অনাহারকে অস্ত্র বানিয়ে ইসরায়েল গাজায় জাতিগত নির্মূলকরণ এবং গণহত্যা চালাচ্ছে
ইসরায়েল লক্ষ লক্ষ গাজার মানুষকে অনাহারে ফেলে দিয়েছে। এটি নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের নৃশংসতা এবং ব্রিটিশরা ভারতে যে অনাহারের পরীক্ষা করেছিল, তার মতোই ভয়ানক।
ব্রিটিশ হাঙ্গার এক্সপেরিমেন্ট – ঐতিহাসিক নীলনকশা
২০০৬ সালে হামাস ফিলিস্তিনের নির্বাচনে জিতে যায়। তখন ইসরায়েল আর মধ্যপ্রাচ্যের চারটা গ্রুপ—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাতিসংঘ আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন—ফিলিস্তিনিদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়। এই অবরোধটা ইসরায়েলের ইচ্ছাকৃত চাল। উইকিলিকস থেকে বেরিয়ে আসা একটা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ম্যাসেজ বলে, এর উদ্দেশ্য ছিল গাজার অর্থনীতিকে ধসের কিনারায় নিয়ে যাওয়া, “to the brink of collapse”।
গোপনে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আমেরিকান কূটনীতিকদের বলেছিল, গাজার বিরুদ্ধে তাদের পুরো নিষেধাজ্ঞা পরিকল্পনায় তারা অর্থনীতিকে ধসের কিনারায় রাখতে চায়, কিন্তু পুরোপুরি ধসিয়ে না দিয়ে। ২০০৭ সালে অবরোধ শুরু হলে, ইসরায়েলি সরকার গাজায় অপুষ্টি রোধ করতে বা সৃষ্টি করতে কত দৈনিক ক্যালোরি দরকার, সেটা হিসাব করে।
জীবন বাঁচাতে গড়ে প্রতিদিন ২,১০০ কিলোক্যালোরি দরকার। ইসরায়েলের ‘রেড লাইন’ কাগজে তারা গাজার নিজস্ব খাদ্য উৎপাদনকে বিবেচনা করে প্রতি মানুষের জন্য ২,২৭৯ ক্যালোরি হিসাব করে। এমন হিসাবের ঔপনিবেশিক সমাজে রয়েছে দীর্ঘ কালো ইতিহাস।
১৮৭৬ সালে ডেকান মালভূমিতে ভয়ানক খরা আর ফসল নষ্ট হয়। তাতে দক্ষিণ ভারতে মহা দুর্ভিক্ষ দুই বছর ধরে চলে, উত্তর দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
সেই সময় ব্রিটিশ দুর্ভিক্ষের কমিশনার স্যার রিচার্ড টেম্পল মানুষের ওপর পরীক্ষা চালায়। স্বাস্থ্যবান লোকদের অনাহারে ফেলে, তারা “জীবন্ত কঙ্কাল” হয়ে যায়, কোনো ধরনের কাজই করতে পারে না।
ব্রিটিশরা রাজস্ব আয় বাড়াতে চেয়েছিল, তাই টেম্পল জীবন বাঁচানোর সর্বনিম্ন খাদ্য হিসাব করে— প্রায় ১,৬২৭ কিলোক্যালরি (মাদ্রাজ, ১৮৭৭)।
তবুও দুর্ভিক্ষে অতিরিক্ত ৮০ লক্ষ লোক মারা যায় বলে অনুমান।
২০০৮-২০০৯ সালে গাজায় ‘শোয়াহ’ (হলোকাস্ট)
গাজায় ইসরায়েল চেয়েছিল অর্থনীতিকে ধসের কিনারায় রাখতে, কিন্তু মানবিক সংকট না ঘটাতে।
নেতানিয়াহুর সরকার ফিলিস্তিনিদের “ডায়েটে” রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু অনাহারে মারা না যাওয়ার মতো।
২০০৮–২০০৯ সালের গাজা যুদ্ধে এই এলাকাটা “শোয়াহ” (হিব্রুতে হলোকস্ট এর অনুবাদ)-এর শিকার হয়, বলেছেন উপ-প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মাতান ভিলনাই।
