১৯৭১ অধ্যায়

১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ – বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ধোঁয়াসা

এক

১৯৭১ সালে ইন্ডিয়ান আর্মির কাছে পাকিস্তান আর্মি ১৫ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ ঘোষণা করে। ভারতীয় আর্মি সেটা অফিশিয়ালি গ্রহণ করে পরদিন।[1]Beyond the Lines, Daily Star book, Dhaka, 2012, p.218 তবে মূলত ১৩ই ডিসেম্বর রাতেই পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান আর্মিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ পাঠায়।[2]বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান, এ কে নিয়াজি, বাংলা অনুবাদ, পৃ ২৬১

১৪ থেকে ১৬ তারিখ পাকিস্তান আর্মি ঢাকায় কোনো সামরিক স্টেপ নেয় নি, নেওয়ার মতো নির্দেশও পায় নি। এই টাইমস্ট্যাম্পে, বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো স্টেপ নেওয়াটা সামরিকভাবে তাদের কাছে কতটুকু যৌক্তিক ঠেকতো তা আলোচ্য।

দুই

“বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তালিকাটা একটু বাড়িয়ে দেখানো হয়। কারণ এ তালিকায় যাদের নাম ছিল তাদের কেউ কেউ তখনো জীবিত ছিলেন।”[3]বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান, এ কে নিয়াজি, বাংলা অনুবাদ, পৃ ২৬৭

তিন

মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি খান একাত্তর সালে বুদ্ধিজীবী হত্যার কথা অস্বীকার করেছেন, বলেছেন তিনি শুধু কাজ করতেন সিভিল বিষয়াদি নিয়ে।[4]পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে একাত্তর, সম্পাদনাঃ মুনতাসীর মামুন ও মহিউদ্দিন আহমেদ, পৃ XX, ভূমিকা অংশ এবং পৃ ১০০

চার

জহির রায়হান দাবি করেছিলেন, বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের পেছনে সংসদে আছে এমন অনেকেও জড়িত। এমনকি যুদ্ধের সময়ও তিনি দেখেছেন কে কী করেছে। তার সব রেকর্ড তার কাছে আছে। তিনি তা শীঘ্রই প্রকাশ করবেন।

এরপর রহস্যজনকভাবে তিনি গায়েব হয়ে যান। তাকে মৃত ঘোষণা করা হলেও তার লাশটাও পাওয়া যায় নি।

জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার প্রতিবাদে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করতে যায় তাঁর বোন নাফিসা কবির। শেখ মুজিব অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে রেখে দেখা করেন। তারপর তাঁকে বলেন,

“জহিরের নিখোঁজ নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে।”[5]সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ, রাহুর কবলে বাংলাদেশ সংস্কৃতি, ঢাকা, পৃষ্ঠা: ১০৮, আসলাম সানী রচিত “শত শহীদ বুদ্ধিজীবী”— কোট করেছেন পিনাকি ভট্টাচার্য, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ – খণ্ড-১, পৃ. ১২৬; মুক্তিযুদ্ধ : আগে ও পরে, পান্না কায়সার, আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারী, ১৯৯১, পৃ: ১৬৮; দৈনিক আজকের কাগজ ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩

পাঁচ

শাহরিয়ার কবিরের ১৯৯২ সালের বক্তব্য,

“…মিরপুরে দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হলে গভীর ষড়যন্ত্র মনে করার কোনো কারণ ছিল না। আমি যতদূর জানি, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন যা অনেক রথী-মহারথীর জন্যই বিপজ্জনক ছিল। সে জন্য তাকে  [জহির রায়হানকে] সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন ছিল।”[6]সাপ্তাহিক বিচিত্রা (ম্যাগাজিন), ১ই মে ১৯৯২

ছয়

বামপন্থী সাংবাদিক নির্মল সেনের দাবি, জহির রায়হানকে গুম করেছে মুজিববাহিনী। মুজিববাহিনীই বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার জন্য লিস্ট বানিয়েছিলো, আর সেটা বামপন্থী চিত্রনির্মাতা জহির রায়হান পেয়ে থাকতে পারে।[7]আমার জবানবন্দি; নির্মল সেন, ইত্যাদি গ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা: ৪০৬

