রাষ্ট্রীয় নাস্তিকতার নির্মম ইতিহাস: সোভিয়েত, আলবেনিয়া ও মেক্সিকোর গির্জা ধ্বংস

একটা প্রচলিত মুখরোচক বয়ান ছড়ানো হয়েছে , বিশেষ করে ফেসবুক আসার পর, সেটা হলো―
“ধার্মিকরা খুবই উগ্র, তারা বাক-স্বাধীনতা দেয়না, ভিন্নমতকে পছন্দ পারে না। তারা জোর করে অন্যের উপর নিজের মতকে চাপায়। পক্ষান্তরে নাস্তিকরা খুবই সুশীল। তারা মুক্তচিন্তা ও ভিন্নমতকে সবসময় স্বাগত জানায়, তারা বাক-স্বাধীনতার জীবন্ত মূর্তি।”
এটা একতরফা বয়ান, ধার্মিকরা এমনটা করেনা সেটা না,―করে। সকলেই করে এটা। গণতন্ত্রের সমর্থকরাও জোর করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। জোর করে মানবাধিকারও চাপানো হয়।
ঠিক তেমনই নাস্তিকরাও জোর করে নাস্তিকতা চাপিয়েছে সাধারণ মানুষের উপর, নাস্তিকতার নামে, নাস্তিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য খুনখারাপিও করেছে, বাক-স্বাধীনতাকে দমনও করেছে। কিন্তু এগুলো সেভাবে চর্চিত হয়না। ইতিহাস থেকে কয়েকটা উদাহরণ দেব:
সোভিয়েত ইউনিয়ন
সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে নাস্তিকতা তথা Gosateizm লাগু করেছিলো নাস্তিক বিপ্লবীরা, অর্থাৎ স্টেট এথিজম। ইউনিয়নের শাসকরা দীর্ঘ 70 বছর ধরে ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে গেছে, হত্যা করেছে পাদ্রী পুরোহিত ও মোল্লাদের।[1]Paul Froese. Forced Secularization in Soviet Russia: Why an Atheistic Monopoly Failed. Journal for the Scientific Study of Religion. তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মবিরোধী পত্রিকা ছাপাতো, স্কুল-কলেজে নাস্তিকতা শেখাতো। রাষ্ট্রীয় মদদে ১৯২৫ সালে গড়ে ওঠে Leaugue of Militant Atheists, যাদের কাজই ছিলো ধর্মের বিরুদ্ধে প্রপাগাণ্ডা চালানো, পাদ্রী পুরোহিত ও মোল্লাদের উপর নির্যাতন করা।[2]Godfrey Blainey, A Short History of Christianity, p 494. তারা Godless Five Years Plan হাতে নেয়, তাদের উদ্দেশ্য ছিলো ধর্মকে সমাজ থেকে পুরোপুরি মুছে দিয়ে নাস্তিকতাকে ধর্মের জায়গায় বসানো।[3]Anderson, John. Religion, State and Politics in the Soviet Union and Successor States, Cambridge University Press, p 3.
তারা এতটাই অসহিষ্ণু ছিলো যে, কেউ নাস্তিকতা বা সরকারের কর্মকাণ্ডকে সমালোচনা করলে রাষ্ট্র জোর করে অবসরে পাঠাতো কিংবা জেলে ভরতো।[4]Pospielovsky, Dimitry. A History of Soviet atheism in theory and practice and the believer, vol 2. গবেষকদের মতে আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড়োজোরপূর্বক গণধর্মান্তরকরণ ঘটিয়েছিলো নাস্তিকরাই, ―
“It Might be Added that the most modern example of forced ‘conversios’ came not from any theocratic state, but from a professedly atheist government – that of the Soviet Union under the Communists.”[5]Adappur, Abraham. Religion and Cultural crisis in India and west.
একটা হিসাব মতে, শুধুমাত্র ১৯২২ সাল থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত ২৮ জন অর্থোডক্স বিশপ আর ১২০০জন পাদ্রীকে হত্যা ও বহুজনকে নির্যাতন করা হয়েছিলো। ১৯২৯–১৯৪১ সময়কালে ৯৮% প্রায় গির্জা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আলবেনিয়া
১৯৬৭ সালে আলবেনিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান এনভার হোজা আলবেনিয়াকে “বিশ্বের প্রথম নাস্তিক রাষ্ট্র” বলে ঘোষণা করেন, এরপর দেশের মোট ২,১৬৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (যার মধ্যে ২৬৮টি ছিল ক্যাথলিক গির্জা) ধ্বংস করা হয় অথবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।”[6]Albania: An atheist state, Bernhard Tonnes, p 6.
