ইতিহাস

সুলতান মাহমুদঃ অমুসলিম প্রসঙ্গে – পর্ব ৩ [শেষ পর্ব]

আগের দুটি পর্বে সোমনাথ মন্দির ধ্বংস নিয়ে দুইভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই অন্তিম পর্বে আমরা দেখবো তাঁর আমলের জনসাধারণ বিশেষ করে হিন্দুরা কিরকম অবস্থায় ছিলো।

সুলতান মাহমুদের শাসনামলে অমুসলিমদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল। বিজিত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনে কোনোপ্রকার বাধা ছিল না। সে সম্পর্কে হেগ, এলফিনস্টোন প্রমুখ ঐতিহাসিক দ্বিমত পোষণ করেন না। বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা সুলতান মাহমুদের উদ্দেশ্য ছিল না।[1]মুহাম্মদ হাবিব, সুলতান মাহমুদ অব গজনী, পৃ ৭৭-৮২

কিছু লেখক অবশ্য মন্দির ধ্বংসের জন্য সুলতান মাহমুদকে অভিযুক্ত করলেও তারা ভুলে যান যে, একমাত্র অভিযান বা যুদ্ধের সময়ই মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল। শান্তির সময় তিনি কখনো কোনো মন্দির ধ্বংস করেননি, এ বিষয়ে ঈশ্বরী টোপা Politics in Pre-Mughal Times এ বলেন,

‘The temples in fact broken during the campaign for reasons other than religious. But in the time peace Mahmud never demolished a single temple.’

একটা অবাক করা বিষয় হচ্ছে সোমনাথ মন্দির আক্রমণের আগে মূলতান শহরের ওপর আক্রমণ চালায় মাহমুদ। সেখানকার শাসক ছিল মুসলিম। মাহমুদ তাকে পরাজিত করে পুরো মুলতানকে লণ্ডভণ্ড করে দেন, সেখানে একটিও মসজিদ আস্ত ছিল না।[2]এস এ এ রিজভী, দ্য ওয়ান্ডার দ্যাটস ওয়াজ ইন্ডিয়া, পৃ ৬৯ কলহন রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’ – তেও এর বর্ণনা পাওয়া যায়। আগেই বলা হয়েছে মাহমুদের যে সেনাবাহিনী সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করেছিল তাঁর ৫০ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১২ জন সেনাধ্যক্ষ ছিল হিন্দু, এর মধ্যে ২ জন ব্রাহ্মণ।

এদের মধ্যে তিলক রায় নামে একজন সেনাপতির নাম পাওয়া যায়। এরা মূলতান আক্রমণ করে মসজিদ ধ্বংসে হাজির ছিল।

মাহমুদের এই বিশাল হিন্দুবাহিনী মধ্য এশিয়ায় অন্যান্য বহু যুদ্ধক্ষেত্রেও লড়াই করেছে।[3]ডি ডি কোসাম্বী, অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি, পৃ ৩০৯-১০[4]অসিতকুমার সেন, তুর্কি ও আফগান যুগে ভারত, পৃ ১৬.
১০০৩ সালে আফগানিস্তানের সিস্তানে একটি বিদ্রোহ দেখা দিলে মাহমুদ সেখানকার মুসলমান ও খ্রিস্টানদের নির্বিচারে হত্যার জন্য ‘পৌত্তলিক ভারতীয় বাহিনী’ ব্যবহার করেছিলেন।[5]ইরফান হাবিব, মধ্যযুগের ভারতঃ একটি সভ্যতার পাঠ, পৃ ৩৩.

ঐতিহাসিক এস এ এ রিজভিও লিখেছেন,

তাঁর (মাহমুদের) বহুজাতিক সৈন্যদলে হিন্দুদের গ্রহণ করতে কোনো দ্বিধা ছিল না মামুদের। এইসব হিন্দু সৈনিক তাদের নিজস্ব সেনাপতির অধীনে থাকত। বলা হত এমন সেনাপতিদের ‘সালার-ই হিন্দুয়াঁ’। অজ্ঞাতনামা লেখক রচিত সিস্তানের ইতিহাসে এমন অভিযোগ দেখা যায় যে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের নৃশংসভাবে দলে দলে হত্যা করেছে মামুদের বিধর্মী ও পৌত্তলিক ভারতীয় সৈন্যদল।[6]এস এ এ রিজভী, দ্য ওয়ান্ডার দ্যাটস ওয়াজ ইন্ডিয়া, পৃ ৭১

শুধু তাই নয়, মাহমুদ তাঁর হিন্দু সেনাপতি তিলকের হাত দিয়ে দমন করিয়ে ছিলেন নিজেরই মুসলমান প্রধান সেনাপতি নিয়ালতিগিনের বিদ্রোহ।[7]তারা চাঁদ, ইনফ্লুয়েন্স অব ইসলাম ইন ইন্ডিয়ান কালচার, পৃ ১১৬

