ভারত প্রশ্নে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশীদের অবস্থান
লেখাটি যখন তৈরি করি তখন ভেবেছিলাম শিরোনাম দেব ‘বাংলাদেশের বন্ধকী আত্মার আর্তনাদ’। কিন্তু এটি বেশি নেতিবাচক হয়ে যায় কিনা, সেজন্য বাদ দিলাম। তবে কেন এই শিরোনামটি ভেবেছিলাম সেটি ব্যাখ্যা করতে একটি গল্প দিয়ে এই লেখাটা শুরু করছি।
১৬ শতকের একজন বিখ্যাত ইংরেজ কবি ও নাট্যকার ছিলেন খ্রিষ্টফার মারলো (Christopher Marlowe)। তার একটি বিখ্যাত নাটক হচ্ছে The Tragical History of the Life and Death of Doctor Faustus সংক্ষেপে Doctor Faustus. খুবই জনপ্রিয় একটি নাটক, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অনার্স পড়া প্রায় সবাইকেই এটি পড়তে হয়।
এই নাটকের গল্প ও কেন্দ্রীয় চরিত্র হচ্ছে ডক্টর ফসটাস (Doctor Faustus)একজন স্কলার যে কিনা প্রচলিত যুক্তিবিদ্যা, মেডিসিন, আইন ও ধর্মবিষয়ক সীমাবদ্ধ জ্ঞানে অসন্তুষ্ট হয়ে ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ বা যাদু-টোনা (খারাপ অর্থে) শিক্ষার সিদ্ধান্ত নিলেন। ডক্টর ফসটাস তার নতুন ক্যারিয়ার শুরু করলেন যাদুকর হিসেবে। তবে যাদুকর হিসেবে তার অফুরন্ত ক্ষমতার আগে শয়তানের (Mephastophilis) সাথে তার একটা চুক্তি হল। ২৪ বছর শয়তান তার সেবা করবে, তাকে সকল ক্ষমতা দেয়া হবে, সে যা চায় তাই হবে কিন্তু এর বিনিময়ে ডক্টর ফসটাসের আত্মাকে দিয়ে দিতে হবে শয়তানকে এবং ২৪ বছর পর তার আত্মা জাহান্নামে যাবে। ডক্টর ফসটাস কিছুটা ইতস্তত করে পরে রাজি হলেন। অর্থাৎ, আত্মার বিনিময় সে যাদুকরী ক্ষমতা পেল ২৪ বছরের জন্য। ২৪ বছর ডক্টর ফসটাস হেন কাজ নেই করলেন না। মানুষকে তাক লাগানোর জন্য আলেকজান্ডার দি গ্রেট কে নিয়ে আসা, দুনিয়ার সেরা সুন্দরী হেলেনের সাথে সাক্ষাত থেকে রাজদরবারে নাক ফাটিয়ে দেয়া ইত্যাদি। পাপ করতে করতে সে নিজেকে ব্যাপক অধঃপতিত করল। মাঝে মাঝে যখন তার অনুশোচনা হত, তওবা করার জন্য লোকেরা বলত কিন্তু সে পারতো না। কেননা তার আত্মা বন্ধক দেয়া শয়তানের কাছে। দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে করে ডক্টর ফসটাস যাদুর খেলা চালাতে চালাতে সময় শেষ হয়ে আসল। একেবারে শেষ মুহূর্তে সে অন্যান্য স্কলারদেরকে তার ঐ চুক্তির কথা বলল। তারা সবাই খুব আশ্চর্য হল এবং ফসটাসের ক্ষমার জন্য দোয়া করতে চাইল। ২৪ বছর যখন প্রায় শেষ, তার আগের দিন ফসটাস অনুশোচনায়, ভয়ে ক্ষমা ও প্রাণ ভিক্ষা চাইতে লাগল কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। গভীর রাতে শয়তানের শাগরেদ এসে তার রুহ কবজ করল এবং আত্মাকে জাহান্নামে নিয়ে গেল। পরদিন অন্য স্কলাররা কেবল ডক্টর ফসটাসের হাড়গোড় দেখতে পেল এবং কবরের ব্যবস্থা করল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৫ বছর এসেও জাতি হিসেবে আমরা ভারতের সাথে আমাদের জাতীয় সম্পর্ক নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়েছি। এই ব্যর্থতা কেবল ব্যর্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বরং হাজির হয়েছে জাতীয় সংকট হিসেবে। বাঙালী জাতীয়তাবাদের অনুসারীদের কাছে ভারত হচ্ছে ‘বন্ধু রাষ্ট্র’। ১৯৭১ সালে ভারতের সাহায্যের কারণে তাঁরা এতটাই ন্যুজ ও নিবেদিত প্রাণ যে ৪৫ বছর পর একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব যখন ভারতের কারণেই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়, তখনও তাঁরা পুরাতন ‘বন্ধুত্বের’ কারণে প্রশ্ন তুলতে কেবল অপারগই নয় বরং কোন এক অজানা কারণে মেরুদণ্ড সোজা করে বলতেও পারেনা আমি স্বাধীন। এ যেন ‘স্বাধীনতার বিনিময়ে স্বাধীনতার বন্ধকী’!
এ যেন ডক্টর ফসটাস এর মত বাংলাদেশের আত্মার বন্ধকী, যার বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আজ খাদের কিনারে এসে প্রাণ ভিক্ষা চাইছে-বলছে আমাকে মুক্তি দাও, আমার স্বাধীনতাকে স্বাধীনতা দাও। আত্মার বন্ধক দেয়া বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রটির শেষ রক্ষা হবে কি? এই নিয়ে এই আলোচনা। একটু দীর্ঘ প্রবন্ধ ধৈর্য নিয়ে পড়ার অনুরোধ রইল।
আমি তরুণ প্রজন্মের অনেককেই একটি প্রশ্ন করেছি, এখনো করি; সমস্যা কী ভারতের মত বিশাল দেশ, সুপার পাওয়ারের সাথে মিশে গেলে?
প্রথমত, এমন একটি প্রশ্ন অনেককেই অপ্রস্তুত করে। অধিকাংশ উত্তরদাতাই কোন সদুত্তর না দিতে পেরে মাথা চুলকায়, আমতা আমতা করে, এরপর বলে-
কি বলেন? আমরা স্বাধীন দেশ না?
তো? ভারতে আমাদের মত ২ ডজন বাংলাদেশ বা তারচেয়ে বড় রাজ্য আছে, তারাও তো স্বাধীন?
না মানে……
আরে ভাই শাহরুখ খান, আমির খান, প্রীতি জিনতার সাথে পাসপোর্ট-ভিসাহীন চা খেতে পারবেন।
তরুণ প্রজন্ম আর আগাইতে পারেনা।
এই তরুণ হচ্ছেন খেয়ে না খেয়ে, বুঝে না বুঝে ভারতবিরোধীতা করা তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি। অন্যদিকে ভারত বিরোধীদের শায়েস্তা করতে এগিয়ে আসা কোন এক তরুণ তর্ক জুড়ে দেন এই বলে-ভারত আমাদের চিরশত্রু পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে ‘উদ্ধারকারী’ হিসেবে এসেছে। আর তাই আমরা তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তাকে যখন উপর্যুক্ত একই প্রশ্ন করা হয় তখন স্বাভাবিক উত্তর হয়- ভারত যদি আমাদের দখল করতে চাইত তাহলে ১৯৭১ সালেই করতে পারত! হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেককেই এই যুক্তি দিতে দেখেছি। এই কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু এই যুক্তিতে মুক্তি মিলছেনা, মিলছে কি?
সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন দেশের যে বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, যেটা আমাদের ছিল, গত কয়েক বছর আমরা কি দেখছি?সীমান্তে চলমান নির্বিচার বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা, খরা হয়ে যাওয়া আমাদের নদী, বিভিন্ন অসম বাণিজ্য-চুক্তি, বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ অনেক বিষয়ে হস্তক্ষেপ, বাংলাদেশের নিরাপত্তায় কম্প্রোমাইজ, এমনকি ভারতীয় দূতাবাসে নির্ধারণ হওয়া এমপি, মন্ত্রীর প্রার্থিতা ইত্যাদি বিষয়গুলো সামনে রাখলে বলা যায় না বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। মনে হয় ভারতের দয়ায় টিকে থাকা একটি Vessel state (ভাসমান রাষ্ট্র)।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন উদ্দেশ্য
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সবাই কি একই লক্ষ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল?বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সময়ে করা মন্তব্যগুলো পর্যালোচনা করে বলা যায় সবাই একই উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। ধর্ম, আদর্শ, আর্থ-সামাজিক অবস্থান ভেদে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ভিন্নতা ছিলই। স্বাধীনতার পর পর অনেকেই বলেছেন বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পাওয়ার আসায় যুদ্ধে গেছেন। অনেকেই গিয়েছিলেন সাম্য-ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার আশায়, অনেকে গিয়েছেন অর্থনৈতিকভাবে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার আশায়, কেউ কেউ গিয়েছেন কারণ তার পক্ষে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে না গিয়ে উপায় ছিল না। কারোরই দেশপ্রেমের অভাব ছিল না। উদ্দেশ্য ও আদর্শ ভিন্ন হলেও একটা লক্ষ্য প্রায় সবার ছিল-দেশকে স্বাধীন করা ।
তবে কিছু মানুষ একেবারে ভিন্ন উদ্দেশ্যে যে যুদ্ধে গিয়েছেন সেটাও আমরা দেখতে পাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর ২৮ ডিসেম্বর চিত্তরঞ্জন সূতার নেতৃত্বে বাংলাদেশের তিনজন সংখ্যালঘু নেতা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী’র সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশকে ভারতের অংশ করে রাখার প্রস্তাব রাখেন। তাদের প্রস্তাবের জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “ইয়ে না মুমকিন হ্যায়“[1]মাসুদুল হক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ, (পঞ্চম সংস্করণ), প্রচিন্তা প্রকাশনী, ২০১১, পৃঃ ১৪০।
ইয়ে না মুমকিন হ্যায় মানে এ সম্ভব নয় – সেদিন ইন্দিরা বললেও চিত্তরঞ্জন সূতার ও তার সঙ্গী ডা. কালীদাস বৈদ্য সে চেষ্টা স্বাধীনতার পরেও করে গেছেন। দুই জনে মিলে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারতে বসে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী ‘বঙ্গভূমি’ আন্দোলন পরিচালনা করে। তাদের বক্তব্য ছিল ‘যদি দ্বিজাতিতত্ত্ব নাই থাকে, তবে সীমান্ত থাকবে কেন?’[2]মাসুদুল হক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ, (পঞ্চম সংস্করণ), প্রচিন্তা প্রকাশনী, ২০১১, পৃঃ ১৯।[3]আরো পড়ুনঃ Hindu republic ‘born’ in Bangladesh, Times of India, Feb 4, 2003
এখন আমরা বলতে পারি চিত্তরঞ্জন সূতার ও তার সঙ্গী ডা. কালীদাস বৈদ্য দুই জনই মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু তাঁরা যেই উদ্দেশ্যে ১৯৬২ সাল থেকে কলকাতায় বসে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে গোপন সংগঠন পরিচালনা করে আসছিলেন তাঁদের সাথে অন্যান্য বাঙালী মুসলমান মুক্তিযোদ্ধার কেবল আদর্শিক ভিন্নতাই নয় বরং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেও ভিন্নতা ছিলই। আরো দুটি উদাহরণ দিয়ে পয়েন্টটি শেষ করছি।
- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্ত বলেছেন, “সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হবে জানলে মুক্তিযুদ্ধ করতাম না” (আমার দেশ অনলাইন, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৩)।
- মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ের মূল সেনানী মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বীর উত্তম বলেন; ‘ বাংলাদেশকে ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি‘ (কালের কণ্ঠ, ২ ডিসেম্বর ২০১৬)
মজার ব্যাপার হচ্ছে সময়ের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে একই ব্যক্তির ভূমিকা দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন ১৯৬২ সালে চিত্তরঞ্জন সূতার পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে দেশের গোয়েন্দাদের কাছে পরিচিত ছিলেন ভারতীয় এজেন্ট ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে কিন্তু একই ব্যক্তির এই ভূমিকাকে আমরা ৭১ এর পর বিবেচনা করেছি স্বাধীনতার সৈনিক হিসেবে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তার আলাপ প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পর সেই একই ব্যক্তিকে এখন বাঙালীরা কীভাবে বিবেচনা করবেন? এই ধরনের ঘটনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অজস্র।
কে কি উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণ করেছে, রাষ্ট্র যদি সবার সেসব উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন করতে যায় তাহলে সেটা আর রাষ্ট্র থাকবেনা। তৈরি হবে নৈরাজ্য। আর এটিই আমরা দেখছি স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি। সবাই সবার ভিশন অনুসারে রাষ্ট্র গড়তে চায় এবং সেটা করতে গিয়ে কে কাঁর সাথে কি শর্তে মিলিত হয়, কাঁর কাছে কি বন্ধক রাখে বলা মুশকিল। তবে এই নৈরাজ্যের দীর্ঘস্থায়ীকরণ কারোরই কাম্য নয়। সেজন্য দরকার ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কেন অংশগ্রহণ করেছে সেটা বুঝার চেষ্টা করা।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণের ঐতিহাসিক কারণ
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণ বুঝতে হলে আমাদেরকে ইতিহাসের একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের দিকে দৃষ্টি দেবার দরকার হবে। দেখতে হবে সেসময় ভারতীয় নেতারা কী শর্তে আমাদেরকে ‘মুক্তি’ দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে আমি কোন পাকিস্তানপন্থী বা কোন বাঙালী মুসলমানের দ্বারস্থ না হয়ে বরং বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালী বুদ্ধিজীবী সুনীতি কুমার ঘোষের বয়ান হুবহু তুলে ধরছি;
