দাজ্জাল: ‘হিজবুত তাওহীদ’ নামক দলের ভুল ব্যাখ্যা বনাম ইসলামের সঠিক আকীদা

ভূমিকা
দাজ্জাল কিয়ামতের বড় আলামতগুলোর একটি। কুরআন ও সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে তাঁর ফিতনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতকে সবচেয়ে বেশি যে ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, তা হলো দাজ্জালের ফিতনা।
কিন্তু হিজবুত তাওহীদ বা হিজবুতিয়ান নামে পরিচিত একটি দল প্রচলিত ইসলামী আকীদার বিপরীতে নতুন মতবাদ প্রচার করছে। তারা দাজ্জালকে মানুষ নয়, বরং “সভ্যতা, ব্যবস্থা বা প্রতীক” বলে দাবি করে। এ প্রবন্ধে তাদের প্রধান ৫টি দাবিকে কুরআন, সহীহ হাদীস ও আলেমদের ব্যাখ্যা দ্বারা খণ্ডন করা হলো।
‘হিজবুত তাওহীদ’ দলটির দাবিসমূহের অসারতা
দাজ্জাল কোনো নির্দিষ্ট মানুষ নয়
সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে এসেছে, দাজ্জাল একজন মানুষ হবে।
রাসূল ﷺ বলেন:
“আমি তোমাদেরকে দাজ্জালের ব্যাপারে এত সতর্ক করেছি যে, আমার পরে কোনো নবী তাঁর উম্মতকে এত সতর্ক করেনি। দাজ্জাল হবে একচোখা মানুষ…”[1]সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2933
অন্য হাদীসে এসেছে:
“দাজ্জালের দুই চোখের মধ্যে ‘কাফির’ লেখা থাকবে।”[2]সহীহ বুখারী, হাদীস: 7408; সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2933
এখানে “রজুল (মানুষ)” শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং দাজ্জাল কেবল প্রতীক নয়, বরং একজন বাস্তব মানুষ।
দাজ্জাল আসলে একটি ব্যবস্থা/সভ্যতা
দাজ্জালের ফিতনা একক ব্যক্তির সাথেই সম্পর্কিত। তিনি নিজেকে আল্লাহ দাবি করবে।
হাদীসে এসেছে:
“দাজ্জাল বলবে: আমি তোমাদের প্রতিপালক। অথচ তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে চিনবে না।”[3]সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2937
আরেক হাদীসে:
“তার সঙ্গে জান্নাত ও জাহান্নাম থাকবে। সে যাকে জান্নাত বলবে তা আসলে জাহান্নাম হবে।”[4]সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2934
সভ্যতা বা সিস্টেম আল্লাহর দাবিদার হতে পারে না। কেবল একজন মানুষই তা করতে পারে।
দাজ্জালের একচোখা হওয়া প্রতীকী
রাসূল ﷺ তাঁর শারীরিক বর্ণনা সুস্পষ্ট করেছেন।
হাদীসে:
“সে হবে একচোখা, আর তোমাদের প্রতিপালক একচোখা নয়।”[5]সহীহ বুখারী, হাদীস: 7407; সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2933
আরেক হাদীসে:
“তার ডান চোখ মুছে ফেলা থাকবে, যেন ভাসমান আঙুরের মতো।”[6]সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2934
এখানে প্রতীকী কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বরং দাজ্জালের শারীরিক ত্রুটি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রচলিত আলেমদের বর্ণনা কল্পকাহিনী
দাজ্জাল সম্পর্কে হাদীস এত সংখ্যক সাহাবীর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে যে এটি মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইমাম আন-নববী (রহ.) বলেন:
“দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদীসসমূহ মুতাওয়াতির। অর্থাৎ এত বেশি সংখ্যক সাহাবী থেকে এসেছে যে মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”[7]ইমাম আন-নববী, শরহ মুসলিম, 18/60
হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.) বলেন:
“দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদীস অস্বীকার করা কুফরির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।”[8]হাফিজ ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী, 13/90
সুতরাং একে কল্পকাহিনী বলা সরাসরি সহীহ হাদীস অস্বীকার করা।
দাজ্জালের ফিতনা মানে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা
আধুনিক ভোগবাদী সভ্যতা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্তির একটি মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু সেটিই দাজ্জাল নয়।
রাসূল ﷺ বলেন:
“দাজ্জাল পূর্ব দিক থেকে বের হবে… সে চলাফেরা করবে, আকাশকে বৃষ্টি বর্ষণের নির্দেশ দেবে, জমিনকে ফল ফলানোর নির্দেশ দেবে।”[9]সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2937
আবার এসেছে:
“দাজ্জাল চল্লিশ দিন পৃথিবীতে অবস্থান করবে। প্রথম দিন হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন হবে এক মাসের সমান, তৃতীয় দিন হবে এক সপ্তাহের সমান, আর বাকি দিনগুলো হবে তোমাদের স্বাভাবিক দিনের মতো।”[10]সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2937
এগুলো স্পষ্টভাবে একটি জীবন্ত ব্যক্তির অলৌকিক কার্যকলাপের বর্ণনা, যা কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা সম্ভব নয়।
আরো পড়ুনঃ
One should know that the Dajjal will be a human being who will eat and drink, and that Allah is far above that; the Dajjal will be one-eyed but Allah is not one-eyed; no one can see his Lord until he dies, but the Dajjal will be seen by all people, believers and kafirs alike, when he emerges. – IslamQA 8806
উপসংহার
হিজবুতিয়ানদের দাজ্জাল সম্পর্কিত দাবিগুলো সহীহ হাদীসের স্পষ্ট বিরোধী। হাদীসে দাজ্জালকে বাস্তব মানুষ বলা হয়েছে। তাঁর শারীরিক বর্ণনা বিস্তারিতভাবে এসেছে। তাঁর ফিতনা, মুজিযার মতো কর্মকাণ্ড ও প্রতারণা সবই ব্যক্তিগতভাবে ঘটবে। সুতরাং দাজ্জালকে “সভ্যতা বা প্রতীক” বলা সহীহ হাদীস অস্বীকার করার সমান, যা উম্মাহকে ভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেয়।
আমাদের করণীয়
- সহীহ হাদীসে দাজ্জাল থেকে বাঁচার দোয়া পড়া (সূরা কাহফের প্রথম ও শেষ দশ আয়াত)।
- ঈমান মজবুত করা।
- ভ্রান্ত ব্যাখ্যা প্রচারকারীদের থেকে সতর্ক থাকা।




আল্লাহ সবাইকে বোঝার তৌফিক দান করুন আমীন