তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বখ্রিস্টধর্মইতিহাস

রোম সম্রাটের সামনে ইমাম বাকিল্লানীর (রহ)-এর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা

কাজী আবু বকর ইবনু আত-তাইয়্যিব ইবনু আল-বাকিল্লানী (রহ.)-এর প্রখর বুদ্ধিমত্তার কিছু ঘটনা, ‘তারীখু কুদাতিল আন্দালুস’ (১/৩৭) গ্রন্থ থেকে:

আল-বাকিল্লানী (রহ.) ছিলেন আদুদুদ্দাওলার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। একবার আদুদুদ্দাওলা তাঁকে রোমের সম্রাটের কাছে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠালেন। উদ্দেশ্য ছিল—তাঁর মাধ্যমে ইসলামের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা এবং খ্রিস্টধর্মের দুর্বলতা ও অসারতা স্পষ্ট করে দেওয়া।

যাত্রার প্রস্তুতির সময় রাষ্ট্রের উজির তাঁকে বললেন,

“আপনি কি আপনার যাত্রার জন্য জ্যোতিষীদের কাছ থেকে শুভ-অশুভ সময় নির্ণয় করিয়েছেন?”

আবু বকর তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন (এর অর্থ কী)। যখন তিনি তাঁর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করলেন, তখন বললেন:

“আমি এমন কথা বলি না, কারণ সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য, ভালো-মন্দ সবই আল্লাহর হাতে। গ্রহ-নক্ষত্রের এখানে বিন্দুমাত্র ক্ষমতা নেই। জ্যোতিষশাস্ত্রের বইগুলো কেবল অজ্ঞ সাধারণ মানুষদের জীবিকা নির্বাহের জন্য রচিত হয়েছে, এর কোনো বাস্তবতা নেই।”

তখন উজির বললেন,

“ইবনুস সূফীকে আমার কাছে হাজির করো,”

ইবনুস সুফি এ বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞ ছিলেন। তাঁকে উপস্থিত করা হলে মন্ত্রী তাঁকে কাজী আবু বকরের সঙ্গে বিতর্ক করতে বললেন, যাতে আবু বকর যে বিষয়টি বাতিল করেছেন—তাঁর কথিত ভুলটি সংশোধন করা যায়। ইবনুস সূফী বললেন:

“বিতর্ক আমার কাজ নয়, আমি তা করতে পারি না। আমি শুধু জ্যোতিষবিদ্যা মুখস্থ রাখি এবং বলি: নক্ষত্রের অবস্থান যদি এমন হয়, তাহলে এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু এর কারণ ব্যাখ্যা করা যুক্তিবিদ ও কালামশাস্ত্রবিদদের কাজ।”

খ্রিষ্টান সম্রাট ও রোমের সম্রাটের সঙ্গে চন্দ্রবিদারণ নিয়ে বিতর্ক

কনস্টান্টিনোপলে রোমের সম্রাট, তাঁর সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ধর্মীয় নেতাদের সামনে আল-বাকিল্লানীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক ও কথোপকথন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে একটি বিতর্ক ছিল চন্দ্রবিদারণ নিয়ে।

সম্রাট তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন,

“তোমাদের নবীর মু’জিযার মধ্যে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার যে দাবি করো, তোমাদের কাছে তার অবস্থা কী?তোমরা তোমাদের নবীর যে মুজিযাগুলোর কথা বলো, তার মধ্যে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনাটি তোমাদের কাছে কীভাবে প্রমাণিত?”

আমি বললাম:

“আমাদের কাছে এটি সত্য ও প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। মানুষ তা দেখেছিল। তবে যারা সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিল এবং যাদের দৃষ্টি তখন চাঁদের দিকে পড়েছিল, তারাই তা দেখতে পেয়েছিল।”

সম্রাট বললেন:

“তাহলে সকল মানুষ কেন তা দেখেনি?”

আমি বললাম:

“কারণ চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হবে—এমন কোনো পূর্বঘোষণা বা নির্ধারিত সময়ের জন্য মানুষ প্রস্তুত হয়ে বসে ছিল না। মানুষ জানতই না যে এমন একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।”

তিনি বললেন:

“এই চাঁদের সাথে তোমাদের একটি বিশেষ সম্পর্ক-আত্মীয়তা আছে, তাহলে রোমান ও অন্যান্য জাতি কেন তা জানল না, শুধু তোমরাই কেন তা দেখলে?”

