
- বাউলদের বিকৃত যৌনাচার – পর্ব ১
- বাউলদের বিকৃত যৌনাচার – পর্ব ২
- বাউলদের বিকৃত যৌনাচার – পর্ব ৩
এক
❝ন্যাড়া-নেড়ী, কর্তাভজা, আউল, বাউল, কত সম্প্রদায় গজিয়ে উঠল চারিদিকে এবং রকমারি ছদ্মনামে যৌন কদাচারের পৃষ্ঠপোষকতা করতে লাগল। শ্রীচৈতন্যের প্রজ্ঞা ও প্রেমতত্ত্ব নিফল হয়ে গেল, ঠিক বুদ্ধের আচার-বিশুদ্ধি ও মৈত্রী-দর্শনের মতোই। আসলে আমাদের মজ্জাগত লিঙ্গপূজার অভ্যাসই টিকে গেছে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে।…
আউল, বাউল, দরবেশ, কর্তাভজা প্রভৃতি অপরাপর সহজিয়াদের মধ্যেও এই রকম বা আরো অনেক রকম কদনুষ্ঠান চলিত আছে। পুরুষে পুরুষে ও নারীতে নারীতে সম-মেলন, শুক্র-শোণিত পান, অবলেহন, যৌনাঙ্গ পূজা, এই সব সম্প্রদায়ের মধ্যেও পূজা-পদ্ধতি হিসাবে স্বীকৃত ও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। শুক্র-সংমিশ্রিত সরবৎকে এঁদের কোন-কোন দল ‘সুধা’ বলেন। ঋতুসিক্ত ন্যাকড়াকে বলেন ‘বজ্র’ এবং তা গোপীযন্ত্র বা এক-তারাতে সংযুক্ত করে রাখেন। অপরাজিতা ফুল যোনির প্রতীক বলে, তাকে এঁরা ‘টোটেম’ হিসাবে ব্যবহার করেন। মৈথুন সংস্পৃষ্ট ঝুমকো জবা দিয়ে বশীকরণ মূলক একাধিক ‘করণ’ হয়। আসলে শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব, যে-কোন পর্যায়ের সহজিয়াই কতকগুলি আনুষ্ঠানিক বিভিন্নতা সত্ত্বেও মূলত একই ধরণের যৌনাপচার করে থাকেন, এতে মনে হয়, আদিম কালের যৌনারাধনা নানা রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে আজো অব্যাহত ধারায় বয়ে চলেছে, আর শাস্ত্রাদেশের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে তাকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে। বস্তুত নৃতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনুসন্ধান এদিক থেকে বেশী পাথেয় সঞ্চয় করেনি বলেই, এর আদি-সূত্রটি আবিষ্কার করা এখনও সহজ হয়নি। কিন্তু বাংলা দেশে যে এ-পথে গবেষণা চালানোর প্রয়োজন রয়েছে, তা আশা করি পাঠক-পাঠিকা অনুধাবন করেছেন।…