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় বাংলা ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান থেকে পৃথক রাষ্ট্র হবে তাতে মুসলিম লীগ নেতাদের সম্মতি ছিল। ২৬শে এপ্রিল মাউন্টব্যাটেন যখন জিন্নাকে সোহরাওয়ার্দী স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ বাংলার প্রস্তাবের কথা বললেন তখন জিন্নাহ একটুও ইতস্তত না করে বলেছিলেন, “আমি আনন্দিত হবো… তারা ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন থাকুক সেটাই ভালো হবে”। একই বক্তব্য ছিল লীগের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী খাঁ’র। তিনি বলেছিলেন, “বাংলা কখনও বিভক্ত হবে না এই তাঁর বিশ্বাস, তাই তিনি বাংলা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তিনি মনে করেন যে, বাংলা হিন্দুস্থানে বা পাকিস্তানে যোগদান করবে না এবং পৃথক রাষ্ট্র থাকবে”। জিন্নাহ ও লিয়াকত তাঁদের এই সম্মতি বারবার জানিয়েছেন। কিন্তু কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বরাবর বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। পাকিস্তান হোক আর না হোক, তবু বাংলাকে ভাগ করতে হবে- এই ছিল তাঁদের অন্যতম দাবি।
কংগ্রেসের এই দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আগেই নেয়া হয়েছিল। মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা নামে যে পরিকল্পনা পরিচিত তা মূলত ১৯৪৬-এর ডিসেম্বরে অথবা ১৯৪৭-এর জানুয়ারিতে প্যাটেলের সঙ্গে আলোচনা করে ভি. পি. মেনন তৈরি করেছিলেন। তাঁরা স্পষ্টই বলেছিলেন যে, পরিকল্পনার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, সেই সময়ে বিভিন্ন জাতিসত্তার যে আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি উঠেছিল- যাকে ‘কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হবার প্রবণতা’ (“centrifugal tendencies”) বলা হয়েছে- তাকে রোধ করার জন্য একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করা।
এটা করতে গিয়ে তাঁরা বাংলার গণমানুষের কল্যাণের কোন চিন্তাই করলেন না। নেহরুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু কৃষ্ণ মেনন ১৯৪৭-এর ১৩ই মার্চ মাউন্টব্যাটেনকে এক দীর্ঘ চিঠিতে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব দিয়ে লিখেছিলেন, বিভাগের বিরুদ্ধে বাংলার তুলনামূলকভাবে প্রবল বিরুদ্ধতা আছে। তবু স্থায়িত্বের (stability-র) জন্য দেশবিভাগ-রূপ দাম বাংলাকে দিতে হবে। দুটি প্রধান দলের মধ্যে একটি দল-মুসলিম লীগ-রাজি ছিল; ব্রিটিশরাজও রাজি ছিল; কিন্তু প্রধান দলের মধ্যে অন্যটি-কংগ্রেস- রাজি ছিল না। কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের জন্যই বাংলা দ্বিখণ্ডিত হলো।
কিন্তু তাঁদের এই ভাগের পেছনেও ছিল কু-চিন্তা। তাঁরা এই ভাগকে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সাময়িকভাবে মেনে নিয়েছিল। কংগ্রেসের ঐ পরিকল্পনার সাথে যুক্ত ছিল বিজেপি’র প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীও। তিনি তখন হিন্দু মহাসভার’র প্রধান ছিলেন।
তৎকালীন বাংলা প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, শ্যামাপ্রসাদ সেই সময়ে একান্তে বলছিলেন: এখন আমরা বিভক্ত করি এবং ইংরেজরা চলে যাক। তারপর আমরা সমগ্র অঞ্চল দখল করে নেবো । সুরেন্দ্রমোহন ঘোষের এই বক্তব্যের মধ্যে সত্যতা আছে। কারণ, বাংলা-তথা ভারত-বিভাজন ঠিক হয়ে যাবার পরেই হিন্দু মহাসভা কর্তৃক একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল : “…যতক্ষণ না বিচ্ছিন্ন অংশগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে এবং এর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করা হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত শান্তি আসবে না”।
হিন্দু মহাসভা আরও দাবি ছিল পূর্ববাংলার হিন্দুরা ও জাতীয়তাবাদী মুসলমানরা ভারতীয় নাগরিক হিসাবে স্বীকৃত হোক। তাদের বিশ্বাস ছিল, ভারতীয় ইউনিয়নে পূর্ববাংলাকে ফিরিয়ে আনা মাত্র সময়ের প্রশ্ন। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারাও নিশ্চিত ছিলেন, পূর্ববাংলা তথা পাকিস্তান হিন্দুস্থানে ফিরে আসতে বাধ্য হবে। প্যাটেলও এই বক্তব্য রেখেছিলেন যে, শক্তিশালী কেন্দ্রের অধীনে ভারতবর্ষ এত ক্ষমতাসম্পন্ন হবে যে পাকিস্তানকে শীঘ্রই তাঁরা ফিরে পাবেন । শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের গুণগ্রাহী হিন্দু মহাসভার নেতা বলরাজ মাধোক লিখেছিলেন যে, শ্যামাপ্রসাদ বলেছিলেন : “কংগ্রেস ভারত-বিভাজন করেছিল আর আমি করেছিলাম পাকিস্তান-বিভাজন”[4]সুনীতি কুমার ঘোষ, কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে, হাসান আজিজুল হক (সম্পাদিত), বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ, সময় প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা ২৬৩-২৮২
এই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় আমাদেরকে ভারতের সাথে তৎকালীন অখণ্ড পাকিস্তানের বৈদেশিক সম্পর্ক বুঝার চেষ্টা করতে হবে। বিশিষ্ট সাংবাদিক মাসুদুল হক তার সাড়া জাগানো গবেষণা “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ” বইতে লিখেন ১৯৬২ সালের চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের পর থেকেই পাকিস্তানকে দুর্বল করার লক্ষ্যে পূর্ব-পাকিস্তানকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁদের সেই পরিকল্পনা থেকেই কালিদাস বৈদ্য ও চিত্তরঞ্জন সুতাকে দিয়ে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ গঠন করা হয়েছিল।

যাই হোক, বিষয়টাকে নাটকীয় কিংবা কেবল ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বের’ আলোকে বিশ্লেষণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কারণ দুনিয়ার কোন ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’-ই ১০০% বাস্তবায়ন হয় না। ৬০ এর দশকের শুরু থেকেই বাঙালী জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনা দানা বাঁধতে শুরু করে এবং কিছু কিছু নেতার মাঝে পূর্ব-পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের চিন্তা প্রবলভাবে অনুভূত হয়। অর্থাৎ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার গ্রাউন্ড ততদিনে তৈরি হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। এই প্রেক্ষিতেই আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছ থেকে ৬ দফা দেখতে পাই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভারতের হেজিমনিক আকাঙ্ক্ষা। আর ভারত তার চিরশত্রু পাকিস্তানের ক্ষতি চাইবে এটাই স্বাভাবিক, আর এটাই চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের শিক্ষা যে কোন দেশের সীমান্তের প্রতিবেশী হচ্ছে শত্রু-দেশ (Natural Enemy)। এটি ভারতীয় কূটনীতির মৌলিক কিতাব যা এখনো সবাইকে পড়তে হয়।
স্বাধীনতার জন্য স্বাধীনতার বন্ধকী?
