ইসলামে বাল্যবিবাহ: শর্ত, কল্যাণ ও সাবালিকার অধিকার
ইসলামে কি কোনো শর্ত ছাড়া বাল্যবিবাহকে অনুমোদিত বলে গণ্য করা হয়? এবং এর পিছনের কারণ কী?

ইসলামের বাল্যবিবাহ নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিকগণ খুব অপপ্রচার করে থাকে এবং কিছু সরলমলা মুসলিম তাদের এই অপপ্রচার দেখে বিভিন্ন বিভ্রান্তিতে পড়ে যান। আবার কিছু মুসলিম ইসলামের গভীর পাণ্ডিত্য না থাকার কারণে এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি করে থাকেন। আজকের আলোচনায় আমরা আলোচনা করব ইসলাম কি বাল্যবিবাহের অনুমতি দেয়? আর যদি ইসলাম বাল্যবিবাহের অনুমতি দিয়েও থাকেন তাহলে কেন বা এই ক্ষেত্রে শর্ত কি কোন শর্ত রয়েছে ইসলামের নাকি সার্বজনীনভাবে এটা স্বীকৃত।
একটি সভ্য ও সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণের জন্য ইসলাম বিবাহে উৎসাহ দেয়, জেনা-ব্যাভিচার থেকে নিষেধ করে। বিবাহের ক্ষেত্রে ইসলাম বয়সের কোনো সীমা বেধে দেয়নি। ইসলাম দ্রুত বিবাহে উৎসাহ দেয়। এখন প্রশ্ন হল এই দ্রুত বিবাহের মানে কি বাল্যবিবাহ?
এখানে আমাদের বুঝা প্রয়োজন বাল্যবিবাহ কি৷ আমাদের সমাজে প্রচলিত ১৮ বছর হলে বিবাহের উপযুক্ত ধরা হয়, এর আগে বিবাহকে বাল্যবিবাহ মানা হয়। এই যে একটি বয়স নির্ধারণ এবং তার উপর ভিত্তি করে বাল্যবিবাহ আইন বানানো এটি সম্পুর্ন অমুসলিমদের বানানো মানুষের নিজ বুঝ থেকে তৈরী কিছু নিয়ম কানুন। এখন কোন কোন দেশে ১৪-১৫ বছর বয়সেও সরকারি ভাবে বিবাহ বৈধ বা কনসেন্ট এর মাধ্যসে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন বৈধ, এমন কি অ্যামেরিকার মত দেশের বহু অঙ্গরাজ্যে ১৬ বছর বয়সে বিবাহ বা শারীরিক সম্পর্ক করা বৈধ৷ এই নিয়ে Frommuslims ওয়েবসাইটে “বাল্যবিবাহের ইতিকথা” নামের আর্টিকেল রয়েছে দেখে নিতে পারেন। তাহলে এইযে ১৮ বছর ধরে নেওয়া হচ্ছে এটাতো চুরান্ত কোন বিষয় নয়, আমি চাইলেই এটার সাথে দ্বীমত করতেই পারে, কারণ এটাতো আর ওহি দ্বারা সাব্যস্ত কোন আইন নয়। আল্লাহ কোরআনে বলেন,
যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ অবহিত। (সুরা মুলক, আয়াত ১৪)
বাল্যপ্রেম বলতে যদি কিছু না থাকে, তাহলে বাল্যবিবাহ বলতেও কিছু থাকা উচিৎ না। মানুষের জৈবিক চাহিদার অংশ হিসেবে খাবার যেমন আবশ্যকীয়, তেমনি বিবাহও মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়। মানুষের খাবারের জন্য যেমন সময় নির্ধারণ করার যৌক্তিকতা নেই, তদ্রুপ বিবাহের জন্যও বয়স ঠিক করে দেওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
বরং এটা যার যার চাহিদা, প্রয়োজনীয়তা, সক্ষমতা ও উপযুক্ততা হিসেবে বিবেচিত ও গ্রহণীয় হবে। কিন্তু পশ্চিমা ও নারীবাদীরা বাল্যপ্রেমের মাধ্যমে ব্যভিচারের বাজার উন্মুক্ত করতে বাল্যবিবাহ নামটি বাজারজাত করেছে।
তাই দ্রুত বিবাহের মানেই বাল্যবিবাহ নয়, ইসলামী শরীয়তে বালেগ হতে হয় ও উপযুক্ত করে হয় বিবাহের জন্য, অপ্রাপ্ত বয়সে বিবাহকে শর্তসাপেক্ষে বৈধ বলেছে দ্বীন ইসলামে।
অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাকে বিয়ে দেওয়া
