মুহাম্মদ (স.) কে মুশরিক বলেছে এক ইসলামবিরোধী
হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা তাহরিম, আয়াত ১]ইসলামবিরোধীর দাবি, এখানে নবী শিরক করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। তিনি স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় হালালকে হারাম করছেন! এটার উত্তর কি হবে?
আপনার প্রশ্ন মুলত হালালকে হারাম করা ও হারামকে হালাল করার মাসআলা সংক্রান্ত৷ এটি তাওহিদুল হাকিমিয়্যার সাথে সংশ্লিষ্ট, (এই পরিভাষা যদিও আমাদের আসলাফদের থেকে বর্ণিত নয় তবুও গুরুত্ব বুঝানোর স্বার্থে বললাম)। কেউ যদি আল্লাহর হালাল করা কোন কিছুকে হারাম করে, বা হারাম করা কোন কিছুকে হালাল করে তাহলে তা শিরক হিসেবে গন্য হয়।
এই সেন্স থেকে প্রশ্নটি এসেছে যে রাসুল কি আল্লাহর সাথে তাওহিদুল হাকিমিয়্যায় শিরক করলেন কিনা। এখন আপনার প্রশ্নের উত্তর ২/৩ ভাবে দেওয়া যায়।
(আলোচনা খুব বেশি বড় হয়ে যাবে বিধায় আমি রেফারেন্স না টেনেই আলাপ করছি, রেফারেন্স লাগলে জানাবেন, ইনশাআল্লাহ সবগুলো কথার রেফারেন্স দেওয়া যাবে)
১। আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট
আপনি যে আয়াত ও ঘটনাগুলো দ্বারা দলিল দিবেন হালালকে হারাম করা ও হারামকে হালাল করা সংক্রান্ত তা মোটামুটি এইগুলো,
- সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩১, তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৯৫, সনদ হাসান।
- সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ২৯
- সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৯
- সূরা আল মায়িদা, আয়াত ৮৭
আর আপনার উক্ত আয়াতটি হল,
- সুরা তাহরিম, আয়াত ১
এখানে সুরা তাহরিম ৭-৮ হিজরিতে নাজিল হয়েছে। আর সুরা ইউনুস এর আয়াতটি ছাড়া বাকিগুলো সুরা তাহরিমের পরে নাজিল হওয়া আয়াত। সেহেতু সেই আয়াতগুলো রাসুলের উপর অ্যাপ্লিকেবল ছিল না তখন, কারণ পরবর্তীতে নাজিল হওয়া আয়াতের ভিত্তিতে আয়াত নাজিল হওয়ার পুর্বে কৃত কোন কর্মের উপর বিধান আরোপ করা নিশ্চয়ই যৌক্তিক কোন ফিকহি পদ্ধতি নয়।
আর সুরা ইউনুসে আহলে কিতাবদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে, তারা যে আসমানী কিতাব ছেড়ে মনগড়া ভাবে হালাল হারাম এর আইন বানাচ্ছে সেটার দলিল কি?
এই আয়াতে উক্ত কাজ কুফর বা শিরক এমন কিছু সুস্পষ্ট ফুটে উঠে নি, এছাড়া আল্লাহর রাসুল তাদের মত নিজের স্বার্থে নফসের অনুসরণ করে হালাল হারামের আইনও বানান নি, সেহেতু এই এই আয়াতও রাসুলের উপর প্রয়োগযোগ্য নয়।
সেহেতু আপনার প্রশ্নে উক্ত অভিযোগের আর কোন ভিত্তি থাকলো না।
২। রাসুলকে অর্পিত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব
রাসুলকে আল্লাহ হালাল ও হারাম নির্ধারণের অথরিটি দিয়েছেন, কারণ তিনি আল্লাহর মনোনিত, তিনি আল্লাহর সাথে শিরক ও কুফর হবে এমন কোন কাজ করবেন না, করার খায়েশাতও উনার মাঝে আসনে না। তাই উনার সিদ্ধান্ত মানুষের জন্য মান্য করা বাধ্যতামুলক। বেশ কিছু হাদিস ও আয়াতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আমার রাসুলের হুকুম মানা সংক্রান্ত একটি লিখা রয়েছে সাইটে সেটা দেখতে পারেন। আবার কিছু হাদিসে কিছু আমল রাসুল ছেড়ে দিয়েছিলেন বা নিজের জন্য খাস করেছিলেন, যেন সেগুলো উম্মতে মুসলিমার জন্য ফরজ না হয়ে যায়, যেমন জামাতে তারাবি ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি। এ বিষয়ে আরো জানতে পারেন এই আর্টিকেলগুলোতে,
