আল্লাহ কি পৃথিবীতে গবাদি পশু ও পোষাক আসমান থেকে নাযিল করেছেন?

প্রশ্নোত্তর (Q&A)Category: ইসলামআল্লাহ কি পৃথিবীতে গবাদি পশু ও পোষাক আসমান থেকে নাযিল করেছেন?
Muhammad Fazim asked 9 মাস ago
আসসালামু আলাইকুম।
কোরআনে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা চার জোড়া গবাদি পশু নাযিল করেছেন (যুমার:৬) এবং পোষাক নাযিল করেছেন (আরাফ : ২৬)। নাযিল করা মানে হলো আসমান থেকে বা উপর থেকে নিচে নামিয়ে আনা বা অবতরণ করা। এখন এই আয়াতগুলোতে নাযিল করা বলতে কী বোঝানো হয়েছে? আল্লাহ কি আসমান থেকে এগুলো নাযিল করেছেন? আর গবাদি পশু তো অনেক প্রকারেরই আছে। এখানে শুধু চার জোড়ার কথা বলা হলো কেন?
1 Answers
Ashraful Nafiz Staff answered 9 মাস ago

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আপনার প্রশ্নটি কুরআনের ভাষাগত অলৌকিকতার একটি দিক স্পর্শ করে, যা কুরআনী শব্দগুলোর গভীর অর্থ বোঝার সাথে জড়িত।

“নাযিল” (نَزَّلَ / أَنْزَلَ) আরবি “নুযুল” বা “নাযালাহ” শব্দের মূল অর্থ হলো — “উপর থেকে নিচে নামানো” বা “কোনো উচ্চতর স্থান থেকে নিম্নতর স্থানে প্রেরণ করা”।

কিন্তু কোরআনে এই শব্দটি সবসময় আসমান থেকে সরাসরি কোনো বস্তু অবতরণ করার অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বরং এটি অনেক গভীরতর এবং বিস্তৃত অর্থ বহন করে।

এর কয়েকটি ব্যাখ্যা ওলামাগণ করেছেন যে:

১. সৃষ্টি বা উদ্ভাবনের অর্থে: অনেক তাফসীরকারের মতে, "আনজালা" এখানে মানে "সৃষ্টি করা" বা "তৈরি করে দেওয়া"। আল্লাহ তো এগুলো সবকিছুর স্রষ্টা—তিনিই এগুলোকে তোমাদের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন। এটি আরবি ভাষায় সাধারণ একটি প্রকাশ।

২. অস্তিত্বের কারণগুলো নামানোর অর্থে: কিছু আলেম বলেন, এটি সেই কারণগুলোকে নির্দেশ করে যা এদের অস্তিত্ব ঘটায়।

- পোশাকের ক্ষেত্রে: পোশাক আসে ছাগল-ভেড়ার লোম বা তুলা থেকে। আর এগুলোর উৎপাদনের জন্য দরকার বৃষ্টি, যা আল্লাহ আকাশ থেকে নামান। বৃষ্টির কারণে মাটি ফলে, পশুরা বাঁচে, এবং তাদের থেকে পোশাক তৈরি হয়।
- গবাদি পশুর ক্ষেত্রে: এদের জীবন সরাসরি বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল—বৃষ্টি নামলে ঘাস-ফসল ফলে, পশুরা খায় এবং বেঁচে থাকে। তাই যেন এরা নিজেরাই আকাশ থেকে "নেমে এসেছে"।

৩. আল্লাহর রহমতের ভাণ্ডার থেকে নামানোর অর্থে: কিছু আলেম বলেন, এই শব্দটি এই নিয়ামতগুলোর মর্যাদা তুলে ধরে। যেন এগুলো আল্লাহর অসীম রহমত ও ক্ষমতার ভাণ্ডার থেকে নেমে এসেছে। এতে বোঝা যায়, এগুলো সাধারণ মাটির সৃষ্টি নয়, বরং আল্লাহর কৃপাময় উপহার। যেমন বৃষ্টিকে "রহমত" বলা হয়, তেমনি এই পশু-পোশাকও আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের প্রতীক।

৪. কাদের ও তাকদীরের অর্থে: আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, আল্লাহর সব ফয়সালা আকাশের লওহে মাহফুজে লেখা, এবং ফেরেশতারা সেগুলো নিয়ে মাটিতে নামে। তাই "আনজালা" মানে আল্লাহর আদেশ অনুসারে এগুলো সৃষ্টি করা ও তোমাদের জন্য নির্ধারিত করা।

সারকথা, "আনজালা" শব্দটি শুধু শারীরিক নামানো নয়—এটি সৃষ্টি, পরিকল্পনা, রহমত এবং আল্লাহর মহিমার একটি সুন্দর প্রকাশ।

কেন শুধু "আট জোড়া" গবাদি পশুর উল্লেখ?

সূরা যুমার: ৬ — “চার জোড়া গবাদি পশু নাযিল করেছেন”
وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ الْأَنْعَامِ ثَمَانِيَةَ أَزْوَاجٍ
“আর তিনি তোমাদের জন্য আট জোড়া গবাদি পশু নাযিল করেছেন।” (যুমার ৩৯:৬)

মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে এগুলো হলো: এখানে “আট জোড়া” মানে: চার প্রজাতির গৃহপালিত পশুর — প্রত্যেকটির একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী — মোট আট, সেগুলো হলো উট, গরু, ভেড়া, ছাগল।

সূরা আন‘আম (৬:১৪৩-১৪৪)-তেও এই আট জোড়ার বিস্তারিত এসেছে — যেখানে একইভাবে “চার প্রজাতির আটটি জোড়া” বলা হয়েছে।

এই চার প্রকারকেই বিশেষভাবে উল্লেখ করার কয়েকটি হিকমত (উপকারিতা) আছে:

- মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্ব: কুরআন যখন নাযিল হয়, তখন আরবদের জীবন এই পশুগুলোর উপর নির্ভরশীল ছিল—এবং আজও পুরো বিশ্বের জন্য এগুলো খাদ্য (মাংস, দুধ), পোশাক (লোম, চামড়া), যাতায়াত এবং কৃষিকাজের প্রধান উপাদান। এগুলো ছাড়া জীবন চলে না।

- ধর্মীয় নিয়মে বিশেষ স্থান: আল্লাহ এই পশুগুলোকে বিশেষ আইন-কানুন দিয়েছেন, যা অন্য পশুর জন্য নেই। যেমন, কুরবানি, হজ্জের হাদি, আকিকা, যাকাত এবং কিসাসের দিয়ত নির্ধারণে এগুলো ব্যবহার হয়। এতে তাদের মর্যাদা বোঝা যায়।

- জাহিলিয়াতের ভুল বিশ্বাসের খণ্ডন: আরবরা কিছু পশু বা তাদের অংশকে নিজেরাই হারাম করে ফেলত (যেমন বাহিরা, সাঈবা, ওয়াসিলা, হাম), আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই। কুরআন এসে বলল, আল্লাহ সবকিছুকে হালাল করেছেন—এই উল্লেখ দিয়ে সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে।

সুতরাং, এই "আট জোড়া"র উল্লেখ মানুষের জীবনের মূল নিয়ামতগুলোর স্মরণ করানো, এবং তৎকালীন সমাজের ভুল ধারণা সংশোধনের জন্য। আশা করি, এই ব্যাখ্যা আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছে।

আপনি এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা জানতে নিম্নোক্ত আর্টিক্যালগুলো পড়তে পারেন।

Back to top button