‘বাংলাদেশ’ ও ‘বঙ্গ’ নাম কি ‘সনাতনীদের’ দেওয়া? – ফ্যাক্ট চেকিং এবং আসল উৎসের সন্ধানে

সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ অগ্নিবীর’ নামক একটি ফেইসবুক পেইজ থেকে পোস্ট করে দাবি করা হয় যে ‘বাংলাদেশ’ ও ‘বঙ্গ’ দুটিই ‘সনাতনীদের’ দেওয়া নাম। পেইজটির দাবি,
- ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় আরণ্যকে সর্বপ্রথম বঙ্গ শব্দটির ‘আবিষ্কার’ হয়। এ থেকে ভুয়া দাবি করা হয় বঙ্গ নামটি ‘সনাতনীদের’ দেওয়া।
- একইসাথে তিরুমালা মন্দিরের শিলালিপিতে “vangaladesa” = বাংলাদেশ শব্দ আসার ভুয়া দাবি করা হয়।
আমরা একে একে বোঝার চেষ্টা করবো এরকম দাবি করা কেমন যৌক্তিক। আমরা দুটি শব্দ নিয়ে একে একে কথা বলছি।
‘বঙ্গ’ কী?
‘বঙ্গ’ একটি জাতি (Tribe) এর নাম বলে ধারণা করেছেন তুলসীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়।[1]মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, তুলসীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৫১), অধ্যায়ঃ ধর্মমঙ্গল, পৃ ১৪৮ তিনি আরো বলেছেন,
“বঙ্গদেশ খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত সভ্যতার আলোক থেকে বঞ্চিত ছিল (?) এবং অনার্য অধ্যুষিত ছিল। ক্রমশ পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে হতে যাযাবর বঙ্গজাতি এখন যে স্থানকে পূর্ববঙ্গ বলা হয় সেখানে বাস করতে থাকে, তা থেকেই পূর্ববঙ্গের প্রাচীন নাম হয় ‘বঙ্গ’।”[2]মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, তুলসীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৫১), অধ্যায়ঃ ধর্মমঙ্গল, পৃ ১৪৯
অর্থাৎ, এই বঙ্গ নামটি বহু প্রাচীন। এমনকি আর্যদের প্রাচীন সাহিত্যেও অনার্যনিবাস ‘বঙ্গ’ নামটি রয়েছে। আর্য বলতে পারস্য থেকে আগত জাতিকে বোঝানো হচ্ছে। এই অঞ্চলে আর্য উপনিবেশ স্থাপন করার আগেই ‘বঙ্গ’ জাতিরা বসবাস করতো। (এ নিয়ে আরেকটা পোস্ট করবো ‘হিন্দু জাতির বঙ্গ ও বাঙ্গালী বিদ্বেষ’ শিরোনামে, সেখানে আরো ভালো করে পরিষ্কার হয়ে যাবে বিষয়টা)।
আসি ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় আরণ্যকের ব্যাপারে। এর আরণ্যক ২, অধ্যায় ১ এ ‘Vaṅgāvagadhas’ শব্দটি আসে। এর উচ্চারণঃ ‘বঙ্গাভগদস’, শব্দের সন্ধি ভাঙ্গলে বঙ্গ শব্দটি পাওয়া যায়।
এই শব্দ নিয়ে মতভেদ আছে, বেদের সবচেয়ে বিখ্যাত ভাষ্যকার সায়ণাচার্য মনে করেন এর অর্থ পাখি ও গাছ। আনন্দতীর্থ মনে করেন এই ‘বঙ্গ’ জাতি বলতে অসুর-পিশাচ-রাক্ষসদের বোঝানো হয়েছে। তবে তারা উভয়েই মধ্যযুগীয়।
আরথার বেরিয়েডাইল কেইথ ঐতরেয় আরণ্যকের সেই জায়গার ব্যাখ্যায় লিখেছেন, এটি দিয়ে কোন ট্রাইবকেও বোঝাতে পারে, আবার স্থানও বোঝাতে পারে।[3]Aitareya Aranyaka Tr. by Keith, Arthur Berriedale, Ed., page 200-201 বৌধায়ন ধর্মসূত্রে আবার ‘বঙ্গ’ স্থান বোঝানো হয়েছে। এটা আমরা পরবর্তী পোস্টে দেখবো।
অর্থাৎ, ডিবেটেবল হলেও বলা যায় বহুত আগে থেকেই ‘বঙ্গ’ স্থান ও ‘বঙ্গ’ জাতি পরিচিত ছিল। কিন্তু ক্লেইম করা যায় না যে ‘বঙ্গ’ নামটি আর্যরা দিয়েছে, বরং বলা যায় জানতো কিংবা পরিচিত ছিল। বঙ্গ শব্দের অরিজিনও সংস্কৃত কিনা তার টাটকা প্রমাণ নেই।
ড. সৈকত আসগর লিখেছেন,
‘বঙ্গ’ শব্দটি প্রাচীন ভারতীয় আর্য বা বৈদিক কিংবা সংস্কৃত বলে মনে হয় না । ‘বঙ্গ’ শব্দটি সম্ভবত অস্ট্রিক।[4]ভাষা আন্দোলন ও শহীদ রফিক, ডাঃ সৈকত আসগর, পৃ ৩৯, ছাপা ১৯৮৮, বাংলা একাডেমী
বঙ্গ নামটি প্রকৃতপক্ষে কীভাবে এলো সেই ইতিহাস অজানা। এতটুকুতেই সমাপ্ত করছি।
‘বাংলাদেশ’ শব্দ?
এবার আসি আরেকটি দাবি নিয়ে, রাজেন্দ্রের সময়ে নাকি ‘বাংলাদেশ’ শব্দ ছিল তিরুমালা মন্দিরের শিলালিপিতে। এটা বোঝার আগে প্রেক্ষাপট বুঝে নেই,
এ অঞ্চলে প্রথম আর্য রাজা রাজেন্দ্র ঢোল ১০২৪ সালে আক্রমণ করে উপনিবেশ স্থাপন করে। কিন্তু তার আগে থেকেই এখানে বঙ্গদেশের অস্তিত্ব ছিল। অন্ধ্রপ্রদেশের নালগোন্ডা/গুন্টুর জেলার কাছে কৃষ্ণা নদীর উপত্যকায় অবস্থিত নাগার্জুনকোণ্ডা শিলালিপিতে বঙ্গদেশের কথা উল্লেখিত আছে, যা ঈসায়ী তৃতীয় শতকের।[5]মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, তুলসীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৫১), অধ্যায়ঃ ধর্মমঙ্গল, পৃ ১৪৮ অর্থাৎ রাজেন্দ্রের ৮০০ বছর আগের।
আলোচ্য তিরুমালার সেই শিলালিপিতে যে শব্দটি পাওয়া গেছে সেটি মূলত ‘Vaṅgāladesam’ / ‘Vaṅgāladesa’। এটির উচ্চারণ ‘বঙ্গালদেশ’ (ব্ + অ + ঙ্ + গা + ল্ + অ + দে + শ্ + অ), কোনোভাবেই ‘বাংলাদেশ’ নয়। ল্যাটিন স্ক্রিপ্টে প্রকাশিত,
- ‘a’ এর উচ্চারণ ‘অ’
- ‘ā’ এর উচ্চারণ ‘আ’।
আর বর্তমান বাংলাদেশের সাথে এটার ভৌগলিক সম্পর্কও ক্ষীণ। বঙ্গালদেশের অবস্থান কোথায় ছিল, এটা বিতর্কিত। তবে মোটামুটি বেশিরভাগ ঐতিহাসিকের মতে বঙ্গালদেশ ছিল বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে, যশোর/খুলনার দিকে।[6]রমেশচন্দ্র মজুমদার (১৯৪৩), পৃ ১৯৬
বঙ্গ আর বঙ্গাল শব্দের মধ্যে সম্পর্ক আছে অবশ্যই, যেহেতু নামে প্রচুর মিল।[7]Ancient Bangladesh, A Study of the Archaeologcial Sources by Chakrabarti, Dilip K, Published in 1992, page 24 আবার বঙ্গ আর বঙ্গাল এক নাকি আলাদা জায়গা সেটা বিতর্কিত। ঐতিহাসিক এ কে এম ইয়াকুব আলি এই দুইটাকে আলাদা বলেছেন।[8]Y. Ali (1979). সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, দ্বাদশ শতাব্দীর অবলুর লিপিতে ‘বঙ্গ’ ও ‘বঙ্গাল’ আলাদা স্থান বলে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।[9]Epigraphia Indica, Vol.5, Page 257
তাই এটা বলা যায় যে, অন্তত দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বঙ্গ ও বঙ্গাল ছিল আলাদা জায়গা। হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।[10]Studies in Indian Antiquities, Chapter 30, Page 266 ঐতিহাসিক ব্লকম্যান গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, মুসলিম বিজেতা তুঘলুক শাহ (১৩২০ ঈসায়ীতে) সালে বঙ্গ ও বঙ্গাল একত্র করেন। সেই দেশের নাম তখন হয় ‘বঙ্গাল্’ / ‘বঙ্গালা’ / ‘বাঙ্গালা’। এই নতুন শব্দ নিয়ে কথা আছে অবশ্যই। সম্রাট আকবরের সমইয়ে আইন-ই-আকবরি গ্রন্থের লেখক আবুল ফজল (২.১২০) লিখেছেন, ‘বঙ্গ + আল্’ শব্দ দিয়ে ‘বঙ্গাল্’ শব্দ গঠিত হয়। এই ‘আল্/al’ আর সংস্কৃত ‘আল/ala’ আলাদা। এখানে ‘আল্’ ভৌগলিক, এ দেশে জমিতে আইল/আল দেওয়া হয়, সেখান থেকে এই আল্ প্রত্যয় এসেছে। এটা গ্রামাটিক্যাল না।
এই ‘বঙ্গাল্’ শব্দ থেকে বিকশিত হয়ে পরে ‘বাঙ্গালা’ শব্দটি আসে। এই নাম কীভাবে আসে তা নিয়ে আরো বিস্তারিত এবং পরিষ্কার আলোচনা করেছেন দীনেশচন্দ্র সরকার। তার লেখা ‘The Indian Historical Quarterly’-তে প্রকাশিত হয়েছিল।[11]The Indian Historical Quarterly, Volume XXIII, Issue I, March 1985, page 62 ফার্সি ভাষার ‘বজার/bazār’ বাঙ্গালী মুসলিমরা ‘বাজার/bāzār’ উচ্চারণ করে। প্রথম ‘অ’ এর বদলে ‘আ’। এই অভ্যাস থেকে বঙ্গাল/ ‘Vaṅgāl’ / ’Vaṅgāla’ হয়ে যায় ‘Bāṅgālah’ / বাঙ্গালাহ। আবার ফার্সি শেষের ‘হ’ বাংলা ভাষায় আসলে শেষের ‘হ’ উচ্চারণ হয় না। যেমনঃ খানাহ থেকে খানা। এ অঞ্চলের মুসলিমদের মুখে মুখে এই ফার্সি বাঙ্গালাহ হয়ে যায় শুধু বাঙ্গালা।
প্রসঙ্গত ফার্সি বর্ণে ‘Vā…’ নেই, স্বাভাবিকভাবেই ‘B’ ব্যবহৃত হয়, এবং উচ্চারণ কিছুটা হ্রস্ব হয়ে যায়। আগের উচ্চারণ ছিল ‘ভ’ ও ‘ব’ এর মাঝখানে, মনে করুন ‘ব্ব’। আরবি-ফার্সিতে শুধুমাত্র ‘ব্বি’ ও ‘ব্বু’ আছে।
তো এই ‘বাঙ্গালা’ শব্দ বহুল ব্যবহৃত হয়েছে বাংলা ভাষায়। আসতে আসতে এখান থেকে উচ্চারিত হতে হতে ‘বাঙলা’ শব্দ এসেছে, এটিও বহুল ব্যবহৃত, যাকে প্রমিত বানানে সংশোধন করে ‘বাংলা’ লেখা হয়েছে। আর ‘বাংলাদেশ’ শব্দ এসেছে এই নতুন ‘বাংলা’ শব্দের সাথে প্রচলিত বাংলা শব্দ ‘দেশ্’ যুক্ত করে, ১৯৬৯ সালে। এখান থেকে বলা যায় ‘সনাতনীরা’ বাংলাদেশ নাম দিয়েছিলো এ কথাটি বিভ্রান্তিকর। সিমিলার নাম আছে বটে, তবে সেই নামের উৎস-প্রয়োগ আলাদা। সেই প্রাচীন ‘বঙ্গাল’ দেশ থেকে অনেক বড় ছিল মুঘল আমলের ‘সুবাহ ই বাঙ্গালাহ’, তার খানিকটা নিয়ে আমাদের আজকের বাংলাদেশ।
এভাবে বলা যায়ঃ
- ধারা-১ঃ বঙ্গ/বং (অজানা ভাষার ধাতু) → বঙ্গ (সংস্কৃত) → বঙ্গাল (সংস্কৃত) → বঙ্গালদেশ (সংস্কৃত)
- ধারা-২ঃ বঙ্গ/বং (অজানা ভাষার ধাতু) → বঙ্গ (সংস্কৃত) → বঙ্গাল্ (প্রত্যয় মিশ্রিত, ফার্সি) → বাঙ্গালাহ্/বঙ্গালাহ্ (ফার্সি) → বাঙ্গালা/বাঙ্গলা (বাংলা) → বাঙ্লা (বাংলা) → বাংলা (বাংলা) → বাংলাদেশ্ (বাংলা)
বাংলা একাডেমীর মতে বাংলা শব্দটি ফার্সি ‘বঙ্গালাহ্’ থেকে এসেছে।[12]ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পরিমার্জিত সংস্করণ, ২০১১, পৃ ৮৪৬
আরেকটা কথা আলাদা করে উল্লেখ করছি, ‘বাঙ্গালী’ শব্দটাও ফারসি থেকে এসেছে। কাবুল→কাবুলী, বাঙ্গালা→বাঙ্গালী, এভাবে এসেছে।
জাযাকাল্লাহু খাইর।
Footnotes
| ⇧1, ⇧5 | মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, তুলসীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৫১), অধ্যায়ঃ ধর্মমঙ্গল, পৃ ১৪৮ |
|---|---|
| ⇧2 | মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, তুলসীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৫১), অধ্যায়ঃ ধর্মমঙ্গল, পৃ ১৪৯ |
| ⇧3 | Aitareya Aranyaka Tr. by Keith, Arthur Berriedale, Ed., page 200-201 |
| ⇧4 | ভাষা আন্দোলন ও শহীদ রফিক, ডাঃ সৈকত আসগর, পৃ ৩৯, ছাপা ১৯৮৮, বাংলা একাডেমী |
| ⇧6 | রমেশচন্দ্র মজুমদার (১৯৪৩), পৃ ১৯৬ |
| ⇧7 | Ancient Bangladesh, A Study of the Archaeologcial Sources by Chakrabarti, Dilip K, Published in 1992, page 24 |
| ⇧8 | Y. Ali (1979). |
| ⇧9 | Epigraphia Indica, Vol.5, Page 257 |
| ⇧10 | Studies in Indian Antiquities, Chapter 30, Page 266 |
| ⇧11 | The Indian Historical Quarterly, Volume XXIII, Issue I, March 1985, page 62 |
| ⇧12 | ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পরিমার্জিত সংস্করণ, ২০১১, পৃ ৮৪৬ |












