পৃথিবী গোলাকার: জগৎবিখ্যাত ৩৫ আলেমের মতামত

বিজ্ঞান যত অত্যাধুনিক হবে ‘মহান আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে প্রাসঙ্গিক কথাগুলো ততই সত্যি বলে প্রমাণিত হবে।
কোরআনে পৃথিবীর আকারকে সমতল বলা হয়েছে ‘এই মর্মে কোরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের বিপরীতে কোরআনকে ভুল প্রমাণের চেষ্টা করে মূলত নাস্তিক ও ইসলাম বিদ্বেষীরা। তবে দুঃখজনক বিষয় হল, বর্তমানে কিছু মুসলিমও নাস্তিকদের এসব অপব্যাখ্যার ফাঁদে পড়েছে। এরা সবকিছু বাদ দিয়ে দিনরাত ‘পৃথিবীকে সমতল’ প্রমাণের ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এরা মূলত ইসলাম নিয়ে নাস্তিক ও ইসলাম বিদ্বেষীদের করা অভিযোগগুলোকে শক্তপোক্ত করছে।
পৃথিবী গোলাকার না সমতল— এটা আকিদার বা মুসলিমদের জন্য জানা জরুরি এমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ই নয়। ফলে এই বিতর্কের কোনো বাস্তব প্রভাব নেই আমাদের ঈমান, আমল কিংবা দুনিয়াবি জীবনে। এটি যে আকিদাগত মাসালা নয় সেই বিষয়ে ইমাম আলবানী (রাহি:) সহ আরও অনেক বিদ্বান বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
এই বিষয়গুলো সেই সাধারণ নীতির অন্তর্ভুক্ত যা সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেছেন, যা ইমাম মুসলিম (রাহি:) তাঁর সহীহ গ্রন্থে আনাস ইবনে মালিক (রা:) থেকে খেজুরের পরাগায়ণের ঘটনা প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন। যখন তিনি (রাসূল (ﷺ)) তাদের বলেছিলেন: “এটি তো কেবল একটি ধারণা যা আমি করেছিলাম। যখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে আদেশ করি, তখন তোমরা সাধ্যমতো তা পালন করো। আর যখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের দুনিয়ার কোনো বিষয় নিয়ে আদেশ করি, তখন তোমরা তোমাদের দুনিয়ার বিষয়গুলো সম্পর্কে বেশি অবগত।
এই বিষয়গুলো এমন নয় যা নিয়ে রাসূল (ﷺ)-এর কথা বলার কথা ছিল। আর যদি তিনি তাঁর হাদীসে বা মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে এ বিষয়ে কথা বলেও থাকেন, তবে তা কোনো মহৎ উদ্দেশ্য, নিদর্শন, অলৌকিকতা বা এই জাতীয় কিছুর জন্য।[1]সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নুর, ৪৯৭/১০
সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহ যে বিষয়ে নীরব থেকেছে, সে বিষয়ে নীরব থাকাই ঈমানের সৌন্দর্য। মহান আল্লাহর বহু হুকুম আহকাম ও রাসূল (ﷺ) -এর বহু দিক-নির্দেশনা এখনো আমাদের অজ্ঞাত বা অল্প জানা, যেগুলো আয়ত্ত করা আমাদের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। সুতরাং মহাজ্ঞানী আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) যখন পৃথিবী গোলাকার নাকি সমতল সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলেননি, তখন রাসূল (ﷺ) এর উম্মত হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো, এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি বা অকারণে বিতর্ক থেকে বিরত থাকা। কেননা, যদি সত্যিই এ তথ্য আমাদের জন্য জরুরী হতো, তবে নিশ্চয়ই রাসূল (ﷺ) তা ব্যাপকভাবে আলোচনা করে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
(مَا تَرَكْتُ شَيْئًا مِمَّا أَمَرَكُمُ اللهُ بِهِ إِلاَّ وَقَدْ أَمَرْتُكُمْ بِهِ وَلاَ تَرَكْتُ شَيْئًا مِمَّا نَهَاكُمُ اللهُ عَنْهُ إِلاَّ وَقَدْ نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ)
“এমন কোন জিনিস নেই, যা আমি তোমাদেরকে আদেশ করিনি, অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে তা আদেশ করেছেন এবং এমন কোন জিনিস নেই, যা আমি তোমাদেরকে নিষেধ করিনি, অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে তা নিষেধ করেছেন।’’[2]মুসনাদ আহমদ, হা/১৭১৭৪ ; তাবারানি কাবীর, হা/১৬৪৭ ; সিলসিলা সহীহাহ, হা/১৮০৩ ; আস-সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী, হা/১৩৮২৫ ; হাদিস সম্ভার, হা/১৩৬ — সনদ সহিহ
এরপরেও শুধুমাত্র তর্কের খাতিরে পেশ করছি : পৃথিবী যে গোলাকার ‘এ বিষয়ে উম্মাহর ইমামদের ইজমা রয়েছে। এ বিষয়ে ইসলাম কখনই আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে অসামঞ্জস্য নয় এবং নাস্তিক ও ইসলাম বিরোধীদের অভিযোগও মিথ্যা প্রমাণিত হয়, আলহামদুলিল্লাহ।
পৃথিবী গোলাকার হওয়ার বিষয়ে ৩৫ জন সুপরিচিত মুসলিম স্কলার ও ৩টি ফতোয়া বোর্ডের রায়
(১) শাইখ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
الأرض كروية عند أهل العلم قد حكى ابن حزم وجماعة آخرون إجماع أهل العلم على أنها كروية،
“আহলুল ইলমদের নিকটে পৃথিবী গোলাকার। ইবনু হাজম এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন যে, আলিমরা ইজমা করেছেন: পৃথিবী গোলাকার।”
— পৃথিবীকে ভূপৃষ্ঠ আমাদের জন্য সমতল করা হয়েছে যাতে এর উপর মানুষ বাস করতে পারে এবং স্বাচ্ছন্দের সাথে থাকতে পারে। পৃথিবীর আকার যে সামগ্রিকভাবে গোল তা এর এই সমতল হওয়ার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ কোনো গোল জিনিসের আকৃতি যদি খুব বৃহৎ হয়, তাহলে এর পৃষ্ঠ অনেক প্রসারিত হয়ে যায় (এবং সমতল বলে মনে হয়)।[3]. https://binbaz.org.sa/fatwas/5966/كروية-الارض .
(২) শাইখ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “পৃথিবী গোলাকার।”[4]সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, টেপ নং ৪৩৫-৪৩৬
https://www.al-albany.com/audios/content/3706/هل-العالم-كروي-أو-مسطح-وهل-هذه-المسألة-من-مسائل-العقيدة
https://www.al-albany.com/audios/content/3707/تابع-للسؤال-السابق-هل-العالم-كروي-أو-مسطح
https://www.al-albany.com/audios/content/3708/هل-هناك-أدلة-شرعية-تخالف-ما-وصل-إليه-العلم-التجريبي-في-كروية-الأرض-وحركتها .
(৩) শাইখ মুকবিল বিন হাদি আল ওয়াদিঈ রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়,
هل الأرض كروية أم مسطحة ؟ وما معنى قوله تعالى : ” وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ ” (الغاشية : ٢٠) ؟
পৃথিবী কি সমতল নাকি গোলাকার? আর আল্লাহ তায়ালা’র এই কথার, ‘আর জমিনের দিকে কীভাবে তাকে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে?’ (সুরা আল-গাশিয়া, ২০) অর্থ কি?
