শিয়াদের আকিদা: কুরআন পরিবর্তন করা হয়েছে

অনেক আগে একজন আলেমের একটি বক্তব্য শোরগোল ফেলে দিয়েছিল, তিনি মন্তব্য করেছিলেন শিয়াদের কিতাব নাকি ৯০ পারা। তখন উনাকে নিয়ে অনেকে ট্রল করেছিল, অনেকে আবার শিয়াদের কুরআনের নুসখা নিয়ে দেখিয়েছিল তাদেরও ৩০ পারাই কুরআন। এই নিয়ে ইসলাম বিদ্বেষীমহলও খুব সোচ্চার অবদান পালন করেছিলেন, যেহেতু তাদের রুটি রুজিই এসব। অনেককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও চালিয়েছিল এরা।
কিন্তু আসলে সমস্যাটি হল সেই আলেম মিথ্যা বলেননি, বরং ভালোভাবে বুঝাতে পারেননি, কারণ এটি হল শিয়াদের আকিদা যে আজকের মুসলিমদের হাতে যে কুরআন রয়েছে, তা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর যেভাবে নাজিল করেছিলেন, সেভাবে নেই। বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীদের হাতে এতে তাহরীফ (বিকৃতি) ও পরিবর্তন ঘটেছে—যেমন শিয়ারা দাবি করে। তারা বলে, সাহাবীরা আহলে বাইতের (আল মুহাম্মাদের পরিবারের) হক গাসব (অন্যায় দখল) করেছে। এজন্য তারা কুরআন থেকে আহলে বাইতের ফজিলত (গুণ-মর্যাদা) সম্পর্কিত সব আয়াত বাদ দিয়েছে, সাহাবীদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) দোষ-ত্রুটি (মাসাব) বর্ণনাকারী আয়াতগুলো মুছে ফেলেছে, আরও অনেক আয়াত কেটে ফেলেছে ও বাদ দিয়েছে— যতক্ষণ না কুরআনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশের মতো অবশিষ্ট থেকেছে। শুধুমাত্র আলি (রা) সম্পূর্ণ ৯০ পাড়া সংরক্ষণ করতে পেরেছিলেন। বর্তমানে সকলের কাছে শুধু ৩০ পারাই কুরআন আছে এবং সম্পূর্ণ ৯০ পারা শুধু ১২ জন ইমামের নিকটই বিদ্যমান। এটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের কোন আকিদা নয়, বরং এই বিশ্বাসই শিয়া ইমামিয়াদের প্রাচীন ও পরবর্তী সকল আলেমের মূল অবস্থান। এ থেকে খুব অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া কেউ বের হয়নি।
আধুনিক সময়ে কিছু শিয়া সিমপ্যাথাইজার পড়া-লেখা কিছু না করে পরবর্তী যুগের কয়েকজন নয়া তাকিয়াবাজ শিয়া আলেমদের বক্তব্য দেখিয়ে বলে যে কুরআনের বিকৃতি (তাহরীফ) সংক্রান্ত যেসব রেওয়ায়াত আছে, সেগুলো মিথ্যা বা প্রত্যাখ্যাত। কুরআন আল্লাহর হেফাজতে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রয়েছে—যেমন আল্লাহ বলেছেন: إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ (নিশ্চয় আমরাই জিকর নাজিল করেছি এবং আমরা অবশ্যই তার সংরক্ষক।)। পরবর্তী সময়ের তাকিয়াবাজ শিয়া আলেমের বক্তব্য দেখিয়ে তারা দাবি করে এটাই নাকি ইমামিয়া শিয়াদের বিশুদ্ধ মতামত, আর আমরা সুন্নিরাই নাকি মিথ্যা বলছি। এখন এই লোকগুলো এতুটুকুও জানে না যে, তাকিয়া হল শিয়াদের মৌলিক আকিদার একটি, আমাদের ফ্রম-মুসলিমস এর সম্পাদক তাহসিন আরাফাত ভাই এই নিয়ে বহু আগেই একটি আর্টিকেল লিখেছিলেন, চাইলে দেখে আসতে পারেন।
যাইহোক এটা সত্য যে পরবর্তী সময়ে অনেকেই কুরআন পরিবর্তন হয়েছে এই মতটাকে গ্রহণ করা থেকে দূরে সরে এসেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে অনেকে পরিবেশ পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে তাকিয়ার আশ্রয়ও নিয়ে এই মত লালন করেছিল। আর যারা জেনুইনলি এই ফিরে এসেছে তারা তাদের শিয়া ধর্মের মূল আকিদার উপরই কুফর করে বসে রয়েছে।
তাই তাদের এই তাকিয়ার জবাবে আমরা তাদেরই বড় বড় আলেম ও ইমামের কিতাব থেকে অল্প কিছু নির্ভরযোগ্য বর্ণনা উল্লেখ করব—যাদের বক্তব্য থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন না, তারা যে ইমামদেরকে রবের আসনে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছে সেই ইমামদের বক্তব্যের বিপরীতে কোন তাকিয়াবাজ পরবর্তী সময়ের শিয়া আলেমের কথা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই এসব যুক্তি-দলিল তাসের ঘরের সমতুল্য।
কুরআন পরিবর্তন হয়েছে – শিয়াদের প্রাচিন আকিদা
কিতাবুল কাফি—যা লিখেছে মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলাইনী (মৃত্যু ৩২৯ হিজরি)। এই কিতাবটিকে তিনি নিজের বই “থুম্মাহতাদাইতু” রচনার অন্যতম উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। শিয়াদের নিকট তাদের ইমামের সংকলিত সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য একটি হাদিস গ্রন্থ হচ্ছে এটি, তাদের কাছে এই কিতাব ঠিক তেমনই মর্যাদাসম্পন্ন যেমন সুন্নিদের কাছে সহীহ বুখারী। এটি ইমামিয়াদের চারটি প্রধান কিতাবের একটি। এই কিতাবে হাদিস বর্ণনার পাশাপাশি কুলাইনী আকিদা ও ফিকহ নিয়েও আলোচনা করেছেন। এখন দেখি কাফিতে কী এসেছে:
(عن أبي بصير قال: دخلت على أبي عبد الله عليه السلام –يعني الحسين بن علي t- فقلت جعلت فداك إن شيعتك يتحدثون أن رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم علم علياً عليه السلام ألف باب من العلم يفتح منه ألف باب. فقال: يا أبا محمد علم رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم، علياً عليه السلام ألف باب يفتح له من كل باب ألف باب. قال: قلت: هذا بذاك، قال ثم قال: يا أبا محمد وإن عندنا الجامعة وما يدريهم ما الجامعة؟ قال: قلت: جعلت فداك وما الجامعة؟ قال: صحيفة طولها سبعون ذراعاً بذراع النبي صلى الله عليه وآله وسلم، وأملاه من فلق فيه، وخط علي بيمينه كل حلال وحرام، وكل شيء يحتاج إليه الناس حتى الأرش والخدش. قال: قلت: هذا والله العلم! قال: إنه لعلم وليس بذاك؛ ثم سكت ساعة ثم قال: عندنا الجفر ما يدريهم ما الجفر؟ قال: وعاء من أدم فيه علم النبيين والوصيين وعلم العلماء الذي مضوا من بني إسرائيل. قال: قلت: إن هذا العلم! قال: إنه العلم وليس بذاك، ثم سكت ساعة، ثم قال: وإن عندنا مصحف فاطمة عليها السلام؟ قال: مصحف فيه مثل قرآنكم هذا ثلاث مرات، والله ما فيه من قرآنكم حرف واحد! قال: قلت: هذا والله العلم. إنه العلم وليس بذاك، ثم سكت ساعة، ثم قال: وإن عندنا علم ما كان، وما هو كائن إلى أن تقوم الساعة!!) اه