এক বাউলের কাছ থেকে খাঁটি গ্রাম্য গান উদ্ধারের আশায় তার ডেরায় গিয়েছিলাম। সেখানে শাড়ীপরা এক যুবককে দেখলাম। তার গোঁফ কামানো, সিথেয় সিঁদুর, হাতে চুড়ি। বলল, আমার প্রকৃতি। বহু ফন্দি-ফিকির করে তার কাছ থেকে শুধু বাউল গানই বের করা গেল না, বাউল সমাজে নানা প্রক্রিয়ার ‘শাস্ত্রসম্মত’ তত্ত্বও বের করা গেল। এই যুবকের নাম দেওয়া হয়েছিল মালতী। এ ছাড়া আর একটি তরুণ ‘প্রকৃতি’ও ছিল তার, কিন্তু তার সাক্ষাৎলাভ আর ভাগ্যে ঘটে ওঠেনি। এই শ্রেণীর ধর্ম-ভিক্ষুকদের একটি নারী-সংস্করণও আছে। ভৈরবী, মাতাজী, গোঁসাইনী, নানা নামে তারা চলে। ইতিপূর্বে তাদের কথা আমি বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছি। তাদেরও নেশা এবং পেশা একই। কালিঘাট অঞ্চলে খড়ম-পর। এই রকম এক বছর-পঁয়ত্রিশ বয়সের মাতাজীকে প্রত্যহ একদল ইতর ব্যক্তির সঙ্গে গঙ্গার ঘাটে বসে গাঁজা খেতে এবং যৎপরোনাস্তি কুকথা বলতে দেখেছেন আশা করি অনেকেই। ঘাটেই একদা তার বসবাস ছিল। স্নানান্তে বহু কূল-মহিলা তার কাছে দাঁড়িয়ে তত্ত্বকথা শুনতেন। কথাটা, মূলাটা পূজাস্বরূপ দিয়ে, কেউ কেউ স্বামী পরিত্যক্তা কন্যা বা ভগিনীকে এনে গোপনে মায়ের দয়া ধরিয়ে নিয়ে যেতেন, এমন খবর পেয়েছি। আবার কোন কোন দুষ্ট বালক বা যুবক তার ঘরে ঢুকে রাত কাটাত, এমন কথাও লোকে বলেছে।…
নর-নারীর মধ্যে অবৈধ অনুরাগ সৃষ্টির উপায় হিসাবে বশীকরণ বিদ্যার প্রচলন এ দেশে আছে অনেক দিন থেকে। কোকার কামশাস্ত্রে, কোন কোন তন্ত্রে এবং আয়ুর্বেদ সংক্রান্ত অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন পুঁথি-পত্রে বশীকরণ তত্ত্বের উল্লেখ দেখ যায়। নানা রকম তুক-তাক বন্ধ-ধন্ধ, মাদুলী ও কবচ বশীকরণের উপায় রূপে ব্যবস্থিত হয় এবং তান্ত্রিক, বাউল ও ফকির জাতীয় শুভানুধ্যায়ীরাই ছদ্মবেশে সমাজ-জীবনে প্রবেশ করে এই সব জিনিষের লেন-দেন করে।…❞[1]নন্দগোপাল সেনগুপ্ত (১৯৬১), সমাজ সমীক্ষা: অপরাধ ও অনাচার, পৃ ৮,৫৮,৪২,১৮৬, গ্রন্থ প্রকাশ, কলকাতা, দ্বিতীয় প্রিন্ট
দুই
❝তারাশঙ্করবাবুর কাছেই সেদিন প্রথম জানলাম, আউল-বাউল ও সহজিয়া-বৈষ্ণবরা দেহতত্ত্ববাদী। তারা মনে করে-যাহা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তাহা আছে দেহভাণ্ডে। পরম ব্রহ্মাকে, পরম সত্যকে জানার জন্য ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠান তাদের কাছে মূল্যহীন। দেহকে জানা, সৃষ্টি তত্ত্বকে জানার জন্যে নারী-পুরুষের মিলন হল স্বাভাবিক উপায়। মিলন থেকেই সৃষ্টি। মিলনেই আনন্দ। মিলনেই পূর্ণ জ্ঞান।❞[2]প্রবীর ঘোষ (২০০৬), মনের রোগ-নিয়ন্ত্রণ-যোগ-মেডিটেশন, পৃ ১২৩, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা
তিন
❝বাউল-মতে গুরু বা মুর্শিদ কাণ্ডারী। কায়া-সাধনায় নারী সহায়িকা। গুরু-নির্দেশে পুরক-কুম্ভকে ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। বাউল-তত্ত্বে জীবস্রষ্টা ‘বস্তু’-রূপে (অর্থাৎ বীর্যরূপে) মানবদেহে অধিষ্ঠিত। তাই এই সাধনায় ‘বস্তু-ধারণ সর্বাগ্রে প্রয়োজন। ‘বস্তুবাদী’ বাউল বিশ্বাস করেন-যা আছে ভাণ্ডে (দেহভাণ্ডে), তা আছে ব্রহ্মাণ্ডে। লালন ফকিরের গানে আছে-
বস্তু ছাড়া নাহি আর আল্লা কিংবা হরি
এহি মত দেখ সবে নরবস্তু ধরি।
রজঃ-বীর্য এই দুই তত্ত্ব যেবা চেনে।
লালন সাঁইজীকে সেই জন জানে।
বাউল-সাধনায় নারীদেহ কামনা ভোগের উপাদান নয়, নিষ্কামচেতনায় দেহসাধনের জন্যই নারী-পুরুষের মিলন। এখানে প্রেমই লক্ষ্য; দেহসঙ্গমে থাকবে কামহীনতা। তাই সহজিয়া চন্ডীদাসের সেই বিখ্যাতপদ মনে জাগে-
গোপন পিরীতি
গোপনে রাখিবি
সাধিবি মনের কাজ।
ভেকের মুখেতে
সাপেরে নাচাবি
তবে তো রসিকরাজ।।
বাউল-গবেষণায় সুখ্যাত ক্ষেত্রসমীক্ষক শক্তিনাথ ঝা বলেছেন, “দেহমিলনের পূর্বে সাধক-সাধিকা ১০৮ বার গুরু-প্রদত্ত মন্ত্র জপ করবে। নারীর জন্মস্থান থেকে রস গিয়ে তিলক পরবে দুজনে। বাম নাকের নিশ্বাসে দেহমিলন করতে হবে। ‘দক্ষিণ দেশ’ বা ডান নাকে সূর্যনাড়ি, তখন দেহ গরম থাকে। তাই ডান দিকের নিশ্বাসে, প্রবর্ত বা সাধক স্তরে দেহমিলন নিষিদ্ধ। দেহমিলনে পুরুষ ধীর এবং শান্তভাবে নারীদেহে অনুপ্রবেশ করবে।”
বাউলরা প্রকৃতির (নারীর) রজঃপ্রবৃত্তির কালকে ‘অমাবস্যা’ বলেন। তা ঘোর অন্ধকারপূর্ণ কামের সময়। বাউলের ‘সহজ মানুষ’, ‘অধর মানুষ’ প্রেমস্বরূপ। সেই ‘সহজ মানুষ’ প্রকৃতির সহস্রার থেকে রজেঃ জাগরিত হন। তাই তাকে বলে- ‘অমাবস্যায় পূর্ণচন্দ্রের উদয়’।
বাউল, নারীকে সাধনসঙ্গিনী-সেবাদাসী হিসাবে দেখেন। দেহসাধনায় মিলন হবে, অথচ কোনও সন্তান জন্মাবে না। যদি সন্তান জন্মায়, তবে সেই বাউল ভ্রষ্ট সাধক। লালনও তাঁর এক শিষ্যকে (পাঞ্জু শাহ) সন্তানের পিতা-হওয়ার-‘অপরাধে’ শিষ্যমণ্ডলী থেকে বহিষ্কার করেন।❞[3]ড. শান্তি সিংহ, (প্রবন্ধ) প্রসঙ্গঃ বাউল-সাধনা ও পুরুলিয়ার বাউলগান, দেবপ্রসাদ জানা’র সম্পাদিত ‘অহল্যাভূমি পুরুলিয়া তৃতীয় খণ্ড’-এ সংকলিত, পৃ ১৪২, দীপ প্রকাশন, কলকাতা, প্রিন্ট: ২০০৪
চার
