ফিলিস্তিন

ইসরায়েলি কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ

আল-জাজিরার ডকুমেন্টারি

“সেখানে কোনো দয়া ছিল না। আমরা যা দেখেছিলাম, পুরো দুনিয়ার কেউ তা দেখেনি।”

দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল; পবিত্র রমজান মাস শেষে আনন্দের দিন, ঈদুল ফিতর। কিন্তু গাজা উপত্যকার সরকারি কর্মকর্তা মুহাম্মদ আল-বাকরির জন্য সেটি ছিল এক দুঃসহ অধ্যায়। এর ঠিক এক মাস আগে ইসরায়েলি সেনারা তাকে গ্রেপ্তার করে। তারপর থেকে প্রতিনিয়ত তার ওপর চলেছে অমানবিক মারধর ও নির্যাতন। হাত-পা বেঁধে রাখা হতো এমনভাবে, যাতে তিনি টয়লেটেও যেতে না পারেন।

ঈদের দিন ইসরায়েলি সেনা ও তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিংস্র কুকুরগুলো তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। আল-বাকরি সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, “আমার ডান পাশে ছয়জন আর বাম পাশে ছয়জন সেনা দাঁড়িয়ে ছিল। তারা নাম জিজ্ঞেস করত। আমি ‘মুহাম্মদ’ বললেই তারা বলত, ‘না, বল তোর নাম বিচ।’”

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই কর্মকর্তা জানান, সে সময় তাকে সহ আরও সাতজন বন্দিকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে, চোখে পট্টি ও হাতে হাতকড়া বেঁধে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, “কাপড় কেড়ে নেওয়ার পর আমাদেরকে ধর্ষণ করা হয়। আমরা চিৎকার করে আল্লাহকে ডাকছিলাম আর তারা হাসাহাসি করছিল এবং ভিডিও চিত্র ধারণ করছিল।”

ইসরায়েলি কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ
মুহাম্মদ জাকি আল বাকরি। ছবি: আল-জাজিরা

আল-বাকরি আরও জানান যে বন্দিদের ওপর এই যৌন নিপীড়নে কুকুর ব্যবহার করা হতো, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও নিশ্চিত করেছে। তিনি বলেন, “অফিসারদের নির্দেশে কুকুরগুলোকে আমাদের ওপর লেলিয়ে দেওয়া হতো।”

তিনি যোগ করেন, “তাদের মনে কোনো দয়া ছিল না। প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট ধরে আমাদের ওপর এই ভয়াবহ যৌন নির্যাতন ও মারধর চলে। এরপর তারা আমাদের কাপড় পরার নির্দেশ দেয় এবং আবার বন্দিশালায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।”

ফিলিস্তিনি বন্দীদেরকে ধর্ষণ-বলাৎকার 

আল-বাকরির মতো এমন আরও অনেক সাবেক বন্দি আল জাজিরার অনুসন্ধানমূলক তথ্যচিত্র বডিজ অব এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন-এ তাদের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর বিচারক, জাতিসংঘ এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের জন্য জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা অ্যালবানিজ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

এছাড়া প্যালেস্টাইনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস এবং ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর-এর মতো অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলোও বন্দিদের ওপর কুকুর লেলিয়ে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনার প্রমাণ নথিবদ্ধ করেছে।

ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর এমন যৌন নির্যাতনের অভিযোগ কিন্তু নতুন নয়, এটি বহু দশক ধরে চলে আসছে। তবে বিগত বছরগুলোতে ধর্ষণের এই পাশবিকতাকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা আল জাজিরার তদন্ত এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

ইসরায়েলি কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ
ইসরায়েলি কারাগারে আল-বাকরি। ছবি: আল-জাজিরা

২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েল নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যৌন, প্রজননগত এবং অন্যান্য লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ধারাবাহিকতায়, গত মে মাসে ইসরায়েলকে যুদ্ধাঞ্চলে যৌন সহিংসতায় জড়িত দেশগুলোর তালিকায় তথা জাতিসংঘের ব্ল্যাকলিস্টভুক্ত করা হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেম এবং পিসিএইচআর ফিলিস্তিনি বন্দিদের দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে এই ব্যাপক যৌন সহিংসতার সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করেছে। উল্লেখ্য, এই বন্দিদের বড় একটি অংশকে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই ইসরায়েলের “প্রশাসনিক আটক” ব্যবস্থার অধীনে বন্দি রাখা হয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের ওপর এমন যৌন নির্যাতনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো ইসরায়েলি সেনা বা কারারক্ষী দণ্ডিত হয়নি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে নেগেভ মরুভূমির “সদে তেইমান” বন্দিশালায় এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে ধর্ষণের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর ইসরায়েল প্রশাসন ১০ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে আটক করেছিল। তবে সে সময় উগ্র ডানপন্থী বিক্ষোভকারী এবং আইনপ্রণেতাদের একটি দল অভিযুক্ত রক্ষীদের মুক্ত করার উদ্দেশ্যে তাদের আটকে রাখার ঘাঁটিতে হামলা চালানোর চেষ্টা করে।