আবু বাসীর (রহ.) থেকে বর্ণিত—তিনি বলেন: আমি আবু আবদিল্লাহ (আ.)-এর কাছে গেলাম—অর্থাৎ হুসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর কাছে। আমি বললাম, “আমার জীবন আপনার জন্য কোরবান হোক! আপনার শিয়ারা বলাবলি করে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আলী (আ.)-কে জ্ঞানের এমন এক হাজার অধ্যায় শিখিয়েছিলেন, যার থেকে আরও এক হাজার অধ্যায় খুলে যায়।” তিনি বললেন, “হে আবু মুহাম্মাদ! রাসূলুল্লাহ ﷺ আলী (আ.)-কে এক হাজার দরজা জ্ঞান দিয়েছিলেন, আর প্রতিটি দরজা থেকে তার জন্য আরও এক হাজার দরজা খুলে যায়।” আমি বললাম, “এটা তো সেই কথাই হলো।” তারপর তিনি বললেন, “হে আবু মুহাম্মাদ! আমাদের কাছে ‘আল-জামে‘আ’ আছে। তারা কি জানে আল জামি‘আ কী?” আমি বললাম, “আমার জীবন আপনার জন্য কোরবান হোক, আল জামি‘আ কী?” তিনি বললেন, “এটি এমন একটি সহীফা, যার দৈর্ঘ্য নবী ﷺ-এর বাহুর মাপে সত্তর হাত। তিনি নিজে তাতে ইমলা করেছেন এবং আলী (আ.) নিজ হাতে সব হালাল-হারাম লিখেছেন আর মানুষের যা কিছু দরকার—এমনকি হত্যার বদলা থেকে নিয়ে আঁচড়ের ক্ষতিপূরণ পর্যন্ত সব আছে।” আমি বললাম, “আল্লাহর কসম, এটাই তো ইলম!” তিনি বললেন, “এটাও ইলম বটে, কিন্তু এটুকুই সবটা নয়।” তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আমাদের কাছে আল জাফর আছে। তারা কি জানে আল জাফর কী?” তিনি বললেন, “চামড়ার একটা থলে, যাতে রয়েছে আম্বিয়া, ওয়াসীদের, আর বনী ইসরাইলের যেসব আলেম গত হয়েছেন তাদের ইলম।” আমি বললাম, “এটাই তো ইলম!” তিনি বললেন, “এটাও ইলম বটে, কিন্তু এটুকুই সবটা নয়।” আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমাদের কাছে ফাতিমা (আ.)-এর মুসহাফ আছে।” বললেন, “এটা এমন একটা মুসহাফ, যাতে তোমাদের এই কুরআনের মতো তিনটা মুসহাফ আছে। আল্লাহর কসম! তাতে তোমাদের কুরআনের অক্ষরমাত্রও নেই।” আমি বললাম, “আল্লাহর কসম, এটাই তো জ্ঞান!” তিনি বললেন, “এটাও ইলম বটে, কিন্তু এটুকুই সবটা নয়।” তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আর আমাদের কাছে যা অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত যা হবে, সব জ্ঞান আছে!”[1]আল-কাফী, ১/১৩৮
শিয়াদের ১২ ইমামের মাঝে ৬ষ্ঠ ইমাম আবু আব্দুল্লাহ জাফর সাদেক এই বিষয়ে বলেন:
(عن هشام بن سالم عن أبي عبد الله عليه السلام: “إن القرآن جاء به جبريل عليه السلام إلى محمد صلى الله عليه وآله وسلم سبعة عشر ألف آية) اه. ومعلوم أن عدد آيات القرآن الكريم تعادل تقريباً ثلث ما ذكر.
হিশাম ইবনু সালিম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আবু আবদিল্লাহ (আ.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই কুরআন জিবরীল (আ.) মুহাম্মাদ (সা.)-এর কাছে এনেছিলেন সতেরো হাজার আয়াত নিয়ে।”
আর সবাই জানেন যে, বর্তমান কুরআনের আয়াত সংখ্যা এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাত্র।[2]আল-কাফী, ৪/৪৫৬
প্রসিদ্ধ শী’আ আলেম আল্লামা কাযভীনী লিখেন:
مراد اینست که بسیاری از ان قرآن ساقط شده و در مصاحف مشهوره نیست.
অর্থাৎ, ইমাম জা’ফর ছাদেকের এ উক্তির অর্থ হল, জিবরাঈলের আনীত কুরআন থেকে অনেক অংশ বাদ দেয়া হয়েছে এবং তা কুরআনের বর্তমান প্রসিদ্ধ কপিসমূহে নেই।
আল-কাফীতেই আরো এসেছে:
عن جابر الجعفي قال: سمعت أبا جعفر عليه السلام يقول: ما ادعى أحد من الناس أنه جمع القرآن كله كما أنزل إلا كذاب، وما جمعه وحفظه كما أنزله الله تعالى إلا علي بن أبي طالب عليه السلام، والأئمة من بعده عليهم السلام
জাবির আল-জুফী থেকে বর্ণিত—তিনি বলেন: আমি আবু জাফর (আ.)-কে বলতে শুনেছি: “মানুষের মধ্যে কেউ দাবি করলে যে, সে পুরো কুরআনকে যেভাবে নাযিল হয়েছে সেভাবে জমা করেছে, সে মিথ্যাবাদী ছাড়া কিছু নয়। আর আল্লাহ যেভাবে নাযিল করেছেন সেভাবে জমা করে সংরক্ষণ করেছেন শুধু আলী ইবনু আবী তালিব (আ.) এবং তার পরবর্তী ইমামগণ (আ.)।”[3]আল-কাফী ১/৪৪১
এমনকি তারা হযরত আলি (রা.) হতেও জাল হাদিস বণর্না করে যে তিনি বলেছেন:
هو قدمت ذكره من اسقاط المنافقين من القرآن وبين القول في اليتامى وبين نكاح النساء من الخطاب والقصص أكثر من ثلث القوان
অর্থাৎ, পূর্বে আমি যে কথা উল্লেখ করেছি, এটা তারই একটি দৃষ্টান্ত। অর্থাৎ, মুনাফিকরা কুরআন থেকে অনেক কিছু বাদ দিয়েছে। এ আয়াতে তারা এই করেছে যে, ان خفتم في فانكحوا ما طاب لكم من النساء এবং اليتامى এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশ কোরআনেরও বেশী ছিল, যা বাদ দেয়া হয়েছে। এতে সম্বোধন ও কিসসা-কাহিনী ছিল।[4]ইহতিজাজে তবরিযীত; ইরানী ইনকিলাব ১২৮ পৃঃ
আলী ইবনু ইবরাহীম আল-কুম্মীর কিতাব “তাফসীরুল কুম্মী”-তে বলেছেন:
” و أما ما هو على خلاف ما انزل الله فهو قوله ” كنتم خير أمة أخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر وتؤمنون بالله ” فقال أبو عبد الله عليه السلام لقارئ هذه الآية “خير أمة” يقتلون أمير المؤمنين والحسن والحسين بن عليه السلام ؟ فقيل له : وكيف نزلت يا ابن رسول الله ؟ فقال إنما نزلت (كنتم خير أئمة أخرجت للناس) ألا ترى مدح الله لهم في أخر الآية ” تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر وتؤمنون بالله ” • ومثله آية قرئت على أبى عبد الله عليه السلام ” الذين يقولون ربنا هب لنا من أزواجنا وذرياتنا قرة أعين واجعلنا للمتقين إماما “فقال أبو عبد الله عليه السلام لقد سألوا الله عظيما أن يجعلهم للمتنين إماما • فقيل له يا ابن رسول الله كيف نزلت ؟ فقال إنما نزلت ( الذين يقولون ربنا هب لنا من أزواجنا وذرياتنا قرة أعين واجعل لنا من المتقين إماما ) وقوله ” له معقبات من بين يديه ومن خلفه يحفظونه من أمر الله” فقال أبو عبد الله كيف يحفظ الشئ من أمر الله وكيف يكون المعقب من بين يديه فقيل له وكيف ذلك يا ابن رسول الله ؟ فقال إنما نزلت ( له معقبات من خلفه ورقيب من يديه يحفظونه بأمر الله ) ومثله كثير .