অনেকেই দাবি করে থাকেন যে ইসলামে পাশ্চাত্য থেকে আসা টার্ম সোকল্ড ‘বাল্যবিবাহ’ কোন শর্ত ছাড়া বৈধ, তবে তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। কেননা ইসলামিক কোন শর্ত ছাড়া এটিকে বৈধতা দেওয়া হয়নি। নির্দিষ্ট একটি মাত্র শর্তে তথাকথিত বাল্যবিবাহ কে বৈধ করা হয়েছে। আর সেই শর্তটি হল:
যদি কোনো পিতা সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত হন যে তার নাবালিকা কন্যার বিবাহ নাবালেগ অবস্থায় সম্পাদন করলে তাতে তার জন্য প্রকৃত কল্যাণ ও মঙ্গল নিহিত রয়েছে, তবে কেবলমাত্র সে অবস্থাতেই শরীয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের বিবাহ বৈধ বলে গণ্য হবে। অন্যথায়, অর্থাৎ যখন এমন কল্যাণ সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান নয়, তখন নাবালিকা কন্যাকে বিবাহ দেওয়া বৈধ নয়।
এ বিধান সর্বসাধারণ পিতার জন্য উন্মুক্ত নয়; বরং এটি সেই পিতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যিনি দ্বীনদার, বিচক্ষণ, সুদূরদর্শী এবং সন্তানের প্রকৃত কল্যাণ সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত।
এ ব্যাপারে জগৎ বিখ্যাত আলেমদের বক্তব্য সমূহ নিম্নরূপ
ইমাম জাসসাস রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার আহকামুল কুরআন গ্রন্থে উল্লেখ করেন
لا يزوج الأب الصغيرةً إلا بمقتضى المصلحة الراجحة التي يراها لها ، فكما أنه يتصرف في مالها بمقتضى مصلحتها ، فكذلك في زواجها ، والشرع إنما يجيز مثل ذلك للأب المسلم التقي ، الذي يراعي مصلحة أولاده حق المراعاة ، وهو يعلم جيدا أنه راع ، وأنه مسئول عن رعيته.
ذكر ابن وهب عن مالك في تزويج الرجل يتيمه : إذا رأى له الفضل والصلاح والنظر أن ذلك جائز له عليه .
পিতা ছোট কন্যার বিবাহ দেবে না, তবে সেই ক্ষেত্রে যখন সে তার জন্য স্পষ্ট ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত কল্যাণ (مصلحة راجحة) দেখতে পায়। যেমন সে তার সম্পদের ব্যাপারে তার কল্যাণ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়, তেমনি তার বিবাহের ক্ষেত্রেও তাই করবে। শরীয়ত এমন অনুমতি কেবল সেই মুসলিম, পরহেযগার পিতার জন্যই দিয়েছে, যে তার সন্তানের কল্যাণ যথাযথভাবে বিবেচনা করে। সে ভালো করেই জানে যে, সে একজন রাখাল (দায়িত্বশীল অভিভাবক) এবং তার অধীনস্থদের ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে।
এছাড়াও ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন
ذكر ابن وهب عن مالك في تزويج الرجل يتيمه : إذا رأى له الفضل والصلاح والنظر أن ذلك جائز له عليه
ইবনু ওয়াহব (রহ.) মালিক (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন—
কোন ব্যক্তি যদি তার তত্ত্বাবধানে থাকা এতিমাকে বিবাহ দিতে চায়, আর সে যদি তার মধ্যে উত্তম গুণ, নেকী ও কল্যাণের দিক দেখতে পায়, তাহলে তার জন্য তা করা বৈধ।[1]আহকামুল কুরআন ২য় খন্ড ৩৪২ পৃষ্ঠা
উপরুক্ত ইমাম মালেক এবং ইমাম জাসাস রহমতুল্লাহি আলাইহির বক্তব্য এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে পিতা যেমন সন্তানের সম্পদ পরিচালনা করে তার মঙ্গলের জন্য, তেমনি বিবাহের ক্ষেত্রেও সে একই নীতি অনুসরণ করবে। অর্থাৎ, বিবাহ কোনো ব্যক্তিগত বা আবেগিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি সম্পূর্ণরূপে মেয়ের কল্যাণ, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, দ্বীনদারিতা ও উপযুক্ততার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