সেহেতু এই ক্ষেত্রেও এই আয়াত উনার উপর অ্যাপ্লিকেবল হয় না, আল্লাহ যেহেতু অথরিটি দিয়েছেন সেহেতু তিনি সেই অথরিটি ব্যবহার করে নিজের জন্য খাস একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেহেতু এখানে আর শিরক হওয়ার কোন কারণ রইলো না। আল্লাহ যদি উনাকে এমন কোন অথরিটি না দিতেন তাহলে একটা কথা ছিল, তিনি যেহেতু অনুমতি বা দায়িত্ব প্রাপ্ত সেহেতু এই বিধান আর উনার জন্য প্রযোজ্য থাকে না।
৩। শেখ উসাইমিনের উত্তর
এই ব্যাখ্যাটি শেখ উসাইমিন (রহ) করেছে উনার কিতাব তাফসিরুল উসাইমিন - মায়েদা এর ২/২৯৯-৩০০ তে, যা স্বাভাবিক ভাবেই আমার নিজ থেকে দেওয়া ১ম দুটো উত্তরগুলোর চাইতে বেশি যৌক্তিক, সন্তুষ্টজনক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমার উত্তরগুলোও কোন না কোন ভাবে এই ব্যাখ্যার সাথেই সম্পর্কিত বা এই ব্যাখ্যার অধীনস্থ।
যাইহোক তিনি সুরা মায়েদার ৮৭ নাম্বার আয়াতের তাফসিরে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আমি সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি।
আল্লাহর দেওয়া হালাল জিনিসকে হারাম বলার তিনটি ধরন বা বিভাগ আছে। মুরাদ: খবর (সংবাদ), এবং ইনশা (প্রণয়ন), এবং ইমতিনা (বিরতি)
১। খবর বা তথ্য দেওয়ার মতো করে বলা, যেমন: কেউ যদি বলে, "ভেড়ার গোশত হারাম," – এটা সে একটি তথ্য বা খবর হিসেবে বলল। আমরা তাকে বলব: তুমি মিথ্যাবাদী। কারণ ভেড়ার গোশত তো হালাল, আর সে মিথ্যা বলে একে হারাম দাবি করল।
২। নিজে থেকে হারামের বিধান জারি করা, এটা হলো আল্লাহ যা হালাল করেছেন, মানুষ নিজে থেকে সেটাকে সব মানুষের ওপর হারাম সাব্যস্ত করে দেওয়া। জাহেলি যুগের লোকেরা ঠিক এটাই করত। যেমন তারা 'সাইবা', 'ওয়াসিলা' ইত্যাদি পশুকে নিজেদের জন্য হারাম করে নিয়েছিল। এই আয়াতে (لَا تُحَرِّمُوا) মূলত এই দ্বিতীয় প্রকারটিকেই বোঝানো হয়েছে। এর আসল অর্থ হলো, আল্লাহর দেওয়া বিধানের বিপরীতে নিজের বিধান চালু করা।
৩। কোনো কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখার ইচ্ছা করা, এখানে কারো উদ্দেশ্য এটা না যে, এই জিনিসটা আল্লাহর শরিয়তে হারাম, কিংবা এটা হারাম বলে ঘোষণা দেওয়া বা খবর দেওয়া। বরং শুধু নিজে থেকে সেটা না খাওয়া বা না ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া। এর একটি উদাহরণ হল কোরআনে যেমন আল্লাহ রাসুলকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন: {হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।} (সূরা আত-তাহরীম: ১)।
কেউ যদি বলে, "এই পাউরুটিটি আমার ওপর হারাম," – তার মানে এই না যে পাউরুটি শরীয়তে হারাম, বরং তার মানে হলো "আমি এটি খাব না" (এক ধরনের শপথের মতো)। এর হুকুম (বিধান) হলো কসম (শপথ) এর মত। এর প্রমাণ হল সুরা তাহরিমের প্রথম দুই আয়াত যেখানে বলা হয়েছে, {হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তা তুমি কেন হারাম করছ?... নিশ্চয় তোমাদের জন্য শপথ হতে নিস্কৃতি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন}
এখানে প্রথমটি হল মিথ্যা কথা, বা মিথ্যা প্রচার, দ্বিতীয়টি হল আয়াতে বর্ণিত হালালকে হারামকারী ও হারামকে হালালকারী, ৩য়টি হল শপথ, নিজেকে কোন প্রয়োজন বা কারণে হালাল বস্তু থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত, এটা শরিয়তের কোন কিছুকে পরিবর্তন করে না। সেহেতু এখানে শিরকের কিছু নেই।