ইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাবইসলামশরিয়াহ আইন

দাসপ্রথা ও ইসলাম: নাস্তিকদের অভিযোগের খণ্ডন

“দাসপ্রথা ও ইসলাম: নাস্তিকদের অভিযোগের খণ্ডন, বিধান, প্রজ্ঞা ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ” পর্ব : ৩

এর পূর্বের পর্ব গুলো পড়ে আসুন: পর্ব :১পর্ব: ২

ইসলাম ও দাসপ্রথা—এ বিষয়টি আধুনিক যুগে নাস্তিক ও ইসলামবিরোধী মহলে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একটি প্রসঙ্গ। অনেকেই ইসলামের ওপর দাসপ্রথা বৈধ করার অভিযোগ আরোপ করে, অথচ তারা ইতিহাস, প্রেক্ষাপট এবং ইসলামী বিধানের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত নয় কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে তা উপেক্ষা করে। ফলে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

বাস্তবতা হলো, ইসলাম এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয় যখন দাসপ্রথা ছিল বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক ব্যবস্থা। ইসলাম এই ব্যবস্থাকে হঠাৎ বিলুপ্ত না করে ধাপে ধাপে সংস্কার করে, দাস-দাসীদের অধিকার নিশ্চিত করে এবং মুক্তির বহু পথ উন্মুক্ত করে দেয়। বরং ইসলামই প্রথম দাসদেরকে মানবিক মর্যাদা প্রদান করে এবং তাদেরকে সমাজের সম্মানজনক সদস্যে পরিণত করার দিকনির্দেশনা দেয়।

এই অধ্যায় আমরা নাস্তিকদের উত্থাপিত প্রধান অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করব এবং কুরআন, সহীহ হাদীস ও ইসলামী ফিকহের আলোকে তার সুসংগত ও প্রমাণভিত্তিক জবাব উপস্থাপন করব, ইনশাআল্লাহ।

অভিযোগ ও খন্ডন- ১: ইসলামে কি যুদ্ধবন্দী কিংবা দাসী ধর্ষণের অনুমতি আছে?

নাস্তিকদের অভিযোগঃ

ইসলামবিরোধীরা দাবি করে যে, ইসলামী শরীয়তে যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক মানবাধিকারের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো স্বাধীন মানুষ যুদ্ধের সময় বন্দী হলে তাকে তার স্বাভাবিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে অন্যের মালিকানায় দেওয়া—এটি মানব মর্যাদার চরম অবমাননা।

তারা আরও অভিযোগ করে যে, ইসলাম দাসীদের (বিশেষত নারী যুদ্ধবন্দী) ক্ষেত্রে যৌন সম্পর্ককে বৈধতা দিয়েছে, যা তাদের ভাষায় “ধর্ষণকে বৈধতা দেওয়া”। তারা “مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ” (যাদেরকে তোমাদের ডান হাত অধিকার করেছে) — এই কুরআনিক পরিভাষাকে সামনে এনে দাবি করে যে, ইসলামে মালিক তার দাসীর সাথে তার সম্মতি ছাড়াই সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে।

এছাড়া তারা বলে, ইসলামে দাসীকে বিয়ে ছাড়াই যৌনভাবে ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, অথচ এটি আধুনিক আইনে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। তাদের মতে, এটি নারীর সম্মান, স্বাধীনতা ও অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করে।৷

এবার আসুন আমরা কুরআন এবং হাদিস বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করব তাদের এই দাবিগুলো কি আসলেই সত্যের মাটিতে দাঁড়িয়ে নাকি কোরআন হাদিস ইতিহাসকে বিকৃত করে মনগড়া ব্যাখ্যা ও একপেশে প্রচারণা।

ইসলামবিদ্বেষীদের এই প্রচারণায় আমাদের জবাব

আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে আমরা আলোচনাটিকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করেছি। সেগুলো হলো

১. ভূমিকা
২. ধর্ষণের সংজ্ঞা
৩. মূলনীতি
৪. স্কলারদের বক্তব্য
৫. যে সকল ক্ষেত্রে দাসীর সাথেও শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা নিষেধ
৬. উপসংহার

ভূমিকা

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, সমকালীন সময়ে ইসলামবিদ্বেষীদের অন্যতম প্রচারণা হলো—ইসলাম নাকি দাস-দাসীর সাথে জোরপূর্বক সহবাসকে বৈধতা দিয়েছে, যা তারা “ধর্ষণ” হিসেবে উপস্থাপন করে। অথচ এই দাবি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি প্রকৃত জ্ঞান, প্রেক্ষাপট ও শরীয়তের সঠিক বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা ইচ্ছাকৃত বিকৃতির ফল।

কোনো বিষয়কে সঠিকভাবে বোঝার জন্য সর্বপ্রথম তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা জরুরি। তাই আমরা প্রথমে “ধর্ষণ” শব্দটির ভাষাগত ও পারিভাষিক অর্থ বিশ্লেষণ করবো। অতঃপর ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালা—বিশেষত জুলুম (ظلم) ও ক্ষতি (ضرر) নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি আলোচনা করবো। এরপর কুরআন, হাদীস ও ফকীহদের বক্তব্যের আলোকে দাসী সম্পর্কিত বিধানসমূহ পর্যালোচনা করে দেখবো—আসলে ইসলাম কী শিক্ষা দেয়।

এই ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, ইসলামের নামে প্রচলিত উক্ত অভিযোগ বাস্তবতার সাথে কতটা সাংঘর্ষিক এবং শরীয়তের প্রকৃত অবস্থান কী।

ধর্ষণের সংজ্ঞা

সম্মানিত পাঠক বৃন্দ, নাস্তিক মুরতাদ ইসলাম বিদ্বেষীগণ দাবি করে থাকেন ইসলাম দাস-দাসীকে ধর্ষণের বৈধতা দিয়ে থাকে। সর্বপ্রথম আমরা তাদের এই জবাব দেওয়ার পূর্বে ধর্ষণের সংজ্ঞা জেনে নেব।

♦ ধর্ষণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জগৎ বিখ্যাত আরবি অভিধান لسان العرب এর মধ্যে উল্লেখ করেন

وَفِي لِسَان الْعَرَب: وَقد تَكَرَّر ذِكْرُ الغصْب فِي الحَدِيث، وَهُوَ أَخْذُ مَالِ الغَيْرِ ظُلْماً وعُدُواناً. وَفِي الحَدِيثِ (أَنَّه غصَبَها نَفْسَها) أَرادَ أَنَّه وَاقَعها كُرْها فاسْتَعَارَه لِلْجِمَاع.