স্বাধীনতার যুদ্ধে কার কী ভূমিকা সেটা এই পোস্টের আলোচ্য বিষয় নয়। সেজন্য কাউকে নায়ক বা ভিলেন বানানোও উদ্দেশ্য নয়। বরং আমাদের কাছে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে ঐ সময় ও প্রেক্ষাপট বুঝার চেষ্টাই মূল লক্ষ্য। আর আমি যেটা বিশ্বাস করি বর্তমানে বসে অতীত নির্মাণ করা যায় না কেবল ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করা যায়। এই পোস্টে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়টিই কেবল আলোচ্য।
একথা তো পরিষ্কার যে, পাকিস্তান ভারতের কাছে শত্রু রাষ্ট্র। সেই শত্রু রাষ্ট্রেরই একটি অংশ স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। কিছু সময়ের জন্য আমি যদি ভারতীয় হিসেবে নিজেকে কল্পনা করি তাহলে ভারতের ভূমিকা কি হবে সেটা বুঝতে পারব। তৎকালীন পূর্ব-বাংলা বা পূর্ব-পাকিস্তানকে মাত্র ২৩ বছর আগে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা মিলে টুকরো করেছে এবং পশ্চিম-বাংলাকে আলাদা করে নিয়ে গেছে। এখন যে-সব কারণে (সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এর অভাব) পূর্ব-বাংলা স্বাধীন হতে চায় সেগুলোর আবেদন পশ্চিম বাংলা এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলোতেও বিদ্যমান[5]উদাহরণস্বরূপ উইকিলিকস প্রকাশিত নথি দেখুনঃ ‘Manipur more a colony of India’, The Hindu, March 21, 2011।
শুধু তাই নয় বাংলাদেশের আশে-পাশের ভারতীয় রাজ্যগুলো আজও এসব মৌলিক দাবি থেকে দিল্লি এবং অন্যান্য রাজ্য থেকে অনেক অনেক পিছিয়ে, এবং সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে অনেকটা বাংলাদেশের মত। তাহলে দিল্লি যদি পূর্ব-বাংলাকে স্বাধীন হতে সাহায্য করে তার প্রভাব ভারতের অভ্যন্তরে কি হবে সেটা অবশ্যই ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও সমর নায়কদের চিন্তায় ছিল। তাছাড়া জাতিসংঘের বিধি নিষেধ, আন্তর্জাতিক আইন-কানুনের অনেক হিসেবে নিকেশ ছিল। (দেখুনঃ The Legal debate of our Liberation from Intl commission of Jurist)) যাই হোক, ভারত ফাইনালি পূর্ব-পাকিস্তানকে স্বাধীন হতে সাহায্য করতে রাজি হয়, কিন্তু কিছু শর্তে। তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে প্রবাসী সরকার ভারতের সাথে যে সমঝোতা চুক্তি (প্যাক্ট নয় এগ্রিমেন্ট) করেছিলেন তার বর্ণনা সাংবাদিক মাসুদুল হক তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে সেগুলোতে ছিল;
ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা দিয়ে প্রশাসন ঢেলে সাজানো হবে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে অবস্থান করবে, বাংলাদেশের কোনো পৃথক সেনাবাহিনী থাকবে না, থাকবে কেবল একটা প্যারা-মিলিশিয়া বাহিনী। সমঝোতা চুক্তিতে আরো ছিল যে, বাংলাদেশ সরকার তার পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে ভারত সরকারের সাথে আলোচনা করে [6]বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ, পৃষ্ঠা ১৪১-১৪২।
তবে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর মতে স্বাধীনচেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পরবর্তীতে তাজউদ্দীনকৃত সমঝোতা চুক্তি মানতে রাজি হন নি। তিনি যদি এই সমঝোতা চুক্তি বাতিল করতে না পারতেন, তবে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র না হয়ে পরিণত হতো ভারতের একটি করোদমিত্র রাজ্যে (Protectorate)। এসব কথা বলেছেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তার এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে যিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের দিল্লি মিশনের প্রধান ছিলেন। উপর্যুক্ত সমঝোতা চুক্তি দেখে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মূর্ছা যান বলে কথিত আছে। যে কেউ এই চুক্তি দেখবে বলতে বাধ্য হবে এ যেন ‘স্বাধীনতা অর্জনের জন্য স্বাধীনতার বন্ধক রাখা’।
তাজউদ্দীনের দেশপ্রেম কম ছিল না নিশ্চয়ই কিন্তু তার ও তার সহকর্মীদের হয়ত আর কোন উপায়ও ছিল না। বঙ্গবন্ধু সেই চুক্তি না মানায় ভারত তাঁর ওপর নাখোশ ছিল। তিনি যখন বুঝতে পারেন ভারতের উদ্দেশ্য, তখন অনেক চেষ্টা করেছেন ভারতের বলয় থেকে বেরিয়ে আসার। কিন্তু ইট ওয়াজ টু লিটল এন্ড টু লেইট।
অন্যদিকে ভারতও তার ষোল আনা বুঝে নিতে চাইল, যেটা স্বাভাবিক। যেহেতু পূর্ব-পাকিস্তানীরা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশ পেতে লড়ছিল সেহেতু ‘অখণ্ড ভারতের’ স্বপ্ন দেখা ভারতীয় রাষ্ট্রনায়কদের উপায়ও ছিল না বাংলাদেশীদের বলা পিণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে পশ্চিম বাংলার সাথে মিলে গিয়ে দিল্লির অধীনে আবার ‘অখণ্ড বাংলা’ গঠন করতে। কীভাবে সেটা বাস্তবিক হত?
