
আফগানিস্তানে গড়ে ওঠে একটি সংগঠনের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ-আমেরিকা পর্যন্ত। সংগঠনটি সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের (১৯৭৯-১৯৮৯) সময়ও রেখেছিল ভূমিকা। শুধু যুদ্ধ নয়, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অবদান রেখেছিল এই সংগঠন।
বলছিলাম আব্দুল্লাহ ইউসুফ আযযাম, উসামা বিন লাদেন এবং আব্দুল্লাহ আনাসের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মাকতাব আল খিদামাতের কথা। এটি মাকতাবু খিদমাতিল মুজাহিদীন আল-আরব বা আফগান সার্ভিস ব্যুরো নামেও পরিচিত ছিল। সংক্ষেপে বলা হতো MaK।
সংক্ষিপ্ত পরিচয়
মাকতাব আল খিদামাতের ব্যাপারে যদিও বিভিন্ন লেখক এবং ঐতিহাসিকের মধ্যে মতপার্থক্য আছে, তবে বেশ কয়েকটি বিষয় সুস্পষ্ট সঠিক বলে প্রমাণিত। সেগুলোই তুলে ধরা হবে।
MaK-এর অর্থায়ন করা হয়েছিল উসামা বিন লাদেনের পারিবারিক সম্পদ থেকে। জানা যায়, উসামা বিন লাদেন এই সংগঠনের পেছনে নিজের সম্পদ থেকে বছরে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় করতেন [1]Zaydan, Usama bin Ladin without Mask।
মাকতাব আল খিদামাত আসলে বহুমুখী কাজের সাথে জড়িত ছিল। প্রথমত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে আক্রমণ করলে MaK আরবসহ অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলের মুজাহিদিনদেরকে আফগান জিহাদে যোগ দেওয়ার জন্য নিয়োগ দিয়েছিল। MaK এসকল বিদেশীদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং তাদের নিয়ে একটি বড় জিহাদি বাহিনী গঠন করে নেতৃত্ব দেয়।
এছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে সংগঠনটির যেসকল শাখা ছিল, সেগুলো অর্থ সংগ্রহ করে আফগানিস্তানে মুজাহিদদের কাছে পাঠাতো। তাছাড়াও স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যারা যুক্ত হতেন, তাদের একাংশকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং আরেক অংশকে কোনো সামরিক দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার কাজ করতো সংগঠনটি। MaK-এর মাধ্যমে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার ও আব্দুর রসুল সাইয়্যাফের বাহিনীতে যোগ দিতে পারতো অনেকেই [2]Scheuer, Osama Bin Laden।
তবে মাকতাব আল খাদামাত কিছু ব্যক্তিকে শরণার্থী ও আহতদের সেবা করা, শিশুদের জন্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা, বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি কাজেও নিযুক্ত করেছিল।

শাখা-প্রশাখা
বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে সংগঠনটির অফিস স্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছিল অন্যতম কেন্দ্র। আবদুল্লাহ আযযাম ব্রুকলিন, সেন্ট লুইস, কানসাস সিটি, সিয়াটল, স্যাক্রামেন্টো, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং সান ডিয়েগোসহ যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩টি [3]Wright, Lawrence, Looming Tower, 2006 শহরে মোট ৫২টি [4]McGregor, “Jihad and the rifle alone”, and Bergen, The Osama bin Laden I Know. অফিস খুলেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম অফিসগুলো স্থাপন করা হয়েছিল ব্রুকলিনের আল কিফাহ রিফিউজি সেন্টার এবং অ্যারিজোনার টুকসনের ইসলামিক সেন্টারের ভেতরে। ব্রুকলিনের শাখাটি ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শুরুতে এটি পরিচালনা করতেন মুস্তাফা শালাবি, যিনি MaK-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আযযামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।
তাছাড়াও সৌদি আরব, মিশর, সুদান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোসহ (Gulf Cou সমগ্র আরব বিশ্বজুড়ে শাখা স্থাপন করা হয়েছিল। আরব ও পশ্চিমা দেশগুলোতে স্থাপিত অফিসগুলোর মাধ্যমে আফগানিস্তানে সংঘটিত জিহাদের জন্য কয়েক কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছিল।