অর্থঃ “লিসানুল আরব”-এ বলা হয়েছে, হাদিসে “غَصْب” (জবরদখল বা বলপ্রয়োগ) বারবার এসেছে, এবং এটি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ও জোরপূর্বক গ্রহণ করাকে বোঝায়।

একটি হাদিসে এসেছে: “أنه غصَبَها نَفْسَها” এর অর্থ হলো, “সে তার সাথে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সহবাস করেছিল (বা ধর্ষণ করেছিল) ” ; এবং এখানে সহবাস বোঝাতে শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।

♦ ধর্ষণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জগৎ বিখ্যাত আরবি অভিধান معجم المعاني الجامع এর মধ্যে উল্লেখ করেন

تعريف و معنى اغتصاب في معجم المعاني الجامع – معجم عربي عربي
اِغتصاب: (اسم)
اِغتصاب : مصدر إِغتَصَبَ
‏اغتصاب‏: (مصطلحات)
أخذ الشيء عنوة بالإكراه‏. (فقهية)
اِغتِصاب: (اسم)
مصدر اِغْتَصَبَ
اِغْتِصَابُ مَالِ النَّاسِ : أَخْذُهُ قَهْراً وَظُلْماً
الاغتصاب: فرض المعاشرة الجنسيّة بالقوّة على فتاة أو امرأة وتعتبر جريمة يعاقب عليها القانون
الاغتصاب: (مصطلحات)
الغصب = أخذ الشيء قهرًا وظلما. (فقهية)
১. اِغتصاب: اسم
اِغتصاب: اِغتَصَب-এর مصدر।

অর্থ: জোরপূর্বক বা বাধ্য করে কিছু নেওয়া।
২. فقهي (ইসলামী ফিকহ সম্পর্কিত ব্যবহার)
اِغتِصاب: কোনো জিনিস জোরপূর্বক অধিকার করা।
اِغتِصَابُ مَالِ النَّاسِ: অন্যের সম্পদ জোর করে এবং অন্যায়ভাবে নেওয়া।
الغصب: জোরপূর্বক এবং অন্যায়ভাবে কোনো বস্তু দখল করা।
৩. جنائي (আইনগত/সাধারণ ব্যবহার)
الاغتصاب: কোনো মেয়েকে বা মহিলাকে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা; এটি একটি অপরাধ এবং আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা এ কোথায় স্পষ্টভাবে দেখতে পেলাম যে কোন নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে স্পর্শ করা অথবা কোন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা কে ধর্ষণ বলা হয়।

মুলনীতি

ইসলামের সমালোচকরা অনেক সময় এমন দাবি করেঃ যেহেতু ইসলাম অনুযায়ী দাসীর উপর তার মনিবের হক আছে, কাজেই ইসলাম অবশ্যই তার সাথে জুলুম করে, অত্যাচার করেও সহবাসের অনুমতি দেয়!

ইসলামী শরীয়তের প্রতিটি বিধান কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন আইন নয়; বরং তা একটি সুসংহত নীতিমালার উপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন ও সুন্নাহ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের সকল বিধানের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ন্যায়বিচার (عدل), দয়া (رحمة), কল্যাণ (مصلحة) এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার উপর। তাই কোনো নির্দিষ্ট মাসআলা বা বিধান সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে, প্রথমেই এই মৌলিক নীতিগুলো সামনে রাখা অপরিহার্য।

বিশেষত মানুষের জান, মাল, ইজ্জত ও অধিকার সংরক্ষণ—ইসলামের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য (مقاصد الشريعة)। এ কারণেই শরীয়তে জুলুম (ظلم) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যের ক্ষতি করা (إضرار) সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং, এমন কোনো ব্যাখ্যা বা দাবি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যা এই মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।

এই প্রেক্ষাপটে আমরা এখন ইসলামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি—(১) জুলুমের নিষেধাজ্ঞা এবং (২) ক্ষতি করার নিষেধাজ্ঞা—দলিলসহ আলোচনা করবো, যা আলোচ্য বিষয়ের সঠিক উপলব্ধির জন্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

ইসলামের জুলুম করা সম্পূর্ণ হারাম সেটা যে কারো ক্ষেত্রেই হোক না কেন। যেমন নিচের হাদীসগুলো লক্ষ্য করুন :-

আবূ যার গিফারী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আল্লাহ তা‘আলার নাম করে যেসব হাদীছ বর্ণনা করেছেন তার একটি হ’ল তিনি বলেছেন যে,

আল্লাহ তাবারকা ওয়া তা‘আলা বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার ওপর যুলম করাকে হারাম করেছি। তাই আমি তোমাদের জন্যও যুলম করা হারাম করে দিয়েছি। অতএব তোমরা পরস্পরের প্রতি যুলম কর না।[1]মুসলিম হা/২৫৭৭; মিশকাত হা/২৩২৬; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬২৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৩৪৫

আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) মু‘আয (রাঃ)-কে ইয়ামেনে পাঠিয়ে তিনি বললেন,

‘তুমি মাযলূমের বদদো‘আ থেকে বেঁচে থাক। কেননা মায লূমের বদদো‘আ ও আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা নেই’[2]বুখারী হা/২৪৪৮; মিশকাত হা/২২২৯

জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

‘তোমরা যুলুম থেকে বেঁচে থাক। কেননা যুলুম ক্বিয়ামতের দিন ঘন অন্ধকার হয়ে দেখা দিবে'[3]মুসলিম হা/৬৭৪১; মিশকাত হা/১৮৬৫

দ্বিতীয় একটি বিষয় হচ্ছে ইসলামে কারো ক্ষতি করা নিষেধ। এ ব্যাপারে লক্ষ্য করুন নিচের হাদীসগুলো

আবূ সিরমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করবে, আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন এবং যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্ট দিবে আল্লাহ তাকে কষ্ট দিবেন।[4]তিরমিযী ১৯৪০, আবূ দাউদ ৩৬৩৫, আহমাদ ১৫৩২৮, ইরওয়া ৮৯৬

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

প্রকৃত মুসলিম সেই, যার মুখ ও হাত হতে মুসলিমগণ নিরাপদে থাকে। আর প্রকৃত মুহাজির (দ্বীন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে স্বদেশ ত্যাগকারী) সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ কর্মসমূহ ত্যাগ করে।[5]বুখারী ৯, ৬৪৮৪, মুসলিম ১৭০

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

যে পছন্দ করে যে, তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হোক এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হোক, তার মরণ যেন এমন অবস্থায় হয় যে, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান রাখে এবং অন্যের প্রতি এমন ব্যবহার দেখায়, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।[6]মুসলিম ৪৮৮২

এ দুটি বিষয়কে সামনে রেখে আমরা বলতে চাই ইসলামী শরীয়তে হারাম করা হয়েছে জুলুম করা এবং কারো ক্ষতি করা। যদি কোন মনিব তার দাসীর উপর জুলুম করে সহবাসে লিপ্ত হয় অথবা তার ক্ষতি করার মাধ্যমে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তাহলে এটা অবশ্যই উপরোক্ত দলিল গুলোর ভিত্তিতে হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হবে।

এমনকি দাস দাসীকে প্রহার করার উপর আলাদা ভাবেই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এই নিয়ে ফ্রম মুসলিমস এ, ‘দাস-দাসীকে প্রহার করার বিধান’ শিরোনামে একটি আর্টিকেল রয়েছে সেটি দেখতে পারেন,

Read More...  দাস-দাসীকে প্রহার করার বিধান

স্কলারদের বক্তব্য

ইসলামী শরীয়তের কোনো বিষয় সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে কেবল আয়াত বা হাদীস উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেসব দলিলের ব্যাখ্যা, প্রয়োগ ও সার্বিক সমন্বয় যেভাবে যুগে যুগে বিজ্ঞ ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ করেছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য। কারণ, তারাই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিভিন্ন মাসআলার সূক্ষ্ম দিকগুলো বিশ্লেষণ করে বাস্তব জীবনের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।

বিশেষত দাস-দাসী সম্পর্কিত বিষয়গুলো এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে সরাসরি দলিলের পাশাপাশি ফকীহদের বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, তারা সামগ্রিক শরয়ী নীতিমালা—যেমন জুলুমের নিষেধাজ্ঞা, মানবিক আচরণ, ও পারস্পরিক অধিকারের ভারসাম্য—এসব বিবেচনায় রেখে এই বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা করেছেন।

এই কারণে, এখন আমরা প্রখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণের বক্তব্য উপস্থাপন করবো, যার মাধ্যমে স্পষ্ট হবে যে দাসীর সাথে আচরণ এবং বিশেষ করে সহবাসের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়তের প্রকৃত অবস্থান কী।

♦ প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ আবু আব্দুল্লাহ আল হালিমি (রহ.) [মৃত্যু ৪০৩ হিজরি/১০১২ খ্রিষ্টাব্দ] এর বক্তব্য

দাস-দাসী প্রসঙ্গে কুরআন ও হাদিসের বক্তব্যগুলোকে সার্বিকভাবে বিবেচনা করে এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ আবু আব্দুল্লাহ আল হালিমি (রহ.) [মৃত্যু ৪০৩ হিজরি/১০১২ খ্রিষ্টাব্দ] উল্লেখ করেছেন –

وأَن يُعْتِقُهُ مُتَبَرِّعًا أَحُسْنٌ وَأَجْمَلُ أَن يَلْزَمُهُ بَدَلَا ، وإِذَا اِشْتَرَى رَجُلٌ بِه عَاهَةِ مستقدرَة عَبْدًا لِيَخْدُمُهُ ، فإِنّ كَرِهَ الْعَبْدُ صِحَّتَهُ ، فَلَيَبِيعُهُ وإِن اِشْتَرَى جَارِيَةً فَكَرِهَتْ أَن يُسَمِّهَا أَو يُضَاجِعُهَا ، فلَا يَمَسُّهَا ولَا يُضَاجِعُهَا ولَا يَطَأُهَا إِلَّا بِإِذْنِهَا ، وَبَيْعَهَا إِنّ أَرَادَتْ ذَلِك وَالْإحْسَانُ إِلَى الْمَمْلُوكِ يَجْمَعُ الشُّكْرُ لِلَهَّ تُعَالَى عَلَى الْفِكَاكِ وَالسلَّامَةِ مِن ذُلِّ الرِّقِّ ، وَالْعَدْلَ وَالْإِنْصَافَ فَيَمَنَ يَضُمُّهُ الْمَلِكُ ، واستطباة نَفْس الْمُلُوكِ ، وَاِسْتِجْلَاَبَ طَاعَتِهِ ومناصحته ، ففِيه نَظَرَ لِلْمَالِكُ دنِيًّا وَدِينًا ، وَنَظَرٌ لِلْمُلُوكَ وَبِذَٰلِكَ جَاءَت الْأَخْبَارُ مُجْمَلَةً وَمُفَصَّلَةً