শেখ মুজিব সহ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা আওয়ামীলীগের প্রথমসারির এইসব নেতারাই মাত্র ২৩ বছর আগে ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে একটি ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন বাংলার জন্য লড়েছিলেন যা ইন্দিরা’র বাবা নেহেরু ও তার দল কংগ্রেস কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। সেজন্যই ইন্দিরা গান্ধী সেদিন বাংলাদেশী হিন্দু-নেতাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বলেছিলেন ইয়ে না মুমকিন হ্যায়, মানে এ সম্ভব নয়। এখন যারা বলেন ভারত চাইলেই সেদিন বাংলাদেশকে দখল করে নিতে পারত তাঁদেরকে আসলে বেবুঝ ছাড়া আর কীইবা বলা যেতে পারে।
মনে রাখা দরকার, ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন এ সম্ভব নয়, বলেননি আমরা এটা চাইনা। এখানেই আমাদের দরকার ব্রাহ্মণ্যবাদের হেজিমনি বুঝা। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ ভারত যাদের রয়েছে অন্য দেশ দখলের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও প্রায়োগিক ঐতিহাসিক উদাহরণ।[7]দেখুনঃ ভারত কর্তৃক হায়দ্রাবাদ ও সিকিম দখলের ইতিহাস ব্রাহ্মণ্যবাদের কাছে কোন লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সময় মূল ফ্যাক্টর নয়, কর্ম সম্পাদন হচ্ছে মূল নীতি। ফলে তাঁদের লক্ষ্য ‘Time bound’ না হয়ে হয় ‘Task oriented’ (যতক্ষণ কাজ সমাপ্ত হবে)। ‘অখণ্ড ভারত’ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বাংলাদেশ। কতদিন লাগবে সেটা নিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের তাড়া নেই। যতদিন লাগুক সে লক্ষ্যে ভারতীয়রা কাজ করে যাচ্ছে, যার চিত্র আমরা এখন বাংলাদেশে দেখছি। কংগ্রেস বলুন আর বিজেপি বলুন যে দলই ক্ষমতায় থাকুক এই ‘অখণ্ড ভারত’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভারতীয়দের রাষ্ট্রিক স্বপ্ন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে ভারতের প্রাপ্তি
স্বাধীনতা উত্তর ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক পর্যালোচনা করতে হলে আমাদেরকে প্রবাসী সরকারের সাথে করা সমঝোতা চুক্তিকেই সামনে রাখতে হবে। কারণ সেটিই ভারতীয়দের মূল দলিল ও দাবি। ভারতের বাংলাদেশ নীতি যে এখনো ঐ চুক্তিকে কেন্দ্র করেই সেটা আমরা হয়ত অনেকেই এখন বুঝতে পারছি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসেব মতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ১ হাজার ৯৮৪ জন ভারতীয় শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১ হাজার ৭৬৯ জন, নৌবাহিনীর ২০৪ জন এবং বিমানবাহিনীর ১১ জন শহীদ। এই সংখ্যা ধরেই তাদেরকে ৫ লাখ রুপি করে সম্মাননা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।[8]প্রথম আলো, মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় শহীদঃ ৫ লাখ রুপি করে পাচ্ছে ১৭০০ পরিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৬। এই জীবন দানের মাধ্যমে ভারত তার চিরশত্রু পাকিস্তানকে দুর্বল করে মানসিক ভাবে, আর্থিকভাবে এবং চেতনার দিক থেকে এবং অর্জন করে বিজয়। আর আমরা বাংলাদেশ অর্জন করি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ভারতের কাছে এই বিজয় কেবলই মানসিক আনন্দেরই ছিল না, ছিল প্রতিশোধও।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় শরণার্থীদের রক্ষণাবেক্ষণ সহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে সাহায্য করে। প্রবাসী বাঙালীরা সাহায্য করে সরাসরি বাংলাদেশ সরকারকে। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যেহেতু তখনো স্বীকৃতি পায়নি সেজন্য অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো ভারত সরকারের কাছে সাহায্য পাঠায় জাতিসংঘের মাধ্যমে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সাবসেক্টর অধিনায়ক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এ এস এম সামছুল আরেফিন তাঁর বিখ্যাত ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ বইয়ে উল্লেখ করেন ভারত সেই সময় বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে ১৬ কোটি ৮১ লক্ষ ৩ হাজার ৭শত ২৭ ডলার সাহায্য পায়।[9]এ এস এম সামছুল আরেফিন, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান, সময় প্রকাশন, ২০১২, পৃ. ৪৫২ সেই সময়ের হিসেবে ১ ডলার= ৭.৮৬ টাকা ছিল। সেই হিসেবে প্রাপ্ত সাহায্যের পরিমাণ তৎকালীন হিসেবে দাঁড়িয়েছিল ১৩২ কোটি ১২ লক্ষ ৯৫ হাজার ২শত ৯৪ টাকা। বর্তমানের হিসেবে এই অর্থের মূল্য দাঁড়াবে আরো অন্তত ১০ গুণ বেশি।
পাকিস্তান যুদ্ধে হেরে যাবার পর আর্থিকভাবে ভারত সরকার পাকিস্তান থেকেও ক্ষতিপূরণ নেয়। ভারতীয় অফিসিয়াল হিসেবে মোতাবেক পাকিস্তানের কাছ থেকে ভারত সর্বমোট ৫৪৩ কোটি ৫১ লাখ ১৪ হাজার দুইশত চুরানব্বই রুপি ক্ষতিপূরণ আদায় করে।[10]Official 1971 War history, History Division, Ministry of Defense, Government of India, Copyright BHARAT RAKSHAK, 1992, available at http://www.bharat-rakshak.com/archives/OfficialHistory/1971War/ (last accessed 13/06/2016).
পাকিস্তান থেকে পাওয়া ভারতের ক্ষতিপূরণ
বাংলাদেশ থেকে কী পায় ভারত?
স্বাধীনতার পর ভারতীয় বাহিনী ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে মার্চ ১৯৭২ পর্যন্ত সময় বাংলাদেশে অবস্থান করে। এই সময়ে কী পরিমাণ লুটপাট তাঁরা করে তা বর্ণনাতীত। তাঁদের লুটপাট মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষদেরকে হতবাক করে দেয়। ২১ শে জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ব্রিটেনের বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকায় সাংবাদিক মার্টিন ঊলাকট (Martin Woollacott) Indians ‘loot whole factory ‘শিরোনামে লেখায় লিখেন,
“Systematic Indian army looting of mills, factories and offices in Khulna area has angered and enraged Bangladesh civil officials here. The looting took place in the first few days after the Indian troops arrived in the city on December 17”[11]Martin Woollacott, Indians ‘loot whole factory, The Guardian, Jan 22, 1972.