এছাড়া স্পষ্ট করা হয়েছে যে, শরীয়ত এই ক্ষমতা শুধুমাত্র সেই দায়িত্বশীল, পরহেযগার পিতার জন্য অনুমোদন করেছে, যে সন্তানের কল্যাণ সম্পর্কে সচেতন এবং জানে যে সে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে। সকল সাধারণ পিতার জন্য নয়।
এ ব্যাপারে ইমাম নববী রাহমাতুল্লাহ আলাইহি এর বক্তব্য,
وأما وقت زفاف الصغيرة المزوجة والدخول بها : فإن اتفق الزوج والولي على شيء لا ضرر فيه على الصغيرة : عُمل به
ছোট বয়সী বিবাহিত কন্যাকে স্বামীর ঘরে পাঠানো (রুখসতি) এবং তার সাথে সহবাসের সময় সম্পর্কে—
যদি স্বামী ও অভিভাবক উভয়ে এমন বিষয়ে একমত হয়, যাতে ছোট কন্যার কোনো ক্ষতি নেই, তাহলে সেটিই কার্যকর হবে।[2]শরহে মুসলিম ৯/২০৬
ইমাম নববী (রহ) আরো বলেন,
واعلم أن الشافعي وأصحابه قالوا : يستحب أن لا يزوِّج الأب والجد البكر حتى تبلغ ويستأذنها لئلا يوقعها في أسر الزوج وهي كارهة ، وهذا الذي قالوه لا يخالف حديث عائشة ؛ لأن مرادهم أنه لا يزوجها قبل البلوغ إذا لم تكن مصلحة ظاهرة يخاف فوتها بالتأخير كحديث عائشة ، فيستحب تحصيل ذلك الزوج لأن الأب مأمور بمصلحة ولده فلا يفوتها ، والله أعلم
জেনে রাখুন, ইমাম শাফেয়ী ও তাঁর অনুসারীরা বলেছেন: পিতা ও দাদা যেন কুমারী কন্যাকে বালেগ হওয়ার আগে বিবাহ না দেন এবং তার অনুমতি নেন—যাতে তাকে অপছন্দনীয় অবস্থায় স্বামীর অধীনে আবদ্ধ না করা হয়।
তবে তাদের এ বক্তব্য আয়েশা (রাঃ)-এর হাদীসের বিরোধী নয়; কারণ তাদের উদ্দেশ্য হলো—যদি কোনো স্পষ্ট কল্যাণ না থাকে, যা বিলম্ব করলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখনই কেবল বালেগ হওয়ার আগে বিবাহ না দেওয়া উত্তম।
আর যদি এমন বিশেষ কল্যাণ থাকে (যেমন আয়েশা (রাঃ)-এর ক্ষেত্রে ছিল), তাহলে সেই উপযুক্ত পাত্রকে গ্রহণ করা মুস্তাহাব; কারণ পিতা সন্তানের কল্যাণ রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাই সে কল্যাণ হাতছাড়া করা উচিত নয়।[3]শরহে মুসলিম : ৯/২০৬
সৌদি আরবের প্রখ্যাত স্কলার শায়েখ সালেহ আল ফাউজান হাফিজাহুল্লাহ এর বক্তব্য
وليّها يقوم مقامها إذا رأى المصلحة أن يزوّجها وهي صغيرة ، بأن يزوجها من رجل صالح ، أو من عالم تقي ؛
অভিভাবক (ওলী) তার পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব করে, যদি সে কল্যাণ দেখে—যে, সে তাকে অল্প বয়সে বিবাহ দেবে; যেমন কোনো সৎ ব্যক্তি বা তাকওয়াবান আলেমের সাথে বিবাহ দেওয়া।[4]এয়ানাতুল মুসতাফিজ: ১/৩২৯
ইসলামে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহ সম্পূর্ণভাবে অভিভাবকের বিবেচনাধীন কল্যাণ (مصلحة) এর উপর নির্ভরশীল। পিতা বা ওলী নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী নয়; বরং কন্যার প্রকৃত উপকার, নিরাপত্তা, দ্বীনদারিতা এবং উপযুক্ত পাত্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এ ক্ষমতা শরীয়ত শুধুমাত্র দায়িত্বশীল, তাকওয়াবান অভিভাবকের জন্য নির্ধারণ করেছে, যিনি নিজের জবাবদিহিতা সম্পর্কে সচেতন।
নাবালেক অবস্থায় কি শারীরিক সম্পর্ক বৈধ?
