
সম্প্রতি সাফওয়ান চৌধুরি রেবিল ওরফে সাহারা চৌধুরি রেবিলের বেশ কিছু ‘সিরিজ এক্টিভিটিজ’ আমরা দেখেছি। ড. সরোয়ার হোসেন এবং আসিফ মাহতাব উৎসকে হত্যার হুমকি দেওয়া, ফেসবুকে অস্ত্র তৈরির ছবি পোস্ট করে উষ্কানি প্রদান, পুলিশ ফাঁড়িতে বোমা মারার কথা বলা এবং এলজিবিটি বিয়ের অধিকার নিয়ে শো-অফ অনশন পালন-এই ছিল মোটাদাগে তার সাম্প্রতিক তৎপরতা।
কিন্তু পুরো ব্যাপারটা কি এখানেই শেষ? আমি মনে করি, “না”। এগুলো নিছক শখের বশে করা হয়নি। ভেবে-চিন্তেই এসব ধারাবাহিক কার্যক্রম চলছে। খটকাটা তখনি লাগে, যখন এই সন্ত্রাসীকে রাম-বাম সবাই মিলে ব্যক্তিগত এবং সাংগঠনিক পর্যায় থেকে সমর্থন জানানো শুরু করে। এরপর আবার সমকামী অধিকারের পক্ষে থাকা সাংবাদিক তাসনিম খলিলের নেত্র নিউজ এই রেবিলের সাক্ষাৎকার নেয় এবং ঢাকা ট্রিবিউন তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এখন আবার বামপন্থীরা পুরো দমে তাকে কাজে লাগাচ্ছে একেবারে নিজেদের প্রজেক্টের মতো।
বাংলাদেশের এলজিবিটি এক্টিভিজমের প্রকাশ্য ধারাপ্রবাহ এখন চলছে রেবিলের মাধ্যমে। তাকে দিয়েই অনেক ধরণের পরীক্ষণ চলছে। রাজুতে যে অনশনের খেলা হলো, এটাও একটা পরীক্ষণ। এগুলো একেকটা তাদের মাইলফলক বা অর্জন – এর অংশ হচ্ছে এবং তাদেরকে ভেতরে ভেতরে উদ্বুদ্ধ করছে পরবর্তী স্টেপে যেতে।
প্রোগ্রামিং এ এলগরিদম বলে একটা কথা আছে। এখানে আপনাকে ধাপে ধাপে একটা কিছু বাস্তবায়ন করতে হয়। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এখানে ধাপগুলো কখনো কখনো ইন্টারকানেক্টেড থাকে। মানে হলো, ধরেন, আপনি ২য় ধাপে এমন কোনো অবস্থা পেলেন, যেটা আপনাকে আর ৩য় ধাপে যেতে বলবে না, সরাসরি ৪র্থ ধাপে, এমনকি কখনো কখনো শেষ ধাপে নিয়ে যাবে।
এলজিবিটি এক্টিভিজমও এভাবেই হচ্ছে এখন। তারা রাষ্ট্রের কাঠামো, সেক্যুলারদের সমর্থন আর জনগণের প্রতিক্রিয়া দেখে ঠিক এভাবেই এলগরিদমের মতো কাজ করছে। যদি দেখতে পায় যে কোনো একটা ধাপ থেকে লাফ দেওয়া যাবে, তাহলে তারা লাফ দিবে আর যদি দেখে যে না পরিস্থিতি বেগতিক, তাহলে ঐ এক ধাপ এক ধাপ করেই এগোবে। আর এই খেলায় আপাতত সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ডে আছে ট্রান্স জঙ্গি রেবিল।
এখানে বেশ কিছু লক্ষণীয় ব্যাপার আছে। রেবিল সিলেট মেট্রোপলিটনের ছাত্র (ছাত্র, ছাত্র, ছাত্র) হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে একটি অপরাধের পক্ষে অনশন করে। একদিকে সে সন্ত্রাসী, আরেক দিকে বহিরাগত। এরপরেও কিন্তু ঢাবি প্রশাসন কিছু বলেনি, এমনকি সেখানকার ছাত্রনেতারাও নীরব ছিল। কিন্তু একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে কিছু ইসলামি অ্যাক্টিভিস্টকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তখন প্রশাসন ও একাধিক ছাত্রনেতারা বাধা দেয়।
অর্থাৎ কেউ পেছন থেকে ইন্ধন যোগাচ্ছে, কেউ ব্যাকআপ দিচ্ছে, কেউ সমর্থন জানাচ্ছে, আবার কেউ বা নীরবে সুযোগ করে দিচ্ছে। এভাবে পুরো সেক্যুলার সিস্টেম এবং লিবারেল ঘরানার ব্যাক্তিবর্গের বদৌলতে চরমপন্থী এলজিবিটি জঙ্গি সাফওয়ান চৌধুরি রেবিল দন্ডবিধি-৩৭৭ এর বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এভাবেই সকল অপশক্তির মিলিত প্রয়াসে সমকামিতাবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা এগিয়ে যাচ্ছে।