সে সময় খুলনার ডিসি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের ক্যাবিনেট সচিব ডক্টর কামাল সিদ্দিকী। তিনি সে সময় ভারতীয় বাহিনীর এই লুটপাটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি লিখে বলেন; কেবল খুলনা থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন টাকার পরিমাণ লুটপাট করে ভারতীয় সেনাবাহিনী। কামাল সিদ্দিকী পরবর্তীতে লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে করা তার পিএইচডি থিসিসে বাংলাদেশের দরিদ্রতার কারণ হিসেবে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তার থিসিসটি পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে বই আকারে বের হয়, সেই হিসেবে এটি সরকারি ভাষ্য হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
স্বাধীনতার পর ভারতীয় সৈন্যদের লুটপাটকামাল সিদ্দিকি নিজে সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় বিভিন্ন জেলার ডিসিদের সাথেও কথা বলে জানতে পারেন অন্যান্য জেলাতেও ভারতীয় বাহিনী একই ধরনের লুটপাট করে। ভারতীয় সৈন্যরা পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া সকল অস্ত্র এবং ৮৭ টি ট্যাংক নিয়ে যায় যার মূল্য ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
অনিক নামের একটি ভারতীয় সাপ্তাহিক পত্রিকার বরাতে কামাল সিদ্দিকি আরো লিখেন ভারতীয় সৈন্যদের লুটপাটের মধ্যে অস্ত্র ছাড়াও ছিল মজুদকৃত খাদ্য শস্য, কাঁচা পাট, সুতা, গাড়ি, জাহাজ, শিল্প প্রতিষ্ঠানের মেশিন ও যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য খাদ্য দ্রব্য। কামাল সিদ্দিকীর মতে সব মিলিয়ে কম করে ধরলেও এই লুটপাটের পরিমাণ ছিল তৎকালীন হিসেবে ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার![12]Kamal Siddiqui, The political economy of rural poverty in Bangladesh (1st ed.), National Institute of Local Government, 1982, Dacca, Page 427. সে সময়ে সারা বাংলাদেশে ১৯টি জেলা থেকে লুটপাটের পরিমাণ কেমন হতে পারে সেটা অনুমান অসম্ভব না।
এই লুটপাটের বাহিরেও ছিল চোরাচালান ও কালোবাজারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্পদের পাচার। কামাল সিদ্দিকী তার থিসিসে দেখিয়েছেন কীভাবে বৈদেশিক সাহায্য, আমদানি-রপ্তানিতে, টাকার অবমূল্যায়ন করে ভারত বাংলাদেশকে লুট করে। লুটপাট ভারতীয় সেনাবাহিনী করলেও চোরাচালান ও কালোবাজারিতে যুক্ত ছিল ভারতীয় ব্যবসায়ী শ্রেণি এবং তাঁরা বাংলাদেশেরও কিছু দালাল জুটিয়ে নিয়েছিল।
ভারত ও ভারতীয়দের এসমস্ত কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো দেশে অল্প সময়ের মধ্যেই এন্টি-ইণ্ডিয়ান মানসিকতা তৈরি হতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশকে দেখতে হয় একটি ভয়ানক দুর্ভিক্ষ যেখানে ৫-১০ লক্ষ মানুষ খুন হয়। এর জন্য দায়ী কে? এরপরও বাংলাদেশীরা আজ ভারতীয় অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ন্যায্য অধিকারের দাবি জানাতেও শরমিন্দা অনুভব করে। অথচ ভারতের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল মানেক শ’ স্বীকার করে বলেন;
‘……আমাদেরকে সত্যাশ্রয়ী হতে হবে। বাংলাদেশীদের প্রতি আমরা সঠিক আচরণ করিনি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সব রকমের সাহায্য করা উচিৎ ছিল, কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা তা করেননি। তারা বেনিয়ার মতো আচরণ করেছেন’[13]ফিল্ড মার্শাল মানেক শ’, স্টেটসম্যান, ২৯ এপ্রিল, ১৯৮৮।
বাংলাদেশ পরবর্তীতে চেষ্টা করেছে নিজ পায়ে দাঁড়াতে, ঘুরে দাঁড়িয়েছিলও। কিন্তু সেটা বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব আজ প্রশ্নের মুখে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যেই আদর্শেই বিশ্বাস করিনা না কেন, যে দলই করিনা কেন বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চাই। এই একটি জায়গায় আমাদের জাতীয় ঐক্য থাকা দরকার। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি, সেখানে খুব কম মানুষই ভারতের আধিপত্যবাদী মানসিকতা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারেন।
অপ্রিয় হলেও সত্য কথা হচ্ছে এই যে, যে দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়েছিল তাঁদের হাতেই বাংলাদেশকে সিকিম বা হায়দ্রাবাদের ভাগ্য বরন করতে হয় কিনা এমন প্রশ্নও আজ মানুষের মনে দেখা দিয়েছে। কিন্তু কেন আমরা এমন অবস্থায় এসে উপস্থিত হলাম? আমরা বাঙালীরা কি নিজেরা নিজেদেরকে পরিচালিত করতে অপারগ? আমরা কি এতটাই অথর্ব যে আমাদেরকে বাহিরের শক্তি এসে শাসন করবে, যেভাবে শত শত বছর আমরা শাসিত হয়েছি? আমাদের জাতীয়তাবাদ এতটাই দূষিত যে জাতিকে ধ্বংস করতে পিছপা হয় না।
এখানে জাতীয়তাবাদের বাগাড়ম্বর আছে কিন্তু জাতীয়তাবোধ নাই, স্বাধীনতার চেতনার পূজা আছে কিন্তু স্বাধীনতাটাই নাই, দেশপ্রেমের বাড়াবাড়ি আছে কিন্তু দেশটাই নাই।
এখানেই আমি শুরুতে উল্লেখ করা ডক্টর ফসটাসের ঐ গল্পের দিকে আবার দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করব। আমাদের জাতীয়তাবাদী নেতারা ‘বাংলাদেশের আত্মার বন্ধকীর’ বিনিময়ে ক্ষমতায় এসেছেন বলে প্রতীয়মান। ক্ষমতায় এসে তাঁরা যা ইচ্ছা তাই করে চলেছেন। কেউ কেউ হয়ত ভুল হচ্ছে বুঝতে পারছেন কিন্তু ফিরতে পারছেন না। বঙ্গবন্ধুর শিষ্যরা তাঁর জীবন থেকে শিখছে বলে মনে হয় না। স্বাধীনতার বন্ধকীর বিনিময়ে অর্জন করা স্বাধীনতা কি টিকে থাকবে? এটাই প্রশ্ন এখন। তবে প্রফেসর আনু মুহাম্মদের মতে ভারত বাংলাদেশকে সিকিম হয়ত বানাবেনা। তিনি বলেন;
ভারত বাংলাদেশকে সিকিম বানাবে এরকম আশঙ্কা সমাজে আছে। এরকম কোন সম্ভাবনা নেই। কেননা, এর চাইতে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কাজের। দায় নেই, সুবিধা বহুবিধ। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশকে ঘেরাও করে ভারতের শাসকেরা পুরো দেশের একমাথা থেকে অন্য মাথা নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় ট্রানজিট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস এখন ভারতের প্রভাব বাড়ছে, চার শতাধিক বায়িং হাউজ ভারতেরই। শিক্ষা, চিকিত্সা, মিডিয়া, বিনোদন জগতেও তাদের প্রভাব অনেক, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নানা আয়োজন চলছে। ভূমি ও বসতি বাণিজ্যেও অনেক প্রস্তাব আছে। বিদ্যুৎ খাতে নিয়ন্ত্রণ আনার নানা প্রকল্প কাজ করছে। নদী বিনাশী আরও তৎপরতা আমরা দেখবো সামনে। বাণিজ্য অসমতা দূর করবার উদ্যোগ জোর পাবে না, বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা জুনিয়র পার্টনার হয়েই খুশি থাকবেন হয়তো[14]আনু মুহাম্মদ, ভারত বাংলাদেশে কী চায়?, Alalodulal.org, ১৭ জানুয়ারি ২০১৪।
উত্তরণ?