আমি বললাম:

“তেমনি এই টেবিল (মায়িদা—ঈসা আ.-এর প্রতি অবতীর্ণ খাদ্যভর্তি টেবিল)-এর সাথেও আপনাদের বিশেষ সম্পর্ক আছে, আর আপনারাই তা দেখেছেন অথচ ইহুদি, মাজুসি, ব্রাহ্মণ ও নাস্তিকরা এমনকি বিশেষ করে আপনাদের প্রতিবেশী গ্রিকদের সবাই তো এই বিষয়টিই অস্বীকার করে!

এ কথা শুনে সম্রাট বিভ্রান্ত হয়ে বললেন:

“সুবহানাল্লাহ!”

এবং তিনি অমুক পাদরিকে আমার সাথে কথা বলার জন্য হাজির করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন,

“আমরা তাঁর সাথে পেরে উঠছি না।”

কিছুক্ষণ পর তারা এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে এল, যে দেখতে ভালুকের মতো বিশালদেহী এবং যার চুল ছিল সোনালি/হলদে। সে এসে বসল। আমি তাকে বিষয়টি বললাম। সে বলল:

“মুসলিম ব্যক্তি যা বলেছে তা ঠিক, এর কোনো জবাব আমার জানা নেই, শুধু যা সে বলেছে তা ছাড়া।”

আমি তাকে বললাম:

“তুমি কি বলো, যখন চন্দ্রগ্রহণ হয়, তখন পৃথিবীর সব মানুষ কি তা দেখতে পায়, নাকি যে অঞ্চলটি চন্দ্রের ঠিক সম্মুখে থাকে, শুধু সেই অঞ্চলের মানুষই তা দেখতে পায়?”

সে বলল:

“শুধু তারাই দেখে যারা তার সম্মুখে থাকে।”

আমি বললাম:

“তাহলে চাঁদ যদি পৃথিবীর কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকেই এমনভাবে থাকে যে সেখানে থাকা মানুষ এবং যারা আগে থেকেই তা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল, তারাই তা দেখতে পায়—তাহলে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনাকে তুমি কেন অস্বীকার করছ? যে ব্যক্তি সেদিকে তাকায়নি, অথবা এমন কোনো স্থানে ছিল যেখান থেকে চাঁদ দেখা সম্ভব ছিল না, সে তো তা দেখতে পাবে না!”

সে বলল:

“তুমি যা বলেছ, তা সঠিক। এর বিরুদ্ধে বলার মতো কোনো যুক্তি আমার নেই। বিতর্কের বিষয় শুধু হলো—যেসব বর্ণনাকারী এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তাদের ব্যাপারটি। অন্য কোনো দিক থেকে এর বিরুদ্ধে আপত্তি করা সঠিক নয়।

সম্রাট বললেন:

“বর্ণনাকারীদের নিয়ে কীভাবে সমালোচনা করা যায়?”

খ্রিস্টান বলল:

“লক্ষ্য করুন, এই ধরনের নিদর্শন যদি সত্য হয়, তবে তা বিপুল সংখ্যক মানুষ বর্ণনা করবে, যার ফলে তা আমাদের কাছে (তাওয়াতুরের মাধ্যমে) নিশ্চিতভাবে পৌঁছাবে। তা যেহেতু ঘটেনি, তা প্রমাণ করে যে এই সংবাদ বানোয়াট ও মিথ্যা।”

সম্রাট আমার দিকে ফিরে বললেন:

“জবাব কী?”

আমি বললাম:

“একই যুক্তি তাহলে আসমানি খাদ্যভোজ মায়িদা অবতরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যেমনটি সে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ক্ষেত্রে আমার বিরুদ্ধে বলল। তাকে বলা হবে: যদি মায়িদা অবতরণ সত্য হতো, তবে তা বিপুল সংখ্যক মানুষ বর্ণনা করত, আর তা বিপুল সংখ্যক মানুষ বর্ণনা করলে কোনো ইহুদি বা খ্রিস্টান বাকি থাকত না যে তা নিশ্চিতভাবে না জানত। যেহেতু তারা তা নিশ্চিতভাবে জানে না, তা প্রমাণ করে যে সংবাদটি মিথ্যা!”

তখন খ্রিস্টান, সম্রাট এবং সভায় উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে গেল এবং সভা এভাবেই শেষ হলো।

ঈসা (আ.) কি আল্লাহর বান্দা?

কাজী বলেন: অন্য এক সভায় সম্রাট আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:

“মারইয়াম পুত্র মসীহ ঈসা আলাইহিস সালাত ওয়াস সালাম সম্পর্কে তোমরা কী বলো?”

