ইসলামইসলামবিরোধীদের প্রতি জবাব

ইসলামের সত্যতা প্রমাণ করব কীভাবে? বিজ্ঞান ছাড়া?

প্রশ্ন: ইসলামের সত্যতা কি আমরা বিজ্ঞান ছাড়া প্রমাণ করতে পারবো?

[উত্তর দিয়েছেন জুবায়ের হাসান ভাই]

উত্তর: নিঃসন্দেহে। কেউ যদি মনে করে যে ইসলামের সত্যতা বিজ্ঞান ছাড়া প্রমাণ করা সম্ভব না তাহলে তিনি অজ্ঞতার মাঝে আছেন। আপনাকে জানতে হবে যে ইসলাম শুধু এই আধুনিক যুগের জন্য নয়। বরং প্রতিটি জামানার জন্য ইসলাম উপযোগী এবং একমাত্র নাজাত লাভের পথ। আর যেহেতু ইসলাম ছাড়া আর কোনো মুক্তির পথ নেই তাই এটা আবশ্যক যে ইসলামের সত্যতার প্রমাণ সমূহ হবে দিনের আলোর চেয়েও সুস্পষ্ট। আর অবশ্যই তা হবে প্রত্যেক জামানার জন্য উপযোগী। আল্লাহর শপথ করে বলছি ইসলাম হক হওয়ার ব্যাপারে মুসলিমদের কাছে এতো প্রমাণ আছে যা গুণে শেষ করতে পারবেন না।

তাহলে যদি কেউ প্রশ্ন করেন যে ইসলাম হক হওয়ার ব্যাপারে এত এত সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরেও কেনো অনেক মানুষ তা গ্রহণ করে না? তখন তাকে বলা হবে, এর অনেক কারণ আছে। এরমধ্যে একটি হলো নিজের কাছে যা আছে তা নিয়ে খুশি হয়ে যাওয়া। ফলে সে ইসলামের সুস্পষ্ট দলিলগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আবার কখনো দুনিয়ার লোভ বা অহংকারের কারণে এটা হয়। আপনি যদি এর প্রমাণ দেখতে চান তাহলে আবু জাহেলের দিকে তাকান। আরো জানতে চাইলে সহিহ বুখারি খুলে হিরাকলের হাদিসটা পড়ুন। দেখুন হিরাকল কিভাবে নবিকে চেনার পরেও দুনিয়ার ভালোবাসার কারণে ইমান আনে নি। আবার স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচার ব্যপারেও আপনি অবাক হবেন। এজন্যই বলা হয় মন্দ সাথীদেরকে সাথে থাকার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। যার ফলে নিজের ভাতিজাকে হকের উপরে চিনেও সেটা গ্রহণ করে নি। ইবনু তাইমিয়্যা আরেকটা চমৎকার কথা বলেছেন। কিছু মানুষ আছে যারা দুনিয়ার কিছু জ্ঞান থাকার কারণে নিজের জ্ঞান নিয়ে এতো খুশি হয়েছে যে নবিদেরকে কোনো পরোয়া করেনি। যেমন এরিস্টটলের কথা বলা যায়। ফলে এইসব জিন্দিক যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তা অস্বীকার করে বসেছে।

অতএব আপনি জানতে পারলেন যে ইসলাম যে হক তা প্রমাণ করার জন্য মুসলিমরা বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল না। তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন, ওই প্রমাণগুলো কি?

ইসলাম যে হক তা প্রমাণ করার জন্যে আপনাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যদি কেউ জানতে পারে যে মুহাম্মাদ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যাকে আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জিনের কাছে প্রেরণ করেছেন তখন তার জন্য তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা কবুল করা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না। এই পর্যন্ত নবুয়তের প্রমাণাদির উপর অনেক বই রচিত হয়েছে। কিছু বইয়ের দিকে পরে ইশারা করা হবে।

এবার জানতে হবে যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের উপর প্রমাণাদির মধ্যে একটা হলো তাঁর ব্যাপারে পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে আসা সুসংবাদ সমূহ। ইয়াহুদ ও নাসারার কিতাবে যে সুসংবাদ এসেছে তা। এই বিষয়ে অনেকেই কিতাব রচনা করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ

তিনি নিজের মনগড়া কিছু বলেন না। তা তো শুধু ওহি যা তার কাছে ওহি করা হয়। [সুরা নাজম আয়াত ৩-৪]

