হেদায়েত দেওয়া ও অন্তরে মোহর মারার কারণ

নিঃসন্দেহে হেদায়েতের মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা। তিনি যাকে খুশি হেদায়েত দেন, যাকে খুশি দেন না, যাকে খুশি পথভ্রষ্ট করেন। কিন্তু আল্লাহ তাই বলে রেন্ডমলি যাকে তাকে হেদায়েত দেনও না, আবার যার তার অন্তরে মোহর মেরেও দেন না।
আল্লাহ (ﷻ) কোরআনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন, পথ উল্লেখ করেছেন যেগুলোর কারণে হেদায়েত দেন আবার যেগুলোর কারণে দেন না। আরো বহু কারণ থাকতে পারে, হয়তো তিনি আমাদেরকে তার মাঝে কয়েকটি জানিয়েছেন যা তিনি প্রয়োজন বোধ করেছেন। আল্লাহ (ﷻ) যে হেদায়েত পাওয়ার যোগ্য তাকে হেদায়েত দেন, আর যে যোগ্য না তাকে দেন না।
এই লিখায় আমরা সেরকমই হেদায়েত পাওয়ার যোগ্য হওয়ার কয়েকটি কারণ জানব ও হেদায়েত হতে বিচ্যুত হয়ে যাওয়ার কয়েকটি কারণ জানব যা আল্লাহই আমাদের জানিয়েছেন।
হেদায়েত পাওয়ার উপায়
হেদায়েততো আল্লাহই দেন, কিন্তু আল্লাহ (ﷻ) যেন হেদায়েত দেন তার জন্য কয়েকটি পথও তিনি আমাদের জানিয়েছেন।
প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান ও সঠিকটা গ্রহণ
আল্লাহ (ﷻ) কোরআনে প্রশ্ন করেছেন,
“মানুষ যা চায় তাই কি সে পায়?”[সূরা নজম আয়াত ২৪]
আবার এর উত্তরে তিনিই বলেছেন,
“আর এই যে, মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা করে, আর এই যে, তার প্রচেষ্টার ফল শীঘ্রই দেখা যাবে”[সূরা নজম আয়াত ৩৯-৪০]
নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে (যতক্ষণ না চেষ্টা করে পরিবর্তনের চেষ্টা করেন)।[সূরা রাদ আয়াত ১১]
সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে বায়াসড হলে চলবে না, কারণ এতে সত্য গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে। আল্লাহর এর সুস্পষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন,
যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না, এক আল্লাহর কথা বলা হলে তাদের অন্তর সংকুচিত হয়ে যায়। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্যগুলোর কথা বলা হলে তখনই তারা আনন্দে উৎফুল্ল হয়।[সুরা আয যুমার আয়াত ৪৫]
আপনারা দেখবেন বর্তমান সময়েও বেশিরভাগ ধর্মবিদ্বেষী ইসলামেরই বিরোধিতা করে, সমালোচনা করে। তারা পৌত্তলিক ধর্মের সমালোচনা কম করে, তাদের প্রতি সফট কর্নার পোষণ করে। ভারতে সনাতন ধর্মের মানুষ বেশি হওয়া সত্ত্বেও ধর্মবিদ্বেষীগুলো বিশেষ করে ইসলাম নিয়েই বেশি পড়ে থাকে, ইসলামেরই বিরোধিতা করে। বাংলাদেশি যেসব ইসলাম বিদ্বেষী ভারতে আছে তারা ঠিকই হিন্দুদের বিভিন্ন পূজা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকে। এক বিশিষ্ট ইসলাম বিদ্বেষীকে যখন প্রশ্ন করা হয় হিন্দু ধর্ম নিয়ে কেন তারা বেশি আলোচনা করে না, সে এটা বলে বিষয়টা এড়িয়ে গিয়েছিল যে, ‘হিন্দু ধর্ম কোন ধর্মই না, সেটা নিয়ে আর কি সমালোচনা করবে, তারা সমালোচনারও যোগ্য না।’ খুব সুন্দর করে এটা বলে এড়িয়ে গেল, অনেকে ভেবে নিল সে ইসলাম থেকেও সনাতন ধর্মকে খাটো করল, অথচ বাস্তবতা হল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার হাজার পোস্ট ও লাইভে ইসলামের পক্ষে বাদ দিন মুসলিমদের পক্ষেও কোন বক্তব্য পাবেন না, কিন্তু হিন্দুদের পক্ষে ভুঁড়ি ভুঁড়ি রয়েছে আলোচনা।
যাইহোক টপিক থেকে সরে গিয়েছিলাম, যা বুঝাতে চেয়েছি তা হল এদের মত বায়াসড হওয়া যাবে না। হেদায়েতের বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা আরো সুস্পষ্ট করে বলেছেন,
আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন।[সুরা আনকাবুত আয়াত ৬৯]
সেই প্রচেষ্টা কীরূপ হতে পারে সে বিষয়েও আল্লাহ (ﷻ) বলেছেন,
যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে অতঃপর তার মধ্যে যা উত্তম তা অনুসরণ করে তাদেরকেই আল্লাহ হিদায়াত দান করেন আর তারাই বুদ্ধিমান।[সুরা আয যুমার আয়াত ১৮]
আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
‘আল্লাহ ঘোষণা করেন, আমি আমার বান্দার প্রতি ঐরূপ, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি বান্দার সঙ্গে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে নিজে স্মরণ করি। আর যদি সে জন-সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, তবে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই, যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়; আমি তার দিকে দু’হাত এগিয়ে যাই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই’।[1]সহিহ বুখারী ৭৪০৫, ৭৫০৫, ৭৫৩৭; মুসলিম ১৬৭৫
এই থেকে প্রতীয়মান হয় যারা সত্য অনুসন্ধান ও গ্রহণের জন্য সেরকম মনমানসিকতা রাখে ও পর্যাপ্ত চেষ্টা করে আল্লাহ (ﷻ) তার প্রতি জুলুম করবেন না। তিনি তাকে কোন না কোন উপায়ে পথ দেখিয়েই দিবেন।
পবিত্র কোরআন
হেদায়েত পাওয়ার আরেকটি অন্যতম উপকরণ হল পবিত্র কুরআন। আল্লাহ্ তা’আলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কুরআনকে হেদায়াত বলে অভিহিত করেছেন।[2]যেমন সূরা আল-বাকারার ২য় আয়াত, সূরা আল ইসরার নবম আয়াত, সূরা আল-বাকারাহঃ ৯৭, ১৮৫, সূরা আলে-ইমরানঃ ১৩৮, সূরা আল-আনআমঃ ১৫৭, সূরা আল-আরাফঃ ৫২, ২০৩, সূরা ইউসুফঃ ১১১, সূরা আন-নাহলঃ ৬৪, ৮৯, ১০২, সূরা আয-যুমারঃ ২৩, সূরা ফুসসিলাতঃ ৪৪, সূরা আল-জাসিয়াহঃ ২০
কিন্তু এই ক্ষেত্রে হেদায়েত পাওয়া না পাওয়াও নির্ভর করে ব্যক্তির উপর, সে কোন মনোভাব নিয়ে, কোন উদ্দেশ্য বা নিয়ত নিয়ে পড়ছে বা শুনছে, সত্য উপলব্ধি করার মনমানসিকতা রয়েছে কিনা, জানার জন্য বুঝার জন্য পড়ছে বা শুনছে কিনা এসবের উপর নির্ভর করে সেটা তার জন্য হেদায়েত হবে নাকি গোমরাহির দরজা হবে। আল্লাহই পবিত্র কুরআনে বলেন,
আর আমি কুরআন নাজিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত, কিন্তু তা জালিমদের ক্ষতিই বাড়িয়ে দেয়।[সুরা বানী ঈসরাইল আয়াত ৮২]
বল, ‘এটি মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও প্রতিষেধক। আর যারা ঈমান আনে না তাদের কানে রয়েছে বধিরতা আর কুরআন তাদের জন্য হবে অন্ধত্ব। তাদেরকেই ডাকা হবে দূরবর্তী স্থান থেকে।
[সুরা ফুসসিলাত আয়াত ৪৪]
এর কারণ আল্লাহ (ﷻ) পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, এটি বিশ্বাসীদের জন্য হিদায়াত ও প্রতিষেধক।[3]সুরা সাজদাহ আয়াত ৪৪; সূরা ইউনুস আয়াত ৫৭; সুরা আলে ইমরান আয়াত ১৩৮
দোয়া
এছাড়া হেদায়েতের জন্য দোয়া করাও প্রয়োজন, আল্লাহর নিকট চাওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।[সুরা গাফির আয়াত ৬০]
হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ (ﷻ) বলেন,
হে আমার বান্দারা! তোমরা সবাই ছিলে দিশেহারা, তবে আমি যাকে সুপথ দেখিয়েছি সে ব্যতীত। তোমরা আমার কাছে হিদায়াত প্রার্থনা কর আমি তোমাদের হিদায়াত দান করব।[4]সহিহ মুসলিম হাদিস ২৫৭৭
কেন অন্তরে মোহর মারা হয়?