পরবর্তীতে গত জুলাই মাসে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ওই রক্ষীদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। উল্টো, ধর্ষণের সেই ভিডিওটি ফাঁস করার অভিযোগে মেজর জেনারেল ইফাত তোমের-ইয়েরুশালমি নামক এক নারী কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলি সেনাদের ধর্ষণের ফুটেজ প্রকাশ করার এই ঘটনাকে দেশের প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে মারাত্মক “জনসংযোগ বিপর্যয়” বলে অভিহিত করেন।

ইসরায়েলি কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে ধর্ষণের অভিযোগে তদন্ত করতে ইসরায়েলি সামরিক পুলিশ সদে তেইমান আটক কেন্দ্রে আসে। এর প্রতিবাদে সেখানে ডানপন্থী বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়। ছবি: জিল গ্র্যালো/রয়টার্স

জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা অ্যালবানিজ বলেন যে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর এই যৌন নির্যাতনের পেছনের উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট; এটি কেবল শারীরিক যন্ত্রণা দেওয়া নয়, বরং ভুক্তভোগীর আত্মসম্মানবোধ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া। ধর্ষণের শিকার দুই ফিলিস্তিনির সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “এর গভীরে আরও একটি বিষয় কাজ করে। যেকোনো ধরনের নির্যাতন—বিশেষ করে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন মানুষের মনস্তত্ত্বকে এমনভাবে ভেঙে চূর্ণ করে দেয় যে পরবর্তীতে তার পক্ষে স্বাভাবিক জীবন ও নিজস্ব অন্তরঙ্গতা ফিরে পাওয়া বা উপভোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।”

এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ আলোচনা চলাকালীন বন্দিদের ধর্ষণ করা বৈধ কি না এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সদস্য হ্যানোক মিলউইডস্কি চিৎকার করে বলেছিলেন, “হ্যাঁ, এটি বৈধ। সে যদি কোনো ‘নুখবা’ (হামাস যোদ্ধা) হয়ে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে যেকোনো কিছু করা বৈধ—সবকিছুই।”

গণহত্যা এবং ধর্ষণ থেকে বেঁচে ফেরা

জব নামের একজন দিনমজুর কখনো ভাবেননি যে তার জীবন পুরোপুরি ভেঙেচুড়ে যেতে পারে।

আল-বাকরির মতোই, জবও মনে করতেন তিনি গাজার একজন সাধারণ মধ্যবয়সী পারিবারিক মানুষ। দুজনেই নিজেদের চেয়ে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে দুজনেই তাদের পরিবারের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। অবরুদ্ধ এই উপত্যকার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠা তল্লাশিচৌকি, বোমাবর্ষণ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মধ্য দিয়ে নিজ নিজ পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুজনেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন।

কিন্তু সেই পরিস্থিতি বদলে যায় যখন দুজনকে বন্দি করা হয় এবং ইসরায়েলি সৈন্য ও প্রহরী কুকুর দ্বারা বারবার নির্যাতন ও বলাৎকার করা হয়।

আল-বাকরির মতোই, জবেরও তার লাৎকারের শিকার হওয়ার স্মৃতি সমানভাবে স্পষ্ট। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “নারী সৈন্যরা আমার রুমে প্রবেশ করেছিল। তারা আমার হাত দুটি পিছন মোড়া করে লোহার হাতকড়া পরিয়ে দেয়। তারা আমার পায়ের বাঁধন খুলে সেখানে আরও হাতকড়া লাগিয়ে দেয়। তারপর তারা আমার গায়ের সব কাপড় খুলে ফেলে।”

ইসরায়েলি কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ
জব। ছবি: আল-জাজিরা

