প্রোপাগান্ডাফিলিস্তিন

হামাস কি ইসরায়েলের তৈরি?

একটি মিথ্যা দাবির খন্ডন

ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থী সংগঠন হামাস একইসাথে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং একটি রাজনৈতিক গ্রুপ। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে তাদের নেতৃস্থানীয় ভূমিকার কারণে ফিলিস্তিনি জনগণের একটি বড় অংশ তাদের সমর্থন করে।

হামাসের শিকড় ফিলিস্তিনি সমাজে গভীরভাবে গেঁথে থাকলেও সংগঠনটির উৎপত্তি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে, এমনকি ফিলিস্তিনি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু মানুষের মধ্যেও ব্যাপকভাবে প্রচারিত একটি ভুল ধারণা রয়েছে। ধারণাটি হলো ইসরায়েল নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে হামাসকে উৎসাহ দিয়েছে বা তৈরি করেছে, যাতে তারা ইয়াসির আরাফাতের রেখে যাওয়া প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-কে দুর্বল করতে পারে।

কিন্তু এই ধারণাটি একটি মিথ অথবা কুযুক্তি, যা আসলে ফিলিস্তিনি সমাজের কিছু হামাস-বিরোধী অংশ এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ছড়িয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুহাম্মাদ দাহলান, যিনি পরে সিআইএ-র সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং ২০০৬ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হামাস সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তবে হামাস বিষয়ক প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ইতিহাসবিদ খালেদ রুব ব্যাখ্যা করেছেন যে কেন এই মিথ্যা দাবির কোনো ভিত্তি নেই। রুবের লেখা দুইটি উল্লেখযোগ্য বই হলো হামাস: পলিটিক্যাল থট এন্ড প্রাক্টিস (Hamas: Political Thought and Practice) এবং হামাস: এ বিগিনার’স গাইড (Hamas: A Beginner’s Guide)। আজকের পুরো আর্টিকেলে রুবের যুক্তিগুলো প্রাধান্য পাবে, তাই এই নামটা ভুলে গেলে চলবে না।

হামাস কি ইসরায়েলের তৈরি?
ফিলিস্তিনি একাডেমিশিয়ান খালেদ রুব

প্রোপাগান্ডার দীর্ঘ ইতিহাস

ইসরায়েল সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হামাসকে সৃষ্টি করেছে বা সমর্থন করেছে—এই বয়ানটির একটি দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস রয়েছে। এই বয়ানের প্রথম দিকের প্রভাবশালী উদাহরণগুলোর একটি হলো ১৯৮১ সালের মার্চ মাসে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ডেভিড কে. শিপলারের একটি প্রতিবেদন।

শিপলার সেখানে গাজার তৎকালীন ইসরায়েলি সামরিক গভর্নর ইৎজাক সেগেভকে উদ্ধৃত করে বলেন, “ইসরায়েলি সরকার আমাকে একটি বাজেট দিয়েছিল এবং সামরিক প্রশাসন (এখানকার) মসজিদগুলোকে অর্থ দেয়।” শিপলার আরও যোগ করেন যে এই অর্থ মসজিদ ও ধর্মীয় স্কুল উভয়ের জন্য ব্যবহৃত হতো, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রো-পিএলও বামপন্থীদের বিপরীতে একটি শক্তি গড়ে তোলা।

পরে তার ১৯৮৬ সালের বই আরব এন্ড জিউস-এর একটি সংস্করণে (যা নন-ফিকশন বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কার পায়) তিনি সেগেভের মন্তব্যকে সংক্ষেপে তুলে ধরেন। সেখানে তিনি লেখেন, সেগেভ তাকে বলেছিলেন যে ইসরায়েল পিএলও ও কমিউনিস্টদের প্রতিপক্ষ হিসেবে ইসলামি আন্দোলনকে অর্থায়ন করেছিল। শিপলার আরও বলেছিলেন যে এই অর্থায়ন হামাসের বীজকে পরিচর্যা করতে সাহায্য করেছিল।

এরপর থেকে এই বক্তব্যটি শিপলারের পরিবর্তে সেগেভের নামে প্রচারিত হতে থাকে, যা এই বয়ানটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এই ভুল আরোপটি বহু প্রকাশনা (যেমন- দ্য ইন্টারসেপ্ট) ও বিশ্লেষকের (যেমন- আলন বেন মেয়ার) মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

