নাস্তিক্যধর্ম

সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার নাকি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ? 

সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার নাকি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত?

লেখকের ওয়েবসাইট থেকে আর্টিকেল লিংকঃ https://www.insightzonebd.com/?p=2703

ফিলোসফি ক্লাস হচ্ছে। ১ম ঘন্টার ক্লাস শেষে মহসিন স্যার ক্লাসে প্রবেশ করলেন। তিনি দর্শনের সমস্যাবলি সাবজেক্টটি পড়ায়। আজকের বিষয় ছিল আল্লাহতত্ত্ব বা ঈশ্বরতত্ত্ব। ঈশ্বর সম্পর্কিত আলোচনায় স্যার সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের পক্ষে কিছু আর্গুমেন্ট সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। যেমনঃ কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট, অন্টোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট, মোরাল আর্গুমেন্ট ইত্যাদি।

সবগুলো আর্গুমেন্ট সম্পর্কে তেমন একটা আলোচনা না করলেও কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন।

যাইহোক, কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট নিয়ে আলোচনা করা মাত্রই ঘন্টা পরে গেল! স্যার বিদায় নিলো।

অন্তু দাড়িয়ে ক্লাসের সকলের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলো,

-অন্তু, “ এসব আর্গুমেন্ট কিছুই না! এগুলো অনেক আগেই ডিবাং করা হয়ে গেছে! আল্লাহ বলে কিছুই নেই! এটা কেবল আমাদের বিভ্রম বা ডিলিউশান!বর্তমান যুগে আল্লাহ যদি সত্যি থাকতো বিজ্ঞান ঠিকই তাকে খুঁজে বের করতো! মহাবিশ্ব কিভাবে অস্তিত্বে এসেছে ? মানুষ কিভাবে অস্তিত্বে এসেছে? এই বিষয়গুলো তাৎপর্য বোঝার জন্য আমরা নির্ভর করবো মানবীয় বুদ্ধিমত্তার উপর। যুক্তি,তথ্য,প্রমাণের আলোকে আমরা সিদ্ধান্ত নিবো যে আসলেই আল্লাহ বলতে কিছু আছে? নাকি নেই! শুধু আল্লাহর অস্তিত্ব নয় সব কিছুই আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিচার,বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিবো।যেহেতু আমরা আল্লাহর কোনো এম্পিরিক্যাল প্রমাণ পাই না তাই আল্লাহর ধারণাটা বিভ্রম বা ডিলিয়শান ছাড়া আর কিছুই না!”

অন্তুর কথা শুনে আমরা সবাই হা করে তাকিয়ে থাকলাম!  ভাবতে লাগলাম আসলেই কি আল্লাহ বলতে কিছু নেই ? আধুনিক বিজ্ঞানতো অনেক উন্নতির শেকড়ে পৌঁছে গিয়েছে, আল্লাহ যদি আসলেই থাকতো তাহলে তো বিজ্ঞান ঠিকই খুঁজে বের করতো! আমরা তো স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে পাইনা! তাহলে কেন আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করবো ?

ভাবতে ভাবতে আমার চোখ গেল সাদিদের দিকে। তার বদ্ধ মুখে ঠোঁটে মৃদু হাসি লক্ষ করলাম। ওর মুখের হাসি দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি, অন্তুর দেওয়া যুক্তিগুলো তুড়ি মেরে ওড়িয়ে দেওয়া সাদিদের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সাদিদ ও অন্তুর সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া দরকার। সাদিদ, অন্তু ও আমি খুবই ভালো বন্ধু। সাদিদ ধার্মিক মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথেই পড়ে। অন্তু আগে ধার্মিক ছিলো। ইউনিভার্সিটিতে এসে কিভাবে জানি এগনোস্টিক হয়ে পড়ে।

আমি সাদিদের উদ্দেশ্যে বললাম, কিরে তুই কিছু বলিস না যে! শুধু হেসেই যাচ্ছিস দেখি!