আল্লাহ (ﷻ) মানুষকে বল প্রয়োগ করে আমল করান না, ব্যক্তি যে পাপ করে তা সম্পূর্ণ তার নিজের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দ্বারা স্বাধীন শারীরিক ক্ষমতা ব্যবহার করেই করে, এটা প্রমাণিত অসংখ্য হাদিস ও আয়াত দ্বারা। এটা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের সুপ্রতিষ্ঠিত আকিদাও বটে। আবার আল্লাহ (ﷻ) মানুষকে তার আমলের জন্য শাস্তি দিবেন, তার উপর জুলুম করবেন না, তার কৃতকর্মেরই প্রতিদান দিবেন, অন্যের বোঝা চাপিয়ে দিবেন না, সরিষার দানা পরিমাণ আমলও তাকে দেখানো হবে, তারা তাদের কৃতকর্মের কারণেই জাহান্নামি হবে এসবও প্রমাণিত বহু আয়াত ও হাদিস দ্বারা।
আল্লাহ তায়ালা শুধু রাস্তা সহজ করে দেন তকদির অনুযায়ী আমলের৷ তার তকদিরে যদি থাকে সে চুরি করবে তবে চুরি করার ১০১ রাস্তা তার জন্য খুলে যাবে।[5]সহিহ বুখারী হা/১৩৬২, মুসলিম হা/২৬৪৭, ২৬৪৮
আবার যারা নাফরমানি, সীমালঙ্ঘন দ্বারা হৃদয়ে ব্যাধি বাড়িয়ে নেয় তাদের বেলায় আল্লাহ (ﷻ) অন্তরে মোহর মেরে দেন। তাদের নিয়ত অনুসারে রাস্তা সহজ করে দেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“সুতরাং যে দান করেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে, আর উত্তমকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে, আমি তার জন্য সহজ পথে চলা সুগম করে দেব। আর যে কার্পণ্য করেছে এবং নিজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করেছে, আর উত্তমকে মিথ্যা বলে মনে করেছে, আমি তার জন্য কঠিন পথে চলা সুগম করে দেব।”[সুরা লাইল আয়াত ৫-১০]
এভাবে আল্লাহ (ﷻ) তাদের বিশ্বাস ও আমলের কারণে তাদের জন্য সেই অনুযায়ী রাস্তা সহজ ও প্রশস্ত করে দেন। অন্তরে কেন দাগ পড়ে যায়, মোহর পরে যায়, অন্তর কেন মরে যায় সেটা নিয়েও কোরআন ও হাদিসে বেশ কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে।
সব সময় গুনাহ লিপ্ত থাকা
মানুষের হৃদয়ে মোহর মারার পিছনে অন্যতম একটি কারণ হল পাপ কাজে লিপ্ত থাকা। আল্লাহর অবাধ্যতা, নাফরমানি প্রকাশ পায় এমন সকল কাজই পাপকার্য হিসেবেই গণ্য হয়। কোরআনে আল্লাহ (ﷻ) বলেন,
আর আল্লাহ ফাসিক কওমকে হিদায়াত করেন না।[সুরা মায়েদা আয়াত ১০৮]
আরেক আয়াতে তিনি বলেন,
কখনো নয়, বরং তারা যা অর্জন করত তা-ই তাদের অন্তরসমূহকে ঢেকে দিয়েছে।[সূরা আল-মুতাফফিফীনঃ ১৪]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরের কিতাবগুলোতে নিম্নোক্ত হাদিস বর্ণিত রয়েছে,
মানুষ যখন কোন একটি গোনাহর কাজ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। সাদা কাপড়ে হঠাৎ কালো দাগ পড়ার পর যেমন তা খারাপ লাগে, তেমনি প্রথম অবস্থায় অন্তরে পাপের দাগও অস্বস্তির সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় যদি সে ব্যক্তি তওবা না করে, আরও পাপ করতে থাকে, তবে পর পর দাগ পড়তে পড়তে অন্তঃকরণ দাগে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় তার অন্তর থেকে ভাল-মন্দের পার্থক্য সম্পর্কিত অনুভূতি পর্যন্ত লুপ্ত হয়ে যায়।[6]তিরমিযি: ৩৩৩৪, ইবনে মাজাহঃ ৪২৪৪, মুসনাদে আহমাদঃ ২/২৯৭
জেনে শুনে সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া
আরেকটি কারণ হল জানা সত্ত্বেও, প্রমাণ তাদের নিকট সুস্পষ্ট হলেও, সত্য পরিষ্কার হয়ে গেলেও, প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। এই বিষয়ে মহান রব বলেন,
আর আমি তো মানুষের জন্য এই কুরআনে সব ধরনের দৃষ্টান্ত পেশ করেছি। আর যদি তুমি তাদের কাছে কোন আয়াত নিয়ে আস, তবে অবশ্যই কাফিররা বলবে, ‘তোমরা তো বাতিলপন্থী’। এমনিভাবে আল্লাহ মোহর মেরে দেন তাদের হৃদয়সমূহে যারা জানে না।[সুরা রুম আয়াত ৫৮-৫৯]
আর আমি তাদের অন্তর ও দৃষ্টি সমূহ পালটে দেব যেমন তারা কুরআনের প্রতি প্রথমবার ঈমান আনেনি এবং আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় ঘুরপাক খাওয়া অবস্থায় ছেড়ে দেব।[সুরা আনআম, আয়াত : ১১০]
