অধ্যায়ের একমাত্র প্রমাণ বা ভিত্তি (আসল) হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং সংশ্লিষ্ট বিষয়টি ইতিমধ্যেই প্রথম স্তর ও প্রথম বিভাগ এবং দ্বিতীয় স্তর ও দ্বিতীয় বিভাগের বর্ণনার মাধ্যমেই সহীহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতএব, তিনি এই তৃতীয় প্রকারের বর্ণনা উল্লেখ করলেন আর নাই করলেন – তা ঐ অধ্যায়ের সামগ্রিক শরয়ী বিধানের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। এ থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর গ্রন্থের বিষয়বস্তুকে তিনটি বিভাগে এবং বর্ণনাকারীদেরকে তিনটি স্তরে সুবিন্যস্ত করেছেন।[3]কিতাব শারহু সহীহি মুসলিম ১/১৬ — হাসান আবুল আশবাল (হাসান আবুল আশবাল আল-জুহায়রী).

ফাহাম: ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থকে তিনটি ভাগে এবং বর্ণনাকারীদের তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম স্তরের বর্ণনাকারীরা হাফেজ, নির্ভুল ও দক্ষ ইমামগণ; দ্বিতীয় স্তরের বর্ণনাকারীরা সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ, তবে প্রথম স্তরের তুলনায় এক ধাপ নিচে; এবং তৃতীয় স্তরের বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে বিদ্বানগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তৃতীয় স্তর কেবল প্রথম দুই স্তরের বর্ণনার জন্য সাক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি স্বতন্ত্রভাবে কোনো অধ্যায়ের প্রমাণ হিসেবে নেওয়া হয়নি।

“আল-আজুব্বাহ ‘আম্মা আশকালাশ শাইখ আদ-দারাকুতনি ‘আলা সহীহ মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ” (ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজের সহীহ-এর উপর শাইখ দারাকুতনি যেসব জটিল প্রশ্ন/সমালোচনা উত্থাপন করেছেন, তার জবাবসমূহ) লেখক: আবু মাসউদ আদ-দিমাশকি (মৃত্যু: ৪০১ হিজরি) এ গ্রন্থে আবু মাসউদ আদ-দিমাশকি প্রায় ছাব্বিশটি হাদীস সম্পর্কে জবাব দিয়েছেন, যেগুলো আদ-দারাকুতনি ইমাম মুসলিমের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই সমালোচনাগুলোর কিছু সঠিক নয়; অথবা ইমাম মুসলিম যে সমালোচিত ও দুর্বল (মা’লুল) হাদীসগুলো উল্লেখ করেছেন, সেগুলো তিনি হাদীসটির দুর্বলতা বা এর রাবীদের মধ্যকার মতভেদ স্পষ্ট করার জন্যই উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও তিনি সঠিক ও যথার্থ অন্যান্য জ্ঞানভিত্তিক জবাব প্রদান করেছেন।

‘মা হাকাজা তুরাদু ইয়া সা’দাল ইবিল‘, লেখক: ডক্টর হামজাহ আল-মালিবারী এতে লেখক প্রাচীন মুহাদ্দিসগণের হাদীস সমালোচনা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং উদাহরণ হিসেবে ইমাম মুসলিম ও তাঁর কিতাবে হাদীস বিন্যাসের পদ্ধতি উপস্থাপন করেছেন। তিনি এতে স্পষ্ট করেছেন যে, ইমাম মুসলিম প্রায়শই হাদীসের শক্তি ও দুর্বলতার ভিত্তিতে তাঁর কিতাবের হাদীসগুলো বিন্যস্ত করেন।