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে যদিও নাবালেক বিবাহের শর্তসাপেক্ষে বৈধ , কিন্তু দাম্পত্য জীবন (রুখসতি ও সহবাস) তখনই বৈধ ও উপযুক্ত হবে, যখন মেয়েটি শারীরিকভাবে তা সহ্য করতে সক্ষম হবে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো বয়স নির্ধারিত নয়; বরং সক্ষমতাই মূল মানদণ্ড—এটাই অধিকাংশ ফকীহের (মালিক, শাফেয়ী, আবু হানীফা) মত।
এবার আসুন আমরা এ ব্যাপারে কিছু দলিল দেখে নেই :
عُمَرُ بْنُ حَفْصِ بْنِ غِيَاثٍ حَدَّثَنَا أَبِي حَدَّثَنَا الأَعْمَشُ قَالَ حَدَّثَنِي عُمَارَةُ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمٰنِ بْنِ يَزِيدَ قَالَ دَخَلْتُ مَعَ عَلْقَمَةَ وَالأَسْوَدِ عَلٰى عَبْدِ اللهِ فَقَالَ عَبْدُ اللهِ كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم شَبَابًا لاَ نَجِدُ شَيْئًا فَقَالَ لَنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّه“ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّه“ لَه“ وِجَاءٌ.
আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায় ! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। [5]বুখারী : ৫০৬৬
আল্লামাহ্ নাবাবী (রহঃ) বলেন: الْبَاءَةَ “বাআত” এর উদ্দেশ্য নিয়ে ‘উলামাগণের মাঝে দু’টি অগ্রগণ্য মত রয়েছে। তন্মধ্যে অধিক বিশুদ্ধ মত হলো, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সহবাস। সুতরাং মূল কথা হলো যে, সহবাসে সক্ষম সে যেন বিবাহ করে। আর যে স্ত্রীর ভরণ-পোষণে অক্ষম ও সহবাসে অক্ষম, তার যৌন চাহিদা দমন করার জন্য সিয়াম পালন করতে হবে আর এটাই তার খারাপ মনোবৃত্তি দূর করবে।
ইবন হাযম (রহঃ) বলেন: সহবাসে সক্ষম ব্যক্তি মাত্র সবার ওপর বিবাহ করা ফার্য, যদি তার বিবাহ করার সামর্থ্য থাকে। এতে যদি সে অক্ষম হয় তবে বেশী বেশী সিয়াম পালন করবে। আর এটাই এক দল সালাফগণের বক্তব্য।
বিবাহ করার সামর্থ্য বলতে দুইটি বিষয় বুঝানো হয়:
- প্রথম বিষযটি হলো: বিবাহ করার সামর্থ্য এবং নিজের স্ত্রীর ভরণপোষণের ক্ষমতা।
- দ্বিতীয় বিষযটি হলো: যৌন ক্ষমতা বা সংগমের ক্ষমতা।
যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর ভরণপোষণের ক্ষমতা রাখবে এবং যৌন ক্ষমতা বা সংগমের ক্ষমতা রাখবে, সে ব্যক্তি যেন বিবাহ করে, তার প্রতি এই হাদীসটি গভীরভাবে উৎসাহ প্রদান করে।
এই নিয়মটি শুধু পুরুষের ক্ষেত্রে নয় বরং নারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ যদি কোন নারী সহবাসের ক্ষেত্রে সক্ষম না হয় বা পরিপূর্ণ প্রস্তুত না হয় তাহলে তার ক্ষেত্রে বিবাহ করা নিষিদ্ধ।