তাকে পিঠ ও ঘাড়ে বুট জুতো দিয়ে চেপে ধরে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছিল, আর সেই সময় নারী সৈন্যরা কৃত্রিম বস্তু ব্যবহার করে তাকে বলাৎকার করে। জব বলেন, “তাদের চারপাশের সৈন্যরা হাততালি দিচ্ছিল এবং সেই দৃশ্যের ভিডিও করছিল। তারা ধর্ষণের দৃশ্যটির ভিডিও ধারণ করছিল।”

হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান আছে কি না তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি জবের ওপর এই যৌন নির্যাতন চলতে থাকে, অথচ যে হামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।

আক্রোশ

বন্দিদশার ভয়াবহ স্মৃতি স্মরণ করে ‘জব’ জানান, তাকে চোখ বেঁধে অমানবিক নির্যাতন করা হয়, বুট দিয়ে মাড়ানো হয় এবং বেধড়ক মারধর করা হয়। ৭ অক্টোবরের ঘটনার সাথে তার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও পুরোটা সময় জুড়ে তাকে ওই বিষয়েই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল।

তিনি স্মরণ করে বলেন, “তারা আমাদের বলছিল-তোমরা তো সৃষ্টিকর্তা এবং কুরআনের আয়াত জানো যে চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত। যেমন কর্ম, তেমন ফল।” ইসরায়েলি সৈন্যরা তাকে বলত, “তোমরা আমাদের ভূমিতে, ইসরায়েলি ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করেছ এবং আক্রমণ চালিয়েছ। তোমরা ধর্ষণ করেছ এবং তোমরা এটা করেছ, ওটা করেছ।”

বন্দিশালায় আল-বাকরির নামের বদলে একটি নম্বর দেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, অন্য কোনোভাবে নিজের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেই তাকে অকথ্য মারধর করা হতো। তিনি স্মরণ করে বলেন, তাকে বলা হয়েছিল, “তুমি এখানে একজন যুদ্ধবন্দি হিসেবে আছ। তোমরা যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছ, তার কারণেই আজ তুমি এখানে।”

Read More...  ঢাকা পতন ও ইসরায়েল - পর্ব ৩
ইসরায়েলি কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ
ইসরায়েলি সৈন্যদের দ্বারা গ্রেপ্তার হওয়া এবং কয়েকদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হওয়া ফিলিস্তিনি পুরুষদের মধ্যে একজনের ছবি। তাকে যে নম্বরটি দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল তা দেখাচ্ছেন এবং হাতকড়ার কারণে তার হাত ফুলে গেছে ছবি: আবদেলহাকিম আবু রিয়াশ/আল জাজিরা

আল-বাকরি বলেন যে বলাৎকারের পাশাপাশি তার এবং অন্যান্য বন্দিদের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হতো। এছাড়াও তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বা বিভ্রান্ত করার জন্য সাউন্ড বোমা নিক্ষেপ করা হতো। তিনি বলেন, “হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় আপনাকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে হবে; আর ঠিক সেই মুহূর্তে তারা আপনার শরীরের ওপর দিয়ে কুকুর হাঁটিয়ে নিয়ে যাবে এবং লাথি মারবে।”

জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ আল জাজিরাকে বলেন, ৭ অক্টোবরের পর থেকে ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাথে দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের এমন বিবরণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “নৃশংসতা এখন নজিরবিহীন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। এটি পুরোপুরি প্রতিশোধমূলক হয়ে উঠেছে।”

তিনি আরও বলেন, “প্রচণ্ড মারধর, চড়-থাপ্পড়, পুড়িয়ে দেওয়া, হাড় ও দাঁত ভেঙে দেওয়া, যৌন সহিংসতা এবং ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো তাদের নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন বস্তু দিয়ে যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে। বারবার যে জিনিসগুলো ব্যবহার করে এই নির্যাতন চালানো হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে ধাতব রড, ছুরি জাতীয় ধারালো বস্তু, মেটাল ডিটেক্টর এবং বোতল।”

ডিহিউম্যানাইজেশন

ফিলিস্তিনি বন্দিদের নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত বহু ইসরায়েলি সৈন্য এমন এক সমাজে বেড়ে উঠেছে, যা তাদের ফিলিস্তিনিদের মানবীয় মর্যাদার অযোগ্য হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত করে তুলেছে বলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরের পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