আমেরিকান গণমাধ্যমে এই বয়ানকে জনপ্রিয় করে তোলার আরেকটি প্রাথমিক লেখা ছিল ১৯৯২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসে ইয়োসি মেলম্যানের একটি প্রবন্ধ, যার শিরোনাম ছিল হামাস: হোয়েন এ ফর্মার ক্লায়েন্ট বিকামস অ্যান ইমপ্লেকেবল এনেমি (Hamas: When a Former Client Becomes an Implacable Enemy)

হামাস কি ইসরায়েলের তৈরি?
১৯৯২ সালে প্রকাশিত Hamas: When a Former Client Becomes an Implacable Enemy শিরোনামের আর্টিকেল

পরবর্তীতে ২০০৯ সালে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে অ্যান্ড্রু হিগিন্সের লেখা “হাও ইসরায়েল হেল্পড টু স্পন হামাস (How Israel Helped to Spawn Hamas)” শিরোনামের একটি নিবন্ধ এই ধারণাকে আরও জোরদার করে। এই নিবন্ধে আভনার কোহেনের কথা বলা হয়, যিনি হামাসের উত্থানের সময় গাজায় “ধর্মীয় বিষয়াবলি” দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বলেন, “গভীর দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, হামাস হলো ইসরায়েলের সৃষ্টি।”

লেখক হিগিন্স এই কোহেনের বক্তব্যকে সংক্ষেপে উল্লেখ করে লেখেন যে ইসরায়েল বহু বছর ধরে ইসলামি আন্দোলনকে সহ্য করেছে এবং পিএলও-র বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরির উদ্দেশ্যে কিছু ক্ষেত্রে উৎসাহিতও করেছে। কিন্তু এই নিবন্ধে চূড়ান্তভাবে দেখানো হয়েছিল যে প্রকৃত ইতিহাস অনেক বেশি জটিল এবং “ইসরায়েল হামাস সৃষ্টি করেছে” এই ধারণাটি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তবুও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের “অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড” এর পর এই “ইসরায়েল হামাসা তৈরি করেছে” ধারণাটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান ধারার বহু গণমাধ্যমও এই বয়ানকে কপচেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে মার্ক মাজেত্তি ও রোনেন বার্গম্যানের বহুল আলোচিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল ‘বায়িং কুয়াইট’: ইনসাইড দি ইসরায়েলি প্ল্যান দ্যাট প্রোপারড আপ হামাস (‘Buying Quiet’: Inside the Israeli Plan That Propped Up Hamas)।

একই সময়ে সিএনএন এই সম্পর্কিত একটি ধারণা প্রচার করে যে কাতার থেকে নেতানিয়াহুর সমর্থনে গাজায় অর্থ পাঠানো হতো। সিএনএন-এর মতে, এই কারণে নেতানিয়াহুর জোটের কিছু সদস্য তাকে “হামাসের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়” বলে সমালোচনা করেছিলেন। জায়নিস্ট ঘরানার কিছু গণমাধ্যম এই বর্ণনাটিকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তাদের দাবি, নেতানিয়াহুর নীতিতে হামাসের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়তা ছিল।

২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এ প্রকাশিত একটি মতামত নিবন্ধে রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাল শ্নাইডার বলেন, ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নীতি হামাসকে সমর্থন জুগিয়েছিল, যা কার্যত আগের দিনের হামলার পথ প্রশস্ত করেছিল। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর সাবেক পররাষ্ট্রনীতি প্রধান (Foreign Policy Chief) জোসেপ বোরেল মন্তব্য করেন, “হ্যাঁ, হামাসকে ইসরায়েলি সরকার অর্থায়ন করেছিল ফাতাহ-নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে।”

বোরেল শুধু এই দাবি করেননি যে ইসরায়েল কাতার থেকে আসা অর্থ গাজায় প্রবেশ করতে দিয়েছে, বরং তিনি এটিও ইঙ্গিত দেন যে এর মাধ্যমে ইসরায়েল হামাসকে অর্থায়ন করেছে। কিন্তু অতীতের ঘটনার এমন উপস্থাপনাকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে মনে করা হয়।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগুনে ঘি ঢেলেছে 

