জিযিয়া শুধু অমুসলিমদের উপরই প্রযোজ্য কেন?
আমার প্রশ্নটা হচ্ছে জিযিয়া নিয়ে জিযিয়া নিয়ে যখনই অমুসলিমদের সাথে বিতর্ক হয় তখনই মুমিন ভাইয়েরা বলেন-এটি হচ্ছে ট্যাক্স। একটি রাষ্ট্রে থাকতে গেলে যেমন ট্যাক্স দিতে হয়,এটিও তেমন। আবার কেউ বলে এটা নিরাপত্তা কর। কেউ বলে মাথাপিছু এর পরিমাণ খুব বেশি না, অমুসলিম সেনাদের জিযিয়া দিতে হয় না। তাহলে একে আলাদাভাবে \\\'জিযিয়া\\\' বলে সম্বোধনের কারণ কি? আর রাষ্ট্রে তো মুসলিমরাও বাস করছে। তাহলে জিযিয়া শব্দটা স্পেসিফিক্যালি অমুসলিমদের জন্য কেন ব্যবহৃত হয়? আর নিরাপত্তা কার হতে দিবে? মুসলিমরাই তো তাদের রাষ্ট্র দখলে নিয়েছে। তাহলে নিরাপত্তা কাদের হতে?
জিজিয়া কর প্রথা আসে রোমানদের কাছে থেকে। মুসলিম শাসকগণ ইসলামিক সাম্রাজ্যে অমুসলমানদের নিকট থেকে মাথা-পিছু কর আদায় করতেন ; একেই “জিজিয়া' বলা হয়। মুসলিমরা প্রথম এই কর উদ্ভাবন করে নি। প্রাক-মুসলিম যুগে পারসিকদের মধ্যে 'গেজিট' [1]নামে এবং রোমানদের মাঝে ‘টি বুটুম ক্যাপিটিস'[2] নামে এই প্রথা পূর্বেই চালু ছিল। যারা 'রোমান নাগরিক ছিল না, রোমান শাসন কর্তাগণ তাহাদের উপর উক্ত কর ধার্য করেছিলেন। এমনকি এই জাতীয় সিস্টেম বাইবেলেও পাওয়া যায়।[3] খ্রিস্টানদের বাইজেন্টানিয় সাম্রাজ্যে জিজিয়া করের মত কর দিতে হত বিধর্মীদের। এমনকি ভারতের হিন্দু গহড়বাল রাজ্যে বসবাসকারী তুর্কি মুসলিমদের রাজাকে তুরুস্কদণ্ড নামে কর দিতে হত। নামেই পরিষ্কার তুরস্কদণ্ড বরং একটি বর্নবাদী ও জাতিবিদ্বেষ প্রসুত কর।[4] (এই তথ্যগুলো MD Mostafijur Rahman ভাইয়ের টেলিগ্রাম চ্যানেল হতে সংগ্রহ করা হয়েছে, লিংক https://t.me/mostafijur_r1/63)
আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিষ্টানরা দারুল ইসলামে বসবাস করার সুবাদে ইসলামি রাষ্ট্রকে প্রতি বছর যে অর্থ দিয়ে থাকে তাকে জিজিয়া বলে। جزية )জিজিয়া) শব্দটি جزاء )জাজা) থেকে এসেছে। جزاءঅর্থ বিনিময়। যেহেতু ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আহলে কিতাবদের নিরাপত্তা দানের বিনিময়ে এটি নেওয়া হয়, তাই এটিকে জিজিয়া বলে। [4.1]
বাংলাদেশে অনেক কিছুর উপর কর নির্ধারণ করা হয়েছে যা এক সময় ছিল না। আয়ের উপর, সেতু পার হওয়া, আমদানি পণ্যের উপর, দেশীয় উৎপাদিত পণ্যের উপর, মোবাইল ব্যালেন্স, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল ইত্যাদি অসংখ্যা জিনিসের উপর কর আরোপ করে রাখা হয়েছে। কেন করেছে? আপনি সরকারকে প্রশ্ন করেন কেন করেছে? আপনি কি বলেন সকল