ইন্জিল ইয়াহানাতে এসেছে,

لكن إذا جاء روح الحق ذاك الذي يرشدكم إلى جميع الحق لأنه ليس ينطق من عنده بل يتكلم بما يسمع ويخبركم بكل ما يأتي

কিন্তু যখন হক রুহ আসবেন তিনিই তোমাদের সকল সত্যের দিকে পথ দেখাবেন। কেননা তিনি নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলবেন না। বরং তিনি তাই বলবেন যা তিনি শুনবেন। তার কাছে যা আসবে তার সবকিছুই তোমাদেরকে জানাবেন।

[ইজহারুল হক, ৪/১১৮৬]

তারপরে আরেকটি পদ্ধতি হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত তথা জীবনাদর্শের মাধ্যমে দলিল পেশ করা। এখানে আবার হাদিসের প্রামাণিকতা সাব্যস্ত করতে হয়। মুসলিম উম্মতের মুহাদ্দিসগণ হাদিসকে যাচাই বাছাই করার যে পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন এবং তা প্রয়োগ করেছেন তা এই পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। ফলে যে কেউ এসে কোনো কথাকে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে চালিয়ে দিবে এই সুযোগে নেই। মুহাদ্দিসিন যেই মূলনীতিগুলো তৈরি করেছেন তা সত্যিই বড়ো আশ্চর্যজনক!

তারপরে আছে কুরআনের মাধ্যমে দলিল পেশ। এটা হলো সবচেয়ে মহান এবং শক্তিশালী প্রমাণগুলোর একটি। এই কুরআন এমন বিষয় ধারণ করেছে যা প্রমাণ করে যে এটা আকাশ ও জমিনের প্রভু আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া কিতাব।

নবুওয়তের প্রমাণের ব্যাপারে প্রাচীন কিতাবগুলোর মধ্যে একটি হলো আলি ইবনু রব্বান আত তবারির লেখা

الدين والدولة في إثبات نبوة النبي الله صلى الله عليه وسلم،

ইবনু রব্বান খ্রিষ্টান ছিলেন। পরে মুসলিম হয়েছেন। তাই তাকে আল মুহতাদি বলা হয়। হাফেজ ইবনু হাজার বলেছেন, ইবনু রব্বান চিকিৎসক ছিলেন। খলিফা জাফর আল মুতাওয়াক্কিলের নির্দেশে এই কিতাবটি লেখেন। ইবনু রব্বানের মৃত্যু ২৪৭ হিজরিতে। এই কিতাবে ইবনু রব্বান পূর্ববর্তী উম্মতের কিতাব থেকে বিভিন্ন বিষয় নকল করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের বিভিন্ন অধ্যায় থেকে বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করেছেন। পরে অনেকেই এই কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। খুবই মূল্যবান একটি বই। ইবনু রব্বান তার এই বইয়ের শুরুতে চমৎকার একটি কথা বলেছেন যা আমার কাছে খুব ভালো লাগলো। তিনি ইসলাম সম্পর্কে বলেছেন,

وتشوقت إليه النفوس،

এটা এমন একটা দীন নফসমূহ যার প্রতি আগ্রহী হয়ে যায়।

আলহামদুলিল্লাহ! যেই রব আমাদেরকে এই দিনের অনুসারী বানিয়েছেন।

একইভাবে ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ তার সহিহ বুখারিতে কিতাবুল মানাকিবের মধ্যে অধ্যায় বিন্যাস করেছেন,

باب علامات النبوة في الإسلام،

এখানে তিনি ষাটের অধিক হাদিস নিয়ে এসেছেন।

ইমাম ইবনু কুতাইবা আদ দিনাওয়ারি রাহিমাহুল্লাহ এই বিষয়ে কিতাব লিখেছেন। কিতাবের নাম,

أعلام رسول الله المنزلة على رسله,

ইবনু কুতাইবার মৃত্যু ২৭৬ হিজরিতে। তিনি এই চমৎকার কিতাবের এক জায়গায় বলেছেন,

ولو قلنا لهذه الزنادقة المكذبة للرسل أين علمتم علمًا يقينًا لا شك فيه أن الله لم يبعث رسولًا إلى خلقه، يهديهم به إلى رضاه وطاعته، ويكُفُّهم عن مساخطه ومعصيته،

আমরা যদি রাসুলগণকে মিথ্যারোপকারী এই জিন্দিকদেরকে জিজ্ঞেস করি, কোত্থেকে তোমরা কোনো সন্দেহ নেই এমন দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে জানতে পারলে যে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকূলের কাছে কোনো রাসুল প্রেরণ করেন নি যিনি তাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের দিকে পথ দেখাবেন এবং তাদেরকে তাঁর অসন্তুষ্টি ও অবাধ্যতা থেকে বিরত রাখবেন?

