বাংলাদেশের ইতিহাস

বঙ্গাব্দের প্রবর্তক কি শশাঙ্ক?

বঙ্গাব্দের প্রবর্তক ও সূচনাকাল- একটি সমীক্ষা

এই লেখাটি মূলত শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক লিখিত “বঙ্গাব্দের প্রবর্তক ও সূচনাকাল- একটি সমীক্ষা” প্রবন্ধ, যা অনিরুদ্ধ রায় সম্পাদিত ‘ইতিহাস অনুসন্ধান ১৯’ বইয়ের পৃ ২৬৩ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তথ্যের বিশুদ্ধতার জন্য লেখকই দায়ী।

বঙ্গাব্দের প্রবর্তক ও সূচনাকাল নিয়ে বির্তক আছে। অনেকে বলেছেন বঙ্গাব্দের প্রবর্তক আকবর বাদশা। পঞ্জিকাকাররাও এক সময় ঐ মত পোষণ করতেন এবং পঞ্জিকায়ও লেখা হত। সাধারণ মানুষজন এসব নিয়ে মাথা ঘামাননি। নয়ের দশকে (বাংলার ১৪০০ সন) ঐ বির্তক আবার শুরু হয়। এই বির্তক তোলার ব্যাপারে সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ অবদান ছিল। উপরোক্ত বিষয় নিয়ে তিনি পত্র পত্রিকায় লেখেন। অনেকেই তাকে সমর্থনও করেন। স্থানীয় পত্র পত্রিকা ছাড়া, তিনি ওভারল্যান্ড দৈনিক পত্রিকা, দেশ ও উদ্বোধন পত্রিকাতেও লেখেন। ১১ অগ্রহায়ণ ১৪০০ বঙ্গাব্দে ওভারল্যান্ড পত্রিকার চিঠিপত্রের কলামে প্রথম তিনি লেখেন। ৩ বৈশাখ, ১৪০১ বঙ্গাব্দে ঐ পত্রিকাতেই ‘বঙ্গাব্দের প্রবর্তক কে’ এই শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। উদ্বোধন পত্রিকার ৪র্থ সংখ্যা, ১৪০২ ও দেশ পত্রিকার চিঠিপত্রের কলামে (জুন, ১৯৯৫) তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। ১৪০৪ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে তিনি বঙ্গাব্দের উৎসকথা প্রকাশ করেন। শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সকল আলোচনার মাধ্যমে দু’টি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

১) সম্রাট শশাঙ্ক বঙ্গাব্দের প্রবর্তক

২) শশাঙ্কের স্বাধীন রাজত্বের সূচনা কালই বঙ্গাব্দের প্রবর্তনকাল।

বহু বিদগ্ধ মানুষ তাঁর মতকে সমর্থন করেছেন। এতে সর্বসাধারণের কাছে একটি ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত সত্য হিসাবে পরিগণিত হয়ে যেতে পারে। শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের প্রয়াস একেবারে মূল্যহীন বলা যাবে না। কেউ কেউ ওর সাথে এক মত হন নি। সুতরাং এখানে অন্য মত ও সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা করতে হবে। তাছাড়া আলোচ্য বিষয়টি একটি সমীক্ষা। আলোচনা দুটি পর্বে ভাগ করে করা হবে। প্রথম পর্ব হবে বঙ্গাব্দের প্রবর্তককে নিয়ে, দ্বিতীয় পর্বে হবে বঙ্গাব্দের সূচনাকাল নিয়ে।

বঙ্গাব্দের প্রবর্তক বিষয়ক আলোচনা: এক সময় বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে আকবর বাদশাহের নাম সর্বাধিক প্রচলিত ছিল। বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে হোসেন শাহ ও তাঁর পুত্র নসরৎ শাহের নামের পক্ষে কিছু কিছু মত আছে। কিন্তু বঙ্গাব্দের প্রবর্তকদের মধ্যে সর্বশেষ নাম যুক্ত হয়েছে রাজা শশাঙ্কের যেটি প্রচারিত করেন সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়। কিন্তু প্রত্যেকটি দাবীর পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তি সহকারে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্তে পৌঁছানই হবে সব থেকে বড় কাজ।