অর্থঃ “আর কোনো বিনিময়ের আশা না করে স্বেচ্ছায় তাকে [দাসকে] মুক্ত করে দেয়া অধিক উত্তম কাজ। যদি শারিরীক বিকলাঙ্গতা আছে এমন কেউ একজন দাস ক্রয় করে নিজের খেদমতের জন্য, আর সেই দাস তার [মনিবের] স্বাস্থ্যগত বিষয় অপছন্দ করে, তাহলে [তাকে কষ্ট না দিয়ে] সে তাকে বিক্রি করে দেবে। যদি কেউ একজন দাসী ক্রয় করে এবং ঐ দাসী যদি তার [মনিব] কর্তৃক স্পর্শ করা বা তার সাথে শোয়া অপছন্দ করে, তাহলে সে তার [দাসীর] অনুমতি ছাড়া তাকে স্পর্শ করবে না, তার সাথে শোবে না আর তার সাথে সহবাসও করবে না। আর সে [দাসী] যদি চায় তবে তাকে সে বিক্রি করে দেবে। দাসের প্রতি অনুগ্রহ করা মানে আল্লাহ তা’আলার শুকরিয়া আদায় করা, কারণ তিনি [সেই মনিবকে] দাসত্বের অপমান থেকে মুক্তি ও নিরাপত্তা দিয়েছেন। শাসক যার উপর শাসন করেন, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার ও ইনসাফ করা, শাসিতদের কল্যাণ কামনা করা, তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা এবং আন্তরিক পরামর্শ প্রদান করা — এসব বিষয় সে শাসকের দুনিয়া ও দ্বীন উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। এটি শাসিতদের জন্যও কল্যাণকর। আর তা শাসকদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ। এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত ও বিষদভাবে বহু বর্ণনা [হাদিস] এসেছে।[7]মিনহাজ ফি শু’আবিল ঈমান – আবু আব্দুল্লাহ আল হালিমি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৬৭

আমরা দেখলাম আজ থেকে হাজার বছর পূর্বের একজন ইমাম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দাসীর সহিত সহবাসের ক্ষেত্রে তার অনুমতির কথা উল্লেখ করেছেন, যদিও এটি পরামর্শমুলক।

কারণ ইমাম হালিমি যে পৃষ্ঠায় তার এই মতামত উল্লেখ করেছেন সেখানো অধ্যায়ের শিরেনামে রয়েছে “الثامن والخمسون من شعب الإيمان وهو باب في الإحسان إلى المماليك অর্থ: “ঈমানের শাখাসমূহের মধ্যে অষ্টান্নতম শাখা, যা দাস-দাসীদের প্রতি ‘ইহসান’ সম্পর্কে একটি অধ্যায়।” আর ইহসান সবসময় ফরজ ওয়াজিব মুলক হয় না।

♦ Islamic Online Madrasah (IOM) এর ইফতা বিভাগে সুনির্দিষ্ট ফাতাওয়া

সহবাসের ক্ষেত্রে দাসীর অনুমতি লাগবে কিনা বা দাসীর সাথে জোরাজুরি করার কোনো বিষয় ইসলামে আছে কিনা এ প্রসঙ্গে Islamic Online Madrasah (IOM) এর ইফতা বিভাগে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা হলে তাঁরাও অনুরূপ উত্তর প্রদান করেন –

“দাসীদের সাথে সহবাসের ক্ষেত্রে ইসলাম অন্য কিছু ধর্মের ন্যায় জোর করার অনুমতি দেয় না। এক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হলো দাসীদের সাথে সহবাস কেবল তাদের সন্তুষ্টি চিত্তেই হবে। জোরপূর্বক নয়। (অর্থাৎ তাদের উপর জুলুম নির্যাতন না করে, তাদেরকে কষ্ট বা দিয়ে) ইসলামে ক্রীতদাসী এর সাথে সহবাস কেন বৈধ – Islamic Fatwa”[8]https://ifatwa.info/10144/ অথবা https://archive.is/IWtTj (আর্কাইভকৃত).

এবার আসুন আমরা দেখার চেষ্টা করি দাসির সাথে মনিবের শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে দাসী থেকে অনুমতি নেওয়াটা কি আবশ্যক, যুক্তি এ ব্যাপারে কি বলে?

তৎকালীন সময়ে কোন নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করার দুইটি পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে প্রথম টি হল বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা। আর দ্বিতীয় টি হল কোন দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা। মালিক-উল-ইয়ামিন (ملك اليمين) বা দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা, ইসলামী শাস্ত্রে কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়। এটি ইসলাম সৃষ্টি করেনি, বরং এটি মানবিক আচরণ এবং নৈতিক রীতির একটি পরিচিত প্রথা ছিল যা আগে থেকেই অদীনের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। মহিলার সাথে কোনো পুরুষের ন্যায্য অধিকার (শারী‘আন) স্থাপন করার জন্য, তাকে বা তার সাথে সংযোগের জন্য বা’য়াত (বিবাহ) অথবা মালিক-উল-ইয়ামিন থাকা আবশ্যক; এর বাইরে অন্য কোনো যৌন সম্পর্ক জিনায়াহ (পাপ) হিসেবে গণ্য হত। এই চুক্তি বিভিন্ন ধর্মে যুগ যুগ ধরে পালন করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নবী ইব্রাহিম (আঃ) এর সময় হাগার (হাজারা) ছিলেন মালিক-উল-যামিন, এছাড়াও নবী ইয়াকুব, দাউদ ও সুলায়মানের সময়েও এ প্রথা বিদ্যমান ছিল। সংক্ষেপে—ইতিহাসে এবং আদি ধর্মে মহিলার যৌন সম্পর্ক বৈধ হওয়া মানে বা’তাল বা মালিক-উল-যামিন চুক্তির মধ্য দিয়ে। আর দাসী ও মালিকের চুক্তি বৈবাহিক চুক্তির চাইতে বেশি শক্তিশালী, তাই কেউ নিজের দাসীকে বিবাহ করতে চাইলে পুর্বে তাকে মুক্ত করতে হয়, তারপর বিয়ে করতে হয়।

এবার আসুন আমরা যৌক্তিকভাবে দেখার চেষ্টা করি আসলে কি দাসির সাথে সহবাসের ক্ষেত্রে দাসীর অনুমতি নেওয়ার যুক্তি কি?