আমি বললাম:

“আল্লাহর রূহ, তাঁর কালিমা, তাঁর বান্দা, তাঁর নবী ও রাসূল।”

এরপর আমি তেলাওয়াত করলাম:

“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মতো। তিনি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাকে বলেছেন, ‘হও’, ফলে সে হয়ে যায়।” [সূরা আলে ইমরান, ৩:৫৯]

সে বলল:

“হে মুসলিম, তোমরা কি বলো মসীহ একজন বান্দা?”

আমি বললাম:

“হ্যাঁ, এটাই আমরা বলি এবং এতেই বিশ্বাস রাখি।”

সে বলল:

“তোমরা কি বলো না যে তিনি আল্লাহর পুত্র?”

আমি বললাম:

“আল্লাহ রক্ষা করুন! আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি, এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো ইলাহ নেই; যদি থাকত, তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজ সৃষ্টি নিয়ে চলে যেত এবং একে অপরের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। আল্লাহ পবিত্র, তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে।” [আল-মু’মিনূন: ৯১] এবং {তবে কি তোমাদের প্রভু তোমাদের জন্য পুত্রসন্তান নির্ধারণ করেছেন আর নিজের জন্য ফেরেশতাদের কন্যা বানিয়েছেন? নিশ্চয়ই তোমরা এক ভয়ানক কথা বলছ।} [বনী ইসরাঈল: ৪০]।

“তোমরা যদি মসীহকে আল্লাহর পুত্র বানাও, তাহলে তাঁর পিতা, ভাই, দাদা, মামা, চাচা কে ছিলেন?”

এভাবে আমি তার সামনে আত্মীয়তার বিভিন্ন সম্পর্কের কথা উল্লেখ করলাম। সম্রাট হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। এরপর বললেন:

“হে মুসলিম! একজন বান্দা কি সৃষ্টি করতে, জীবন দিতে, মৃত্যু দিতে এবং জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করতে পারে?”

আমি বললাম:

“কোনো বান্দা নিজস্ব ক্ষমতায় এসব করার সামর্থ্য নেই। এগুলো সবই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে হয়!”

সে বলল:

“মসীহ যদি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর সৃষ্টিদের একজন হন, তাহলে কীভাবে তিনি এসব নিদর্শন এনেছেন ও এসব করেছেন?”

আমি বললাম:

“আল্লাহ রক্ষা করুন! করুন! মসীহ নিজস্ব ক্ষমতায় মৃতদের জীবিত করেননি এবং জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীদের সুস্থ করেননি!”

সম্রাট এতে আরও হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন এবং তাঁর ধৈর্যও কমে গেল। তিনি বললেন:

“হে মুসলিম! তুমি এমন কিছু অস্বীকার করছ যা সৃষ্টির মধ্যে সুপরিচিত এবং মানুষ যা গ্রহণ করেছে!”

আমি বললাম:

“ফিকহ ও জ্ঞানের কোনো আলেম বলেননি যে নবীরা নিজে থেকে মু’জিযা সম্পন্ন করেন; বরং তা আল্লাহ তা’আলা তাঁদের হাতে সংঘটিত করেন তাঁদের সত্যতা প্রমাণের জন্য, যা এক প্রকার সাক্ষ্যের মতো কাজ করে!”

সে বলল:

“তোমাদের ধর্মের একদল বিশিষ্ট ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তি আমার কাছে এসেছিল এবং বলেছিল যে এটি তোমাদের কিতাবে আছে।”

আমি বললাম:

“আমাদের কিতাবে আছে যে এসব সবই আল্লাহ তা’আলার অনুমতিক্রমে ঘটেছে!”

এবং আমি তাঁর সামনে মসীহ সম্পর্কে কুরআনের নির্দিষ্ট আয়াত তেলাওয়াত করলাম:

যখন আল্লাহ বলবেন,‘হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তোমার উপর ও তোমার মাতার উপর আমার নি‘আমত স্মরণ কর, যখন আমি তোমাকে শক্তিশালী করেছিলাম পবিত্র আত্মা* দিয়ে, তুমি মানুষের সাথে কথা বলতে দোলনায় ও পরিণত বয়সে। আর যখন আমি তোমাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম কিতাব, হিকমাত, তাওরাত ও ইনজীল; আর যখন আমার আদেশে কাদামাটি থেকে পাখির আকৃতির মত গঠন করতে এবং তাতে ফুঁক দিতে, ফলে আমার আদেশে তা পাখি হয়ে যেত। আর তুমি আমার আদেশে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করতে এবং যখন আমার আদেশে তুমি মৃতকে জীবিত বের করতে। আর যখন তুমি স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলে তখন আমি বনী ইসরাঈলকে তোমার থেকে ফিরিয়ে রেখেছিলাম। অতঃপর তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তারা বলেছিল, এতো স্পষ্ট যাদু। [আল-মায়িদা: ১১০]।