কোন যুগ বা কাল সূচনার পিছনে সর্বদা একটা উদ্দেশ্য কাজ করে। সেইজন্য কোন মহান ব্যক্তির জন্ম দিন, বা তাঁর কর্মারম্ভের দিন-ক্ষণ দিয়ে করা হয় কোন যুগের সূচনা। এইভাবেই নির্দিষ্ট হয় কোন বংশের সূচনা। এইভাবেই এসেছে খ্রিষ্টাব্দ শকাব্দ, গুপ্তাব্দ, হিজরী অব্দ প্রভৃতি। অনুরূপভাবে, বঙ্গাব্দের প্রবর্তক ও সূচনা কালের সন্ধান পাওয়া যাবে, যুক্তিগ্রাহ্য ঐতিহাসিক সত্যের মধ্যে। কেউ কেউ মনে করেন আকবর বাদশাই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। তাঁদের মতে আকবরের সিংহাসন লাভের বৎসর (১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ), থেকে তিনি বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেন রাজস্ব প্রদানের সুবিধার কথা বিবেচনা করে। ৯৬৩ হিজরী (১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে চন্দ্র বৎসরের পরিবর্তে সৌরবৎসর হিসাবে দিন গণনা আরম্ভ করে, বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেন। এটি ঐতিহাসিক সত্য হিসাবে গ্রহণ করা যায় না।

১৫৫৬ খ্রিঃ আকবর দিল্লী অধিকার করেন সত্য কিন্তু তাদের গৌড় বঙ্গ অধিকার করতে অনেক বছর লেগে যায়।[1]রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ১২৬ ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে আকবর দাউদ খাঁকে পরাজিত করে গৌড় রাজ্যের অধিকার নেন। ঐ সময় গৌড়বঙ্গের বহুস্থান বিশেষ করে সমতট আকবরের অধিকারের বাহিরে ছিল। এই সমতটেই বঙ্গ, বঙ্গাল, হরিকেল, পুণ্ড্রবর্ধন অবস্থিত ছিল। তাছাড়া সমগ্র গৌড় বঙ্গ তখনও বঙ্গদেশ হিসাবে পরিচিত ছিল না।

গৌড় অধিপতি আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ১৪৯৪-১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত গৌড়ের সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন।[2]রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৯০ তিনি অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন, ‘হিন্দু বিদ্বেষীও’ ছিলেন না। তবে, হুসেন শাহ যে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেছিলেন এ কথা প্রমাণের অভাবে মানা যায় না। বরং তিনি সর্বক্ষেত্রে হিজরী অব্দ ব্যবহার করতেন। সুতরাং, বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের সঙ্গে এক্ষেত্রে সহমত পোষণ করা যায়।

পিতার মৃত্যুর পর নসরৎ শাহ ১৫১৯ খ্রিঃ বা ৯২৫ হিজরীতে গৌড়ের সিংহাসন লাভ করেন। তিনিও বঙ্গাব্দের প্রচলন করেছিলেন বলে কোন সরকারী নথিপত্রে প্রমাণ মেলে না। সুতরাং নসরৎ শাহকে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে চিহ্নিত করা যায় না।

“মহা সেনগুপ্ত প্রায় ৫৯৫ খ্রিঃ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। পরবর্তী গুপ্তরাজাগণ হীনবল হইয়া পড়েন, ফলে এই সুযোগে গৌড়দেশে শশাঙ্ক এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।[3]রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৩৪
‘৬০৬ অব্দের পূর্বে শশাঙ্ক একটি স্বাধীন রাজ্যপ্রতিষ্ঠা করিয়া ছিলেন। তাঁর রাজধানী কর্ণসুবর্ণ…।”[4]রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৩৫ কর্ণসুবর্ণের বর্তমান নাম রাঙ্গামাটী, ইহা মুর্শিদাবাদ জেলার প্রধান নগর বহরমপুরের দক্ষিণে অবস্থিত। হর্ষচরিত অনুসারে … গৌড় বলিতে উত্তরবঙ্গ বুঝায়। সুতরাং মগধ গৌড় ও রাঢ়দেশ শশাঙ্কের অধিকারভুক্ত ছিল…।”[5]রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়- বাংলার ইতিহাস, পৃ: ৮০-৮১
রমেশচন্দ্র মজুমদার উল্লেখ করেছেন, ‘বঙ্গরাজ্য শশাঙ্কের রাজ্যভুক্ত ছিল কিনা বলা যায় না’।[6]রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৪৫