তাহলে আমরা কি কিছু করব না? প্রজন্মকে কি ছেড়ে দিবো লিবারেল সিস্টেমের থাবার সামনে? না, বুঝার মতো অনেকগুলো ব্যাপার আছে, আমাদের করণীয় আছে, না করার মতোও কিছু কাজ আছে। বু্ঝার ব্যাপারগুলো বলেছিই। করণীয় বলার আগে স্পষ্ট করে নিতে চাই যে কী করা যাবে না। ফেসবুকে অনেক সময় আমরা ভায়োলেন্ট কমেন্ট পাই, যেখানে অনেকে বলতে চান যে এলজিবিটি এক্টিভিস্টদেরকে মেরে ফেলাটাই সমাধান।
এটা নিছক আবেগী কথা ছাড়া কিছুই না। প্রথমত, ইসলামি শাসন যেখানে চলছে, সেখানেও কোনো একক ব্যক্তি কোনো সমকামীকে হত্যা করতে পারবে না। এই এখতিয়ার থাকবে আদালতের। এছাড়াও এমন কোনো অনিয়ন্ত্রিত কাজ করা বা এমন কথা বলার মাধ্যমে এলজিবিটি প্রতিরোধ তো হবেই না, বরং সমকামিতাবান্ধব পলিসি তৈরির পথ আরও সুগম হবে। কওমে লূতের এ যুগের অনুসারীরা সিমপ্যাথি বাগিয়ে নিয়ে তাদের আন্দোলনকে আরও বেগবান করবে।
জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয়ের কাহিনী জানেন? এই দুজন ছিল সমকামী অধিকারকর্মী, যাদেরকে ২০১৬ সালে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর সমকামীরা বেশ খানিকটা ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিল অবশ্য, কিন্তু পরবর্তীতে জুলহাজ-তনয়ের আদর্শকে নিয়ে অনেককেই কাজ করতে দেখা গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি এই দুই সমকামীর তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে ঝুলিয়ে রেখেও তাদের কার্যক্রম চালিয়েছে এবং কর্মীদেরকে প্রেরণা যুগিয়েছে।
আজকের পরিস্থিতি আরও ব্যতিক্রম। এখন এমন কোনো ঘটনা ঘটলে সেটা ২০১৬ এর মতো হবে না, বরং একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হবে। শুধুমাত্র সন্ত্রাসী রেবিলকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করার ফলশ্রুতিতেই বামপাড়া তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল, সেখানে কোনো অঘটন ঘটলে বা সামষ্টিক ভায়োলেন্ট আচরণ প্রকাশ পেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
দেখুন, সামনের দিনগুলো চ্যালেঞ্জিং হবে। আমাদের বিরুদ্ধে আছে অপশক্তি, আর পেছনে আছে পূর্বপুরুষদের গৌরবগাঁথা। আমাদেরকে লড়াই করে যেতে হবে, জনগণকে সচেতন করতে হবে এলজিবিটিকিউ নামক ঘৃণ্য পাপাচারপূর্ণ এজেন্ডার ব্যাপারে। এখনই সময় এই তথাকথিত যৌন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অপতৎপরতার ব্যাপারে জানার এবং অন্যকে বুঝানোর। যারা এখনো ‘সমতার আড়ালে সমকামিতা মিশন’ বইটি পড়েননি, তাদের উচিত বইটা দ্রুত পড়ে ফেলা। তাহলে আপনার সামনে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে।
আর যারা পড়ে ফেলেছেন বইটা, জানেন সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডারদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে; তাদের উচিত ব্যাপক পরিসরে অ্যাক্টিভিজম করা। সচেতনতামূলক লিফলেট, ডিজিটাল পোস্টার এবং ইনফোগ্রাফিক বানিয়ে এলজিবিটিকিউ এর গভীরতা তুলে ধরা যেতে পারে। সেই সাথে চলবে চলবে পশ্চিমা ফ্রেমিং থেকে নিজের চিন্তাকে মুক্ত করার লড়াই।
আর ইস্যুভিত্তিক এক্টিভিজমগুলোকেও বেগবান করতে হবে। এলজিবিটি গোষ্ঠীর এলগরিদম ক্র্যাক করতে হবে। তাদেরকে প্রতিটি ধাপে প্রতিহত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকার আশা করে লাভ নেই। আঞ্চলিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কমিউনিটিগুলোকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।
মনে রাখবেন, এই লড়াই প্রজন্ম রক্ষার লড়াই।