আর আমি বললাম:

“মসীহ এসব কিছুই একমাত্র আল্লাহর মাধ্যমে করেছেন, যাঁর কোনো শরীক নেই, নিজের ক্ষমতা বলে নয়। মসীহ যদি নিজের সত্তা ও শক্তিতে মৃতদের জীবিত করতেন এবং জন্মান্ধ-কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করতেন, তাহলে বলা যেত যে মূসা নিজের ক্ষমতার দ্বারা সমুদ্র বিভক্ত করেছিলেন এবং নিজের হাত নিখুঁতভাবে সাদা বের করেছিলেন! নবীদের মু’জিযা তাঁদের নিজেদের থেকে প্রকাশ হয় না, স্রষ্টার ইচ্ছে ব্যতিত। সুতরাং যখন মূসার মুজিযাকে তাঁর নিজস্ব ক্ষমতার ফল বলে মেনে নেওয়া যায় না, তখন ঈসার হাতে প্রকাশিত মুজিযাগুলোকেও ঈসার নিজস্ব ক্ষমতার ফল হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না!”

খ্রিস্টান ধর্মগুরুর সামনে আল-বাকিল্লানীর জবাব

ইবনু হাইয়ান বর্ণনা করেছেন যে একজন তাঁকে বলেছিলেন, সম্রাট কাজী আবু বকরকে খ্রিস্টানদের একটি বড় সমাবেশে নির্দিষ্ট দিনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। আবু বকর হাজির হলেন, সভাটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয়েছিল। সম্রাট তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন, অত্যন্ত সৌজন্যের সঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথা বললেন এবং নিজের সিংহাসনের সামান্য নিচে একটি আসনে তাঁকে বসালেন। সম্রাট নিজে রাজকীয় জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকে ছিলেন এবং তাঁর নিকটজন ও রাজ্যের কর্মকর্তারা তাঁদের পদমর্যাদা অনুযায়ী উপস্থিত ছিলেন।

Read More...  বোকা ছাড়া কেউ দ্বিতীয়বার চড় খাওয়ার জন্য গাল বাড়িয়ে দেয় না!

এরপর তাঁদের ধর্মের প্রধান ধর্মগুরু প্যাট্রিয়ার্ক/বাতরাক সবার শেষে সেখানে প্রবেশ করলেন। তাঁর চারপাশে তাঁর অনুসারীরা ছিল। তারা ইঞ্জিল পাঠ করছিল এবং ভেজা আগরকাঠ জ্বালিয়ে ধূপ দিচ্ছিল। তারা অত্যন্ত উত্তম পোশাক পরিহিত ছিল।

যখন তিনি সভার মাঝখানে পৌঁছালেন, সম্রাট ও তাঁর লোকজন তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিলেন, তাঁর পোশাক স্পর্শ করলেন এবং তাঁকে নিজের পাশে বসালেন। এরপর সম্রাট কাজী আবু বকরের দিকে ফিরে বললেন:

“হে ফকীহ! এই হলেন প্যাট্রিয়ার্ক, আমাদের ধর্মের অভিভাবক ও সম্প্রদায়ের নেতা!”

কাজী তাঁকে খুব আন্তরিকভাবে সালাম দিলেন এবং অত্যন্ত সহৃদয়ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন:

“পরিবার ও সন্তানরা কেমন আছে?”

এই কথাটি তাঁর ও উপস্থিত সবার কাছে অত্যন্ত গুরুতর মনে হলো। তারা মুখে হাত চাপা দিল এবং আবু বকরের এই কথার তীব্র প্রতিবাদ জানাল। তিনি বললেন:

“হে লোকেরা! তোমরা এই মানুষটির জন্য স্ত্রী ও সন্তান গ্রহণকে অসম্ভব মনে করছ এবং তাঁকে এ থেকে পবিত্র মনে করছ, অথচ তোমরা তোমাদের প্রভুকে (মহিমান্বিত ও সম্মানিত) এ থেকে পবিত্র মনে করছ না! তোমরা তাঁর প্রতি এমন কথা আরোপ করছ—এই মতের ভিত্তি কতটা স্পষ্টভাবে ভুল!”

তারা নিরুত্তর হয়ে গেল, কোনো জবাব দিতে পারল না, তাদের মধ্যে এক বিশাল ভীতি সঞ্চারিত হলো এবং তারা পরাভূত হলো। এরপর সম্রাট প্যাট্রিয়ার্ককে জিজ্ঞাসা করলেন:

“এই ব্যক্তির ব্যাপারে তোমার মত কী?”

