বোরকা বনাম বিকিনি: নারীর পোশাকের স্বাধীনতা নাকি মিডিয়ার ব্রেনওয়াশ?

কেউ বোরকা খুলে ফেললে সেটা হয়ে যায় স্বাধীন সিদ্ধান্ত। কেউ বোরকা পরে নিলে সেটা হয় যায় মগজধোলাই (ব্রেইনওয়াশ)।— এমনটা প্রচার কেন?
হলে দুটোই স্বাধীন সিদ্ধান্ত হবে, নাহলে দুটোই মগজধোলাই। বিকিনি বা শর্টস পরাও তো মগজধোলাই হওয়া উচিত। মানুষ সামাজিক জীব, মানুষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বহুকিছু থেকে প্রভাবিত হতে পারে। পরিবার থেকে, বই পুস্তক থেকে, স্কুল কলেজ থেকে, মুভি থেকে বা মিডিয়া থেকে। আদর্শ মুক্তচিন্তা বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত এইজন্য অসম্ভব।
যে মেয়েটা বোরকা খুলে ফেললো সে কেন এমনটা করলো?— কারণ সে এটাকে ‘পশ্চাৎপদতা’ বলে ভাবতে শুরু করেছে, আর এই ভাবনা কে নির্মাণ করলো? পরিবেশ, সমাজ বা মিডিয়া। কারণ মিডিয়া সবসময়ই বোরকাকে ‘পশ্চাৎপদতা’ ও ‘দাসত্ব’ হিসেবে চিত্রিত করেছে। তাহলে বোরকা খুলে ফেলা কি আসলেই স্বাধীন সিদ্ধান্ত?— মোটেও না, এটাও মগজধোলাই। মিডিয়া নির্মিত সিদ্ধান্ত।
বহুজন বলে তারা বিকিনি কিংবা শর্টস পরছে এটা তাদের চয়েজ বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত।— আসলেই কি তাই? মোটেও না।
মিডিয়া, বিশেষ করে মুভি, টিভি সিরিজ ও বিজ্ঞাপন একটি নির্দিষ্ট Ideal নারীচিত্র ও বয়ান বারবার তুলে ধরে— যেমন: ‘শরীর তোমার সিদ্ধান্ত তোমার’, ‘নিজের ইচ্ছায় পোশাক পরো’,’বিকিনি হলো সাহসী পোশাক’ ইত্যাদি।
মিডিয়ার এসব বক্তব্য বারবার শুনে নারীরা প্রভাবিত হয়, তারা ভাবতে শুরু করে— ‘আসলেই তো! আমার শরীর আমার সিদ্ধান্ত। যা খুশি পরবো। মাই চয়েজ।’— অথচ বাস্তবতা হলো, এই ‘চয়েজ’টি বহু বছর ধরে মিডিয়া ও কর্পোরেট ব্র্যান্ডগুলোর তৈরি করা আর সেগুলো নারীদের মাথায় ঢোকানো হয়েছে। ব্রেনওয়াশ।
আসলে কর্পোরেট ব্র্যান্ডগুলো ও ফ্যাসান ইন্ডাস্ট্রি এক ধরনের বিউটি স্ট্যান্ডার্ড গড়ে তোলে আর নারীরাও সেটাকে ফলো করার চেষ্টা করে। ঐ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। যেমন সমুদ্রে গেলে বিকিনি পরে স্নান করা, বিভিন্নরকম শর্টস পোশাক পরা, স্লিম থাকা ও আকর্ষণীয় হওয়ার জন্য বিভিন্ন সার্জারি করা।
মোটকথা আধুনিক নারীরা যেগুলোকে তাদের ‘স্বাধীন সিদ্ধান্ত’ বা ‘চয়েজ’ বলে মনে করছে সেগুলো মোটেও স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও চয়েজ নয়, এগুলো মূলত নির্মিত সিদ্ধান্ত যা গড়ে তুলেছে ফ্যাসান ইন্ডাস্ট্রি ও মিডিয়া।
ফ্যাসান ইন্ডাস্ট্রি বা মিডিয়া কীভাবে নারীদের সিদ্ধান্তকে কন্ট্রোল করে কয়েকটা উদাহরণ দেখি—