আসলে, ইসরায়েল “হামাস সৃষ্টি করেছে” এই মিথের সবচেয়ে প্রাথমিক দাবিগুলো আসে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে। কিন্তু ইতিহাসবিদ খালেদ হ্রুব তার হামাস: পলিটিক্যাল থটস এন্ড প্রাক্টিস (Hamas: Political Thought and Practice) বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থার উত্থান সম্পর্কে ইসরায়েলি মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী ছিল। কেউ কেউ ইসলামপন্থীদের উত্থানকে ইসরায়েলি “ষড়যন্ত্র” হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ বলেছেন ইসরায়েলি নীতি কেবল এই ঘটনাকে উপেক্ষা করেছিল। অন্যরা মনে করেন ইসরায়েলি অবস্থান ছিল সম্পূর্ণরূপে শত্রুভাবাপন্ন এবং এই প্রবণতাকে দমন করার লক্ষ্যেই ইসলামপন্থী আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে।

তবে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাধ্যমে এই মিথটি আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে পিএলও-র নেতা ইয়াসির আরাফাত এক্ষেত্রে একটা ভূমিকা রেখেছিলেন। হামাসের প্রতি তার আদর্শিক বিরোধের শিকড় অনেক পুরানো। ফাতাহ নামক সেক্যুলার দলের প্রতিষ্ঠাতাদের ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে বিচ্ছেদের মধ্যেই এই বিরোধ গেঁথে আছে। আর এই ব্রাদারহুডের অস্তিত্ব ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেই ছিল।

হ্রুব তার বইয়ে দেখান যে পিএলও হামাসের ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলি ব্যাখ্যাগুলো গ্রহণ করে এবং সেগুলো প্রচারে কাজ করে। এক্ষেত্রে তারা সেই ব্যাখ্যাকেই অগ্রাধিকার দেয়, যেখানে বলা হয় যে হামাস আসলে পিএলও-কে দুর্বল করার জন্য ইসরায়েলের একটি সৃষ্টি মাত্র। ১৯৬০-এর দশক থেকে ফিলিস্তিনিদের মুক্তির জন্য সংগ্রামকারী সেক্যুলার সংগঠন পিএলও এবং ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে জন্ম নেওয়া হামাসের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ কনফারেন্সের ঠিক আগে।

হামাস কি ইসরায়েলের তৈরি?
১৯৯১ সালের মাদ্রিক কনফারেন্সের একটি স্থিরচিত্র। ছবি: পল হোয়াইট

পিএলও হামাসকে একটি কমিটিতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়, যার উদ্দেশ্য ছিল প্যালেস্টেনিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিল-কে পুনর্গঠন করা, যা ফিলিস্তিনের ভেতরে এবং প্রবাসে থাকা ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব করে। হামাস এতে সাড়া না দিলে, পিএলও-র মুখপত্র ফিলাস্তিন আল থাওরা হামাসের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য ত্যাগ করার অভিযোগ প্রচার করতে থাকেন।

রুবের মতে, “পিএলও-র বিবৃতিগুলোতে এই ধারণার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল যে হামাসকে ইসরায়েলের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, অথবা অন্তত ইসরায়েলের সম্মতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পিএলও-কে দুর্বল করার জন্য।” মাদ্রিদ সম্মেলনের সময় হামাস একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে তারা পিএলও-কে অযোগ্য বলে অভিহিত করে। কারণ তাদের মতে পিএলও দখলদারিত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

এরপর উত্তেজনা আরও বাড়ে যখন ইসলামপন্থী, জাতীয়তাবাদী এবং বামপন্থী বা মার্কসবাদী বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সংগঠন তথাকথিত শান্তি প্রক্রিয়ার বিরোধিতায় একটি যৌথ ফ্রন্ট গঠন করে। এই সংগঠনগুলো ১৯৯১ সালের ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মাদ্রিদ সম্মেলনের সময় সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান জানায়। রুবের ভাষায়, “ধর্মঘটের সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য এবং পিএলও নেতৃত্বের জন্য উদ্বেগজনক।”

এদিকে হামাস ও আরও ১০টি সংগঠনের নেতৃত্ব ১৯৯১ সালের ২২ থেকে ২৪ অক্টোবর তেহরানে একটি সম্মেলন হয়। ১৯৯২ সালের শুরুতে হামাস তেহরানে একটি কার্যালয় খোলার পর, পিএলও নেতারা “নিয়মিতভাবে” হামাসকে “বিদেশি শক্তির প্রতি আনুগত্যশীল” বলে অভিযুক্ত করতেন। ১৯৯২ সালের শেষদিকে ইয়াসির আরাফাত দাবি করেন যে হামাস ইরানের কাছ থেকে বছরে ৩০ মিলিয়ন ডলার পায়। এই দাবি আবার হামাস সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে এবং “অতিরঞ্জিত” বলে উল্লেখ করে। কিন্তু আরব ও পশ্চিমা গণমাধ্যম দ্রুত এই দাবিগুলো প্রচার করে ফেলে।