হিউয়ান-চৌয়াং ‘শশাঙ্কের মৃত্যুর পরে আনুমানিক ৬৩৮ অব্দে (ইংরাজী অব্দ) বাংলা পরিভ্রমণ করেন। তিনি কজঙ্গল, পুণ্ড্রবর্ধন (উত্তরবঙ্গ), কর্ণসুবর্ণ (পশ্চিমবঙ্গ), সমতট (পূর্ববঙ্গ), এবং তাম্রলিপ্ত (মেদিনীপুর জেলা) এই পাঁচটি রাজ্য ও তাদের রাজধানীর নাম উল্লেখ করেছেন, কিন্তু রাজার নাম উল্লেখ করেননি…।”[7]রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৪২ হিউয়ান চুয়াং কর্ণসুবর্ণ হয়ে সমতটে অসেন। হিউয়ান চুয়াং অনুসারে ‘এ রাজ্যটির আয়তন তিন হাজার লি মত ছিল। … রাজধানীর পরিধি ২০লি।'[8]হিউয়েন সাং-এর দেখা ভারত (সংকলক প্রেমময় দাশগুপ্ত) পৃঃ ১৪৯ সমতটের ঐ রাজবংশ ব্রাহ্মণ বংশীয় ছিল।[9]রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৪৫ ‘ইউয়ান চোয়াং এর অবস্থান কালে সমতট দেশের রাজপুত্র, মহামতি শীলভদ্র নালন্দা মহাবিদ্যালয়ের মহাস্থবির ছিলেন।'[10]রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়- বাংলার ইতিহাস, পৃ: ৮৯

উপরের তথ্য সমূহ থেকে স্পষ্ট যে, সমতট শশাঙ্কের রাজ্যভুক্ত ছিল না। সমতট একটি পৃথক রাজ্য ছিল। ‘মুসলমানেরা এই দেশ জয় করিয়া সমস্ত বিজিত প্রদেশটি বঙ্গাল নামে অভিহিত করে। মুসলমান যুগের শেষভাগে গৌড়দেশ বলিতে সমস্ত বাংলাকেই বুঝাইত।”[11]রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৪৫ এই সমতট রাজ্যের মধ্যেই বঙ্গাল বঙ্গ প্রভৃতি ছিল। তবে, শশাঙ্কের সময় সমতট স্বাধীন রাজ্য ছিল কিন। বলা যায় না। শশাঙ্ক উত্তর-পূর্ব ভারতে অভিযান করে ‘কামরূপ ব্যতীত সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের অধীশ্বর’ হয়েছিলেন। সে ক্ষেত্রে, সমতটের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুন্ন থাকা স্বাভাবিক ছিল না। সমতটের স্বাতন্ত্র্য যখন বজায় থাকতে পারত দুটি কারণে ১) সমতট তখন শশাঙ্কের অনুগত কোন সামন্ত রাজার অধীনস্ত হলে, বা ২) সমতট, তখন যে, স্বাধীন ব্রাহ্মণ রাজবংশের অধীন ছিল, সেই বংশের জ্ঞানগরিমাকে সম্মান করে, তাঁদের কোন বিরুদ্ধাচারণ না করার জন্যে।

সুতরাং যে রাজ্য তাঁর (শশাঙ্কের) অধিকারভুক্ত ছিলেন না, সেই রাজ্যের একটি অংশের নাম নিয়ে একটি অব্দ প্রচলন করা অবাস্তব। তাছাড়া কোন তাম্রশাসন, পাথরে খোদিত কোন লিপি বা শশাঙ্ক প্রবর্তিত কোন মুদ্রায় বঙ্গাব্দের উল্লেখ নেই। শশাঙ্ক কোন অবস্থায় বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হতে পারেন না। কিন্তু শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। কিছু লোক নিম্নে কয়েকটি মত উদ্ধৃত করে, তার যথার্থতা সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

প্রথমেই সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করা বাঞ্ছনীয়। তবে তিনি যে যুক্তিতে বঙ্গাব্দের অন্য প্রবর্তকদের দাবী নসাৎ করেছেন, শশাঙ্কের ক্ষেত্রে সেই সকল যুক্তি এড়িয়ে গিয়েছেন। পক্ষান্তরে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে শশাঙ্কের দাবী প্রতিষ্ঠিত করতে একটি ধর্মীয় আবেগের বাতাবরণ সৃষ্টি করে, সমস্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বস্তুনিষ্ঠ যুক্তিকে তিনি আড়াল করেছেন। সুনীল বাবুর মতে আইন-ই-আকবরী গ্রন্থের ইংরাজী অনুবাদকর্মে হিজরী সনের অবলুপ্তি, ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ অব্দের প্রবর্তন প্রভৃতি কথা থাকলেও বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের উল্লেখ নাই। ইতিহাসেও বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে আকবরের নাম মেলে না। তাই বলাযেতে পারে আকবর বঙ্গাব্দের প্রবর্তক নন।[12]সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়- “বঙ্গাব্দের প্রবর্তক কে?” ওভারল্যান্ড তাং ১৭-৪-১৯৯৯ তিনি আরো উল্লেখ করেছেন “কোন বাদশাহী ফরমানেও আকবর কর্তৃক বাংলা সন প্রবর্তনের উল্লেখ পাওয়া যায় না। এমনকি, আকবর নিজেও কোন দিন বঙ্গাব্দ /বাংলা সন বা সাল প্রবর্তন করেছেন বলে দাবী করেননি।”[13]সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়- বঙ্গাব্দের উৎস কথা, পৃঃ ৩৪ সুনীল বাবু বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হুসেন শাহ-র দাবী বাতিল করার জন্য লিখেছেন ‘তিনি এ সন বা অব্দ প্রবর্তন করলে তাঁর আমলের সরকারী নির্দেশনামা মসজিদের প্রতিষ্ঠিত ফলক ইত্যাদিতে এর উল্লেখ পাওয়া যেত। কিন্তু সেরূপ কিছুরই সন্ধান পাওয়া যায় না।'[14]সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়- বঙ্গাব্দের উৎস কথা, পৃঃ ৩৫