আমি ইতিবাচক চিন্তার মানুষ। ইতিবাচক ভাবতে চাই। অবশ্যই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব এবং অবশ্যই সেটা করতে হবে। কেননা বাঙালী মুসলমান (ডান-বাম-নাস্তিক-সেকুলার-ইসলামপন্থী) ও দলিত হিন্দুরা ১৯৪৭ যে কারণে ভারতের সাথে থাকার সুযোগ থাকা স্বত্বেও হাজার মাইল দূরের পাঞ্জাবীদের সাথে নিজেদের ভাগ্য গড়তে চেয়েছিল, সেইসব কারণ ভারতে আজও বিদ্যমান। সেসব কারণ যখন তাঁদের সামনে পরিষ্কার হয়ে উঠবে তখন নিজের দেশে ভারতীয় মুসলমান ও দলিতের মত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে বাঁচতে চাইবে না।[15]দেখুনঃ স্বাধীন ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের করুণ অবস্থা। তাঁরা বুঝবে ১০% সংখ্যালঘু যেখানে ২৯% সরকারি চাকরিতে অবস্থান করে, সেখানে ভারতের সাথে মিশে গিলে সংখ্যাগুরুই চাকরির ক্ষেত্রে হয়ে যাবে সংখ্যালঘু।
বাঙালী মুসলমান যেদিন বুঝবে কাশ্মীরের রক্তক্ষরণের অন্যতম প্রধান অপরাধ তাঁরা মুসলমান এবং তাঁরা ব্রাহ্মণ্যবাদের অধীনতা থেকে মুক্তি চায়।[16]দেখুনঃ India ‘covering up abuses’ in Kashmir: report, Al Jazeera, 10 Sep 2015 https://aje.io/h8cs3 সেদিন বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন হবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে বাংলাদেশ। এখন বাংলাদেশের মানুষের সামনে পরিষ্কার কে কী (Who is Who) এবং কার কি ভূমিকা। বাংলাদেশকে তাঁর আত্মার উদ্ধার করতে হবে। সেজন্য সর্বপ্রথম দরকার ১৯৭১ সালে ভারতের ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় ভূমিকাকে আমি মিড ওয়াইফ (ধাত্রী)এর সাথে তুলনা করে ব্যাখ্যা করতে চাই। অখণ্ড পাকিস্তানের গর্ভে বাংলাদেশ নামক ভ্রূণটি অনেকদিন থেকেই বেড়ে উঠছিল পূর্ব-পাকিস্তানে। ১৯৭১ সালে এসে প্রসব বেদনা শুরু হয়। এটা হয়ত আরো আগে বা পরে হতে পারত। কিন্তু নিজ দেশের রক্ষক আর্মির আঘাতে প্রসব বেদনায় কাতরানো পূর্ব-পাকিস্তানের সিজার করে বাংলাদেশকে বের করার ক্ষেত্রে ধাত্রীর ভূমিকা পালন করে ভারত। হাসপাতালের মত করে তাঁদের আশ্রয়, সহযোগিতায় বাংলাদেশের জন্ম হয়। বাংলাদেশ সেজন্য ধাত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ। সেই কৃতজ্ঞতা সরূপ বাংলাদেশ ভারতকে তাঁর প্রাপ্যের চেয়েও বেশি দিয়েছে। ভারতীয়রা আমাদের অনেক সম্পদ নিয়েছে যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৪৫ বছর যাবত নিয়েছে। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভারতের বাজার। এর চেয়ে আর কি দেওয়ার আছে ভারতকে আমাদের? কী দিলে আমাদের মুক্তি মিলবে? মিলবে প্রকৃত স্বাধীনতা?
এখন এই ধাত্রী যদি বাংলাদেশের পিতৃত্ব দাবি করে বসে, আরো বাড়িয়ে বললে হাসপাতাল যদি ৪৫ বছর পরও আমাদেরকে কৃতজ্ঞতার কথা বলে খোটা দিতে চায়, আমাদেরকে দাস বানাতে চায় তখন আর নেয়া যায় না। বাংলাদেশের মানুষ যে কারণে পাকিস্তানকে ত্যাগ করেছে এবং সেটা করতে গিয়ে যে খুন ঝরিয়েছে, একই কারণ যদি আবার সৃষ্টি হয় এবং ভারত যদি পাকিস্তানের স্থানে আবির্ভূত হয় নিপীড়ক শক্তি হিসেবে তাহলে বাঙালী মুসলমান ভারতকে কেন বন্ধু হিসেবে সমীহ করবে?
রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব হয় না
আরেকটি বিষয় অনেকেই আমরা চিন্তা করিনা, বন্ধুত্ব হয় ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির। রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের অ্যালায়েন্স হয়, বন্ধুত্ব হয় না। রাষ্ট্র একটি এবস্ট্রাক্ট এনটিটি, তাঁর বন্ধু হয় না। আধুনিক জাতি রাষ্ট্র সংজ্ঞাগতভাবেই অন্য রাষ্ট্র থেকে আলাদা। আর সে জন্যই রাজনৈতিক সীমানা, প্রাচীর এবং মানচিত্র। একেই বলে সার্বভৌমত্ব। এক রাষ্ট্রের সাথে আরেক রাষ্ট্রের বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক স্বার্থে যোগাযোগ হয়, কূটনীতি চলে কিন্তু বন্ধুত্ব চলেনা। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ‘বন্ধুত্ব’ পরিভাষাটাই মিসনোমার।
জাতি রাষ্ট্রের সংজ্ঞাই হচ্ছে এমন যে নিজের রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে প্রয়োজনে অস্ত্র চালাতে হয়। শুধু সীমান্তের প্রতিবেশীই নয় অন্য যেকোনো রাষ্ট্র আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হবে তাঁর বিরুদ্ধেই লড়াই করবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী। ভারত যা প্রতিনিয়ত করছে বাংলাদেশের সাথে সীমান্তে বাংলাদেশীদেরকে খুনের মাধ্যমে। কারণ বাংলাদেশ ভারতের কাছে শত্রুরাষ্ট্র, সে ব্যাপারে তাঁদের কোন সন্দেহ নাই, যেটা আমাদের বাংলাদেশীদের মাঝে আছে। বাংলাদেশের সরকারি হিসেবে (সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসেব) কেবল গত ১০ বছরেই ৫৯১ জন বাংলাদেশীকে খুন করেছে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী বিএসএফ[17]Dhaka Tribune, BSF kills 591 Bangladeshi citizens in last 10 years, June 07 2016। যেখানে ভারতীয় কূটনীতির মূল সূত্র অনুসারে বাংলাদেশ তাঁর কাছে শত্রু রাষ্ট্র (কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুসারে), সেখানে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করে চলেছে ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র?[18]পড়ুনঃ ‘বাংলাদেশিদের সঙ্গে শত্রুর মতো আচরণ করছে ভারত’, ডয়চে ভেলে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

এক্ষেত্রে আমাদের অগ্রজ বুদ্ধিজীবী মরহুম আহমদ ছফা বলে গিয়েছেন;
ছোট দেশকে তার নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনেই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বড় দেশের বিরোধিতা করতে হয়। ঠিক তেমনি একটা স্বনির্ভর বাংলাদেশ নির্মাণ করতে হলে আমাদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই ভারতের বিরোধিতা করতে হবে। অনেকে ভারত বিরোধিতা মানে হিন্দু বিরোধিতা বুঝে থাকে। কিন্তু আমি কথাটা বলছি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে (আহমদ ছফা, স্বনির্ভর বাংলাদেশ নির্মাণে অবশ্যই ভারতের বিরোধিতা করতে হবে, মূলধারা বাংলাদেশ, ২৫.০৫.২০১৬)।
দুনিয়ার বহুদেশ স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। এটাই যুদ্ধের সময়ের রীতি। বর্তমানে তুরস্কেই অবস্থান করছে প্রায় ২৫ লক্ষ সিরিয়ান রিফিউজি, যারা বছরের পর পর সেখানে অবস্থান করছে। বিভিন্ন দেশ সাহায্যের জন্য বিভিন্ন দেশের সাথে অ্যালায়েন্স করে। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে মরক্কো এবং মিশরের সহযোগিতা একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এসেছিল আমেরিকা। কিন্তু তাই বলে কি আমেরিকা ফ্রান্সকে বলে আমার পদানত হয়ে থাক বন্ধুত্বস্বরূপ?