তিনি বললেন:

“তার প্রয়োজন পূরণ করুন, তার সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করুন এবং যত দ্রুত সম্ভব এই ইরাকি ব্যক্তিকে আপনার দেশ থেকে বের করে দিন। যদি তা সম্ভব হয়, আজই তাকে বিদায় করুন। অন্যথায়, এই ব্যক্তি খ্রিস্টধর্মের জন্য যে ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে, তা থেকে আপনি নিরাপদ নন।”

সম্রাট তাই করলেন, আদুদুদ্দাওলাকে সুন্দর জবাব ও উপহার পাঠালেন, দূতকে দ্রুত বিদায় করলেন এবং তাঁর সাথে বেশ কয়েকজন মুসলিম বন্দিকে পাঠালেন এবং নিজের সৈন্যদের মধ্য থেকে কাউকে তাঁর নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত করলেন, যতক্ষণ না তিনি নিরাপদে পৌঁছান।

সীরারু আ‘লামিন নুবালা-তে বর্ণিত আরেকটি ঘটনা

আয-যাহাবী তাঁর গ্রন্থ “সিয়ারু আ’লামিন নুবালা”-এ উল্লেখ করেছেন: কাজী আমিরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে রোম সম্রাটের কাছে দূত হিসেবে গিয়েছিলেন এবং তাঁর সাথে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিল। তার একটি হলো: সম্রাট তাঁকে একটি ছোট নিচু দরজা দিয়ে প্রবেশ করাতে চেয়েছিলেন, যাতে তিনি সম্রাটের প্রতি রুকু করে (মাথা নত করে) প্রবেশ করেন। কাজী তা বুঝতে পারলেন এবং পিঠ দিয়ে (পিছনের দিক দিয়ে) প্রবেশ করলেন।

তার আরেকটি হলো: তিনি তাদের পাদরিকে প্রশ্ন করেছিলেন, “পরিবার ও সন্তানরা কেমন আছে?” তখন সম্রাট বললেন,

“থামো! তুমি কি জান না যে পাদরি এসব থেকে পবিত্র?”

তিনি বললেন:

“আপনারা এই ধর্মগুরুকে স্ত্রী ও সন্তান থেকে পবিত্র রাখছেন, অথচ বিশ্বজগতের প্রতিপালককে স্ত্রী ও সন্তান থেকে পবিত্র রাখছেন না!”

আয়শা (রা) সম্পর্কে প্রশ্ন

আরও বলা হয়: সম্রাট তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,

“তোমাদের নবীর স্ত্রীর ব্যাপারে কী ঘটেছিল?”

এই প্রশ্নটি তিরস্কারের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। তিনি বললেন:

“যা ইমরান-কন্যা মারইয়ামের ক্ষেত্রে ঘটেছিল, তেমনই ঘটেছিল, এবং আল্লাহ উভয়কেই নির্দোষ প্রমাণ করেছেন—তবে একটি পার্থক্য হলো আয়িশা কোনো সন্তান জন্ম দেননি।”

এতে সম্রাট নিরুত্তর হয়ে গেলেন।

শিয়া নেতা ইবনুল মু‘আল্লিমের সঙ্গে ঘটনা

আরও বলা হয় যে, তিনি একটি বিতর্ক সভায় উপস্থিত ছিলেন, তখন আবু আবদিল্লাহ ইবনুল মু’আল্লিম বললেন:

“শয়তান এসে গেছে”

আর এই ইবনুল মু’আল্লিম ছিলেন শিয়াদের শায়খ, রাফিজিদের ইমাম ও তাদের আলেম।

কাজী আবু বকর তাঁর একথা শুনে বললেন:

“তুমি কি লক্ষ্য করনি যে, আমি কাফিরদের জন্য শয়তানদেরকে ছেড়ে দিয়েছি; ওরা তাদেরকে বিশেষভাবে প্ররোচিত করে? (সূরা মারইয়াম : ৮৩ এর ইঙ্গিত)

অর্থাৎ, ইবনুল মু‘আল্লিম বিচারক আবু বকরকে “শয়তান” বলে ইঙ্গিত করেছিলেন; আর আবু বকর কুরআনের ওই আয়াতের মাধ্যমে অত্যন্ত তাৎক্ষণিক ও বুদ্ধিদীপ্তভাবে তার কথারই বিপরীত অর্থ তার দিকে ফিরিয়ে দেন।

Citation is loading...
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Back to top button