তাকদির নিয়ে এত বৈপরীত্যে কেনো?

প্রশ্নোত্তর (Q&A)Category: ইসলামতাকদির নিয়ে এত বৈপরীত্যে কেনো?
Rayhan Rashid asked 1 বছর ago
তাকদিরের কনসেপ্ট নিয়ে কোরআন - হাদীসে এত বৈপরীত্যে কেনো? একেক বিষয়ে একেক রকম, একেক জন একেক দলিল দিয়ে একেক রকম ব্যাখ্যা দেয়। এমন কেন?
1 Answers
Ashraful Nafiz Staff answered 1 বছর ago

তকদিরের বিষয়টা সাধারণ, আমরাই অযথা এটাকে কঠিন বানাই৷

আমরা ভাবি তকদির হল ভবিষ্যৎ, ব্যস। অথচ এটা সঠিক নয়, তকদিরের সাথে আরো অসংখ্য বিষয় জড়িত।

কিছু বিষয় হল গায়েবি, তা মানুষের বুঝের অনেক ঊর্ধ্বে। কিছু বিষয় মানুষের বুঝার অনুমতি দেওয়া থাকলেও তা মানুষ এখনো বুঝে উঠতে পারে নি। কিছু বিষয় বুঝার অনুমতি নেই বিধায় সে বিষয় যতই ব্যাখ্যা দেওয়া হোক না কেন তা প্রকৃত রূপে সঠিক ভাবে বুঝতেই পারবে না কেউ।
আমার নিকট এই বিষয়টা হল অন্ধের হাতি দেখার মত চিন্তা করি৷ এই বিষয়ে এটা দেখতে পারেন https://youtube.com/shorts/HulyTN9CeHY?si=cRy0H-lTtPtu6i96 ।  আমার নিকট যতটুকু তথ্য আছে সেটা হল সীমিত, তাই আমি সেটাকে প্রপারলি ডিফাইন করতে পারি না।
আল্লাহ কোরআনে বলেছেন গায়েবের চাবি উনারই কাছে, তিনি যা যতটুকু জানার অনুমতি দিয়ে রেখেছেন তার চাইতে বেশি কেউ জানতে পারবে না। তিনি গায়েব সম্পর্কে শুধু উনার মনোনীত বান্দাদেরকেই কিছু কিছু জানিয়েছেন। আল্লাহ ও তার রাসুলের কথা হতে এটি পরিষ্কার যে তকদিরও আল্লাহর গায়েবের ভান্ডারের একটি ইলম। সাহাবাগণ তকদির নিয়ে বেশি প্রশ্ন, চিন্তা, গবেষণার বিরুদ্ধে চরমভাবে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
এর কারণ হল তকদিরের স্তর, লিখা, পরিমাণ, ধরণ ইত্যাদির ৫ শতাংশও হয়তো আমাদের কাছে প্রোপারলি এক্সপ্লেইন করেন নি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা।

এই বিষয়ে একটু, সে বিষয়ে একটু (যতটুকু আমাদের জন্য যথেষ্ট) বলার কারণে আমরা সবগুলোর একত্রে সিকুয়েন্স বুঝতে পারি না, সমন্বয় করতে পারি না। কারণ বহু কিছু আমাদেরকে জানানো হয় নি, আমাদের কাছে বহু তথ্য নেই। আর এরকম বিষয়ে যতরকমের ব্যাখ্যাই থাকুক না কেন আমাদেরকে তা শতভাগ সন্তুষ্ট নাও করতে পারে। কোনো না কোনো ফাঁকফোকর বের হয়ে আসে।