জবাবে তিনি বলেছেন,
اختلف العلماء فجمهور أهل العلم يقولون : إنها مسطحة ، وأبو محمد بن حزم وشيخ الإسلام ابن تيمية والحافظ ابن كثير وجمعٌ معهم يقولون : إنها كروية ، وليس هناك دليل من القرآن والسنة صريح بأنها كروية ولا أنها ليست بكروية ، أما مسطحة فممكن أن في حقنا مسطحة ولا يمنع أن أطرافها يلتف ويرتفع إلى فوق ، فما هناك دليل صريح يدل على ذلك فيٌرجع إلى الواقع ، فالذي يظهر أن أبا محمد ابن حزم وشيخ الإسلام ابن تيمية ومن جرى مجراهما أنهم واسعوا الأفق وأنهم عرفوا أن أطراف الدنيا مكورة والله المستعان . هذا وليس في الآية ما يمنع ذلك أعني قوله تعالى : ” وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ ” ( الغاشية : ٢٠)
“আলেমগণ এই বিষয়ে মতভেদ করেছেন। জুমহুর আহলুল ইলম বলেছেন, এটা সমতল। অন্যদিকে আবু মুহাম্মাদ ইবনু হাজম, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, হাফেজ ইবনু কাসির এবং তাদের সাথে একটি গোষ্ঠী বলেছেন, এটা গোলাকার। এটা গোলাকার কিংবা এটা গোলাকার না এই ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নতে কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই। আর সমতলের ব্যাপারে বলা যায় যে, এটা হতে পারে যে তা আমাদের কাছে সমতল এবং তার অংশগুলো বাঁকা হয়ে উপরে উঠাকে এটা মানা করে না। যেহেতু এই বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই তাই বাস্তবতার দিকেই ফিরে যেতে হবে। যেটা প্রকাশ পাচ্ছে যে আবু মুহাম্মাদ ইবনু হাজম ও শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এবং যারা তাদের পথে চলেছেন তারা অনেক বেশি অধ্যয়ন করেছেন এবং জানতে পেরেছেন যে পৃথিবীর প্রান্তগুলো গোলাকার। আল্লাহুল মুসতাআন। আর আয়াতটিতে এমন কিছু নেই যা এটাকে নিষেধ করে অর্থাৎ আমি তাঁর এই কথাকে বোঝাতে চাচ্ছি, ‘আর জমিনের দিকে কিভাবে তাকে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে?’ (সুরা আল-গাশিয়া, ২০)[5]. https://www.muqbel.net/fatwa.php?fatwa_id=1674 .
— এটাই শাইখ মুক্ববিল রাহিমাহুল্লাহ’র বিস্তারিত ফতোয়া। সমতলবাদিরা উক্ত ফতোয়া কাটছাট করে প্রচার করে থাকে।
(৪) শাইখ ইবনু উছাইমিন রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
“পৃথিবী গোল। এই কথার ভিত্তি হচ্ছে কুরআন, বাস্তবতা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী। কুরআনের প্রমাণ হচ্ছে এই আয়াতটি, যেখানে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, (خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ ۖ يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ ۖ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ ۖ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُّسَمًّى ۗ أَلَا هُوَ الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ) “তিনি (আল্লাহ) যথাযথভাবে আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তিনি রাতকে দিনের উপর এবং দিনকে রাতের উপর জড়িয়ে দিয়েছেন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন করেছেন সূর্য ও চাঁদকে। প্রত্যেকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চলছে। জেনে রাখ, তিনি মহাপরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল” (সুরা যুমার, ৩৯/৫)।[6]. ফাতাওয়া নুরুন ‘আলাদ দারব, ২/২৪ .
— এখানে (يُكَوِّرُ) শব্দটির অর্থ হল: জড়িয়ে দেওয়া বা প্যাঁচিয়ে দেওয়া। যেভাবে পাগড়ি প্যাঁচানো হয়। সবাই জানে যে, পৃথিবীতে রাত ও দিন একে অন্যের অনুসরণ করে। এর মানে দাঁড়ায়, পৃথিবী গোল, কেননা কোনো কিছুকে যদি অন্য কিছুর উপর প্যাঁচিয়ে দেওয়া হয় এবং সেই জিনিসটি যদি পৃথিবীকে ঘিরে প্যাঁচানো থাকে, তাহলে পৃথিবীকে অবশ্যই গোল হতে হবে।
তিনি (রাহি:) আরও বলেছেন:
لو قال قائل: إن الله عز وجل أخبر أن الأرض قد سطحت، قال: ( وإلى الأرض كيف سطحت) الغاشية/ 20 ، ونحن نشاهد أن الأرض مكورة ، فكيف يكون خبره خلاف الواقع ؟ فجوابه : أن الآية لا تخالف الواقع ، ولكن فهمه خاطئ إما لقصوره أو تقصيره ، فالأرض مكورة مسطحة ، وذلك لأنها مستديرة ، ولكن لكبر حجمها لا تظهر استدارتها ، وحينئذ يكون الخطأ في فهمه، حيث ظن أن كونها قد سطحت مخالف لكونها كروية
“যদি কেউ বলে যে, আল্লাহ তা’আলা জানিয়েছেন যে পৃথিবী সমতল করা হয়েছে, যেমন তিনি বলেছেন: ‘এবং পৃথিবীর দিকে যে, কীভাবে তা সমতল করা হয়েছে?’ (সূরা আল-গাশিয়াহ; ২০)। কিন্তু আমরা তো দেখছি পৃথিবী গোলাকার, তাহলে কি আল্লাহ তাআলার বানী বাস্তবের বিপরীত? এর উত্তর হলো: আয়াতটি বাস্তবতার বিপরীত নয়। বরং তার বোঝায় ভুল রয়েছে, হয়তো তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে কিংবা ত্রুটির কারণে। পৃথিবী গোলাকার এবং সমতল উভয়ই। কারণ এটি গোলাকার হলেও এর বিশাল আকারের কারণে এর গোলাকার ভাব প্রকাশ পায় না। এই পরিস্থিতিতে, তার বোঝার ভুল হয়, যখন সে মনে করে যে এর সমতল হওয়া এর গোলাকার হওয়ার বিপরীত।”[7]. মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ৮/৬৪৪ .
— অর্থাৎ, কোরআনের আয়াতসমূহের মাঝে কোনো ধরনের বিরোধ নেই। বাস্তবতাও এটাই যে পৃথিবী মূলত গোলাকার, তবে তার বিশালত্বের কারণে মানুষের চোখে সমতল মনে হয়।
(৫) শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
هَذَا وَقَدْ ثَبَتَ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَإِجْمَاعِ عُلَمَاءِ الْأُمَّةِ أَنَّ الْأَفْلَاكَ مُسْتَدِيرَةٌ
“কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মাহর আলেমদের ঐকমত্য দ্বারা এটি প্রমাণিত যে পৃথিবী গোলাকার।”[8].মাজমূ’উ ফাতাওয়া, ২৫/১৯৩.