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য কর এবং তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, অথচ তোমরা শুনছ। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বলে আমরা শুনেছি অথচ তারা শুনে না। নিশ্চয় আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম বিচরণশীল প্রাণী হচ্ছে বধির, বোবা, যারা বুঝে না। আর আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে কোন কল্যাণ জানতেন তাহলে অবশ্যই তাদেরকে শুনাতেন। আর যদি শুনাতেন তাহলেও তারা মুখ ফিরিয়ে নিত, এমতাবস্থায় যে, তারা উপেক্ষাকারী।[সুরা আল আনফাল আয়াত ২০-২৩]
আল্লাহ (ﷻ) তাদের বিষয়েও বলেছেন যারা জেনে শুনে সত্যা গ্রহণ হতে বিরত ছিল এবং সাথে সেই সত্য গোপন করেছিল অন্যরাও যেন তা গ্রহন করতে আগ্রহি হয়ে না উঠে তার জন্য।
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাকে চিনে, যেমন চিনে তাদের সন্তানদেরকে। আর নিশ্চয় তাদের মধ্য থেকে একটি দল সত্যকে অবশ্যই গোপন করে, অথচ তারা জানে।[সুরা বাকারা আয়াত ১৪৬]
নিশ্চয় যারা গোপন করে যে কিতাব আল্লাহ নাজিল করেছেন এবং এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে, তারা শুধু আগুনই তাদের উদরে পুরে। আর আল্লাহ কিয়ামতের দিনে তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব। তারাই হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা এবং মাগফিরাতের পরিবর্তে আজাব ক্রয় করেছে। আগুনের উপর তারা কতই না ধৈর্যশীল। [সুরা বাকারা আয়াত ১৭৫]
আল্লাহ তায়ালা পুরোনো জনপদের কথা বলেছেন, যার কিছু কাহিনি তিনি বর্ণনা করছেন কুরআনে। তাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তাদের রাসূলগণ এসেছিল সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ। কিন্তু পূর্বে যা অস্বীকার করেছিল তার প্রতি তারা ঈমান আনার ছিল না। তাই আল্লাহ (ﷻ) এসব সীমালঙ্ঘনকারী কাফিরদের অন্তরে মোহর মেরে দেন।[7]সুরা আরাফ আয়াত ১০১, সুরা ইউনুস আয়াত ৭৪
ইচ্ছাকৃত ইমান আনতে না চাওয়া
আল্লাহ (ﷻ) মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি দিয়েছেন, সে চাইলে আল্লাহর উপর ইমান আনতে পারে, আবার তা বর্জনও করতে পারে। কেউ যদি সব জেনে বুঝেও নিজ ইচ্ছায় আল্লাহর সাথে কুফুরি করতে চায় তাহলে আল্লাহও তাকে সে দিকেই পরিচালিত করেন। আল্লাহ বলেন,
নিশ্চয় তোমাদের কাছে চাক্ষুষ নিদর্শনাবলি এসেছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। অতএব যে চক্ষুষ্মান হবে, তবে সে তার নিজের জন্যই হবে। আর যে অন্ধ সাজবে, তবে তা তার উপরই (বর্তাবে)। আর আমি তোমাদের উপর সংরক্ষক নই।[সূরা আনআম, আয়াত ১০৪]
অতঃপর তারা যখন বাঁকাপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়গুলোকে বাঁকা করে দিলেন। আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।[সুরা সফ, আয়াত : ৫]
আর যে রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাব যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ।[সুরা নিসা আয়াত ১১৫]
সামূদ সম্প্রদায়ও ধ্বংস হয়েছিল এই কারণে যে, তাদের নিকট পরিষ্কার নির্দেশনা আসার পরও তারা অজ্ঞতা ও গোমরাহিকেই বেছে নিয়েছিল। আল্লাহ বলেন,
আর সামূদ সম্প্রদায়, আমি তাদেরকে সঠিক পথের নির্দেশনা দিয়েছিলাম; কিন্তু তারা সঠিক পথে চলার পরিবর্তে অন্ধ পথে চলাই পছন্দ করেছিল। ফলে তাদের অর্জনের কারণেই লাঞ্ছনাদায়ক আযাবের বজ্রাঘাত তাদেরকে পাকড়াও করল।[সূরা ফুসসিলাত আয়াত ১৭]
যারা হকের পরিবর্তে বাতিল, ভালোর পরিবর্তে মন্দ এবং ঈমানের পরিবর্তে কুফরীর পথ অবলম্বন করল। ফলে মহান আল্লাহ (ﷻ) শাস্তি স্বরূপ তাদের অন্তরকে সব সময়ের জন্য হিদায়াত থেকে ফিরিয়ে দিলেন। কেননা, এটাই হল আল্লাহর চিরাচরিত বিধান। অব্যাহতভাবে কুফরী ও ভ্রষ্টতার উপর অবিচল থাকলে, তা অন্তঃকরণে মোহর লেগে যাওয়ার কারণ হয়।
ইমান আনার পর কুফুরি করা