কর জুলুম? অবশ্যই বলেন না। অবশ্যই কর যখন বেশি আরোপ করে তখনই আওয়াজ তোলেন, এছাড়া নয়। অথচ ইসলামির শরিয়ায় আর কোন কিছুর উপর কর আরোপ করা হয় না! সব কর উঠিয়ে দিয়ে শুধু একটি রাখা হয়, আর ইসলামি শরিয়তে জনগণ হতে শুধু যাকাতের টাকা কোষাগারে নেওয়া হয়। বাকি বাইতুল মালের জন্য আয় অন্য অনেক ভাবে করা যায়। যার ধরুন এমনিতেই সকল পণ্যের মূল্য কমে যায়, সাধারণ মানুষ আর্থিক দিক দিয়ে সুবিধা পায়, এছাড়া জিজিয়া করেও রয়েছে বহু ছাড়। এর ফলাফল আওরঙ্গজেবের কাহিনি হতেই দেখে নিতে পারেন, যেখানে হিন্দুস্তাত চীনের ইকোনমিকেও পার করতে সক্ষম হয়, অথচ বহু পশ্চিমা সমালোচনা করেছিল কেন সকল কর উঠিয়ে ফেলা হয়েছে, এবং শোষণমুলক জিজিয়া কর আরোপ করা হয়েছে! তাহলে জিজিয়া কেন আরোপ করা হয়েছে, এটা কি অন্যায় নয়, এটা কি জুলুম নয় এই জাতীয় অভিযোগমুলক প্রশ্নের কারণ কি?
রাসূল (সা) ইয়েমেনবাসীদের থেকে বাৎসরিক এক দ্বীনার করে জিজিয়া নিয়েছিলেন তাদের অভাব অনটনের কারনে, যার মুল্য বাংলাদেশি হিসেবে বর্তমানে ৩৮০ টাকা বা তার কাছাকাছি। ওমর (রা) ধনীদের (স্বর্ণ অলংকারের মালিকদের) থেকে বেশি নিয়েছিলেন, আনুমানিক ৪ দ্বীনার করেছিলেন। [5]
আপনার নাম মনে করেন ফারহান, এখন কেউ যদি বলে আপনাকে ফারহান বলে সম্বোধনের কারণ কি? স্বাভাবিক উত্তর আপনার পিতা মাতা রেখেছে বিধায় আপনাকে ফারহান বলে। তেমনই এই করের নাম জিজিয়া রাখা হয়েছে বিধায় একে এই নামে সম্বোধন করা হয়। জিজিয়া কর নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধান আছে।[6]
- শিশু-কিশোর, নারী, পাগল, দাস-দাসী, প্রতিবন্ধী, উপাসনালয়ের সেবক, সন্যাসী, ভিক্ষু, অতি বয়োবৃদ্ধ এমন লোকদের জিজিয়া দিতে হবে না।
- অমুসলিমদের কেউ যদি দেশরক্ষার কাজে নিয়োজিত হতে রাজি হন, তাহলে তার জিজিয়া মওকুফ হবে।
- জিজিয়া দিতে আর্থিক ভাবে অক্ষম কোন ব্যক্তি হতে জোর জবরদস্তি করে, তাদের উপর জুলুম করে জিজিয়া নেওয়া বৈধ নয়।
- তাদের থেকে জিজিয়া না নিতে পেরে তাদের গৃহের আসবাসপত্রও জোর করে নিয়ে আসা বৈধ নয়।
আল-সারাখাশি (রহ) ঘোষণা করেছেন:
“জিযিয়ার উদ্দেশ্য অর্থ নয়, বরং সর্বোত্তম পদ্ধতিতে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া। কারণ, [অমুসলিমদের সঙ্গে] একটি শান্তি চুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে, যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায় এবং শান্তিপ্রিয় [অমুসলিমদের] নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়, যার ফলস্বরূপ, মুসলমানদের মধ্যে বসবাস করার সুযোগ হয়, তারা ইসলামের সৌন্দর্য প্রথম হাতে অনুভব করে। অথবা উপদেশ গ্রহণ করে, যা তাকে ইসলাম গ্রহণ করতে পরিচালিত করতে পারে।"[7]