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেছেন – ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ’র ছাত্র আহমদ ইবনে জা’ফর ইবনে আল-মুনাদী (রাহি:)-এর কথা:
وكذلك أجمعوا على أن الأرض بجميع حركاتها من البر والبحر مثل الكرة. – قَالَ: وَيَدُلُّ عَلَيْهِ أَنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالْكَوَاكِبَ لَا يُوجَدُ طُلُوعُهَا وَغُرُوبُهَا عَلَى جَمِيعِ مَنْ فِي نَوَاحِي الْأَرْضِ فِي وَقْتٍ وَاحِدٍ بَلْ عَلَى الْمَشْرِقِ قَبْلَ الْمَغْرِبِ
“একইভাবে তাঁরা (আলিমগণ) ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, ভুপৃষ্ঠ এবং সমুদ্র ধারণকারী পৃথিবী একটি গোলকের ন্যায়। — তিনি বলেন: এর প্রমাণ হলো এই যে, সূর্য, চাঁদ ও অন্যান্য নক্ষত্রের উদয় ও অস্ত পৃথিবীর সকল অঞ্চলের মানুষের কাছে একই সময়ে ঘটে না, বরং পশ্চিমাঞ্চলের চেয়ে প্রাচ্যবাসীদের কাছে আগে ঘটে।[9].মাজমু’উ ফাতাওয়া, ২৫/১৯৫.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন,
اعلم أن «الأرض» قد اتفقوا على أنها كروية الشكل
“তারা ঐক্যমত হয়েছেন যে পৃথিবী গোলক আকৃতি।”[10].মাজমু’উ ফাতাওয়া, ৫/১৫০.
ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহি:) আরও বলেন,
وكذا المتفقه قد ينازع في هذا زعما منه أن هذا مخالف للشريعة وليس مع واحد منها دليل شرعي ولا عقلي يخالف ذلك ولا يمنع كون الأفلاك مستديرة ولا ينقل عن أحد من أئمة الإسلام وعلمائه النزاع في ذلك بل قد ذكر غير واحد من علماء المسلمين مثل الشيخ أبي الحسيين ابن المنادي أحد العلماء المشاهير ذوي التصانيف الكثيرة من الطبقة الثانية من أصحاب الإمام أحمد ومثل أبي محمد بن حزم ومثل أبي الفرج ابن الجوزي إجماع المسلمين على أن الأفلاك مستديرة وأبو.
অনুরূপভাবে, একজন অল্পজ্ঞানী ব্যক্তিও পৃথিবীর আকার নিয়ে বিতর্ক করতে পারে এই ধারণার বশবর্তী হয়ে যে পৃথিবী গোল এই বিষয়টি শরীয়ত বিরোধী এবং এর স্বপক্ষে তাদের (এই মূর্খদের) কাছে কোনো শরয়ী বা আক্বলী দলিল নেই যা এর বিরোধিতা করে অথবা পৃথিবী গোলাকার হওয়াকে অস্বীকার করে।
বরং ইসলামের ইমাম ও আলেমদের কেউই এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেননি। বরং অনেক মুসলিম আলেম যেমন শায়েখ আবুল হুসাইন ইবনুল মুনাদী, যিনি ইমাম আহমাদের অনুসারীদের দ্বিতীয় স্তরের বিখ্যাত আলেমদের একজন এবং বহু গ্রন্থের রচয়িতা, তেমনি আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযম ও আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযীর মতো ব্যক্তিগণ পৃথিবীকে গোলাকার হওয়ার বিষয়ে মুসলিমদের ইজমা উল্লেখ করেছেন।
الحسين من أعظم الناس إطلاعا وكذلك هؤلاء وإذا ذكر هو أو غيره إجماع علماء المسلمين على أن الأفلاك مستديرة كان من نازع بعد هذا الإجماع من متكلم ومتفقه وغيرهما مسبوقا بالإجماع وما علمت منازعا في ذلك إلا نقل الإجماع الذي ذكره أبو الحسين بن المنادي وإن كان قد نقل عن بعض السلف نزاع في حركة الأفلاك لكن ما علمت عنهم نزاعا في استدارتها.
হুসাইন ছিলেন সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তিদের অন্যতম, এবং এই ব্যক্তিরাও। যখন তিনি বা অন্য কেউ পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার ব্যাপারে মুসলিম আলেমদের ইজমা উল্লেখ করেছেন, তখন এই ইজমার পরেও যে ব্যক্তি বিতর্ক করবে, চাই সে মুতাকাল্লিম হোক বা তথাকথিত জ্ঞানী অথবা অন্য কেউ, সে ইজমার পূর্বেই ভ্রান্ত বলে গণ্য হবে। আমি এ বিষয়ে আবুল হুসাইন ইবনুল মুনাদীর উল্লেখ করা ইজমার বিপরীত কোনো বিতর্ককারীর কথা জানতে পারিনি। যদিও কিছু সালাফ থেকে পৃথিবীর গতি নিয়ে ইখতিলাফ বর্ণিত হয়েছে, তবে তাদের থেকে এর গোলাকার হওয়া নিয়ে কোনো ইখতিলাফ আমার জানা নেই।[11].বায়ান তালবিসিল জাহমিয়্যাহ, ইবনু তাইমিয়্যাহ ৪/৫-৭.
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ’কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:
দু’জন মানুষ আসমান ও জমিনের আকৃতি নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলো। তাদের একজন বলল, “আসমান এবং পৃথিবী উভয়ই গোলাকার।” আরেকজন এ কথাটিকে অস্বীকার করে বলল, “এর কোনো ভিত্তি নেই” এবং সে তা প্রত্যাখ্যান করল। এ ক্ষেত্রে সঠিক অভিমত কোনটি? — তিনি উত্তরে বলেন,
السموات مستديرة عند علماء المسلمين ، وقد حكى إجماع المسلمين على ذلك غير واحد من العلماء أئمة الإسلام : مثل أبي الحسين أحمد بن جعفر بن المنادي أحد الأعيان الكبار من الطبقة الثانية من أصحاب الإمام أحمد وله نحو أربعمائة مصنف ، وحكى الإجماع على ذلك الإمام أبو محمد بن حزم وأبو الفرج بن الجوزي ، وروى العلماء ذلك بالأسانيد المعروفة عن الصحابة والتابعين ، وذكروا ذلك من كتاب الله وسنة رسوله ، وبسطوا القول في ذلك بالدلائل السمعية ، وإن كان قد أقيم على ذلك أيضا دلائل حسابية ، ولا أعلم في علماء المسلمين المعروفين من أنكر ذلك ، إلا فرقة يسيرة من أهل الجدل لما ناظروا المنجمين قالوا على سبيل التجويز : يجوز أن تكون مربعة أو مسدسة أو غير ذلك ، ولم ينفوا أن تكون مستديرة ، لكن جوزوا ضد ذلك ، وما علمت من قال إنها غير مستديرة – وجزم بذلك – إلا من لا يؤبه له من الجهال
“মুসলিম আলেমদের মতে আকাশমণ্ডলী গোলাকার। এবং মুসলিমদের এ বিষয়ে ঐকমত্য আছে বলে একাধিক ইসলামের ইমাম শ্রেণির আলেম বর্ণনা করেছেন। যেমন: আবুল হুসাইন আহমদ ইবনে জাফর ইবনুল মুনাদী (রাহিমাহুল্লাহ)., যিনি ইমাম আহমদের শিষ্যদের দ্বিতীয় স্তরের প্রখ্যাত শীর্ষস্থানীয় আলেমদের একজন, এবং প্রায় চারশোটি গ্রন্থ রচনা করেছেন—তিনি এ ব্যাপারে ইজমা বর্ণনা করেছেন। তেমনিভাবে ইমাম আবু মুহাম্মদ ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) ও আবুল ফারজ ইবনুল জাওযীও এ (ইজমা) ঐকমত্য উল্লেখ করেছেন। আলেমগণ পরিচিত সনদসমূহের মাধ্যমে সাহাবা ও তাবেঈন থেকে এই বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। তারা কিতাবুল্লাহ (কুরআন) এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ থেকে এর প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন এবং শ্রুতিমূলক দলিল দ্বারা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যদিও এর ওপর গণিতভিত্তিক প্রমাণও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মুসলিম আলেমদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কারও পক্ষ থেকে আমি কখনো এ বিষয়ে অস্বীকৃতি পাইনি। শুধুমাত্র কিছুসংখ্যক তর্কবিদ ছাড়া,যখন তারা জ্যোতিবিদদের সাথে বিতর্ক করার সময় বলেছিল যে, এটি বর্গাকার বা ষড়ভুজাকার কিংবা অন্য যেকোনো আকারের হতে পারে।তারা এর গোলাকার হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি, বরং এর বিপরীত সম্ভাবনা তুলে ধরেছিলেন মাত্র। আর আমি কাউকে জানি না, যে নিশ্চিতভাবে বলেছে আকাশ গোলাকার নয়—শুধুমাত্র সেই অজ্ঞ লোকেরা ছাড়া, যাদের মতামতের কোনো মূল্য নেই।”[12].মাজমূ‘উ ফাতাওয়া, ৬/৫৮৬.