একটা কথা আছে না স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। ইমান, হেদায়েতও অনেকটা সেরকমই। এরকম হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘মানুষের নিকট এমন একটি সময় আসবে, যখন জ্বলন্ত আগুনের স্ফুলিঙ্গ হাতের মুষ্ঠির মধ্যে রাখার মতই দীন নিয়ে টিকে থাকা কঠিন হবে।'[8]তিরমিযী হাদিস ২২৬০
আল্লাহ (ﷻ) কুরআনে বলেছেন,
তারা ঈমান এনেছিল তারপর কুফরী করেছিল। ফলে তাদের অন্তরসমূহে মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই তারা বুঝতে পারছে না।[সুরা মুনাফিকুন আয়াত ৩]
যে ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে এবং যারা তাদের অন্তর কুফরী দ্বারা উন্মুক্ত করেছে, তাদের উপরই আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব। ঐ ব্যক্তি ছাড়া যাকে বাধ্য করা হয় (কুফরী করতে) অথচ তার অন্তর থাকে ঈমানে পরিতৃপ্ত। এটা এ জন্য যে, তারা আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে পছন্দ করেছে। আর নিশ্চয় আল্লাহ কাফির কওমকে হিদায়াত করেন না। এরাই তারা, যাদের অন্তরসমূহ, শ্রবণসমূহ ও দৃষ্টিসমূহের উপর আল্লাহ মোহর করে দিয়েছেন এবং তারাই হচ্ছে গাফেল।[সুরা নাহল আয়াত ১০৬-১০৮]
আল্লাহ কীভাবে হেদায়াত করবেন সে সম্প্রদায়কে, যারা ঈমান আনার পর ও রাসূলকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেয়ার পর এবং তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন আসার পর কুফর করে? আর আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না। নিশ্চয় যারা ঈমান আনার পর কুফরী করেছে তারপর তারা কুফরীতে বেড়ে গিয়েছে তাদের তওবা কখনো কবুল করা হবে না। আর তারাই পথ ভ্ৰষ্ট।[আলে ইমরান আয়াত ৮৬-৯০]
অবশ্য উপরিউক্ত সুরা আলে ইমরানের আয়াত আল্লাহ (ﷻ) পরবর্তীতে রহিত করে আমাদের জন্য কিছুটা সহজ করে দেন বিধানটি।[9]সুনানে আন নাসাই, হাদিস নং ৪০৬৯, ৪০৭০ এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা একবার ঈমান এনে পরে পুনরায় কাফের হয়ে গেছে, আবার ঈমান এনেছে এবং আবারো কাফের হয়েছে এবং [অন্তরের] অবিশ্বাস বৃদ্ধি করেছে, আল্লাহ্ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না, তাদের সৎ পথও দেখাবেন না।[10]সূরা নিসা আয়াত ১৩৭, সূরা নাহল আয়াত ১০৬, সূরা বাকারা আয়াত ২১৭
অর্থাৎ ইমান আনার পর দুইবার কুফুরিতে ফিরে গেলে সে আর হেদায়েত না পাওয়ার বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চয়তা রয়েছে। আবার এরা ছাড়াও মুনাফিকদের অন্তরেও মোহর মেরে দেওয়া হয়।[11]সুরা তাওবা আয়াত ৯৩, সুরা মুহাম্মদ আয়াত ১৬
অহংকার
অহংকার আল্লাহর সবচেয়ে অপছন্দ কর্মগুলোর একটি।[12]মুসলিম হাদিস ১৩২, আহমাদ ১/৪১২, ৫/১০৯ একটি হাদিসে এসেছে অহংকার আল্লাহর চাদর।[13]মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫১১০ আর এই অহংকারও হেদায়েত পাওয়ার জন্য বাঁধা সরূপ। আল্লাহ (ﷻ) বলেন,
দুর্ভোগ প্রত্যেক চরম মিথ্যুক পাপাচারীর জন্য! সে শোনে আল্লাহর আয়াতসমূহ যা তার সামনে তিলাওয়াত করা হচ্ছে, তারপর সে ঔদ্ধত্যের সাথে অবিচল থাকে, যেন সে তা শুনতে পায়নি। অতএব তুমি তাকে এক যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। আর যখন সে আমার আয়াতসমূহের কিছু জানতে পারে, তখন সে এটাকে পরিহাসের পাত্ররূপে গ্রহণ করে। এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক আজাব।[সুরা জাসিয়া আয়াত ৭-৯]
যারা অন্যায়ভাবে যমিনে অহংকার করে আমার আয়াতসমূহ থেকে তাদেরকে আমি অবশ্যই ফিরিয়ে রাখব। আর তারা সকল আয়াত দেখলেও তাতে ঈমান আনবে না এবং তারা সঠিক পথ দেখলেও তাকে পথ হিসাবে গ্রহণ করবে না। আর তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে তা পথ হিসাবে গ্রহণ করবে। এটা এ জন্য যে, তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে এবং সে সম্পর্কে তারা ছিল গাফেল।[সুরা আরাফ আয়াত ১৪৭]
আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকার বশতঃ আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’[সুরা গাফির আয়াত ৬০]
অহংকার করে হেদায়েত হতে বিচ্যুত হয়েছে এর সর্বোত্তম দৃষ্টান্ততো খোদ সয়তানই, আল্লাহ তায়ালা বলেন,
আর যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা কর’। তখন তারা সিজদা করল, ইবলীস ছাড়া। সে অস্বীকার করল এবং অহংকার করল। আর সে হল কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত।[সূরা বাকারাহ আয়াত ৩৪]
প্রবৃত্তির অনুসরণ বা নফসকে ইলাহ বানানো
আমার নিকট মানুষ সবচেয়ে বেশি হেদায়েত হতে দুরে সরে যাওয়ায় কারণগুলোর মাঝে অন্যতম একটি কারণ হল এই প্রবৃত্তির অনুসরণ। কোরআনে বর্ণিত বর্ণিত হয়েছে,
তবে তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে আপন ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? তার কাছে জ্ঞান আসার পর আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন এবং তিনি তার কান ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। আর তার চোখের উপর স্থাপন করেছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পর কে তাকে হিদায়াত করবে? তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?[সূরা জাসিয়া আয়াত ২৩]
অতঃপর তারা যদি তোমার আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে জেনে রাখ, তারা তো নিজেদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করে। আর আল্লাহর দিকনির্দেশনা ছাড়া যে নিজের খেয়াল খুশির অনুসরণ করে তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ জালিম কওমকে হিদায়াত করেন না।[সুরা কাসাস আয়াত ৫০]
এই নিজের প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশির অনুসরণ করার বিষয়ে আল্লাহ (ﷻ) তার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা নবীদেরকে পর্যন্ত সতর্ক করেছেন। তিনি দাঊদ (আ) এর উদ্দেশ্যে বলেন,
নিশ্চয় আমি তোমাকে যমিনে খলীফা বানিয়েছি, অতএব তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার কর আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, কেননা তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।[সুরা সোয়াদ আয়াত ২৬]
এর ভয়াবহতা সম্পর্কে হাদিসেও এসেছে। হুযাইফাহ (রা) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি,
চাটাই বুননের মত এক এক করে ফিতনা মানুষের অন্তরে আসতে থাকে। যে অন্তরে তা গেঁথে যায় তাতে একটি করে কালো দাগ পড়ে। আর যে অন্তর তা প্রত্যাখ্যান করবে তাতে একটি উজ্জ্বল দাগ পড়বে। এমনি করে দুটি অন্তর দু’ধরনের হয়ে যায়। এটি সাদা পাথরের ন্যায়; আসমান ও জমিন যতদিন থাকবে ততদিন কোন ফিতনা তার কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর অপরটি হয়ে যায় উল্টানো সাদা মিশ্রিত কালো কলসির ন্যায়, তার প্রবৃত্তির মধ্যে যা গেছে তা ছাড়া ভাল-মন্দ বলতে সে কিছুই চিনে না।[14]সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৪
আলী (রাঃ) বলেন,
‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য দু’টি বস্তুর ভয় করছি- দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির পূজা। কেননা দীর্ঘ আশা আখিরাত ভুলিয়ে দেয় এবং প্রবৃত্তির পূজা মানুষকে হক থেকে বাধা দেয়’।[15]আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/৩৪২