‘উবকুরিয়াতুল ইমাম মুসলিম ফি তারতীবি আহাদিসি মুসনাদিহিস সহীহ‘ লেখক: ডক্টর হামজাহ আল-মালিবারী, এই গ্রন্থ ইমাম মুসলিমের তাঁর কিতাবের হাদীস বিন্যাস পদ্ধতি ব্যাখ্যার জন্য রচিত হয়েছে। এতে লেখক প্রমাণ করেছেন যে, ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ-এ প্রয়োজনানুসারে ও প্রাসঙ্গিকভাবে কিছু দুর্বলতা/সমালোচনা (তা’লিলাত) উল্লেখ করেন। তিনি ইমাম মুসলিমের সনদ নির্বাচন, উপস্থাপন পদ্ধতি ও ব্যবহারে তাঁর সূক্ষ্মদৃষ্টি ও প্রতিভা ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ফাহাম: তাহলে উপরোক্ত তিনটি বইয়ের লেখকদের আলোচনা থেকে বোঝা যায়: ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে হাদীসগুলোকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তিন স্তরে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম স্তরে এনেছেন সবচেয়ে সহীহ ও নির্ভরযোগ্য সনদের বর্ণনা, দ্বিতীয় স্তরে এনেছেন শক্তিশালী হলেও প্রথমটির তুলনায় সামান্য নিচের বর্ণনা, আর তৃতীয় স্তরে এমন রাবীদের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যাদের সম্পর্কে জারহ-তাদীলের মতভেদ আছে—যেগুলো তিনি কখনোই মূল দলিল হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং শুধু শাহিদ ও মুতাবি’ হিসেবে আনেন। সমালোচিত বা দুর্বল সনদের কিছু হাদীস তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই উল্লেখ করেছেন যাতে সনদের মতভেদ, ইল্লাত ও তুলনামূলক অবস্থান স্পষ্ট হয়। এসবের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইমাম মুসলিমের হাদীস সাজানোর পদ্ধতি সাধারণ সংগ্রহ নয়; বরং গভীর উসূলি, গবেষণামূলক এবং সনদ-প্রজ্ঞাভিত্তিক একটি সূক্ষ্ম বাছাই-পদ্ধতি।

প্রশ্ন উত্তর আর আমার বিস্তারিতভাবে উপস্থাপনা:

সহীহ মুসলিমে হাদিস বিন্যাসের ব্যাখ্যায় আলেমগণ দুটি দলে বিভক্ত হয়েছেন। প্রথম দল বলেছেন যে তিনি সহীহ হাদিসগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় দল বলেছেন যে তিনি সনদ বিশুদ্ধতার দৃষ্টিকোণ থেকে হাদিস বিন্যাসের ক্ষেত্রে কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করেননি। তাহলে কোন মতটি সঠিক, যুক্তিসহ জানতে চাই।

উত্তরঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবাদের উপর।

আমাদের জবাব নিম্নরূপ:

ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর সহীহের ভূমিকায় স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে তিনি হাদিসগুলোকে তিনভাগে ভাগ করেছেন: প্রথম ভাগ: নির্ভরযোগ্য, সুদক্ষ হাফেজগণ বর্ণিত হাদিস। দ্বিতীয় ভাগ: যাদের পরিচিতি মাঝারি স্তরের এবং স্মৃতিশক্তি ও দক্ষতার ক্ষেত্রে মধ্যম মানের, তাদের বর্ণিত হাদিস। তৃতীয় ভাগ: দুর্বল ও প্রত্যাখ্যাত বর্ণনাকারীদের হাদিস। আর তিনি যখন প্রথম ভাগের হাদিসগুলো পূর্ণ করবেন, তখন এরপর দ্বিতীয় ভাগের হাদিসগুলো উল্লেখ করবেন। আর তৃতীয় ভাগের হাদিসের দিকে তিনি মনোযোগ দেবেন না, বরং তা বাদ দেবেন।

এই বিভাজনের উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। তাদের কেউ কেউ মনে করেছেন যে তিনি প্রত্যেক স্তরের জন্য আলাদা বই রচনা করবেন। আবার কেউ কেউ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। সঠিক মত হলো, তিনি প্রত্যেক অধ্যায়ের হাদিসগুলো সনদ বিশুদ্ধতার যে বিভাজন অনুসরণ করেছেন তার ভিত্তিতে সাজাতে চেয়েছেন। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘সহীহ মুসলিমের ভূমিকা’ গ্রন্থে বলেছেন:

ذكر مسلم رحمه الله في أول مقدمة صحيحه أنه يقسم الأحاديث ثلاثة أقسام الاول ما رواه الحفاظ المتقنون والثاني ما رواه المستورون المتوسطون في الحفظ والاتقان والثالث ما رواه الضعفاء والمتركون وأنه اذا فرع من القسم الاول أتبعه الثاني وأما الثالث فلا يعرج عليه فاختلف العلماء في مراده بهذا التقسيم فقال الامامان الحافظان أبو عبد الله الحاكم وصاحبه أبو بكر البيهقي رحمهما الله أن المنية اخترمت مسلما رحمه الله قبل اخراج القسم الثاني وانه إنما ذكر القسم الاول قال القاضي عياض رحمه الله وهذا مما قبله الشيوخ والناس من الحاكم أبي عبد الله وتابعوه عليه قال القاضي وليس الأمر على ذلك لمن حقق نظره ولم يتقيد بالتقليد فانك اذا نظرت تقسيم مسلم في كتابة الحديث على ثلاث طبقات من الناس كما قال فذكر أن القسم الاول حديث الحفاظ وأنه اذا انقضى هذا أتبعه بأحاديث من لم يوصف بالحذق والاتقان مع كونهم من أهل الستر والصدق وتعاطى العلم ثم أشار إلى ترك حديث من أجمع العلماء أو اتفق الاكثر منهم على تهمته ونفى من اتهمه بعضهم وصححه بعضهم فلم يذكره هنا ووجدته ذكر في أبواب كتابه حديث الطبقتين الاوليين وأتى بأسانيد الثانية منهما على طريق الاتباع للاولى والاستشهاد أو حيث لم يجد في الباب الأول شيئا وذكر أقواما تكلم قوم فيهم وزكاهم آخرون وخرج حديثهم ممن ضعف أو اتهم ببدعة وكذلك فعل البخارى فعندى أنه أتى بطبقاته الثلاث في كتابه على ما ذكر ورتب في كتابه وبينه في تقسيمه وطرح الرابعة كما نص عليه فالحاكم تأول أنه إنما أراد أن يفرد لكل طبقة كتابا ويأتى بأحاديها خاصة مفردة وليس ذلك مراده بل انما أراد بما ظهر من تأليفه وبان من غرضه أن يجمع ذلك في الأبواب ويأتى بأحاديث الطبقتين فيبدأ بالاولى ثم يأتى بالثانية على طريق الاستشهاد والاتباع حتى استوفى جميع الاقسام الثلاثة ويحتمل أن يكون أراد بالطبقات الثلاث الحفاظ ثم الذين يلونهم والثالثة هي التي طرحها وكذلك علل الحديث التي ذكر ووعد أنه يأتي بها قد جاء بها في مواضعها من الأبواب من اختلافهم في الاسانيد كالارسال والاسناد والزيادة والنقص وذكر تصاحيف المصحفين وهذا يدل على استيفائه غرضه في تأليفه وادخاله في كتابه كلما وعد به قال القاضي رحمه الله وقد فاوضت في تأويلي هذا ورأيى فيه من يفهم هذا الباب فما رأيت منصفا الا صوبه وبان له ما ذكرت وهو ظاهر لمن تأمل الكتاب وطالع مجموع الأبواب ولا يعترض على هذا بما قاله بن سفيان صاحب مسلم أن مسلما أخرج ثلاثة كتب من المسندات أحدها هذا الذي قرأه على الناس والثاني يدخل فيه عكرمة وبن إسحاق صاحب المغازي وأمثالها والثالث يدخل فيه من الضعفاء فانك اذا تأملت ما ذكر بن سفيان لم يطابق الغرض الذي أشار إليه الحاكم مما ذكر مسلم في صدر كتابه فتأمله تجده كذلك إن شاء الله تعالى هَذَا آخِرُ كَلَامِ الْقَاضِي عِيَاضٍ رَحِمَهُ اللَّهُ وهذا الذي اختاره ظاهر جدا والله اعلم

ইমাম মুসলিম (রহ.) তার সহীহ গ্রন্থের শুরুর ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, তিনি হাদীসকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন:

প্রথম: যা বর্ণনা করেছেন সূক্ষ্ম স্মৃতিশক্তি ও সুদক্ষ হাফেজগণ।
দ্বিতীয়: যা বর্ণনা করেছেন সততা সম্পন্ন, মধ্যম পর্যায়ের হিফজ ও দক্ষতাসম্পন্ন রাবীগণ।
তৃতীয়:যা বর্ণনা করেছেন দুর্বল ও বর্জনীয় রাবীগণ।

এবং তিনি উল্লেখ করেছেন যে, প্রথম বিভাগ থেকে হাদীস বর্ণনার পর তিনি দ্বিতীয় বিভাগের হাদীস অনুসরণ করাবেন, কিন্তু তৃতীয় বিভাগের প্রতি মনোযোগ দেবেন না। এই বিভাজনের উদ্দেশ্য নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। ইমাম হাফেজ আবু আবদুল্লাহ আল-হাকিম এবং তার সাথী আবু বকর আল-বাইহাকী (রহ.) বলেন যে, মুসলিম (রহ.) দ্বিতীয় বিভাগ প্রকাশ করার পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন, তাই তার গ্রন্থে কেবল প্রথম বিভাগের হাদীসই সংকলিত হয়েছে।