(৬) ইমাম ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
إن البراهين قد صحت بأن الأرض كروية ، والعامة تقول غير ذلك ، وجوابنا وبالله تعالى التوفيق : أن أحداً من أئمة المسلمين المستحقين لاسم الإمامة بالعلم رضي الله عنهم لم ينكروا تكوير الأرض ، ولا يحفظ لأحد منهم في دفعه كلمة ، بل البراهين من القرآن والسنة قد جاءت بتكويرها … ”
“তাঁরা বলেন, পৃথিবী গোল এ ব্যাপারে ভালো প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু আম জনতা এর বিপরীত কথা বলে। আল্লাহর তাওফিকে এ ব্যাপারে আমাদের জবাব: মুসলিম উম্মাহর কোনো ইমাম যাঁরা ইলমের মাধ্যমে ইমাম উপাধি লাভের যোগ্য তাদের কেউই এ কথা অস্বীকার করেন নি যে, পৃথিবী গোল। তাঁদের থেকে এই কথা অস্বীকার করে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় নি। বরং কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত হয় যে, এটি (পৃথিবী) গোল।”[13].আল ফাসল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া-ই ওয়ান নিহাল, ২/৭৮.
(৭) ইমাম মুহাম্মাদ আল-ইদ্রিসি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
الهيئة أن الأرض مدورة كتدوير الكرة
“গোলাকার বলের ন্যায় পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার।”[14].নুজহাতুল মুশতাক, ১/৭.
(৮) ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
الأرض في وسط السماء كبطيخة في جوف بطيخة
“আসমানের ভিতরে পৃথিবী হচ্ছে তরমুজের অভ্যন্তরে তরমুজের মতো।”
وأن سفل العالم هو جوف كرة الأرض ،
“আর পৃথিবীর নিচু অংশ হচ্ছে গোলাকার পৃথিবীর অভ্যন্তরে।”[15].মুখতাছারুল উলু, পৃ. ৭৪.
(৯) ইমাম গাজ্জালী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
والأرض كرة
“পৃথিবী গোলাকার।”[16].তাহফাতুল ফালাসিফা, পৃ. ১০৫.
(১০) ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
والأرض كرة
“পৃথিবী গোলাকার।”[17].মিফতাহু দারুস- সা’আদাহ, ৩/১৪১৮.
(১১) ইমাম ইবনুল জাওযি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وكذلك أجمعوا على أن الأرض بجميع أجرامها من البرد مثل الكرة، ويدل عليه أن الشمس والقمر والكواكب لا يوحد طلوعها وغروبها على جميع من في نواحي الأرض في وقت واحد بل على المشرق قبل المغرب
একইভাবে ইমামগণ একমত হয়েছেন যে পৃথিবীর সকল পার্শ্বের অবয়ব গোলাকার। এর প্রমাণ হচ্ছে যে সূর্য, চন্দ্র এবং গ্রহসমূহ পৃথিবীর সকল অংশে একই সাথে একই সময়ে উদিত এবং অস্তমিত হয় না। বরং পশ্চিমদিকের আগে পূর্বদিকে উদিত হয়।[18].আল-মুনতাযাম ফি তারীখিল মুলক, ১/১৮৪.
(১২) ইতিহাসবিদ ‘ইবন খালদুন আল মালিকী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
اعلم أنّه قد تبيّن في كتب الحكماء النّاظرين في أحوال العالم أنّ شكل الأرض كرويّ وأنّها محفوفة بعنصر الماء
জেনে রাখুন, প্রজ্ঞাবান লেখকগণ ‘যারা পৃথিবীর অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করে থাকেন তাদের বই-পুস্তক থেকে পৃথিবী আকার গোল হবার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।[19]তারিখে ইবন খালদুন, ১/৫৭.
(১৩) বিখ্যাত তাফসীর আস-সাদীতে (সুরা আল-গশিয়াহ, আয়াত ২০)-এর ব্যাখায় শাইখ আব্দুর রহমান নাসির আস সাদী বলেছেন ‘পৃথিবী একই সাথে বিস্তৃত একই সাথে গোলাকার হতে পারে এটা পরস্পরের বিরোধী নয়।
(আর জমিনের দিকে, কীভাবে তা বিস্তৃত করা হয়েছে – وَإلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ)
واسعًا، وسهلت غاية التسهيل، ليستقر الخلائق على ظهرها، ويتمكنوا من حرثها وغراسها، والبنيان فيها، وسلوك الطرق الموصلة إلى أنواع المقاصد فيها. واعلم أن تسطيحها لا ينافي أنها كرة مستديرة، قد أحاطت الأفلاك فيها من جميع جوانبها، كما دل على ذلك النقل والعقل والحس والمشاهدة، كما هو مذكور معروف عند أكثر الناس، خصوصًا في هذه الأزمنة، التي وقف الناس على أكثر أرجائها بما أعطاهم الله من الأسباب المقربة للبعيد، فإن التسطيح إنما ينافي كروية الجسم الصغير جدًا، الذي لو سطح لم يبق له استدارة تذكر. وأما جسم الأرض الذي هو في غاية الكبر والسعة ، فيكون كرويًا مسطحًا، ولا يتنافى الأمران، كما يعرف ذلك أرباب الخبرة.