Read More...  অনাহারকে অস্ত্র বানিয়ে ইসরায়েল গাজায় জাতিগত নির্মূলকরণ এবং গণহত্যা চালাচ্ছে

ইয়াসির আরাফাত হামাসকে হেয় করার চেষ্টা করেন। কারণ হামাস ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার বিরোধিতা করছিল এবং ফাতাহ-র কিছু ব্যাপারেও বিরোধীতা করছিল। হামাস যখন বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় শুরু করে, তখন ইয়াসির আরাফাত ও ফাতাহ নেতৃত্ব আশঙ্কা করে যে হামাসের নেতৃত্বে শান্তি আলোচনার বিরোধী জোটটি পিএলও-র বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

হামাস কি ইসরায়েলের তৈরি?
২০০১ সালে শায়খ আহমেদ ইয়াসিন। ছবি: ইলেক্ট্রনিক ইন্তিফাদা

পরবর্তী কয়েক বছরে ইয়াসির আরাফাত ও ফাতাহ-র অন্যান্য নেতা হামাসকে পিএলও-তে যোগ দিতে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হামাস একদিকে যেমন পিএলও-তে বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানায়, অন্যদিকে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ফলে ইয়াসির আরাফাত হামাসকে অযোগ্য প্রমাণ করার প্রচারণা শুরু করেন।

২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ইতালীয় সাপ্তাহিক এল-এসপ্রেসো-তে ডিনা নাসচেত্তি–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাফাত জানান যে তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন তার “অনমনীয়তার” মাধ্যমে “ইসলামী চরমপন্থীদের” শক্তিশালী করেছেন। পরবর্তী সংখ্যায় নাসচেত্তি আরেকটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন, যেখানে আরাফাতের মন্তব্য আরও স্পষ্ট। তিনি বলেন, “হামাস ইসরায়েলের সহায়তায় গঠিত হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল পিএলও-র বিরোধিতা করা। তারা ইসরায়েলের কাছ থেকে অর্থ ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। তারা বিভিন্ন অনুমতি পেত, যেখানে আমাদের একটি টমেটো কারখানা বানানোর অনুমতিও দেওয়া হয়নি।”

তবে বাস্তবে হামাসের উৎপত্তির সাথে আরাফাতের এই দাবি খুব একটা মানানসই নয়।

হামাসের উৎপত্তির প্রেক্ষাপট 

১৯৭৩ সালে ক্যারিশম্যাটিক ধর্মীয় নেতা শায়খ আহমেদ ইয়াসিন এবং ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের অন্যান্য ব্যক্তিত্বরা ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন, যা আরবিতে আল-মুজাম্মা আল-ইসলামি নামে পরিচিত। অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন মাহমুদ আল জাহার, আবদেল আজিজ আল-রানতিসি, ইব্রাহিম ফারেস আল-ইয়াজুরি, আব্দুল ফাতাহ দুখান, ইসা আল-নজর এবং সালাহ শাহাদেহ, যারা পরবর্তীতে হামাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। ইসলামিক সেন্টারের মূল লক্ষ্য ছিল শরণার্থী শিবির এবং দরিদ্র শহুরে এলাকাগুলোতে দাতব্য ও কল্যাণমূলক সেবা প্রদান করা, যে অঞ্চলগুলো অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বারা উপেক্ষিত ছিল।

শাউল মিশাল এবং আব্রাহাম সেলা তাদের ২০০০ সালের বই দ্য প্যালেস্টিনিয়ান হামাস (The Palestinian Hamas)-এ উল্লেখ করেছেন যে গাজায় মসজিদের সংখ্যা ১৯৬৭ সালের ৭৭টি থেকে ১৯৮৬ সালে বেড়ে ১৫০টিতে পৌঁছায়, যা হামাস গঠনের আগের কথা। ১৯৮৯ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২০০-তে পৌঁছে যায়। এই মসজিদগুলো গোপন রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করত, যা ইসরায়েলি নজরদারি থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল। এগুলো ইসলামিক আন্দোলনের বার্তা ছড়ানো, সমর্থন গড়ে তোলা এবং প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