একজন নারী যখন যুদ্ধক্ষেত্রে আসে তখন সেই নারী অবশ্যই জেনে থাকেন যে যদি সে পরাজিত হয় বা তার দল পরাজিত হয় তাহলে তাকে বন্দী করা হবে এবং তৎকালীন প্রচলিত নিয়ম অনুসারে সেই বন্দীকে দাসে পরিণত করা হবে। এবং দাস-দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক করা তৎকালীন সময় স্বাভাবিক বিষয় ছিল। আর এ বিষয়টা জেনেই একজন নারী অবতরণ হয় যুদ্ধের ময়দানে। কাজেই এখানে সরাসরি একজন নারী এই বিষয়ে অবগত হয়েই যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে যে যদি সে পরাজিত হয় প্রতিপক্ষের লোক তাকে বন্দী করবে এবং তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করবে। সুতরাং এখানে একজন নারী তার কনসেন্ট দিয়েই যুদ্ধে আছেন যে যদি সে পরাজিত হয় এবং দাসীতে পরিণত হয় তাহলে তাকে শারীরিকভাবে ব্যবহার করা হবে। কেননা যদি তার শারীরিক সম্পর্কে আপত্তি থাকত তাহলে সে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হতো না, কারণ যুদ্ধে পরাজিত হওয়া ব্যক্তিকে দাসী হিসেবে গ্রহণ করা হয় এটা তার জানা ছিল। সুতরাং তার যদি এ বিষয়ে দ্বিমত থাকতো তাহলে সে কখনোই যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হতেন না।

এটা অনেকটা বিবাহের মতোই আমরা ধরে নিতে পারি কেননা যখন দুজন মানুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, যখন উভয়ে এ কথা জানা থাকে যে একজন আরেকজনের শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করবে। পরবর্তীতে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের সময় স্ত্রী থেকে স্বামীর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

ঠিক তদ্রুপ যুদ্ধক্ষেত্রেও যখন একজন নারী এসে উপস্থিত হয় তখন তার জানাই থাকে যে যদি সে পরাজিত হয় বা তার দল পরাজিত হয় তাহলে তাকে বন্দী করা হবে এবং তৎকালীন প্রচলিত নিয়ম অনুসারে সেই বন্দীকে দাসে পরিণত করা হবে। এবং দাস-দাসীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হবে। সুতরাং এ বিষয়টি স্বাভাবিক যে একজন নারী যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া মানেই তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বৈধতা দিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া।

ইসলামে দাসীর প্রতি কত প্রকারের বিধান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা রেখেছেন দেখুন, ইবনে হাজার উনার কিতাবে দাসীকে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে প্রবেশ করানো ও তাদের অনুমতি ছাড়া জোর করে অন্য কারো সাথে বিবাহ দেওয়া হারাম হওয়া নিয়ে খুব বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

তাদেরকে দিয়ে পতিতাবৃত্তি করানো হারাম হওয়ার আয়াত উল্লেখ করে অনুমতি ছাড়া জোর করে বিয়ে দেওয়া বিষয়ে ইমাম ইবন হাজার আসকালানী (রহ) বলেন —

قَوْلُهُ: (بَابُ لَا يَجُوزُ نِكَاحُ الْمُكْرَهِ) الْمُكْرَهُ بِفَتْحِ الرَّاءِ.

قَوْلٌ: ﴿وَلا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ

وَقَدِ اسْتَشْكَلَ بَعْضُهُمْ مُنَاسَبَةَ الْآيَةِ لِلتَّرْجَمَةِ وَجَوَّزَ أَنَّهُ أَشَارَ إِلَى أَنَّهُ يُسْتَفَادُ مَطْلُوبُ التَّرْجَمَةِ بِطَرِيقِ الْأَوْلَى لِأَنَّهُ إِذَا نَهَى عَنِ الْإِكْرَاهِ فِيمَا لَا يَحِلُّ فَالنَّهْيُ عَنِ الْإِكْرَاهِ فِيمَا يَحِلُّ أَوْلَى.

অর্থঃ “তাঁর বাণীঃ (অধ্যায়: জবরদস্তি করে বিয়ে বৈধ নয়)— المُكْرَهُ শব্দটি ر (রা) অক্ষরে ফাতহা (যবর) সহ উচ্চারিত হবে।

[আল্লাহর] বাণীঃ “আর তোমরা তোমাদের দাসীদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য কোরো না…” (সুরা নুর ২৪ : ৩৩) যদি এমন বিষয়ে জবরদস্তি করা নিষিদ্ধ হয় যা হারাম, তবে যে বিষয়ে অনুমতি আছে, সেখানে জবরদস্তি নিষিদ্ধ হওয়া আরও অধিক প্রযোজ্য।”[9]ফাতহুল বারী – ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৩১৯

যে সকল ক্ষেত্রে দাসীর সাথেও শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা নিষেধ

১। বণ্টন হবার আগে কোন যুদ্ধবন্দিনীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন নিষিদ্ধ

অনেকের মাঝে একটি গুরুতর ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, যুদ্ধের ময়দানে মুসলিম যোদ্ধারা ইচ্ছেমতো যে কোনো যুদ্ধবন্দিনী নারীর সাথে তাৎক্ষণিকভাবে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে, এবং ইসলামে এ বিষয়ে নাকি কোনো বিধিনিষেধ নেই। প্রকৃতপক্ষে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও শরীয়তের পরিপন্থী। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, যুদ্ধবন্দীদের (সাবায়া) বিষয়টি একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার অধীন। যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই বন্দিনী নারীর সাথে সহবাস বৈধ নয়। বরং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপ্রধান বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বন্দীদের সঠিকভাবে বণ্টনের পূর্বে তাদের সাথে কোনো প্রকার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন সম্পূর্ণরূপে হারাম।