অর্থাৎ, অনেক প্রশস্ত করা হয়েছে এবং অনেক সহজ করা হয়েছে, যাতে করে সৃষ্টিরা এর ওপর চলাফেরা করতে পারে এবং তাতে চাষাবাদ, প্রাসাদ নির্মান ও বিভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে চলতে পারে। — জেনে রেখো যে, জমিনকে বিস্তৃত করাটা সেটি গোলাকার হওয়ার বিপরীত নয়। সেটির সকল দিক থেকে বিভিন্ন কক্ষপথ ঘিরে আছে, যেমনটি কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা, বিবেক, এবং বাহ্যিক অনুভবের মাধ্যমেও জানা যায়। আর এমনটি অধিকাংশ মানুষের নিকট সুপরিচিত, বিশেষ করে এই যুগের মানুষদের নিকটে। কেননা এখন মানুষজন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত সম্পর্কে জানতে পেরেছে। কারণ দূরের জিনিসকে দেখার জন্য বিভিন্ন মাধ্যম আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দান করেছেন। আর বিস্তৃত হওয়াটা ছোট আকৃতির গোলাকার বস্তুর বিপরীত হবে। কেননা ছোট আকৃতির গোলাকার বস্তুকে বিস্তৃত করলে সেটি আর সেই আকৃতিতে থাকবে না। — কিন্তু জমিনের আকৃতিটি হলো বিশাল প্রশস্ত। ফলে তার আকৃতি হলো বিস্তৃত গোলাকার। এই দুইয়ের মাঝে কোন বৈপরিত্য নেই। আর জ্ঞানী ব্যক্তিরাই এই বিষয়টি বুঝতে পারে। [20]তাফসীর আস-সাদি (বাংলা অনুবাদ) ১০/৩৬৪-৩৬৫ ; আরবি, পৃ. ৯২২ ; শামেলা।
(১৪) একই ফতোয়া দিয়েছে সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটি। (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) — কমিটির ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: পৃথিবী কি গোলাকার নাকি সমতল? তাঁরা জবাবে বলেন:
(الأرض كروية الكل مسطحة الجزء) “পৃথিবী সামগ্রিকভাবে গোলাকার, কিন্তু এর অংশবিশেষ (ভূপৃষ্ঠ) সমতল।”[21].ফাতাওয়া লাজনাতুদ দাইমাহ, ২৬/৪১৪.
— অর্থাৎ, পৃথিবীর আকার সামগ্রিকভাবে গোলকার, কিন্তু এর ভূপৃষ্ঠ (মানুষের চলাচল, বসবাসের অংশ) সমতল। এই সমতলের কথাই কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে বলা হয়েছে (এটি পৃথিবীর সামগ্রিক আকার নয়।)
(১৫) ইমাম ফখরুদ্দিন আর-রাযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
هَلْ يَدُلُّ قَوْلُهُ: وَالْأَرْضَ مَدَدْناها عَلَى أَنَّهَا بَسِيطَةٌ؟ — قُلْنَا: نَعَمْ لِأَنَّ الْأَرْضَ بِتَقْدِيرِ كَوْنِهَا كُرَةً، فَهِيَ كُرَةٌ فِي غَايَةِ الْعَظَمَةِ، وَالْكُرَةُ الْعَظِيمَةُ يَكُونُ كُلُّ قِطْعَةٍ صَغِيرَةٍ مِنْهَا، إِذَا نُظِرَ إِلَيْهَا فَإِنَّهَا تُرَى كَالسَّطْحِ الْمُسْتَوِي، وَإِذَا كَانَ كَذَلِكَ زَالَ مَا ذَكَرُوهُ مِنَ الْإِشْكَالِ، وَالدَّلِيلُ عَلَيْهِ قَوْلُهُ تَعَالَى: وَالْجِبالَ أَوْتاداً [النَّبَأِ: ٧] سَمَّاهَا أَوْتَادًا مَعَ أَنَّهُ قَدْ يحصل عليها سطوح عظيمة مستوية، فكذا هاهنا.
যদি বলা হয়: “এবং আমি যে পৃথিবী ছড়িয়ে দিয়েছি” শব্দগুলো কি ইঙ্গিত করে যে এটি সমতল? আমরা উত্তর দেব: হ্যাঁ, কারণ পৃথিবী, যদিও এটি গোলাকার, একটি বিশাল গোলক, এবং এই বিশাল গোলকের প্রতিটি ছোট অংশ, যখন এটির দিকে তাকানো হয়, তখন এটি সমতল বলে মনে হয়। যেহেতু এই ক্ষেত্রে, এটি তারা যা বিভ্রান্তির কথা বলেছে তা দূর করবে। এর প্রমাণ হল সেই আয়াত যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন (অর্থের ব্যাখ্যা): “এবং পাহাড়গুলি খুঁটি হিসাবে” (আন-নাবা, ৭৮/৭)। তিনি তাদের আওতাদ (খুঁটি) বলেছেন যদিও এই পর্বতগুলির বিশাল সমতল পৃষ্ঠ থাকতে পারে। এবং এই ক্ষেত্রেও একই কথা।[22].তাফসির আল-কাবীর, ১৯/১৩১.
এছাড়াও, ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী (রহ.) সূরা বাকারার ১৬৪ নং আয়াতের ব্যাখায় প্রমান করেছেন যে “পৃথিবী গোলাকার”। এবং সমতলবাদিদের অভিযোগের জবাব দিয়েছেন।[23].তাফসীর আল-কাবীর, সূরা বাকারা, আয়াত ১৬৪ ; ৪/১৬৪-১৬৫ পৃ..
(১৬) শাইখ রাফি‘উদ্দীন ইবনে ওয়ালিউল্লাহ আদ-দেহলভী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর কিতাব আত-তাকমিলে বলেছেন,
أهل الشرائع يفهمون من مثل قوله تعالى (الْأَرْضَ فِرَاشًا)، و (دَحَاهَا)، و (سُطِحَتْ) أنها سطح مستو، والحكماء يثبتون كرويتها بالأدلة الصحيحة فيتوهم الخلاف، ويدفع بأن القدر المحسوس منها في كل بقعة سطح مستو، فإن الدائرة كلما عظمت قل انجذاب أجزائها فاستواؤها باعتبار محسوسية، أجزائها، وكرويتها باعتبار معقولية جملتها انتهى
“কেউ কেউ হয়তো শব্দগুলি এভাবে বুঝতে পারে যেমন [পৃথিবীকে বিছানা হিসাবে তৈরি করেছেন” (আন-নাবা 78:6), “তিনি পৃথিবী ছড়িয়ে দিয়েছেন” (আন-নাজিআত 79:30) এবং “…কীভাবে এটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে…” (আল-গাশিয়াহ 88: 20)] এই শব্দগুলোর অর্থ হল এটি সমতল, যেখানে পণ্ডিতগণ নিশ্চিত করেছেন যে এটি সঠিক প্রমাণের ভিত্তিতে গোলাকার, তাই মনে করা হয় যে একটি দ্বন্দ্ব রয়েছে। এটি এই সত্য দ্বারা খণ্ডন করা যেতে পারে যে এর দৃশ্যমান (পৃথিবীর) অংশটি (এটির উপর দাঁড়িয়ে থাকা একজন ব্যক্তির জন্য) সমতল দেখায়, কারণ একটি বৃত্ত যত বড় হয়, এটি তত বেশি ছড়িয়ে পড়ে, তাই আমরা বলতে পারি যে এটির ভিত্তিতে সমতল। এটির সেই অংশটি যা আমাদের কাছে দৃশ্যমান, এবং এটি সম্পূর্ণরূপে বৃত্তাকার, যুক্তিতত্ত্বের ভিত্তিতে (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)।”[24].সিদ্দিক হাসান খান স্বীয় তাফসীরে তার থেকে উদ্ধৃত করেছেন ; ফাতহুল বায়ান, ১৫/২০৮.