ইমাম শাফিয়ি-এর মতে সর্বনিম্ন জিজিয়া বছরে এক দিনার অথবা তার সমপরিমাণ কাপড়। [8] ইমাম আহমাদ-এর মতে জিজিয়ার সর্বোচ্চ পরিমাণটি ইজতিহাদমূলক। আর সে ইজতিহাদ ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর ন্যস্ত। রাষ্ট্রপ্রধান যার জন্য যতটুকু উপযোগী মনে করবেন, তার জন্য ঠিক ততটুকু জিজিয়া নির্ধারণ করবেন। [9] ইমাম মালিক-এর মতে জিজিয়ার ওয়াজিব পরিমাণ হলো, উমর বিন খাত্তাব কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণটি। আর তা হলো, চার দিনার অথবা চল্লিশ দিরহাম। [10]
ইমাম আবু হানিফা-এর মতে জিজিয়ার ক্ষেত্রে আহলে কিতাবগণ তিনটি স্তরে বিভক্ত। অর্থাৎ উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। উচ্চবিত্ত: এদের জিজিয়ার পরিমাণ হলো, আটচল্লিশ দিরহাম বা চার দিনার। মধ্যবিত্ত: পূর্বের শ্রেণির অর্ধেক তথা চব্বিশ দিরহাম বা দুই দিনার। নিম্নবিত্ত: তাদের জিজিয়া মধ্যবিত্তের অর্ধেক তথা বারো দিরহাম বা এক দিনার। [11]
তথ্যসূত্রঃ-
[1] খূদাবখশ : দি অরিয়েন্ট, পৃঃ ৬৫; আমীর আলী : দি স্যার্যাসেন্স, পৃঃ ৬৩।
[2] আল-তাবারী: তারিখ-উলু-উম্মি-ওয়া-আল-মুলুক, ২৬৬৩-২৬৬৫
[3] Joshua 16:10; 2 Kings 17:3; Matthew 17:25
[4] এ বি এম হবিবুল্লাহ, ভারতে মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠা ১২০৬-১২৯০, অনিরুদ্ধ রায় অনুদিত, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, ২০০৭, পৃষ্ঠা ২৭৭-২৮১
[4.1] তাজুল আরুস ৩৭/৫৩ (দারুল হিদায়া, বারিদা)
[5] https://www.hadithbd.com/books/link/?id=3987
https://www.hadithbd.com/books/link/?id=3986
[6] https://response-to-anti-islam.com/show/জিজিয়া-কি-আসলেই-শোষণমূলক-বিধান--/197 ;
https://islamqa.org/shafii/seekersguidance-shafii/241482/what-were-the-criteria-for-paying-jizya/ ;
https://discover-the-truth.com/2016/06/10/the-truth-about-jizyah/
[7] কামিল সালামাহ আল দুকস, আল 'ইলাকাত আল দাউলিয়াহ ফি আল ইসলাম [জেদ্দা: দার আল শুরুক, 1396/1976], পৃষ্ঠা 302
[8] আল-মাজমু শরহুল মুহাজ্জাব ১৯/৩৯১ (দারুল ফিকর, বৈরুত)
[9] আল-মুগনি, ইবনু কুদামা ৯/৩৩৪ (মাকতাবাতুল কাহিরা, মিশর)
[10] বিদায়াতুল মুজতাহিদ: ২/১৬৬ (দারুল হাদিস, কায়রো)
[11] আল-মাবসুত, সারাখসি: ১০/৭৮ (দারুল মারিফা, বৈরুত)