আল্লাহ কি পৃথিবীতে গবাদি পশু ও পোষাক আসমান থেকে নাযিল করেছেন?
আসসালামু আলাইকুম।
কোরআনে বলা হয়েছে যে,
আল্লাহ তায়ালা চার জোড়া গবাদি পশু নাযিল করেছেন (যুমার:৬) এবং পোষাক নাযিল করেছেন (আরাফ : ২৬)।
নাযিল করা মানে হলো আসমান থেকে বা উপর থেকে নিচে নামিয়ে আনা বা অবতরণ করা। এখন এই আয়াতগুলোতে নাযিল করা বলতে কী বোঝানো হয়েছে? আল্লাহ কি আসমান থেকে এগুলো নাযিল করেছেন? আর গবাদি পশু তো অনেক প্রকারেরই আছে। এখানে শুধু চার জোড়ার কথা বলা হলো কেন?ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আপনার প্রশ্নটি কুরআনের ভাষাগত একটি দিক স্পর্শ করে।
“নাযিল” (نَزَّلَ / أَنْزَلَ) আরবি “নুযুল” বা “নাযালাহ” শব্দের মূল অর্থ হলো — “উপর থেকে নিচে নামানো” বা “কোনো উচ্চতর স্থান থেকে নিম্নতর স্থানে প্রেরণ করা”।
কিন্তু কোরআনে এই শব্দটি সবসময় আসমান থেকে সরাসরি কোনো বস্তু অবতরণ করার অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বরং প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন কিছু বোঝাতে পারে যা আরবী বালাগাত ও ভাষারীতির আলোকে একদম নরমাল একটি বিষয়। যেমন এর প্রমান আমরা কোরআনের অন্য আয়াতেও পাই,
"হে আদমের সন্তানগণ! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্য দান করে। আর তাকওয়ার (আল্লাহভীতি ও সৎকর্মের) পোশাক— এটাই উত্তম। এটি আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে।" [সুরা আরাফ আয়াত ২৬]
"অবশ্যই আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সঙ্গে নাযিল করেছি কিতাব ও তুলাদণ্ড (ন্যায়ের মানদণ্ড), যাতে মানুষ ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। আর আমি অবতীর্ণ করেছি লোহা, যার ভেতর রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ।" [সুরা হাদীদ আয়াত ২৫]
এই আয়াতগুলোতে আক্ষরিক অর্থে পোশাক, তুলাদণ্ড আকাশ থেকে পাঠানো বুঝানো হয় নি।
এর কয়েকটি ব্যাখ্যা ওলামাগণ করেছেন এভাবে:
১. সৃষ্টি বা উদ্ভাবনের অর্থে: অনেক তাফসীরকারের মতে, "আনজালা" দ্বারা এখানে মানে হলো "সৃষ্টি করা" বা "তৈরি করে দেওয়া"। আল্লাহ তো এগুলো সবকিছুর স্রষ্টা—তিনিই এগুলোকে মানুষের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন।
ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাইয়িমের দৃষ্টিভঙ্গি হলো আয়াতে “আসমান থেকে” বলা হয়নি। পশুরা তাদের আসলাব/জরায়ু থেকে “নামে” (জন্ম নেয়), লোহা পাহাড়/খনি থেকে “নামে”, ইত্যাদি। এতে শব্দের ভাষাগত অর্থ বজায় থাকে, অথচ আকাশ থেকে পড়ার দাবি করা হয় নি।
২. আরবি ভাষায় "নাযালা" (نزل) ধাতুর মূল অর্থ উপর থেকে নিচে নামা। কিন্তু এই ধাতু থেকে নিষ্পন্ন শব্দ আরবিতে আরও বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়। "ইনযাল" (إنزال) বলতে কাউকে সম্মানের সাথে আতিথেয়তা দেওয়া, আশ্রয় দেওয়া বা কিছু দান করাও বোঝায়। এর সাথে সম্পর্কিত শব্দ "নুযুল" (نُزُل) বলতে মেহমানের জন্য প্রস্তুত করা আপ্যায়ন-সামগ্রী বোঝায়। কুরআনেই এর ব্যবহার আছে: "তাদের জন্য ফিরদাউসের জান্নাতসমূহ রয়েছে নুযুল (আপ্যায়ন) হিসেবে।" (কাহফ ১৮:১০৭) নূহ (আ.)-এর দোয়া: "হে আমার রব, আমাকে বরকতময় অবতরণস্থলে নামিয়ে দিন (আনযিলনী)।" (মুমিনূন ২৩:২৯)
এখানে "আনযালা" দ্বারা কোনো উচ্চস্থান থেকে অবতরণ নয়, বরং মেহমানদারি, আশ্রয় বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ শব্দটি দাতার মর্যাদা ও গ্রহীতার প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করে।
৩. অস্তিত্বের কারণগুলো নামানোর অর্থে: কিছু আলেম বলেন, এটি সেই কারণগুলোকে নির্দেশ করে যা এদের অস্তিত্ব ঘটায়।
- যেমন পোশাকের ক্ষেত্রে: পোশাক আসে ছাগল-ভেড়ার লোম বা তুলা থেকে। আর এগুলোর উৎপাদনের জন্য দরকার বৃষ্টি, যা আল্লাহ আকাশ থেকে নামান। বৃষ্টির কারণে মাটি ফসল ফলায়, পশুরা বাঁচে, এবং তাদের থেকে পোশাক তৈরি হয়।
- গবাদি পশুর ক্ষেত্রে: এদের জীবন সরাসরি বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল—বৃষ্টি নামলে ঘাস-ফসল ফলে, পশুরা খায় এবং বেঁচে থাকে।
৪. আল্লাহর রহমতের ভাণ্ডার থেকে নামানোর অর্থে: কিছু আলেম বলেন, এই শব্দটি এই নিয়ামতগুলোর মর্যাদা তুলে ধরে। এতে বোঝা যায়, এগুলো সাধারণ মাটির সৃষ্টি নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত। যেমন বৃষ্টিকে "রহমত" বলা হয়, তেমনি এই পশু-পোশাকও আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের প্রতীক।
৫. কাদের ও তাকদীরের অর্থে: আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, আল্লাহর সব ফয়সালা আকাশের লওহে মাহফুজে লেখা, এবং ফেরেশতারা সেগুলো নিয়ে মাটিতে নামেআল্লাহর আদেশ ও ফয়সালা আসমান থেকে এসেছে। তাই "আনজালা" মানে আল্লাহর আদেশ অনুসারে এগুলো সৃষ্টি করা ও তোমাদের জন্য নির্ধারিত করা।
সারকথা, "আনজালা" শব্দটি শুধু শারীরিক নামানো নয়—এটি সৃষ্টি, পরিকল্পনা, রহমত এবং আল্লাহর মহিমার একটি প্রকাশও বোঝাতে পারে।
কেন শুধু "আট জোড়া" গবাদি পশুর উল্লেখ?