মালিক, শাফেয়ী ও আবু হানীফা (রহ.) বলেন:
وقال مالك والشافعي وأبو حنيفة : حدُّ ذلك أن تطيق الجماع ، ويختلف ذلك باختلافهن ، ولا يضبط بسنٍّ ، وهذا هو الصحيح
আর মালিক, শাফেয়ী ও আবু হানীফা (রহ.) বলেন: এর সীমা (অর্থাৎ শারীরিক সম্পর্ক বৈধ হওয়ার ) হলো—সে সহবাসের উপযুক্ততা অর্জন করেছে কি না। এটি মেয়েদের ভেদে ভিন্ন হয়; নির্দিষ্ট কোনো বয়স দ্বারা তা নির্ধারিত নয়। এটিই সঠিক মত। [6]শরহে মুসলিম : ৯/২০৬
এ ব্যাপারে ইমাম নবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন
أما الدخول بالصغيرة فلا يلزم بالعقد ، فلا يدخل بها زوجها حتى تطيق الجماع ، ولا يشترط لذلك البلوغ ، وهذا أمر يختلف باختلاف البيئات والأزمان
ছোট বালিকার সঙ্গে সহবাস করার ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র বিবাহের চুক্তির দ্বারাই এটি বৈধ হয়ে যায় না। স্বামী তার সঙ্গে সহবাস করবে না যতক্ষণ না সে সঙ্গমের জন্য উপযুক্ত হয়।[7]শরহে মুসলিম, ৯/২০৬
هُزَالٍ أَوْ نَحْو ذَلِك
খতিব শিরবিনি (রহ) বলেছেন,
وَيَحْرُمُ وَطْءُ مَنْ لَا تَحْتَمِلُ الْوَطْءَ لِصِغَرٍ أَوْ جُنُونٍ أَوْ مَرَضٍ أَوْ هُزَالٍ أَوْ نَحْو ذَلِكَ لِتَضَرُّرِهَا بِهِ
“কোনো নারীর সাথে সহবাস হারাম হবে যদি সে এই ব্যাপারে সামর্থ্য না রাখে, এই কাজের জন্য অল্পবয়স্ক হয়, অসুস্থ থাকে, রোগা-পাতলা হয় অথবা অনুরূপ কোনো কারণে যাতে তার ক্ষতি হয়।”[8]মুগনি আল মুহতাজ ৪/৩৭৩
ইমাম সাদর আশ-শাহিদ হানাফী (রহ) (৪৮৩-৫৩৬ হি.) বলেন—
وفيه دليل على أنه لا بأس بأن تزف في حالة الصغر، لكن لا يغاشيها إلا إذا علم أنها تطيق ذلك.
অর্থাৎ— এবং এতে প্রমাণ আছে যে, ছোট বয়সে বিয়ে দেওয়ায় কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু যৌনসম্পর্ক স্থাপন করা যায় কেবল তখনই, যখন জানা যায় যে সে এটি সহ্য করতে সক্ষম।[9]শরহু আদাবুল কাজি লিল লিল-খাসাফ, ৪/১৩১
ইমাম বোরহানউদ্দিন আল-বুখারী হানাফী রহিঃ (৫৫১-৬১৬ হি.) বলেন—
ومن المشايخ من قال: ليس للزوج أن يدخل بها ما لم تبلغ، وأكثر المشايخ على أنه لا عبرة للسن في هذا الباب، وإنما العبرة للطاقة إن كانت صحة سمينة تطيق الرجال ولا يخاف عليها المرض من ذلك؛ كان للزوج أن يدخل بها وإن لم تبلغ تسع سنين. فإن كانت نحيفة مهزولة لا تطيق الجماع ويُخاف عليها المرض لا يحل للزوج أن يدخل بها، وإن كبر سنها وهو الصحيح.
