আদম হাওয়ার সন্তানরা অজাচারি?
আমি জানতে চাই এটা কি সত্য? ইসলাম অজাচারকে বৈধতা কি করে দিতে পারে! আদম হাওয়ার সন্তানদের মাঝে অজাচার সংগঠিত হয়েছিল?ঠিক আছে, ধরা যাক আদম ও হাওয়া (আ.) ছিলেন প্রথম দু'জন মানুষ। তাদের সন্তানরা ছিল। তাহলে তারা কীভাবে বংশবিস্তার করল? পরিবারের ভিতরেই তো মিলন ঘটেছিল, না কি? অর্থাৎ বাবা-মেয়ে, ভাই-বোন, মা-ছেলে—সবাই শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিল, আর এভাবেই সন্তান জন্ম নিয়েছে। তাহলে তো তোমরা সবাই ব্যভিচারের ফল, সবচেয়ে নিকৃষ্ট পাপের উত্তরাধিকারী! তোমরাই পাপের ফল, আমি নই।
ইসলাম বিদ্বেষীরা প্রায়ই আদম আ: এর পরবর্তীকালীন বংশবিস্তারের প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গটি তুলেছে ইসলামকে ছোট দেখাতে চেষ্টা করে থাকে। আসুন, তাহলে ইনসেস্ট নিয়ে তোলা এই আপত্তির জবাবটা দেখে নেই:
১। আদম আ: এর সময়ও বাবা-মেয়ে, মা-ছেলের মধ্যে বিয়ে করা নিষেধ ছিল।
২৷ আদম আ: এর সন্তান জোড়ায় জোড়ায় জন্ম হতো। প্রত্যেক জোড়ায় একজন ছেলে ও একজন মেয়ে থাকতো।
একই জোড়ায় পয়দা হওয়া ছেলে মেয়ের মধ্যেও বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল।
বরং এক জোড়ার ছেলে আরেক জোড়ার মেয়ের সাথে বিবাহ করতো।
আর এটাই ছিল জেনেটিক্যালি সবচেয়ে বেশি দূরত্ব বজায় রাখার একমাত্র পদ্ধতি, তখনকার সময় বিবেচনায়।
৩। ইসলামে পাপ ও সাওয়াবের ধারণার একমাত্র সোর্স হচ্ছে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ।
যেমন: ইসলামের প্রাথমিক যুগে মদ খাওয়া হারাম ছিল না। অনেক সাহাবীই মদ খেতেন। পরবর্তীতে সেটা হারাম হয়৷ এখন সেই আগের প্রসংগ টেনে কেউ যদি এখনো মদকে হালাল ভাবে, তাহলে তার মানসিক সুস্থতা কামনা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
আল্লাহ তখনকার জন্য এমন বিবাহ বৈধ করেছিল, তাই এটা পাপ নয়। আর তখন এটা ছাড়া আর কোন লজিক্যাল পন্থাও ছিল না। তাই তখনকার সময় বিবেচনায় এই কাজটি ইল্লোজিক্যাল ও নয়।
এখন যেহেতু মানুষের প্রজাতিতে বিভিন্ন ধারা যোগ হয়েছে, মানুষ বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়েছে, তাই আদম আ: এর সময়কার পদ্ধতির এখন আর দরকার নাই। সেই সাথে আল্লাহর নিষেধ হওয়াতে এমনটা গুনাহ ও বটে।
৪। অনেকেই প্রশ্ন তুলেন যে, এখন যেমন কাছাকাছি আত্মীয়তে বিয়ের ফলে জন্মানো সন্তানের জেনেটিক্যাল সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখনও নিশ্চয় এমন সমস্যা হয়েছে। তাই আদম আ: এর সময় এই পদ্ধতি আসলে মেডিকেল সাইন্সের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভুল ছিল।
এক্ষেত্রে বলবো, বর্তমান সময়ের মানুষের উপর করা রিসার্চ যদি আপনি লক্ষ লক্ষ বছর আগে আসা প্রথম মানুষের উপর এপ্লিকেবল হবে বলে নিশ্চিতভাবে ধরে নেন, তাহলে আপনার বুদ্ধিহীনতার প্রতি সমবেদনা জানানো ছাড়া আর কিছুই করার নাই৷
তাছাড়া, এখনকার বেশিরভাগ মানুষই যেহেতু সুস্থ, বেশিরভাগ মানুষই যেহেতু প্রতিবন্ধী নয়, তাই আমরা জেনেটিক্যালি সুস্থ মানুষের পূর্বপুরুষ থেকেই এসেছি- এমনটা ধরে নেয়াই অধিক যৌক্তিক।