وأما ما هو محرف فهو قول ( لكن الله يشهد بما انزل إليك في علي انزله بعلمه والملائكة يشهدون ) وقوله ( يا أيها الرسول بلغ ما أنزل إليك من ربك في علي فان لم تفعل فما بلغت رسالته ) وقوله ( إن الذين كفروا وظلموا آل محمد حقهم لم يكن الله ليغفر لهم ) وقوله ( وسيعلم الذين ظلموا آل محمد حقهم أي منقلب ينقلبون ) وقوله ( ولو ترى الذين ظلموا آل محمد حقهم في غمرات الموت )
“আর যা আল্লাহ যেভাবে নাযিল করেছেন তার বিপরীত, তা হলো এই আয়াত: ‘তোমরা হচ্ছো সর্বোত্তম উম্মাহ, যা মানুষের জন্য বের করা হয়েছে—তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখো এবং আল্লাহতে বিশ্বাস করো।’ আবু আবদিল্লাহ (আ.) এই আয়াত পাঠকের কাছে বললেন, “ ‘সর্বোত্তম উম্মাহ’ যারা আমীরুল মু’মিনীন, এবং তাঁর সন্তান হাসান এবং হুসাইনকে হত্যা করেছে?’ তাকে বলা হলো, ‘হে রাসূলের সন্তান! তাহলে এটা কীভাবে নাযিল হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘এটা নাযিল হয়েছে এভাবে: তোমরা ছিলে সর্বোত্তম ইমাম, যা মানুষের জন্য বের করা হয়েছে।’ তুমি কি দেখছ না, আয়াতের শেষে আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেছেন: ‘তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখো এবং আল্লাহতে বিশ্বাস করো।’ আর এমনই একটা আয়াত আবু আবদিল্লাহ (আ.)-এর সামনে পড়া হলো: ‘যারা বলে, হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য ইমাম বানাও।’ আবু আবদিল্লাহ (আ.) বললেন, ‘তারা তো আল্লাহর কাছে বড় কিছু চেয়েছে—যাতে তাদেরকে মুত্তাকীদের ইমাম বানানো হয়।’ তাকে বলা হলো, ‘হে রাসূলের সন্তান! তাহলে এটা কীভাবে নাযিল হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘এটা নাযিল হয়েছে এভাবে: যারা বলে, হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করো এবং মুত্তাকীদের থেকে আমাদের জন্য ইমাম বানাও।’ আরেকটা আয়াত: ‘তার জন্য রয়েছে পাহারাদার ফিরিশতা, তার সামনে থেকে এবং পেছন থেকে, যারা তাকে আল্লাহর আদেশ থেকে রক্ষা করে।’ আবু আবদিল্লাহ বললেন, ‘কীভাবে কোনো কিছুকে আল্লাহর আদেশ থেকে রক্ষা করবে? আর সামনে থেকে কীভাবে পাহারাদার হবে?’ তাকে বলা হলো, ‘হে রাসূলের সন্তান! তাহলে বিষয়টা কেমন?’ তিনি বললেন, ‘এটা নাযিল হয়েছে এভাবে: তার জন্য রয়েছে পাহারাদার ফিরিশতা, তার পেছন থেকে এবং সামনে থেকে একজন পর্যবেক্ষক, যারা তাকে আল্লাহর আদেশ অনুসারে রক্ষা করে।’ আর এমন অনেক উদাহরণ আছে।
আর যা বিকৃত করা হয়েছে, তা হলো: ‘কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যা তিনি তোমার প্রতি নাযিল করেছেন আলী সংক্রান্ত, তিনি তা সজ্ঞানে নাযিল করেছেন। আর এ বিষয়ে তো ফিরিশতারাও সাক্ষ্য দেয়।’ আর আয়াত: ‘হে রাসূল! যা তোমার প্রতি তোমার রব থেকে নাযিল করা হয়েছে আলী সংক্রান্ত, তা পৌঁছে দাও। যদি না করো, তাহলে তো তাঁর রিসালাত পৌঁছাওনি।’ আরেকটা আয়াত হচ্ছে: ‘নিশ্চয়ই যারা কুফর করেছে এবং মুহাম্মাদ পরিবারের অধিকারের ক্ষেত্রে যুলুম করেছে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করার নন।’ অন্য একটি আয়াতে আছে: ‘যারা মুহাম্মাদ পরিবারের অধিকারের ক্ষেত্রে যুলুম করেছে, তারা শীঘ্রই জানবে কোন প্রত্যাবর্তনের দিকে তারা প্রত্যাবর্তন করবে।’ আর আয়াত: ‘আর যদি তুমি মুহাম্মাদ পরিবারের অধিকারের ক্ষেত্রে নিপীড়কদেরকে মৃত্যুর ঘনঘটায় দেখতে!’”[5]তাফসীরুল কুম্মী, ১০৬ পৃষ্ঠা
উপরিউক্ত বর্ণনায় সুস্পষ্ট দেখাই যাচ্ছে শিয়াদের বারো ইমামের একজনই কতই না সুস্পষ্ট ভাবে আয়াত ধরে ধরে বলছে কোথায় কি বিকৃত করা হয়েছে।
আর আবুল কাসিম আলী ইবনু আহমাদ ইবনু মূসা আল-কূফী (৩৫২ হিজরী) বলেছেন:
ومن بدعِه –يعني أبا بكر رضي الله عنه- أنه لما أراد أن يجمع ما تهيأ من القرآن صرخ مناديه في المدينة، من كان عنده شيء من القرآن فليأتنا به. ثم قال: لا نقبل من أحد منه شيئاً إلا بشاهدي عدل. وإنما أراد هذا الحال لئلا يقبلوا ما ألفه أمير المؤمنين عليه السلام، إذ كان ألف في ذلك الوقت جميع القرآن بتمامه وكماله من ابتدائه إلى خاتمته على نسق تنزيله. فلم يقبل ذلك منه خوفاً أن يظهر فيه ما يفسد عليهم أمرهم. فلذلك قالوا: لا نقبل القرآن من أحد إلا بشاهدي عدل
“আর তার (অর্থাৎ আবু বকর রা.-এর) বিদআতের মধ্যে একটা হলো—যখন তিনি কুরআন যা সংগ্রহ করা যায় তা জমা করতে চাইলেন, তখন তার ঘোষক মদীনায় চিৎকার করে বলল: যার কাছে কুরআনের কোনো অংশ আছে, সে আমাদের কাছে নিয়ে আসুক। তারপর বললেন: আমরা কারো থেকে কোনোটাই গ্রহণ করব না যদি না দু’জন ন্যায়বান সাক্ষী থাকে। এই শর্ত তিনি শুধু এজন্য রেখেছিলেন যাতে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর সংকলিত কুরআন গ্রহণ না করতে হয়। কারণ তিনি তখন পুরো কুরআনকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নাযিলের ক্রমানুসারে সম্পূর্ণরূপে জমা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি, ভয়ে যে, তাতে এমন কিছু প্রকাশ পাবে যা তাদের কাজ নষ্ট করে দেবে। তাই তারা বলল: আমরা কারো থেকে কুরআন গ্রহণ করব না যদি না দু’জন ন্যায়বান সাক্ষী থাকে।”[6]কিতাব “আল-ইস্তিগাসা” পৃষ্ঠা ২৫
আরেকজন প্রখ্যাত শিয়া মোল্লা হাসান বলেন,
আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের সুত্রে বর্ণিত এসব কাহিনী ও অন্যান্য বর্ণনাসমূহ থেকে বুঝা যায় যে, আমাদের মধ্যে প্রচলিত কুরআন মুহাম্মাদ (ﷺ) এর উপর অবতীর্ণ কুরআনের মত পরিপূর্ণ নয়; বরং তার মাঝে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার পরিপন্থী আয়াত যেমন রয়েছে; আবার তেমনি পরিবর্তিত ও বিকৃত আয়াতও রয়েছে। আর তার থেকে অনেক কিছু বিলুপ্ত করা হয়েছে।[7]তাফসীরুস সাফী। মোল্লা হাসান। পৃষ্ঠা ১৩
শেখ মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু নু‘মান, যিনি আল-মুফীদ নামে পরিচিত (৪১৩ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন), বলেছেন:
اتفقت الإمامية على … أن أئمة الضلال خالفوا في كثير من تأليف القرآن وعدلوا فيه عن موجب التنزيل، وسنة النبي.
