আল্লাহর পরিক্ষায় বৈষম্য কেন?
“যেহেতু দুনিয়াটা পরীক্ষার হল, তো এই পরীক্ষায় সবাইকে সমান সুযোগ দেয়া উচিত ছিলনা? যার পা নাই বা যার হাত নেই, তার জীবন আর একজন সুস্থ মানুষের জীবন তফাত করেন একবার। আবার কাউকে কত সুন্দর সুঠাম দেহ দিয়েছেন, সুন্দর ফিটনেস, এত ধনসম্পদ দিয়েছেন যে সারাজীবন বসে খেলেও চলবে, এখন সে এগুলো পেয়ে খারাপ হতে পারে বলবেন, এখন আমি বলব সে কিন্তু ভালো কাজও করতে পারে, এমনকি ভালো কাজ করে আখিরাতে জান্নাত পেতে পারে তারমানে ৫০/৫০ নিশ্চয়তা। আবার কাউকে কুৎসিত চেহার ,বিকলাঙ্গ, ভিখারী বা এমন নিচু মানুষ করে দুনিয়ায় পাঠাইছেন তারা কারো সাথে মিশতেও পারেনা, অনেক লোক আছে যে কিনা একদিন কাজে না গেলে খাবার পায়না,কত কষ্ট করে জীবন পার করে, এদের জন্য আল্লাহর ইবাদত করা তথা পরীক্ষা দেয়া উপরোক্ত ব্যক্তির তুলনায় কি বেশি কষ্টকর না? এরাও কি একটা সুন্দর জীবন পেতে পারত না? এদেরকে কেন দুনিয়ায় এত কষ্ট করে চলতে হচ্ছে? আল্লাহ এমন বৈষম্য করলেন কেন? প্রশ্নের স্বপক্ষে উত্তর দিবেন আশা করি।”
দুনিয়া আমাদের জন্য পরীক্ষা কেন্দ্র, সব কিছুই পরীক্ষা। এখন আমাদের উপরই নির্ধারণ করবে তা পরীক্ষা নাকি আজাব৷ রাসূল (ছাঃ)-তো বলেছেনই, ‘মুমিনের জন্য দুনিয়া কারাগার ও কাফিরের জন্য জান্নাত সদৃশ। [1]
আল্লাহ নিজেই বলেছেন উনার পরীক্ষার ধরণগুলো কেমন, দুর্ভিক্ষ, জানমাল ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, ক্ষুধা, ভয়, রোগ ইত্যাদি।[2] আল্লাহতো দেখতে চান এত কষ্টের মাঝেও কে তার অনুগত। [3] তিনি যেহেতু আগ থেকেই পরীক্ষার ধরণ বলে রেখেছেন সেহেতু এটাকেতো বৈষম্য বলা যায় না। শিক্ষক চাইলে নিজের ১০ জন ছাত্রের পরীক্ষা ১০ ভাবে নিতে পারেন, এমনকি পরিস্থিতি অনুসারে অসুস্থতা, বিপদ ইত্যাদির কারণে ৩০ মিনিট বেশিও সময় দিতে পারেন কাউকে, এর জন্যতো শিক্ষককে অন্যায়কারী বা বৈষম্যকারী বা ইনসাফ করে নি এমন বলা যায় না।
আবার বহু পরীক্ষা আল্লাহ মানুষের কৃতকর্মের কারণে ও হেদায়েতের সুযোগ দেওয়ার জন্য করে থাকেন।[4] আর যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা তাদের পরীক্ষা তিনি কঠিন করেন অন্যদের তুলনায়, তাদের পরীক্ষাও অন্যদের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে, আল্লাহর পরীক্ষা যত কঠিন পুরষ্কারও তত বড় হয়ে থাকে। [5]
যদিও সব কিছু পরীক্ষা তবুও মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব না সব সময় গুনাহ হতে বেঁচে থাকা, সকল পরিক্ষায় ভালো করা। আল্লাহর রাসুল বলেন মানুষ আল্লাহর দয়া, করুনা, মেহেরবানি ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। [6] আসলেই সত্য, এত নেয়ামতের বিপরীতে আমরা যে আমল করি তা কখনোই যথেষ্ট নয়, তার উপর আমরা বারবার বারবার নাফরমানি করি।
তারপরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