আলবেনিয়ার ধার্মিকদের উপর চলে নাস্তিক শাসনের জুলুমবাজি। তারা ধর্মীয় চিহ্ন, পোশাক ও আচার-আচরণকে বাতিল করে সরকারিভাবে। ধর্মীয় নেতাদের আইনের আওতায় আনা হয়। মূলত নাস্তিক শাসকগোষ্ঠী দাবি করেছিল যে, আলবেনিয়ায় ধর্ম একটা বিদেশি জিনিস। এই যুক্তিতে তারা ধর্মকে ১৯৬৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দমন করে।[7]Representations of Place: Albania, Derek R. Hall
১৯৭২ সালে শকোদের শহরে গোপনে একটি শিশুকে দীক্ষা দেওয়ার অপরাধে ক্যাথলিক পুরোহিত Shtjefen Kurti-কে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। এরপর ১৯৯০ সালে এসে আলবেনিয়ায় রাষ্ট্রীয় নাস্তিকতাবাদের নীতি বাতিল করা হয়।
মেক্সিকো
১৯১৭ সালের মেক্সিকোর সংবিধানের ৩, ৫, ২৪, ২৭ এবং ১৩০ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মবিরোধী ধারাসমূহ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯২৪ সালে প্রেসিডেন্ট Plutarco Elías Calles ক্ষমতায় আসার পর এই আইনকে আরো জোরদার করেন। Calles-এর সময়ের মেক্সিকোকে বলা হয় নাস্তিক রাষ্ট্র, তার লক্ষ্য ছিল মেক্সিকো থেকে ধর্মীয় চর্চা মুছে ফেলা।[8]American Catholics and Mexican Anticlericalism, 1933–1936,E. David Cronon Journal of American History, Volume 45, Issue 2, September 1958, Pages 201–230
১৯২৬ সালের ১৪ জুন, প্রেসিডেন্ট Calles একটি ধর্মবিরোধী আইন পাশ করেন, The Law Reforming the Penal Code বা Calles Law নামে, এর ফলে ক্যাথলিকবিরোধী কার্যক্রম আরও তীব্রতর হয়। এর আইনে― ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সংঘ নিষিদ্ধ, গির্জাকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, পুরোহিতদের নাগরিক অধিকার বাতিল করা হয়।[9]Resisting Rebellion: The History and Politics of Counterinsurgency, Anthony James Joes, p. 70
গির্জার বাইরে যাজকীয় পোশাক পরলে ৫০০ পেসো জরিমানা করা হত এবং সরকারের সমালোচনাকারী পুরোহিতদের পাঁচ বছরের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হত। ক্যালেস গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিলেন, সমস্ত বিদেশী পুরোহিতদের বহিষ্কার করেছিলেন এবং মঠ, কনভেন্ট এবং ধর্মীয় বিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছিলেন।[10]John W. Warnock, The Other Mexico: The North American Triangle Completed p. 27
কঠোর ধর্মবিরোধী আইনের ফলে বিভিন্ন রাজ্যে ক্যালেসের বিরুদ্ধে বিরোধ শুরু হয়। আর এই বিরোধ থেকেই ১৯২৬–১৯২৯ সালে ক্রিস্তেরো যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ১৯৯২ সালে, মেক্সিকান সরকার সকল ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আইনি মর্যাদা প্রদান করে, তাদের সম্পত্তির অধিকার প্রদান করে এবং দেশে পুরোহিতের সংখ্যার উপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে সংবিধান সংশোধন করে।
ফরাসি বিপ্লব
১৭৮৯ সালে হওয়া ফরাসি বিপ্লবের নেতৃত্বে থাকা বিপ্লবীরা ছিলেন সেকুলার ও নাস্তিক। তারা ছিলেন খ্রিষ্টধর্মের চরমতম বিদ্বেষী। তারা গণহারে খ্রিস্টানদের গণহত্যা করে ফ্রান্সকে Dechristianize করার চেষ্টা করে। বিপ্লবের এই সময়কালকে বলা হয় সন্ত্রাসের রাজত্ব, এই সময় বিপ্লবীরা চার্চকে দমন করে, গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, 30,000 পুরোহিতকে নির্বাসিত করে এবং আরও শত শত পুরোহিতকে হত্যা করে।[11]Collins, Michael (1999). The Story of Christianity. pp. 176–177.