ইনি শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য লিখলেন “৫৯৩ খ্রিঃ ৬ এপ্রিল সোমবার সূর্যোদয়কালে অথাৎ ১ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ সোমবার… গৌড়বাংলায় শশাঙ্ক তাঁর স্বাধীন রাজত্বের সূচনা করেন। সোমবার দিনটি শৈব্যধর্মাবলম্বীদের পরম পবিত্র দিন এবং দিনটি শিবের জন্ম দিন বলেও বিশ্বাস। তাই বিশ্বাসই তাঁরা স্বাধীন রাজত্বের সূচনার দিনটিকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করে।”[15]ওভারল্যান্ড পত্রিকা, তাং ১৭ এপ্রিল, ১৯৯৪ তিনি অবার লিখেছেন “সম্প্রতিক কালে কর্ণসুবর্ণ অঞ্চলে খনন কাজের ফলে শশাঙ্কের মূদ্রা সহ অন্যান্য কিছুনিদর্শন আবিষ্কৃত হলেও তাঁর স্বাধীন রাজত্বের সূচনা কাল নির্দেশক কোন তথ্য বা নিদর্শন মেলেনি।”[16]সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়- বঙ্গাব্দের উৎস কথা, পৃঃ ৩৮ তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, “আত্মভোলা, প্রচার বিমুখ শশাঙ্ক অমিতশক্তির অধিকারী হয়েও, রাজকোষ করায়ত্ব থাকা সত্ত্বেও গৌড়বাংলায় স্বাধীন রাজত্বের সূচনা কালের স্মারক হিসাবে করাননি কোন স্মৃতিফলক, রাখেননি কোন লিখিত বিবরণ এবং লেখেননি কোন আত্মজীবনী।”[17]ওভারল্যান্ড পত্রিকা, তাং ১৭ এপ্রিল, ১৯৯৪

সুনীল বাবুর যুক্তিতে ‘পাথুরে প্রমাণের ঘাটতি থাকলেও একমাত্র বিশ্বাসই শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে।[18]উদ্বোধন, ১৪০২ বঙ্গাব্দ, ৪র্থ সংখ্যা, দেশ, জুন, ১৯৯৫ (চিঠি পত্র) কিন্তু সুনীলবাবুর বিশ্বাসে অন্যজনের বিশ্বাস নাও থাকতে পারে। বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে হোসেন শাহের উপর যদি কারও দৃঢ় বিশ্বাস থেকে থাকে, সে বিশ্বাস কি শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় মেনে নেবেন? অনুরূপভাবে কেবল বিশ্বাস নির্ভর হয়ে শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। কিন্তু ঐ বিশ্বাসের পিছনে যুক্তি ও প্রমাণ থাকলে, তবেই বিশ্বাস সত্যে আবদ্ধ হবে। কিন্তু বিশ্বাস যদি যুক্তি তর্কের সীমানা ছাড়িয়ে সত্য থেকে বহুদূরে ভাবনির্ভর হয়ে পড়ে, তা’হলে সেই বিশ্বাস কখনই শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না।

উপরে উল্লখিত ভাবনির্ভর অগভীর যুক্তি ও তত্বের উপর দাঁড় করান আপাত সত্যের কাছে বিদ্বজনেরা কি ভাবে আত্ম সমর্পন করেছেন দেখা যাক।