‘বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ ওই ব্যক্তির চেয়েও অধিক খুশি হন, যার বিশাল বিস্তৃত ভূমিতে সফরের সময় উট পালিয়ে গেল, যেখানে তার খাদ্য ও পানীয় ছিল। কোনো উপায় না দেখে মৃত্যুর অপেক্ষায় বৃক্ষের ছায়ায় শুয়ে থাকা অবস্থায় বাহনটি পুনরায় ফিরে এল। এতে আনন্দের ভুলে বলে ফেললো, আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা এবং আমি তোমার প্রভু। [7]
আল্লাহ জানেন আমরা দুর্বল, তিনিই সৃষ্টি করেছেন, তিনি জানবেন না আমাদের সম্পর্কে! [8] তাই তিনি কোরআনে আমাদেরকে বারবার মনে করিয়েছেন তিনি যে গাফ্ফার, রহিম, রহমান৷ তিনি যদি আমাদের পাই পাই করে সকল হিসাব নেন ওয়াল্লাহি আমরা কেউ জান্নাতি হতে পারব না, ওয়াল্লাহি আমরা কেউ জন্নাতি হতে পারব না, ওয়াল্লাহি আমরা কেউ জান্নাতি হতে পারব না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কতটা দয়ালু চিন্তা করে দেখুন যে মুমিনের বালা মুসিবতের বিনিময়েও তার গুনাহ মাফ করে দেন৷ [9] গরিবদের জন্য পরীক্ষা ধনিদের তুলনায় বেশি কঠিন মনে হতে পারে কিন্তু আল্লাহর রাসুল বলছেন দরিদ্ররা ৫০০ বছর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [১০] সে যদি সামান্য কষ্টের বিনিময়ে সারাজীবন জান্নাতে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করে তাহলে কি তার কষ্ট বেশি এটা অন্যায় হবে, নাকি সে বেশি কষ্ট করায় উপযুক্ত প্রতিদান পেয়েছে বলে তা ইনসাফ হিসেবে গণ্য হবে?
যাদের পরীক্ষা কঠিন মনে হচ্ছে তা আপাতত দৃষ্টিতে আমাদের নিকট বৈষম্য বা অন্যায় মনে হলেও আখিরাতে তার এই পরীক্ষার বিনিময়ে কি প্রতিদান অপেক্ষা করছে আমরা বলতে পারি না। তার পরীক্ষা কঠিন তাই সে পিছিয়ে পরবে এমন সিস্টেমই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইসলামে রাখেন নি৷ সে কঠিন পরীক্ষা যদি কোন রকম টেনে টুনেও পাশ করে তাহলেও সে আমার চাইতেও বহু গুন উত্তম স্থানে থাকতে পারে যদি আমি সহজ পরিক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েও পাস করি।
তথ্যসুত্রঃ
=======
[1] মুসলিম হা/২৯৫৬; মিশকাত হা/৫১৫৮ ‘রিক্বাক্ব’ অধ্যায়।
[2] সুরা আরাফ আয়াত ১৩০-১৩১, সুরা বাকারা আয়াত ১৫৫, সুরা আম্বিয়া আয়াত ৮৩-৮৪
[3] সুরা মুলক আয়াত ২
[4] সুরা সাজদা আয়াত ২১, সুরা রুম আয়াত ৪১, সূরা আশ-শূরা আয়াত ৩০
[5] তিরমিযী হা/২৩৯৬, সনদ হাসান (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, তাহকীক : কামাল ইউসুফ আল-হউত ১৪০৮/১৯৮৭) ৪/৫১৯ পৃ.; মিশকাত হা/১৫৬৬, ১৫৬২। তিরমিযী হা/২৩৯৮, ২৩৯৯; ইবনু মাজাহ হা/৪০২৩; ছহীহ ইবনু হিববান হা/২৯০১, ২৯২৪; ছহীহাহ হা/১৪৩।
[6] https://www.hadithbd.com/hadith/subjectwise/detail/?sub=21
[7] মুসলিম: ২৭৪৭
[8] সূরা মূলক আয়াত ১৪
[9] বুখারী হা/৫৬৪১; মিশকাত হা/১৫৩৭
[১০] তিরমিযী হা/২৩৫৪; মুসলিম হা/২৭৩৬