সাদিদ আমার কথায় কর্ণপাত না করেই অন্তুর  দিকে তাকিয়ে বললো,

– সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞান কখনোই আলোচনা করেনা। এটা বিজ্ঞানের বিষয়ই না!  তুই যেহেতু তোর কথাই একটা পয়েন্ট উপস্থাপন করতে চেয়েছিস যে সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস হচ্ছে বিভ্রম বা ডিলিউশানের ফল। সোজা বাংলায় বলতে গেলে মানুষ এমন কিছুর উপর বিশ্বাস করে যার কোনো বাস্তবতা নেই! আমি সেদিকটা নিয়েই কথা বলি।

অন্তু- হ্যাঁ, আমি এটাই বুঝাতে চাচ্ছি যে মানুষ এমন কিছুর উপর বিশ্বাস করে যার কোনো বাস্তবতা নেই!

সাদিদ – দেখ আমরা যদি মানব ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখবো যে ইতিহাসজুড়ে অধিকাংশ মানুষ কোনো-না-কোনো স্রষ্টা বা অতিপ্রাকৃতিক কোনো সত্তার উপর বিশ্বাস করে এসেছে। যদিও স্থান-কাল-পাত্রভেদে মানুষের এই বিশ্বাসের মতপার্থক্য রয়েছে। তবে একজন সৃষ্টিকর্তা যে আছে সে বিষয়ে কিন্তু সবাই একমত ।

অন্তু – হুম তা-তো বটেই।

সাদিদ – আচ্ছা, এখন যেহেতু সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস হলো বিভ্রমের ফল। এবং এই বিশ্বাস যেহেতু বৈশ্বিক তাহলে এই বিভ্রমও বৈশ্বিক !?

অন্তু – উম….

সাদিদ – দেখ অন্তু, তোর যুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষ এমন এক বিভ্রমে আছে যেটা এতই শক্তিশালী যে যুগে যুগে এই ভ্রান্ত বিশ্বাস মানুষকে উপসনার দিকে চালিত করেছে! আমাদের এই বিভ্রম এতটাই গভীর যে, আমরা নিজেরাই আমাদের এই মানসিক রোগের ব্যাপারে জানিনা। তাই তো ?

অন্তু – হুম অনেকটা সেরকম বলতে পারিছ।

সাদিদ – অনেকটা নয়, পুরোপুরিই সে রকম। আচ্ছা তোর কথাই কিন্তু আরেটা পয়েন্ট ছিলো যে, “মহাবিশ্ব কিভাবে অস্তিত্বে এসেছে ? মানুষ কিভাবে অস্তিত্বে এসেছে? এই বিষয়গুলো তাৎপর্য বোঝার জন্য আমরা নির্ভর করবো মানবীয় বুদ্ধিমত্তার উপর। যুক্তি,তথ্য,প্রমাণের আলোকে আমরা সিদ্ধান্ত নিবো যে আসলেই আল্লাহ বলতে কিছু আছে? নাকি নেই! শুধু আল্লাহর অস্তিত্ব নয় সব কিছুই আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিচার,বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিবো।”

অন্তু – হুম।

সাদিদ – আচ্ছা, যে প্রজাতির অধিকাংশ মানুষের মাঝে এমন গভীর ডিলিউশানে ভোগার প্রবণতা আছে, তাদের বিচার বুদ্ধির উপর কি আমরা ভরসা করতে পারি ?

অন্তু – মানে? ঠিক বুঝলাম না তো!

সাদিদ – হা,হা! আচ্ছা আরো সহজ করে বলি, তোর যুক্তি অনুযায়ী আমরা সকলেই একটা বিভ্রম বা ডিলিউশানে আছি এবং এটা যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। এই বিভ্রম বা মানসিক সমস্যা এতোটাই প্রখর যে, মানুষ নিজেরাই জানেনা এই মানসিক রোগের ব্যাপারে।

অন্তু – উম….

সাদিদ – তাহলে তুই একটু আগেই বলছিলি যে, কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌছানোর জন্য মানবীয় বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভর করতে হবে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যে প্রজাতির অধিকাংশ সদস্যের এমন গভীর ও স্থায়ী ডিলিউশনে ভোগার প্রবণতা আছে, তাদের বিচার বুদ্ধির উপর কি নির্ভর করা যায় ? মানসিক সমস্যা ভোগা একটা প্রজাতির পক্ষে কি সম্ভব সত্য মিথ্যা নির্ধারণ করা?