সূরা যুমার: ৬ — “চার জোড়া গবাদি পশু নাযিল করেছেন”وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ الْأَنْعَامِ ثَمَانِيَةَ أَزْوَاجٍ“আর তিনি তোমাদের জন্য আট জোড়া গবাদি পশু নাযিল করেছেন।” (যুমার ৩৯:৬)
এই আয়াতে আরবীতে ৮ আনআম জাওজে দিয়েছেন বলা হয়েছে। অর্থাৎ ৮ গবাদী পশুকে জোড়ায় দিয়েছেন, এই আয়াতে ৮ জোড়া দিয়েছেন বোঝানো হয় নি। আরবিতে ‘থামানিয়াতা আজওয়াজিন’ মানে আটটি যাওজ (জোড়া বা জোড়ার একজন)। তাই মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে এগুলো হলো: এখানে “আট জাওজ” মানে: চার প্রজাতির গৃহপালিত পশুর — প্রত্যেকটির একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী — মোট আট, সেগুলো হলো উট, গরু, ভেড়া, ছাগল।
সূরা আন‘আম (৬:১৪৩-১৪৪)-তেও এই আট জোড়ার বিস্তারিত এসেছে — যেখানে একইভাবে “চার প্রজাতির আটটি” বলা হয়েছে।
এই চার প্রকারকেই বিশেষভাবে উল্লেখ করার কয়েকটি হিকমত (উপকারিতা) আছে:
- মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্ব: কুরআন যখন নাযিল হয়, তখন আরবদের জীবন এই পশুগুলোর উপর নির্ভরশীল ছিল—এবং আজও পুরো বিশ্বের জন্য এগুলো খাদ্য (মাংস, দুধ), পোশাক (লোম, চামড়া), যাতায়াত এবং কৃষিকাজের প্রধান উপাদান। এগুলো ছাড়া জীবন চলে না।
- ধর্মীয় নিয়মে বিশেষ স্থান: আল্লাহ এই পশুগুলোকে বিশেষ আইন-কানুন দিয়েছেন, যা অন্য পশুর জন্য নেই। যেমন, কুরবানি, হজ্জের হাদি, আকিকা, যাকাত এবং দিয়াত নির্ধারণে এগুলো ব্যবহার হয়। এতে তাদের মর্যাদা বোঝা যায়।
- জাহিলিয়াতের ভুল বিশ্বাসের খণ্ডন: আরবরা কিছু পশু বা তাদের অংশকে নিজেরাই হারাম করে ফেলত (যেমন বাহিরা, সাঈবা, ওয়াসিলা, হাম), আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই। কুরআন এসে বলল, আল্লাহ এগুলোকে হালাল করেছেন—এই উল্লেখ দিয়ে সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে।
সুতরাং, এই "আট জোড়া"র উল্লেখ মানুষের জীবনের মূল নিয়ামতগুলোর স্মরণ করানো, এবং তৎকালীন সমাজের ভুল ধারণা সংশোধনের জন্য। আশা করি, এই ব্যাখ্যা আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছে।
সারকথা: ‘আনযালা’ শুধু শারীরিক নামানো বা আকাশ থেকে পাঠানোকে বুঝায় না—এটি আল্লাহর সৃষ্টি, পরিকল্পনা, রহমত, নিয়ামত এবং মহিমার প্রকাশ। আক্ষরিক অর্থে পশু বা পোশাক আকাশ থেকে পড়েনি; এটি ভাষারীতি ও প্রেক্ষাপট অনুসারেই বুঝা যায়। মুফাসসিরগণের মধ্যে বিভিন্ন গ্রহণযোগ্য মত আছে, কিন্তু অধিকাংশ আক্ষরিক আকাশ থেকে অবতরণকে প্রধান মত হিসেবে নেননি।
আপনি এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা জানতে নিম্নোক্ত আর্টিক্যালগুলো পড়তে পারেন এবং এই আয়াতগুলোর তাফসির দেখতে পারেন। আমার উল্লেখ করা বিষয়গুলোর রেফারেন্সও এগুলোতেই রয়েছে -
- https://islamqa.info/ar/answers/237614/
- https://www.islamweb.net/ar/fatwa/71060/
- https://www.islamweb.net/ar/fatwa/97951/
- https://asyilaislamiyya.com/article/لما-قال-القرآن-انزال-الأنعام-ولم-يقل-خلق
- https://surahquran.com/aya-143-sora-6.html
- https://www.islamweb.net/ar/library/content/61/3143/قوله-تعالى-وأنزل-لكم-من-الأنعام-ثمانية-أزواج