ইমামিয়্যাহ শিয়াগণ এইসব বিষয়ে একমত যে, … পথভ্রষ্ট ইমামগণ কুরআন নাজিলের দাবি আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত থেকে সরে গিয়ে কুরআনে পরিবর্তন সাধন করেছেন।[8]আওয়াইলুল মাকালাত পৃ. ১৩
এটা স্পষ্ট যে, তার মতে ‘পথভ্রষ্ট নেতারা’ বলতে সেই সাহাবীদের বোঝানো হয়েছে যারা কুরআন সংকলন করেছিলেন। আর কাশানীর মুহাম্মাদ ইবনু মুরতাদা (যিনি তাফসীর আস-সাফী ও অনেক গ্রন্থের রচয়িতা), বলেছেন:
وأما اعتقاد مشايخنا في ذلك فالظاهر من ثقة الإسلام محمد بن يعقوب الكليني طاب ثراه أنه كان يعتقد التحريف والنقصان في القرآن، … وأستاذه علي بن إبراهيم القمي فإن تفسيره مملوء منه، وله غلو فيه، والشيخ الطبرسي فإنه أيضاً نسج على منوالهما في كتاب الاحتجاج
“আর আমাদের মাশায়েখদের এ বিষয়ে বিশ্বাস হচ্ছে, ইসলামের বিশ্বস্ত ব্যক্তি মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকুব আল-কুলাইনী (রহ.)-এর থেকে, আল্লাহ তার কবরকে শান্তিতে ভরপুর করুন, যা প্রকাশ পায় তা হলো—তিনি কুরআনে তাহরীফ ও কাটছাঁটের ব্যাপারে বিশ্বাস করতেন। … তাঁর উস্তায আলী ইবনু ইবরাহীম আল-কুম্মী— তাঁর তাফসীর তো এতে ভরপুর, এবং তাতে অতিরঞ্জনও আছে। আর শেখ আত-তাবারসীও তাদের দু’জনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার কিতাব আল ইহতিজাজে একই পথে চলেছেন।”[9]তাফসীরে সাফীর মুকাদ্দিমা, খণ্ড ১, পৃ. ৩৩
মির্জা হুসাইন মুহাম্মাদ তাকী আন-নূরী আত-তাবারসী (মৃত্যু ১৩২০ হিজরী) একটা কিতাব লিখেছেন যাতে দাবি করেছেন যে কুরআন কারীমে তাহরীফ (বিকৃতি) ঘটেছে, আর সাহাবীরা তাতে অনেক কিছু লুকিয়ে রেখেছেন—যার মধ্যে একটা হলো সুরা ওয়ালায়া, সুরা নূরাইন নামে এক সুরার উল্লেখও করেছেন তিনি।[10].https://islamqa.info/ar/answers/21500/.
২০২১ সালে পবিত্র কোরআন শরিফ হতে ২৬টি আয়াতের অপসারণ চেয়ে আদালতে রিট দায়ের করেছিলেন ভারতের উত্তরপ্রদেশের শিয়া ওয়াকফ বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ ওয়াসিম রিজভী।[11].https://samakal.com/international/article/58626/. এই ঘটনাতো সকলেরেই মনে আছে আশা করি, তার এমন দুঃসাহস কোথা থেকে হয়েছিল জানেন? সেই যে তাদের প্রাচীন আকিদা!
আমাদের শিয়া সিমপ্যাথাইজার সুন্নিদের কাছে নয়া খলিফা বনে উঠা ইরানের মরহুম প্রেসিডেন্ট রুহুল্লাহ খোমেনী-ও কোন অংশে কম যান না। পাকিস্তানের লাহোর শহর থেকে ইসলামী জামাতগুলোর পক্ষ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন “এশিয়া” ১৪০৪ হিজরির ২৯শে ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশিত সংখ্যায় খোমেনীর একটি চিঠির সম্পূর্ণ পাঠ ছাপে, যার শিরোনাম ছিল: “এটি ইসলামের অস্বীকৃতি”। তাতে বলা হয়েছিল:
“إن القرآن اليوم مستور ملفوف، وإن العلماء والمفكِّرين قد شرحوا القرآن إلى حدٍّ ما، ومع ذلك لم يكن ما كان ينبغي أن يكون، وتفاسير القرآن الموجودة من البداية إلى وقتنا هذا ليست تفاسير؛ بل هي تراجم ونجد فيها لمسًا للقرآن، ولكنَّها لا تستحق أن تعتبر تفسيرًا كاملاً للقرآن”
“নিশ্চয়ই আজ কুরআন আবৃত ও মোড়ানো অবস্থায় আছে। আলিম ও চিন্তাবিদগণ কিছু পরিমাণে কুরআনের তাফসীর করেছেন; যদিও যা হওয়া দরকার ছিল তা-ই হয়নি! শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রচলিত কুরআনের তাফসীরগুলো প্রকৃত তাফসীর নয়; বরং সেগুলো হচ্ছে কুরআনের তরজমা আর আমরা এসবে কুরআনের ছোঁয়া পাই। কিন্তু সেগুলো কুরআনের পূর্ণাঙ্গ তাফসীর বলে গণ্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।”
নিশ্চয়ই খোমেনী অন্যান্য শিয়াদের মতোই কুরআন সম্পর্কে বলেন যে, তা বিকৃত। আর তিনি তার এ কথা কয়েকটি নির্ধারিত বই থেকে গ্রহণ করেন, যেগুলোর ব্যাপারে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন এবং যাদের রচয়িতাগণ কুরআন বিকৃতির বিশ্বাস পোষণ করেন, যেমন “মুস্তাদরাকুল ওয়াসায়েল” গ্রন্থ এবং তিনি এর লেখকের প্রতি রহমতের দোয়া করেন। আর এই লেখকই হলেন “ফাসলুল খিতাব ফী তাহরিফি কালামি রাব্বিল আরবাব” গ্রন্থের প্রণেতা।
আর “আল-কাফী” গ্রন্থ এবং এর রচয়িতা কুলাইনীর আকীদা হলো যে, কুরআন বিকৃত। তিনি তার এই গ্রন্থে স্পষ্টভাবেই তা উল্লেখ করেছেন। সাফী তার “তাফসীর” গ্রন্থে এবং শিয়াদের অন্যান্য গ্রন্থেও তার থেকে তা বর্ণনা করেছেন।
আর আহমদ তাবারসীর “আল-ইহতিজাজ” গ্রন্থ থেকেও এই ধারণা গৃহীত। তিনি কুরআন বিকৃতির দাবিতে চরমপন্থী গোঁড়ামিপূর্ণ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। শিয়ারা এই মিথ্যাবাদীদের সম্মান করে, তাদের থেকে জ্ঞান আহরণ করে এবং তাদের জন্য রহমতের দোয়া করে। তারা এদের এবং এদের কুফরি আকীদার প্রশংসা করে। খোমেনীও এদের অন্তর্ভুক্ত, সে তাদের জন্য রহমতের দোয়া করে এবং নিজ রচনাবলীতে তাদের ওপর নির্ভর করে।
এবং খোমেনীর “তাহরিরুল ওয়াসিলা” গ্রন্থে বর্ণিত আছে: “এটি বর্ণিত হয়েছে যে, সে তিনজনের একজন যারা অভিযোগ দায়ের করবে।” এর পূর্ণাঙ্গ শব্দ হলো:
“يجيء يوم القيامة ثلاثةٌ يشكون إلى الله – عز وجل -: المصحف، والمسجد، والعترة… يقول المصحف: يا ربِّ، حرَّفوني ومزَّقوني”، وفي رواية “ومصحف معلَّق قد وقع عليه غبارٌ لا يقرأ فيه”
“কিয়ামতের দিন তিনটি বস্তু আল্লাহর নিকট অভিযোগ দায়ের করতে আসবে: কুরআন, মসজিদ এবং আহলে বাইত… কুরআন বলবে, হে প্রভু, তারা আমাকে বিকৃত করেছে এবং ছিন্নভিন্ন করেছে।” অন্য এক বর্ণনায় আছে, “এবং একটি মুসহাফ ঝুলন্ত অবস্থায় আছে যার উপর ধূলি জমে গেছে, তা পড়া হয় না।”
এইভাবে ইবনে বাবুইয়েহ তার “আল-খিসাল” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যা শিয়াদের নিকট নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোর একটি।[12].https://www.shafinchowdhury.com/আয়াতুল্লাহ-আল-খোমেইনী-এর-কুফর-ও-বিভ্রান্তি/.
মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আস-সাফফার তার প্রসিদ্ধ কিতাব “বাসায়িরুদ দারাজাত”-এ একটা অধ্যায় বানিয়েছেন, যার শিরোনাম: “বাবু ফী আল-আইম্মাহ আন্না ‘ইন্দাহুম জামী‘আল কুরআনিল্লাযী উনযিলা ‘আলা রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম”। এই অধ্যায়ের অধীনে তিনি এমন অনেক রেওয়ায়াত উল্লেখ করেছেন যা স্পষ্টভাবে কুরআনে তাহরীফ ঘটেছে বলে প্রমাণ করে।
আবু নাসর মুহাম্মাদ ইবনু মাসউদ আল-‘আয়্যাশী-ও তাদের মধ্যে একজন যিনি কুরআনে তাহরীফের রেওয়ায়াত অনেক বেশি বর্ণনা করেছেন। তার তাফসীর কিতাবে তিনি তাদের ইমামদের নামে বর্ণিত এমন অনেক রেওয়ায়াত দিয়ে ভর্তি করে দিয়েছেন যা কুরআনের অনেক অংশ হারিয়ে গেছে (আউযুবিল্লাহ), কিছু কথা যোগ করা হয়েছে ইত্যাদি প্রমাণ করে। যেমন, ইবরাহীম ইবনু উমর থেকে বর্ণিত:
আবু আবদিল্লাহ (আ.) বলেছেন:
إن في القرآن ما مضى وما يحدث وما هوكائن كانت فيه أسماء الرجال فألقيت وإنما الاسم الواحد منه في وجوه لا تحصى يعرف ذلك الوصاة
“কুরআনে যা অতীতে ঘটেছে, যা ঘটছে এবং যা ভবিষ্যতে ঘটবে—সবই ছিল। তাতে মানুষের নাম ছিল, কিন্তু সেগুলো অপসারণ করা হয়েছে। একটা নামের মধ্যে অগণিত বিষয় ব্যক্ত হয়ে থাকে। এই বিষয়গুলো সম্মানিত বারো ইমাম জানেন।”[13]তাফসীরুল ‘আয়্যাশী, খণ্ড ১, পৃ. ১২
আয়্যাশী আরেকটা রেওয়ায়াত এনেছেন আবু বসীর থেকে: আবু জাফর মুহাম্মাদ (ইমাম বাকির আ. ৫ম ইমাম) বলেছেন:
خرج عبد الله بن عمر من عند عثمان فلقي أمير المؤمنين صلوات الله عليه فقال له: يا علي بيتنا الليلة في أمر نرجو أن يثبت الله هذه الأمة. فقال أمير المؤمنين: لن يخفى عليّ ما بيتم فيه حرفتم وغيرتم وبدلتم تسعمائة حرف ثلاثمائة حرفتم وثلاثمائة حرف غيرتم وثلاثمائة بدلتم , ثم قرأ: فويل للذين يكتبون الكتاب بأيديهم ثم يقولون هذا من عند الله
“আবদুল্লাহ ইবনু উমর উসমানের কাছ থেকে বের হয়ে আমীরুল মু’মিনীনের (আলী রাদিআল্লাহু আনহুর) সাথে দেখা করল। সে বলল, ‘হে আলী! আজ রাতে আমাদের ঘরে এমন একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে যাতে আশা করছি আল্লাহ এই উম্মাহকে স্থির রাখবেন।’ আমীরুল মু’মিনীন বললেন, ‘তোমরা যে বিকৃত করেছ, পরিবর্তন করেছ এবং রদবদল করেছো, এই বিষয় আমার কাছে অবিদিত নেই। তোমরা নয়শো হরফ থেকে তিনশো হরফ বিকৃত করেছ, তিনশো হরফ পরিবর্তন করেছ, আর তিনশো হরফ বদলে দিয়েছ।’ তারপর তিনি কুরআনের আয়াত পড়লেন: ধ্বংস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে, তারপর বলে এটা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে।”
আলী ইবনু ইবরাহীম আল-কুম্মী, তিনি কুলাইনীর শায়খ (উস্তাদ) এবং কুরআনে তাহরীফের কথা সবচেয়ে বেশি বলা আলেমদের একজন। তার তাফসীর কিতাবে এমন অনেক রেওয়ায়াত ভর্তি করে দিয়েছেন যা তাহরীফের কথা স্পষ্টভাবে বলে। তিনি নিজেও তার তাফসীরের মুকাদ্দিমায় (ভূমিকায়) এটা স্পষ্ট করে বলেছেন।
তাইয়্যিব আল-মূসাভী আল-জাযায়িরী কুম্মীর তাফসীরের প্রশংসা করতে গিয়ে “কুরআনে তাহরীফ” শিরোনামের অধীনে বলেছেন:
بقي شيء يهمنا ذكره. وهو أن هذا التفسير كغيره من التفاسير القديمة يشتمل على روايات. مفادها، أن المصحف الذي بين أيدينا لم يسلم من التحريف والتغيير. وجوابه، أنه لم ينفرد المصنف بذكرها بل وافقه فيه غيره من المحدثين المتقدمين والمتأخرين عامة وخاصة.
“এখানে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় অনুল্লেখ রয়ে গিয়েছে। বিষয়টা হচ্ছে, এই তাফসীরটি অন্যান্য প্রাচীন তাফসীরের মতোই এমন রেওয়ায়াতে ভর্তি। যার অর্থ হলো, আমাদের হাতের মুসহাফ তাহরীফ ও পরিবর্তন থেকে রক্ষা পায়নি। এর জবাব হলো: লেখক একা এটা বলেননি; বরং প্রাচীন ও পরবর্তী সকল মুহাদ্দিস ঐক্যমতে ও এককভাবে তাঁর সাথে একমত।”[14]তাইয়্যিব আল-মূসাভীর মুকাদ্দিমা, তাফসীরুল কুম্মী, ১/২২
এই আকিদা তাওয়াতুর ও জরুরিয়াতের অন্তর্ভুক্ত
স্বনামখ্যাত শী’আ মুহাদ্দিছ সাইয়েদ নেয়ামতুল্লাহ জাযায়েরী তার কোন কোন গ্রন্থে বলেছেন, যেমন তার কাছ থেকে বর্ণিত আছে যে, কুরআনে পরিবর্তন ব্যক্তকারী রেওয়ায়েত সমূহের সংখ্যা দু’হাজারেরও অধিক। আমাদের একদল আলেম, যেমন শায়খ মুফিদ, মুহাক্কিক দামাদ ও আল্লামা মজলিসী এসব রেওয়ায়েত মশহুর বলে দাবী করেছেন। শায়খ তৃসীও তিবইয়ান গ্রন্থে পরিষ্কার লিখেন যে, এসব রেওয়ায়েতের সংখ্যা অনেক বেশী। বরং আমাদের একদল আলেম, যাদের কথা পরে আসবে-দাবী করেছেন যে, এসব রেওয়ায়েত মুতাওয়াতির।[15]ইরানী ইনকিলাব, পৃষ্ঠা ২২৭
মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী (১১১১ হিজরী) বলেছেন:
لا يخفى أن كثيراً من الأخبار الصحيحة صريحة في نقص القرآن وتغييره، وعندي أن هذه الأخبار متواترة معنى، وطَرْحُ جميعها يوجب رفع الاعتماد عليها رأساً.