(১৭) আল্লাহ তা’আলা সাত আসমান স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন (সুরা মূলক, ৬৭/৩) এ আয়াতের ব্যাখায় ইমাম ইব্রাহিম বিন ওমর আল-বিকাঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
“আয়াতে আসমানসমূহকে যথাযথ স্তর হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এক স্তরের উপর আরেক স্তর -যা নির্দেশ করে যে এগুলো প্রতিসম। এটা কেবল তখনই সম্ভব হতে পারে যদি পৃথিবী গোলাকার হয় এবং ১ম আসমান পৃথিবীকে ঠিক সেভাবে বেষ্টন করে রাখে যেভাবে ডিমের খোসা ডিমকে সব দিক থেকে বেষ্টন করে রাখে। একইভাবে ২য় আসমানও ১ম আসমানকে বেষ্টন করে রাখে। এভাবেই চলতে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত আল্লাহর আরশ সব কিছুকে বেষ্টন করে। এর মধ্যে আরশের সবচেয়ে নিকটে হচ্ছে কুরসী যা আরশের তুলনায় মরুভুমির মধ্যে একটি আংটির মতো। কাজেই যা কিছু কুরসীর নিচে আছে, সেগুলো আর কী রকমেরই বা হতে পারে? প্রতিটি আসমান একে অন্যের উপরে সমান অনুপাতে আছে। এটি জ্যোতির্বিদদের দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত তথ্য। এবং শরিয়তের কোনো তথ্য এর সাথে সাংঘর্ষিক বলে প্রমাণিত নয় বরং নস (কুরআন-সুন্নাহর পাঠাংশ) দ্বারা এর সত্যতারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।”[25].নাযমুদ দুরার ফি তানাসুবুল আয়াত ওয়াস সূওয়ার ; তাফসিরে বিকাঈ, ২০/২২৩.
(১৮) ইমাম আশ-শানকিতি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন:
যদি ইসলামের পণ্ডিতরা পৃথিবীকে গোলাকার বলে স্বীকার করেন, তাহলে তারা সেই আয়াত সম্পর্কে কী বলবেন যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তবে কি তারা উটের দিকে লক্ষ্য করে না যে, কিভাবে ওকে সৃষ্টি করা হয়েছে? এবং আকাশের দিকে যে, কিভাবে ওটাকে ঊর্ধ্বে উত্তোলন করা হয়েছে? এবং পর্বতমালার দিকে যে, কিভাবে ওটাকে স্থাপন করা হয়েছে? এবং ভূতলের দিকে যে, কিভাবে ওটাকে সমতল করা হয়েছে?” (সুরা আল-গাশিয়াহ, ১৭-২০)
আর এর জবাব হলো: এটি তাদের সেই জবাবের মতোই যা তারা আল্লাহর এই বাণী সম্পর্কে দিয়েছিলেন: “অবশেষে যখন তিনি (জুলকারনাইন) সূর্যের অস্তগমনস্থলে পৌঁছালেন, তখন দেখলেন যে তা একটি কর্দমাক্ত জলাশয়ে অস্ত যাচ্ছে।” (১৮/৮৬) — অর্থাৎ, (সূর্য অস্ত যাচ্ছে) চক্ষুর দৃষ্টিতে। কারণ, সূর্য এক জাতি থেকে অদৃশ্য হয়, আর অন্য জাতির দিগন্তে তা দৃশ্যমান থাকে, যতক্ষণ না তা পরের দিন সকালে পূর্ব দিক থেকে তার উদয়স্থলে ফিরে আসে।
আর পৃথিবীর বিস্তৃত হওয়া এবং সমতল হওয়াটি হলো তার বিশালতা এবং বৃহৎ আকারের কারণে এর প্রতিটি অঞ্চল ও অংশের প্রতি দৃষ্টি রেখে। আর এটি পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতির (গোলাকার) সাথে কোনো সাংঘর্ষিক নয়। কেননা, আমরা হয়তো একটি সুউচ্চ পর্বত দেখি, কিন্তু যখন আমরা তাতে আরোহণ করি এবং চূড়ায় পৌঁছাই, তখন সেখানে একটি সমতল পৃষ্ঠ দেখতে পাই, এবং সেখানে সকল প্রয়োজনীয় উপকরণসহ একটি জনপদ দেখতে পাই। আর হয়তো সেই জনপদের কিছু মানুষ বাকি বিশ্বের ব্যাপারে জানেই না। ব্যাপারটি এমনই। আর আল্লাহ্ তা’আলাই সর্বাধিক অবগত।[26].আদওয়া আল-বায়ান, ৮/৪২৮.
(১৯) ইবন আরাফাহ আল-মালিকী আল-আশআরী রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৮০৩ হি.) বলেছেন,
بأن ذكرها بالمطابقة أولى من ذكرها بالتضمن والالتزام، لأنها مشاهدة مرئية، ومذهب (المتقدمين أنها بسيطة ومذهب) المتأخرين أنها كروية.قال الغزالي في النهاية ولا ينبني على ذلك الكفر ولا إيمان.
“পূর্ববর্তীদের মতে এটি সমতল হলেও পরবর্তী যুগের লোকেদের মতে এটি গোলাকার।” (কিন্তু তিনি স্পষ্ট করেননি তিনি পূর্ববর্তী বলতে কাদের বুঝিয়েছেন আর না কোনো দলিল পেশ করেছেন। তিনি পূর্ববর্তীদের মতে পৃথিবীর সমতল হবার দাবি করলেও একে ইমান বা কুফরের বিষয় বলে দাবি করেননি।) ইমাম গাজ্জালী (রাহি:) ‘আন-নিহায়াহ’ গ্রন্থে বলেছেন: (পৃথিবী গোলাকার নাকি সমতল) এই বিশ্বাসের উপর ঈমান বা কুফর নির্ভর করে না।[27].তাফসীরে ইবনে আরাফাহ, ২/৮০০.
(২০) হাফিয জালালুদ্দীন সুয়ূতি (মৃত্যু ৯১১ হি.) রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
(دحاها) : بسطها، وبهذا استدل من قال: إن الأرض بسيطة غير كروية، ولكن يفهم من هذه الآية أن الأرض خلقت قبل السماء. وفي آية فصلت السماء قبلها، والجمع بينهما أن الله خلقها قبل السماء، ثم دحاها بعد ذلك
“তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন, প্রশস্ত করেছেন” – এই কালাম সে সকল লোকেরা দলিল গ্রহণ করে, যারা পৃথিবীকে গোলাকার নয় বরং সমতল বলে। তবে এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে পৃথিবীকে আকাশের পূর্বে সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে আরেকটি আয়াতে এসেছে যে, তার আগেই আসমানকে আলাদা করা হয়েছিল। এদের সমন্বয় করলে বোঝা যায় যে আল্লাহ আসমানের পূর্বে পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছিলেন অতঃপর একে বিস্তৃত করে দেন।[28].মু’তারাক আল-আক্বরান ফি ই’জাযিল কুরআন, ২/১৭৪.