প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে কীভাবে ধ্বংস করে তার একটি দৃষ্টান্ত হল কবি আ‘শা বিন ক্বায়েস ইবনে ছা‘লাবা। সে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ)-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য রওয়ানা হয়। সে মক্কার নিকটবর্তী পৌঁছার পর আবু জাহল এসে বলল, মুহাম্মাদ তো ব্যভিচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আ‘শা বললেন তার তো ব্যভিচারের কোন প্রয়োজন নেই। আবু জাহল পুনরায় বলল, তিনি তো মদ্যপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আ‘শা বললেন, আল্লাহর কসম! মদের প্রতি তো আমার চরম দুর্বলতা রয়েছে। ঠিক আছে আমি এবার ফিরে যাব এবং এই এক বছর তৃপ্তি সহকারে মদ পান করে নেব। তারপর ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করব। কিন্তু ঐ বছরেই তাঁর মৃত্যু হয়। পুনরায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ফিরে আসার সুযোগ তাঁর হয়ে উঠেনি।[16]আবুল ফিদা ইবনু কাছীর, আল-বিাদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (বৈরূত : দারুল ফিকর, ১৪০৭ হিঃ/১৯৮৬ খ্রিঃ), ৩/১০২
আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা
আল্লাহ (ﷻ) নামে মিথ্যা রচনা, বানোয়াট কথা বার্তা পুরাতন একটি আমল। জাহেলিয়াতের যুগে যেমন এই আমল ছিল এখনও মুসলিম ও কাফেরদের মাঝেও এই আমল পাওয়া যায়। আল্লাহ (ﷻ) নামে মিথ্যা বানোয়াট কথা প্রচার করাও অন্তরে মোহর পরে যাওয়ার একটি কারণ, এই বিষয়ে তিনি নিজেই বলেছেন,
তারা কি একথা বলে যে, সে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে? অথচ যদি আল্লাহ চাইতেন তোমার হৃদয়ে মোহর মেরে দিতেন। আর আল্লাহ মিথ্যাকে মুছে দেন এবং নিজ বাণী দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিশ্চয় তিনি অন্তরসমূহে যা আছে, সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।[সুরা আশ শূরা আয়াত ২৪]
এই বিষয়ে মুসা (আ) নিজের কওমকে সতর্ক করে বলেছিলেন,
‘তোমাদের দুর্ভাগ্য! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করো না। করলে তিনি আজাব দ্বারা তোমাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি মিথ্যা আরোপ করে, সে-ই ব্যর্থ হয়।[সূরা তাহা আয়াত ৬১]
আর আল্লাহ (ﷻ) নিজেও বলেছেন,
সুতরাং তার চেয়ে অধিক জালিম আর কে, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং তার কাছে সত্য আসার পর তা অস্বীকার করে? জাহান্নামেই কি কাফিরদের আবাসস্থল নয়?[সুরা আয যুমার আয়াত ৩২, সূরা আল-আনকাবূত আয়াত ৬৮]
বল, ‘নিশ্চয় যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না’।[সুরা ইউনুস আয়াত ৬৯]
যারা নিজেদের কাছে আগত কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়া আল্লাহর নিদর্শনাবলি সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়। তাদের এ কাজ আল্লাহ ও মুমিনদের দৃষ্টিতে অতিশয় ঘৃণার্হ। এভাবেই আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী স্বৈরাচারীর অন্তরে সীল মেরে দেন।[সুরা ফাতির আয়াত ৩৫]
আরো কিছু
উপরে উল্লিখিত কারণগুলো ছাড়াও আরো কিছু কারণ পাই কোরআন হাদিসে যেগুলো মানুষের হেদায়েতের পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন ক্ষমতা, লোভ এগুলিও অনেক সময় হেদায়েতের পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।
রাসূল (ﷺ)-এর দূত দাহিয়া বিন খলীফা আল-কালবী (রাঃ) হিরাকলের নিকটে গেলে তিনি পত্র পাঠ ও আবু সুফিয়ান (রাঃ) – এর কাছে রাসুলের অবস্থা জানার পর বলেন,
‘তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তবে শীঘ্রই তিনি আমার এ দু’পায়ের নীচের জায়গার অধিকারী হবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য হ’তে হবেন, এ কথা ভাবতে পারি নি। যদি জানতাম, আমি তাঁর নিকট পৌঁছতে পারব, তাহলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি যেকোন কষ্ট সহ্য করতাম। আর আমি যদি তাঁর নিকট থাকতাম তবে অবশ্যই তাঁর পা দু’খানা ধৌত করে দিতাম। …অতঃপর তিনি সম্মুখে এসে বললেন, হেরোমের অধিবাসী! তোমরা কি মঙ্গল, হেদায়াত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নবীর নিকটে বায়আত গ্রহণ কর। এ কথা শুনে তারা বন্য গাধার ন্যায় দ্রুত নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু তারা তা বন্ধ দেখতে পেল। হিরাক্লিয়াস যখন তাদের অনীহা লক্ষ্য করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন বললেন, ওদের আমার নিকট ফিরিয়ে আন। তিনি বললেন, আমি অব্যবহিত পূর্বে যে কথা বলেছি, তা দ্বারা তোমাদের দ্বীনের উপরে তোমাদের৷ দৃঢ়তার পরীক্ষা করছিলাম। এখন তা দেখে নিলাম। একথা শুনে তারা তাঁকে সিজদা করল এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হল। এটাই ছিল হিরাক্লিয়াসের সর্বশেষ অবস্থা’।[17]বুখারী হাদিস ৭, ২৯৪১