ফ্রান্সেই প্রথম রাষ্ট্র-সমর্থিত নাস্তিকতা প্রতিষ্ঠা লাভ করে বিপ্লবীদের মাধ্যমে। এইসময় ফ্রান্সে দুই ধরনের কাল্ট তৈরী হয়, সেকুলারদের Cult of the Supreme Being এবং নাস্তিকদের Cult of Reason,[12]Kennedy, Emmet (1989). A Cultural History of the French Revolution. Yale University Press. p. 343 যেসব পুরোহিতরা বিপ্লবী সরকারের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেননি তাদের নির্বাসনে পাঠানো হয় বা কারাবন্দি করা হয়। এমনকি গির্জায় যাওয়ার পথে মহিলাদেরও রাস্তায় মারধর করা হতো।[13]Anthony James Joes, Resisting Rebellion: The History and Politics of Counterinsurgency 2006, p. 51 অনেক গির্জাকে Temples of reason-এ রূপান্তর করা হয়, যেখানে নাস্তিকতাবাদী অনুষ্ঠান হতো।[14]Thomas Hartwell:An Introduction to the Critical Study and Knowledge of the Holy Scriptures. Cambridge University Press. p. 30
এই সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে Nantes শহরে, যেখানে Jean-Baptiste Carrier-এর নেতৃত্বে হাজার হাজার খ্রিস্টান বিশ্বাসী, পুরুষ-মহিলা এমনকি শিশুকেও নদীতে বেঁধে ডুবিয়ে মারা হয়—যাকে বলা হয় Noyades de Nantes। একই সময়ে গ্রামে গ্রামে Infernal Columns পাঠানো হয়, যারা Vendée-সহ বিদ্রোহী এলাকাগুলোয় গির্জা পুড়িয়ে ধর্মপ্রাণ বহু মানুষ হত্যা করে।
নাস্তিকরা যখনই হাতে শাসনক্ষমতা পেয়েছে তখনই তারা ধর্ম ও ধার্মিকদের উপর খড়গহস্ত হয়েছে। বাক-স্বাধীনতা সংকুচিত করেছে, ভিন্নমতকে দমন করেছে, সেইসাথে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জোর করে নাস্তিকতা চাপাতে চেয়েছে। হত্যা করেছে ধার্মিক নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ এমনকি দুধের শিশুদেরও। সবকিছুই হয়েছে ধর্মকে ঘৃণা করে নাস্তিকতার নামে ও মুক্তচিন্তার নামে।
শেষে প্রাভদার সম্পাদক নিকোলাই বুখারিনের একটা উক্তি দিয়ে শেষ করবো, যিনি বলেছিলেন,
“Extermination of Religion, at the tip of the bayonet.”
Footnotes
| ⇧1 | Paul Froese. Forced Secularization in Soviet Russia: Why an Atheistic Monopoly Failed. Journal for the Scientific Study of Religion. |
|---|---|
| ⇧2 | Godfrey Blainey, A Short History of Christianity, p 494. |
| ⇧3 | Anderson, John. Religion, State and Politics in the Soviet Union and Successor States, Cambridge University Press, p 3. |
| ⇧4 | Pospielovsky, Dimitry. A History of Soviet atheism in theory and practice and the believer, vol 2. |
| ⇧5 | Adappur, Abraham. Religion and Cultural crisis in India and west. |
| ⇧6 | Albania: An atheist state, Bernhard Tonnes, p 6. |
| ⇧7 | Representations of Place: Albania, Derek R. Hall |
| ⇧8 | American Catholics and Mexican Anticlericalism, 1933–1936,E. David Cronon Journal of American History, Volume 45, Issue 2, September 1958, Pages 201–230 |
| ⇧9 | Resisting Rebellion: The History and Politics of Counterinsurgency, Anthony James Joes, p. 70 |
| ⇧10 | John W. Warnock, The Other Mexico: The North American Triangle Completed p. 27 |
| ⇧11 | Collins, Michael (1999). The Story of Christianity. pp. 176–177. |
| ⇧12 | Kennedy, Emmet (1989). A Cultural History of the French Revolution. Yale University Press. p. 343 |
| ⇧13 | Anthony James Joes, Resisting Rebellion: The History and Politics of Counterinsurgency 2006, p. 51 |
| ⇧14 | Thomas Hartwell:An Introduction to the Critical Study and Knowledge of the Holy Scriptures. Cambridge University Press. p. 30 |