একইভাবে ভিয়েতনামের উদাহরণ টানা যেতে পারে, কমিউনিস্ট দেশগুলো এক দিকে আর আমেরিকার নেতৃত্বে এন্টি-কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো প্রতিপক্ষ সাইডে অবস্থান নেয় সেখানে। প্রায় ২০ বছর স্থায়ী এই যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ লোকের জীবনের বিনিময়ে তাঁরা স্বাধীনতা লাভ করল। যেখানে চীনের ১১০০ এর মত সৈন্য মারা যায়। ভিয়েতনাম ঠিকই আমেরিকা এবং চীনের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। চীন নিশ্চয়ই ভারতের মত ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ সুলভ হেজিমনি কায়েমে ব্যস্ত নেই সেখানে। মুক্তিযোদ্ধা কবি মােহাম্মদ রফিক এর মন্তব্যও এখানে বিবেচনাযোগ্য। তিনি বলেন;
“এটা ঠিক যে আমরা ভারতের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছি, রাশিয়ার কাছে সাহায্য নিয়েছি। আর আমেরিকা যখন স্বাধীন হয় তখন তারা কি ফ্রান্সের কাছে সাহায্য নেয় নি? পৃথিবীর প্রত্যেক দেশই তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্যদেশের সাহায্য নেয়। আমরাও নিয়েছি। এটাকে বড় করে দেখার কিচ্ছু নেই। কিন্তু আমাদেরকে স্বাধীন করেছি আমরা। এটা আমাদের আত্মশক্তির জায়গা। এবং এই জায়গাটার কথা ওরা জানে। এবং ওরা জানে, আমরা যদি দাঁড়াই মাথা তুলে, আমরা পৃথিবীটাকে কাঁপিয়ে দিতে পারি।”[19]সর্বমানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না— মােহাম্মদ রফিক, সাক্ষাতকার, পরস্পর.কম, এপ্রিল ১২, ২০১৬
অর্থাৎ, ভারতের সাহায্য ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হতোই। অখণ্ড পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এটি হতে বাধ্য হত। হয়ত আমাদের সময় ৯ মাসের স্থলে ৯ বছর লাগত, হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়ত।
শেষ কথা, ভারতের সাথে আমরা কূটনীতি করব, বাণিজ্য করব কোনো সন্দেহ নেই। তবে অবশ্যই সেটা স্বাধীনতা, দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ ও সম্মান বজায় রেখে। ভারতের কৃতজ্ঞতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতের রাজ্যগুলোতে চলা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের যে-সকল আন্দোলন চলছে বাংলাদেশ তাঁদেরকে পেট্রোনাইজ করে না। এই নীতিতে ভারতের সাথে আমাদের সম্মানজনক কূটনীতি চলবে। এভাবেই বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দুনিয়ার বুকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। এটাই হোক আমাদের আগামীর স্বপ্ন।
লেখকঃ আনোয়ার মোহাম্মদ
মূল লিখার লিংকঃ https://www.muldharabd.com/?p=1174
বানান সংশোধনঃ ফ্রম মুসলিমস্ টিম
Footnotes
| ⇧1 | মাসুদুল হক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ, (পঞ্চম সংস্করণ), প্রচিন্তা প্রকাশনী, ২০১১, পৃঃ ১৪০ |
|---|---|
| ⇧2 | মাসুদুল হক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ, (পঞ্চম সংস্করণ), প্রচিন্তা প্রকাশনী, ২০১১, পৃঃ ১৯ |
| ⇧3 | আরো পড়ুনঃ Hindu republic ‘born’ in Bangladesh, Times of India, Feb 4, 2003 |
| ⇧4 | সুনীতি কুমার ঘোষ, কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো এবং কার স্বার্থে, হাসান আজিজুল হক (সম্পাদিত), বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ, সময় প্রকাশন, ২০১২, পৃষ্ঠা ২৬৩-২৮২ |
| ⇧5 | উদাহরণস্বরূপ উইকিলিকস প্রকাশিত নথি দেখুনঃ ‘Manipur more a colony of India’, The Hindu, March 21, 2011 |
| ⇧6 | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ, পৃষ্ঠা ১৪১-১৪২ |
| ⇧7 | দেখুনঃ ভারত কর্তৃক হায়দ্রাবাদ ও সিকিম দখলের ইতিহাস |
| ⇧8 | প্রথম আলো, মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় শহীদঃ ৫ লাখ রুপি করে পাচ্ছে ১৭০০ পরিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৬ |
| ⇧9 | এ এস এম সামছুল আরেফিন, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান, সময় প্রকাশন, ২০১২, পৃ. ৪৫২ |
| ⇧10 | Official 1971 War history, History Division, Ministry of Defense, Government of India, Copyright BHARAT RAKSHAK, 1992, available at http://www.bharat-rakshak.com/archives/OfficialHistory/1971War/ (last accessed 13/06/2016). |
| ⇧11 | Martin Woollacott, Indians ‘loot whole factory, The Guardian, Jan 22, 1972 |
| ⇧12 | Kamal Siddiqui, The political economy of rural poverty in Bangladesh (1st ed.), National Institute of Local Government, 1982, Dacca, Page 427 |
| ⇧13 | ফিল্ড মার্শাল মানেক শ’, স্টেটসম্যান, ২৯ এপ্রিল, ১৯৮৮ |
| ⇧14 | আনু মুহাম্মদ, ভারত বাংলাদেশে কী চায়?, Alalodulal.org, ১৭ জানুয়ারি ২০১৪ |
| ⇧15 | দেখুনঃ স্বাধীন ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের করুণ অবস্থা |
| ⇧16 | দেখুনঃ India ‘covering up abuses’ in Kashmir: report, Al Jazeera, 10 Sep 2015 https://aje.io/h8cs3 |
| ⇧17 | Dhaka Tribune, BSF kills 591 Bangladeshi citizens in last 10 years, June 07 2016 |
| ⇧18 | পড়ুনঃ ‘বাংলাদেশিদের সঙ্গে শত্রুর মতো আচরণ করছে ভারত’, ডয়চে ভেলে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ |
| ⇧19 | সর্বমানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না— মােহাম্মদ রফিক, সাক্ষাতকার, পরস্পর.কম, এপ্রিল ১২, ২০১৬ |