১) সম্পাদকীয় স্তম্ভ উদ্বোধন – ১৪০২ বঙ্গাব্দে ৪র্থ সংখ্যা

‘তাঁহার সিংহাসন আরোহণ ৫৯৩ খ্রিঃ হইয়া থাকিতে পারে। এই ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গাব্দের ক্ষেত্রে মাইল প্রস্তারের মত একটি অব্দাঙ্ক। অযৌক্তিক নয় ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দকে সম্রাট শশাঙ্কের গৌড়বঙ্গের রাজধানী কর্ণসুবর্ণের সিংহাসনে আরোহণ বর্ষ বলিয়া নির্ধারণের অনুমানটিও। … যৌক্তিকতা প্রমাণিত হলে, অনুমান প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়।’

Read More...  ‘বাংলাদেশ’ ও ‘বঙ্গ’ নাম কি 'সনাতনীদের' দেওয়া? - ফ্যাক্ট চেকিং এবং আসল উৎসের সন্ধানে

২) অতুল সুরের মতে, ‘… শশাঙ্ক কর্তৃক বঙ্গাব্দে প্রবর্তিত হয়েছিল, এই মতবাদের পিছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে। শশাঙ্কের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষ করে বঙ্গবাসীর পক্ষে বঙ্গাব্দ প্রতিষ্ঠা করা খুবই যুক্তি যুক্ত সিদ্ধান্ত।'[19]দেশ, সেপ্টেম্বর সংখ্যা, ১৯৯৫

৩) অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় “শ্রীযুক্ত সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘বঙ্গাব্দের উৎস কথা’ পেয়ে খুব খুশি হয়েছি। ….এ সম্পর্কে লেখকের তথ্যপ্রমাণ সম্পূর্ণ যুক্তিপূর্ণ বলে আমার ধারণা।[20]বঙ্গাব্দের উৎস কথা, সু. কু. ব., পৃ: ১ (পরিশিষ্ঠ).

৪) বৈদ্যনাথ বসুর (প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, ফলিত গণিত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) মত “নিরলস সাধনায় বিজ্ঞান সম্মত গবেষণা পদ্ধতি প্রয়োগ করে, বিভ্রন্তির আড়াল থেকে বঙ্গাব্দের উৎসমুখটিকে আলোয় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন।”[21]বঙ্গাব্দের উৎস কথা, সু. কু. ব., (পরিশিষ্ঠ).

৫) রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্তের (প্রাক্তন অধিকর্তা, জাতীয় গ্রন্থাগার) মতে, শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে শেষ কথা বলিয়াছেন। বঙ্গাব্দের ইতিহাস সম্বন্ধে একখানি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করিয়া উপস্থিত করিয়াছেন।'[22]বঙ্গাব্দের উৎস কথা, সু. কু. ব., পৃ: ১

একমাত্র দিলীপ কুমার বিশ্বাস (প্রাক্তন সভাপতি, এশিয়াটিক সোসাইটি) বাদে বাকিরা বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে শশাঙ্কের নাম মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা তার ঐতিহাসিক সম্ভাব্যতা বিবেচনা না করে মেনে নিয়েছেন।

অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে, বাংলাদেশ বলিতে যা বুঝাত’ শশাঙ্কের সময় বাংলাদেশকে সেই ভাবে বুঝাত না। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে ‘বঙ্গ’ নামের উৎপত্তি পৌরাণিক কালে। প্রহ্লাদপৌত্র ত্রিভুবনজয়ী দৈত্যরাজ বলিবিষ্ণুর ষড়যন্ত্রে পাতাল বা রসাতলে বাস করতে বাধ্য হন। বলির রাজ্য রসাতল তাঁর চার পুত্র, বান, সুক্ষ, অঙ্গ ও বঙ্গের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায়। বলির পুত্রদের অধিকৃত রাজ্য তাঁদের নামানুসারে পরিচিত হয়ে যায় (মহাভারতে দ্রষ্টব্য ১.১০৪-৫৫, ১.১০৪.৫১-৫৩, ১.১০৪.৫১-৫৪)। বঙ্গ বা বাংলা নামের আদি উল্লেখ এ অঞ্চলে এই ভাবেই হয়েছিল। পরবর্তীকালে, “খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দী বা তারও আগে ‘বঙ্গ’ ও ‘বঙ্গাল’ নামে পৃথক দুটি দেশের অস্তিত্বের কথা বহু শিলালিপিতে উল্লেখ আছে।”[23]রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ২ ঐতিহাসিকদের মতে ‘বঙ্গাল’ দেশের নাম থেকে বাঙ্গালা বা বাংলা নামের উৎপত্তি হয়েছে।