— অর্থাৎ, পৃথিবী শুরু থেকেই সত্তাগত ভাবে গোলাকার ছিল, পরবর্তীতে প্রানীকুলের বসবাসের উপযোগী করতে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন।
(২১) নিজাম উদ্দীন আন নাইসাবুরী আশ শাফেঈ (মৃত্যু ৮৫০ হি.) রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
“তিনি যমীনকে প্রশস্ত করেছেন.” এর অর্থ সম্পর্কে আল-আসাম বলেছেন, তিনি এর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এমনভাবে সম্প্রসারণ করেছেন যা কল্পনাতীত। পৃথিবীর প্রান্তের অংশসমূহ বিশাল হবার দরুন বাহ্যিক অর্থে এই সম্প্রসারণ বলে যা প্রতীয়মান হয় তা পৃথিবী গোলাকার হবার মতের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।[29].তাফসীরুন নাইসাবুরী ; গারাইবুল কুরআন ওয়া রাগাইবুল ফুরকান, ৪/১৩৭.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন,
فقال حكماء الإسلام: قد ثبت بالدلائل اليقينية أن الأرض كروية في وسط العالم، وأن السماء محيطة بها من جميع الجوانب، وأن الشمس في فلكها تدور بدوران الفلك. وأيضا قد وضح أن جرم الشمس أكبر من جرم الأرض بمائة وست وستين مرة تقريبا،
ইসলামের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিগণ বলেছেন, দলিল-প্রমাণাদির আলোকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে পৃথিবী তার মধ্যভাগের দিকে গোলাকৃতির। আকাশ একে চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করে আছে। আর সূর্য তার নিজস্ব পরিক্রমণপথে তার নিজ অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।[30].তাফসীরুন নাইসাবুরী ; গারাইবুল কুরআন ওয়া রাগাইবুল ফুরকান, ৪/৪৫৯.
(২২) মুহাম্মাদ বিন আব্বাস আল খাওরাযিমি (মৃত্যু ৩৮৩ হি.) বলেন,
قال قائلون الأرض كرة مدورة وقال آخرون مسطحة وأصحها أن الأرض مدورة مسيرة خمسمائة عام كأنها نصف كرة مدورة فيكون سطحها أرفع ولذلك كانت الجزيرة التي وسط الارض أعلى الارض وأقطارها أعمق
কিছু কথকদের দাবি হচ্ছে যে পৃথিবী গোলাকার আর অন্যান্যদের দাবি হচ্ছে পৃথিবী সমতল। তন্মধ্যে সবচেয়ে সঠিক মত হচ্ছে পৃথিবী ৫০০ বছর যাবত তার ভ্রমণপথে গোলাকারভাবে রয়েছে। এটির গোলাকার গোলার্ধ সম্পন্ন, তাই এর পৃষ্ঠ পুরু। এজন্য পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থিত দ্বীপগুলো পৃথিবীর পৃষ্ঠের উপর অধিক উঁচু থাকে আর পৃথিবীর ব্যাস গভীর।[31].মুফীদুল উলূম ওয়া মুবীদুল হুমূম, পৃ. ২১৪.
(২৩) আবু আব্দুল্লাহ আদ-দারানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
قال ابن عطية: وقوله مد الأرض، يقتضي أنها بسيطة لا كرة، وهذا هو ظاهر الشريعة. قال أبو عبد الله الداراني: ثبت بالدليل أن الأرض كرة، ولا ينافي ذلك قوله: مد الأرض، وذلك أن الأرض جسم عظيم. والكرة إذا كانت في غاية الكبر كان كل قطعة منها تشاهد كالسطح، والتفاوت بينه وبين السطح لا يحصل إلا في علم الله تعالى. ألا ترى أنه قال: والجبال أوتادا «1» مع أن العالم والناس يسيرون عليها فكذلك هنا
দলিলাদির আলোকে পৃথিবীর গোলাকার হওয়াটা প্রমাণিত আর পৃথিবীকে প্রশস্ত করার ব্যাপারে আল্লাহর বাণীর সাথে উক্ত মতটি সাংঘর্ষিক নয়। তার কারণ, পৃথিবী অবয়ব বিশালাকার। কোনো বল বিশালাকার হলে তার প্রত্যেকটি অংশই পৃষ্ঠের মতো হতে পারে। মানুষ এবং সেই পৃষ্ঠের মধ্যকার অসমতার ব্যাপারে জ্ঞান আল্লাহ তা’আলা ছাড়া কারো কাছে নেই। (অর্থাৎ তিনিই ভালো জানেন কীভাবে গোলাকৃতি হওয়া সত্ত্বেও মানুষ স্থির থাকে)। তুমি কি দেখো না যে আল্লাহ পাহাড়কে পেরেকের ন্যায় বলেছেন কিন্তু আলেম আর সাধারণ মানুষও তার উপর দিয়ে স্বাচ্ছন্দে চলাচল করতে পারে, এটিও তেমন।[32].আল-বাহরুল মুহিত, ৬/৩৪৬.
(২৪) শাইখুল ইসলাম ইবন হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ এর ছাত্র বুরহান উদ্দীন বিকাঈ (মৃত্যু ৮৮৫ হি.) তার তাফসিরে লিখেছেন,
{الذي مد الأرض} ولو شاء لجعلها كالجدار أو الأزج لا يستطاع القرار عليها، وهذا لا ينافي أن تكون كرية، لأن الكرة إذا عظمت كان كل قطعة منها تشاهد كالسطح، كما أن الجبال أوتاد والحيوان يستقر عليها
“আল্লাহ চাইলেই পৃথিবীকে দেয়াল বা ধনুকাকৃতির খিলান রূপে তৈরি করতে পারতেন, তখন এর উপর দাঁড়ানো সম্ভব হতো না। তবে এর পৃষ্ঠকে প্রশস্ততা করাটা এর গোলাকৃতি হবার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ, গোলাকৃতি বস্তু যদি বিশালাকার হয় তবে এর প্রত্যেকটি অংশ একেকটি পৃষ্ঠরূপে প্রতীয়মান হয়। তদ্রুপ পাহাড়কেও আল্লাহ পৃথিবীর জন্য পেরেক বলেছেন তবুও প্রাণীকূল তার উপর আশ্রয় নিতে পারে।”[33]নাজমূদ দুরার ফী তানাসুবিল আয়াতি ওয়াস সুওয়ার, ১০/২৭৪
(২৫) আল খাতিব আশ শিরবিনী আশ শাফেঈ (মৃত্যু ৯৭৭ হি.) রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أجيب: بأنّ الأرض جسم عظيم والكرة إذا كانت في غاية الكبر كان كل قطعة منها تشاهد كالسطح كما أنّ الله تعالى جعل الجبال أوتاداً مع أنّ العالم من الناس يستقرّون عليها، فكذلك ومع هذا فالله تعالى قد أخبر أنه مدّ الأرض ودحاها وبسطها، وكل ذلك يدل على التسطيح والله تعالى أصدق قيلاً وأبين دليلاً من أصحاب الهيئة هذا هو الدليل الأوّل من الدلائل الأرضية
আমার উত্তর হবে যে, পৃথিবী বিশালাকার আর গোলক যদি অত্যন্ত বিশালাকার হয় তবে এর প্রত্যেক অংশই পৃষ্ঠকরূপে প্রতীয়মান হবে। যেমন, আল্লাহ পাহাড়কে পেরেকরূপে বানিয়েছেন (বাহ্যিক অর্থে) তবুও দুনিয়ার মানুষ তার উপর আশ্রয় নেয়। তবুও, আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে তিনি পৃথিবীকে প্রশস্থ, বিস্তৃত ও সম্প্রসারণ করেছেন যা সমতল পৃষ্ঠের ইঙ্গিত দেয়। আর আল্লাহ তা’আলার কথাই সত্য এবং ঐ সব আকার বিশেষজ্ঞদের চাইতে আল্লাহর তা’আলার প্রমাণই অধিক স্পষ্ট।[34].আস-সিরাজুল মুনীর, ২/১৪৫.