আল-জিহাদ সাময়িকী
১৯৮৪ সালে মাকতাব আল খিদামাত থেকে প্রকাশিত হয় আল-জিহাদ নামক মাসিক সাময়িকী। প্রতি মাসে এর প্রায় ৭০,০০০ কপি প্রিন্ট করা হতো [5]Bergen, The Osama bin Laden I Know। আরবি ভাষায় প্রকাশিত এই ম্যাগাজিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচার ও নিয়োগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করত, যেখানে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে আরবদের প্রচেষ্টার বিবরণ তুলে ধরা হতো, যাতে বিদেশি যোদ্ধাদের আকৃষ্ট করা যায়।
আল-জিহাদ সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধকে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক জিহাদ আন্দোলনে রূপান্তর করতে সহায়তা করেছিল এবং এই লড়াইকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত করার আদর্শিক পরিবর্তনের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র মাকতাব আল খিদামাতের অফিসগুলোর মাধ্যমে এই ম্যাগাজিনের কপিগুলো যুক্তরাষ্ট্রেও ছড়িয়ে পড়ে।

শেষ…
আফগান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপর মাকতাব আল খিদামাতের ভবিষ্যত দিকনির্দেশনা নিয়ে আব্দুল্লাহ আযযাম এবং আইমান আল-জাওয়াহিরীর (যিনি সংগঠনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন) মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। এর আগে ১৯৮৬ সালের দিকেও আব্দুল্লাহ আযযামের সাথে উসামা বিন লাদেনের মতপার্থক্য দেখা দিতে থাকে, যদিও তারা পরস্পরকে শ্রদ্ধা-সম্মান করতেন।
১৯৮৯ সালের ২৪ নভেম্বর মাগরিবের নামাজের জন্য স্থানীয় মসজিদে যাওয়ার পথে আব্দুল্লাহ আযযাম ও তার দুই ছেলে অজ্ঞাত ঘাতকদের পুঁতে রাখা ৩টি মাইন বিস্ফোরণে শহিদ হন। এক পক্ষ সরাসরি এই হামলার দায় উসামা বিন লাদেনের উপর দিয়েছিল। কিন্তু আব্দুল্লাহ আযযামের স্ত্রী সেই দাবিকে পুরোই নাকচ করে দিয়েছিলেন, যে ব্যাপারটি উঠে এসেছে আল-জাজিরার I knew bin Laden শিরোনামের প্রামাণ্যচিত্রে।
আব্দুল্লাহ আযযামের মৃত্যুর পরে উসামা বিন লাদেন মাকতাব আল খিদামাতের নিয়ন্ত্রণ নেন। কিন্তু স্বতন্ত্র সংগঠন হিসেবে এটি বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেনি। এটা সংগঠনটির ব্যর্থতা ছিল না। আসলে পরবর্তীতে এই সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা সীমিত হয়ে গিয়েছিল এবং এই সংগঠনের অনেকেই পরে উসামা বিন লাদেন প্রতিষ্ঠিত আল-কায়েদায় যোগ দিয়েছিলেন।
অনেকে বলেন, আল-কায়েদা হলো মাকতাব আল খিদামাতের একটি বিবর্তিত সংস্করণ। তবে এটি পুরোপুরি সত্য নয়। তাছাড়াও মাকতাব আল খিদামাতের সেবামূলক কার্যক্রম থাকলেও আল-কায়েদার কার্যক্রম ছিল শুধুমাত্র সামরিক ক্ষেত্রে। কারণ ইতিমধ্যে বহু এমন সেবামূলক কার্যক্রম চলমান ছিল। একারণে আল-কায়েদার মূল নজর ছিল ময়দানের ফ্রন্টে।
উপসংহার
সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় কোনো সমস্যা না থাকলেও পরবর্তীতে মাকতাব আল খিদামাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং এটিকে ২০০১ সালের ৬ অক্টোবর ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে তালিকাবদ্ধ করা হয় [6]MAKHTAB AL-KHIDAMAT, United Nations Security Council। ধারণা করা হয়, সংগঠনটির কিছু সদস্যকে কুখ্যাত গুয়ান্তামো কারাগারেও বন্দি করা হয়েছিল [7]Alleged associates held at Guantanamo Bay, Wikipedia।
Footnotes
| ⇧1 | Zaydan, Usama bin Ladin without Mask |
|---|---|
| ⇧2 | Scheuer, Osama Bin Laden |
| ⇧3 | Wright, Lawrence, Looming Tower, 2006 |
| ⇧4 | McGregor, “Jihad and the rifle alone”, and Bergen, The Osama bin Laden I Know. |
| ⇧5 | Bergen, The Osama bin Laden I Know |
| ⇧6 | MAKHTAB AL-KHIDAMAT, United Nations Security Council |
| ⇧7 | Alleged associates held at Guantanamo Bay, Wikipedia |