গুপ্তযুগে গৌড় বলতে আধুনিক কালের বাংলাকে বুঝাত। কখনও কখনও গৌড় বলতে পশ্চিম ও উত্তর বঙ্গকেও বুঝাত। পাল যুগের বৃহৎ রাজ্যের পঞ্চগৌড়ের এক গৌড়স্থল বাংলাদেশ। সুলতানী আমলেও সমস্ত বাংলাদেশ গৌড় নামেই পরিচিত ছিল। মুঘল যুগের শেষেই সমগ্র গোড়দেশ ‘বাংলা’ নামস্থায়ী ভাবে পায়। ইতিপূর্বে কখনই আধুনিক কালের সমগ্র বাংলাকে বঙ্গ, বাঙ্গালা বা বাংলা নামস্বরূপ ব্যবহার করা হয়নি।

অবশ্যই বঙ্গাব্দ গণনার একটি সূচনা বিন্দু থাকবে। সেই দিনটি হবে বঙ্গাব্দের প্রথম মাসের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ বৈশাখ। বৈশাখ মাসের প্রথম দিন থেকে চৈত্র মাসের শেষ দিনটি হলে, বঙ্গাব্দের ১ম বর্ষ পূর্ণ হবে বা প্রথম বঙ্গাব্দ হবে। সুনীল বাবু ১ম বঙ্গাব্দের আরম্ভ দিনটি (১ বৈশাখ) গৌড়বঙ্গের স্বাধীন রাজা শশাঙ্কের রাজ্যাভিষেকের দিন হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। যুক্তি হিসাবে সুনীল বাবুর প্রথম বক্তব্য হল –

১) ‘৫৯৩ খ্রিঃ ৬ এপ্রিল সোমবার অর্থাৎ প্রথম বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ সোমবার। ওই দিনই গৌড়বাংলায় শশাঙ্ক তার স্বাধীন রাজত্বের সূচনা করেন। সোমবার দিনটি শৈব ধর্মাবলম্বীদের পরম পবিত্র দিন এবং দিনটি শিবের জন্ম দিন।'[24]ওভারল্যান্ড, ১৭ এপ্রিল, ১৯৯৪

২) মত পরিবর্তন করে করেন ‘৫৯৪ খ্রিঃ ৫ এপ্রিল, সোমবার …… বঙ্গাব্দের আদি বিন্দু।'[25]উদ্বোধন, ১৪০২ বঙ্গাব্দ ৪র্থ সংখ্যা, দেশ, জুন ১৯৯৫ (চিঠি পত্র)

৩) সুনীল বাবু ১৯৯৭ খ্রিঃ প্রকাশিত বঙ্গাব্দের উৎস কথা বই অনুসারে ‘১ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ (১২ এপ্রিল, ৫৯৪) সোমবার সূর্যোদয় কালে বঙ্গাব্দের আদি বিন্দু। …..তাই শশাঙ্কের স্বাধীন রাজত্বের সূচনা ও বঙ্গাব্দের গণনা শুরু একই দিনে হয়েছে-বলা যায়। অতএব আপাতত প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকলেও আনুষঙ্গিক প্রমাণে প্রমাণিত যে, শশাঙ্কের আমলেই বঙ্গাব্দের সূচনা।'[26]বঙ্গাব্দের উৎস কথা-প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৪

উপরোক্ত মত থেকে শশাঙ্কের রাজ্য আরোহণের বৎসর এবং রাজ্য আরোহণের দিন প্রকৃত পক্ষে কি ছিল নির্ধারণ করা দরকার। সুনীল বাবুর প্রথম দুটি মন্তব্যে বঙ্গাব্দের সূচনা দিন ও শশাঙ্কের রাজ্যারম্ভের সূচনা দিন একই যতটা জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, তাঁর বই এর বক্তব্য অত জোরাল নয় বলে মনে হল।