বি’তসেলেম এবং ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরায়েল-এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো উল্লেখ করেছে যে, কীভাবে বহু ইসরায়েলি তাদের পুরো জীবন কোনো ফিলিস্তিনির মুখোমুখি না হয়েই কাটিয়ে দেয়। মূলত রাষ্ট্রীয় নীতির কারণেই ফিলিস্তিনিদের একটি পৃথক শিক্ষাব্যবস্থায় পড়তে বাধ্য করা হয়।

সমাজবিজ্ঞানী ইহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি বলেন যে ফিলিস্তিনিদের একটি স্বীকৃত জাতিসত্তার বাইরে বিবেচনা করার মানসিকতা ইসরায়েলি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। এই ধারাটি বর্তমান থেকে শুরু করে অতীতে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। তৎকালীন কর্মকর্তারা এই অঞ্চলটিকে জনহীন এক ভূমি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আর আজ বর্তমান সময়ে এসে দৃশ্যত কোনো শাস্তি বা জবাবদিহিতা ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন করা সম্ভব হচ্ছে।

জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ আল জাজিরাকে বলেন, “সমগ্র জনগোষ্ঠীকে ‘মানুষরূপী পশু’ ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করে এবং গণহত্যাকে জায়েজ করতে ‘মানব ঢাল’ ব্যবহারের অজুহাত তুলে ধরে ইসরায়েল মূলত পুরো বেসামরিক জনসংখ্যাকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।” তিনি আরও বলেন, “এমনকি যে শিশুদের ‘ভবিষ্যতের সন্ত্রাসী’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তারাও আসন্ন মৃত্যুর এক চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।”

ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ৭ অক্টোবরের হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার জন্য সমস্ত ফিলিস্তিনিকে “দ্ব্যর্থহীনভাবে” দায়ী করতে কোনো দ্বিধা করেননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন: “সেখানকার পুরো একটি জাতি এই ঘটনার জন্য দায়ী। বেসামরিক নাগরিকরা কিছু জানত না বা তারা এর সাথে জড়িত নয়, এমন দাবি সত্য নয়। এটি একেবারেই মিথ্যা।”

সেই হামলার পরপরই তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট মন্তব্য করেছিলেন যে, ইসরায়েল “মানুষরূপী পশুদের” বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং তিনি সেখানকার পুরুষ, নারী ও শিশুদের ওপর “পূর্ণাঙ্গ অবরোধের” নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো ব্যক্তিরা নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনিদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কিংবা ফিলিস্তিনি সমাজের বড় একটি অংশকে ঢালাওভাবে অপরাধী বা চরমপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, বিশেষ করে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের ক্ষেত্রে।

ইসরায়েলি কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ
জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ-এর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের অমানুষিক হিসেবে প্রতিপন্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। ছবি: গিল কোহেন-মাগেন/এএফপি

আলবানিজ বলেন, “গণহত্যা কিংবা যেকোনো ধরণের যৌথ শাস্তি ও নির্যাতনের মতো অপকর্মে মানুষকে অমানুষ হিসেবে উপস্থাপন করার ভাষা বা ডিহিউম্যানাইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ, কাউকে ‘মানুষের চেয়ে নিচু স্তরের জীব’ বা ‘উপ-মানব’ হিসেবে বিবেচনা না করলে, তার সাথে তেমন অমানবিক আচরণ করা অসম্ভব।”

বিচারহীনতা

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের একটি স্থায়ী ও প্রতিষ্ঠিত রূপ বিদ্যমান রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা বর্ণনা করলেও, গাজা বা অধিকৃত পশ্চিম তীরে এসব কর্মকাণ্ডের জন্য ইসরায়েলকে এখনও কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে আইনি নিন্দা বা নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়নি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে জাতিসংঘের উদ্যোগসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমস্ত প্রচেষ্টাকে ইসরায়েল সরাসরি প্রতিহত করেছে।

