আল্লাহর সিফাত: আকল না ওহী, কোনটা মান্য?

নাস্তিকদের দাবি – আল্লাহর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকা যুক্তিহীন। ইসলাম কি বলে? কুরআন-হাদিসে আল্লাহর সিফাতের ব্যাখ্যা, মানুষের আকলের সীমাবদ্ধতা ও ওহীর দলিল নিয়ে স্বল্প পরিসরে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি।
নাস্তিকদের আপত্তিঃ আল্লাহর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকা যৌক্তিক নয়?
একটি ‘শ’ অক্ষর দিয়ে শুরু নাস্তিকদের সাইটে আপত্তি এসেছে কোরআন হাদিসে আল্লাহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংক্রান্ত যে বর্ণিত হয়েছে তা নিয়ে। সেখানে উপসংহারে বলা হয়েছে,
“মহাবিশ্বের স্রষ্টা যে শারীরিক অঙ্গ যেমন হাত-পা থাকার ধারণার ঊর্ধ্বে তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব, দার্শনিক যুক্তি এবং শারীরবৃত্তীয় বিবেচনায়। শারীরিক অঙ্গ থাকা মানে সীমাবদ্ধতা, স্থান-কাল-দেহের নিয়ন্ত্রণে থাকা। কিন্তু স্রষ্টা সর্বশক্তিমান, অসীম এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার বাইরে। তাই স্রষ্টার শারীরিক অঙ্গ থাকার ধারণাটি যৌক্তিকভাবে সঠিক নয় এবং তার মহানত্ব ও অসীম ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে এই ধারণাটি বাস্তবতাহীন।”
জবাবঃ আকলের সীমাবদ্ধতা ও ওহীর প্রমাণ
এই বিষয়ে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা পরে না, কিন্তু তারপরও অনেক আগে একজন এই রেফারেন্সগুলো দেখিয়ে প্রশ্ন করেছিল। তাই ভাবলাম একটা স্বতন্ত্র লিখা থাকা দরকার, ভবিষ্যতে কারো যদি প্রয়োজন হয়!
এখন আসি মুল আলোচনায়, এই যে আকল ব্যবহার করলো আল্লাহর জাতের উপর এটাই যথেষ্ট এটা বলার জন্য যে আপত্তিকারীর মানসিক সমস্যা রয়েছে।
কারণ সে নিজের মত একটা স্ট্যান্ডার্ড ধরে নিয়েছে আল্লাহর জন্য, এমন হলে তা স্রষ্টার জন্য মানায় না, এমন হলে তা স্রষ্টার সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে, এমন হলে তা অযৌক্তিক, এমন হলে তা স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য হতে পারে না, এমন হলে তিনি স্রষ্টাই হতে পারেন না। অথচ তারা যা বলছে সব অনুমানের ভিত্তিতে বলছে, কারণ তারা কি করে জানবে আল্লাহ বৈশিষ্ট্য, জাত, সিফাত কেমন হবে না হবে, কেমন হওয়া উচিত বা উচিত নয়? তাদেরকে কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এসে বলে গিয়েছেন? তাহলে তারা সেটা কিসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করেন?