রুবের মতে, এই পর্যায়টি এমন এক বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ঘটেছিল, যেখানে ইসলামপন্থী দলগুলো দ্রুত রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্থান ঘটাচ্ছিল। এই আঞ্চলিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থীরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। তারা সমাজকে পুনরায় ইসলামিকীকরণ এবং দাতব্য ও সামাজিক কাজের ওপর মনোযোগ দেওয়া থেকে সরে এসে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও মুখোমুখি সংঘর্ষে মনোযোগ দেয়, যা একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ ছিল।

রুব আরও বলেন যে এই কৌশলগত পরিবর্তনের সাথে সাথে ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের নাম পরিবর্তন করে হামাস রাখে। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে গাজায় প্রথম ইন্তিফাদার সূচনা হামাসের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে একই সময়ে ঘটে। উল্লেখ্য, এই ইন্তিফাদা ছিল ফিলিস্তিনের কিছু অঞ্চল ও ইসরায়েলের দখলকৃত ভূমিতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা পরিচালিত দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলন।

ইসরায়েলের অনুমতি

ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পর ইসরায়েল তাদেরকে প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালানোর অনুমতিপত্র দেয়। এই ঘটনা এমন ধারণার জন্ম দেয় যে ইসরায়েল শুধু হামাসের গঠনে সম্মতি দিয়েছিলই না, বরং তা উৎসাহিতও করেছিল। কিন্তু এই অনুমতিপত্র ইস্যু করার কিছুদিন পরই সাময়িকভাবে বাতিল করা হয় এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর পুনরায় অনুমোদন দেওয়া হয়।

এছাড়া, মিশাল ও সেলা উল্লেখ করেন যে ইয়াসিন এবং তার ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সহকর্মীরা ১৯৭০ সাল থেকে ইসরায়েলি সামরিক প্রশাসনের কাছে বারবার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিলেন, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়। লেখকদের ভাষায়, এই প্রত্যাখ্যানের একটি বড় কারণ ছিল গতানুগতিক ইসলামিক বিষয়াদির প্রতি ইসরায়েলের বিরোধিতা।

অন্যদিকে, ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠনগুলোকেও একই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকতে হতো এবং তারাও এই সময়ে বৈধভাবে কার্যক্রম চালানোর জন্য অনুমতি পেত, যেমন পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ শহরের কাছে অবস্থিত বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়, যা ১৯৭৮ সালে অনুমতি পায়। সুতরাং, হামাসের প্রাথমিক রূপ তথা ইসলামিক সেন্টারের ব্যাপারে যে অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছিল, এটা এমন আহামরি কিছু না যাতে প্রমাণ হয় হামাস ইসরায়েলের তৈরি।

বিতর্ক অনুষ্ঠান থেকে বিতর্ক

১৯৮৪-১৯৮৬ সময়কালে গাজা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ইসলামিক ব্লকের (ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড-এর ছাত্রসংগঠন) ছাত্র কর্মীরা ফাতাহ-সমর্থিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নানা আলোচনা ও বিতর্কে অংশ নিতেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুষ্ঠিত হতো। এসব আলোচনার মূল বিষয় ছিল ফিলিস্তিনি ইস্যু এবং সশস্ত্র সংগ্রাম। ১৯৮৫ সালে এমনই এক বিতর্কে অংশ নেন ইসলামিক ব্লকের সদস্য তরুণ ইয়াহিয়া সিনওয়ার এবং ফাতাহ-র মুহাম্মদ দাহলান।

হামাস কি ইসরায়েলের তৈরি?
প্রয়াত হামাস কমান্ডার ইয়াহইয়া সিনওয়ার। ছবি: আডেল হানা

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুই পক্ষের (অর্থাৎ ফাতাহ ও ইসলামিক আন্দোলন) মধ্যে পারস্পরিক অভিযোগের আদান-প্রদান। এই আলোচনায় সিনওয়ার ফাতাহ নেতৃত্বের শান্তি প্রস্তাবের সমালোচনা করেন, আর দাহলান মুসলিম ব্রাদারহুডকে তিরস্কার করেন যে তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালায়নি, বরং দখলদারদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন পরিচালনা করছে। পরবর্তী কয়েক দশকে দাহলান এই দাবির বিভিন্ন সংস্করণ তুলে ধরতে থাকেন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হামাস পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা করে।

মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে মুহাম্মদ দাহলান সরাসরি সিআইএ-এর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ২০০৬ সালের ফিলিস্তিনি আইন পরিষদ নির্বাচনে হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জিতলে এই ফলাফল উল্টে দেওয়ার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সহযোগিতা করেন। এই নিকৃষ্ট কাজের ফলে ২০০৭ সালে গাজা ও পশ্চিম তীরে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে একটি স্বল্পস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গাজায় ফাতাহ-র অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং দাহলান পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। তবে পশ্চিম তীরে তা সফল হয়, যেখানে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এখনো ইসরায়েলের এক ধরনের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

ইসরাইলি অর্থায়নে চলে হামাস?