সুখময় সরকার তাঁর নিবন্ধে সুনীল বাবুর শশাঙ্কের রাজ্য আরোহণের বৎসরকে সমর্থন করে লিখেছেন-“….. শশাঙ্কের রাজ্যভিষেক হয় আনুমানিক ৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে। আনুমানিক কথাটা মনে রাখতে হবে। ওটা তেরো বছর আগেও তো হতে পারে অর্থাৎ ৫৯৩ খ্রিঃ শশাঙ্কের রাজ্যভিষেক হয়েছিল….।'[27]উদ্বোধন, ১৪০০ বঙ্গাব্দ, ১২ সংখ্যা সুখময় সরকারের এই প্রবন্ধ লেখার পরে সুনীল বাবু তার বক্তব্য থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। তা’হলেও সরকারের যুক্তি মানা সম্ভব না কারণ, তাঁর যুক্তি মত যেমন ‘ওটা তেরো বছর আগেও হতে পারে’ তেমনি ‘ওটা তেরো বছর পরে হওয়ার যুক্তি সমান ভাবে থাকে। সুতরাং, সিদ্ধান্তে পৌঁছনর এই যুক্তি গ্রহণ যোগ্য নয়। তা’ছাড়া, যেখানে একটি সূচনা বছর এবং দিন-ক্ষণ নির্ণয়ের ব্যাপার, সেখানে বারো তেরো বছরের পার্থক্য গ্রহণ যোগ্য নয়। আনুমানিক ব্যবধান বড়ো জোর এই দুই বছরের হতে পারে। ইতিহাসের পাতায় উঠে আসা মতগুলি সমীক্ষা করা যেতে পারে। শশাঙ্কের রাজ্যরান্ত কাল সম্পর্কে অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের রচনাবলীর তৃতীয় খণ্ডের ২৬৩ পৃষ্ঠার বক্তব্য হল- ‘আর্যাবর্তে বাঙ্গালীর এই প্রথম সাম্রাজ্য। তিনি ৬১৯-৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করেন। রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে ‘মহা সেনগুপ্ত প্রায় ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।'[28]রমেশচন্দ্র মজুমদার, প্রাগুক্ত আবার সুনীল চট্টোপাধ্যায়ের প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে (২য় খণ্ড) আছে- ‘৬০৬, খ্রিষ্টাব্দের অল্পকাল আগে শশাঙ্ক গৌড়ের রাজা ছিলেন। রমেশচন্দ্র প্রণিত বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রাচীন যুগের ৩৫ পৃঃ অনুসারে ‘৬০৬, খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে শশাঙ্ক একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিরণ চৌধুরীর ভারতের ইতিহাস কথায় (প্রাচীন যুগ) ২০৩ পৃষ্ঠা) আছে কালচুরীদের আক্রমণের ফলে ‘৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে মহা সেনগুপ্ত থানেশ্বরের রাজা প্রভাকর বর্ধনের সভায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।’ সুতরাং ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কোন অবস্থায় শশাঙ্ক ৫৯৩ বা ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীন রাজ্যের সূচনা করেছিলেন মেনে নেওয়া যায় না। এটি সুনীল কুমার বন্দোপাধ্যায়ের কষ্ট কল্পনার ফল ছাড়া কিছু নয়।

বঙ্গাব্দের সূচনা দিবস ও অব্দ এবং শশাঙ্কের রাজ্যাভিষেকের দিবসও অব্দ একই বলে, সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় বহু তথ্য ও যুক্তি দ্বারা নির্দিষ্ট করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে শশাঙ্কের রাজ্যারোহণ অব্দ মানা সম্ভব হযনি। সে ক্ষেত্রে, শশাঙ্কের রাজ্যারোহণ দিবস সংক্রান্ত আলোচনা অর্থহীন। ফলে, শশাঙ্কের রাজ্যারোহণের সঙ্গে বঙ্গাব্দ আরম্ভের কোন যোগসূত্র রইলো না। সুতরাং শশাঙ্ক সংক্রান্ত আলোচনার পরিবর্তে বঙ্গাব্দের আরম্ভের অব্দ ও সূচনা কাল নিয়েই আলোচনা করতে হবে। তবে বঙ্গাব্দ বিষয়ক আলোচনার ক্ষেত্রে তাঁর ‘বঙ্গাব্দের উৎসকথা’ বইতে শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু মূল্যবান কাজ করেছেন। যেমন বঙ্গাব্দের অধিবর্ষ তালিকা ‘বঙ্গাব্দ ও খ্রিষ্টাব্দ তালিকা প্রভৃতি। কিন্তু তার বিশুদ্ধতা প্রশ্নাতীত কিনা বলা যায় না।