কাজী ইয়াজ (রহ.) বলেন, “শাইখগণ ও সাধারণ আলেমরা আবু আবদুল্লাহ আল-হাকিমের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন এবং তার অনুসরণ করেছেন।” তবে তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি গভীর গবেষণা করে এবং অন্ধ অনুসরণে আবদ্ধ থাকে না, তার কাছে বিষয়টি এমন নয়। কেননা আপনি যদি মুসলিম (রহ.)-এর গ্রন্থে হাদীসের শ্রেণিবিন্যাস দেখেন, তিনি যেমন বলেছেন, মানুষের তিনটি স্তর উল্লেখ করেছেন: প্রথম বিভাগ হাফেজদের হাদীস, যখন তা শেষ হবে, তখন তিনি এমন লোকদের হাদীস উল্লেখ করবেন যারা সূক্ষ্ম স্মৃতিশক্তি ও দক্ষতার গুণে ভূষিত নন, বরং তারা সততা ও গোপনীয়তার অধিকারী এবং জ্ঞান চর্চাকারী। এরপর তিনি এমন ব্যক্তিদের হাদীস বর্জনের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যাদের সম্পর্কে আলেমগণের ঐকমত্য বা অধিকাংশের মতে দোষ রয়েছে। আর যাদের সম্পর্কে কেউ দোষারোপ করেছেন আবার কেউ নির্দোষ বলেছেন, তিনি তাদের হাদীস এখানে উল্লেখ করেননি।”

“আমি দেখেছি যে, তিনি তার গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়ে প্রথম দুই স্তরের হাদীস বর্ণনা করেছেন, এবং দ্বিতীয় স্তরের হাদীসসমূহ প্রথম স্তরের অনুসরণ ও সমর্থনের পথে উল্লেখ করেছেন, অথবা এমন স্থানে যেখানে প্রথম স্তরে কোনো হাদীস পাননি। তিনি এমন কিছু রাবীর হাদীসও বর্ণনা করেছেন, যাদের সম্পর্কে একদল সমালোচনা করেছেন, অন্যদল তাদের নির্ভরযোগ্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। দুর্বল বা বিদআতের অপবাদে অভিযুক্তদের হাদীসও তিনি অনুরূপভাবে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রহ.)ও অনুরূপ করেছেন।”

“আমার মতে, তিনি তার গ্রন্থে উল্লিখিত তিনটি স্তরের হাদীসই সংকলন করেছেন, সেগুলো সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত করেছেন, তার বিভাজন সুস্পষ্ট করেছেন এবং চতুর্থ স্তর বর্জন করেছেন, যেমনটি তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। আল-হাকিম (রহ.) ধারণা করেছেন যে, মুসলিম (রহ.) প্রতিটি স্তরের জন্য পৃথক গ্রন্থ রচনা করতে এবং শুধুমাত্র সেই স্তরের হাদীস পৃথকভাবে বর্ণনা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এটি তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তার সংকলন পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য থেকে যা প্রতিভাত হয়, তা হলো তিনি সবগুলো অধ্যায়ের মধ্যে হাদীসগুলো একত্রিত করেছেন, প্রথম স্তরের হাদীস দিয়ে শুরু করে, তারপর দ্বিতীয় স্তরের হাদীস সমর্থন ও অনুসরণের পথে উল্লেখ করেছেন, এভাবে তিনটি বিভাগের হাদীসই তিনি গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।”

“এটাও সম্ভব যে, তিন স্তর দ্বারা তিনি প্রথমত: হাফেজগণ, দ্বিতীয়ত: তাদের নিকটতমগণ এবং তৃতীয়ত: যাদের হাদীস তিনি বর্জন করেছেন, তাদেরকে বুঝিয়েছেন। আর তিনি হাদীসের দুর্বল দিক (ইলাল) সম্পর্কে যা উল্লেখ করার ওয়াদা করেছিলেন, তা গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানেই উল্লেখ করেছেন… বিশেষত অধ্যায়সমূহে সনদগত মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে, যেমন: মুরসাল ও মুত্তাসিল সনদ, হাদীসে বৃদ্ধি-কমানি এবং মুসাহিফদের (হাদীস লিপিকারীদের) ভুল-ত্রুটির উল্লেখ। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি তার সংকলনের উদ্দেশ্য পূর্ণ করেছেন এবং তার গ্রন্থে প্রতিশ্রুত সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত করেছেন।”

কাজী ইয়াজ (রহ.) আরও বলেন, “আমি আমার এই ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিভঙ্গি এ বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা করেছি। আমি কোনো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ছাড়া এমন কাউকে দেখিনি, যে এটিকে সমর্থন করেনি এবং আমি যা উল্লেখ করেছি, তা তার কাছে স্পষ্ট হয়নি। যে ব্যক্তি গ্রন্থটি গভীরভাবে অধ্যায়ন করে এবং সমস্ত অধ্যায়ের সামগ্রিক বিষয়বস্তু বিবেচনা করে, তার নিকট এটি স্পষ্ট।”

