বাংলা ভাষার উপর ব্রাহ্মণ্যবাদী ঘৃণা-আক্রমণের সিলসিলা, পর্ব-১
বাংলা ভাষার প্রতি বহিরাগত বৈদিক আর্যদের ঘৃণা

ক
ব্রাহ্মণ্যবাদী সেনদের অত্যাচারের কারণে বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি হয় ব্যাপক। এই নিয়ে অধ্যাপক দেবেন্দ্রকুমার ঘোষ লিখেছেন,
“পাল বংশের পরে এতদ্দেশে সেন বংশের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চিন্তা অতিশয় ব্যাপক হইয়া ওঠে ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রবাহ বিশুষ্ক হইয়া পড়ে। সেন বংশের রাজারা সবাই ব্রাহ্মণ্যধর্মী, তাহাদের রাজত্বকালে বহু ব্রাহ্মণ বঙ্গদেশে আসিয়া বসতি স্থাপন করে ও অধিকাংশ প্রজাবৃন্দ তাহাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। এভাবে রাজ ও রাষ্ট্র উভয়ই বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরূপ হইলে বাংলার বৌদ্ধরা স্বদেশ ছাড়িয়া নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি পার্বত্য প্রদেশে গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করে। বাংগালার বৌদ্ধ সাধক কবিদের দ্বারা সদ্যজাত বাংগালা ভাষায় রচিত গ্রন্হগুলিও তাহাদের সঙ্গে বাংগালার বাহিরে চলিয়া যায়। তাই আদি যুগের বাংগালা গ্রন্হ নিতান্ত দুষ্প্রাপ্য”।[1]প্রাচীন বাংগালা সাহিত্যের প্রাঞ্জল ইতিহাস, অধ্যাপক দেবেন্দ্রকুমার ঘোষ, পৃষ্ঠা ৯-১০
“বাংলা দেশে পাল রাজাদের আমলে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়। বৌদ্ধ গান ও দোহাগুলি সেকালের বাংলা ভাষার নিদর্শন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পালদের পরে বাংলা দেশে সেন রাজারা রাজত্ব করেন। তাঁরা শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন না, হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থানে বিশ্বাসী ছিলেন। সেজন্যে বাংলা তাঁদের সংস্কৃতি ও চর্চার ভাষা ছিল না। দেবভাষা সংস্কৃতের মাধ্যমে তাঁরা রাজকার্য নির্বাহ করতেন। সংস্কৃত কবি জয়দেব লক্ষ্মণসেনের রাজসভার কবি ছিলেন।
সেন আমলে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনর্জাগরণের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। মুহম্মদ ইখতিয়ারুদ্দীন বখতিয়ার খিলজি ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে ১৭ জন অশ্বারোহী সৈন্য সমভিব্যাহারে লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত ক’রে বাংলার সিংহাসন দখল করে নেন। তার পরের শতাব্দীকাল বাংলা দেশে মুসলমানদের রাজ্য বিস্তার ও স্থিতি-শীলতার সংগ্রাম চলে।
এভাবে মুসলমান আমীর-ওমরাহ ও রাজা-বাদশারা রাজ্যের স্থিতি-শীলতা বিধান করার পর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি সাধনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। মুসলমানেরা সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর অধিকারী ছিলেন। তাছাড়া এদেশে আগমন করার পর মুসলমান সুলতানগণ এদেশের মাটিকে আপন ব’লে গ্রহণ ক’রে এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। সেজন্যে এদেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণের দিকেও তাঁদের সজাগ দৃষ্টি নিপতিত হয়। তার ফলে এদেশের মানুষের রচিত সাহিত্যেরও তাঁরা পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তখনকার দিনে বিজিত বাংলা দেশের অধিকাংশ অধিবাসীই ছিলেন হিন্দু এবং তাঁদের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। বিজিত বাঙালী হিন্দুর মুখের ভাষায় রচিত সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা তাঁরা না করলেও পারতেন। তাঁদের মাতৃভাষা ও নব প্রচলিত রাজভাষা ফারসীর সাহায্যেই দেশের যাবতীয় কাজকর্ম নির্বাহ করতে পারতেন। কিন্তু তা না ক’রে মুসলিম সুলতানেরা প্রধানতঃ হিন্দু রচিত বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করলেন।”[2]মুহাম্মদ আব্দুল হাই, ওয়াকিল আহমেদ লিখিত ‘সুলতান আমলে বাংলা সাহিত্য‘ বইয়ের ভূমিকা অংশ, প্রথম সংস্করণ, মাঘ ১৩৭৪
গ
“আগেই বলেছি, বাংলা ভাষার প্রতি সংস্কৃতাভিমানী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সামান্যতম শ্রদ্ধা ছিল না। শুধু কি ভাষা, ‘বাংলা দেশ’ ও ‘বাঙালী জাতি’র প্রতিও তাদের ঘৃণা সঞ্চিত ছিল। কান্যকুব্জ থেকে আদিশূর যখন এদেশে এলেন রাজক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে, তখন এদেশের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এবং বসবাসের যোগ্য করার জন্য স্বদেশ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণকে আনতে হয়েছিল। আবার একমাত্র তীর্থছাড়া বাংলা দেশে এলে প্রায়শ্চিত্তের নির্দেশ ছিল ‘বোধায়নধর্মসূত্রে’। অষ্টম শতকে রচিত ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ গ্রন্থে গৌড় ও পুণ্ডের অধিবাসীদের অসুর ভাষাভাষী বলা হয়েছে। ‘ঐতরেয়’ ব্রাহ্মণ গ্রন্থে এদেশবাসীর মনুষ্যত্ব হরণ করে নিয়ে বলা হয়েছে ‘পাখী’। কোথাও কেবল ‘পাপ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।”[3]সুলতান আমলে বাংলা সাহিত্য, পৃ ৭, ওয়াকিল আহমেদ (১৯৬৭)।
ঘ
হিন্দুধর্মে সংস্কৃত ভাষা ব্যাতীত অন্য ম্লেচ্ছ ভাষা যেমন বাংলা-ইংরেজি এসব শেখা নিষিদ্ধ।[4]বসিষ্ঠ ধর্মসূত্র ৬/৪১
হিন্দুদের কাছে ‘অসংস্কৃত’ মানেই ম্লেচ্ছভাষা।[5]বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস (১৯১৬), পৃ ১৫০৪
দেখবেন এজন্যই সাধারণ চলিত ভাষা যা বাংলাদেশের জনসাধারণ ব্যবহার করে, মুসলমান ব্যবহার করে, নিচুজাতের হিন্দুরা ব্যবহার করে, সে ভাষার প্রতি উঁচুজাতের দাদাবাবুদের কতো রাগ। তারা বাংলা ভাষাকে ফোর্ট উইলিয়িয়াম প্রজেক্টে ধর্ষণ করে সংস্কৃতায়িত বাংলা বানিয়েছে।
ঙ
ব্রিটিশ উপনিবেশিক ভারতের রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বাঙ্গালী মুসলমান যখন বাংলা ও উর্দুর পক্ষে ছিল, তখন তথাকথিত বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:
‘The only possible language for inter-provincial inter course is Hindi in India’. অর্থাৎ হিন্দী ছাড়া ভারতের আন্তঃপ্রাদেশিক সাধারণ ভাষা হওয়ার যোগ্য অন্য কোনো ভাষা নেই।[6]রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা ৭৮
চ
যে (সংস্কৃত ভিন্ন ভাষা যেমন বাংলা) ভাষায় ১৮ পুরাণ, ইতিহাস, রামায়ণ পাঠ করবে সে নরকে যাবে।
এই ছিলো বাংলা ও অন্যান্য ভাষার প্রতি ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মনোভাব।[7]সাহিত্য-সংহিতা (নব পর্য্যায়, পঞ্চম খন্ড), পৃ ১৩৬
Footnotes
| ⇧1 | প্রাচীন বাংগালা সাহিত্যের প্রাঞ্জল ইতিহাস, অধ্যাপক দেবেন্দ্রকুমার ঘোষ, পৃষ্ঠা ৯-১০ |
|---|---|
| ⇧2 | মুহাম্মদ আব্দুল হাই, ওয়াকিল আহমেদ লিখিত ‘সুলতান আমলে বাংলা সাহিত্য‘ বইয়ের ভূমিকা অংশ, প্রথম সংস্করণ, মাঘ ১৩৭৪ |
| ⇧3 | সুলতান আমলে বাংলা সাহিত্য, পৃ ৭, ওয়াকিল আহমেদ (১৯৬৭)। |
| ⇧4 | বসিষ্ঠ ধর্মসূত্র ৬/৪১ |
| ⇧5 | বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস (১৯১৬), পৃ ১৫০৪ |
| ⇧6 | রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা ৭৮ |
| ⇧7 | সাহিত্য-সংহিতা (নব পর্য্যায়, পঞ্চম খন্ড), পৃ ১৩৬ |