আমাদের সাব্বির ভাইতো উত্তর দিলেনই, এর পর আর উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকে না, কারণ উনার উত্তরই যথেষ্ট ছিল।
কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। প্রথমত হাদিসে ভাই বোনের বিয়ের কথা এসেছে, অভিভাবক ও সন্তানদের মাঝে শারিরীক সম্পর্ক হয়েছে বলে কোন গ্রহণযোগ্য সুত্রে কোন কিছু বর্ণিত হয় নি।
আব্বাস রা. ও ইবনে মাসউদ রা. হতে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায় যেখানে আদম ও হাওয়া আ. এর জোড়ায় জোড়ায় সন্তান জন্ম হত, এক জোড়ার ছেলেকে আরেক জোড়ার মেয়ের সাথে বিয়ে দেওয়া হত। এই বর্ণনাটি উক্ত সাহাবাদ্বয় হতে হাসান সুত্রে বর্ণিত হয়েছে।
কিন্তু এগুলো হাসান সুত্রে বর্ণিত হলেও এগুলো দলিলযোগ্য নয়৷ কারণ এগুলো আহলে কিতাবগণ হতে বর্ণনা করা হয়েছে, রাসুল (সা) হতে নয়। শেখ উসাইমিন (রহ) বলেন,
"ইসরাঈলিয়াত (ইহুদি-খ্রিস্টান উপকথা) থেকে কিছু বর্ণনায় বলা হয়—"আদম (আ.)-এর প্রতি গর্ভে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্ম নিত, এবং এক গর্ভের ছেলে অপর গর্ভের মেয়েকে বিয়ে করত।" এসব বর্ণনার কোনো ভিত্তি নেই। এটি সম্পূর্ণ ইসরাঈলিয়াতের গল্প, যা শরীয়তসম্মত সূত্রে প্রমাণিত নয়।" [কিতাবু ফাতাওয়া নূরুন 'আলা আদ-দারবি লিল-'উসাইমীন ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২]
কেউ হয়তো এখন বলতে পারে সাহাবীদের থেকেতো সহিহ, তাহলে কেন ইজরায়েলী হবে! এর জবাবে ড. মুহাম্মদ আবু শাবা বলেন,
"কোনো রেওয়ায়েতের সনদ সহীহ, হাসান বা প্রমাণিত হওয়া আর তা বনী ইসরাঈলের ইসরাঈলী রেওয়ায়েত, তাদের মনগড়া কথা ও মিথ্যা বর্ণনা হওয়ার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। এগুলো ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস, মুজাহিদ, ইকরিমা, সাঈদ ইবনে জুবাইর প্রমুখ থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হলেও এগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে গ্রহণ করা হয়নি। বরং এগুলো আহলে কিতাবের সেইসব লোকদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সুতরাং এগুলো যে ব্যক্তি থেকে বর্ণিত হয়েছে তার নিকট হতে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয়, আর এগুলো (গল্পগুলো) নিজের মধ্যেই মিথ্যা, বাতিল বা বানোয়াট হওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়।" [কিতাবুল ইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউদূ'আত ফী কুতুবিত তাফসীর পৃষ্ঠা ৯৬]
আহলে কিতাবগণ হতে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু ওয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
বনী-ইস্রাঈল থেকে (ঘটনা) বর্ণনা কর, তাতে কোন ক্ষতি নেই। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যা (বা জাল হাদীস) আরোপ করল, সে যেন নিজ আশ্রয় জাহান্নামে বানিয়ে নিল। [রিয়াদুস সলেহিন ১৩৮০]