আকল? সকলের আকলতো এক নয়, সকলের বুঝতো এক নয়, তাহলে? আমার আকলতো এসবকে সীমাবদ্ধ বলছে না, অযৌক্তিক বলছে না, তাহলে আমি কারটা মানবো? আমার আকলেরটা নাকি নাস্তিকের আকলেরটা? কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
চক্ষুসমূহ তাকে আয়ত্ব করতে পারে না। আর তিনি চক্ষুসমূহকে আয়ত্ব করেন। আর তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। সূরা আল-আন’আম আয়াত ১০৩
তিনি তাদের আগের ও পরের সব কিছুই জানেন, কিন্তু তারা জ্ঞান দিয়ে তাঁকে বেষ্টন করতে পারবে না। সুরা ত্বহা আয়াত ১১০
সম্মুখের অথবা পশ্চাতের সবই তিনি অবগত আছেন। একমাত্র তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত, তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারেনা। সুরা বাকারা আয়াত ২৫৫
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে আল্লাহর জাতের উপর নিজের আকলি দলিল দেওয়া চরম মুর্খতার লক্ষণ। কারণ আল্লাহ সকল দৃষ্টি ও জ্ঞানের ঊর্ধ্বে, আল্লাহ মানুষকে সেই জ্ঞান দেন নি তার বিষয়ে অনুমানের ভিত্তিতে মন্তব্য করতে পারার।
কুরআনে আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে সতর্কতা
তাই আল্লাহ জন্য অনুমানের ভিত্তিতে কোন স্ট্যান্ডার্ড তৈরী করাটাই বুদ্ধিমানের কোন কাজ নয়, কারণ আল্লাহর জন্য এমন কিছু নির্ধারণ করা যে বিষয়ে আল্লাহ কোন ইলম দেন নি তা নিছক নফসের খায়েশাত পুরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। কেরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন,
(হারাম করেছেন) যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না। সুরা আরাফ আয়াত ৩৩
নিশ্চয় সে তোমাদেরকে আদেশ দেয় মন্দ ও অশ্লীল কাজের এবং আল্লাহর ব্যাপারে এমন কিছু বলতে, যা তোমরা জান না। সুরা বাকারা আয়াত ১৬৯
“তারা বলে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন’। তিনি মহান পবিত্র তিনি অভাবমুক্ত! যা কিছু আছে আসমানসমূহে ও যা কিছু আছে পৃথিবীতে তা তারই। এ বিষয়ে তোমাদের কাছে কোন সনদ নেই। তোমরা কি আল্লাহর উপর এমন কিছু বলছ যা তোমরা জান না?” সূরা ইউনুস আয়াত ৬৮
নাকি আল্লাহর উপর এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না’? সুরা বাকারা আয়াত ৮০
তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না’? সূরা আল আরাফ: ২৮
আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে। সুরা ইসরা আয়াত ৩৬
“তোমরা বিবিধ ধারনা করা থেকে বেঁচে থাক; কেননা কোন কোন ধারনা করা গুনাহের পর্যায়ে পড়ে।” [সূরা আলহুজুরাতঃ ১২]
হাদীসে এসেছে, “তোমরা ধারনা করা থেকে বেঁচে থাক; কেননা ধারনা করে কথা বলা মিথ্যা কথা বলা৷” [বুখারীঃ ৫১৪৩, মুসলিমঃ ২৫৬৩]
গায়েবি বিষয়ে অনুমানের ভিত্তিতে কোন মন্তব্য করা নিয়েও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা, কোরআনে আল্লাহ বলেন,
কেউ কেউ বলবে, তারা ছিল তিনজন তাদের চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর এবং কেউ কেউ বলবে, তারা ছিল পাঁচজন, তাদের ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর, গায়েবী বিষয়ে অনুমানের উপর নির্ভর করে। সূরা আল-কাহফ আয়াত ২২
অথচ এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞানই নেই। তারা তো কেবল অনুমানেরই অনুসরণ করে। আর নিশ্চয় অনুমান সত্যের মোকাবেলায় কোনই কাজে আসে না। সুরা আন নাজম আয়াত ২৮
আর তাদের অধিকাংশ কেবল অনুমানেরই অনুসরণ করে, সত্যের পরিবর্তে অনুমান তো কোন কাজে আসে না, তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবগত। সুরা ইউনুস আয়াত ৩৬
আল্লাহর সাথে সৃষ্টির সাদৃশ্য নেই
দ্বিতীয় বিষয়টি হল কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর হাত পা মুখ ইত্যাদি সিফাত কি সৃষ্টির সাথে মিলবে? আপত্তিকারী নিজেই বলছে, “স্রষ্টা সর্বশক্তিমান, অসীম এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার বাইরে।” তাহলে প্রশ্ন হল আল্লাহ কি এই সিফাতগুলো সহিত সেই সীমাবদ্ধতার বাইরে থাকতে পারে না? এখন আপনিই বলছেন তিনি সর্বশক্তিমান, তাহলে উনার পক্ষে এই ছোট জিনিস সম্ভব হবে না কেন?