“এতে মুসলিম (রহ.)-এর ছাত্র ইবনে সুফিয়ানের বক্তব্য দ্বারা আপত্তি উত্থাপন করা যায় না, তিনি বলেছেন যে, মুসলিম (রহ.) মুসনাদ গ্রন্থসমূহ থেকে তিনটি গ্রন্থ সংকলন করেছেন: প্রথমটি, যা তিনি মানুষের কাছে পাঠ করিয়েছেন; দ্বিতীয়টি, যাতে ইকরিমা, মাগাযী বিশারদ ইবনে ইসহাক ও তাদের সমতুল্যদের হাদীস অন্তর্ভুক্ত; এবং তৃতীয়টি, যাতে দুর্বল রাবীদের হাদীস অন্তর্ভুক্ত। কারণ আপনি যদি ইবনে সুফিয়ানের এই উক্তি গভীরভাবে বিবেচনা করেন, তাহলে দেখবেন এটি আল-হাকিমের সেই উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যা তিনি মুসলিমের গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখিত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করেছেন। আপনি গভীরভাবে চিন্তা করলে, ইন শা আল্লাহ, আপনি তাই দেখতে পাবেন।”

এটি ছিল কাজী ইয়াজ (রহ.)-এর বক্তব্যের সমাপ্তি। আর তার এই মতামত অত্যন্ত স্পষ্ট। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।[4]শারহু সহীহ মুসলিম: ১/২৩-২৪

ফাহাম: উপরের দীর্ঘ আলোচনা সমগ্রভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ইমাম মুসলিম (রহ.) হাদীস বিন্যাসে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিত পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন, এবং এ বিষয়ে কাজী ইয়াজ (রহ.)-এর ব্যাখ্যাই সবচেয়ে যথার্থ ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে ইমাম মুসলিম আলাদা তিনটি গ্রন্থ রচনা করেননি, বরং একই গ্রন্থের মধ্যেই তিন শ্রেণির হাদীস সুশৃঙ্খলভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অধ্যায়সমূহে ইমাম মুসলিম সর্বপ্রথম স্থান দিয়েছেন প্রথম স্তরের সর্বোচ্চ সহীহ সনদের হাদীসগুলোকে—যা নির্ভরযোগ্য, হাফেজ, সূক্ষ্ম স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন রাবীদের মাধ্যমে বর্ণিত।

Read More...  কোরআন কি রাসুলের হুকুম না মানার কথা বলে?

এরপর তিনি দ্বিতীয় স্তরের মধ্যম মানের হিফজ ও দক্ষতাসম্পন্ন কিন্তু সৎ ও গ্রহণযোগ্য রাবীদের বর্ণনাকে অনুসরণ, সমর্থন বা বিকল্প সনদের ভূমিকা হিসেবে যুক্ত করেছেন, বিশেষত তখন যখন প্রথম স্তরে অতিরিক্ত সনদ বা বৈচিত্র্য পাওয়া যায়নি।

তৃতীয় স্তর সম্পর্কে কাজী ইয়াজ (রহ.) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে ইমাম মুসলিম দুর্বল, বর্জনীয় বা আলেমদের ঐকমত্যে সমালোচিত রাবীদের বর্ণনা তাঁর গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেননি; এগুলো সম্পূর্ণভাবে পরিহার করেছেন। তবে এমন কিছু রাবীর হাদীস তিনি মাঝে মাঝে উল্লেখ করেছেন যাদের সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ ছিল—কেউ তাদের নির্ভরযোগ্য বলেছেন, আবার কেউ সমালোচনা করেছেন। এদের বর্ণনা তিনি মূল দলিল হিসেবে নয়, বরং প্রসঙ্গগত আলোচনা, তুলনামূলক সনদ, বা ইলাল ব্যাখ্যার প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে উল্লেখ করেছেন। এটি দেখায় যে তৃতীয় স্তরের বর্ণনাকে তিনি কখনোই প্রাধান্য দেননি এবং মূল হুকুম প্রমাণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি।

সমগ্র আলোচনার ফলাফল হলো—ইমাম মুসলিমের গ্রন্থে প্রাধান্য পেয়েছে প্রথম স্তরের সর্বোচ্চ সহীহ সনদের হাদীস, দ্বিতীয় স্তর এসেছে সমর্থন ও অনুসরণের জন্য, আর তৃতীয় স্তর মূলত বর্জিত, খুব প্রয়োজনে শুধু তুলনামূলক আলোচনায় ব্যবহৃত হয়েছে। কাজী ইয়াজ (রহ.)-এর এই ব্যাখ্যাই ইমাম মুসলিমের বিন্যাস-পদ্ধতির প্রকৃত উদ্দেশ্য ও বাস্তবতাকে সঠিকভাবে তুলে ধরে।