“অনেকগুলো সহীহ হাদীস স্পষ্টভাবে কুরআনে কাটছাঁট করা ও পরিবর্তনের কথা বলে, যা গোপন নয়। আমার মতে এই হাদীসগুলো অর্থগতভাবে মুতাওয়াতির পর্যায়ের। আর এইসব হাদীস যদি অস্বীকার করা হয়, তাহলে তো হাদীসে বিশ্বাস করার ভিত্তিই থাকবে না। [16]মিরাতুল উকুল, ১২/৫২৫
আর নি‘মাতুল্লাহ আল-জাযায়িরী বলেছেন:
إن تسليم تواترها –القراءات السبع- عن الوحي الإلهي وكون الكل قد نزل به الروح الأمين يفضي إلى طرح الأخبار المستفيضة بل المتواترة الدالة بصريحها على وقوع التحريف في القرآن كلاماً ومادة وإعراباً، مع أن أصحابنا رضوان الله عليهم قد أطبقوا على صحتها والتصديق بها
“যদি আল্লাহ তাআলার ওহীর মাধ্যমে সাত কিরাতের মুতাওয়াতির হওয়ার বিষয়টি মেনেও নেওয়া হয় এবং মেনে নেওয়া হয় যে, রূহুল আমীনের মাধ্যমে সকল আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, তাহলে এই বিষয়টা আমাদেরকে ব্যাপক; এমনকি এরকম মুতাওয়াতির হাদীস সমূহকে অস্বীকার করার দিকে নিয়ে যাবে, যে হাদীস গুলো কিনা তার সুস্পষ্টতার মাধ্যমে জানান দেয় যে, কুরআনে ভাষায়, হরফে এবং ইরাবে (বা স্বরবর্ণে) বিকৃতি সাধন হয়েছে। এছাড়াও আমাদের মতাদর্শী আলেমগণ রিদওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন এগুলোর শুদ্ধতা এবং সত্যতার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।” [17]আল-আনওয়ার আন-নু‘মানিয়্যাহ, ২/৩৫৭
আর আদনান আল-বাহরানী বলেছেন:
الأخبار لا تحصى كثيرة، وقد تجاوزت حد التواتر، ولا في نقلها كثير فائدة بعد شيوع القول بالتحريف والتغيير بين الفريقين، وكونه من المسلمات عند الصحابة والتابعين. بل وإجماع الفرقة المحقة –يقصد الشيعة- وكونه من ضروريات مذهبهم وبه تضافرت أخبارهم
“হাদীসগুলো অগণিত। আর হাদীস গুলো মুতাওয়াতিরের সীমা অতিক্রম করেছে। এগুলো বর্ণনা করার মধ্যে আহামরি কোনো লাভ নেই। কারণ, উভয় দলের মধ্যেই কুরআনে বিকৃতি সাধন ও পরিবর্তনের কথাটা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এই বিষয়টি সাহাবী ও তাবেয়ীদের কাছে স্বীকৃত বিষয় ছিল। বরং সত্যপন্থী দলের, অর্থাৎ শিয়াদের ইজমা রয়েছে এবং এটা তাদের মতবাদের অনিবার্য বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে তাদের হাদীসগুলো পরস্পর সমর্থিত।”[18]মাশারিকুশ শুমূস আদ-দুররিয়্যাহ, পৃ. ১২৬
আর সৈয়দ হাশিম আল-বাহরানী বলেছেন:
اعلم أن الحق الذي لا محيص عنه بحسب الأخبار المتواترة الأتية وغيرها أن هذا القرآن الذي في أيدينا قد وقع فيه بعد رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم شيء من التغييرات، وأسقط الذين جمعوه كثيراً من الكلمات والآيات، وأن القرآن المحفوظ عما ذكر، الموافق لما أنزله الله تعالى ما جمعه علي عليه السلام، وحفظه إلى أن وصل إلى ابنه الحسن عليه السلام، وهكذا إلى أن انتهى إلى القائم عليه السلام، وهو الآن عنده صلوات الله عليه
“জেনে রাখো, মুতাওয়াতির হোক বা না হোক, (উভয় প্রকার) হাদীসের ক্ষেত্রে অনিবার্য সত্যটি হলো, আমাদের হাতে সংরক্ষিত এই কুরআনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর কিছুটা রদবদল হয়েছে। যারা এই কুরআন সংকলন করেছিল, তারাই অনেক শব্দ ও আয়াত বাদ দিয়েছে। (কুরআনে) বলা হয়েছে কুরআন সংরক্ষিত। আর, আল্লাহর অবতারিত কুরআন আলি রাদিআল্লাহু আনহুর সংকলিত কুরআনের সাথে মিলে যায়।
তিনি তা সংরক্ষণ করেছেন। (এরপর) তা তাঁর ছেলে হাসান আলাইহিস সালামের কাছে পৌঁছেছে। এভাবে চলতে চলতে কায়েম আলাইহিস সালামের কাছে পৌঁছেছে। এখন সেই কুরআন তাঁর কাছেই রয়েছে। তাঁর ওপর আল্লাহর দয়া বর্ষিত হোক।”[19]আল-বুরহান ফী তাফসীরিল কুরআন, পৃ. ৩৬
আর একই কিতাবের পৃ. ৪৯-এ তিনি বলেন:
وعندي في صحة هذا القول بعد تتبع الأخبار وتفحص الآثار بحيث يمكن الحكم بكونه من ضروريات مذهب التشيع، وأنه من أكبر مقاصد غصب الخلافة. فتدبر
“আমার কাছে এই কথার সত্যতা এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে, হাদীস ও আসার তদন্ত ও পরীক্ষার পর এটাকে শিয়া মাযহাবের জরুরিয়াতের (অনিবার্য বিশ্বাস) অন্তর্ভুক্ত বলে বিচার করা যায়। আর এটা খিলাফত গাসবের (অন্যায় দখলের) সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্যগুলোর একটি। সুতরাং চিন্তা করে দেখো।”
শিয়াদের কতিপয় বড় বড় আলেম কুরআনে তাহরীফ অস্বীকার করেছেন। প্রথম যিনি এটা অস্বীকার করেন তিনি মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনু বাবুয়াইহ আল-কুম্মী, চতুর্থ হিজরী শতাব্দীতে তার কিতাব “আল-ই‘তিকাদাত”-এ “কুরআনের পরিমাণ সম্পর্কে বিশ্বাস” অধ্যায়ে। তার অনুসরণ করেন সৈয়দ মুরতাজা (আলমুল হুদা), মৃ. ৪৩৬ হিজরী। তাবারসী তার কিতাবে[20]তাফসীর মাজমা‘উল বায়ানে ১/৫ এটা উল্লেখ করেছেন। তারপর আবু জাফর আত-তূসী (মৃ. ৪৬০ হি.) তার কিতাবে।[21]তাফসীর আত-তিবয়ানে ১/৩ আর চতুর্থ হলেন আবু আলী আত-তাবারসী (মৃ. ৫৪৮ হি.), তার মাজমা‘উল বায়ানে মুরতাজার কথা উদ্ধৃত করে বলেন: “যোগ করার ব্যাপারে সবাই একমত যে তাতে নকসান নেই। আর নকসানের ব্যাপারে আমাদের অনেক সঙ্গী ও সাধারণদের কিছু হাশভিয়া বর্ণনা করেছে যে কুরআনে পরিবর্তন ও কমতি আছে। কিন্তু আমাদের মাযহাবের সঠিক মত তার বিপরীত—যা মুরতাজা সমর্থন করেছেন।
ইহসান ইলাহী যাহির (রহ.) দাবি করেছেন যে, প্রথম ছয় শতাব্দীতে শিয়াদের মধ্যে এই চারজনই কুরআনে তাহরীফ অস্বীকার করেছেন—এর পঞ্চম কেউ নেই। তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন যে, শিয়া আলেমদের কেউ যেন প্রমাণ করে ইবনু বাবুয়াইহের আগে প্রথম তিন শতাব্দীতে কোনো একজন শিয়াও তাহরীফ অস্বীকার করেছেন কি না; অথবা পরবর্তী তিন শতাব্দীতে এই চারজন ছাড়া পঞ্চম কেউ আছে কি না। তিনি মনে করেন, এদের তাহরীফ অস্বীকারের কারণ ছিল তাকিয়্যা কারণ তারা দেখলেন যে, মানুষ শিয়াদের বিরুদ্ধে কুরআনের সংরক্ষণে বিষয়ে অবিশ্বাসের অভিযোগ আনছে। তাই তারা তাকিয়্যার জন্য তাহরীফ অস্বীকার করলেন। তিনি এর জন্য অনেক দলিল দিয়েছেন—কিছু শক্তিশালী, কিছু দুর্বল। বিস্তারিত জানতে তার কিতাব “আশ-শিয়া ওয়াস সুন্নাহ” (পৃ. ১২৪-১৪১) দেখতে পারেন।
এছাড়া কোরআন পরিবর্তন হওয়া নিয়ে শিয়াদের আকিদার উপর আরো কিছু লিখা রয়েছে সেগুলোও দেখতে পারেন। যেমন একটি হল মোহাম্মদ আব্দুল রহমান সাইফ এর লিখিত ”আশ-শী‘আ আল-ইসনা আশারিয়্যাহ ওয়া তাহরীফুল কুরআন” বইটি।
সম্পূর্ণ কোরআন কার নিকট?