জাতিসংঘের তদন্তে দেখা গেছে—জোরপূর্বক নগ্ন করা, ধর্ষণের হুমকি দেওয়া থেকে শুরু করে যৌনাঙ্গ লক্ষ্য করে আঘাত করার মতো সুনির্দিষ্ট নির্যাতনগুলো ইসরায়েলি বাহিনীর একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে, যা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদনেই করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বেন-গভির সদে তেইমান বন্দিশালায় ধর্ষণের ঘটনার তদন্তকে “লজ্জাজনক” বলে নিন্দা করেছেন। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ধর্ষণের জন্য সৈন্যদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার চেষ্টাকে “ব্লাড লাইবেল” (গুরুতর মিথ্যা অপবাদ) হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আলবানিজ মন্তব্য করেছেন যে, ইসরায়েলে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনকে এক ধরণের গৌরব হিসেবে দেখা হয়। তিনি বলেন, “কেবল ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও নেতারাই ফিলিস্তিনিদের সাথে কতটা নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে তা নিয়ে অহংকার করছেন না… বরং বসতিস্থাপনকারী (সেটলার) এবং সাধারণ নাগরিকদেরও বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো এই অবমাননাকর পরিস্থিতি সচক্ষে দেখতে পারে, উপভোগ করতে পারে, এমনকি নিজেরাও তাতে অংশ নিতে পারে।”

লিভারপুল জন মুরেরস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) গাজার ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনি দলের সদস্য ত্রিয়েস্তিনো মারিনিয়েলো আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে যৌন সহিংসতার বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত উপায়ে সংঘটিত সহিংসতার মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।”

তিনি বলেন, “পূর্বেরটি (বিচ্ছিন্ন ঘটনা) যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু যখন এই একই কাজগুলো সুসংগঠিত এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল হয়ে দাঁড়ায়।” মারিনিয়েলো আরও যোগ করেন, “এই অপরাধগুলো ঘটছে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক বন্দিশালায়। অপরাধীদের বিচার, অভিযুক্ত বা দণ্ডিত না করার বিষয়টিই প্রমাণ করে যে এই অপরাধ সংঘটনের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নীতি কাজ করছে।”

ইসরায়েলি কারাগারে কুকুর দিয়ে ধর্ষণ
ইসরায়েলি কারাগারে কিছু ফিলিস্তিনি বন্দীদের প্রাথমিক অবস্থান

তবে ফিলিস্তিনিরা এখনো প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে আলবানিজ বলেন, “ফিলিস্তিনিরা এখনো লড়াই করে যাচ্ছে যেন তারা পৃথিবী থেকে মুছে না যায়, যেন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসম্পন্ন একটি জাতি হিসেবে তারা বিলুপ্ত হয়ে না পড়ে।” কিন্তু অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের মতে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ইসরায়েলের ওপর আরোপিত কেবল “কাগুজে যুদ্ধবিরতি”কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা অব্যাহত রয়েছে।

ইসরায়েল এখন অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়া তীব্র গতিতে চালাচ্ছে। ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সেখানকার ভূমির মালিক ও কৃষকদের যেকোনো প্রতিরোধকে সাধারণত সহিংসতা, কারাদণ্ড এবং প্রায়শই নির্যাতন ও ধর্ষণের মাধ্যমে দমন করা হচ্ছে।

আলবানিজ বলেন, “সাধারণভাবে যেকোনো যৌন সহিংসতা ও নির্যাতন, বিশেষ করে ধর্ষণের ধাক্কা কাটিয়ে বেঁচে থাকাটাই অত্যন্ত নৃশংস এক অভিজ্ঞতা। এখন ভাবুন, যখন এটি কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিতভাবে এবং ব্যাপক আকারে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তার অর্থ হলো-মূলত সেই জাতিটিকেই চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া।”

মন্তব্য

এতক্ষণ যেই বীভৎস ঘটনাগুলোর কথা শুনলেন, তা মূলত আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা কি শুধু এই প্রতিবেদনের দাবি বা তথ্যগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ? এই পাশবিক ও সিস্টেমেটিক সহিংসতার পেছনে কি শুধুই ইসরায়েল দায়ী নাকি সাপের মাথা হিসেবে ভূমিকা রাখছে যুক্তরাষ্ট্র? অধিকারের সংজ্ঞা কি গাজায় এলে বদলে যায়?

৭ অক্টোবরের হামলাকে দায়ী করা কি শুধুই যুক্তি নাকি অজুহাত? ২০২৩ এর অক্টোবরের আগে কি গাজার মানুষ সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতো? হামাস না থাকলে কি গাজায় পরিপূর্ণ শান্তি ফেরত আসবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের মাঝেই পুরো প্রতিবেদনটির প্রেক্ষাপট, ভবিষ্যৎ চিত্র এবং উম্মাহর করণীয় লুকিয়ে আছে। একেকটা প্রশ্নের উত্তর একেকটা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ!

আল জাজিরার ডকুমেন্টারি: ‘They used dogs’: New Al Jazeera film exposes Israel’s use of rape in jails

Citation is loading...
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button