হোলি উৎসবের সূচনা – গালাগালি এবং নারীদের নিরাপত্তাহীনতা যখন ধর্মীয় উৎসব!

ভারতীয় রাজনৈতিক ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র হোলি খেলার ভিক্টিম রিসেন্টলি অনেক। প্রধান টার্গেট নারীরা এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষজন।
অহরহ খবরে দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়, কুরুচিপূর্ণভাবে মেয়েদের শরীরে ধরে রঙ/আবির মাখিয়ে দিচ্ছে। অশ্লীলভাবে স্পর্শ করছে। কিন্তু কথা একটাই, “Bura na mano, holi hein”।
অর্থাৎ, সামাজিকভাবেই লাইসেন্স দিয়ে রেখেছে যা খুশি তাই করার। এই দুইদিন আগের হোলি উৎসবেও এমন ঘটনা দেখা গেছে। স্পেশালি কম্যুনালভাবে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের মেয়েদের টার্গেট করা তো এখন অহরহ ঘটছে। তবে রিসেন্ট না, বহু আগে থেকেই। ১৯৮১ সালে হোলি উৎসবে ত্রিপুরায় এক মুসলিম নারীকে ধর্ষণচেষ্টা করা হয়, সে নিয়ে নেক্সট পোস্ট লিখতেসি।
হোলি উৎসবের সূচনাটাও করুন। পড়ুয়াদের মনে পরার কথা নিশ্চয়ই কীভাবে খ্রিস্টানরা লক্ষ লক্ষ মেয়েদেরকে ডাইনী তকমা দিয়ে পুড়িয়ে মেরে মধ্যযুগ কায়েম করেছিল। একইরকম কুসংস্কার ছিলো আর্যদের মধ্যে।
[ক]
অর্ঘ্য মুখার্জী তার ‘ধর্ম ও উপাসনা : এক নিবিড় পাঠ’ গ্রন্থে লিখছেন,
❝বসন্ত উৎসব সারা ভারতের উৎসব। উত্তর ভারতে ‘হোলি’, বিহারে ‘ফাগুয়া’ ও বাংলায় ‘দোলযাত্রা’। আদিতে এই উৎসব ছিল মূলত আর্যদের।…
উত্তর ভারতে, বিশেষ করে পঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে এই উৎসবকে বলা হয় ‘হোলি’ উৎসব। এই ‘হোলি’ নামটার পিছনে রয়েছে এক পৌরাণিক কাহিনী। হিরণ্যকশিপু নামে এক রাজা ছিল। তার বোনের নাম ছিল হোলিকা। সে ছিল নররাক্ষসী। তাই পূর্ণিমার আগের রাতে অর্থাৎ চতুর্দশীর রাতে লোকেরা হোলিকা নররাক্ষসীকে পুড়িয়ে মেরেছিল। এই উপলক্ষ্যে সেদিন তারা আনন্দে যে উৎসব করেছিল তার নাম ‘হোলিকা দহন’ উৎসব। সেই থেকে এই উৎসব চলে আসছে ‘হোলি উৎসব’ নামে। সারা ভারতেই এখন বসন্তোৎসবের সূচনা হয় আগের দিন রাতে শুকনো ডালপালা দিয়ে গড়া দৈত্যের প্রতীক অথবা শীতবুড়ির ঘর পোড়ানোর মধ্য দিয়ে। এটা সেই মূল আর্যরীতিরই সংস্করণ। বাংলায় একে বলা হয় ‘চাঁচর’, গ্রামবাংলায় ‘ন্যাড়াপোড়া’।
বাংলায় এই উৎসবের সূচনা করেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রায় ৫০০ বছর আগে। তিনি বৃন্দাবন পরিক্রমাকালে ওখানে ‘হোলি উৎসব’ দেখেন। মহাপ্রভু বাঙলায় এসে বিধান দিলেন, এই দিনটিতে ভক্তরা কৃষ্ণমন্দিরে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে রং-আবির দেবে। তারপর সেই রং ও আবির নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে খেলবে। আর যে যাকে রং দেবে, সে তাকে মালপোয়া খাওয়াতে বাধ্য থাকবে। এভাবেই মহাপ্রভু বাংলায় ‘শ্রীকৃষ্ণের দোলযাত্রা’ উৎসব প্রবর্তন করেছিলেন।❞[1]ধর্ম ও উপাসনা : এক নিবিড় পাঠ, অর্ঘ্য মুখার্জী, পৃ ১৪৮-১৪৯
‘নররাক্ষসী’ পোড়ার ঘটনাতে আনন্দ উৎসব!