আর সবশেষে আল-কাফীতে এসেছে:
عن محمد بن سليمان عن بعض أصحابه عن أبي الحسن عليه السلام. قال: جعلت فداك. إنا نسمع الآيات من القرآن ليس هي عندنا كما نسمعها، ولا نحسن أن نقرأها كما بلغنا عنكم، فهل نأثم؟ فقال: لا. اقرأوا كما تعلمتم فسيجيئكم من يعلمكم
মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান থেকে, তার কোনো সঙ্গীর মাধ্যমে আবুল হাসান (আ.)-এর কাছে বর্ণিত। তিনি বললেন, “আমার জীবন আপনার জন্য কোরবান! আমরা কুরআনের আয়াত শুনি, কিন্তু আমাদের কাছে সেগুলো যেভাবে আছে, সেভাবে নয় যেভাবে আমরা শুনি; আর আমরা সেগুলো পড়তে পারি না যেভাবে আপনাদের থেকে পৌঁছেছে। তাহলে কি আমরা গুনাহগার হব?” তিনি বললেন, “না। তোমরা যেভাবে শিখেছ সেভাবেই পড়ো। শীঘ্রই তোমাদের কাছে এমন একজন আসবেন যিনি তোমাদের শিখিয়ে দেবেন।”[22]আল-কাফী ৪/৪৩৩
অর্থাৎ প্রতীক্ষিত মাহদী (আ.), কারণ তাদের কিছু কাল্পনিক রেওয়ায়াতে আছে যে, কুরআনকে যেভাবে নাযিল হয়েছে সেভাবে শুধু তিনিই সংরক্ষণ করবেন। আর শেষ যামানায় তিনি আসবেন ইমামিয়া শিয়াদের শেখাতে—যখন মানুষের হাতের মুসহাফগুলো আসমানে তুলে নেওয়া হবে। ইমাম মাহদি যিনি তাদের মতে ১২তম শিয়াদের ইমাম উনার দ্বারাই পূর্ণ কুরআন প্রকাশিত হবে। প্রখ্যাত শিয়া আলেম নুরী আত-তাবারসী ‘ফসলুল খিতাব’ গ্রন্থে বলেন,
আমীরুল মুমিনীনের হযরত আলী (রা) এর কাছে একটি বিশেষ কুরআন ছিল, যা তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তিকালের পর নিজেই সংকলন করেন এবং তা জনসমক্ষে পেশ করেন; কিন্তু তারা তা উপেক্ষা করে। অতঃপর তিনি তা তাদের দৃষ্টি থেকে গোপন করে রাখেন; আর তা ছিল তার সন্তান তথা বংশধরের নিকট সংরক্ষিত, ইমামত তথা নেতৃত্বের সকল বৈশিষ্ট্য ও নবুয়তের ভাণ্ডারের মত যার উত্তরাধিকারী হয় এক ইমাম থেকে অপর ইমাম। আর তা প্রমাণ (মাহদী) এর নিকট সংরক্ষিত রয়েছে। “আল্লাহ আল্লাহ দ্রুত তাকে মুক্ত করে দিন”- তিনি তখন তা জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন এবং তাদেরকে তা পাঠ করার নির্দেশ দিবেন; আর তা সংকলন, সূরা ও আয়াতসমূহের ধারাবাহিকতার দিক থেকে বিদ্যমান এই কুরআনের বিপরীত; এমনকি শব্দসমূহও কম-বেশি করার দৃষ্টিকোণ থেকে তার বিপরীত। আর যেখানে সত্য আলী’র সাথে; আর আলী সত্যের সাথে, সেখানে বিদ্যমান কুরআনের মধ্যে উভয়দিক থেকেই পরিবর্তন রয়েছে; আর এটাই উদ্দেশ্য।[23]ফসলুল খিতাব, পৃষ্ঠা ৯৭
শিয়াদের পরবর্তী যুগের আলেমরাও পূর্ববর্তী আলেমদের সাথে কুরআন কারীমের ব্যাপারে মতভেদ করেন না। সকলেই একমত যে, আজকের মানুষের হাতে যে কুরআন রয়েছে তা পূর্ণাঙ্গ নয়। তাদের দাবি অনুসারে, এতে তাহরীফ, পরিবর্তন ও বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পূর্ববর্তীরা এটা খুব স্পষ্ট ও সাহসিকভাবে বলেছেন—যেমনটি তাদের কথায় আগে এসেছে। আর পরবর্তীরা কিছু লোক তাকিয়্যা (লুকোচুরি) করে আহলে সুন্নাতের সাথে মিলে যাওয়ার ভান করেছেন—কুরআন অক্ষুণ্ণ ও তাহরীফমুক্ত বলে। কিন্তু অধিকাংশই—যারা সংখ্যায় বেশি—পূর্বের মতের ওপর অটল রয়েছেন। তারা স্পষ্টভাবে কুরআনে তাহরীফ ঘটেছে বলেছেন, পূর্বের আলেমদের কথা ও তাদের ইমামদের নামে বর্ণিত স্পষ্ট রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন।
এই মত লালনকারীরা কাফের
এই ছিল তাদের আকিদার ছোট একটা নমুনা। এখন এসব কি কুফর নয়? অবশ্যই এগুলো সুস্পষ্ট কুফুরী। লিখা শেষ করছি এই বিষয়ে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের ওলামাগণের কওল দিয়ে।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা বলেছেন:
وكذلك من زعم منهم أن القرآن نقص منه آيات وكتمت أو زعم أن له تأويلات باطنة تسقط الأعمال المشروعة ونحو ذلك ، وهؤلاء يسمَّون القرامطة والباطنية ، ومنهم التناسخية ، وهؤلاء لا خلاف في كفرهم.
“আর যারা দাবি করে যে কুরআন থেকে কিছু আয়াত কমে গেছে বা লুকানো হয়েছে, অথবা এর বাতিনী তা’বীল আছে যা শরীয়তের আমলগুলোকে বাতিল করে দেয়—এমন লোকদেরকে কারামিতা ও বাতিনিয়া বলা হয়, আর তাদের মধ্যে তানাসুখিয়া (পুনর্জন্মবাদী)ও আছে। এদের কুফরে কোনো মতভেদ নেই।”[24]আস-সারিমুল মাসলূল, খণ্ড ৩, পৃ. ১১০৮–১১১০
ইবনে আশূর (রহ.) বলেন:
وكون القرآن قد تلاشى منه كثير هو أصل من أصول الروافض ليطعنوا به في الخلفاء الثلاثة، والرافضة يزعمون أن القرآن مستودع عند الإمام المنتظر فهو الذي يأتي بالقرآن وقر بعير
আর কুরআনের অনেকাংশ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার দাবি রাফেযীদের মূল ভিত্তি, যার মাধ্যমে তারা তিন খলীফার ওপর আক্রমণ করে। রাফেযীরা ধারণা করে যে, কুরআন ইমাম মুন্তাজারের (প্রতীক্ষিত ইমাম) নিকট সংরক্ষিত আছে; তিনিই কুরআন নিয়ে আসবেন — ‘উটের বোঝা পরিমাণ কুরআন’ নিয়ে।”[25]আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, ২১/২৪৭
সারাখসী (রহ.) বলেন:
وقال أيضًا: أما حديث عائشة – رضي الله عنها – فضعيف جدًا؛ لأنه إذا كان متلوا بعد رسول الله – صلى الله عليه وسلم -، ونسخ التلاوة بعد رسول الله – صلى الله عليه وسلم – لا يجوز فلماذا لا يتلى الآن؟ ! وذُكر في الحديث (فدخل داجن البيت فأكله)، وهذا يقوي قول الروافض الذين يقولون: كثير من القرآن ذهب بعد رسول الله – صلى الله عليه وسلم – فلم يثبته الصحابة – رضي الله عنهم – في المصحف وهو قول باطل بالإجماع (٣).
(٣) المبسوط للسرخسي (٥/ ١٣٤).
“আয়েশা (রা.)-এর হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ, যদি তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পরে তিলাওয়াতের আয়াত হিসেবে থাকত এবং রাসূলের পরে তিলাওয়াতের আয়াত রহিত করা সম্ভব না হতো, তাহলে বর্তমানে তা তিলাওয়াত করা হয় না কেন?”