ولا بد من التفريق بين ما أخرجه مسلم في الأصول وبين ما أخرجه في الشواهد. فهو يرتب الأحاديث –عادةً– في كل بابِ بحسب قوة إسنادها. فعندما يتعارض المتن الأول مع الثاني نقدّم الأول لأنه الأصل، بينا الثاني شاهد له. وقد نص على هذا في مقدمة صحيحه، ومعظم الانتقادات هي لأحاديث أخرجها في الشواهد، وأظن عللها لا تخفى عليه

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো: মুসলিম যা মূল হাদিস হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং যা সমর্থনসূচক প্রমাণ (শাওয়াহিদ) হিসেবে বর্ণনা করেছেন, এর মধ্যে পার্থক্য। তিনি সাধারণত প্রতিটি অধ্যায়ের হাদিসগুলো তাদের সনদের শক্তি অনুযায়ী সাজান। তাই যদি প্রথম হাদিসের বক্তব্য দ্বিতীয়টির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, আমরা প্রথমটিকে অগ্রাধিকার দেই কারণ সেটিই মূল, আর দ্বিতীয়টি তার সমর্থনকারী। তিনি তার সহীহ মুসলিমের ভূমিকায় এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন। বেশিরভাগ সমালোচনা সেইসব হাদিসের জন্য যা তিনি সমর্থনসূচক প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর আমার ধারণা, এই দোষগুলো তার কাছে অজানা ছিল না।[5]তথ্যসূত্র:  http://www.ibnamin.com/daef_bukhari_muslim.htm#_Toc127803798 .

সংক্ষেপ:

ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর সহীহ মুসলিম গ্রন্থে হাদিসগুলোকে তিন ভাগে এবং বর্ণনাকারীদের তিন স্তরে বিন্যস্ত করেছেন।

১. প্রথম স্তর ও ভাগ: সবচেয়ে সহীহ, নির্ভরযোগ্য ও দক্ষ হাফেজদের বর্ণিত হাদিস। প্রধান প্রমাণ ও ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত।
২. দ্বিতীয় স্তর ও ভাগ: মধ্যম মানের হিফজ ও দক্ষতার রাবীদের বর্ণিত হাদিস, যা প্রথম স্তরের সমর্থন ও বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন।
৩. তৃতীয় স্তর: দুর্বল, বিতর্কিত বা বর্জনীয় রাবীদের হাদিস। মূল প্রমাণ হিসেবে নয়, কেবল তুলনামূলক, প্রসঙ্গগত বা ইলাল ব্যাখ্যার জন্য সীমিতভাবে উল্লেখ।

ইমাম মুসলিম হাদিসের শক্তি, সনদ ও বিশ্বাসযোগ্যতা বিবেচনা করে এই বিন্যাস করেছেন। অধ্যায়ের মধ্যে হাদিসগুলো সাধারণত তাদের সনদ শক্তির ক্রমে সাজানো, যাতে যদি কোনো হাদিসের বক্তব্য দ্বিতীয়টির সাথে সংঘর্ষ করে, মূল হাদিসকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়। মূল হাদিস ও সমর্থক (শাওয়াহিদ) হাদিসের মধ্যে এই পার্থক্য স্পষ্ট।

ফলশ্রুতিতে, মুসলিমের গ্রন্থটি গভীর গবেষণামূলক, সনদ-নির্ভর ও সুসংগঠিত, যেখানে প্রথম স্তরের হাদিস প্রাধান্য পায়, দ্বিতীয় স্তর সমর্থন দেয়, আর তৃতীয় স্তর প্রয়োজনমতো তুলনামূলকভাবে ব্যবহৃত হয়।

সহীহ মুসলিমের কিছু হাদিসের উপর আপত্তি করলে কি ইজমা নষ্ট হয়?