তকদির সত্য, আল্লাহ সব জানেন সত্য, তিনি সব লিখে রেখেছেন সত্য, সব উনার ইচ্ছায় হয় সত্য, কিন্তু তিনি সেগুলোর সব কিছুই মানুষকে দিয়ে করান না এটাও সত্য, মানুষ নিজে নিজে সেগুলো করে এটাও সত্য, মানুষ তকদিরের অনুগামী সত্য, ভালো ভাগ্য ও মন্দ ভাগ্য নির্ধারিত সত্য, কে জান্নাতি কে জাহান্নামি তা নির্ধারিত সত্যা, কতজন করে তাও নির্ধারিত সত্য, জন্ম মৃত্যু নির্ধারিত সত্য, মানুষ তার কর্ম ফলের কারণে জান্নাত ও জাহান্নাম পাবে সত্য, আজাব মানুষের কৃতকর্মের কারণে আসে সত্য, আল্লাহ জুলুম করেন না সত্য, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে সত্য, তা অনুসারে কর্ম করার ক্ষমতা রয়েছে বা দেওয়া হয়েছে সত্য, কিন্তু সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেটাও সত্য, আল্লাহ কাউকে জোর করে কিছু করান না, চাপিয়ে দেন না সত্য, আল্লাহ সঠিক বেঠিক নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং মানুষকে পুতুলের মত নাচান না সত্য, আল্লাহ পরীক্ষা করছেন সত্য, কারো মতে তকদির পরিবর্তন হয় সত্য, রিজিক নির্ধারিত সত্য, পরিমাণ নির্ধারিত সত্য, কি খাবেন তা লিখিত আছে সত্য, হালাল বেঁচে খওয়া আপনার দায়িত্ব কারণ আপনাকে জোর করে খওয়ানো হচ্ছে না সত্য ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু সবকিছুকে সমন্বয় করে সন্তুষ্ট জনক উত্তর দাঁড় করানো পসিবল হয়ে ওঠে না, কারণটা একটু উদাহরণ দিয়ে বলি। আমি আপনাকে কিছু পাজলের টুকরো দিলাম, যার মধ্যে ২৫ বা ৫০ শতাংশ আপনাকে দিই নাই। আপনি বহু চেষ্টা করে জোরা তালি লাগিয়ে এটার একটা সাইজ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না যে সেগুলো এত কষ্টের পরও আপনি কেন সঠিক ভাবে সাজাতে পারছেন না, আপনি জানেনই না যে সেখানে বেশ কিছু অংশ অনুপস্থিত। তকদিরের বিষয়েও আমাদের অবস্থা একই রকম, এখন সেই ইলম বা তথ্যের ঘাটতি থেকে যায় তকদির নিয়ে থাকা তথ্যগুলোর সমন্বয় করতে গেলে। ৬ এর পর যে ৭ বসবে সেটা আমরা জানিই না, আমরা ৮ বসিয়ে ফেলছি, ৭ এর অস্তিত্বের সম্পর্কেই আমাদের ধারণাই নেই, এর গুরুত্ব, ম্যাকানিজম জানা নেই। যার কারণে সেই ঘাটতি থাকা তথ্যের কারণে আমাদের নিকট মনে হয় বৈপরীত্য রয়েছে, কিন্তু আমরা এটা বুঝার চেষ্টা করি না যে আমাদের সকল তথ্য নেই তাকদির সম্পর্কে, তাই আমাদের কাছে এমন মনে হচ্ছে।

দেখে একটা অন্যটার সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে কিন্তু এসব সাংঘর্ষিক না, কিন্তু এর পিছনের ম্যাকানিজমটা কেমন যার কারণে সাংঘর্ষিক না সেটা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। মেকানিজমটা না জানা, না বুঝার কারণে মানুষ তাকদির নিয়ে বেশি গবেষণা করতে গিয়ে বিভ্রান্তিতে পতিত হয়। আমরা সম্পূর্ণ ম্যাকানিজমটা তখনই বুঝতে পারতাম যখন আল্লাহ আমাদের নিকট তকদিরের সকল তথ্য উন্মুক্ত করে দিতে। কিন্তু আল্লাহ তেমনটি করেন নি, হতে পারে আল্লাহর সেই মেকানিজমটি মানুষের বুঝার সাধ্যেও নেই তাই তিনি এর জ্ঞানকে গোপন রেখেছেন, আল্লাহই ভালো জানেন। আল্লাহই উনার সৃষ্টি সম্পর্কে অধিক জানেন, আর তার ইলম আমাদেরকে দেন নি, তাই তকদির বিষয়ে আল্লাহ ও তার রাসুল হতে যতটুকু ইলম প্রাপ্ত হয়েছি ততটুকুতেই আমাদেরকে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

মানুষ এই সিম্পল বিষয়টা বুঝে না বিধায় তকদির নিয়ে চিন্তা করতে করতে ঘুরপাক থেকে থাকে। আপনি যখন বুঝবেন আপনাকে দেওয়া পাজেলে কিছু অংশ অনুপস্থিত তখন আপনি সেটার সমাধান করার চেষ্টা করা ছেড়ে দিবেন, কারণ অনুপস্থিত অংশ ছাড়া সেটা পূরণ করা যে সম্ভব না সেটা আপনিও জানেন ও বুঝেন।