ইসরায়েলিরা ভেবেছিল এতে গাজার লোকেরা হামাসের বিরুদ্ধে যাবে। ধারণা ছিল গাজাকে কয়েক দশক পিছনে ফেলে দেওয়া, বলেছেন তৎকালীন জেনারেল ইয়োভ গ্যালান্ট। ১৫ বছর পর তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ওয়ারেন্ট দেয়, যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে অনাহার, নাগরিকদের ওপর আক্রমণ, হত্যা, নির্যাতন আর অন্যান্য অমানবিক কাজের জন্য।
২০১৮ সালের মে মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সবাই মিলে রেজোলিউশন ২৪১৭ পাস করে। এতে যুদ্ধে নাগরিকদের অনাহারে ফেলা আর মানবিক সাহায্য না দেওয়াকে নিন্দা করা হয়।
কিন্তু গাজা যুদ্ধে এই রেজোলিউশনের বেশিরভাগ নিয়ম ভাঙা হয়েছে। এতে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা আর যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমের সহযোগিতার পথ খুলে যায়।
নাৎসিদের গণ-অনাহার থেকে ইসরায়েলি জেনারেলদের পরিকল্পনা
ইতিহাস দেখলে, গাজার ২.৩ মিলিয়ন ফিলিস্তিনি শরণার্থীর ওপর ইসরায়েলের পুরো অবরোধ ইউনিক কিছু না। এটি লেনিনগ্রাদ অবরোধের মতো, যেখানে ৩.১ মিলিয়ন মানুষ ছিল।
নাৎসিদের ‘হাঙ্গারপ্ল্যান’ এর অংশ ছিল এসএস নেতা হার্বার্ট ব্যাকে। উদ্দেশ্য ছিল ৩১ থেকে ৪৫ মিলিয়ন সোভিয়েত আর পূর্ব ইউরোপীয়দের অনাহারে মারা, খাদ্য চুরি করে জার্মান সেনাদের দেওয়া।
আমেরিকান ইউজেনিক্স আর শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদের সাথে, হিটলারের জার্মানিতে অনাহার নীতির অনুপ্রেরণা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেটিভ আমেরিকানদের প্রতি আচরণ।
১৯১৪–১৯ সালে ব্রিটিশরা জার্মানির ওপর অবরোধ চাপিয়ে অনাহারের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের শক্তি শেখায়। উদ্দেশ্য ছিল পণ্য আমদানি বন্ধ করে জার্মানদের অনাহারে আত্মসমর্পণ করানো।
গাজায় ইসরায়েলের ‘জেনারেলস প্ল্যান’ ছিল খাদ্য বন্ধ আর মহামারী ছড়ানো। আন্তর্জাতিক বিরোধিতায় পুরোটা করা যায়নি। কিন্তু আংশিক করাতেই ২০২৪ অক্টোবরে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়। জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তারা উত্তর গাজাকে “অ্যাপোক্যালিপটিক” বলে চিহ্নিত করে, কারন সবাই রোগ, দুর্ভিক্ষ আর সহিংসতায় মৃত্যুর ঝুঁকিতে।
ভয়ানক সাদৃশ্য
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ইসরায়েলকে ৩০ দিনের আলটিমেটাম দেন—আরও সাহায্য ট্রাক গাজায় পাঠাতে। জাতিসংঘ বলে, নভেম্বরের শুরুতে ইসরায়েল সেটা মানেনি। কিন্তু বাইডেন প্রশাসন কিছু করে না, ব্লিঙ্কেন চোখ ফিরিয়ে রাখেন।
গাজায় খাদ্যের একটা বিস্তারিত স্টাডি দেখায়, ২০২৩ অক্টোবর থেকে ২০২৪ এপ্রিল পর্যন্ত খাদ্য ট্রাক যুদ্ধ-পূর্বের চেয়ে কম। কিন্তু গাজার অবস্থা আগের ঘটনাগুলোর চেয়ে কতটা খারাপ?