অর্থাৎ— কিছু শায়েখ বলেন, স্বামীর অধিকার নেই যতক্ষণ না স্ত্রী পূর্ণবয়স্ক হয়। তবে অধিকাংশ শায়েখ মত দেন যে, এই ক্ষেত্রে বয়সের কোনো গুরুত্ব নেই; বরং বিবেচ্য বিষয় হলো শারীরিক সক্ষমতা। যদি মেয়েটি সুস্থ, শক্তিশালী এবং পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক সহ্য করতে পারে এবং এতে তার স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি আশঙ্কা না থাকে, তবে স্বামী যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে, এমনকি যদি তার বয়স নয় বছরও হয়।
কিন্তু যদি সে দুর্বল, পাতলা ও অসুস্থ হয়, যৌনসম্পর্ক সহ্য করতে না পারে এবং এতে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি আশঙ্কা থাকে, তবে স্বামীর জন্য এটি অনুমোদিত নয়। এবং যদি তার বয়স বেশীও হয়, আর এটি সঠিক।[10]মুহিত আল-বুরহানি, ৩/৪৮
এছাড়াও আরেকটি হাদিস লক্ষ্য করুন,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ لاَ ضَرَرَ وَلاَ ضِرَارَ ”
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহাও যাবে না।[11]ইবনে মাজার ২৩৪১
এ হাদীসটি তে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। আর তা হল ইসলামে কারো ক্ষতি করার হারাম। এই মূলনীতিকে সামনে রেখে অসংখ্য ওলামায়ে কেরামগণ এই বক্তব্য দিয়েছেন যে যদি কোন মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার কারণেই তার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে ওই মেয়েকে বিবাহ দেওয়া হারাম।
নাবালিকা অবস্থায় কোনো মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন করা হলে, সে সাবালিকা হওয়ার পর যদি মনে করে যে উক্ত বিবাহ বহাল রাখতে চায় না, তাহলে ইসলামী শরীয়ত তাকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই বিবাহ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার প্রদান করেছে। এই অধিকারকে ফিকহের পরিভাষায় “خِيَارُ الْبُلُوغِ” (সাবালিক হওয়ার পর পছন্দের অধিকার) বলা হয়। তবে এই অধিকার সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; বরং তা নির্ভর করে কে তার অভিভাবক হিসেবে বিবাহ সম্পন্ন করেছে এবং বিবাহে তার জন্য কোনো ক্ষতি বা অকল্যাণ সংঘটিত হয়েছে কি না—এসব বিষয়ের উপর।
حدثنا إِسْمَاعِيلُ قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكَ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْقَاسِمِ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ وَمُجَمَّعَ ابْنِي يَزِيدَ بْنِ جَارِيَةَ عَنْ حَنْسَاء بِنْتِ عِذَامٍ الأَنْصَارِيَّةِ أَنْ أَبَاهَا زَوْجَهَا وَهِيَ نَبِبٌ فَكَرِهَتْ ذَلِكَ فأنت رَسُولَ اللهِ ﷺ فَرَدَّ نَكَاحَهُ.