কোন এক প্রশ্নে আহমাদুল্লাহ হাফি. একটা চমৎকার উদাহরণ দিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন। উদাহরণটাই আমারো টানছি। কয়েকশত শত বছর আগের একলোক হঠাৎ করে বর্তমান সময়ে চলে আসলো, সেতো এখনকার দিন দুনিয়া কিছু জানে না, বুঝে না। সে ঢাকা শহরে এসে দেখলো সব দিকে তার দিয়ে এক জঞ্জাল অবস্থা। তার কাছে সেগুলো দেখতে খারাপ লাগছে, ভাবিলো এই দেশের মানুষ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না, তাই সে সব তার ছিড়ে কেটে পরিষ্কার করে ফেললো। সারা শহরে ঝামেলা সৃষ্টি  হওয়ার পর তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করা হলে সে সব খুলে বলে। তারপর তারে শাস্তির আয়োতায় আনা হয়। এখন সে বললে এই দেশের মানুষতো চরম খারাপ! তাদের উপকার করলাম আর তারা আমাকে জেলে ঢুকাচ্ছে! এখন তারতো এত জ্ঞান নেই যে কয়েত শত বছর পরে দুনিয়ার পরিবর্তনের বিষয়ে, টেকনলজির বিষয়ে, এখানের সিস্টেম নিয়ে। তাকে কয়েক বছর সব কিছু বিস্তারিত বলে বুঝালেই হয়তো সে বুঝতে পারবে তারপর। এর আগেতো সে এখনকার মানুষকে অজ্ঞ, জ্ঞানহীন, মুর্খই ভাববে, কারণ তার কাছে পর্যাপ্ত ইলম নেই। সামান্য এই ২/৩শত বছরের ডিফারেন্সে যদি এমন কিছু হতে পারে সেখানে তাকদিরের বিষয়ে অসীম শক্তিমত্তার অধিকারী আল্লাহর সিস্টেম ও সসিম জ্ঞানের অধিকারী মানুষের বুঝের মধ্যে কেমন পার্থক্য হতে পারে সেটা একটাবার কল্পনা করে দেখুন।

আমরা তকদিরের বিষয়গুলোকে আলাদা আলাদা ভাবে কিছুটা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হলেও সব বিষয় একত্রে সমন্বয় করে ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। কারণ সেই আমাদের ইলমের ঘাটতি। এমনকি অনেক সময় তকদিরের দুই তিনটি বিষয়কে একত্রে সমন্বয় করে ব্যাখ্যা করতেও আমাদেরকে হিমশিম খেতে হয়। আমরা তকদিরের সকল বিষয়কে খুব ভালো করেই ব্যাখ্যা করতে পারতাম যদি এই ইলম আল্লাহ গায়েবের ইলম না রেখে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিতেন মানুষের জন্য। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাতো এমন করেন নি, নিশ্চয়ই এর পিছনে হিকমা রয়েছে, সেহেতু বহু বিষয় খুব ভালো ভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে না এটাই স্বাভাবিক।

তাকদির আল্লাহর দুর্বোধ্য ভেদ। এর সামনে ফেলে রাখা হয়েছে অসংখ্য পর্দা। এ সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। মানুষের ক্ষুদ্র জ্ঞান ও উপলব্ধি থেকে তিনি তা আড়ালে রেখেছেন। তাই আমাদের করনীয় -যে সীমা-পরিসীমা আমাদের বাতলে দেয়া হয়েছে আমরা তার বাইরে যাব না। কারণ, অদৃশ্যের জ্ঞান জগতের সবার থেকে গোপন করে রেখেছেন তিনি, এমনকি তার নিকটবর্তী ফেরেশতা ও নবী-রসূলগনও তা সম্পর্কে কিছু জানেন না। বলা হয়, জান্নাতে প্রবেশ করার পর তাদের সামনে তাকদিরের বিষয় স্পষ্ট হবে, তার আগে হবে না। -ইমাম সামআনি রহ.।
-হাদিসে আরবাইন, মাকতাবাতুল আসলাফ, ১/২২৫।

Back to top button