এই ব্যাধিই ফেরাঊন ও তার সম্প্রদায়ের ঈমানের পথে বাধা হয়েছিল। কোরআনে আল্লাহ (ﷻ) বলেন,
তারপর আমি মূসা ও তার ভাই হারূনকে আমার নিদর্শনাবলি ও সুস্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছি। ফির‘আউন ও তার পারিষদবর্গের কাছে; কিন্তু তারা অহংকার করল এবং তারা ছিল উদ্ধত কওম। অতঃপর তারা বলল, আমরা কি আমাদের মতই দু’জন মানুষের প্রতি ঈমান আনব অথচ তাদের কওম আমাদের সেবাদাস।[সুরা মুমিনুন আয়াত ৪৫-৪৭]
আরো একটি কারণ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে টানা ৩ জুমা অবহেলা করে আদায় না করা। আবূল জা’দ যামরী (রাঃ) সূত্রে, যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী ছিলেন, নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
যে ব্যক্তি তিনটি জুমু’আ তার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন পূর্বক ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তা’আলা তার অন্তরে মোহর মেরে দেন।[18]ইবন মাজাহ হাঃ ১২২৫, সুনানে নাসায়ী ১৩৭১-৭২, সুনানে আবু দাউদ ১০৫২
এই ছিল বিস্তারিত বিষয়, হয়তো আরো কারণ থাকতে পারে যা আমি মিস করে গিয়েছি বা আমার জানা নেই, আল্লাহই ভালো জানেন।
যাইহোক আমার এই লিখাটির উদ্দেশ্য শুধু কাফেরদের, ইসলাম বিদ্বেষীদের, সংশয়বাদীদের জবাব দেওয়া না, বরং এর সাথে তারা এবং মুসলমানরাও যেন এই বিষয়ে সতর্ক হয় ও সেভাবে যেন আমল করার প্রতি উদ্ভূত হয় এটাও লিখার একটি মুখ্য কারণ। আমরা আশা রাখতে পারি এগুলো জানার পর সেভাবে আমল করলে, আল্লাহর বলে দেওয়া পথ অনুসরণ করলে তিনি আমাদের হেদায়েত দিবেন। এবং হেদায়েত না পাওয়ার মত আমলগুলো করলে আল্লাহ তায়ালা হিদায়াত দিবেন না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সকলকে তাওফিক দিন যেন আমরা হেদায়েতের পথে চলতে পারি ও অটল থাকতে পারি।
Footnotes
| ⇧1 | সহিহ বুখারী ৭৪০৫, ৭৫০৫, ৭৫৩৭; মুসলিম ১৬৭৫ |
|---|---|
| ⇧2 | যেমন সূরা আল-বাকারার ২য় আয়াত, সূরা আল ইসরার নবম আয়াত, সূরা আল-বাকারাহঃ ৯৭, ১৮৫, সূরা আলে-ইমরানঃ ১৩৮, সূরা আল-আনআমঃ ১৫৭, সূরা আল-আরাফঃ ৫২, ২০৩, সূরা ইউসুফঃ ১১১, সূরা আন-নাহলঃ ৬৪, ৮৯, ১০২, সূরা আয-যুমারঃ ২৩, সূরা ফুসসিলাতঃ ৪৪, সূরা আল-জাসিয়াহঃ ২০ |
| ⇧3 | সুরা সাজদাহ আয়াত ৪৪; সূরা ইউনুস আয়াত ৫৭; সুরা আলে ইমরান আয়াত ১৩৮ |
| ⇧4 | সহিহ মুসলিম হাদিস ২৫৭৭ |
| ⇧5 | সহিহ বুখারী হা/১৩৬২, মুসলিম হা/২৬৪৭, ২৬৪৮ |
| ⇧6 | তিরমিযি: ৩৩৩৪, ইবনে মাজাহঃ ৪২৪৪, মুসনাদে আহমাদঃ ২/২৯৭ |
| ⇧7 | সুরা আরাফ আয়াত ১০১, সুরা ইউনুস আয়াত ৭৪ |
| ⇧8 | তিরমিযী হাদিস ২২৬০ |
| ⇧9 | সুনানে আন নাসাই, হাদিস নং ৪০৬৯, ৪০৭০ |
| ⇧10 | সূরা নিসা আয়াত ১৩৭, সূরা নাহল আয়াত ১০৬, সূরা বাকারা আয়াত ২১৭ |
| ⇧11 | সুরা তাওবা আয়াত ৯৩, সুরা মুহাম্মদ আয়াত ১৬ |
| ⇧12 | মুসলিম হাদিস ১৩২, আহমাদ ১/৪১২, ৫/১০৯ |
| ⇧13 | মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫১১০ |
| ⇧14 | সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৪ |
| ⇧15 | আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/৩৪২ |
| ⇧16 | আবুল ফিদা ইবনু কাছীর, আল-বিাদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (বৈরূত : দারুল ফিকর, ১৪০৭ হিঃ/১৯৮৬ খ্রিঃ), ৩/১০২ |
| ⇧17 | বুখারী হাদিস ৭, ২৯৪১ |
| ⇧18 | ইবন মাজাহ হাঃ ১২২৫, সুনানে নাসায়ী ১৩৭১-৭২, সুনানে আবু দাউদ ১০৫২ |