“আর হাদীসে উল্লেখ রয়েছে: ‘একটি গৃহপালিত জানোয়ার ঘরে ঢুকে তা খেয়ে ফেলে।’ এটি রাফেযীদের সে কথাকে শক্তি দেয় যারা বলে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পরে কুরআনের অনেকাংশ হারিয়ে গেছে, আর সাহাবাগণ তা মুসহাফে সংরক্ষণ করেননি। অথচ ইজমার দৃষ্টিতে এটি বাতিল কথা।”[26]আল-মাবসূত লিস সারাখসী, ৫/১৩৪
কাজী ইয়াদ (রহ.) তার কিতাব-এ বলেছেন:
“وقد أجمع المسلمون أن القرآن المتلو في جميع أقطار الأرض المكتوب في المصحف بأيدي المسلمين مما جمعه الدفتان من أول “الحمد لله رب العالمين” إلى آخر “قل أعوذ برب الناس” أنه كلام الله ووحيه المنزل على نبيه صلى الله عليه وسلم وأن جميع ما فيه حق وأن من نقص منه حرفا قاصدا لذلك أو بدله بحرف آخر مكانه أو زاد فيه حرفا مما لم يشمل عليه المصحف الذي وقع الإجماع عليه، وأجمع على أنه ليس من القرآن عامدا لكل هذا أنه كافر. ”
“মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, সমস্ত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যে কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, মুসলিমদের হাতে লেখা যে মুসহাফে (কুরআনের কপিতে) যা দুই প্রচ্ছদের মধ্যে সংকলিত আছে—সুরা ফাতিহার শুরু থেকে ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ থেকে শুরু করে শেষ সুরা ‘কুল আউজু বিরাব্বিন নাস’ পর্যন্ত—এটা আল্লাহর কালাম এবং তাঁর ওহী, যা তিনি তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নাযিল করেছেন। এতে যা কিছু আছে সবই সত্য। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এর থেকে একটি হরফও কমিয়ে দেয়, অথবা তার জায়গায় অন্য কোনো হরফ বসিয়ে দেয়, অথবা এমন কোনো হরফ যোগ করে যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত মুসহাফে নেই—এসব কাজ যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে করে এবং এতে বিশ্বাস করে যে এটা কুরআনের অংশ নয়, তাহলে উম্মাহর ইজমা অনুযায়ী সে কাফির।”[27]আশ-শিফা ১১০২/১১০৩ পৃষ্ঠা
একই গ্রন্থ ও পৃষ্ঠায় কাজী ইয়াদ আবু উসমান আল-হাদ্দাদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:
جميع من ينتحل التوحيد متفقون على أن الجحد لحرف من التنزيل كفر
“তাওহীদের দাবিদার সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, নাযিলকৃত কুরআনের একটি হরফও অস্বীকার করা কুফর।”
আবদুল কাহির আল-বাগদাদী তার কিতাবে বলেছেন:
“وأكفروا -أي أهل السنة والجماعة- من زعم من الرافضة أن لا حجة اليوم في القرآن والسنة لدعواه أن الصحابة غيروا بعض القرآن وحرفوا بعضه ”
“আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (সুন্নি মুসলিমরা) তাদেরকে কাফির বলে গণ্য করেছেন—অর্থাৎ রাফিযীদের মধ্যে যারা দাবি করে যে, আজকের কুরআন ও সুন্নাহতে আর কোনো দলিল নেই, কারণ তারা মনে করে সাহাবীরা কুরআনের কিছু অংশ পরিবর্তন করে দিয়েছেন এবং কিছু অংশ বিকৃত করেছেন।”[28]আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক ৩১৫ পৃষ্ঠা
কাজী আবু ইয়া’লা তার কিতাব বলেছেন:
“والقرآن ما غير وبدل ولا بدل ولا نقص منه ولا زيد فيه خلافا للرافضة القائلين أن القرآن قد غير وبدل وخولف بين نظمه وترتيبه -ثم قال – إن القرآن حمع بمحضر من الصحابة رضي الله عنهم وأجمعوا عليه ولم ينكر منكر ولا رد أحد من الصحابة ذلك ولا طعن فيه ولو كان مغيرا مبدلا لوجب أن ينقل عن أحد من الصحابة أنه طعن فيه، لأن مثل هذا لا يجوز أن ينكتم من مستقر العادة .. ولأنه لو كان مغيرا ومبدلا لوجب على علي رضي الله عنه أن يبيته ويصلحه ويبين للناس بيانا عاما أنه أصلح ما كان مغيرا فلما لم يفعل ذلك بل كان يقرأه ويستعمله دل على أنه غير مبدل ولا مغير “اهـ
“কুরআন কোনোভাবেই পরিবর্তন বা বদল করা হয়নি, এতে কোনো বিকল্প করা হয়নি, কোনো অংশ কমানো হয়নি এবং কোনো অংশ বাড়ানো হয়নি—এটা রাফিযীদের (যারা বলে কুরআন পরিবর্তন ও বদল করা হয়েছে, এর বিন্যাস ও ক্রম পরিবর্তন করা হয়েছে) বিপরীতে।
তারপর তিনি বলেন: কুরআন সাহাবীদের (রা.) সামনে সংকলিত হয়েছে, তারা সবাই এতে একমত হয়েছেন, কেউ এর বিরোধিতা করেনি, কোনো সাহাবী এটা অস্বীকার করেননি বা এতে আপত্তি তোলেননি। যদি এতে পরিবর্তন বা বিকৃতি থাকত, তাহলে অবশ্যই কোনো না কোনো সাহাবীর পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে আপত্তির কথা বর্ণিত হতো। কারণ এমন গুরুতর বিষয় সাধারণত গোপন থাকতে পারে না।
আর যদি এতে পরিবর্তন বা বিকৃতি থাকত, তাহলে অবশ্যই আলী (রা.)-এর উপর ওয়াজিব হতো যে তিনি রাত জেগে এটা ঠিক করে দিতেন, মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে বলতেন যে তিনি যা বিকৃত হয়েছিল তা সংশোধন করে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি তা করেননি; বরং তিনি নিজে এটা পড়তেন এবং আমল করতেন—এটা প্রমাণ করে যে কুরআন বিকৃত বা পরিবর্তিত হয়নি।”[29]আল-মুতামাদ ফী উসুলিদ দীন ২৫৮ পৃষ্ঠা
আল্লাহু আলাম
Footnotes
| ⇧1 | আল-কাফী, ১/১৩৮ |
|---|---|
| ⇧2 | আল-কাফী, ৪/৪৫৬ |
| ⇧3 | আল-কাফী ১/৪৪১ |
| ⇧4 | ইহতিজাজে তবরিযীত; ইরানী ইনকিলাব ১২৮ পৃঃ |
| ⇧5 | তাফসীরুল কুম্মী, ১০৬ পৃষ্ঠা |
| ⇧6 | কিতাব “আল-ইস্তিগাসা” পৃষ্ঠা ২৫ |
| ⇧7 | তাফসীরুস সাফী। মোল্লা হাসান। পৃষ্ঠা ১৩ |
| ⇧8 | আওয়াইলুল মাকালাত পৃ. ১৩ |
| ⇧9 | তাফসীরে সাফীর মুকাদ্দিমা, খণ্ড ১, পৃ. ৩৩ |
| ⇧10 | .https://islamqa.info/ar/answers/21500/. |
| ⇧11 | .https://samakal.com/international/article/58626/. |
| ⇧12 | .https://www.shafinchowdhury.com/আয়াতুল্লাহ-আল-খোমেইনী-এর-কুফর-ও-বিভ্রান্তি/. |
| ⇧13 | তাফসীরুল ‘আয়্যাশী, খণ্ড ১, পৃ. ১২ |
| ⇧14 | তাইয়্যিব আল-মূসাভীর মুকাদ্দিমা, তাফসীরুল কুম্মী, ১/২২ |
| ⇧15 | ইরানী ইনকিলাব, পৃষ্ঠা ২২৭ |
| ⇧16 | মিরাতুল উকুল, ১২/৫২৫ |
| ⇧17 | আল-আনওয়ার আন-নু‘মানিয়্যাহ, ২/৩৫৭ |
| ⇧18 | মাশারিকুশ শুমূস আদ-দুররিয়্যাহ, পৃ. ১২৬ |
| ⇧19 | আল-বুরহান ফী তাফসীরিল কুরআন, পৃ. ৩৬ |
| ⇧20 | তাফসীর মাজমা‘উল বায়ানে ১/৫ |
| ⇧21 | তাফসীর আত-তিবয়ানে ১/৩ |
| ⇧22 | আল-কাফী ৪/৪৩৩ |
| ⇧23 | ফসলুল খিতাব, পৃষ্ঠা ৯৭ |
| ⇧24 | আস-সারিমুল মাসলূল, খণ্ড ৩, পৃ. ১১০৮–১১১০ |
| ⇧25 | আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, ২১/২৪৭ |
| ⇧26 | আল-মাবসূত লিস সারাখসী, ৫/১৩৪ |
| ⇧27 | আশ-শিফা ১১০২/১১০৩ পৃষ্ঠা |
| ⇧28 | আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক ৩১৫ পৃষ্ঠা |
| ⇧29 | আল-মুতামাদ ফী উসুলিদ দীন ২৫৮ পৃষ্ঠা |