মাহমুদ যেমন পঞ্চাশ হাজার অমুসলিমকে হত্যা করেন তেমনি সমান সংখ্যক মুসলিম বিদ্রোহীকেও হত্যা করেছেন।[8]ডি এন ঝাঁ, আর্লি ইন্ডিয়া, এ কনসাইজ হিস্টোরি, পৃ ১৬৮

আরেকটা চমকপ্রদ ঘটনা হল, একটি মসজিদে মুসলিম বিদ্রোহীদের ঢালাওভাবে হত্যা করার জন্য মাহমুদ তাঁর হিন্দু সেনাদের ব্যবহার করেছিলেন।[9]প্রাগুক্ত

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে অস্বীকার করায় হিন্দুদের হত্যা করা হয়েছে এরূপ কোনো নজির নেই।

সুলতান মাহমুদ বহু ব্রাহ্মণ ও হিন্দুদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেছিলেন।

‘তারিখ-ই-বায়হাকি’ – তে বলা হয়েছে যে, সুলতান মাহমুদের সেনাপতিদের মধ্যে তিলক রায়, সোন্দি, সোনাই, হিন্দা ও হাজারী রায় ছিলেন হিন্দু।[10]A A Engineer, Communalism in India, p 11

সুলতান মাহমুদের শাসনাধীনে হিন্দুগণ পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতেন। তিনি গজনীতে হিন্দুদের বসবাসের জন্য স্বতন্ত্র বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালন করতে পারতেন, কোনো বাধা বিপত্তি ছিল না। তিনি হিন্দুদের বিচার হিন্দু আইনমত করবার ব্যবস্থা মেনে চলতেন।[11]I H Qureshi, The Administration of Sultanate of Delhi, p 11

মাহমুদের ধর্মীয় নীতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক ডব্লিউ হেইগ ‘কেমব্রিজ হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া’ (৩য় খণ্ড) গ্রন্থে বলেছেন,

His religious policy was based on tolerance and though zealous for Islam, he maintained a large body of Hindu troops and there is no reason to believe that conversion was a condition of their services.[12]The Cambridge History Of India Volume III by Wolseley Haig, page 27 https://archive.org/details/cambridgehistory035492mbp/page/26/mode/1up

এলফিনস্টোন তাঁর ‘A History of India’ গ্রন্থে (লন্ডন, ১৯১৬) বলেন,

এইরকম ঘটনা কোথাও দেখা যায়নি যে, যুদ্ধ ব্যতীত কোনো হিন্দুকে কোথাও তিনি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।

তা ছাড়া সুলতান মাহমুদই ভারতের মানুষকে হিন্দু আর ভারতের প্রচলিত ধর্মকে হিন্দুধর্ম নাম দেন। এই অর্থে মাহমুদকেই হিন্দুধর্মের প্রতিষ্ঠাতা বলে উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট গবেষক সুরজিৎ দাশগুপ্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম’ গ্রন্থে। কেনেথ জোন্স তাঁর গ্রন্থ ‘আর্যধর্মঃ হিন্দু কনশাসনেস ইন নাইনটিনথ সেঞ্চুরি পাঞ্জাব’ এ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

Read More...  ইসলাম ও ভারতবর্ষঃ কেন ইসলামকে হজম করা যায় নি?

তিনি গজনীতে হিন্দু সংস্কৃতি ও সংস্কৃত সাহিত্যের বিকাশ সাধনের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম স্থাপন করেছিলেন।[13]আব্দুল করিম, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন, পৃ ২১

মজুমদার, রায়চৌধুরি ও দত্ত তাঁদের ‘অ্যাডভান্সড হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে সুলতান মাহমুদ প্রসঙ্গে বলেছেন,

সুলতান মাহমুদ অবশ্যই বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক অধিনায়ক। তাঁর প্রশান্ত সাহসিকতা, বিজ্ঞতা, উদ্ভাবনী শক্তি ও অন্যান্য গুণাবলি তাঁকে এশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম প্রধান বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর সাফল্যজনক ভারত অভিযানের ওপরেও তাঁর কৃতিত্বের ঘরে জমা পড়েছিল দুটি অবিস্মরণীয় সমর-অভিযান। যুদ্ধপ্রিয় তুর্কিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার পথে ইলাক খান ও সেলুজাকদের সৈন্যবাহিনী তিনি ধ্বংস করেন। শ্রেষ্ঠ সমর- নায়ক সুলতান শিল্পের যোদ্ধা ও পৃষ্ঠপোষক এবং বিদ্যোৎসাহী ছিলেন।.. ধর্মপ্রচারের জন্য বা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে তিনি এদেশে আসেননি।

সোজা কথায় বললে মাহমুদের রাজ্যে প্রত্যেকে সুখ-শান্তির ছায়ায় আরামে থাকত। সেই যুগে মাহমুদের মতো এত ভালো রাজা আর কেউই ছিলেন না।[14]Elphinston, A History of India, p 334.

