ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাববিজ্ঞানইতিহাস

আদিমানবের প্রথম ধর্ম: একেশ্বরবাদ — নৃতত্ত্ব কী বলে?

ইসলাম ও নৃবিজ্ঞান একমত: একেশ্বরবাদই ছিল মানবজাতির প্রথম ধর্ম

ইসলাম অনুসারে আদম ও হাওয়াই প্রথম মানব ও মানবী যারা একেশ্বরবাদী ছিলেন, প্রথম শিরকের আবির্ভাব হয় নুহ (আ.) এর সময়, যখন মানুষ কিছু গন্যমান্য ব্যক্তিদেরকে সম্মান করতে করতে এক সময় গিয়ে শিরকে লিপ্ত হয়ে যায়। এটাতো ধর্মীয় বিশ্বাস, এইবার দেখে নি নৃতত্ত্ববিদদের দৃষ্টিতে আসল সত্যতা কি।

সাহিত্যিক ও নৃতত্ত্ববিদ অ্যান্ড্রু ল্যাং The Making of Religion (১৮৯৮) গ্রন্থে প্রমাণ দেখিয়েছেন-সৃষ্টিশীল, নৈতিক, সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ একক স্রষ্টার ধারণা পৃথিবীর একেবারে আদিমতম মানবদের মাঝেও বিদ্যমান ছিল! ল্যাং দৃঢ়ভাবে মনে করতেন যে, একেশ্বরবাদের অস্তিত্বই প্রথম; পরে তা বিভিন্নভাবে কলুষিত হয়ে পড়ে।[1]E. E. Evans-Pritchard, Theories of Primitive Religion; p. 32

খ্যাতনামা নৃবিজ্ঞানী ড. পল রেডিন বলেন,[2]Paul Radin, Primitive Man as Philosopher, p. 346

“ল্যাং সাহেব তাঁর বই লেখার পর পঁচিশ বছর কেটে গেল। তিনি যা ভেবেছিলেন তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণাদি মিলেছে। আগের নৃবিজ্ঞানীরা পুরোই ভুলের ওপর ছিলেন। বিশেষজ্ঞ গবেষকদের পাওয়া নিখুঁত তথ্যপ্রমাণ ল্যাং সাহেবের অস্পষ্ট দৃষ্টান্তগুলোকে সরিয়ে আরও জোরালো প্রমাণ দাঁড় করিয়েছে। অনেক আদিম মানব যে এক সর্বোচ্চ-অদ্বিতীয় বিধাতায় বিশ্বাস করত, এনিয়ে এখন কারও তেমন একটা দ্বিমত নেই।”

পরবর্তী কালে প্রখ্যাত জার্মান নৃতত্ত্ববিদ উইলহেম স্মিত ধর্মের উৎপত্তি বিষয়ে নৃবিজ্ঞানীদের চিন্তাধারায় এক বিপ্লব ঘটান। নিজের গবেষণা থেকে তিনি জানান যে, আদিমানবের মাঝে সর্বপ্রথম ধর্ম ছিল এক মহান খোদায় বিশ্বাস, যা কিনা Primal Monotheism। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীদের ওপর গবেষণা চালান। গবেষণার ফলাফল নিয়ে তিনি ১২ খণ্ডের Der Ursprung der Gottesidee (The Origin of the Idea of God) রচনা করেন।

ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,[3]Karen Armstrong, A History of God; p. 3-4

“[T]he Origin of the Idea of God গ্রন্থে উইলহেম স্মিত বলেছেন, (প্রাচীনকালের) পুরুষ ও নারীরা একাধিক দেবতার উপাসনা শুরু করার পূর্বে তাঁদের মাঝে আদি একেশ্বরবাদ প্রচলিত ছিল। শুরুতে তারা কেবলমাত্র এক ও অদ্বিতীয় খোদার অস্তিত্ব স্বীকার করত- যিনি জগৎ সৃষ্টি করেছেন ও দূর থেকে মানুষের নানা বিষয় নজরে রাখছেন। এমন মহান খোদায় বিশ্বাস এখনও অনেক আদিবাসী আফ্রিকান গোত্রের ধর্মীয় জীবনের বৈশিষ্ট্য। তারা ব্যাকুলভাবে খোদার কাছে প্রার্থনা করে। বিশ্বাস করে যে, তিনি তাদের নজরদারি করছেন এবং খারাপ কাজ করলে তিনি শাস্তি দিবেন। কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো-তিনি তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে (মূর্তরূপে) অনুপস্থিত: তাঁর কোনো বিশেষ পূজা-অর্চনা ছিল না এবং কখনোই তাকে প্রতিমায় রূপ দেওয়া হয়নি। আদিবাসীদের মতে তিনি অনির্বচনীয় এবং এমন সত্তা যিনি দুনিয়া দ্বারা কলুষিত হওয়ার নন। কেউ কেউ আবার বলে যে, তিনি অপগতা নৃতত্ত্ববিদদের মতে, (সময়ের আবর্তে) এই খোদা (তাদের নিকট) এত দূরবর্তী ও সুউচ্চ মনে হতে থাকে যে, কার্যত তিনি ছোটখাটো ও আরও সহজলভ্য দেবতাদের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে শুরু করেন। স্মিত-এর তত্ত্বও এমনটাই বলে যে প্রাচীনকালে সেই মহান খোদা (ক্রমান্বয়ে) পৌত্তলিকতার বেড়াজালে আরও চকমকে দেবতাদের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়ে যান। শুরুতে তাই এক খোদাই ছিলেন।”