[খ]
❝এই বৈষ্ণব ভাবানুষঙ্গই হিরণ্যকশিপুর ভগ্নী হোলিকা দানবীর ‘অগ্নিদাহনের পুরাণবৃত্ত সৃষ্টি করেছে: প্রহলাদকে কোলে নিয়ে অগ্নিতে প্রবেশ করে তাকে পুড়িয়ে মারতে গিয়ে হোলিকা নিজেই পুড়ে মরেছিল। চাঁচরের সঙ্গে এই গল্প খাপ খাইয়ে নিয়ে বৈষ্ণবধর্ম মাহাত্ম্য প্রচার করা হয়েছে অবশ্যই রাধাকৃষ্ণের দোললীলার প্রসারেব পরিপ্রেক্ষিতে। হোলির অঙ্গস্বরূপ গালাগালিকে বৈষ্ণবমতে জল চল করতে কল্পনা করা হয়েছে আরেক রাক্ষসীর ঢুনচিকাব। গালাগালির অশুচিতা নাকি তার আক্রমণ ঠেকাবে! স্পষ্টতই এ সব কাহিনী ‘আই ওয়াশ’ রূপেই ব্যবহৃত সামাজিক নীতির স্বাস্থ্য বক্ষার্থে।❞[2]পূজা-পার্বণের উৎসকথা, পল্লব সেনগুপ্ত, পৃ ১৩৭, পুস্তক বিপণি-কলকাতা, ছাপা: ১৯৫৯
কারো এক্সিডেন্টাল ডেথ কোনো ধর্মীয় উৎসব হয়ে যায়! তবে এটা খুব সহজেই অনুমেয় যে উত্তর ভারতের আর্যরা ‘দানব’ বলতে অনার্য জাতিকেই বোঝায়। অনার্য নারীর কোনো ট্র্যাজেডিতে উৎসব করার জন্যই আর্যরা এমন গল্প ছড়িয়েছে। লেখক এখানে বৈষ্ণবদের উপর দায় চাপিয়ে দিয়েছেন যে ‘রাধাকৃষ্ণের’ দোললীলার প্রসারের পরিপ্রেক্ষিতে এই গল্প ছড়ানো হয়েছিল।
[গ]
যোগেশচন্দ্র রায় ১৯৫১ সালে লিখেছিলেন,
❝বঙ্গদেশে হোলি নাম অজ্ঞাত ছিল। কয়েক বৎসর হইতে উত্তর-ভারতের লোকদিগের মুখে প্রচারিত হইয়াছে। নগর হইতে গ্রামে গ্রামে এখনও উপস্থিত হয় নাই। তাহারা হোলির সময় রুষ্পচূর্ণ ও রঞ্জিত জল পরস্পরের গাত্রে নিক্ষেপ করিয়া কৌতুক করে। সেদিন উত্তর-ভারতে ও অন্যত্র অশ্রাব্য অশ্লীল ভাষায় গান হয়। অকথ্য ভাষা পরস্পরের প্রতি প্রযুক্ত হয়। সেদিন পথে নারী বাহির হয় না।❞[3]পূজা-পার্বণ, শ্রীযোগেশচন্দ্র রায় বিধ্যানিধি, পৃ ৫, ছাপা: আশ্বিন ১৩৫৮, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, কলকাতা
এটাই উত্তর ভারত থেকে হয়ে আসা প্রচলন। নারী পথে কেন বের হয় না এই টেক্সট থেকেই স্পষ্ট!
গালাগালিও একটা সামাজিক উৎসব হয়!
[ঘ]
হোলিতে এই গালাগালিকে ‘মধুর’ বিবেচনা করেছেন কেউ কেউ![4]পুর্ণেন্দুমোহন ঘোষঠাকুর (১৯৫৯), শ্রীনাম-ভাগবতম্, খণ্ড-১, পৃ ৪৫, ফুটনোট দ্রষ্টব্য
[ঙ]
এবার আপনারাই বলুন, গালাগালির লাইসেন্স দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দিলে তারা কি নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে অন্য বিষয়ে সংযত থাকবে?
২০২৬ সালের হোলি উৎসবে কলকাতায় অসভ্য আচরণ, জোর করে রং মাখানো বা মত্ত অবস্থায় গোলমালের অভিযোগে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ৩৩০ জনকে গ্রেফতার করেছে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ।[5]ইটিভি ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, ৪ঠা মার্চ ২০২৬, [লিংক]
একাধিক ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে নারীদেরকে যৌন নিপীড়ন করার। এটা কি আসলে নিয়ন্ত্রণযোগ্য?
Footnotes
| ⇧1 | ধর্ম ও উপাসনা : এক নিবিড় পাঠ, অর্ঘ্য মুখার্জী, পৃ ১৪৮-১৪৯ |
|---|---|
| ⇧2 | পূজা-পার্বণের উৎসকথা, পল্লব সেনগুপ্ত, পৃ ১৩৭, পুস্তক বিপণি-কলকাতা, ছাপা: ১৯৫৯ |
| ⇧3 | পূজা-পার্বণ, শ্রীযোগেশচন্দ্র রায় বিধ্যানিধি, পৃ ৫, ছাপা: আশ্বিন ১৩৫৮, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, কলকাতা |
| ⇧4 | পুর্ণেন্দুমোহন ঘোষঠাকুর (১৯৫৯), শ্রীনাম-ভাগবতম্, খণ্ড-১, পৃ ৪৫, ফুটনোট দ্রষ্টব্য |
| ⇧5 | ইটিভি ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, ৪ঠা মার্চ ২০২৬, [লিংক] |