ঐতিহাসিক ঈশ্বরীপ্রসাদ লিখেন,

ইতিহাসে মাহমুদের স্থান নির্ণয় কঠিন নয়। সমসাময়িক মুসলমানরা তাকে গাজী ও ইসলামের নেতা বলে জানতেন। হিন্দুরা আজ পর্যন্ত তাকে নিষ্ঠুর, অত্যাচারী, আদি হুন এবং মন্দির ও মূর্তি ভঙ্গকারী বলে মনে করে থাকেন। …..নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের চোখে মাহমুদ একজন আজন্ম নেতা, ন্যায়পরায়ণ সুলতান, জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্পকলার উৎসাহদাতা ছিলেন, তিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা- বাদশাহদের একাসনে বসার সমকক্ষ।[15]ঈশ্বরী প্রসাদ, হিস্ট্রি অব দ্য মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া, পৃ ১৯১ ; ঈশ্বরী প্রসাদ, এ শর্ট হিস্ট্রি অব মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া, পৃ ৪৯

ঐতিহাসিক গীবন তাঁকে আলেকজান্ডারের চেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্রাট বলেছেন,

‘The Sultan of Gazana surpassed The Limits of The Conquest of Alexander’[16]Decline And The Fallen of Roman Empire, Vol-6, p 241

স্যার জন মার্শাল মাহমুদকে ‘মহামতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।[17]Cambridge History of India, Vol 3, p 574
সতীশচন্দ্র বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন মানুষের নেতা’।[18]সতীশচন্দ্র, মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া, খণ্ড ১, পৃ ১৬
ঐতিহাসিক সুরজিৎ দাশগুপ্ত বলেন,

এটা ঠিক কথা যে মাহমুদের যে সমর প্রতিভা ছিল তার তুলনা সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসেই বিরল এবং প্রাকমুসলিম ভারতীয় রাহুণদের দ্বারা প্ররোচিত না হলেও মাহমুদের সমরপ্রতিভা কোন না কোন ভাবে প্রকাশের পথ খুঁজে নিতই, হয়তো সে ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে ভারতবর্ষের বদলে চীন তথা পূর্বদিকেই আক্রমণ চালনা করা সম্ভব ছিল। কিন্তু জয়পাল প্রমুখ ভারতীয় রাজনাদের স্পধা, শঠতা ও সন্ধিভঙ্গের অপরাধ তাঁর ওই প্রতিভাকে বিশেষভাবে ভারতবর্ষের দিকেই বিকাশের অনুকূল পরিবেশ করে দিয়েছিল। পাঞ্জাবে কর্তৃত্ব বিস্তার ছাড়া ভারতীয় ভূখণ্ডে কোন স্থায়ী রাজত্ব প্রতিষ্ঠার অথবা ভারতীয় জনসাধারণের মধ্যে কোন ধর্মপ্রচারের পরিকল্পনা তাঁর ছিল না, তা তিনি করেনও নি।[19]সুরজিৎ দাশগুপ্ত, ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পৃ ৩১

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 মুহাম্মদ হাবিব, সুলতান মাহমুদ অব গজনী, পৃ ৭৭-৮২
2 এস এ এ রিজভী, দ্য ওয়ান্ডার দ্যাটস ওয়াজ ইন্ডিয়া, পৃ ৬৯
3 ডি ডি কোসাম্বী, অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি, পৃ ৩০৯-১০
4 অসিতকুমার সেন, তুর্কি ও আফগান যুগে ভারত, পৃ ১৬.
5 ইরফান হাবিব, মধ্যযুগের ভারতঃ একটি সভ্যতার পাঠ, পৃ ৩৩.
6 এস এ এ রিজভী, দ্য ওয়ান্ডার দ্যাটস ওয়াজ ইন্ডিয়া, পৃ ৭১
7 তারা চাঁদ, ইনফ্লুয়েন্স অব ইসলাম ইন ইন্ডিয়ান কালচার, পৃ ১১৬
8 ডি এন ঝাঁ, আর্লি ইন্ডিয়া, এ কনসাইজ হিস্টোরি, পৃ ১৬৮
9 প্রাগুক্ত
10 A A Engineer, Communalism in India, p 11
11 I H Qureshi, The Administration of Sultanate of Delhi, p 11
12 The Cambridge History Of India Volume III by Wolseley Haig, page 27 https://archive.org/details/cambridgehistory035492mbp/page/26/mode/1up
13 আব্দুল করিম, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন, পৃ ২১
14 Elphinston, A History of India, p 334.
15 ঈশ্বরী প্রসাদ, হিস্ট্রি অব দ্য মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া, পৃ ১৯১ ; ঈশ্বরী প্রসাদ, এ শর্ট হিস্ট্রি অব মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া, পৃ ৪৯
16 Decline And The Fallen of Roman Empire, Vol-6, p 241
17 Cambridge History of India, Vol 3, p 574
18 সতীশচন্দ্র, মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া, খণ্ড ১, পৃ ১৬
19 সুরজিৎ দাশগুপ্ত, ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পৃ ৩১
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button