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া তাঁর কিতাব ‘ক্বায়েদা জালীলা ফিত-তাওয়াসসুল ওয়াল-ওয়াসীলা'[6]ক্বায়েদা জালীলা ফিত-তাওয়াসসুল ওয়াল-ওয়াসীলা পৃষ্ঠা ৮৬-এ, যা ‘মাজমূউল ফাতাওয়া'[7]মাজমূউল ফাতাওয়া ১|২৫৬-এর অন্তর্ভুক্ত, বলেন:

«ولا يبلغ تصحيح مسلم مبلغ تصحيح البخاري. بل كتاب البخاري أجلُّ ما صُنِّف في هذا الباب. والبخاري من أعرف خلق الله بالحديث وعِلله، مع فقهه فيه. وقد ذكر الترمذي أنه لم ير أحداً أعلم بالعلل منه. ولهذا كان من عادة البخاري إذا روى حديثاً اختُلِفَ في إسناده أو في بعض ألفاظه، أن يذكر الاختلاف في ذلك، لئلا يغترَّ بذكره له بأنه إنما ذكره مقروناً بالاختلاف فيه. ولهذا كان جمهور ما أُنكر على البخاري مما صحّحه، يكون قوله فيه راجحاً على قول من نازعه. بخلاف مسلم بن الحجّاج، فإنه نوزع في عدة أحاديث مما خرجها، وكان الصواب فيها مع من نازعه

«আর সহীহ মুসলিমের বিশুদ্ধতার মর্যাদা সহীহ বুখারীর বিশুদ্ধতার মর্যাদায় পৌঁছায় না। বরং বুখারীর কিতাব এ শাখায় (হাদীস সংকলন ও মূল্যায়নে) রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব। আর বুখারী আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে হাদীস ও তার ‘ইলাল’ (সূক্ষ্ম দোষ/ত্রুটি) সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী, সাথে সাথে এর মধ্যে তাঁর ফিকহী উপলব্ধিও রয়েছে। তিরমিযী উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ‘ইলাল’ সম্পর্কে বুখারীর চেয়ে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখেননি। আর এজন্যই বুখারীর অভ্যাস ছিল যে, যখন তিনি এমন হাদীস বর্ণনা করতেন যার সনদে বা এর কিছু শব্দে মতভেদ রয়েছে, তখন তিনি সে বিষয়ে মতভেদ উল্লেখ করতেন, যাতে কেউ তার বর্ণনা করাকে (নিঃশর্ত সঠিক বলে) ধারণা করে ধোঁকায় না পড়ে; বরং তিনি মতভেদের সাথেই তা উল্লেখ করেছেন। এজন্যই বুখারীর উপর যে সমস্ত আপত্তি করা হয়েছে, যেগুলো তিনি সহীহ বলে সাব্যস্ত করেছেন, তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর মতই তাঁর বিরোধীর মতের উপর প্রাধান্য পায়। মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজের ক্ষেত্রে এর বিপরীত; কেননা তিনি যে কয়টি হাদীস বর্ণনা করেছেন, তার বেশ কয়েকটিতেই তার সাথে মতবিরোধ হয়েছে এবং সে ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধীদের মতই সঠিক ছিল।

– كما روى في حديث الكسوف أن النبي ﷺ صلى بثلاث ركعات وبأربع ركعات، كما روى أنه صلى بركوعين. والصواب أنه لم يصل إلا بركوعين، وأنه لم يصل الكسوف إلا مرة واحدة يوم مات إبراهيم. وقد بَيـَّن ذلك الشافعي. وهو قول البخاري وأحمد بن حنبل في إحدى الروايتين عنه. والأحاديث التي فيها الثلاث والأربع فيها أنه صلاها يوم مات إبراهيم. ومعلومٌ أنه لم يمت في يومي كسوف ولا كان له إبراهيمان. ومن نقل أنه مات عاشر الشهر فقد كذب.

2– وكذلك روى مسلم: “خَلَق اللهُ التربةَ يوم السبت”. ونازعه فيه من هو أعلم منه كيحيى بن معين والبخاري وغيرهما، فبينوا أن هذا غلط ليس هذا من كلام النبي ﷺ. والحجة مع هؤلاء، فإنه قد ثبت بالكتاب والسنة والإجماع أن الله تعالى خلق السماوات والأرض في ستة أيام، وأن آخر ما خلقه هو آدم، وكان خلقه يوم الجمعة. وهذا الحديث المختلف فيه يقتضي أنه خلق ذلك في الأيام السبعة. وقد رُوِي إسنادٍ أصح من هذا أن أول الخلق كان يوم الأحد.

3– وكذلك روى أن أبا سفيان لما أسلم طلب من النبي أن يتزوج بأم حبيبة وأن يتخذ معاوية كاتباً. وغلَّطه في ذلك طائفة من الحفاظ.
ولكن جمهور متون الصحيحين متفق عليها بين أئمة الحديث تلقوها بالقبول وأجمعوا عليها وهم يعلمون علما قطعيا أن النبي قالها. وبسط الكلام في هذا له موضع آخر».