হারুন ইবনুল আসিম বর্ণনা করেন: উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে সৈন্যবাহিনীসহ প্রেরণ করেন এবং খালিদ (রা.) সৈন্যদলসহ জিরার ইবনুল আযওয়ারকে প্রেরণ করেন, আর তারা আসাদ গোত্রের একটি এলাকা দখল করেন। তারা একটি সুন্দরী নারীকে বন্দি করেন এবং জিরার তার প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি তার সঙ্গীদের থেকে তাকে (নারীটিকে) চাইলেন, তারা দিয়ে দিল এবং তিনি তার সাথে সঙ্গম করলেন। উদ্দেশ্য পূর্ণ হবার পর কৃতকর্মের জন্য তিনি অনুতপ্ত হলেন এবং খালিদ(রা.)এর নিকট গিয়ে এ সম্পর্কে বললেন। খালিদ(রা.) বললেন, অবশ্যই আমি তোমার জন্য এর অনুমোদন ও বৈধতা প্রদান করছি। জিরার বললেন, “না, উমরকে চিঠি না পাঠানো পর্যন্ত নয়।” উমর উত্তরে লিখলেন, তাকে রজম (প্রস্তারাঘাতে হত্যা) করতে হবে। কিন্তু চিঠি পৌঁছবার আগেই জিরার ইন্তেকাল করলেন। খালিদ (রা.) বললেন, “আল্লাহ জিরারকে অপমানিত করতে চাননি।”[10]সূত্র: বায়হাকি’র সুনান আল কুবরা, হাদিস নং ১৮৬৮৫

লক্ষ্য করুন: খলিফা বা খলিফা হতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কর্তৃক বণ্টন হবার আগে যুদ্ধবন্দিনীর সাথে সহবাস করা যে অবৈধ সেটা সুবিদিত ছিল।

উক্ত কর্মটিকে ব্যভিচার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কেননা, উমর (রা.) এক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে ব্যভিচারের হদ নির্ধারণ করেছেন।

২। যুদ্ধক্ষেত্রে স্বামীসহ ধৃত যুদ্ধবন্দিনীদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন নিষিদ্ধ

বন্দি হবার পর সাধারণভাবে বিবাহিত যুদ্ধবন্দিনীর পূর্বেকার বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হিসেবে গণ্য করা হয়, ফলে তাদেরকে উপপত্নী হিসেবে গ্রহণ করা তথা তাদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা বৈধ বিবেচিত হয়।[11]দ্রষ্টব্য: আয়াতসূত্র-২ যদি যুদ্ধক্ষেত্রে স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েই একসাথে অথবা একজনকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিধির বাইরে নিয়ে যাবার আগেই অন্যজন যুদ্ধবন্দি/বন্দিনী হিসেবে ধৃত হয়, সেক্ষেত্রে তাদের বিবাহ-বন্ধন অক্ষুন্ন থাকবে, ফলে উক্ত যুদ্ধবন্দিনীর সাথে স্বামী ভিন্ন অন্য কারো দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন অবৈধ হবে। ইমাম সারাখসী (رحمه الله) বলেন:

فَإِنْ سُبِيَا جَمِيعًا فَالنِّكَاحُ بَاقٍ بَيْنَهُمَا

“যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়েই বন্দী হয়, তাহলে তাদের পারস্পরিক বিবাহ বহাল থাকবে।”[12]المبسوط ٥/٤٥

৩। ইদ্দতকাল অতিবাহিত হবার আগে ক্রীতদাসি/যুদ্ধবন্দিনীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন নিষিদ্ধ

ক্রীতদাসি ক্রয় করলেই বা বন্টনকৃত যুদ্ধবন্দিনী লাভ করার সাথে সাথেই একজন মুসলিমদের জন্য তার সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন বৈধ হয়ে যায় না, বরং এক ইদ্দতকাল (তথা একটি মাসিক চক্র) অতিবাহিত হবার আগে তাদের সাথে মিলিত হওয়া নিষিদ্ধ। [এই নিয়ম সেসব ক্রীতদাসি/যুদ্ধবন্দিনীদের জন্য যারা গর্ভবতী নন]

حَدَّثَنَا النُّفَيْلِيُّ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ، حَدَّثَنِي يَزِيدُ بْنُ أَبِي حَبِيبٍ، عَنْ أَبِي مَرْزُوقٍ، عَنْ حَنَشٍ الصَّنْعَانِيِّ، عَنْ رُوَيْفِعِ بْنِ ثَابِتٍ الأَنْصَارِيِّ، قَالَ قَامَ فِينَا خَطِيبًا قَالَ أَمَا إِنِّي لاَ أَقُولُ لَكُمْ إِلاَّ مَا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ يَوْمَ حُنَيْنٍ قَالَ ‏”‏ لاَ يَحِلُّ لاِمْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ يَسْقِيَ مَاءَهُ زَرْعَ غَيْرِهِ ‏”‏ ‏.‏ يَعْنِي إِتْيَانَ الْحَبَالَى ‏”‏ وَلاَ يَحِلُّ لاِمْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ يَقَعَ عَلَى امْرَأَةٍ مِنَ السَّبْىِ حَتَّى يَسْتَبْرِئَهَا وَلاَ يَحِلُّ لاِمْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ يَبِيعَ مَغْنَمًا حَتَّى يُقْسَمَ ‏”‏ ‏.‏

রুওয়াইফি ইবনে সাবিত আল আনসারি হতে বর্ণিত: আমি কি তোমাদেরকে বলবো না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হুনাইনের দিনে যা বলতে শুনেছি: “আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় অন্যের ফসলে পানি দেওয়া (অর্থাৎ কোন গর্ভবতী নারীর সাথে সঙ্গম করা)। এবং আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় কোন যুদ্ধবন্দিনী নারীর সাথে সঙ্গম করা যতক্ষণ না এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে সে গর্ভবতী নয়। এবং আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় বণ্টন হবার আগে গণিমতের কোন মাল বিক্রয় করা।”[13]সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২১৫৮