১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ - বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ধোঁয়াসা

সাত

উদাহরণস্বরূপ, ১৪ই ডিসেম্বর রাতে খুন হওয়া মুনির চৌধুরী ছিলেন চীনপন্থী বাম। তারা পাকিস্তান আর্মির সাথে একত্রে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। মুনির চৌধুরী নিয়মিত পাকিস্তান আর্মির সাথে সখ্যতা রাখতেন। হত্যার তালিকায় আরো ছিলো পাকিস্তানপন্থী সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেন, শান্তি কমিটির পক্ষের লোক কবির চৌধুরী। তাদের হত্যা করার পেছনের মোটিভ অস্পষ্ট।

ডিসেম্বরের শেষদিকের এই বুদ্ধিজীবী হত্যার পেছনে পাকিস্তান আর্মি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামী ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে দায়ী করেছে ‘মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র’।[8]মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র, একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় (২য় সংস্করণ), ঢাকা: মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র, ১৯৮৭, পৃ. ১২৬ ও ১২৭

আট

ব্রিগেডিয়ার এ আর সিদ্দিকী বুদ্ধিজীবী হত্যার পেছনে ফরমান আলীকে সন্দেহ করেছেন তবে প্রমাণ করতে পারবেন না বলেছেন।[9]পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে একাত্তর, সম্পাদনাঃ মুনতাসীর মামুন ও মহিউদ্দিন আহমেদ, পৃ ৪৬

নয়

১৯৭১ সালে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।[10]‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ভারতীয় সেনাদের ষড়যন্ত্রের অংশ’– সময়ের আলো ডেস্ক, প্রকাশ: রোববার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৬:৫৩ পিএম https://www.shomoyeralo.com/news/339024

দশ

“একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরের দিকে ঢাকা শহরে রাজাকার আল বদরদের কোন কার্যকারিতা ছিল না। সে সময় কারা হত্যা করেছিলো স্ব-স্ব গৃহে অবস্থানকারীদের এ নিয়ে গত ৩৩ বছর যাবত জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠতম সমর্থক বৃটেনের সাবেক মন্ত্রী জন স্টোন হাউজ এই সময়ে সশরীরে ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭১-এর ২১ ডিসেম্বর আকাশবাণী, কোলকাতা কেন্দ্রে প্রদত্ত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জন স্টোন হাউজ বলেন, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে পাকিস্তানী সৈন্যেরাই যে জড়িত তার কাছে তার প্রমাণ আছে। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে জেনারেল পদমর্যাদার দশজন পাকিস্তানী অফিসারকে বিমানযোগে কোলকাতায় নিয়ে গিয়েছিল? জন স্টোন হাউজ ছিলো আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক। সুতরাং তার এই বক্তব্যকে মিথ্যা বলা যায় না। নিহত বুদ্ধিজীবীদের পরিবার পরিজনের চাপে পরবর্তীকালে যে তদন্ত কমিশন (দেশীয়) গঠন করা হয়েছিল, এর রিপোর্ট আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। যখন তদন্ত কমিটির রিপোর্টে সরকারের কাছে জমা দেন তখন আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় ছিলো। অথচ রহস্যজনক কারণে এই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ধামাচাপা দেয়া হয়।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে রাজাকার আল বদরেরা যদি সত্যি সত্যিই এর জন্য দায়ী হয়ে থাকে, তাহলে তখনই তাদের বিচার করে কঠোর শাস্তি দেয়া হলো না কেন? যুদ্ধের পরপরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং শাস্তিই তো স্বাভাবিক নিয়ম । কিন্তু কেন কোন্ সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সমস্ত ব্যাপারটাকে রহস্যময় করে রাখা হলো? এই ব্যর্থতা কাদের? কারা এর জন্য দায়ী?