রাফায়েল লেমকিন তার ১৯৪৪ সালের বইয়ে সতর্ক করেন, দখলকৃত দেশে ইহুদিরা নির্মূল হচ্ছে—দুর্বলতা আর অনাহার দিয়ে, কারণ তাদের খাদ্য কম দেওয়া হয়; আর গেটোতে গণহত্যা দিয়ে।
লেমকিন ১৯৪৩ সালের যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্ট থেকে তথ্য নেন—ইহুদিরা স্বাভাবিক ক্যালোরির দশমাংশ পেয়েছে, যা আট দশক পর গাজার অনেক ফিলিস্তিনির মতো।

জাতিগত নির্মূল আর গণহত্যার প্রস্তুতি
ইতিহাসে দেখা যায়, অনাহারকে অস্ত্র বানানো সাম্রাজ্যবাদ আর ঔপনিবেশিক কাজের সাথে যুক্ত। এটি গণহত্যার পথ খুলে দেয়।
এমনকি নাৎসি ক্যাম্পগুলো ঔপনিবেশিক ক্যাম্প থেকে এসেছে বলে ট্রেইস করা যায়, যেমন ১৮৯৯–১৯০২ সালের বোয়ার যুদ্ধে ব্রিটিশ ক্যাম্প, তারপর জার্মানদের হেরেরো-নামাকুয়া গণহত্যা (১৯০৪–১৯০৮)।
ব্রিটিশ কলোনিয়াল ভারত থেকে নামিবিয়া পর্যন্ত, দুর্ভিক্ষ অনাহার চূড়ান্ত গণহত্যার শুরু। লেমকিন বলেন, গণহত্যার সবচেয়ে সরাসরি উপায় হলো হত্যা—ধীরে ধীরে অনাহার দিয়ে কিংবা গ্যাস চেম্বারে দ্রুত।
নাৎসি যুগে গণ-অনাহার আর গণহত্যা নতুন স্তরে পৌঁছায়—শিল্পায়িত অত্যাচার, দক্ষ হত্যা আর বিজ্ঞানের সাহায্যে।
পশ্চিমে ক্যাম্প আর অনাহার আধুনিকতার সাথে জড়িয়ে যায়। এগুলো তুলনা করার একটা সাধারণ উপায় হলো ক্যালোরি হিসাব।
কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে গাজায় ক্যালোরি গ্রহণের হার কেমন?
১৯৪১ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত লেনিনগ্রাদ অবরোধ ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। জার্মানরা খাদ্য বন্ধ করলে ২.৪ মিলিয়নের অর্ধেক মারা যায়, বেশিরভাগ অনাহারে। ‘হাঙ্গার উইন্টার’ এ গড়ে ৩০০ ক্যালোরি দেওয়া হতো।
ওয়ারশা গেটোতে ১৯৪২ সালে নাৎসিরা বন্দীদের জন্য ১৮০ ক্যালোরি অনুমোদন করে।
লেমকিন বলেন, অনাহার জাতিগত নির্মূলের সাথে সংযুক্ত—লোক সরিয়ে দখলকারীর লোক বসানো।
গাজায়? ২০২৩ অক্টোবর থেকে খাদ্য সরবরাহে গড়ে ৮৬০ kCal, নাৎসি ক্যাম্পের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ কম।
জার্মান আক্রমণ ব্যর্থ হলে নাৎসি ক্যাম্পে ১৯৪৪ সালে ৭০০ kCal হয়। এটি ২০২৪-এর প্রথমার্ধে উত্তর গাজার ২৪৫ kCal এর তিনগুণ। তখন নিউ ইয়র্ক পোস্ট পত্রিকা প্রচার করছিলো গাজায় দুর্ভিক্ষ নেই (!) বলে।
(এটা ড. ড্যান স্টেইনবকের নতুন বই ‘দি অবলিটারেশন ডকট্রিন‘ থেকে নেওয়া।)
উৎস: টিআরটি ওয়ার্ল্ড, https://trt.global/world/article/d9b26bd5d45b