গবেষণার ফল থেকে উইলহেম স্মিত ও তাঁর সহকর্মীরা মনে করেন আদিবাসীরা সম্ভবত কোনো প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হয়েছিল, যা পরে বিকৃত হয়ে পড়ে।[4]Britannica Encyclopedia of World Religions, p. 915 এখনও পৃথিবীর অনেক আদিবাসী মানবের মাঝে একত্ববাদের ধারণা দেখতে পাওয়া যায়। কখনোই বাইরের সভ্যতার সংস্পর্শ পায়নি এমন অনেক বিচ্ছিন্ন আদিবাসী পাওয়া যায়, যাদের বিশ্বাসের মাঝে অদ্ভুত মিল! জানা যায়-তারা এক খোদার উপাসনা করত, তাদের কাছে খোদাপ্রেরিত বাণী ছিল কিন্তু সেটা হারিয়ে গেছে। তারা প্রতীক্ষায় আছে এমন একজনের, যে তাদের কাছে সেই হারিয়ে যাওয়া বাণীকে ফিরিয়ে আনবে। লাহু-কারেন-কাচিন-কুই-লিশু-মিযো-সাঁওতাল-সহ আরও অনেক আদিবাসীদের মূল বিশ্বাস এমন ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়।[5]Don Richardson, Eternity in Their Hearts: Startling Evidence of Belief in the One True God in Hundreads of Cultures Throughout the World

Read More...  সতীপ্রথার জন্য কি মুসলিম শাসন দায়ী?

কিন্তু ঝামেলা হলো আদিমানব একেশ্বরবাদী স্বীকার করলে বিবর্তন তত্ত্বের প্রতি তা হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, বস্তুবাদী গবেষকদের অনুমিত ক্রমধারা অনুযায়ী, একেশ্বরবাদ আধুনিক মানুষের উন্নত মস্তিষ্কের ফসল। তারা ভেবেছিলেন, আদিমানবের মস্তিষ্ক তো অনুন্নত ছিল। তাই আদিমানবদের মাঝেও যদি একেশ্বরবাদ পাওয়া যায় তা হলে, তাদের যে তথাকথিত প্রিমিটিভ মাইন্ড অর্থাৎ অবিকশিত মনন ছিল, এহেন দাবি ধোপে টিকবে না। তাই দেখা যায়, তৎকালীন বিজ্ঞানীরা একেশ্বরবাদের পক্ষে থাকা প্রমাণগুলো একেবারে উপেক্ষা করে যান!

ড. কর্নেল গোয়েনার জানান:

“ল্যাংয়ের গবেষণায় ছোটখাট কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি ছিল বটে, তবে তার বইয়ের মূল বক্তব্য এমন সব তথ্যপ্রমাণ পেশ করেছিল যা কোনোভাবেই বিবর্তন তত্ত্বের সাথে মেলানো যাচ্ছিল না। কিন্তু সেকালের বিজ্ঞানীরা বিবর্তন তত্ত্বে এতটাই মজে ছিলেন যে এসব তথ্যপ্রমাণ দেখেও তারা না দেখার ভান করে এড়িয়ে যান।”[6]H. Cornell Goerner, Ph.d., The Question of Primitive Religion: A Review of the Shifting of Scientific Opinion in Favor of the Theory of Primeval Monotheism. The Review and Expositor, Vol. XXXIII, No. 4, p. 362 (October, 1936).

হায়রে সত্য সন্ধানী বিজ্ঞানীকূল!

লিখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে হুমায়ুন আজাদ ওরফে চটি আজাদের গাঞ্জাখুরির খন্ডনে রাফান আহমেদের রচিত ‘অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়‘ বইয়ের ১০৩-১০৫ পৃষ্ঠা হতে।

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 E. E. Evans-Pritchard, Theories of Primitive Religion; p. 32
2 Paul Radin, Primitive Man as Philosopher, p. 346
3 Karen Armstrong, A History of God; p. 3-4
4 Britannica Encyclopedia of World Religions, p. 915
5 Don Richardson, Eternity in Their Hearts: Startling Evidence of Belief in the One True God in Hundreads of Cultures Throughout the World
6 H. Cornell Goerner, Ph.d., The Question of Primitive Religion: A Review of the Shifting of Scientific Opinion in Favor of the Theory of Primeval Monotheism. The Review and Expositor, Vol. XXXIII, No. 4, p. 362 (October, 1936).

FromMuslims Collections

বিভিন্ন লেখকের লেখার সংগ্রহ।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button