এক
বিশ শতকের শুরুতে পশ্চিমা সমাজে নারীদেহে বগলের লোম ছিল স্বাভাবিক। অশোভন বলে ভাবা হতো না। Gillette 1915 সালে Milady Décolleté নামে প্রথম নারী রেজার বাজারে আনে।
১৯১৫ সালেই, হার্পার’স বাজার নামক ম্যাগাজিন নারীদের বগলের নীচের লোম অপসারণের জন্য প্রচারণা চালায়, বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু হয়: ‘নারী যদি আধুনিক হতে চায়, তবে বগলের লোম কাটা উচিত।’ এর ফলে নারীদের মধ্যে হিড়িক পড়ে যায় বগলের লোম সাফ করার। এটাকেই তারা বিউটি স্ট্যান্ডার্ড ধরে নেয়। এর ফলে দেখা যায় ১৯৬৪ সালের মধ্যে, ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ৯৮% আমেরিকান মহিলা এধরণের লোম কামিয়ে ফেলেন।
দুই
১৯৪৬ সালে ফ্রান্সে প্রথম বিকিনি তৈরি হয়।
তখন এটাকে অশ্লীল মনে করা হতো। প্রথমে অনেক মডেলই বিকিনি পরে ফটোশুট করতে রাজি হননি। তখন একজন নগ্ন নৃত্যশিল্পী দিয়ে সেটাকে প্রথম প্রদর্শন করানো হয়, এরপর ১৯৬০–৭০-এর দিকে হলিউড, ম্যাগাজিন, এবং টিভি সিরিজের মাধ্যমে বিকিনিকে যৌনতা ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে “Glamorize” করা হয়। নারীরা বিকিনিকে এখন স্বাধীনতার প্রতীক বলে মনে করে যেটাকে আগে ঘৃণা করতো।
তিন
১৯২০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধুমপান ছিল শুধুই পুরুষদের জন্য স্বাভাবিক, নারীদের ধুমপান করা জঘন্য হিসেবে দেখা হতো। তখন Lucky Strike কোম্পানি বিশাল এক বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইন চালায়: ‘ধুমপান হলো নারী-স্বাধীনতার টর্চলাইট।’ ফলে ধীরে ধীরে নারীদের ধূমপান হয়ে ওঠে একপ্রকার নারী স্বাধীনতার অংশ।
২০১০ সালে গার্ল স্কাউটস ১৩-১৭ বছর বয়সী ১০০ জন মেয়ের উপর একটি অনলাইন জরিপ পরিচালনা করে। তারা যা দেখেছে তা হল, ১০ জনের মধ্যে ৯ জন মেয়ে ফ্যাশন এবং মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি থেকে রোগা হওয়ার চাপ অনুভব করে। আর এই চাপের জন্য বহুজন রোগা হতে গিয়ে ও সার্জারি করতে গিয়ে প্রাণও হারিয়েছে।
তাহলে আজকের নারীরা যখন বলেন, ‘আমি শর্টস পরি কারণ এটা আমার শরীর, আমার পছন্দ,’ বা ‘বিকিনি আমার অধিকার’, তখন প্রশ্ন ওঠে— এই পছন্দ কি নারীর নিজের? নাকি এটি দীর্ঘ সময় ধরে মিডিয়া ও ফ্যাসান ইন্ডাস্ট্রির তৈরি করে দেওয়া পছন্দ বা সিদ্ধান্ত যেটাকে নারীরা তাদের পছন্দ বলে মনে করছে!
মুক্তমনারা পাবলিকলি বিকিনি, ব্রা, প্যান্টি পরাকে পোশাকের স্বাধীনতা বলে মেনে নিলেও তারা হিজাব নিকাবকে পোশাকের স্বাধীনতা বলে মেনে নিতে পারে না।—কিন্তু কেন?