“ইসরায়েল হামাস তৈরি করেছে”-এই ধারণাটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের “অপারেশন আল আকসা ফ্ল্যাড”-এর পর আরও বেশি আলোচিত হয়। এর সঙ্গে নতুন একটি দাবি যুক্ত হয় যে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কাতারকে গাজায় অর্থ পাঠাতে অনুমতি দিয়ে হামাসের আক্রমণকে কার্যত সম্ভব করে তুলেছিলেন।

এই বয়ানটি ২০১৮-১৯ সালের দীর্ঘস্থায়ী গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন-সংক্রান্ত হামাস ও ইসরায়েলের আলোচনার একটি বিকৃত উপস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে ছড়িয়েছে। ঐ আলোচনার ফলে ইসরায়েল কিছু ছাড় দেয়, যার মধ্যে ছিল কাতারকে গাজায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের অনুমতি দেওয়া, এঅর্থনৈতিক স্থবিরতা কমানো, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া ইত্যাদি। এর বিনিময়ে হামাস ইসরায়েল-গাজা সীমান্তে বিক্ষোভের তীব্রতা কমাতে সম্মত হয়।

কাতারের এই অর্থায়নের বিরোধিতার কারণে তৎকালীন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগডর লিবারম্যান ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে নেতানিয়াহুর সরকার থেকে পদত্যাগ করেন। একই সময়ে, তৎকালীন ইসরায়েলি শিক্ষামন্ত্রী নাফতালি বেনেট অভিযোগ করেন যে নেতানিয়াহু শান্তি বজায় রাখার জন্য কার্যত হামাসকে “চাঁদা” (protection money) দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এখনো দাবি করে যে কাতার থেকে গাজায় পাঠানো অর্থ আল কাসাম ব্রিগেডসকে ৭ অক্টোবরের অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করেছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে গাজায় কাতারের অর্থায়নকে হামাসকে অর্থ দেওয়ার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, বাস্তবে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো চালু রাখা এবং ইসরায়েল ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্ভোগ লাঘবে ব্যয় করা হয়েছিল।

গাজায় মানবিক পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন করা এবং সরাসরি হামাসকে অর্থায়ন করা এক জিনিস নয়, যদিও অনেক ক্ষেত্রে এটিকে ভুলভাবে একই হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

“গাজা উপত্যকায় কাতারের সহায়তা সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েল, জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত,” ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে রয়টার্স-কে কোনো এক আরব রাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এ কথা জানান। কাতারের অর্থ হামাসের হাতে গেছে-এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই; যদিও হামাস তাদের সামরিক কার্যক্রমের জন্য অন্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। বরং এই অর্থ নির্ধারিত উপকারভোগীদের কাছেই পৌঁছেছে-এমন সমসাময়িক নথিপত্রের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

শেষ কথা 

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে এটা মনে করার কোনো যুক্তি থাকে না যে আবু উবায়দা-ইয়াহইয়া সিনওয়ারদের হামাস সরাসরি ইসরায়েলের তৈরি। রুবের মতে, “হামাস হলো ফিলিস্তিনি জাতীয় প্রেক্ষাপটে গভীরভাবে প্রোথিত একটি সংগঠনের ফল, যার গঠন প্রক্রিয়া অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিকশিত হয়েছে।”

দুঃখজনকভাবে, অনেক বিচক্ষণ মানুষও এই মিথ পুনরাবৃত্তি করেছেন, যেখানে “ইসরায়েল হামাসকে অর্থায়ন করেছে” – এই ধারণাটি এক ধরনের প্রচলিত ব্যাপার হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভিযানের ফলে ইসরায়েলের অজেয়তার ধারণা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

মূল প্রবন্ধ: Debunking the lie that “Israel created Hamas”

Citation is loading...
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button