[আলামু রাসুলিল্লাহ, পৃ ২৫১]

একইরকম প্রশ্ন কিন্তু নাস্তিকদেরও করা যায়। তাই আমিও ইমাম ইবনু কুতাইবার সুরে নাস্তিকদের বলতে চাই কোথা হতে তোমরা দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে জানতে পারলে যে এই জগতের কোনো স্রষ্টা নেই? বড়োই আফসোস তোমাদের জন্য! তোমরা তোমাদের স্রষ্টার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছো?!

এরপর কিতাব লিখেছেন কাদি আব্দুল জাব্বার আল মুতাজিলি। তার ওফাত ৪১৫ হিজরিতে। যদিও তিনি মুতাজিলাদের অন্তর্ভূক্ত কিন্তু এই কিতাবটি অন্য রকম। চমৎকারভাবে তিনি এখানে নবুওয়াতের প্রমাণ পেশ করেছেন এবং বিভিন্ন সংশয়ের জবাব দিয়েছেন। তার কিতাবের নাম হলো,

تثبيت دلائل النبوة،

তবে এই কিতাব তারাই পড়বেন যারা বিশুদ্ধ আকিদা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন। আহলে সুন্নাহর একাধিক ইমাম এই কিতাবের ভূয়সি প্রশংসা করেছেন। আশ শাইখ আল মুহাদ্দিস রাবি আল মাদখালি বলেছেন, কাদি আব্দুল জাব্বারের দালায়েলুন নুবুওয়্যাতের উপরে একটা কিতাব আছে যেখানে তিনি আশ্চর্যজনক বিষয় নিয়ে এসেছেন।

নবুওয়াতের প্রমাণাদির ব্যাপারে হাফেজ আবু বাকর আল বাইহাকি (মৃত্যু ৪৫৮ হিজরি) কিতাব লিখেছেন। কিতাবের নাম দিয়েছেন,

دلائل النبوة ومعرفة أحوال صاحب الشريعة،

তিনি এই কিতাব লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন,

إذا الْقَصْدُ مِنْ هَذَا الْكِتَابِ بَيَانُ دَلَائِلِ صِحَّةِ نُبُوَّتِهِ وَإِعْلَامُ صِدْقِهِ فِي رِسَالَتِهِ،

যেহেতু এই কিতাব লেখার উদ্দেশ্য হলো তার নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণাদি বর্ণনা করা এবং তার রিসালতের ব্যাপারে তিনি যে সত্যবাদী তা অবগত করা।

কয়েক খন্ডের কিতাব এটা। এই কিতাবে হাফেজ আল বাইহাকি হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও আলোচনা করেছেন।

হাফেজ বাইহাকি উক্ত কিতাবে এক জায়গায় বলেছেন,

لا يدرك الإنسان ضرورة الرسالة النبوية إلا عند ما يستعرض أحوال العالم قبل ظهور الإسلام،

কোনো মানুষ নবির রিসালতের আবশ্যকতা তখনই বুঝতে পারবে যখন সে ইসলাম আসার আগে জগতের অবস্থা সমূহ নিয়ে পর্যালোচনা করবে।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ ۚ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ شَهِيدًا،

তিনিই তাঁর রাসুলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন যাতে করে তিনি সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। [সুরা সফ আয়াত ৯]

এরপরে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা এই বিষয়ে তার কিতাব,

Read More...  টিভিতে খেলা দেখা কি জায়েজ?

الجواب الصحيح لمن بدل دين المسيح،

এর সর্বশেষ খন্ডে নবুওয়াতের প্রমাণাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

যদিও ইমাম আত তিরমিজি নবুওয়ের প্রমাণ সম্বলিত কোনো কিতাব রচনা করেছেন বলে জানি না তবে তার রচিত আশ শামাইল অত্যন্ত সুন্দর একটা কিতাব। এই কিতাব যে পড়েছে সেই এটা পড়া ও শোনায় কি স্বাদ তা জানে।