ডঃ নীলিমা ইব্রাহীমসহ কয়েকজন শেখ মুজিবকে পীড়াপীড়ি করছিল বুদ্ধিজীবীদের জন্য আলাদা স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য। বিরক্ত হয়ে শেখ সাহেব বললেন, “আপা এতো বেশি মিনার বানালে এসবের পিলারে গরু বেঁধে রাখবে।” (সূত্র : দৈনিক বাংলাবাজার, উপসম্পাদকীয় – ১৬/৩/৯৮) শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শেখ সাহেবের এই উদাসীনতা রহস্যজনক।

অথচ প্রতিবছর বিশেষ দিনগুলোতে তাদের স্মরণে রেডিও-টিভিতে নাটকের মাধ্যমে, সভা-সমিতিতে আলোচনা অনুষ্ঠান করে উদোরপিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে গত তেত্রিশ বছর যাবত নিজেরা ধোয়া তুলসি পাতা সেজে বেতালের তবলা বাজাচ্ছে। একে পুঁজি করে বিভিন্ন রংয়ের বিভিন্ন তালের, বিভিন্ন চেতনার রাজনীতি করে যাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হই, যখন দেখি যাদেরকে হত্যাকারী বলে গত তেত্রিশ বছর যাবত চিহ্নিত করা হচ্ছে, তারাই এ হত্যালীলার তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের দাবি তুলছে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারের দাবি জানাচ্ছে। তবে এদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে জাতির সাথে আমিও বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচারপ্রার্থী। যে বা যারাই হত্যাকারী হোক না কেন, আমি তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট সাপেক্ষে বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার কামনা করি। এটাও জানি এ বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার হলে অনেকেরই অনকে রংয়ের, অনকে চেতনার রাজনীতি এদেশ থেকে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। কিছু নোংরা ও ষড়যন্ত্রকারী রাজনীতিবিদদের উৎপাত থেকে জাতি রেহাই পাবে॥”[11]সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ, আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল (২য় খন্ড), মে ২০০৪,পৃ: ৫৭০

সবাই একে অপরের উপর দায় চাপিয়েছে, এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের আসল হোতা কে, সে নিয়ে তদন্ত আজও হয় নি!

Citation is loading...
Footnotes
1 Beyond the Lines, Daily Star book, Dhaka, 2012, p.218
2 বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান, এ কে নিয়াজি, বাংলা অনুবাদ, পৃ ২৬১
3 বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান, এ কে নিয়াজি, বাংলা অনুবাদ, পৃ ২৬৭
4 পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে একাত্তর, সম্পাদনাঃ মুনতাসীর মামুন ও মহিউদ্দিন আহমেদ, পৃ XX, ভূমিকা অংশ এবং পৃ ১০০
5 সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ, রাহুর কবলে বাংলাদেশ সংস্কৃতি, ঢাকা, পৃষ্ঠা: ১০৮, আসলাম সানী রচিত “শত শহীদ বুদ্ধিজীবী”— কোট করেছেন পিনাকি ভট্টাচার্য, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ – খণ্ড-১, পৃ. ১২৬; মুক্তিযুদ্ধ : আগে ও পরে, পান্না কায়সার, আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারী, ১৯৯১, পৃ: ১৬৮; দৈনিক আজকের কাগজ ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩
6 সাপ্তাহিক বিচিত্রা (ম্যাগাজিন), ১ই মে ১৯৯২
7 আমার জবানবন্দি; নির্মল সেন, ইত্যাদি গ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা: ৪০৬
8 মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র, একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় (২য় সংস্করণ), ঢাকা: মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র, ১৯৮৭, পৃ. ১২৬ ও ১২৭
9 পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে একাত্তর, সম্পাদনাঃ মুনতাসীর মামুন ও মহিউদ্দিন আহমেদ, পৃ ৪৬
10 ‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ভারতীয় সেনাদের ষড়যন্ত্রের অংশ’– সময়ের আলো ডেস্ক, প্রকাশ: রোববার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৬:৫৩ পিএম https://www.shomoyeralo.com/news/339024
11 সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ, আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল (২য় খন্ড), মে ২০০৪,পৃ: ৫৭০
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button