ধরা যাক, বাংলা বৎসর ১৪১০ বঙ্গাব্দ। বছরের প্রথম দিন ১ বৈশাখ, ১৫ই এপ্রিল ২০০৩, মঙ্গলবার। সুতরাং এই দিন থেকে ১৪১০ বৎসর পূর্বে কোন এক দিন ছিল বঙ্গাব্দের সূচনা দিন অর্থাৎ ১ বৈশাখ (১ম বঙ্গাব্দের প্রথম দিন)। ১ম বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ কি বার ছিল জ্ঞাতব্য বিষয়। বঙ্গাব্দ গণনার সূত্রপাত কি করে হল, বঙ্গাব্দের প্রথমদিন কোন বিশেষ ঘটনার সাক্ষী কিনা, ইত্যাদি জানার থাকতে পারে। যে সূত্রে বর্তমান নিবন্ধ, সেই সূত্রানুসারে খ্রিষ্টাব্দের প্রেক্ষাপটে শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গাব্দের প্রথম দিনের বার নির্দেশ করেছিলেন। তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছিল। যেমন প্রথমে তিনি স্থির করেন ৫৯৩ খ্রিঃ ৬ এপ্রিল, সোমবার, সেটাকে পরিবর্তন করে, তিনি দ্বিতীয় বার স্থির করেন ৫৯৪ খ্রিঃ ৫ এপ্রিল, সোমবার ১ম বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। কিন্তু তাঁর, বঙ্গাব্দের উৎস কথা বইতে তিনি ঐ দিন ও বার স্থির করেন ১২ এপ্রিল, সোমবার ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে এবং তিনি ১ম বঙ্গাব্দের প্রথম দিন থেকে প্রত্যেক বৎসরের প্রথম দিনের কোন তারিখ ও কি বার, ইংরাজী খ্রিষ্টাব্দ অনুসারে নির্দেশ করে একটি চার্টও সংযোজন করেছেন। কিন্তু শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১ম বঙ্গাব্দের প্রথম দিন সোমবার করার পক্ষে বিশেষ যুক্তি হলো যে, ‘বঙ্গাব্দের সূচনা সোমবার। শৈব্যধর্মাবলম্বী হিসাবে সোমবার দিনটি শশাঙ্কের নিকট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।'[29]বঙ্গাব্দের উৎস কথা, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৯ শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ওভারল্যান্ডের প্রবন্ধে লিখেছিলেন ‘সোমবার দিনটি শৈব্য ধর্মাবলম্বীদের পরম পবিত্র দিন এবং দিনটি শিবের জন্মদিন বলেও বিশ্বাস।[30]ওভারল্যান্ড, ১৭ এপ্রিল, ১৯৯৫ সংখ্যা বার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এমন একটি যুক্তি, সত্যে পৌঁছানর পক্ষে যথেষ্ট নয় বলেই মনে হয়। তা’ছাড়া প্রত্যক্ষ পদ্ধতি, মাস ও বার ধ্রুবক পদ্ধতিতে তাঁর নির্ধারিত বার সমর্থিত হয়নি। কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল, তার নির্দেশও নেই।

Citation is loading...

Footnotes

Footnotes
1 রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ১২৬
2 রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৯০
3 রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৩৪
4 রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৩৫
5 রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়- বাংলার ইতিহাস, পৃ: ৮০-৮১
6, 9, 11 রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৪৫
7 রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ৪২
8 হিউয়েন সাং-এর দেখা ভারত (সংকলক প্রেমময় দাশগুপ্ত) পৃঃ ১৪৯
10 রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়- বাংলার ইতিহাস, পৃ: ৮৯
12 সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়- “বঙ্গাব্দের প্রবর্তক কে?” ওভারল্যান্ড তাং ১৭-৪-১৯৯৯
13 সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়- বঙ্গাব্দের উৎস কথা, পৃঃ ৩৪
14 সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়- বঙ্গাব্দের উৎস কথা, পৃঃ ৩৫
15, 17 ওভারল্যান্ড পত্রিকা, তাং ১৭ এপ্রিল, ১৯৯৪
16 সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়- বঙ্গাব্দের উৎস কথা, পৃঃ ৩৮
18 উদ্বোধন, ১৪০২ বঙ্গাব্দ, ৪র্থ সংখ্যা, দেশ, জুন, ১৯৯৫ (চিঠি পত্র
19 দেশ, সেপ্টেম্বর সংখ্যা, ১৯৯৫
20 বঙ্গাব্দের উৎস কথা, সু. কু. ব., পৃ: ১ (পরিশিষ্ঠ).
21 বঙ্গাব্দের উৎস কথা, সু. কু. ব., (পরিশিষ্ঠ).
22 বঙ্গাব্দের উৎস কথা, সু. কু. ব., পৃ: ১
23 রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ) (সংস্করণ ১৯৮৮), পৃঃ ২
24 ওভারল্যান্ড, ১৭ এপ্রিল, ১৯৯৪
25 উদ্বোধন, ১৪০২ বঙ্গাব্দ ৪র্থ সংখ্যা, দেশ, জুন ১৯৯৫ (চিঠি পত্র
26 বঙ্গাব্দের উৎস কথা-প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৪
27 উদ্বোধন, ১৪০০ বঙ্গাব্দ, ১২ সংখ্যা
28 রমেশচন্দ্র মজুমদার, প্রাগুক্ত
29 বঙ্গাব্দের উৎস কথা, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৯
30 ওভারল্যান্ড, ১৭ এপ্রিল, ১৯৯৫ সংখ্যা

FromMuslims Collections

বিভিন্ন লেখকের লেখার সংগ্রহ।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button