২. “যেমনটি তিনি গ্রহণে সালাতের হাদীসে বর্ণনা করেছেন যে, নবী ﷺ তিন রুকূ ও চার রুকূ সহ সালাত আদায় করেছেন, যেমনটি বর্ণনা করা হয়েছে যে তিনি দুই রুকূ সহ সালাত আদায় করেছেন। সঠিক কথা হল, তিনি কেবল দুই রুকূ সহ সালাত আদায় করেছেন এবং তিনি কেবল একবারই গ্রহণ সালাত আদায় করেছেন, সেটা ছিল ইবরাহীম (তাঁর পুত্র) মৃত্যুর দিন। ইমাম শাফিঈ এটি স্পষ্ট করেছেন। এটাই হল ইমাম বুখারী এবং আহমাদ ইবনে হাম্বলের মত (আহমাদের দুটো রেওয়ায়েতের মধ্যে একটি)। যেসব হাদীসে তিন ও চার (রুকূ) বর্ণিত হয়েছে, তাতে আছে যে তিনি তা ইবরাহীমের মৃত্যুর দিন আদায় করেছেন। আর এটা জানা বিষয় যে, তিনি দুইটি গ্রহণের দিন মারা যাননি এবং তাঁর দুইটি ইবরাহীমও ছিল না। আর যে ব্যক্তি বর্ণনা করেছে যে তিনি (ইবরাহীম) মাসের দশ তারিখে মারা গেছেন, সে মিথ্যা বলেছে।

৩. “এমনিভাবে মুসলিম বর্ণনা করেছেন: ‘আল্লাহ তাআলা মাটি সৃষ্টি করেছেন শনিবার দিন।’ এতে তাঁর বিরুদ্ধে এমন ব্যক্তিরা মতভেদ করেছেন যারা তাঁর চেয়ে অধিক জ্ঞানী, যেমন ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, বুখারী ও অন্যান্যরা। তারা স্পষ্ট করেছেন যে এটি একটি ভুল এবং এটি নবী ﷺ-এর কথা নয়। প্রমাণ এদের পক্ষেই রয়েছে; কেননা কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে স্থিরীকৃত যে আল্লাহ তাআলা আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং সর্বশেষ তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা হল আদম, এবং তার সৃষ্টি হয়েছিল জুমুআর দিন। আর এই বিতর্কিত হাদীসটি বোঝায় যে তিনি তা সাত দিনে সৃষ্টি করেছেন। এর চেয়ে বেশি শুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে সর্বপ্রথম সৃষ্টি রবিবার দিন হয়েছিল।

৪. “এমনিভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন যে, আবু সুফিয়ান যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন তিনি নবী ﷺ-এর কাছে আবেদন করেছিলেন যেন তিনি (নবী) উম্মু হাবীবাকে (আবু সুফিয়ানের কন্যা) বিবাহ করেন এবং মুআবিয়াকে লেখক নিযুক্ত করেন। হাফিযগণের একটি দল এতে তাঁর (মুসলিমের) সমালোচনা করেছেন (এটিকে ভুল বলেছেন)।

কিন্তু সহীহাইন (বুখারী ও মুসলিম)-এর অধিকাংশ মাতন (হাদীসের বক্তব্য) হাদীসের ইমামগণের মধ্যে ঐক্যমত্যের বিষয়; তারা সেগুলোকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর তারা নিশ্চিত জ্ঞানে জানেন যে নবী ﷺ তা বলেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য রয়েছে অন্য স্থান।”” (সমাপ্ত)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা বোঝা যায় যে সহীহ মুসলিমের কিছু হাদিসে সমালোচনা থাকলেও সেগুলোর কারণে ইমামদের ইজমা নষ্ট হয় না।

সংকলক, লেখক: ইকরামুজ্জামান রুকন
[(আহলুল হাদীস/ সালাফী, আরাবিক ডিপ্লোমা আল ইলম একাডেমী)]

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 আল-আনওয়ার আল-কাশিফা গ্রন্থের ১/২৯ পৃষ্ঠায়
2 আল-ইলযামাত ওয়াত-তাতাব্বু’
3 কিতাব শারহু সহীহি মুসলিম ১/১৬ — হাসান আবুল আশবাল (হাসান আবুল আশবাল আল-জুহায়রী).
4 শারহু সহীহ মুসলিম: ১/২৩-২৪
5 তথ্যসূত্র:  http://www.ibnamin.com/daef_bukhari_muslim.htm#_Toc127803798 .
6 ক্বায়েদা জালীলা ফিত-তাওয়াসসুল ওয়াল-ওয়াসীলা পৃষ্ঠা ৮৬
7 মাজমূউল ফাতাওয়া ১|২৫৬
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button