(২৬) ব্যাকরণবিদ ইমাম আবুল কাসিম আয-যামখাসরি (মৃত্যু ৫৩৪ হি.) তার তাফসিরে লিখেছেন,
طلحة: مهادا. ومعنى جعلها فراشا وبساطا ومهادا للناس: أنهم يقعدون عليها وينامون ويتقلبون كما يتقلب أحدهم على فراشه وبساطه ومهاده. فإن قلت: هل فيه دليل على أنّ الأرض مسطحة وليست بكرّية؟ قلت: ليس فيه إلا أن الناس يفترشونها كما يفعلون بالمفارش، وسواء كانت على شكل السطح. أو شكل الكرة، فالافتراش غير مستنكر ولا مدفوع، لعظم حجمها واتساع جرمها وتباعد أطرافها. وإذا كان متسهلا في الجبل وهو وتد من أوتاد الأرض، فهو في الأرض ذات الطول والعرض أسهل
প্রশস্ত করা মানে বিছিয়ে দেয়া, বিস্তৃত করা, মানবকূলের জন্য সমান করে দেয়া যাতে তারা এতে বসতে পারে, শুয়ে থাকতে পারে এবং গড়াগড়ি করতে পারে, যেমনিভাবে একজন ব্যক্তি তার বিছানা, চাদর এবং শয্যাস্থানে গড়াগড়ি খায়। – আপনি যদি বলেন, এতে কি এটা প্রমাণ হয় না যে পৃথিবী গোলাকৃতি নয় বরং সমতল? – তাহলে আমার জবাব হবে যে, এতে কোনো আপত্তি থাকবে না যদি মানুষ বিষয়টিকে সেভাবে বিবেচনা করে যেভাবে তারা চাদর বিছায়। যদিও বা বিছানার তোষকটি সমতল অবস্থায় থাকুক বা কিছু কিছু গোলাকার। এর বৃহদাকৃতি, অবয়বের প্রশস্ততা এবং কিনারাসমূহের দূরত্বের কারণে শয়নের ক্ষেত্রে কোনো বিপত্তি বা অনুৎসাহের সৃষ্টি হয় না।[35].তাফসীরুল কাশশাফ, ১/৯৪.
(২৭) ইয়াকুত আল-হামাউয়ি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৬২৬ হি.) বলেন,
خط الاستواء من المشرق إلى المغرب وهو أَطولُ خط في كرة الأرض. . . ثم قال: بل السماء كروية، وكل ما فيها يدور، وهو لا خلاف فيه
“বিষুবরেখা পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি পৃথিবীর গোলকের (বা, গোল পৃথিবীর) দীর্ঘতম রেখা। . . এরপর তিনি বললেন: বরং আকাশ (বা মহাকাশ) গোলাকার, আর এর ভেতরের সবকিছুই ঘোরে, এবং এই বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই (বা, এটি অনস্বীকার্য)।”[36].মু’জামুল বুলদান, ১/১৯.
(২৮) বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি স্কলার এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ ‘ডক্টর জাকির নায়েক হাফিজাহুল্লাহ’ বলেছেন,
“পৃথিবী গোলাকার। যারা সমতল বলে তারা কোরআনের আয়াতের ভূল ব্যাখা করে।”
والمقدسي (٢٩)، والقلشندي (٣٠)، وابن حيان (٣١)، وأبو بكر الصوفي (٣٢)، وابن النفيس (٣٣)، وصاحب تحفة المحتاج في شرح المنهاج (٣٤)، وابن خرداذبة (٤٥)، والمسعودي (٣٦)، وأبو محمد الجويني (٣٧)
(٢٩) مقدمة كتاب أحسن التقاسيم في معرفة الأقاليم.
(٣٠) صبح الأعشى[37]١/ ٤٠٨
(٣١) تفسير البحر المحيط[38]٧/ ٨٠
(٣٢) كما ورد في وفيات الأعيان لابن خلكان[39]٤/ ٣٥٩
(٣٣) في شرح كتاب تشريح قانون ابن سينا[40]ص ١١٢.
(٣٤) كتاب الصلاة[41]٤/ ٤٠٠
(٣٥) مقدمة كتاب المسالك والممالك.
(٣٦) في مروج الذهب[42]١/ ٢٥٣
(٣٧) في رسالة في إثبات الاستواء والفوقية[43]١/ ٨١
(২৯) আল-মাকদিসি[44]মুকাদ্দিমাতু কিতাব আহসানিত তাকাসিম ফি মারিফাতিল আকালিম
(৩০) আল-কালকাশান্দি[45]সুবহুল আ’শা, ১/৪০৮
(৩১) ইবনু হাইয়ান[46]তাফসিরুল বাহরুল মুহিত, ৭/৮০
(৩২) আবু বকর আস-সুফি[47]কামা ওয়ারাদা ফি ওয়াফায়াতিল আ’ইয়ান লি ইবন খাল্লিকান, ৪/৩৫৯
(৩৩) ইবনু আন-নাফিস[48]শারহি কিতাবি তাশরিহি কানুন ইবনু সিনা, পৃষ্ঠা ১১২
(৩৪) তুহফাতুল মুহতাজ ফি শারহিল মিনহাজ[49]কিতাবুস সালাত, ৪/৪০০
(৩৫) ইবনু খুরদাজবেহ[50]মুকাদ্দিমাতু কিতাবিল মাসালিক ওয়াল মামালিক
(৩৬) আল-মাসউদি[51]ফি মুরুজিজ জাহা, ১/২৫৩
(৩৭) আবু মুহাম্মাদ আল-জুওয়াইনি[52]ফি রিসালাতিন ফি ইসবাতিল ইসতিওয়া ওয়াল ফাওকিয়্যাহ, ১/৮১
https://shamela.ws/book/146418/7156 (৪১১-৪১২ পৃ.) — পৃথিবী গোলাকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ আলোচনা উক্ত কিতাবের ১২/৪০৮ থেকে ৪৪৬ পৃ. পর্যন্ত পাবেন।
এছাড়াও ‘পৃথিবী গোলাকার’ এ ব্যাপারে আপনি দেখতে পারেন ‘শায়েখ সালেহ আল মুনাজ্জিদ হাফিজাহুল্লাহ’ কতৃক পরিচালিত IslamQA-এর ফতোয়া বোর্ডের ফতোয়া।
‘পৃথিবী গোলাকার’ এ বিষয়ে আরও দেখতে পারেন IslamWeb-এর ফতোয়া বোর্ডের ফতোয়া।
Footnotes