আবূ হুরাইরাহ রা বলেন, আহলে কিতাব (ইয়াহূদী) ইবরানী ভাষায় তাওরাত পাঠ করে মুসলিমদের কাছে তা আরবী ভাষায় ব্যাখ্যা করত। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
তোমরা আহলে কিতাবকে বিশ্বাসও কর না আর অবিশ্বাসও কর না এবং তোমরা বল (আল্লাহর বাণী) ‘‘আমরা আল্লাহ্তে ঈমান এনেছি এবং যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে . . . .’’- (সূরাহ আল-বাকারাহ ২/১৩৬)। [বুখারী ৪৪৮৫]
ড. মুহাম্মদ আবু শাবা আরেক যায়গায় হাবিল কাবিলের ভাই বোনের বিয়ের এই বর্ণনাগুলো সম্পর্কে বলেন,
এ ধরনের সব বর্ণনা - কুরআনে বর্ণিত বনী ইসরাঈলের ইসরাঈলী বর্ণনা ছাড়া - ইসরাঈলী উপকথার অন্তর্ভুক্ত। কিছু বর্ণনা স্পষ্টভাবে কা'ব আল-আহবার, ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ, এবং ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ ও অন্যান্যদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে, যার উৎস হলো সেই সব আহলে কিতাব যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। [কিতাবুল ইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউদূ'আত ফী কুতুবিত তাফসীর পৃষ্ঠা ১৮২]
কেউ কেউ বলতে পারেন ইবনে মাসউদ হতেওতো হাসান সনদ রয়েছে, তিনিতো ইজরাইলিয়াত বর্ণনাকারী নন! কিন্তু এই কথাও শতভাগ শুদ্ধ নয়। কারণ তিনিও ইজরায়েলী রেওয়ায়েত করতেন বলে জানা যায়, যদিও তা অন্যদের তুলনা কম৷ যেমন, শাইখ রাযেহী তার সুনানে নাসাইয়ের শারহতে উল্লেখ করছেন, মাসাউদ ইসরাইলিয়াত বর্ননা করতেন, কিন্তু অল্প। [কিতাবু শারহি সুনান আন নাসাঈ - আর-রাজিহী, খন্ড ১৯, পৃষ্ঠা ৩]
শেখ বিন বাযও এটা নিশ্চিত করেছেন যে এই বর্ণনাগুলো ইজরায়েলী। তিনি বলেন,
"এটি বনী ইসরাঈলের খবর, যার উপর ভরসা করা যায় না। এটি বনী ইসরাঈলের বর্ণনা। সে কাকের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরই মাটি চাপা দিয়েছিল। বনী ইসরাঈলের খবরে দ্বন্দ্ব ও অসঙ্গতি থাকে, কারণ এগুলো আল্লাহর কাছ থেকে আসেনি। তারা কখনো সত্য বলে, কখনো মিথ্যা।...
আল্লাহ যা উল্লেখ করেছেন তাতেই যথেষ্ট। কুরবানী এই বোনের জন্য হোক অথবা বা ওই বোনের জন্য, এমন বিস্তারিত বর্ণনা কুরআনের নির্দিষ্ট নির্দেশনার উপর নির্ভর করে। আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্ট নির্দেশ ব্যতীত কিছু নিশ্চিত করা যায় না। ..."
কাবীল ও হাবীলের নামে কোনো সহীহ হাদীস আছে কিনা এর জবাবে তিনি বলেন,
"আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না, তবে একটি সহীহ হাদীস আছে: “যে কোনো প্রাণ অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়, তার রক্তের একটি অংশ আদমের প্রথম পুত্রের উপর বর্তায়, কারণ সে প্রথম হত্যার প্রবর্তক।” তবে কাবীল ও হাবীলের নাম মুফাসসির ও ঐতিহাসিকদের মাঝে প্রসিদ্ধ। এর কোনো প্রমাণ নেই। এটি বনী ইসরাঈলের খবর।" [ https://binbaz.org.sa/audios/3457/تفسير-قوله-تعالى-واتل-عليهم-نبا-ابني-ادم-بالحق-اذ-قربا-قربانا-فتقبل-من-احدهما-ولم-يتقبل-من-الاخر ]