৫১৩৮. খান্না বিনতে খিযাম আল আনসারিয়্যাহ হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, যখন তিনি অকুমারী ছিলেন তখন তার পিতা তাকে বিয়ে দেন। এ বিয়ে তিনি অপছন্দ করলেন। এরপর তিনি রসূলুল্লাহ্-এর কাছে আসলেন। রসূলুল্লাহ এ বিয়ে বাতিল করে দিলেন।[12]সহীহ বুখারী হা/৫১৩৮,৫১৩৯, ৬৯৪৫, ৬৯৬৯
এখান থেকে এই কথাই স্পষ্ট হলো যে যদি কোন নাবালিকা মেয়েকে তার পিতা বিবাহ দেয় সে সাবালিকা হওয়ার পর যদি সেই বিয়েতে অপছন্দ করে তাহলে সে ওই বিয়েকে ভেঙ্গে ফেলতে পারবে।
ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহ) বলেন, পিতা-মাতার জন্য সমীচীন নয় যে, ছেলের বিবাহ এমন মেয়ের সাথে দিবে যাকে সে চায় না, মেয়েকে এমন ছেলের সাথে বিবাহ দিবে যাকে সে চায় না। যদি জোর করে ছেলে ও মেয়েকে বিবাহ দিতে চায় তখন ছেলে ও মেয়ে সেটার বিরোধীতা করলে তা অবাধ্যতা হিসেবে গণ্য হবে না।[13]ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘উল ফাতাওয়া ৩২/৩০, ৫২
শায়খ ইবনু বায (রহ) বলেন, ‘জোরপূর্বক বিবাহ দিলে, তার বিবাহ বিচ্ছেদের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে’[14]ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, ২২তম খণ্ড, পৃ. ৯৩-৯৪
সমাপিকা
ইসলামে অল্প বয়সে বিবাহকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবে এটি শর্তসাপেক্ষে বৈধ। মূল শর্ত হলো—অভিভাবক বা পিতা তখনই তার নাবালিকা কন্যাকে বিবাহ দিতে পারবেন যখন তিনি সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত হবেন যে এতে কন্যার জন্য প্রকৃত কল্যাণ ও মঙ্গল নিহিত রয়েছে। এটি কোনো সাধারণ অনুমতি নয়; বরং এটি সেই দায়িত্বশীল, পরহেযগার, দ্বীনদার অভিভাবকের জন্য প্রযোজ্য, যিনি সন্তানের নিরাপত্তা, উপযুক্ত পাত্র, এবং ভবিষ্যৎ কল্যাণ বিবেচনায় রাখেন।
শারীরিকভাবে সহবাসের ক্ষেত্রে ইসলামের নীতি হলো—নাবালিকা কন্যাকে শুধুমাত্র তখনই স্বামীর সাথে মিলিত হতে দেওয়া যাবে যখন সে শারীরিকভাবে সক্ষম হবে; নির্দিষ্ট কোনো বয়স নয়, সক্ষমতাই মূল মানদণ্ড। এ নীতি নিশ্চিত করে যে কোনো ধরনের ক্ষতি বা অপকারিতা ঘটবে না। যদি মেয়েটি সাবালিকা হওয়ার পর বিবাহ বহাল রাখতে চায় না, তাহলে ইসলাম তাকে সেই অধিকার দিয়েছে। এটি “خِيَارُ الْبُلُوغِ” নামে পরিচিত, যা কেবল সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে বিবাহ সম্পন্ন করেছে তার সচেতন ও কল্যাণমুখী অভিভাবক।
অতএব, ইসলামে কম বয়সে বিবাহ অনুমোদিত হলেও এটি সুনির্দিষ্ট শর্ত ও মূলনীতি অনুসরণ করে, এবং মেয়ের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও সক্ষমতা সবসময় সর্বোচ্চ প্রাধান্য পায়। এটি নাস্তিকদের অপপ্রচারের বিপরীতে ইসলামের সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল বিধানকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
Footnotes
| ⇧1 | আহকামুল কুরআন ২য় খন্ড ৩৪২ পৃষ্ঠা |
|---|---|
| ⇧2 | শরহে মুসলিম ৯/২০৬ |
| ⇧3, ⇧6 | শরহে মুসলিম : ৯/২০৬ |
| ⇧4 | এয়ানাতুল মুসতাফিজ: ১/৩২৯ |
| ⇧5 | বুখারী : ৫০৬৬ |
| ⇧7 | শরহে মুসলিম, ৯/২০৬ |
| ⇧8 | মুগনি আল মুহতাজ ৪/৩৭৩ |
| ⇧9 | শরহু আদাবুল কাজি লিল লিল-খাসাফ, ৪/১৩১ |
| ⇧10 | মুহিত আল-বুরহানি, ৩/৪৮ |
| ⇧11 | ইবনে মাজার ২৩৪১ |
| ⇧12 | সহীহ বুখারী হা/৫১৩৮,৫১৩৯, ৬৯৪৫, ৬৯৬৯ |
| ⇧13 | ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘উল ফাতাওয়া ৩২/৩০, ৫২ |
| ⇧14 | ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, ২২তম খণ্ড, পৃ. ৯৩-৯৪ |