দুনিয়ার কথাই চিন্তা করেন, মানুষ, টিকটিকি, ক্যাঙ্গারু, ডাইনোসর, তেলাপোকা, ডলফিন, জ্যালিফিশ, চিতা, বাঘ, হাতি, ঈগল, চড়ুই ইত্যাদি সৃষ্টি সবার হাত পা কি একরকম? সৃষ্টির মধ্যে বিভিন্ন প্রাণীর মাঝে যদি এতটা ভিন্নতা থাকতে পারে তাহলে যেই স্রষ্টা আমাদের সবগুলোকেই সৃষ্টি করেছেন সেই স্রষ্টার হাত, পা, মুখ ইত্যাদির কি কোন সৃষ্টি সদৃশ হতে পারে৷ অবশ্যই না, এটা কমন সেন্স এর বিষয়।
আবার কোরআন হাদিসে আল্লাহ জন্য বর্ণিত এসব সিফাত দেখিয়ে মুশরিকরাও দেখলাম নিজেদের দেব-দেবির পক্ষে দলিল দেয়। ভাইরে ভাই এতটা অজ্ঞতা কেমনে সম্ভব! আপনি আপনার হাতে মানুষ, গরু, ছাগল, শুয়র, বানর, ময়ুর, সাপের মূর্তি বানিয়ে পুজা করেন আবার এগুলোর পক্ষে আল্লাহর সিফাতগুলোর দলিলও দেখান! অথচ আল্লাহর সঙ্গেতো কোন সৃষ্টির মিল নেই!
কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা উনার সাদৃশ্য না থাকা সম্পর্কে নিম্নে আয়াতগুলো বর্ণনা করেন,
বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। সুরা ইখলাস আয়াত ১
কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সূরা শূরা আয়াত ১১
সুতরাং তোমরা আল্লাহর জন্য অন্য কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন আর তোমরা জান না।
সূরা নাহল আয়াত ৭৪
সুতরাং যে সৃষ্টি করে, সে কি তার মত, যে সৃষ্টি করে না? অতএব তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না? সুরা নাহল আয়াত ১৭
বল, ‘আসমানসমূহ ও যমীনের রব কে’? বল, ‘আল্লাহ’। তুমি বল, ‘তোমরা কি তাঁকে ছাড়া এমন কিছুকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছ, যারা তাদের নিজদের কোন উপকার অথবা অপকারের মালিক না’? বল, ‘অন্ধ ও দৃষ্টিমান ব্যক্তি কি সমান হতে পারে? নাকি অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে? নাকি তারা আল্লাহর জন্য এমন কতগুলো শরীক নির্ধারণ করেছে, যেগুলো তাঁর সৃষ্টির তুল্য কিছু সৃষ্টি করেছে, ফলে তাদের নিকট সৃষ্টির বিষয়টি একরকম মনে হয়েছে’? বল, ‘আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি এক, একচ্ছত্র ক্ষমতাধর’। সুরা আর রাদ আয়াত ১৬
সেহেতু এই বিষয়টি প্রতিয়মান হয় যে এমন আপত্তি চরম অজ্ঞতার থেকেই কেউ করতে পারে। সুস্থ মস্তিষ্কের কারো দ্বারা এমন সব আপত্তি আসাটা একটু অস্বাভাবিক বিষয়৷ আশা করি ইনশাআল্লাহ এই নিয়ে কোন কনফিউশান থাকবে না কারো। যদি সব কিছু আমাদের নিজ নিজ এই দুনিয়াবী সীমিত ইলম, বুঝ, ভালো লাগা, নফসের খায়েশাত দ্বারা বুঝার চেষ্টা করি, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি তাহলে দিন শেষে মুশরিকদের মতই মুর্তি বানিয়ে পুজার আচার অনুষ্ঠান শুরু করা লাগবে।
আল্লাহ আলাম
[ছবির কনটেস্ট হলঃ একটি মানুষের হাত একটি বিশাল, ধেয়ে আসা সমুদ্রের ঢেউকে একটি ক্ষুদ্র, স্বচ্ছ কাঁচের বাক্সে মাপতে বা ধরে রাখতে চেষ্টা করছে। ঢেউটি শক্তিশালী এবং উপছে পড়ছে, এটিকে ধরে রাখা অসম্ভব। এটি আল্লাহর গুণাবলীকে মানুষের যুক্তি দিয়ে সীমাবদ্ধ করার অসারতাকে প্রতিনিধিত্ব করে।]