জেনে রাখুন, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন, ইসলাম মানুষকে চিন্তা ভাবনা করতে নিষেধ করে  নি। আপনি কি কুরআনে দেখেন নি কত জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তারা কি চিন্তা ভাবনা করে না, তারা কি বুঝে না এমন আরো অনেক বিষয়। কিন্তু গাইবি জগতক বিবেক দিয়ে বিচার করা যাবে না। কুরআন ও সুন্নাহ প্রকৃতপক্ষে বিবেকের বিপরীত নয়। কিন্তু কখনো কখনো কিছু মানুষ  অসুস্থ বিবেকের অধিকারী হওয়ার কারণে বিবেককে কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত মনে করে। তারপর কুরআন ও সুন্নাহকে হয় বিকৃত করে না হয় প্রত্যাখ্যান করে। যখন আপনি মেনে নিবেন যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন আল্লাহর রাসুল তখন তার দেওয়া যাবতীয় সংবাদ বিশ্বাস করা আপনার জন্য আবশ্যক যদিও তা আপনার বিবেকে তা না ধরে বা বিবেক তার বিরোধিতা করে। তখন আপনি দৃঢ়ভাবে জানবেন যে কুরআন ও সুন্নাহয় যা এসেছে তা অবশ্যই সত্য ও সঠিক। অন্যথায় আপনি তো তাঁর নবুয়তে কিভাবে বিশ্বাস করলেন? কুরআন ও সুন্নাহ বিবেকের বিরোধী নয় এই বিষয়ে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা কিতাব লিখেছেন। যার নাম হলো

درء تعارض العقل والنقل،

সহিহুল বুখারিতে আবু সুফিয়ানের সাথে রোমের বাদশাহ হিরাকলের ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। হিরাকল আবু সুফিয়ানকে কয়েকটি প্রশ্ন করেন এবং আবু সুফিয়ান সেগুলোর জবাব দেন। তারপর রোমের বাদশাহ তার দোভাষীকে বললেন,

তুমি তাকে বলো, আমি তোমার কাছে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তুমি তার জবাবে উল্লেখ করেছো যে, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের। প্রকৃতপক্ষে রাসূল গণকে তাঁদের কওমের উচ্চ বংশেই প্রেরণ করা হয়ে থাকে। তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, এ কথা তোমাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেছে কিনা? তুমি বলেছো, না। তাই আমি বলছি যে, আগে যদি কেউ এ কথা বলতো, তবে অবশ্যই আমি বলতে পারতাম, এ এমন ব্যাক্তি, যে তাঁর পূর্বসূরীর কথারই অনুসরণ করছে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে কোন বাদশাহ ছিলেন কি না? তুমি তার জবাবে বলেছো, না। তাই আমি বলছি যে, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে যদি কোন বাদশাহ থাকতেন, তবে আমি বলতাম, ইনি এমন এক ব্যাক্তি যিনি তাঁর বাপ-দাদার বাদশাহী ফিরে পেতে চান।

আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, এর আগে কখনো তোমরা তাঁকে মিথ্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছো কি না? তুমি বলেছো, না। এতে আমি বুঝলাম, এমনটি হতে পারে না যে, কেউ মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা ত্যাগ করবে অথচ আল্লাহ্‌র ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলবে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, সম্মানিত লোকজন তাঁর অনুসরন করে, না দুর্বল লোকেরা? তুমি বলেছো, দুর্বল লোকেরা তাঁর অনুসরণ করে। আর বাস্তবেও তারাই হলো রাসুলগণের অনুসারী। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তারা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছো বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে ইমানে পূর্ণতা লাভ করা পর্যন্ত এ রকমই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তাঁরা দ্বীনে প্রবেশ করার পর অসন্তুষ্ট হয়ে কেউ কি তা ত্যাগ করেছে? তুমি বলেছো, না। ইমান এরকমই। যখন এর মিষ্টতা অন্তরগুলোর সাথে মিশে গেলে এরূপই হয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি তিনি চুক্তি ভঙ্গ করেন কি না? তুমি বলেছো, না। প্রকৃতপক্ষে রাসুলগণ  এরূপই, চুক্তি ভঙ্গ করেন না।

আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি তিনি তোমাদের কি করতে নির্দেশ দেন। তুমি বলেছো, তিনি তোমাদের এক আল্লাহ্‌র ইবাদত করা ও তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক না করার নির্দেশ দেন। তিনি তোমাদের নিষেধ করেন মূর্তিপূজা করতে আর তোমাদের আদেশ করেন নামাজ পড়তে, সত্য কথা বলতে ও নিষ্কলুষ থাকতে। তুমি যা বলেছো তা যদি সত্য হয়, তবে শীঘ্রই তিনি আমার এ দুই পায়ের নীচের জায়গার মালিক হবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্যে থেকে হবেন, এ কথা ভাবি নি। যদি জানতাম, আমি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারবো, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি যে কোনো কষ্ট স্বীকার করতাম। আর আমি যদি তাঁর কাছে থাকতাম তবে অবশ্যই তাঁর দুই পা ধুয়ে দিতাম।

[ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ থেকে পরিমার্জিত]

এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে নবিগণ আলাইহিমুস সালামের অনুসারীরা কি শুধু দুর্বল ও অসহায়রা? উত্তর হলো এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। অহংকারের কারণে তারা হক গ্রহণ করে না। আবু বকর, উমার, উসমান ও অন্যান্য অনেক সাহাবি সম্মানিত ছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

সহিহুল বুখারিতে এসেছে,

كسَفَتِ الشَّمْسُ علَى عَهْدِ رَسولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ يَومَ مَاتَ إبْرَاهِيمُ، فَقالَ النَّاسُ: كَسَفَتِ الشَّمْسُ لِمَوْتِ إبْرَاهِيمَ، فَقالَ رَسولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ: إنَّ الشَّمْسَ والقَمَرَ لا يَنْكَسِفَانِ لِمَوْتِ أحَدٍ ولَا لِحَيَاتِهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ فَصَلُّوا، وادْعُوا اللَّهَ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় যেদিন ইবরাহিম মারা যান সেদিন সূর্য গ্রহণ হয়েছিলো। তখন লোকজন বলতে থাকে ইবরাহিমের মৃত্যুর জন্যেই সূর্য গ্রহণ হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সূর্য ও চাঁদ কারো জীবন বা মৃত্যুর জন্য গ্রহণ হয় না। যখন তোমরা এমন দেখবে তখন তোমরা নামাজ পড়বে এবং আল্লাহর কাছে দুআ করবে।

সেই পরিস্থিতিতেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের ধারণার ভ্রান্তি ও বিশ্বাসের অসারতা প্রমাণ করে চরম সত্যবাদিতার দৃষ্টান্ত  রেখেছিলেন তখন।

সহিহুল বুখারিতে আরো এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، «أَنَّهُ مَرَّ بِقَوْمٍ بَيْنَ أَيْدِيهِمْ شَاةٌ مَصْلِيَّةٌ فَدَعَوْهُ، فَأَبَى أَنْ يَأْكُلَ قَالَ: خَرَجَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِنَ الدُّنْيَا وَلَمْ يَشْبَعْ مِنَ الْخُبْزِ الشَّعِيرِ.»

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে যে তিনি একদিন কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যাদের সামনে ভুনা বকরী ছিলো। তখন তারা তাকে ডাকলেন। কিন্তু তিনি খেতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন অথচ তিনি তৃপ্তি সহকারে যবের রুটি খান নি।

জামি আত তিরমিজিতে এসেছে

عَنْ ‌عَبْدِ اللهِ قَالَ: «نَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى حَصِيرٍ، فَقَامَ وَقَدْ أَثَّرَ فِي جَنْبِهِ، فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللهِ لَوِ اتَّخَذْنَا لَكَ وِطَاءً فَقَالَ: مَا لِي وَلِلدُّنْيَا، مَا أَنَا فِي الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبٍ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا».

وَفِي الْبَابِ عَنِ ابْنِ عُمَرَ، وَابْنِ عَبَّاسٍ.

আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত , তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পাটির উপর ঘুমিয়ে ছিলেন। যখন ঘুম থেকে উঠলেন আর তা তার পার্শ্বে দাগ ফেলে দিয়েছিলো তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যদি আপনার জন্য একটি নরম বিছানা বানিয়ে দেই? তিনি বললেন, এই দুনিয়ার সাথে আমার কি সম্পর্ক? আমি তো শুধু দুনিয়াতে ঐ আরোহীর মতো যে একটি গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে বিশ্রাম করলো এবং পরে তা ছেড়ে চলে গেলো।

এই বিষয়ে ইবনু উমার ও ইবনু আব্বাস থেকেও বর্ণনা আছে।

অথচ তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচার করা ছেড়ে দিলে কুরাইশের কাফেররা উনাকে মাথার তাজ করে রাখতো, নিজেদের নেতা বানিয়ে নিত, উনার পায়ের নিকট ধনসম্পদের স্তুপ করে দিত, কিন্তু সেসব বিলাসিতা, লোভ কখনো করেন নি তিনি

Citation is loading...
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Check Also
Close
Back to top button