আমি বুঝাতে চাচ্ছি, সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাস এতটাই বৈশ্বিক, এতটাই সহজাত যে এটি মানব মন ও মানবীয় চিন্তার সাথে মৌলিকভাবে জড়িত। তাই সৃষ্টিকর্তাকে নাকচ করার মানে নিজেদের বুদ্ধিমত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। নিজেদের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

অন্তু – উম… তোর কথাই যুক্তি আছে বটে।

সাদিদ – দেখ অন্তু, আল্লাহর উপর বিশ্বাস করটাই যৌক্তিক পজিশন। আল্লাহর উপর বিশ্বাস না করাটাই বরং অযৌক্তিক পজিশন।

প্রত্যেক মানুষই এক আল্লাহর অস্তিত্বের স্বাভাবিক অনুভূতি নিয়ে জন্মায়,

বৈজ্ঞানিক প্রমাণ লাগবে?  University of Oxford এর Centre for Anthropology and mind বিভাগের সিনিয়র রিসার্চার Dr. Justin barrott দীর্ঘ ১০ বছর শিশুদের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে বলেছেন,

 “Human beings are natural believers in God.” অর্থাৎ, মানুষ স্বভাবতই ঈশ্বরে বিশ্বাসী।[1]http://www.telegraph.co.uk/news/religion/3512686/Children-are-born-believers-in-God-academic-claims.html[2]https://www.thepoachedegg.net/2012/05/apologetics-are-we-born-believers.html

Read More...  নাস্তিকতা কি স্বভাবজাত? নাকি আস্তিকতা?

একইভাবে Dr. Olivera petrovich বলেন,

belief in God is not taught but develops naturally” অর্থাৎ, ঈশ্বরে বিশ্বাস শেখানো হয় না কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হয়। Dr. Olivera petrovich সাইকোলজি অব রিলিজিয়নের উপর বিশেষজ্ঞ এবং তিনি একজন নাস্তিক।[3]Infants ‘have natural belief in God’ (smh.com.au)

সুতরাং, আল্লাহকে বিশ্বাস করা প্রতিটি মানুষের প্রাকৃতিক ও স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য।নাস্তিকতা স্বাভাবিক কোনো কিছু নয়। এটি একটি অস্বাভাবিক, ভ্রান্ত ও কৃত্রিম ধারণার নাম।

অন্তু আর কিছু না বলেই ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল! আমরাও আর ক্লাস করলাম না! বাসার উদ্দেশ্যে চললাম। প্রতিদিন অন্তু, আমি ও সাদিদ এক সাথেই ক্যাম্পাসে আসি, এক সাথেই বাসায় যায়। কিন্তু আজকের গল্পটা ভিন্ন।  অন্তু আমাদের রেখে একাই চলে এসেছে।

আসরের আজান হলো, সাদিদের ফোন পেয়ে ঘুম থেকে উঠে মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হলাম। সাদিদ বাহিরে আপেক্ষায় আছে। আমার বাসার পাশেই মসজিদ। জামাত শুরু হওয়ার এখনো ৫মিনিট আছে। আমি আর সাদিদ মসজিদের এক কোণায় গিয়ে বসলাম। হুট করেই দেখি আমাদের পাশে অন্তু! আমি আর সাদিদ অন্তুর মুখের দিকে তাকালাম। অন্তু আমাদের চাহনির ভাষা বুঝতে পেরেছে। সে বললো- নামাজ পড়তে এসেছি।

ফিলোসোফি ও সাইন্স সম্পর্কে জানতে Md. Abdullah Saeed স্যারের ওয়েবসাইটের লিখাগুলো পড়ুন। 

Citation is loading...
Source
সাজ্জাতুল মওলা শান্ত'র মূল লেখা
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Minhaz uddin Miraj
2 years ago

♥️

Back to top button