৪। গর্ভবতী ক্রীতদাসি/যুদ্ধবন্দিনীদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা

ক্রয়কৃত ক্রীতদাসি বা বন্টনকৃত যুদ্ধবন্দিনী যদি গর্ভবতী হয়, তবে সন্তান প্রসবের আগে তার সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা নিষিদ্ধ।

حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ عَوْنٍ، أَخْبَرَنَا شَرِيكٌ، عَنْ قَيْسِ بْنِ وَهْبٍ، عَنْ أَبِي الْوَدَّاكِ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، وَرَفَعَهُ، أَنَّهُ قَالَ فِي سَبَايَا أَوْطَاسٍ ‏ “‏ لاَ تُوطَأُ حَامِلٌ حَتَّى تَضَعَ وَلاَ غَيْرُ ذَاتِ حَمْلٍ حَتَّى تَحِيضَ حَيْضَةً ‏”‏

আবু সাঈদ আল খুদরি (রা.) আওতাসে ধৃত যুদ্ধবন্দিদের সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নোক্ত এরশাদ বর্ণনা করেন: গর্ভবতী নারীর সাথে সঙ্গম করো না যতক্ষণ না সে সন্তান প্রসব করে এবং যে নারী গর্ভবতী নয় তার সাথে (সঙ্গম) করো না যতক্ষণ না তার একটি ঋতুচক্র সম্পন্ন হয়।[14]সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২১৫৭

এছাড়াও আরেকটি হাদিসে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে

حَدَّثَنَا النُّفَيْلِيُّ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ، حَدَّثَنِي يَزِيدُ بْنُ أَبِي حَبِيبٍ، عَنْ أَبِي مَرْزُوقٍ، عَنْ حَنَشٍ الصَّنْعَانِيِّ، عَنْ رُوَيْفِعِ بْنِ ثَابِتٍ الأَنْصَارِيِّ، قَالَ قَامَ فِينَا خَطِيبًا قَالَ أَمَا إِنِّي لاَ أَقُولُ لَكُمْ إِلاَّ مَا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ يَوْمَ حُنَيْنٍ قَالَ ‏”‏ لاَ يَحِلُّ لاِمْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ يَسْقِيَ مَاءَهُ زَرْعَ غَيْرِهِ ‏”‏ ‏.‏ يَعْنِي إِتْيَانَ الْحَبَالَى ‏”‏ وَلاَ يَحِلُّ لاِمْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ يَقَعَ عَلَى امْرَأَةٍ مِنَ السَّبْىِ حَتَّى يَسْتَبْرِئَهَا وَلاَ يَحِلُّ لاِمْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ يَبِيعَ مَغْنَمًا حَتَّى يُقْسَمَ ‏”‏ ‏.‏

রুওয়াইফি ইবনে সাবিত আল আনসারি হতে বর্ণিত: আমি কি তোমাদেরকে বলবো না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হুনাইনের দিনে যা বলতে শুনেছি: “আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় অন্যের ফসলে পানি দেওয়া (অর্থাৎ কোন গর্ভবতী নারীর সাথে সঙ্গম করা)। এবং আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় কোন যুদ্ধবন্দিনী নারীর সাথে সঙ্গম করা যতক্ষণ না এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে সে গর্ভবতী নয়। এবং আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় বণ্টন হবার আগে গণিমতের কোন মাল বিক্রয় করা।”[15]সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২১৫৮

৫। বিবাহিত ক্রীতদাসির সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা

যদি মুনিবের অনুমতিক্রমে কোন ক্রীতদাসি অন্য কোন পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, সেক্ষেত্রে মুনিবের জন্য উক্ত ক্রীতদাসির সাথে দৈহিক সম্পর্ক তো বটেই এমনকি যৌনাঙ্গের দিকে দৃষ্টিপাত করাও নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْمَيْمُونِ، حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ، عَنِ الأَوْزَاعِيِّ، عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ إِذَا زَوَّجَ أَحَدُكُمْ عَبْدَهُ أَمَتَهُ فَلاَ يَنْظُرْ إِلَى عَوْرَتِهَا ‏”‏ ‏.‏

আমর বিন সুহাই’ব তার পিতার বরাতে তার দাদা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: যখন তোমাদের কেউ তার ক্রীতদাসের সাথে তার ক্রীতদাসির বিবাহ দেয়, তার (ক্রীতদাসির) গোপনাঙ্গের দিকে তাকানো তার (মুনিবের) জন্য উচিত নয়।[16]সূত্র: সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৪১১৩

৬। যে ক্রীতদাসির সাথে মুনিবের দৈহিক সম্পর্ক রয়েছে তার বোনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা

যদি সহোদর দুই বোন কোন ব্যক্তির ক্রীতদাসি হিসেবে থাকে, মুনিব কোন একজনের সাথে দৈহিক সম্পর্কে জড়িত থাকা অবস্থায় অন্য জনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না।

وَحَدَّثَنِي عَنْ مَالِكٍ، أَنَّهُ بَلَغَهُ عَنِ الزُّبَيْرِ بْنِ الْعَوَّامِ، مِثْلُ ذَلِكَ ‏.‏ قَالَ مَالِكٌ فِي الأَمَةِ تَكُونُ عِنْدَ الرَّجُلِ فَيُصِيبُهَا ثُمَّ يُرِيدُ أَنْ يُصِيبَ أُخْتَهَا إِنَّهَا لاَ تَحِلُّ لَهُ حَتَّى يُحَرِّمَ عَلَيْهِ فَرْجَ أُخْتِهَا بِنِكَاحٍ أَوْ عِتَاقَةٍ أَوْ كِتَابَةٍ أَوْ مَا أَشْبَهَ ذَلِكَ يُزَوِّجُهَا عَبْدَهُ أَوْ غَيْرَ عَبْدِهِ ‏.‏