তাদের এ বিষয়ে দুটো মত মোটাদাগে:
- হিজাব নিকাব জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
- হিজাব নিকাব নারীরা ইচ্ছেকৃত পরলেও সেগুলো মূলত ব্রেনওয়াশের জন্য।
অর্থাৎ ছোট থেকেই মুসলিম নারীদের এসব শেখানো হয়, বারবার বলা হয় ফলত তারা এসব শুনে শুনেই বড়ো হয় আর এটাকেই তারা তাদের জন্য নরমাল পোশাক মনে করে। তো তাদের মতে হিজাব নিকাব চয়েজ বা পোশাকের স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে না। হয় এটা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া, নাহয় ব্রেনওয়াশ। কেবল বিকিনি পরাই চয়েজ।
আমি কোন দ্বিধা ছাড়াই মেনে নিতে প্রস্তুত যে তাদের উপরোক্ত দুটো মতই সঠিক। তারা সত্যই বলেছে। আমরা জোর করে চাপিয়ে দিই। আর আমরা ব্রেনওয়াশও করি ছোট থেকে।
এগুলো মূলত কোন সমস্যা নয়। এগুলো কোন ভালো আরগুমেন্টও নয়। তাহলে সমস্যাটা আসলে কোথায়?—সমস্যাটা হলো মুক্তমনারা যেসব অভিযোগ আমাদের উপর করে, আসলে সেইসব কর্মকাণ্ড তারাও করে থাকে। কিন্তু তারা স্বীকার করে না। আইওয়াশ করে।
পর্দা করতে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন তাই আমরা আমাদের অধীনস্থদের জোর করি, আর সেটা স্বীকারও করি।
একইভাবে মুক্তমনারাও পর্দা খুলতে জোর করে, জরিমানা নির্ধারণ করে, পাবলিকলি মোক করে, অনলাইনে কটুক্তি করে। ইউরোপের তথাকথিত মুক্তমনা রাষ্ট্রগুলো আইন বানিয়ে পর্দাপ্রথা বন্ধ করেছে। জোর করে। জোর করে তারা গণতন্ত্র চাপায়, জোর করে হারাম খেতে বাধ্য করে। তাদের কথা না মানলে তারা অবরোধ লাগিয়ে লক্ষ লক্ষ শিশুর প্রাণ হত্যা করে। কমিউনিস্ট দেশে দাড়ি কাটতে, পর্দা খুলতে পুলিশ নিয়োগ করা হয়। উইঘুর মুসলিম। সবই হয় জোর করে। আর দোষ হয় কেবল আমাদের! এটা হলো আইওয়াশ।
সেকেন্ড পয়েন্ট ব্রেনওয়াশ, আমরা ছোট থেকেই আমাদের বাড়ির নারীদের পর্দাপ্রথার হুকুম, গুরুত্ব ও ফজিলত শোনাই আর এভাবেই ব্রেনওয়াশ করি। ঠিইইক। একদম সঠিক।
কিন্তু মুক্তমনারাও সেম কাজ করে। একটা মুক্তচিন্তক পুরুষ বা নারী তার কন্যা বা পুত্রকে ছোট থেকেই শিক্ষা দেয়—
“নারী-পুরুষ আলাদা কিছু না। তারা যেকোনো পোশাক পরতে পারে, যা খুশি করতে পারে, Her/His body Her/His choice, সমাজের মুল্যবোধ আসলে সেকেলে সেগুলো না মানলেও চলে, সম্মতি থাকলেই সেক্স করা যায় বিয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না, বিকিনি বা ব্রা প্যান্টি বাকি পোশাকগুলোর মতোই সুতরাং এগুলো পরতে কোন সমস্যায় নেই।”
এগুলোই তারা শেখে ছোট থেকে। তারা তাদের মা-কেও সেইসব পোশাকে দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এরপর রিলস, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামসহ প্রভৃতি সোশাল মিডিয়া ও বিভিন্ন টিভি প্রোগ্রামেও এইধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়। আর এগুলোই তারা শুনে শুনে বড়ো হয়। আর এগুলোকেই তারা সত্য বলে মনে করে।
এভাবেই তাদের ব্রেনওয়াশ করা হয়, আর তারা যখন এধরণের পোশাক পরে সমালোচনার শিকার হয় তখন তারা বলে ওঠে
“মাই বডি মাই চয়েজ”, “পোশাকের অধিকার” ইত্যাদি।
সুতরাং দেখায় যাচ্ছে জোর করে তারাও চাপিয়ে দেয়, আর তাদের বিকিনি পরা মোটেও চয়েজ না সেটা ব্রেনওয়াশের ফসল। কিন্তু তারা স্বীকার করবে না।