❝তবে রাঢ়ের বাউল সম্পর্কে বলা যায়-
এরা নিজেদেরকে বৈষ্ণব বলে পরিচয় দেন। আসলে বাউলের বিভিন্ন শুদ্ধাচারণ তাদের ক্রমশ বৈষ্ণব করে তোলে। প্রত্যেক সাধু বাউলরা নিজেদেরকে ‘বৈষ্ণব বাউল’ হিসাবে পরিচয় দেন। এই কারণে বাউল বোষ্টম কথাটির প্রচলন আছে। এই কারণে বাউলদের সঙ্গিনীকে বোষ্টুমী বা বৈষ্ণবী বলা হয়। এদের মতে নারী পুরুষের সম্পর্ক একটাই সেটা যৌন সম্পর্ক। এই সম্পর্কটি একমাত্র প্রাকৃতিক সতা, এর কোনো ন্যায় অন্যায় হয় না। অন্যান্য প্রাণীর সম্পর্কও এই রকম। তাছাড়া বাউলরা মনে করে যে ধর্মীয় সামাজিক সম্পর্ক প্রাকৃতিক নয়, এই কারণে তারা নারী পুরুষের ধর্মীয় সামাজিক সম্পর্কে বিশ্বাসী নয়।…(পৃ ১৯)বাউল সাধনা দেহকে কেন্দ্র করেই; ফলে যৌনাচার স্বাভাবিকভাবে চলে আসে।…(পৃ ৬৩)
মনের মানুষের সঙ্গে এই মিলন, নারী পুরুষের যৌন মিলনের মধ্যে দিয়েই হতে পারে। লালন মনে করেন যে, পুরুষ-প্রকৃতির যথার্থ মধুর মিলনেই আত্মার উপলব্ধি সম্ভব। এখানে যেন তান্ত্রিক কায়াসাধনার আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।…(পৃ ১০৬)❞[4]তপনকুমার বিশ্বাস (১৯৬০), লোককবি লালন, রায়-পণ্ডিত পাবলিকেশন্স, কলকাতা
পাঁচ
❝কাপালিক, তান্ত্রিক তো বটেই, এমনকি আউল-বাউল সহজিয়াপন্থীরাও তাদের ধর্মীয় আচারে যে যৌনাচার অনুপ্রবেশ করেছে সে তথ্যটা অত্যন্ত সঙ্গোপনে রাখে। সাধনচক্রের সেই একান্ত গুরুমুখী গুপ্তবিদ্যার ক্রিয়াকলাপ তাঁরা কিছুতেই মন্দিরগাত্রে বিচিত্রিত করতেন না।❞[5]নারায়ণ সান্যাল (২০০২), ভারতীয় ভাষ্কর্যে মিথুন, পৃ ৬৫, সাহিত্যলোক, কলকাতা
| ⇧1 | নন্দগোপাল সেনগুপ্ত (১৯৬১), সমাজ সমীক্ষা: অপরাধ ও অনাচার, পৃ ৮,৫৮,৪২,১৮৬, গ্রন্থ প্রকাশ, কলকাতা, দ্বিতীয় প্রিন্ট |
|---|---|
| ⇧2 | প্রবীর ঘোষ (২০০৬), মনের রোগ-নিয়ন্ত্রণ-যোগ-মেডিটেশন, পৃ ১২৩, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা |
| ⇧3 | ড. শান্তি সিংহ, (প্রবন্ধ) প্রসঙ্গঃ বাউল-সাধনা ও পুরুলিয়ার বাউলগান, দেবপ্রসাদ জানা’র সম্পাদিত ‘অহল্যাভূমি পুরুলিয়া তৃতীয় খণ্ড’-এ সংকলিত, পৃ ১৪২, দীপ প্রকাশন, কলকাতা, প্রিন্ট: ২০০৪ |
| ⇧4 | তপনকুমার বিশ্বাস (১৯৬০), লোককবি লালন, রায়-পণ্ডিত পাবলিকেশন্স, কলকাতা |
| ⇧5 | নারায়ণ সান্যাল (২০০২), ভারতীয় ভাষ্কর্যে মিথুন, পৃ ৬৫, সাহিত্যলোক, কলকাতা |