মালিক (রহ.) বলেন যে, যদি কোন পুরুষ তার মালিকাধিন একজন ক্রীতদাসির সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত থাকে, অতঃপর সে তার (ক্রীতদাসির) বোনের সাথেও সম্পর্কে জড়িত হতে চায়, উক্ত বোন পুরুষটির জন্য হালাল নয় যতক্ষণ না (প্রথমোক্ত) ক্রীতদাসির সাথে তার সহবাস হারাম হয়ে যায়- বিবাহ, মুক্তকরণ, কিতাবা অথবা অনুরূপ কোন ঘটনার দ্বারা, যেমন যদি সে যদি তাকে (অর্থাৎ প্রথমোক্ত ক্রীতদাসিকে) তার ক্রীতদাসের সাথে বা অন্য কারো সাথে বিবাহ প্রদান করে।[17]সূত্র: মুয়াত্তা মালিক: বুক ২৮, হাদিস নং- ১১২৯

৭। নিজ মালিকাধীন নয় এমন ক্রীতদাসির সাথে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক নিষিদ্ধ

নিজের মালিকাধীন ক্রীতদাসি ব্যতিত অন্য কারো ক্রীতদাসির সাথে বিবাহ-বহির্ভূত দৈহিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ (এমনকি নিজের স্ত্রীর ক্রীতদাসির সাথেও) এবং তা ব্যভিচার হিসেবে পরিগণিত।

عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي الرَّجُلِ يَأْتِي جَارِيَةَ امْرَأَتِهِ قَالَ ‏ “‏ إِنْ كَانَتْ أَحَلَّتْهَا لَهُ جُلِدَ مِائَةً وَإِنْ لَمْ تَكُنْ أَحَلَّتْهَا لَهُ رَجَمْتُهُ ‏”‏ ‏.‏

মালিক (রহ.) বলেন যে, যদি কোন পুরুষ তার মালিকাধিন একজন ক্রীতদাসির সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত থাকে, অতঃপর সে তার (ক্রীতদাসির) বোনের সাথেও সম্পর্কে জড়িত হতে চায়, উক্ত বোন পুরুষটির জন্য হালাল নয় যতক্ষণ না (প্রথমোক্ত) ক্রীতদাসির সাথে তার সহবাস হারাম হয়ে যায়- বিবাহ, মুক্তকরণ, কিতাবা অথবা অনুরূপ কোন ঘটনার দ্বারা, যেমন যদি সে যদি তাকে (অর্থাৎ প্রথমোক্ত ক্রীতদাসিকে) তার ক্রীতদাসের সাথে বা অন্য কারো সাথে বিবাহ প্রদান করে।[18]সূত্র: মুয়াত্তা মালিক: ১১২৯

উপসংহার

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগ প্রচার করা হয়—“ইসলাম দাসীদের সাথে জোরপূর্বক সহবাস বা ধর্ষণকে বৈধতা দিয়েছে”—তা বাস্তবতা, দলিল ও শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কারণ, আমরা প্রথমেই দেখেছি যে, ধর্ষণের সংজ্ঞাই হলো—কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন; আর ইসলাম সুস্পষ্টভাবে জুলুম (ظلم) ও ক্ষতি (ضرر) উভয়কেই হারাম ঘোষণা করেছে।

কুরআনের নির্দেশনা, নববী হাদীস এবং ফকীহদের বিশ্লেষণ একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ইসলামে কোথাও জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সহবাসকে বৈধ বলা হয়নি; বরং এর বিপরীতে মানবিক আচরণ, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এমনকি দাসী সম্পর্কিত ক্ষেত্রেও একাধিক শর্ত, বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—এটি কোনো উন্মুক্ত বা ইচ্ছাধীন বিষয় নয়।

অতএব, ইসলামের নামে এ ধরনের অভিযোগ মূলত অজ্ঞতা, অপব্যাখ্যা অথবা ইচ্ছাকৃত বিকৃতির ফল। একজন ন্যায়পরায়ণ অনুসন্ধানী পাঠকের জন্য আবশ্যক হলো—তিনি যেন আবেগ বা প্রচারণার ভিত্তিতে নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ইসলামী বিদ্যার আলোকে বিষয়গুলো যাচাই করেন। তখনই তার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে—ইসলাম কোনোভাবেই জুলুমকে সমর্থন করে না; বরং মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই তার অন্যতম মূল লক্ষ্য।

চলবে..

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 মুসলিম হা/২৫৭৭; মিশকাত হা/২৩২৬; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৬২৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৩৪৫
2 বুখারী হা/২৪৪৮; মিশকাত হা/২২২৯
3 মুসলিম হা/৬৭৪১; মিশকাত হা/১৮৬৫
4 তিরমিযী ১৯৪০, আবূ দাউদ ৩৬৩৫, আহমাদ ১৫৩২৮, ইরওয়া ৮৯৬
5 বুখারী ৯, ৬৪৮৪, মুসলিম ১৭০
6 মুসলিম ৪৮৮২
7 মিনহাজ ফি শু’আবিল ঈমান – আবু আব্দুল্লাহ আল হালিমি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৬৭
8 https://ifatwa.info/10144/ অথবা https://archive.is/IWtTj (আর্কাইভকৃত).
9 ফাতহুল বারী – ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৩১৯
10 সূত্র: বায়হাকি’র সুনান আল কুবরা, হাদিস নং ১৮৬৮৫
11 দ্রষ্টব্য: আয়াতসূত্র-২
12 المبسوط ٥/٤٥
13, 15 সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২১৫৮
14 সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২১৫৭
16 সূত্র: সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৪১১৩
17 সূত্র: মুয়াত্তা মালিক: বুক ২৮, হাদিস নং- ১১২৯
18 সূত্র: মুয়াত্তা মালিক: ১১২৯
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button