দুধ উৎপাদন হয় গোবর এবং রক্তের মাঝখান থেকে?
প্রশ্ন- কুরআনে আছে রক্ত ও গোবরের মধ্য থেকে দুধ উৎপন্ন হয়। রক্ত, দুধ, গোবর একসাথে মিশে থাকে, গরুর লিভার সেটি আলাদা করে ৩ জায়গায় পৌঁছে দেয়। অথচ বিজ্ঞান বলে দুধ উৎপাদন হয় স্তনগ্রন্থিতে এবং লিভার এমনকিছু করে না। এর ব্যাখ্যা কী?
উত্তর- কুরআনে এমন কোনো আয়াত নেই, যা বলে রক্ত, দুধ, গোবর একসাথে মিশে থাকে এবং যকৃত সেটাকে আলাদা করে ভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেয়। কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
"আর নিশ্চয়ই গবাদি পশুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। তার উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য থেকে তোমাদেরকে পান করাই বিশুদ্ধ দুধ, যা পানকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যকর।" [সূরা নাহল, আয়াত ৬৬]
এখানে যকৃতের কোনো ভূমিকা উল্লেখ নেই। যকৃতের ভূমিকার বিষয়টি কুরআনে নয়, বরং তাফসীরে উঠে এসেছে।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ জন্তুর ভক্ষিত ঘাস তার পাকস্থলীতে একত্রিত হলে পাকস্থলী তা সিদ্ধ করে। পাকস্থলীর এই ক্রিয়ার ফলে খাদ্যের বিষ্ঠা নীচে বসে যায় এবং দুধ উপরে থেকে যায়। দুধের উপরে থাকে রক্ত। এরপর যকৃত এই তিন প্রকার বস্তুকে পৃথকভাবে তাদের স্থানে ভাগ করে দেয়, রক্ত পৃথক করে রগের মধ্যে চালায় এবং দুধ পৃথক করে জন্তুর স্তনে পৌঁছে দেয়। এখন পাকস্থলীতে শুধু বিষ্ঠা থেকে যায়, যা গোবর হয়ে বের হয়ে আসে। [তাফসীরে বাগাওয়ী]
শাইখ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া হাফিযাহুল্লাহ লিখেন-
এ বর্ণনাটি ইমাম বাগাভী রাহিমাহল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এনেছেন। তবে সনদ উল্লেখ নেই। ইমাম ইবন কাসীর সেটা এনেছেন, তবে দুটি কাজ করেছেন,
১- যকৃত উল্লেখ করেননি।
২- ইবন আব্বাস উল্লেখ করেননি।
তাই বুঝা গেল, আসল সমস্যাটি তাফসীর বাগাওয়ী থেকে। সেখানে যেহেতু 'যকৃত' বলা হলেও মূল বক্তব্যটির সনদ উল্লেখ করা হয়নি, তাই ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এ শব্দ থেকে মুক্ত বলা যায়। অর্থাৎ, এরকম কিছু কুরআনে নেই এবং সনদসহ রাসূল ﷺ বা কোনো সাহাবী থেকেও বর্ণিত হয় নি।
এবার জেনে নিই, বিজ্ঞান অনুযায়ী দুধ কীভাবে উৎপন্ন হয়। দুধ উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণলব্ধ এবং দৃশ্যমান সত্য, কোনো হাইপোথিসিস বা থিওরি নয়। তাই এটা বিশ্বাস করা জরুরি, ইসলাম দৃশ্যমান বিষয় অস্বীকার করে না।
দুধ উৎপাদন প্রক্রিয়া-
গরু Mammalia- স্তন্যপায়ী শ্রেণিভুক্ত প্রাণী। অন্যসব স্তন্যপায়ী প্রাণীর মত গরুর Mammary Gland থেকে দুধ উৎপন্ন হয়। গরুর ডিম্বাশয় ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোন উৎপাদন করে, যা স্তনগ্রন্থির বিকাশের জন্য আবশ্যক। এই হরমোন দুটি রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। বাছুর জন্মের পর দুধ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাছুর দুধপানের চেষ্টা করলে এই উদ্দীপনা মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে পৌঁছে ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার ব্লক করে দেয়। এর ফলে প্রোল্যাক্টিন হরমোন উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের নিচে অবস্থিত পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে আসা এই হরমোন এবং ভ্যাসো-এক্টিভ আন্ত্রিক পেপটাইড দুধ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করে।
গরুর ক্ষুদ্রান্ত চর্বিত ঘাস থেকে পুষ্টি উপাদান শোষণ করে রক্তের মাধ্যমে তা স্তনগ্রন্থিতে পৌঁছায়। কৈশিক নালিকা বেষ্টিত নি:স্রাবি কোষে সেই পুষ্টি উপাদান প্রবেশ করে দুধ উৎপন্ন হয়ে সংগ্রাহী গ্রন্থিতে জমা হয়, যা স্তনবৃন্তের মাধ্যমে নি:সরণ হয়। দুধে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানগুলো হলো- ক্যালসিয়াম, রিবোফ্ল্যাভিন, ফসফরাস, ভিটামিন এ, ভিটামিন বি-১২, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, আয়োডিন। অর্থাৎ, সংক্ষেপে- - গরুর স্তনগ্রন্থির বিকাশ ঘটে ডিম্বাশয়ে উৎপন্ন ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন দ্বারা, যা রক্তের মাধ্যমে কাজ করে।
বাছুর জন্মের পর দুধপানের চেষ্টার ফলে পিটুইটারি থেকে প্রোল্যাক্টিন হরমোন রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে স্তনগ্রন্থিকে উদ্দীপ্ত করে ল্যাক্টোজেনেসিস বা দুধ উৎপাদন শুরু করে। - গরুর ক্ষুদ্রান্ত্র চর্বিত ঘাস অর্থাৎ গোবর থেকে পুষ্টি উপাদান শোষণ করে, যা সরাসরি রক্তের মাধ্যমে স্তনগ্রন্থিতে পৌঁছে সিক্রেটরি সেল বা নিস:স্রাবি কোষে দুধ উৎপাদন করে।
অর্থাৎ, পুরো প্রক্রিয়াটি রক্ত এবং গোবর থেকে আসা পুষ্টি উপাদান ও হরমোনের মাধ্যমে সম্পাদন হয়, যা কুরআনের আয়াতের সাথে শতভাগ সাদৃশ্যপূর্ণ। আলহামদুলিল্লাহ, এটাই এ প্রশ্নের উত্তর। দুধ উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন
- [১] https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK218174/#:~:text=The%20cow%20has%20four%20mammary,into%20small%20clusters%20called%20lobules.
- [২] https://academic.oup.com/af/article/13/3/44/7205886
- [৩] https://vikaspedia.in/agriculture/livestock/general-management-practices-of-livestock/milk-production-and-the-udder
- [৪] https://www.sciencedirect.com/topics/agricultural-and-biological-sciences/milk-synthesis
লেখক- মাহাথির বিন আলী
শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব ফার্মেসি, ঈস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা